বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমদ মুসা দাঁড়াবার পর মুহূর্তেই বাঁ দিক থেকে একটা কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এল, ‘হাতের ষ্টেনগান ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়াও, না হলে তোমার মাথার খুলি উড়ে যাবে এখনি।’
কিছুটা অসতর্ক ভাবেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার ষ্টেনগানটা তার ডান হাতে ঝুলছে। আর আক্রমণটা এসেছে সামনে থেকে নয়, একদম পাশ থেকে। ওদের উদ্যত রিভলবার বা ষ্টেনগানের মুখে তার অপ্রস্তুত ষ্টেনগানকে টার্গেট পর্যন্ত তুলে নিয়ে সফল হওয়া অস্বাভাবিক। আহমদ মুসা দ্রুত ভাবছিল বিকল্প নিয়ে।
ঠিক এ সময় আহমদ মুসার তার পেছন থেকে প্রায় একই সাথে দুটি গুলীর শব্দ শুনল। বুঝল এ গুলী হাজী আবদুল্লাহর।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াবার সময় একটু সামনে এগিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার ফলেই হাজী আবদুল্লাহ পেছনে পড়েছিল।
আহমদ মুসা ষ্টেনগান উঁচিয়ে ধরে তাকাল বাঁ দিকে। দেখল, বাঁ দিকে রাস্তার ওপারে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজন যুবক টলতে টলতে পড়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বসে পড়ল।
হাজী আবদুল্লাহ উঠে দাঁড়াচ্ছিল তখনই। আহমদ মুসা বলল, ‘বসুন জনাব, ওদের আর একজন আছে।’
বসে পড়ল হাজী আবদুল্লাহ।
‘ধন্যবাদ। কনগ্রাচুলেশন জনাব। আপনি ঠিক সময়ে গুলী করেছেন।’ বলল আহমদ মুসা হাজী আবদুল্লাহকে।
‘ধন্যবাদের কিছু নেই আহমদ মুসা। আমি টেনশনমুক্ত অবস্থায় ধীরে-সুস্থে, মেপে-জুকে গুলী করার সুযোগ পেয়েছি। এমনভাবে সফল হতে যে কেউ পারে।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল।
‘আপনি লুকোচ্ছেন জনাব। কে বলল টেনশন ছিল না। আপনার গুলী ব্যর্থ হলে ওদের পরমুহূর্তের পাল্টা গুলী আমাকে, আপনাকে কাউকে রেহাই দিত না। আপনার হাত অভ্যস্ত ও নিখুঁত। আপনি লুকোলেও আপনার এক অতীত আছে। আমাকে সাহায্য করা এবং এই অভিযানে আপনার শামিল হওয়া থেকেই আমি এটা বুঝেছি।’ আহমদ মুসা কথাগুলো বলছিল রাস্তার ওপারে তার অপলক চোখ নিবদ্ধ রেখে।
হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসার কথার কোন জবাব না দিয়ে আহমদ মুসার দৃষ্টি আনুসরণ করে রাস্তার ওপারে তাকিয়ে বলল, ‘ওদের সাথে আরো কেউ থাকলে সে সংগে সংগেই জবাব দেবার কথা।’
‘সে এদের সাথে নাও থাকতে পারে, কিন্তু কোথাও থাকার কথা।’ বলে আহমদ মুসা আবার মাথা উপরে তুলল।
হাজী আবদুল্লাহও।
উত্তরে রাস্তা বরাবর কারাগারের সামনে চোখ পড়তেই আহমদ মুসা দেখতে পেল, একজন বিশাল বপু লোক লাঠি হাতে দৌড়ে কারাগারের ভেতরে ঢুকে গেল।
হাজী আবদুল্লাহও দেখতে পেয়েছে ব্যাপারটা এবং সেই প্রথম কথা বলে উঠল, ‘ঐ তো সে পালাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ জনাব, ইনিই সম্ভবত এদের এক নেতা স্বামীজী।’
বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আসুন দৌড় দিতে হবে।’ সে গংগারামের ক্ষতি করতে পারে, যদি গংগারাম এখনও বেঁচে থাকে।’
ছুটল আহমদ মুসা কারাগার লক্ষ্যে।
দুজনেই ছুটছে।
কারাগারের সামনে পৌছেই তার ষ্টেনগান থেকে গুলীবর্ষণ শুরু করল আহমদ মুসা।
গুলী করতে করতেই ঢুকল কারাগারে।
আহমদ মুসার পেছনে পেছনে ছুটছে হাজী আবদুল্লাহ।
‘আমরা এভাবে গুলীর দেয়াল সৃষ্টি করে তাকে জানান দিলে তাতে তার পালানোর সুবিধা হয়ে যাবে না?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
‘ও এমনিতেই পালাবার চেষ্টা করবে। তার মধ্যে আতংক সৃষ্টি করতে চাই যাতে করে সে গংগারামের ক্ষতি করার সুযোগ না পায়।’ আহমদ মুসা বলল।
পুরাতত্ব বিভাগের ঝুলানো আলোকোজ্জ্বল কয়েকটি সাইনবোর্ড দেখে সামনে এগুলো আহমদ মুসারা।
সামনে পেল অন্ধকার করিডোর। সামনে এগুবে, না কোন দিকে যাবে ভাবছিল আহমদ মুসা।
তার পাশে এসে দাঁড়াল হাজী আবদুল্লাহ। সে বলে উঠল,‘বেভান, তুমি তাকিয়ে দেখ, করিডোরের শেষ প্রান্তের অন্ধকার কিন্তু ফিকে। মনে হচ্ছে ডান দিক থেকে একটা হালকা আলোর রেশ অন্ধকারের উপর এসে পড়েছে।’
‘ঠিক বলেছেন জনাব।’ বলে সেদিকে ছুটল আহমদ মুসা।
ঐ প্রান্তে আহমদ মুসারা দেখল, করিডোরটি ওখানে ডানদিকে বাঁক নেবার পর কিছুটা এগিয়ে আবার ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। বাঁকের ওদিক থেকেই উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে এসেছে। সেই আলোই দেয়ালে প্রতিবিম্বিত হয়ে পেছনের অন্ধকার করিডোরের উপরে পড়েছে।
করিডোর ধরে আলোর দিকে চলল আহমদ মুসারা।
আলোর উৎস করিডোরটা দীর্ঘ। মাঝ বরাবার জায়গায় আলো জ্বলছে।
আলোর নিচে পৌছতেই আহমদ মুসার চোখে পড়ে গেল একটা সিঁড়ি হাতের বাঁয়ে মানে পূর্ব দিকে নেমে গেছে। আহমদ মুসা আন্দাজ করল, তারা ঘুরে ঘুরে আবার কারাগারের প্রশাসনিক অংশের মাঝামাঝি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিল। ভাবল সিঁড়ি নিশ্চয় আন্ডার ফ্লোরে গেছে। স্বামীজী পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। অথবা আরো কোন রহস্য বা পথের সন্ধান সেখানে পাওয়া যেতে পারে।
আহমদ মুসা তখন পা বাড়িয়েছে সিঁড়িতে নামার জন্যে।
হঠাৎ ক্ষীণ চিৎকারের আওয়াজ এল সামনের করিডোরের খুব নিকটের কোথাও থেকে।
সে থমকে দাঁড়াল।
ছুটল আবার শব্দ লক্ষ্যে।
হাজী আবদুল্লাহও।
সামনে কিছুটা এগিয়ে হাতের ডান পাশে পেল আবছা অন্ধকার একটা করিডোর। নিচে আলো দেখা যাচ্ছে। সেই আলোরই কিছুটা এসে পড়েছে সিঁড়িতে।
চিৎকার আসছে নিচের কোন এক স্থান থেকে।
আহমদ মুসারা নিচে নেমে গিয়ে শব্দ লক্ষ্যে এগুলো।
একটা ঘরে বাঁধা অবস্থায় পেল গংগারামকে।
আহমদ মুসা তার হাত-পায়ের বাঁধন কেটে তাকে তুলে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তুমি ঠিক আছ তো গংগারাম?’
‘ঠিক আছি স্যার। কিন্তু ওরা মানুষ নয়।’ বলে কেঁদে উঠল গংগারাম।
‘গংগারাম, ওরা শাস্তি পেয়েছে। বাইরে ওরা দশজন মরেছে। শুধু খুঁজে পাচ্ছি না স্বামীজীকে। সে তো এদিকেই পালিয়ে এসেছে।’
‘ঐ স্বামীজীই তো সব স্যর। সে আমাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়েছে। তরবারির আগা দিয়ে আমার বুকে ত্রিশূল এঁকেছে। খুনি কাপালিক সে।’ বলল গংগারাম আর্তকণ্ঠে।
‘কিন্তু সে গেল কোথায়?’ আহমদ মুসা বলল।
‘স্যার ওদের আলাপে শুনেছি, কাছেই কোথাও সিঁড়িপথ আছে এই পাহাড় থেকে বের হবার।’ বলল গংগারাম।
‘তাহলে আমরা আসার পথে যে সিঁড়ি দেখে এলাম, সেটা কি? ঐ সিঁড়িটা পূর্ব দিকে নেমে গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওটাই হবে আহমদ মুসা। আমি তো পেছনে ছিলাম। আমি আসার সময় সিঁড়ি পথ বন্ধ হতে দেখে এসেছি।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘ওদিকটা তাহলে দেখতে হয়।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কোন লাভ হবে না আহমদ মুসা। যে জোরে সে দৌড় দিয়েছে তাতে এতক্ষণে পগার পার। আমি সুড়ঙ্গটা দেখেছি। সেটা পাহাড়ের পূর্বমুখী খাড়িতে গিয়ে শেষ হয়েছে। ওখান থেকে মটর বোটে চড়ে এক মিনিটের মধ্যেই দ্বীপ থেকে বের হওয়া যায়। সুতরাং প-শ্রম না করে এস তোমাকে একটা ভাল কাহিনী শোনাব।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘কাহিনী? এই সময়?’ একটা কৌতুকমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার মুখে।
‘কাহিনী মানে রূপকথা নয়, জীবন্ত এক ইতিহাস।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে।
হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাকে হাত ধরে নিয়ে গেল ঘরের একমাত্র দরজাটির সামনে।
ঘরের দরজা লোহার মোটা শিকের তৈরি, কিন্তু চৌকাঠ শাল কাঠের।
পাশের চৌকাঠের একটা জায়গা হাজী আবদুল্লাহ হাত দিয়ে পরিষ্কার করল। তারপর ছুরি বের করে তার ফলা দিয়ে খুঁচিয়ে পরিষ্কার করে একটা কিছু বের করল। সামান্য একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এস আহমদ মুসা, পড়।’
আহমদ মুসা চৌকাঠটির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দেখানো স্থানটার দিকে।
আরবী বর্ণমালা নজরে পড়ল তার। পড়ল, ‘শেরখান।’ একজন লোকের নাম।
‘দেখলাম। সম্ভবত কোন বন্দী ছিলেন শেরখান।’ হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বলল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ বন্দী। শুধু বন্দী নয়, একজন বীর বন্দী। শুধু একজন বীর বন্দী নয়, একজন শহীদ বীর বন্দী। তাঁর ফাঁসির পূর্ব পর্যন্ত এই ঘরেই বন্দী ছিলেন তিনি। শুনেছি তিনি বহু কষ্টে এক টুকরো কাঁচ যোগাড় করে সেই কাঁচ দিয়ে খোদাই করে তার নামটাকে এ কাঠের গায়ে লিখে রাখার চেষ্টা করেছে। সে হয়তো জানতো তার নামে ভারতে কোন মনুমেন্ট হবে না, কেউ স্মরণও করবে না তার কথা। আমার আনন্দ যে, তার নামটা তোমাকে আমি দেখাতে পারলাম।’ থেমে গেল হাজী আবদুল্লাহ। কান্নায় বন্ধ হয়ে গেল তার কথা। তার দু’গ- বেয়ে নেমে এল অশ্রুর ধারা।
গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসা। সে তার এক হাত হাজী আবদুল্লাহর কাঁধে আস্তে আস্তে রেখে বলল, ‘স্যরি জনাব, আমিও তাকে চিনি না, তার নাম জানি না।’
চোখ মুছে হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘তোমার জানার কথা নয়। বৃটিশ ঐতিহাসিকরা ভারতের বৃটিশ শাসনকর্তা লর্ড মেয়োকে হত্যাকারী এতবড় ক্রিমিনাল শেরখানের নাম ঘৃণাভরেই লেখেনি। পরে ভারতের ইতিহাস তাকে স্মরণ করেনি, কারণ সে মুসলিম ছিল। আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিকদের চোখে এমনকি কাছের অনেক বড় জিনিসও পড়ে না, আন্দামানের শেরখান তাদের চোখে পড়বে কেমন করে?’
‘ভারতের বৃটিশ শাসক লর্ড মেয়ো কি আন্দামানে নিহত হন?’ জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
‘হ্যাঁ। আন্দামানে মাউন্ড হেরিয়েট দ্বীপে তিনি নিহত হন। ওখানে ‘ইয়াবু’ পর্বত থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। আন্দামান সফরে আসা লর্ড মেয়ো সূর্যাস্ত দেখার জন্যে ইয়াবু পর্বতে গিয়েছিলেন। তার ফেরার পথে হেরিয়েট দ্বীপেরই উপকূলে তিনি নিহত হন।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘শেরখান কে ছিলেন?’ প্রশ্ন আহমদ মুসার।
‘তিনি ছিলেন পেশোয়ারের বাসিন্দা। বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের এক সৈনিক ছিলেন তিনি। বিচারে এই আন্দামানে তার দ্বীপান্তর হয়।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘এত বড় শাস্তির পরও তিনি এই কাজ করেন? তাঁর সাথে আর কতজনের শাস্তি হয়?’
‘তাঁর সাথে আর কেউ ছিল না। লর্ড মেয়োকে হত্যার কাজ তিনি একাই করেন।’
‘একা? একা কেন?’
‘তোমার এই ‘কেন’-এর উত্তর তুমি শেরখানের মুখ থেকেই শোন। শেরখান বীরদর্পে বিচারককে জানান, “১৮৬৭ থেকে আমার সংকল্প ছিল যে, কোন ইংরেজী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আমি হত্যা করব। সেই উদ্দেশ্যেই কয়েক বছর এই ছুরিখানা আমি তৈরি করে রেখেছিলাম। ৮ই ফেব্রুয়ারী (১৮৭২ খৃষ্টাব্দ) যখন লর্ড মেয়ো আন্দামানে এলেন, আমি ছুরি ধার দিয়ে নিলাম। সারা দিন রশ দ্বীপে (যেখানে লর্ড মেয়ো অবস্থান করছিলেন) যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু অনুমতি পাইনি। সন্ধ্যা পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তকদির লর্ড মেয়োকে আমার বাড়িতেই নিয়ে এল। আমি তার সঙ্গে পাহাড়ের উপরে গিয়েছিলাম, তার সঙ্গেই ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু সুযোগ পাইনি। তীরে ফিরে গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। এখানেই আমার মনের সাধ পূর্ণ হয়............।” শেরখান তার এই বক্তব্যে কোন মিথ্যা বলার চেষ্টা করেননি। একটা কথাও লুকোননি।’
‘বৃটিশদের কোন কষ্ট হয়নি তাকে ফাঁসির আদেশ শোনাতে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বৃটিশদের ফাঁসি শেরখানকে সামান্যও ভীত করতে পারেনি। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ভাই সকল, আমি তোমাদের শত্রুকে শেষ করেছি। তোমরা সাক্ষি থাক যে আমি মুসলমান।’ তারপর তিনি কালেমা তাইয়েবা পড়েছিলেন। কালেমা পড়া অবস্থায় তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।’ অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসাও অভিভূত হয়ে পড়েছিল। বলল, ‘কোথায় তাঁর ফাঁসি হয়?’
‘এই জেলখানা থেকে আরও উপরে পাহাড়ের মাথায়। সেখানে তার জন্যে একটা ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। আজ তো সময় নেই আর একদিন তোমাকে দেখাব ঐতিহাসিক জায়গাটা। আরও ঐতিহাসিক জায়গা এখানে আছে আহমদ মুসা।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘ধন্যবাদ জনাব।’ বলেই আহমদ মুসা তাকাল গংগারামের দিকে। বলল, তোমার এখন কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘কোন অসুবিধা নেই।’
‘তাহলে বল, তুমি তো অনেকটা সময় ওদের হাতে ছিলে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তুমি জানতে পেরেছ কিনা?’
‘স্যার, ওরা ধরে নিয়েছিল আমি এখান থেকে জীবিত বেরিয়ে যেতে পারব না। তাই সব আলোচনাই তারা আমার সামনে করতো। স্যার, প্রথম দিকে আমার মনে হয়েছিল যাকে ওরা স্বামীজী বলে সেই স্বামী শংকরাচার্য শিরোমণিই বোধ হয় সব। তাঁর আদেশেই সব কিছু হয়। তিনিই ওদের নেতা। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, আসল নেতা তিনি নন। তিনি সামান্য আদেশ পালনকারী মাত্র। এদের দলের শীর্ষ নেতা আন্দামান সরকারের কেউ। আর সবকিছুর এ্যাডভাইজার একজন আছেন, তিনি ভারতের লোক নয়। কোথাকার জানতে পারিনি। তবে নাম শুনেছি ‘ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেন’। ওঁকে ওরা ‘টিসি’ (ট্রিপল সি) বলে ডাকে।
নাম শুনে চমকে উঠল আহমদ মুসা। বলল, ‘কি বললে নাম ‘টিসি’? ‘ক্রিষ্টোফার কোলম্যান কোহেন? ঠিক শুনেছ নাম?’
‘জি স্যার। তাকে চেনেন নাকি স্যার? নাম শুনতে ভুল হবার কথা নয় স্যার। তিনি এখানে এসেছিলেন।’
‘এখানে? এই জেলখানায়?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।
‘তুমি তাঁকে চেন নাকি আহমদ মুসা?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘হ্যাঁ চিনি। তিনি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর সবচেয়ে সফল একজন মিশন কনট্রোলার। ‘মোসাদ’ এর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গোয়েন্দা অভিযান বা গোয়েন্দা প্রকল্পের তিনি পরিচালক ছিলেন।’
‘তাই হবে স্যার। তিনি অত্যন্ত চালাক। তিনি আমার সামনে কোন আলাপেই রাজি হননি। কথা বলার জন্যে স্বামীজীকে তিনি ঘরের বাইরে নিয়ে যান।’
হাজী আবদুল্লাহর চোখ-মুখও বিস্ময়ে ভরে উঠেছিল। গংগারাম থামতেই হাজী আবদুল্লাহ বলে উঠল, ‘ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে ‘মোসাদ’ এর যোগ-সাজস আমার কাছে বিস্ময়ের নয়, আন্দামানে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ- এর লোক আসা আমার কাছে নতুন ঘটনা নয়, কিন্তু আমি বিস্মিত হচ্ছি, স্বামী শংকরাচার্য শিরোমণি ও সোমনাথ শম্ভুজীদের সংযোগ কি করে হলো মোসাদের সাথে!’
আহমদ মুসা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘আপনার এ প্রশ্নের জবাব আমার কাছে আছে, কিন্তু তার আগে বলুন, ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের সাথে ‘মোসাদ’-এর যোগ-সাজশের কথা এবং আন্দামানে ‘মোসাদ’ এর আসার কথা আপনি জানলেন কি করে?’
হাসল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘কথাটা বলেই কিন্তু আমার মনে হয়েছে, আমার এ কথা তোমার নজর এড়াবে না।’
বলেই একটু গম্ভীর হলো হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগে আমি দীর্ঘদিন চাকুরী করেছি। আন্দামানের গোয়েন্দা প্রধানের দায়িত্বও আমি পাই। এই পদ থেকে আমাকে আগাম রিটায়ার করে দেয়া হয়। এবং সেটা হয় ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এর পরামর্শে। ‘মোসাদ’-এর একটা টীম এসেছিল আন্দামানে। ডেমোগ্রাফিক একটা গোপন রিপোর্ট তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আমার অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর কিছুদিন পরেই আমাকে রিটায়ার করে দেয়া হয়। আমার রিটায়ারের পরে ‘মোসাদ’-এর মিশনটি এখানে আসে। এটা বিশ বছর আগের কথা।’
‘ধন্যবাদ জনাব। আপনার অতীতে এমন ধরনের কিছু কথা থাকবে, তা আমি ধারণা করেছিলাম। তবে আপনার ‘অভিনয়’ খুব সুন্দর হয়েছে। একই সাথে দুহাতে দুজনকে টার্গেট করে সফল হওয়ার ঘটনায় কিন্তু আপনি নিজেকে লুকাতে পারেননি।’
একটু থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘জনাব, আপনার জিজ্ঞাসার জবাব আপনি নিজেই দিয়েছেন। ‘মোসাদ’ আন্দামানে ডেমোগ্রাফিক অনুসন্ধান চালিয়ে যে সিদ্ধান্তে পৌছেছিল, সম্ভবত সেই সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করছে স্বামী শংকরাচার্য শিরোমণিরা। অতএব ‘মোসাদ’-এর লোকেরা তাদের কাছে আসবে না কেন? হতে পারে, ‘মোসাদ’ এর সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত ভারত সরকার বাস্তবায়নে রাজী হয়নি এবং অন্য কোন সংস্থা-সংগঠন এর বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে। ‘মোসাদ’ হয়তো এদেরই সাহায্যে এগিয়ে এসেছে।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু স্বামী শংকরাচার্যদের কাজটি একেবারেই বেসরকারী? গংগারাম কিন্তু বলেছে যে, আন্দামানে শংকরাচার্যদের সংস্থার নেতৃত্বে আছে আন্দামান সরকারেরই কেউ।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘আন্দামান সরকারের কোন লোক শংকরাচার্যদের সংস্থার নেতৃত্ব দেয়ার পরও এটা বেসরকারী কোন গোপন সংস্থা হতে পারে। কারণ আন্দামান সরকারের উক্ত লোকটি সরকারের অজান্তে ব্যক্তিগতভাবে শংকরাচার্যদের সংস্থার সাথে জড়িত থাকতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘হ্যাঁ এটাও হতে পারে আহমদ মুসা।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা মুখ ফিরাল গংগারামের দিকে। বলল, ‘তুমি কি করে বুঝলে যে, স্বামী শংকরাচার্যের দলেল নেতা আন্দামান সরকারের কেউ?’
‘স্বামীজীর কিছু টেলিফোন টক থেকে আমার এটা মনে হয়েছে।’ বলল গংগারাম।
‘কি কথা শুনেছিলে?’
‘নির্যাতনের ফলে একবার আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন দেখলাম স্বামীজী ঘরে প্রবেশ করছেন। দেবানন্দ ও নটবর আগে থেকেই ঘরে হাজির ছিল। স্বামীজী প্রবেশ করার পরেই তার মোবাইল বেজে উঠল। টেলিফোন ধরেই তিনি একেবারে জড়সড় হয়ে গেলেন। গলার স্বর নিচে নেমে গেল। টেলিফোনে স্বামীজী কিছুই বলেননি। শুধু জি স্যার, ইয়েস স্যার, ইত্যাদি করে গেছেন। একবার শুধু বলেছিলেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন স্যার, কথা আমরা বের করেই ছাড়ব।’ মোবাইলে কথা শেষ করেই দেবানন্দকে লক্ষ্য করে তীব্র কণ্ঠে বলল, ‘গভর্নর অফিস থেকে টেলিফোন এসেছিল। তুমি উত্তরে টেলিফোন করনি কেন? এখন আবার তাঁকে টেলিফোন করতে হলো! উত্তরে দেবানন্দ বলেছিল, ‘আমি মিসকল পেয়েছিলাম। তারপর আধাঘণ্টা চেষ্টা করেও আমি লাইন পাইনি। ব্যস্ত ছিল তাঁর টেলিফোন।’ দেবানন্দ থামলে স্বামীজী বললেন, ‘শোন, বস বলেছেন, আগামী দুদিনের মধ্যে সেই লোক এবং আহমদ আলমগীরের মা-বোনকে পাকড়াও করতে হবে। কোন অজুহাত তিনি শুনবেন না।’ এই কথাবার্তা থেকে আমার নিশ্চিত মনে হয়েছে এদের নেতা গভর্নর অফিসের সরকারী কেউ।’ থামল গংগারাম।
‘গভর্নর অফিসে অনেক জাঁদরেল লোক রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ একজন হতেই পারেন।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘গভর্নর হাউজের সেই বস সম্পর্কে বোধ হয় আর কিছুই শোননি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না স্যার, প্রসঙ্গটা এই একবারই উঠেছিল।’ গংগারাম বলল।
‘এবার বল, আহমদ আলমগীর সম্পর্কে তারা কি আলোচনা করেছে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘আহমদ আলমগীরের নাম ওদের মুখ থেকে শুনিনি। তাদের কথা থেকে শুনেছি, একজন বড় শয়তানকে ‘রশ’ দ্বীপে ওরা আটকে রেখেছে।’
‘বড় শয়তান যে আহমদ আলমগীর কি করে তা বুঝলে?’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘শুনেই আমার মনে হয়েছে, তার উপর আহমদ আলমগীরের মা-বোনের কথাও তাদের আলোচনায় আসে। আমার সন্দেহ নেই, আহমদ আলমগীরকেই ওরা ওখানে বন্দী করে রেখেছে।’ গংগারাম বলল।
‘ধন্যবাদ গংগারাম। তোমার দেয়া দুটি তথ্যই আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।’ বলল আহমদ মুসা।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা তাকাল হাজী আবদুল্লাহর দিকে। বলল, ‘রশ দ্বীপ তো সংরক্ষিত এলাকা। ওখানে কি করে আহমদ আলমগীরকে রাখল?’
‘গংগারামের এই তথ্য তার আগের দেয়া তথ্যকে সত্য প্রমাণিত করছে। সরকারের শক্তিধর কেউ যদি সন্ত্রাসী দলের সাথে থাকে, তাহলে এই সন্ত্রাসীরা ‘রশ’ দ্বীপ অবশ্যই ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং দু’তথ্যের একটি অপরটির সত্যায়ন করছে বলে আমি মনে করি।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘ঠিক জনাব। সন্ত্রাসী দলটির সাথে আন্দামান সরকারের উচ্চপদস্থদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে আত্মগোপন করা কিংবা কাউকে গোপনে রাখার জন্যে ‘রশ’ দ্বীপই সবচেয়ে উপযুক্ত। কারণ কেউ এ দ্বীপে আসলে সরকারের অনুমতি নিয়ে আসবে। আহমদ আলমগীরকে কিডন্যাপ করে রাখার জন্যে এমন জায়গা বেছে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক।’
‘তাহলে আহমদ মুসা, আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, আহমদ আলমগীরকে ‘রশ’ দ্বীপেই বন্দী করে রাখা হয়েছে।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘আমরা ‘রশ’ দ্বীপ অভিযানের আয়োজন করতে পারি। দ্বীপটি সম্পর্কে সব কিছুই আপনার জানার কথা।’ আহমদ মুসা হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বলল।
‘তবু দ্বীপের সরকারী ও গুরুত্বপূর্ণ বিল্ডিং-এর বৃটিশযুগীয় লে-আউট আরেকবার দেখতে হবে।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘কোথায় ওটা পাওয়া যাবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আন্দামান মিউজিয়ামের পুরাতত্ব বিভাগে এবং গভর্নর অফিসে পাওয়া যাবে।’
‘জনাব, এটা আপনাকেই সংগ্রহ করতে হবে।’
‘অবশ্যই তা করব। কিন্তু কে সরকারের এই সন্ত্রাসীদের নেতা, তা বের করতে পারলে এবং আন্দামানের গভর্নর ও দিল্লী সরকারকে বেনামীতে হলেও জানিয়ে দিতে পারলে বিরাট কাজ হতো।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
‘জি জনাব। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আহমদ আলমগীরকে উদ্ধার করা এবং সন্ত্রাসী দলটির গোড়ায় সরকারের কে আছে তা বের করা- এ দুটিই আমাদের প্রধান কাজ এখন। তারপর সমস্যাটি কোন দিকে গড়ায় দেখতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। আমরা মনে হয় কিছুটা এগুতে পেরেছি।’
‘অবশ্যই! তাহলে এখন চলতে পারি। গংগারাম ক্লান্ত, ওর রেষ্ট দরকার।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক। গংগারাম ওঠ। চলি আমরা।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসা গংগারামকে ধরে দাঁড় করাতে করাতে বলল হাজী আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে, ‘আরেকটি কাজ করতে হবে। ভাইপার দ্বীপের এই জেলখানা পুরাতত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। একটা নিউজ করতে হবে যে, পুরাতত্ব বিভাগ একদল সন্ত্রাসী গ্রুপকে এ জেলখানায় ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের মধ্যেকারই সংঘর্ষে অমুক রাতে প্রায় ডজন খানেক মানুষ নিহত হয়েছে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে এ নিউজ পত্রিকায় আনতে হবে।’
‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। ভাল বুদ্ধি বের করেছ। এটা করলে পুরাতত্ব বিভাগ ও সন্ত্রাসী দল- উভয় পক্ষকেই চাপের মধ্যে ফেলা যাবে।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ।
গংগারামকে ধরে নিয়ে আহমদ মুসা চলতে শুরু করেছে। বলল, ‘সরকারের যে ব্যক্তিটি সন্ত্রাসীদের সাথে জড়িত রয়েছে, সেও বিব্রতবোধ করবে এবং পুরাতত্ব বিভাগের পক্ষে সে কিছুটা সক্রিয়ও হয়ে উঠতে পারে। তাকে আইডেনটিফাই করার ক্ষেত্রে এটা কাজেও আসতে পারে।’
‘সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন আমার খুব ঘনিষ্ঠ। তাদের দিয়ে আমি নিউজটা করাতে পারব।’ আহমদ মুসাদের পেছনে চলা শুরু করে বলল হাজী আবদুল্লাহ।
আহমদ মুসারা বেরিয়ে এল ভাইপার কারাগার থেকে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now