বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পের নামঃকালো
ওয়েটিং রুমে ঢুকেই ভাইয়ার দিকে একবার তাকাই আমি। অনির্দিষ্টভাবে কোথাও তাকিয়ে আছেন।ভাইয়ার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে পুরো পরিবারটার দিকে একবার চোখ বুলোই-কত উৎকণ্ঠা তাদের মধ্যে।আনমনেই হেসে উঠি।আচ্ছা যার জন্যে এত উৎকণ্ঠা তিনি কি কখনো জানতে পারবেন?হয়তো,জানলে অবশ্যই খুশি হবেন।হাতের প্রেস্ক্রিপশনটার সাথে ঔষধগুলো মিলিয়ে দেখি একবার।নার্সের হাতে ঔষধের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে ফিরে আসি ওয়েটিং রুমে।
একটা ভালো সিট দেখে বসে পড়ি।গা এলিয়ে দিই হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়ে।ছাউনীর দিকে একবার তাকাই,সেখানে ফ্যানটা ভো ভো করে ঘুরছে।ভাইয়া চোখ বন্ধ করে অনেকটা সময় ধরে কি যেন প্রার্থনা করছেন,চোখে তার স্পষ্ট অশ্রু।কি অবাক করা বিষয় তাই না?যার জন্যে এত প্রার্থনা তার, তাকেই কত কি অবহেলা।
ভাইয়া আমার থেকে সব দিক থেকেই এগিয়ে।কি পড়াশোনা,কি চেহারায়।ঈর্ষা কি কম করি?ভাইয়া যখন আইবিএতে ভর্তি হলেন,বাবা তখন আমার মাথার পেছন থেকে কষে চড় মারেন।আমি রাগী রাগী চোখে তাকাই।
“সমস্যাটা কি?”
“ভাইটাকে দেখেছিস?”
“দেখব না কেন?”
“এরপরও কোন শিক্ষা হয় না?”
আমি চেয়ারে গা এলিয়ে দিই।“কি শিক্ষা হবে?”
আমার নির্লিপ্ততায় বাবা বিরক্ত।বিড়বিড় করতে করতে চলে যান।
নতুন কেউ আসলেই ঢ্যাব ঢ্যাব চোখে দুজনকে দেখতে শুরু করতো।তারপর কেলিয়ে একটা হাসি দিয়ে মায়ের দিকে ফিরে বলতেন, “আপা আপনার দুই ছেলেকে দেখলে মনে হয়ই না এরা এক পেটের বাচ্চা।ছোট জনের চেহারা তো কারো সাথেই মিলে না।অবশ্য ছেলে মানুষ চেহারা দিয়ে করবেটা কি…”
স্পষ্ট দেখতে পাই মায়ের মুখটা কালো হয়ে গিয়েছে।আমার এসব গায়ে লাগে না,কিন্তু মহিলার একটা কথা কানে বাজতে থাকে।ছেলেমানুষ চেহারাটা দিয়ে করবে কি?মেয়ে মানুষই বা করবে কি?বুঝে উঠি না।
একটা সময় ভাইয়া পাশ করে বের হন।চাকুরীও পান বেশ,মাসে এক লাখ টাকার উপরে।বাবা-মা বিয়ে দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লাগেন। ভাইয়া বাবা-মায়ের বাধ্য সন্তান।বিয়েতে তার অমত নেই।
ভাবিকে এক নজর দেখি।চোখজোড়া কেমন যেন টানা টানা,নাকটা কেমন যেন বোচা।মুখের হাসিটা যে কাউকে খুশী করে দিতে পারবে।ভাইয়ার বড্ড মন খারাপ।ভাবিকে পছন্দ হয়নি তার,গায়ের রংটা নাকি বড্ড বেশি কালো।তার সাথে নাকি যায় না।আবার মানাও করতে পারে না,বাবা মায়ের বাধ্য ছেলে বলে কথা।
পাড়া প্রতিবেশী ফিসফিস করে,মেয়ে কালো বলে কথা।ছেলে হলেও চলতো বটে।আজব এক দুনিয়া!
ভাবির সাথে প্রথম কথা হয় বিয়ের পরদিন।বেশ চটপটে একটা মেয়ে।কথা নেই বার্তা নেই আমার রুমে ঢুকে পড়া।
“তুই সকালে খাস নি?”
অপরিচিত কারো মুখ থেকে তুই শোনার অনুভূতিটা কেমন যেন।আমি মাথা ডানে বায়ে করি।ভাবি কি যেন ভেবে বেরিয়ে যান।
ট্রে তে সাজানো নানা পদের নাস্তা।আমি অবাক হই।
“আপনি?”
“আপনি না তুমি।”ভাবির মুখে মুচকি হাসি।
ভাইয়া আজকাল রাত করে অফিস থেকে ফেরেন।মুখে কি সবের যেন গন্ধ।বাবা-মাকে নিজের অজান্তেই খারাপ কথা বলে বসেন।মা ফুঁপিয়ে কাঁদেন। ভাবির দিকে একবার তাকাই,হাতজোড়া শক্ত করে দাড়িয়ে আছেন,চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি।
হাতের উপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সরে যায়,হাতটায় কেমন যেন কাটার দাগ।তাজা রক্তগুলো কেমন যেন ঝিলিক দিয়ে ওঠে।আমি হাতটা খপ করে ধরি।
“ভাবি…”
ভাবি কিছু বলেন না,ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন।কপালের একটা অংশ তার লাল হয়ে আছে-আমি শিউরে উঠি।
বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ,নতুন অতিথি আসবে বলে সবার মাঝে কি আনন্দ।ভাবিকে খুঁজে বেড়ায় আমি।ছাদের এক কোণে একটা অবয়ব,আমি ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে যাই।ভাবি স্থির চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
“আচ্ছা কালো কি কোন অভিশাপ?”
“কেন?”আমি ভাবির দিকে তাকাই।
“ঠিক জানি না।”আমার দিকে তাকান তিনি।“আমার সন্তানটি যেন কালো না হয় কেবল এই প্রার্থনাই করি।”
এরপর প্রায় নয়টা মাস কেটে যায়।ভাইয়া কেমন যেন পরিবর্তন হতে শুরু করেন।আজকাল কথার ফাঁকে আমার কাছে ভাবির খোজ নেন তিনি,আমি মিটিমিটি হাসি।
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি,ভাবি ককিয়ে উঠেন।ভাইয়া দ্রুত বাসায় ফিরে আসেন।এম্বুলেন্স,লাল বাতি আর সাইরেনের শব্দ-আমরা করিডর ধরে এগিয়ে যাই।অপারেশন থিয়েটারে যাবার আগ মুহূর্ত নাগাদ ভাবি ভাইয়ার হাতটা ধরে রাখেন।কে আজব এক বিশ্বাস…
ওয়েটিং রুমটার ছোট্ট জানালাটার পাশে এসে দাঁড়ান ভাইয়া,আমি তার পাশে এসে দাঁড়াই।
“আজকে আকাশটা বড্ড কালো।”
“হুম।”
“আচ্ছা শুভ, কালো মানে জানিস?তুই তো বাংলার ছাত্র।”
আমি হেসে উঠি।“কালো মানে আভাস।নতুন শুরুর আভাস, ব্যর্থতার পর নতুন শুরুর আভাস,পরাজয়কে হারানোর নতুন শক্তি,নতুন একটি সূর্যের অপেক্ষা।কালো সব রঙকে গ্রহণ করতে জানে।তার মাঝে সকল বৈশিষ্ট্যই পরিপূর্ণ বিদ্যমান।কালো মানেই পরিপূর্ণতা,নতুন পথ চলার শক্তি। ”
ভাইয়া কি যেন ভাবেন,অজান্তেই মাথা নাড়েন একবার।
নার্স এসে উপস্থিত হন।আমরা তার দিকে ফিরে তাকাই।
হেসে ওঠেন তিনি।“মেয়ে হয়েছে।ঠিক মায়ের মত।”
আমি কেমন যেন ধাক্কা খাই।ভাইয়ার দিকে তাকাই ভয়ে ভয়ে,মুখে তার বিস্তৃত হাসি।
পরিশিষ্ঠঃ
পাড়ার হুজুর পানটা মুখে দিয়ে বাচ্চাটাকে ভালো করে একবার দেখেন।বিভিন্ন ভঙ্গিতে কি যেন পরীক্ষা করেন।আমাকে ইশারায় ডাকেন তিনি।আমি এগিয়ে যাই।
“মাইয়া কালা হওয়ার মানে জানেন?”
আমি মাথা এদিক ওদিক করি।
“অভিশাপ,বুঝলেন অভিশাপ।”
মনের অজান্তেই হেসে উঠি। ধর্মের কোথাও এমন লেখা আছে কিনা জানা ছিল না।হাতটা সটান করে গাল বরাবর বসিয়ে দিই।ততক্ষণে মুখের পান অনেকদূর ছিটকে গিয়েছে।গালের উপর পাঁচটা দাগ।হুজুর সাহেব গালে হাত দিয়ে ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ান।অন্য হাতটাও সটান করি।আরেকটা থাপড় তার জন্যে আবশ্যক।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now