বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ক্যানিয়ন

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X উইংচ্যাপের টুংটাং আওয়াজে ঘোর কাটিয়ে উঠতেই দেখি, ঘড়িতে ঠিক বিকেল পাঁচটা বাজে । অনেকদিন পর আজকের দিনটা ছিল আমার ইচ্ছেমত আলসেমি খোঁজার দিন । তাই এক মগ আগুন গরম কফি নিয়ে বারান্দায় বসেছিলাম সময় কাটানোর জন্য । জানেন পাঠক, আমার বাসার এই ছোট্ট বারান্দাটির কখনো মন খারাপ হয় না । বলতে পারিনা, একটা বারান্দার কি কখনো নিজস্ব অনুভূতি থাকতে পারে ? বোধ হয় , পারে । নাহলে এক মগ কফি নিয়ে এই বারান্দায় বসলে আমার নিজের সাথে এত বোঝাপড়া কেমন করে হয়ে যায় ? কফিতে শেষ চুমুক দেবার আগেই কল রিঙ্গের আওয়াজ পেয়ে উঠে দাঁড়াই আমি। টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি ছোটফুপি – স্কাইপিতে কল দিয়েছে । কল রিসিভ করতেই সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ কি ইরা ? খুব ভাল্লাগছে এখন তোর, তাইনা ?” চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে ঘোলাটে দৃষ্টিতেই স্কাইপি স্ক্রিনের দিকে তাকালাম আমি । ফুপির চোখ পাকানো এক্সপ্রেশান দেখে ফিক করে হেসে ফেলতেই সে রীতিমত চিৎকার করে আমাকে বলল, “বেয়াদব মেয়েমানুষ ! হাসবিনা একদম !” আমি হাসি থামানোর প্রানপন চেষ্টা করে মুখে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বললাম , “ ওককে ! এই থামলাম আমি । আর হাসবোনা । খেপে আছো কেন বল তো ?” “ ইরা, তোকে বলেছিলাম আমি – এইসব ছাড় তুই !” আমি কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে নাক টেনে বললাম , “ কি ছাড়বো বলতো ?” “ চুপ কর ! তোকে বললাম আমেরিকান ছেলেটার সাথে ডেইট কর – সেলফি আপ দে । ওই পাজির পা ঝাড়া লোকটাকে তো এখনো লিস্টে রেখে দিয়েছো – ওকে দেখাও , তাকে ছাড়া তুমি বিন্দাস আছো !” “ আসল কথা, তুমি চাচ্ছো শায়নকে আমি জেলাস বানাই, তাইতো ? বুঝেছি ।” ফুপি হাল ছেঁড়ে দিয়ে বলল, “ তুই কি চাস বলতো ?” আমি এক মুহুর্ত চুপ থেকে বিশাল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম , “ আরো কিছু বছর এই পৃথিবীর কার্বন ডি অক্সাইড বাড়িয়ে ধাম করে মরে যেতে চাই ।” “ তুই মর না – এক্ষুনি মর । নাইলে ব্লক দিব আমি তোকে , কেমন ?” আমি অট্টহাসি দেবার আগেই ফুপি কল কেটে দিয়ে অফলাইন হয়ে গেল । ভদ্রমহিলা রেগে আছে ভীষন । রাগ করার অবশ্য একটা কারন আছে - স্টিফেন নামে আমার এক আমেরিকান কলিগ আমাকে অনেকদিন ধরেই পটানোর চেষ্টা করছিল । বহুবার সহ্য করার পর সেই ভদ্রলোককে আজকে আমি সিরিয়াসলি রিজেক্ট করে দিয়েছি । অথচ কোন এক অদ্ভুত কারণে ফুপি একে একদম এ প্লাস মার্কস দিয়েছিল । তাই আমার এই কাজে সে খেপে আগুন হয়ে আছে । অবশ্য এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই । আমার কাজকর্মে রাগ করাটা তার জন্য আলুভর্তা- ডিমভাজির মতই নরম্যাল হয়ে গেছে । আর আমি তো জানি , সে কেন আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করে ! কফিমগটা নামিয়ে রেখে আমি আমার কোলের ওপর রাখা অফহোয়াইট কালারের এনভেলাপটিকে ছুঁয়ে দিলাম । জানেন পাঠক, এই এনভেলাপটার মাঝে পুরনো হয়ে যাওয়া একটা বিয়ের ইনভাইটেশান কার্ড রয়েছে । খুব সম্ভবত কার্ডটার বয়স প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে । অথচ এখনো একে দেখলে আমার পুরো পৃথিবীটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায় ! এই পর্যায়ে এসে পাঠককে বরং আমার ব্যাপারে কিছ কথা বলে নিই । জানেন পাঠক, আমি মেয়েটা আগে থেকেই ভীষণ বোকা ছিলাম । তাই খুব বোকার মতই একটা সময় আমি ভাবতাম , যদি কখনো কাউকে ভালবাসি তো চুপ করে থাকব না ! একদম ছেলেটার কলার চেপে ধরে বলব , ভালবাসতেই হবে আমাকে । খুব বোকাবোকা ভাবনা, তাইনা পাঠক ? অথচ দেখুন, বাস্তবতা কি অদ্ভুত ! আর এই অদ্ভুত বাস্তবতা সত্যিই আমাকে যখন ভালবাসতে শেখাল , আমি বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলাম - আমার সামনে একটা পথই খোলা । আর সেই পথটা ধরে আমাকে নাকি চুপচাপ সরে যেতে হবে ! যে ছেলেটাকে ছাড়া আমার দম নিতেও কষ্ট হয় , এই একটা জীবন আমাকে নাকি তাকে ছাড়াই বাঁচতে হবে ! খুব ছেলেমানুষি জেদে আমি তাকে আঁকড়ে ধরতে গেলাম । কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম , সেই চোখে আমার জন্য কোন জায়গা নেই । তার নিঃশ্বাস আমার নামটা উচ্চারন করতে পারেনা । আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগল , কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমি ডুবে যেতে থাকলাম এক অচেনা চোরাবালিতে ! কয়েকদিন পর এই আমিই আর তার কলার চেপে আমাকে ভালবাসতে বাধ্য করবার কথা ভাবতে পারলাম না । সেই অধিকারটুকু যে আমার নেই । আমাকে সে চায় না , ভালবাসেনা কিংবা তার জীবনে আমার অস্তিত্ব খুবই নগন্য - এরকম অনেকগুলো বুলেট এসে আমার হৃদয়ের মাঝখানে আঘাত করতে লাগল দিনের পর দিন । তাকে ছাড়া ভাল থাকবার কোন সুযোগ আমার নেই , তবুও আমি প্রতিদিন তাকে ছেড়ে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম । ভাবলাম , আমি চলে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি তো একাই ছিলাম , আরো একটু বেশি একা হয়ে গেলে আর কি ক্ষতি হবে আমার ? প্রিয় পাঠক, একটা জিনিস আমি খুব ভালভাবে বুঝে গিয়েছিলাম - আমি যতদিন তার কাছাকাছি থাকব, ইচ্ছেয় অনিচ্ছেয় তাকে বিরক্ত করব । হ্যা , বিরক্ত ! আমি নিজেকে থামাতে পারতাম না কিছুতেই । তাই দূরে সরে যাওয়াটাই আমার একমাত্র অপশান ছিল । ঠিক করলাম, নিজের এই ভাগ্যকে মেনে নেব । দূরে চলে যাব – যত দূরে চলে গেলে এই একটা জীবনে সে আমার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবেনা কোনদিন ! আমার আগের জীবনটায় যদি ফিরে যেতে পারতাম , কতইনা ভাল হত ! যে জীবনে সে ছিল না । কেন যেন মানুষ শুধু বদলেই যায় । মানুষের ভাল লাগাগুলো বদলে যায় । দুজনের মাঝে একজন মুভ অন করতে পারে , আর অন্যজন চুপচাপ হয়ে যায় – মৃত মানুষের মত । জানেন পাঠক, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি ওকে চলে যেতে দিতাম না । দুই হাতে ওর শার্টের হাতা খামচে নিয়ে বলতাম , “ শায়ন , তোমাকে ছাড়া বাঁচতে আমার অনেক ভয় করে ! শায়ন ! শায়ন !” কিন্তু আমি পারিনি, আমার শেষরক্ষা হয়নি । শায়ন অন্য একজনকে পছন্দ করত । তার পছন্দ করা মেয়েটার নাম কি অথবা সে দেখতে কেমন – এসব কোন কিছু জানতে চাইবার সাহসই আমি পাইনি কোনদিন । নিজের জীবনটাকে যদি কোরিয়ান কোন ড্রামা হিসেবে আমি দেখতে পেতাম , তাহলে চোখ বন্ধ করে আমাকে বলা হত সেকেন্ড লিড । জানেন পাঠক , সেকেন্ড লিডদের আমার কখনোই ভাল লাগত না – নায়ক নায়িকার মাঝে শুধু কাবাব মে হাড্ডিগিরি ! অথচ দেখুন, আমার নিজের জীবনে আমি নিজেই কিনা হয়ে গেলাম সেকেন্ড লিড । যে হাজার চেষ্টা করলেও তার ভালবাসাকে ছুঁয়ে দিতে পারবেনা কোনদিন ! শায়ন যেদিন আমাকে তার বিয়ের কার্ডটা দিয়েছিল , সেদিন ছিল গ্রীষ্মের এক রোদ্দুর বিকেল । এক হাতে মুভ এন পিকের আইসক্রিম নিয়ে অন্য হাত দিয়ে আমি কার্ডটা ধরে রেখেছিলাম । সেদিনের সেই বিকেলে এই কার্ডটা আমার কাছে আমার ভালবাসার ছাড়পত্র এনে দিয়েছিল । যে ছেলেটা আমাকে কোনদিন একটা মুহুর্তের জন্যেও ভালবাসতে পারেনি , সেদিন আমি তার কাছ থেকে এক জীবন একাকীত্ব কিনে নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম । চলে আসবার আগে নিজের সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলেছিলাম , “ আচ্ছা শায়ন, আমাকে কি তোমার কখনো ভাল লেগেছিল ? এই ধর , খুব অল্প সময়ের জন্য ?” সে শুধু একটু হাসবার ভান করে বলেছিল , “তোমাকে তো আমার সবসময়ই ভাল লাগে ইরা, তোমাকে আমার কেন খারাপ লাগবে ? কিন্তু তুমি যেই সেন্সে ভাল লাগবার কথা বলছো , ইরা – আমি আসলে সেই সেন্সে... আমি আসলে...” শায়নের অবস্থা দেখে অতি দুঃখেও আমার হাসি চলে এসেছিল । এই ছেলেটা আমাকে কোনদিন ভালবাসতে পারেনি – এটা কি তার অপরাধের মাঝে পড়ে ? আমি তবু দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলাম, “ তুমি সত্যি বিয়ে করে ফেলছো, তাইনা ? সত্যি আমার এখন গিভ আপ করা উচিত, তাইনা ?” “ ধুর বোকা মেয়ে – রাজপুত্র আসবে তোমার জন্য !” আমি ওর চোখের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলাম, “ শায়ন, রাজপুত্র আসবার আগেই তুমি এসেছিলে কেন ?” শায়ন উত্তর দিতে পারেনি । আমি অপেক্ষা করেছিলাম কয়েক মুহুর্ত - তারপর তাকে পাথরের মত বসিয়ে রেখে আমি সেদিন চলে এসেছিলাম । সেদিনের সেই বিকেলে আমার ছেলেমানুষী হৃদয়টা ভীষণ বোকার মত মরে গিয়েছিল । মরে যাবার আগে আমাকে ডেকে বলেছিল , “ইরা ! এভাবে কাউকে চাইতে নেই । এভাবে কাউকে চাইতে হয়না । এতটা বোকামি কখনো করতে হয়না, ইরা !” তারপর দিনে দিনে কেটে গেল অনেকখানি সময় - আমি নিজেকে নিয়ে বাঁচবার জন্য বেঁচে রইলাম । শুধু আমার অস্তিত্ব থেকে শায়নকে আমি মুছে দিতে পারলাম না । নিউজার্সিতে আমার ছয়তলার ছোট্ট এপার্টমেন্ট থেকে ডেলাওয়ার রিভারের একটা সাইড চোখে পড়ে সবসময় । কোন কোনদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে আমি আমার স্বচ্ছ জানালা দিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার জানালার সামনে জমাট বাঁধা অন্ধকার । আমিতো শায়নের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি - তবু এতগুলো দিন পরেও তার নামটা উচ্চারন করলেই আমার চোখ ফেটে কান্না আসে কেন ? খুব জানতে ইচ্ছে করে - এই দুর্ভাগা ভালবাসার গল্পে সবটুকু কাঁদবার জন্য আমি একাই পড়ে আছি কেন ? শায়ন , আমার মুক্তি নেই কেন ? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় , আমি আর শায়ন একই ক্লাবে ছিলাম । আমি গান লিখতাম , আর ও চুপচাপ ওর গীটারে সুর তুলত । একদম শেষবর্ষে আমি যখন র‍্যাগ প্রোগ্রামের জন্য একটা ইংরেজী গান লিখলাম – টানা তিনদিন আমাকে পাশে বসিয়ে রেখে গানটার সুর করেছিল শায়ন । ও বলেছিল, এই গানের সুর পারফেক্ট কিনা সেটা নাকি আমি ছাড়া আর কেউ বলতে পারবেনা ! আমি গানটার নাম দিয়েছিলাম – ক্যানিয়ন । -“ আচ্ছা ইরা , তোমার কি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে বেড়াতে যাবার অনেক শখ ?” -“অনেক কিনা বলতে পারিনা , তবে একটু একটু শখ আছে ।” -“মিথ্যে ! অনেক শখ না হলে কেউ ক্যানিয়নের কাছে লাভস্টোরি বলতে চায় নাকি ?” আমি ধরা খেয়ে হেসে ফেলেছিলাম । শায়ন গীটার থেকে আঙ্গুল সরিয়ে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলেছিল , “ ক্যানিয়নের দিকে হাঁটা দেবার আগে পারলে আমাকে ডেকো । আমিও শুনতে চাই তোমার গল্প ।” ঠিক সেদিন থেকে আমি শায়নের নামে মনে মনে জ্বালিয়েছিলাম একশ একটি ফানুশ । সে হয়ত একজন বন্ধু হিসেবেই আমার সাথে কথা বলত – কিন্তু আমি আর তাকে বন্ধুর চোখে দেখতে পারলাম না । তারপর একদিন ঘুম ভেঙ্গে জানতে পারলাম , শায়ন যাকে পছন্দ করে – সে অন্য কেউ । জানতে পারলাম শায়ন যাকে ভালবাসে , আমি হাজারবার মরে গেলেও কখনো সেই মানুষটি হতে পারব না ! স্টেটসে চলে আসবার পর , আমি ক্যানিয়নে গিয়েছি বেশ কয়েকবার – কিন্তু শায়নকে ডাকা হয়নি কোনদিন । প্রতিবার ক্যানিয়নে গিয়ে আমি একই গল্প বলি – একই শ্রাবনে প্রতিবার ভিজি । তবু আমি আমার এই গল্পটাকে বদলে দিতে পারিনি কিছুতেই । মাঝেমাঝে মন খুব বেশি খারাপ লাগলে আমি ছোটফুপিকে যন্ত্রণা দিতে তার শিকাগোর এপার্টমেন্টে চলে যাই । ভদ্রমহিলা আমাকে নিয়ে যদিও অনেক চিল্লাপাল্লা করে , কিন্তু তার জীবনটা আমার হলে আমি বোধহয় বাঁচতে পারতাম না বেশিদিন । আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি , তখন আমার ভার্সিটি পড়ুয়া ফুপির একটা রিলেশান ছিল । আটমাসের মাথায় সেই রিলেশানটা ভেঙ্গে যায় । আমার সবসময় হাসিখুশি থাকা ফুপিটা কেমন যেন নিভে গিয়েছিল । তার কাছে যখন জানতে চাইতাম , ফুপি তোমার কি হয়েছে – তখন সে মলিনভাবে হাসত , আর সেই হাসি দেখে প্রচন্ড মেঘে আঁধার হয়ে আসত আকাশ । স্টেটসে আসবার দেড় বছরের মাথায় , ফুপিকে আমার কথাগুলো বলেছিলাম । শুনে সে চোখ পাকিয়ে বলেছিল , “ দ্যাখ ইরা ! এসব কিছুনা –তুইও ভুলে যেতে পারবি, ব্যাপার না !” তার কথা শুনে আমি হেসে ফেলেছিলাম । সেই হাসি দেখে ফুপি চমকে উঠে বলল, “ এভাবে হাসতে শিখেছিস কেন ? এই হাসি মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয় – জানিস ?” এই কথার উত্তর আমি দিতে পারিনি । “ ফুপি মনে আছে ? আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম – তোমার ব্রেক আপ হল ...” ফুপি হাসল । অবিকল আমার মত হাসি । বাবা বলত , আমাদের দুজনের চেহারায় নাকি অদ্ভুত রকম মিল । তাই ফুপির নাম ‘নীরা’র সাথে মিলিয়ে আমার নাম রাখা হয়েছিল ইরা । -“ জানিস ইরা , আমার সেই আটমাসের সম্পর্কটায় – ছেলেটাকে আমি যে কি ভালবাসতাম ! অথচ আমি তাকে চিনতামই না, সে ই এপ্রোচ করেছিল । দিনে দিনে সে আমার চারপাশের দেয়ালটা ভেঙ্গে দিয়েছিল – আর একদিন আমি তার জন্য আমার হৃদয়টা খুলে দিয়েছিলাম । আমাদের গল্প শুরু হল । খুব ছেলেমানুষি অভিমানে আমি যখন চুপ করে থাকতাম , সে বলত – আমি রেগে থাকলে সে নাকি ঘুমাতে পারবেনা ! আমি কথা বলা থামিয়ে দিলে সে নাকি ভাল থাকতে পারবেনা ! জানিস ইরা – আমি এত বোকা ছিলাম , সেই রাতে আমি পৃথিবীর সবচাইতে সুখী রাজকন্যার মত ঘুমাতে গেলাম । বোকার মত ভাবলাম – এই ছেলেটিকে আমি বুঝি “ আমার” বলতে পারব !” -“ তারপর ?” -“ যে সম্পর্কটা দুজনের ইচ্ছেয় শুরু হয়েছিল , সেটা শুধুমাত্র একজনের ইচ্ছেয় ভেঙ্গে গেল । আমি তোকে বুঝাতে পারব না ইরা , সে যখন আমাকে বলল , এই রিলেশানটা তার আর ভাল লাগছেনা - আমি সেদিন ঠিক সেই মুহুর্তে মরে গিয়েছিলাম । আর তার পরের মুহুর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম , আমার কোন কিছুতেই তার আর কিছু আসে যায়না ! আমি তাকে মুক্তি দিলাম ,সেই মানুষ – যাকে আমি আমার সব ইগোর উর্দ্ধে গিয়ে ভালবেসেছিলাম ।” -“ ফুপি ...” -“ আমার কাছে সে আর ফিরে আসেনি । জানতে ইচ্ছে হয় , আমাকে একা ছেঁড়ে দিয়ে ও এখন কতটা ভাল আছে । তাই বোকার মত এখনো আমি তার অপেক্ষায় থাকি । আমি জানি, তার এখন সুন্দর একটা পরিবার আছে , জানিস - ওর বউটা একদম পরীর মত ! আমি তবু অপেক্ষায় থাকি , হঠাত যদি কোন এক ভোরে সে আমাকে একটা ইমেইল দিয়ে জানতে চায়, “ নীরা, এতদিন পরে তুমি কি এখনো একা ? তোমার কি খুব ক্লান্ত লাগে ? তুমি এখন কেমন আছো, নীরা ?” আমি তার অপেক্ষায় থাকি – সেই ইমেইলটাকে চোখের সামনে নিয়ে আমি পাগলের মত কাঁদবার অপেক্ষায় থাকি !” এতটুকু শুনবার পর আমি আর থাকতে পারিনি । রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম এক ছুটে । ফুপিকে দেখে মাঝেমাঝে অবাক লাগে আমার । কি অসাধারন একজন মানুষ – চাইলেই তার জীবনটা গুছিয়ে নিতে পারত সুন্দর ভাবে । কিন্তু অতীতটাকে আঁকড়ে ধরে সে তার জীবনে আর অন্য কোনকিছুতে থেমে থাকে নি । এখানেই একটা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছে , বুকের ভেতর একটা মৃত আগ্নেয়গিরি চেপে রেখে তবুও সে হাসিখুশি থাকছে । ফুপির কথা ভাবতে ভাবতেই খেয়াল করি, আমার অবকাশের বিকেল একটু একটু করে সন্ধ্যা হচ্ছে । একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াই আমি । রেডি হতে হবে , আজ রাতে আমার ফ্লাইট । ক্যানিয়ন আমাকে ডাকছে । আমি যে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে জব করি , সায়েম নামের একটা ছেলে গত কয়েকমাস ধরে সেখানে কাজ করছে । ছেলেটি আমার বেশ কয়েক বছরের জুনিয়র – মিশুক হবার কারণে অফিসের সবার সাথেই ভাল সম্পর্ক তার । স্ত্রীকে এই দেশে নিয়ে এসেছে বলে তার গ্রুপের সবাইকে দাওয়াত দিল একদিন । দাওয়াত পেলাম আমিও । সাধারনত আমার কোন রকম অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়না , আর চুপচাপ থাকি বলে আমি গেলাম কি না গেলাম সেটা নিয়েও কারো মাথাব্যথা থাকেনা । এক কথায় বলা যায় , আমাকে কেউ ঘাটাতে আসে না । একসাথে কাজ করার কারণে আমার এই স্বভাব সায়েমও জানত , তাই দাওয়াতের দিন সে নিজে গাড়ি নিয়ে আসল আমাকে নিয়ে যাবার জন্য । আমার না যাওয়ার আর কোন উপায় থাকল না । টোনাটুনির সংসারে ভালই আয়োজন করেছিল ছেলেটা । খাবার পর্ব শেষ হতেই সবাই মিলে আড্ডা – সেই সাথে ছোট্ট একটা গেইম শো । ঠিক হল, লটারিতে যার কাছে যেটা পড়বে তাকে সেটা করে দেখাতে হবে । আমার কাছে পড়ল – গান । খালি গলায় গান গাইতে হবে । সেদিন এত আনন্দের মাঝেও আমার লেখা সেই বিষণ্ণ সুরের ‘ক্যানিয়ন’ কেন গেয়েছিলাম জানিনা – তবু একটাবারের জন্যেও আমার মনে হয়নি , এই গানটি এই পরিবেশের সাথে যায়না । যেহেতু গাড়ি নিয়ে আসিনি , তাই সেই রাতে সায়েমই আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল । ইঞ্জিন চালু করেই সে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল, “ ইরা আপু – একটা কথা জানতে চাই – বলবেন ?” “কি কথা ?” “আপনি - যে গানটি গাইলেন , কোথায় শুনেছেন এই গান ?” আমি হেসে ফেললাম , “ ভার্সিটিতে একটা প্রোগ্রামের জন্য লিখেছিলাম ।” “ আপনিই গেয়েছিলেন ?” “ না । “ এক মুহুর্ত থেমে বললাম , “ যে সুর করেছিল , সে গেয়েছে ।” সায়েম গাড়িটা রাস্তার একপাশে পুলঅভার করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল , “ ইরা আপু, আপনি কি শায়ন নামের কাউকে চিনতেন ?” আমি ঝট করে সায়েমের দিকে চোখ তুলে তাকাই । সোডিয়ামের হলদে আলোয় ছেলেটার চোখ ছলছল করছে । “ আপনিই সেই মানুষ আপু ? আপনিই সে ? আমি যখন ভাইয়ার কাছে জানতে চাইতাম , ভাইয়া – এই গানটা তোর এত প্রিয় কেন ? সে উত্তর দিত, এই গান আমার স্পেশাল মানুষটির লেখা – তাই । অনেকদিন বলেছি, ভাইয়া , পরিচয় করিয়ে দে । ভাইয়া বলত , অপেক্ষা কর । আগে নিজেদের পরিচয়টা হয়ে নিক । আপু, আপনাদের মাঝে কি হয়েছিল আমি জানিনা । আমি শুধু জানি , ভাইয়া নিজে কষ্ট পেয়েছে – তার প্রিয় মানুষটিকেও কষ্ট দিয়েছে । অনেকদিন বুঝিয়েছি , তার সেই একটাই উত্তর , ও ভাল থাকুক ।” আমার দুই চোখে প্রচন্ড রকম বিস্ময় । আমি ক্লান্ত গলায় বললাম , “ আমি কিছু বুঝতে পারছিনা সায়েম ! শায়নতো অন্য একটা মেয়েকে পছন্দ করত । তুমি ভুল করছ । এই গানটা হয়ত আমার লেখা । কিন্তু ওর সাথে আমার যেদিন শেষবারের মত দেখা হয়েছিল, ও আমাকে ওর বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দিয়েছিল ।” সায়েম হাসল, “ মিথ্যে বলেছে । সে শুধুই বোকার মত মিথ্যে বলে গেছে । আপু, অনেকদিন অসুস্থ থাকবার পর আমাদের মা গতবছর মারা গেছেন । কয়েক বছর আগে হঠাত করেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল । মা কোন মেয়েকে সহ্য করতে পারতেন না । এমনকি আমাদের বোনকেও না । মেয়ে দেখলেই ডাইনী বলে চিৎকার করে উঠতেন । কয়েকবার মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন বলে আমরা বোনকে পর্যন্ত হোস্টেলে দিয়েছিলাম । ঠিক সেই সময়টাতেই ভাইয়া মিথ্যে বলেছিল আপনাকে ।” “ কিন্তু শায়ন আমাকে মিথ্যে বলল কেন ?” সায়েমের কথাগুলো বিশ্বাস হতে চাইছিল না আমার । “ সেটাই । ভাইয়া বলত , আপনাদের একে অন্যের জন্য ফিলিংসটা নাকি মিউচুয়াল । তবু সে আপনাকে কিছুই বলে নি । আমি জানিনা কেন । তার সাইকোলজিটা আমি শুধু আন্দাজ করেছিলাম , ভাইয়া মাকে ছাড়তে পারত না । এদিকে তার জন্য আপনাকে কতদিন ওয়েট করতে হবে – সেই ব্যাপারেও হয়ত সে কনফিউশানে ছিল , তাই সবকিছু শেষ করে দিয়েই সমাধান খুঁজতে চেয়েছিল ভাইয়া !” সেদিন আমি সায়েমের কোন কথার আর উত্তর দিতে পারিনি । বাসায় ফিরে চুপচাপ শুয়েছিলাম অর্ধমৃতের মত । শায়ন আর শায়নের মিথ্যে – আমি এই দুটোর ভার নিতে পারছিলাম না কোনভাবেই । পাঁচটা বছর, শায়ন – তুমি কষ্টের মানে জানো ? সত্যি জানো ? পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি সায়েমের একটা টেক্সট পাই – “ আপু, ভাইয়া অ্যারিজোনাতে । আমার স্ত্রীকে এখানে রেখে সে চলে গেছে ক্যানিয়নের টানে । আপু , প্লিজ এই একটিবার আপু , প্লিজ !” আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে ডেলাওয়ার রিভারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম । ক্যানিয়ন আমার কান্না দেখেছে । আমি যদি না চাই - ক্যানিয়ন তোমাকে ক্ষমা করবেনা শায়ন । বাইরে সায়াহ্ন আঁধার ছড়িয়েছে - লাগেজের হ্যান্ডেলটা টেনে নিয়ে আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম । কেন যেন ক্যানিয়নের সামনে আমি শায়নের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি । পরিশিষ্টঃ There was a story I have known I am gonna tell you This afternoon Oh Canyon Oh Canyon Are you alone? শায়ন ওর গীটারে মৃদু মৃদু সুর তুলে গান গাইছে । আর আমি স্টুপিডের মত তার পাশে বসে প্রানপনে নিজের কান্না চেপে যাচ্ছি । এখানে কেন এসেছি আমি ? - “আমি দুঃখিত , ইরা ।” -“তুমি মিথ্যেবাদী ।” -“ আমার কোন উপায় ছিল না , বিশ্বাস করো । আমি মাকে ছাড়তে পারতাম না – আমি জানতাম , তুমি অপেক্ষা করতে । কিন্তু কতদিন ? তোমার ক্যারিয়ার , তোমার জীবন – আমি আটকে রাখবার অধিকার খুঁজে পাইনি ইরা ।” আমি চুপ করে তাকিয়ে থাকলাম । শায়ন আমার হাত ধরে বলল, “প্লিজ , কিছু বল !” - “ আমার দিকে তাকিয়ে দেখ, শায়ন । আমি কত ভাল আছি দেখ ! কি ? বুঝতে পারছোনা ?” -“আমি সত্যিই দুঃখিত, ইরা ।” - “শায়ন, আমার একটা শখ ছিল জানো ? খুব ঝলমলে একটা দিনে , ক্যানিয়ন থেকে কলোরাডো রিভারের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি মরে যাব । খুব কষ্ট না পেলে এই জিনিস কি সম্ভব বল ? তোমাকে আমার ট্রিট দেওয়া উচিত ।” - “ইরা…” -“ কেন শায়ন ? বলতে পারো , কেন আমি এখানে এসেছি ? তোমাকে ফিরে চাইতে ? না , আমি তোমাকে আর চাইনা । এই একটা জীবনে আমার মত ইরারা হাজারবার মরে গেলেও তোমাদের কিছু আসে যায়না, শায়ন । আমি শুধু বলতে এসেছি , আমার কোন রিগ্রেট নেই । তোমাকে পাইনি বলে এতটুকু রিগ্রেট ও নেই আমার । আমি সবটাই মেনে নিয়েছি । এতটা দূরে চলে এসেছিলাম , শুধু যেন তুমি ভাল থাকো এই ভেবে । তাই আমার জন্য নিজেকে অপরাধী ভেবোনা – ভেবে নিও আমাকে তুমি চিনতে না কোনদিন ! সব মুছে ফেলো - ভালভাবে বেঁচে থাকো । আমি তোমাকে শুধু এই একটা কথাই জানাতে এসেছি । আর কিছুনা !” শায়ন হাহাকারের মত গলায় বলল, -“ আমাকে ক্ষমা করো , ইরা ! আমি ভাল নেই । There can’t be any way - আমি ভাল থাকতে পারি না ! আমার অনেক ভুল !” আমি শায়নের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “ ভুলে যাও, শায়ন । ক্যানিয়ন তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে ।” আমি চলে যাচ্ছি । আমার চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে । হাজারটা ভোঁতা অনুভূতির মাঝেও আমি কলরাডো রিভার থেকে ভেসে আসা স্রোতের শব্দ শুনতে পাচ্ছি একটু একটু করে । আমি আমার পেছন পেছন আসতে থাকা শায়নের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি । I was always behind the curtain All I wanted is to show you my shadow Now if you leave me, I will sing like a hurt swallow Oh canyon That’s my story I never told anyone Oh canyon Have you ever loved someone? আমি একরাশ হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি । এই ছেলেটিকে আমি কেন এভাবে ভালবাসতে গেলাম , কলোরাডো রিভার কি এর উত্তর দিতে পারবে ? - Seeny moni


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ক্যানিয়ন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now