বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ হোটেল সাহারা পোর্ট ব্লেয়ারের পূর্ব প্রান্তে সাগরের ধার ঘেঁষে বিরাট জায়গা জুড়ে অবস্থিত। হোটেলের সমগ্র এলাকা প্রাচীর ঘেরা। হোটেলের পূর্ব দিকে সাগর। পশ্চিম দিকে প্রাচীরের বিশাল গেট পর্যন্ত বাগান। বাগানের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া রাস্তা হোটেলের গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। বাগানটা হোটেলের দক্ষিণ ও উত্তর প্রান্তে বিস্তৃত। বাগানের বাইরে দিয়ে বিভিন্ন ফলফলারীর গাছ এবং ছোট ছোট আগাছায় ভরা জংগল। আহমদ মুসা হোটেলের প্রাচীরের কাছে যাবার আগেই একটা কাঁচা গলিপথ দিয়ে গাড়ি উত্তর দিকে ঘুরিয়ে নিল। দুটি দোকানের মাঝখান দিয়ে কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে প্রাচীরের ধার ঘেঁষে একটা বড় গাছের ছায়ায় ঝোপের আড়ালে গাড়ি দাঁড় করাল। সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। এদিকে কেউ আসবে না, নিশ্চিত আহমদ মুসা। গাড়ির সিটে বসেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল সে। তারপর তৈরি হয়ে নেমে এল। গাড়ি লক করে চাবিটা গাড়ির চাকার তলায় রেখে দিল। প্রাচীর ধরে প্রথমে উত্তরে তারপর পূর্ব দিকে এগুলেঅ আহমদ মুসা। তারপর একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল। আজ সকালেই সে হোটেলের তিনদিকের গোটা বাগান ঘুরে বেড়িয়েছে। সব কিছুই দেখেছে সে। তার এই ঘুরে বেড়াবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তার কক্ষের জানালা থেকে দেখতে পাওয়া সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো কবরখানাটা দেখা। দেখেছে সে কবরখানা। কবরটা মওলানা লিয়াকত আলীর। তিনি আন্দামানে দ্বীপান্তরিত ভারতের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আহমদ মুাস শ্রদ্ধাভরে সালাম দিয়েছে করববাসীকে। আহমদ মুসা তাঁকে চেনেনি, কিন্তু বুঝেছে দেশ ও জাতির জন্যে বৃটিশের বিরুদ্ধে জীবন-পণ সংগ্রাম করেছে যে হাজার হাজার মুসলমান, এই মওলানা লিয়াকত আলী তাদেরই একজন। পরে হাজী আবদুল আলীকে জিজ্ঞাসা করে আহমদ মুসা জেনেছিল, আন্দামানে জেলের বাইরে বাড়িঘর করে স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের অনুমতি পেয়েছিল অনেক কয়েদি। মওলানা লিয়াকত আলী তাদেরই একজন। তিনি এই মুক্ত কয়েদিদের একটা জুমআ মসজিদের ইমাম ছিলেন। এই কবরের পাশেই তার বাড়ি ছিল। হাজী আবদুল আলীর পূর্ব পুরুষ বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অপরাধে ১৯২২ সালে দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চল থেকে দ্বীপান্তরিত হয়ে এখানে আসে। তারপর তাদেরই এক উত্তর পুরুষ এই জায়গাটা কিনে নেয়। হাজী আবদুল আলী তাদেরই এক উত্তর পুরুষ। বংশানুক্রমে মওলানা লিয়াকত আলীর পরিচয় তাঁর কাছেও পৌছে। তার স্মৃতি নয়, একটা ইতিহাস রক্ষার জন্যেই তিনি কবরটাকে ধরে রেখেছেন। আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে কোমরে জড়ানো সিল্কের কর্ড বের করে হুকটা ছুঁড়ে মারল প্রাচীরের মাথায়। হুকটা প্রাচীরের মাথায় ভালভাবে আটকেছে দেখে নিয়ে তরতর করে সে উঠে গেল প্রাচীরের মাথায়। সিল্কের কর্ডটা খুলে নিয়ে লাফিয়ে পড়ল সে ভেতরে। গুড়ি মেরে ছুটল সে হোটেলের দিকে। গিয়ে দাঁড়াল তার ঘরের জানালা বরাবর নিচটায়। একটা ইমারজেন্সী এক্সিটের ব্যবস্থা হিসাবে গত রাতেই সে তার জানালার স্ক্রুগুলো খুলে রেখেছে। মাটি থেকে জানালার পাশ দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া পানির পাইপ বেয়ে তরতর করে উঠে গেল দুতলার জানালায়। তারপর কার্নিসে দাঁড়িয়ে গোটা জানালাটা খুলে ভেতরে রেখে দিল এবং বেড়ালের মত নিঃশব্দে লাফিয়ে ঘরে গেল। সোফায় বসে মুখ ও কপালের ঘাম মুছে একটু জুড়িয়ে নিল শরীরটাকে। আহমদ মুসা হিসাব করল, তার এখন দ্বিতীয় কাজ হলো হাজী আবদুল আলী ও শাহ বানুদের কাছে পৌছা। কিন্তু তার আগে আহমদ মুসা আলমারি থেকে ব্যাগ এনে দড়ির মই বের করে যথাস্থানে রাখল। ইমারজেন্সী এক্সিট সামনে রেখেই গত রাতে সে এই দড়ির মইটাও জোগাড় করেছে। আহমদ মুসা গভর্নর হাইজে যাওয়া জামার উপর বহু পকেট ওয়ালা জ্যাকেট পরে নিল। সব ঠিক আছে দেখে নিয়ে আহমদ মুসা এগুলো দরজার দিকে। আস্তে করে নব ঘুরিয়ে দরজাটি খুলল আহমদ মুসা। সামনে দরজা সরাতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। চার-পাঁচ গজ দূরেই দাঁড়ানো সোমনাথ শম্ভুজী। তার হাতের রিভলবার উঠে এসে স্থির হলো আহমদ মুসার বুক বরাবর। হেসে উঠল সোমনাথ শম্ভুজী। বলল, ‘প্রথমে শব্দ শুনে আমি মনে করেছিলাম ঘরে ইঁদুর-টিদুর হবে। চলেই যাচ্ছিলাম। সারাদিন দরজা পাহারা দিয়ে বসে আছি। কখন তুমি ঢুকেছিলে ঘরে ছদ্মবেশী আমেরিকান?’ গম্ভীর হয়ে উঠল সোমনাথ শম্ভুজী। কঠোর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘হাত উপরে তোল বেভান বার্গম্যান। একটু চালাকির চেষ্টা করলে বুক তোমার এফোড় ওফোড় হয়ে যাবে।’ হাত উপরে তুলল আহমদ মুসা। তার মুখটা অকস্মাৎ যেন একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘কে আপনি? কি করছেন এসব? দিন-দুপুরে হোটেলে এভাবে...........।’ সোমনাথ শম্ভুজী একটা ধমক দিয়ে আহমদ মুসার কথা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘কে আমি, কি করছি সবই টের পাবে।’ কথা বলতে বলতে সোমনাথ শম্ভুজী যখন বাম হাতের রিভলবার ধরে ডান হাতে আহমদ মুসাকে সার্চ করতে আসছিল, ঠিক তখন উপরে উঠানো আহমদ মুসার ডান হাত জ্যাকেটের কলারের নিচ থেকে তীক্ষè ফলার ছুরি বের করে হাতে নিচ্ছিল। ছুরিটা হাতে নিয়েই আহমদ মুসা সোমনাথ শম্ভুজীর পেছন দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘গংগারাম’ ডোন্ট ফায়ার।’ সোমনাথ শম্ভুজী চমকে উঠে মুহূর্তের জন্যে পেছনে তাকাল। আহমদ মুসা মুহূর্তের এই সুযোগটাই চাচ্ছিল। ছুরির বাট ধরা আহমদ মুসার ডান হাত তীব্র বেগে নেমে এল। গিয়ে আঘাত করল সোমনাথ শম্ভুজীর পিঠের বাম পাশে ঠিক হৃদপিন্ডের উপর। ছুরিটা আমূল বিদ্ধ হয়েছিল। একটামাত্র চিৎকার সোমনাথ শম্ভুজীর মুখ থেকে বেরুল। তারপর সে ঢলে পড়ল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা শম্ভুজীকে ধরে ঘরের ভেতরে টেনে নিল। দ্রুত ছুটে আসা দুজনের পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা। সম্ভবত সোমনাথ শম্ভুজীর চিৎকার তারা শুনতে পেয়েছে। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি সোমনাথ শম্ভুজীকে রেখে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। সোমনাথ শম্ভুজী পড়ে আছে দরজার পরেই ঘরের মেঝেতে। দুজন লোক ছুটে এসে দরজায় মুহূর্তের জন্যে দাঁড়াল। তাদের হাতে রিভলবার। তারপর তারা দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল সোমনাথ শম্ভুজীর দিকে। দুজন পাশাপাশি। আহমদ মুসা গুড়ি মেরে একটু এগিয়ে অকস্মাৎ তার দুপাকে ছুঁড়ে দিল তাদের সামনে। তারা দেখতে পেল আহমদ মুসাকে। কিন্তু তারা কিছু ভাববার আগেই আহমদ মুসার বাড়িয়ে দেয়া পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মুখ থুবড়ে সোমনাথ শম্ভুজীর উপর। আহমদ মুসা দ্রুত উঠে গিয়ে তার দুহাতের দুরিভলবার দুজনের দিকে তাক করে বলল, ‘তোমরা তোমাদের হাতের রিভলবার ফেলে দাও।’ কিন্তু আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই তারা বিদ্যুত বেগে তাদের শরীর উল্টিয়ে নেয়ার সাথে সাথে তাদের রিভলবার ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। গুলী না করে আহমদ মুসা কোন উপায় থাকল না। আহমদ মুসা তার রিভলবারের নল দুজনের পাঁজরে চেপে ধরে এক সাথেই ট্রিগার চাপল। শব্দ এড়াবার জন্যে গুলী করতে চায়নি আহমদ মুসা। দুজনের গায়ে রিভলবারের নল চেপে তার গুলী করা শব্দ এড়াবার লক্ষ্যেই। আহমদ মুসা একটু অপেক্ষা করল। না আর কেউ এল না। ঘর থেকে বেরিয়ে সে দরজা লক করে ছুটল শাহ বানুদের ঘরের দিকে। শাহ বানুদের ঘরের পাশের ঘরে হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহর থাকার কথা। আহমদ মুসা সেই দরজায় নক করল। দরজায় ডোর ভিউ আছে। ডের ভিউতে আলোর নড়াচড়া লক্ষ্য করল আহমদ মুসা। পরক্ষণেই দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে হাজী আবদুল্লাহ। তার পেছনে ঘরের মাঝখানে মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছে শাহ বানু ও তার মা সাহারা বানু। হাজী আবদুল্লাহ জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, ‘তুমি কি পনের মিনিটেই এসে গেছ। এই পনের মিনিট আমার কাছে পনের বছরের মত ভারী হয়েছে। কি করে এলে তুমি?’ ‘জনাব যে পথে এসেছি, সে পথেই ফিরব। দেখবেন আপনি।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘মা আপনারা রেডি?’ ‘হ্যাঁ বাবা, কিন্তু কি নিতে হবে বুঝতে পারছি না।’ সাহারা বানু বলল। ‘প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন নেই মা।’ ‘আমরা কোথায় যাব বেটা?’ ‘চিন্তা করে দেখলাম মা হোটেলে যেমন আপনারা নিরাপদ নন, তেমনি পরিচিত কোন মুসলিম ঘরও নিরাপদ নয়। সব ভেবে সুষমা রাও-এর প্রস্তাব আমি গ্রহণ করেছি মা। সুষমা রাওয়ের সাথে আপনাদের পরিচয় আছে তো!’ আহমদ মুসা বলল। ‘জি, ভাল পরিচয় আছে।’ বলল শাহ বানু। ‘সুষমা রাও তার কাছে তোমাদের রাখতে চায়। পরিচয় হবে আপনারা তাদের গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়।’ ‘ভাল-মন্দ কিছুই আমরা বুঝব না বেটা, তুমি যেটা ভাল মনে কর, সেটাই করবে।’ সাহারা বানু বলল। ‘সুষমা রাও যদি এ দায়িত্ব নেয়, তাহলে এটা হবে সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। ‘সুষমা আন্তরিকভাবে এ অনুরোধ করেছে। এ কারণে আমিও ভাল মনে করেছি এটা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ভাইয়া নিখোঁজ হওয়ার পর সুষমা আমাদের বাড়ি এসেছে এবং প্রতিদিনই টেলিফোনে আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছে। আমিও মনে করি এটা ভাল ব্যবস্থা হবে।’ বলল শাহ বানু। ‘কিন্তু এদের নিয়ে কিভাবে যাওয়া যাবে আহমদ মুসা?’ হাজী আবদুল্লাহ বলল। ‘আহমদ মুসা নয়, বলুন বেভান বার্গম্যান।’ আহমদ মুসা বলল। হাসল হাজী আবদুল্লাহ। বলল, ‘ভুল আর হবে না মি. বার্গম্যান।’ ‘চলুন যাওয়া যাক।’ বলে আহমদ মুসা দরজা খুলে প্রথম বের হলো করিডোরে। চারদিকে দেখে বলল, ‘আপনারা আসুন।’ সবাই চলল আহমদ মুসার ঘরের দিকে। ঘরের লক খুলে প্রথমে তাদের ঘরে ঢুকিয়ে আহমদ মুসা ঢুকল। ঘরে ঢুকে আঁৎকে উঠোছে হাজী আবদুল্লাহ, সাহারা বানু এবং শাহ বানু তিনজনেই। ‘একি আহমদ মুসা? কিভাবে হলো?’ আর্তকণ্ঠে বলল হাজী আবদুল্লাহ। ‘আপনি বলেছিলেন সোমনাথ শম্ভুজী তার কক্ষে নেই। তাই বলে হোটেলে ছিল না তা নয়। সে আমার কক্ষের সামনে কোথাও ওঁৎ পেতে আমার ঘরের উপর সার্বক্ষণিক চোখ রেখেছিল। আমি বাগান দিয়ে এসে পানির পাইপ বেয়ে জানাল দিয়ে ঘুরে ঢুকি। আপনার কাছে যাবার জন্যে যখন দরজা খুলেছিলাম, তখন রিভলবার বাগিয়ে আমার উপর সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেষে এই পরিণতি তার হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কিন্তু অন্য দুজন?’ ‘ওরাও সোমনাথ শম্ভুজীর লোক। শম্ভুজীর চিৎকার শুনে ওরা ছুটে এসেছিল। দেখুন তাদের হাতে এখনও রিভলবার ধরা আছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ আহমদ মুসা। ওরা আক্রমণ করল, আবার ওরাই মারা পড়ল। তোমার হতে যাদু আছে আহমদ মুসা। এতদিন শুনেছি, এবার চোখে দেখার সৌভাগ্য হলো।’ ‘যাদু নয় জনাব, আল্লাহর সাহায্য আছে।’ বলেই আহমদ মুসা জানালার নিচে রাখা দড়ির মই নিয়ে জানালার দুপাশের দুহুকের সাথে ভাল করে বাঁধতে লাগল, আর শাহ বানুকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি মৃত ওদের সবার পকেট সার্চ কর। নেমকার্ড, যে কোন ধরনের কাগজ ও মোবাইল পেলে আমাকে দাও।’ আহমদ মুসা দড়ির মই সেট করে বলল হাজী আবদুল্লাহকে, ‘জনাব, আমি সোমনাথ শম্ভুজীর ঘরটা একটু সার্চ করে আসি।’ ‘তার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু কি পেতে চাচ্ছ?’ বলল আবদুল্লাহ। ‘আহমদ আলমগীর ও গংগারামকে তারা কোথায় রেখেছে, ওদের আস্তানা কোথায়, এদের উদ্দেশ্য ও পরিচয় কি, ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য আমার দরকার।’ আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই শাহ বানু সোমনাথ শম্ভুজীসহ মৃত তিনজনের পকেট থেকে পাওয়া কিছু টুকরো কাগজ এনে আহমদ মুসার হাতে তুলে দিল। আহমদ মুসা দ্রুত চোখ বুলাতে লাগল কাগজের টুকরোগুলোর উপর। বিভিন্ন ধরনের স্লিপ। কোনটাতে ঔষধের নাম লেখা, কোনটাতে মানুষের নাম লেখা, কসমেটিকস-এর নামও দুটো স্লিপে পাওয়া গেল। কয়েকটা ব্যবসায় কোম্পানীর কার্ডও পাওয়া গেল। একটা স্লিপের উপর এসে চোখ আটকে গেল আহমদ মুসার। তাতে লেখা: ‘এই চিরকুটের বাহক দুজন পিকআপের ড্রাইভারকে তোমার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশকে বলেছি। তারা সাহায্য করবে। এই হোটেলেই ওরা আছে। ওদের ধরতেই হবে। ‘ভাইপার’ এ তোমার আসার দরকার নেই। ক্যাব শয়তানটাকে আমরাই দেখব। ওর কাছ থেকে কথা পেলে সংগে সংগেই তোমাকে জানাব।’ -স্বামীজী রুদ্ধশ্বাসে চিরকুটটি পড়ল আহমদ মুসা। তার কোন সন্দেহ নেই। ‘ক্যাব-শয়তান’ বলতে গংগারামকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘ভাইপার’ কি বাড়ি, না জায়গা? আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল হাজী আবদুল্লাহকে, ‘জনাব, ভাইপার কি? এ নামের কোন বাড়ি বা স্থান আছে?’ ‘ভাইপার ছোট্ট দ্বীপের নাম, পোর্ট ব্লেয়ারের অংশ। কেন জিজ্ঞাসা করছ?’ ‘সন্ধ্যার পর ওরা গংগারামকে ভাইপার-এ নিচ্ছে।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘ঠিক আহমদ মুসা। নিতে পারে। ভাইপার-এ পোর্ট ব্লেয়ারের পুরানো জেলখানা। ওটা পোড়ো বাড়ি। পুরাতত্ব বিভাগ কিছু কিছু সংস্কার করে স্মৃতি হিসাবে ধরে রেখেছে। ক্রিমিনালরা জনমানবহীন ঐ জায়গায় আড্ডা গারতে পারে।’ হাজী আবদুল্লাহ বলল। আনন্দের প্রকাশ ঘটল আহমদ মুসার চোখে-মুখে। দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘ধন্যবাদ জনাব। আমি শাহ বানুদেরকে সুষমার ওখানে দিয়েই তাহলে ছুটব ভাইপার দ্বীপে।’ ‘ভাইপার দ্বীপের কোন কিছুই তুমি চিনবে না। আমি চিনি। আমি তোমার সাথে থাকব। ভেব না। আমিও বন্দুক চালাতে জানি, দেখবে।’ ‘কিন্তু জনাব, আমি তো ওদিক দিয়ে চলে যাব।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ঠিক আছে। আমি এ লাশগুলো সামলাবার ও তোমার ঘরটা পরিষ্কার করার কাজ সেরে এখন থেকে ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় পুরানো ভিক্টোরিয়া ব্রীজে পৌছব। ও ব্রীজ দিয়েই ভাইপার দ্বীপে যেতে হয়। ব্রীজের গোড়ায় বসে তোমার অপেক্ষা করব। তুমি ওখানে পৌছে সমান মাপের তিনটা হর্ন দেবে। আমি আড়াল থেকে বেরিয়ে আসব।’ ‘ঠিক আছে জনাব। তাহলে আমি এখন আর সোমনাথ শম্ভুজীর কক্ষে যাচ্ছি না। ইনশাআল্লাহ ফিরে এসে দেখব। ওর ঘরে যেন অন্য কেউ না ঢোকে আপনার লোকদের সেটা দেখতে বলবেন।’ ‘তথাস্তু বেভান।’ বলল হাজী আবদুল্লাহ। তার মুখে আনন্দের হাসি। আহমদ মুসা ঘুরল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘মা, দড়ির মই দিয়ে নামতে পারবেন তো? এক তলার দূরত্ব অসুবিধা হবে না।’ ‘নামতে তো হবেই বেটা।’ ‘ধন্যবাদ মা! আশা করি অসুবিধা হবে না। আমি আগে নিচে যাব। নিচ থেকে মই ধরে রাখব।’ বলে আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে ঘরের রাইটিং টেবিলটা নিয়ে এল জানালার নিচে। চেয়ারও আনল টেবিলের ধারে। বলল আহমদ মুসা শাহ বানুকে, ‘চেয়ার থেকে টেবিলে, টেবিল থেকে জানালায় এবং জানালা থেকে দড়ির মই বেয়ে নিচে নামবে, ঠিক আছে?’ ‘উত্তরটা দিতে পারব নিচে নামার পর।’ বলল শাহ বানু। চিন্তান্বিত তার মুখ। আহমদ মুসা লক্ষ্য করল শাহ বানুর চিন্তাক্লিষ্টতা। বলল, ‘ভাবছ কেন শাহ বানু। তুমি মোঘল কন্যা না? মধ্য এশিয়ার ‘পারগানা’ থেকে ভারতের ‘দিল্লী’ পর্যন্ত মোঘল ইতিহাস জান না? মোঘল দুহিতারা কি হাতির পিঠে, ঘোড়ার পিঠে বসেনি এবং পায়দলে যুদ্ধ করেনি?’ ‘ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি আসার পর সবই মনে পড়তে শুরু করেছে। সাহস, বাঁচার আশা সবই ফিরে আসছে। আপনি সামনে আছেন, সব কিছুই আমরা পারব।’ বলল শাহ বানু। ভারী ও গম্ভীর কণ্ঠ শাহ বানুর। ‘ধন্যবাদ শাহ বানু’ বলে আহমদ মুসা ঘরের চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে হাজী আবদুল্লাহকে বলল, ‘জনাব, ঘর সাফ করার সময় লোকরা যেন চেয়ার টেবিল ঠিক জায়গায় রাখে এবং জানালাটাও তুলে জানালার স্পেসে সেট করে রাখে, একটু দেখবেন। যে কোন সময় পুলিশ ওদের নিয়ে আমাদের ঘরগুলো সার্চ করতে পারে।’ কথা শেষ করেই ‘আমি নিচে যাচ্ছি’ বলে আহমদ মুসা জানালায় উঠে গেল। ‘বেভান, তুমি জানালা খোলার পর জানালার হুক কি যথেষ্ট শক্তিশালী আছে?’ ‘একজন মানুষ বহন করার মত শক্তিশালী অবশ্যই। ভয় হুকের তীক্ষè প্রান্ত নিয়ে। আল্লাহ ভরসা, মাত্র পনের ষোল ফুট উচ্চতার ব্যাপার তো। এই মুহূর্তে বিকল্প চিন্তার সময় নেই।’ বলল আহমদ মুসা। কথা শেষ করেই তর তর করে নেমে গেল আহমদ মুসা দড়ির মই বেয়ে। নিচে নেমে দড়ির মই টেনে ধরলে শাহ বানুর মা দড়ির মই বেয়ে ভালভাবেই নেমে এল। কিন্তু শাহ বানু মাঝপথ পর্যন্ত আসতেই দড়ির মই ছিঁড়ে পড়ে গেল। মই টেনে ধরে নিচে দাঁড়িয়ে ছিল আহমদ মুসা, তাই নিচে পাথরের উপর পড়া থেকে রক্ষা পেল শাহ বানু। হাত বাড়িয়ে যথাসময়েই তাকে ধরে ফেলেছিল আহমদ মুসা। উপর থেকে চাপা কণ্ঠে হাজী আবদুল্লাহ বলল, ‘বেভান, তোমরা সবাই ঠিক আছ তো?’ আহমদ মুসা শাহ বানুকে দাঁড় করিয়ে উপরে তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘ধন্যবাদ, ঠিক আছি আমরা।’ বলে আহমদ মুসা বলল শাহ বানুকে, ‘বললাম বটে, কিন্তু তুমি আসলেই ঠিক আছ তো?’ ‘আলহামদুলিল্লাহ। আমি তো বেঁচে গেছি। আঘাত আপনার পাবার কথা।’ বলল শাহ বানু কম্পিত ও বিব্রত কণ্ঠে। তখনও শাহ বানু নিজেকে সামলে নিতে পারেনি। ‘কিভাবে কি ঘটে গেল, আমার কিছুই মনে পড়ছে না।’ বলে আহমদ মুসা হাঁটা শুরু করে বলল, ‘আসুন আম্মা, শাহ বানু এস।’ সমস্যা দেখা দিল প্রাচীর টপকাতে গিয়ে। আহমদ মুসা সহজেই প্রাচীর পার হয়েছিল হুকওয়ালা সিল্কের কর্ডের সাহায্যে। সে কর্ড তো শাহ বানু ও সাহারা বানুর ক্ষেত্রে অচল। সমস্যাটা শাহ বানুরাও উপলব্ধি করেছে। শাহ বানুর মা সাহারা বানু বলল, ‘দড়ির মই তো ছিঁড়ে গেছে। প্রাচীর টপকাব কি করে বেটা?’ ‘আমি পার হয়েছিলাম সিল্কের কর্ডে হক প্রাচীরে আটকিয়ে। এখনকার কথা তখন মনেই পড়েনি। অসুবিধা নেই আম্মা। আসুন।’ বলে আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায় গিয়ে কোমর থেকে হুকওয়ালা কর্ড খুলে প্রাচীরের মাথায় ছুড়ে মেরে হুক আটকিয়ে নিল। তারপর বসে পড়ল আহমদ মুসা প্রাচীরের গোড়ায়। বলল, আম্মা আমার দুকাঁধে পা রেখে কর্ড ধরে দাঁড়ান। আমি দাঁড়াবার পর তিন ফিট উপরে থাকবে প্রাচীরের মাথা। হাত দিয়ে ভাল করে প্রাচীরের মাথা ধরে প্রাচীরের উপরে গিয়ে আপনি বসুন। পরের ব্যবস্থা আমি প্রাচীরে উঠে করব।’ ‘কি বলছ বেটা, তোমার কাঁধে পা রাখব?’ বলল সাহারা বানু প্রতিবাদের সুরে। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলল, ‘আম্মা আমাকে মাফ করুন, এখন কথা বলার সময় নয়। আমরা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে আছি। জীবনের স্বাভাবিক আইন এখানে চলবে না, প্লিজ।’ বলে আবার বসে পড়ল আহমদ মুসা। আর কোন কথা না বলে শাহ বানুর মা জুতা খুলে দুহাতে সিল্কের কর্ড ধরে আহমদ মুসার দুকাঁধে পা রেখে উঠে দাঁড়াল। তাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। বলল, ‘আম্মা, এবার আপনি কর্ড ছেড়ে দিয়ে প্রাচীরের মাথা শক্ত করে ধরুন।’ ‘ধরেছি বেটা।’ বলল সাহারা বানু। ‘এবার আপনি প্রাচীরের মাথায় উঠার চেষ্টা করুন, আমি পা ধরে ঠেলে দিচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা সাহারা বানুর দুপা ধরে তাকে উপরের দিকে ঠেলে দিল। সাহারা বানু সহজেই উঠে বসল প্রাচীরের মাথায়। আবার বসে পড়ল আহমদ মুসা। বলল, ‘এস শাহ বানু।’ বিব্রত, সংকুচিত শাহ বানু কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। দ্রুত গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসার পেছনে। ‘আম্মা যা করেছেন দেখেছ সেভাবেই তোমাকে প্রাচীরের মাথায় উঠতে হবে।’ শাহ বানু জুতা খুলে ‘আই এ্যাম স্যরি’ বলে সিল্কের কর্ড ধরে সে আহমদ মুসার কাঁধে উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে শাহ বানুর দুপা ধরে উপরে ঠেলে দিলে সে মায়ের মতই প্রাচীরের মাথায় উঠে বসল। আহমদ মুসা সিল্কের কর্ডের সাথে শাহ বানু ও সাহারা বানুর জুতা ও ব্যাগ বেঁধে কর্ড ধরে উঠে গেল প্রাচীরের মাথায়। উঠেই বলল সাহারা বানুকে, ‘আম্মা, আপনি দুহাতে প্রাচীরের মাথা ধরে বাইরের পাশে ঝুলে পড়–ন। ভয় নেই আমিও আপনার হাত ধরে থাকছি।’ ‘ভেব না, আমি পারব বেটা।’ বলে সাহারা বানু প্রাচীরে ঝুলে পড়ল। আহমদ মুসাও একইভাবে ঝুলে পড়ল প্রাচীরে। তারপর বাঁ হাত দিয়ে প্রাচীর ধরে রেখে ডান হাত সরিয়ে নিয়ে ধরল সাহারা বানুর এক হাত। বলল, ‘আম্মা, এখন আমি আপনার যে হাত ধরেছি সেটা প্রথমে ছেড়ে দিন, পরে দ্বিতীয় হাতটাও ছেড়ে দিয়ে আমার হাতের উপর ঝুলে পড়–ন।’ ‘কিন্তু তুমি দুজনের ভার এক হাতে.............।’ কিছু বলতে যাচ্ছিল সাহারা বানু। আহমদ মুসা তাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করার পর কোন প্রশ্ন তোলা ঠিক নয় আম্মা।’ ‘আল্লাহ সাহায্য করুন’ বলে সাহরা বানু চোখ বন্ধ করে দ্বিতীয় হাতটা প্রাচীর থেকে সরিয়ে ঝুলে পড়ল আহমদ মুসার হাতে। প্রবল এক ঝাঁকুনি খেল আহমদ মুসার দেহ। কিন্তু তার অনড় বাঁ হাত লোহার হুকের মতই প্রাচীরের মাথায় চেপে বসেছিল। প্রাচীরের অসমান মাথা লোহার হুকের তেমন ক্ষতি করতে পারে না, কিন্তু আহমদ মুসার হাতকে সুঁচের মত বিদ্ধ করল। সাহারা বানু যখন ঝুলে পড়ছিল, শাহ বানুও তখন চোখ বন্ধ করেছিল ভয়ে, তার মা পড়ে যাবার কোন শব্দ না পেয়ে সব ঠিক আছে বুঝে চোখ খুলল শাহ বানু। দেখল তার মা ঝুলছে আহমদ মুসার হাতে। ‘থ্যাংকস গড।’ অস্ফুট কণ্ঠে বলল শাহ বানু। সাহারা বানু হাতের উপর ঝুলে পড়লে আহমদ মুসা বলল, ‘আম্মা, এখন আপনি মাটি থেকে ফুট খানেকেরও কম উপরে। লাফিয়ে পড়ুন মাটিতে। জায়গাটা ভাল, ঘাসে ঢাকা নরম মাটি।’ বলার পরেই ‘রেডি’ বলে সাহারা বানুর হাত ছেড়ে দিল আহমদ মুসা। ছোট একটা শব্দ হলো। ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি ঠিক আছি বেটা।’ নিচ থেকে চাপা কণ্ঠে বলল সাহারা বানু। শাহ বানুকে আর বলতে হলো না। আহমদ মুসা তার দিকে তাকাতেই সে ঝুলে পড়ল প্রাচীরে। তারপর একহাত বাড়িয়ে দিল আহমদ মুসার দিকে। তারপর দ্বিতীয় হাত প্রাচীর থেকে টেনে নিয়ে ঝুলে পড়ল আহমদ মুসার হাতের উপর। শাহ বানুর সুবিধা হলো নিচ থেকে তার মা ধরে ফেলায়। আহমদ মুসা নিচে নেমে এল। ব্যাগ ও জুতা কর্ড থেকে খুলে তাদের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘স্যরি, আপনাদের খুব কষ্ট হয়েছে আম্মা। কিন্তু এ ছাড়া তো আর কোন পথ ছিল না।’ শাহ বানু ঝুঁকে পড়ে আহমদ মুসার দুপায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে করতে বলল, ‘সব কষ্ট করলেন আপনি আর বলছেন কষ্ট করলাম আমরা। মহামানুষদেরকে কি এতটাই বিনয়ী হতে হয়?’ আহমদ মুসা পা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করে বলল, ‘একি হচ্ছে শাহ বানু?’ ‘বড়দের গায়ে পা লাগলে এখানে সালাম করা হয় বেটা।’ বলল শাহ বানুর মা সাহারা বানু। ‘হিন্দুয়ানী রীতি শাহ বানু দেখছি ভালই রপ্ত করেছে।’ হেসে বলল আহমদ মুসা। শাহ বানু কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাধা দিয়ে বলল, ‘আর কোন কথা নয়, এখান থেকে বেশ একটু দূরে গাড়ি। চল।’ শাহ বানুরা জুতা পরে নিয়েছিল। সবাই চলতে শুরু করল। গাড়ির আলো নিভিয়ে রেখেই আহমদ মুসা গাড়ি নিয়ে মেইন রোডে উঠে এল। ছুটল গাড়ি। আহমদ মুসাদের গাড়ির পাশ ঘেঁষে দুটি পুলিশের গাড়িকে হোটেল সাহারার দিকে যেতে দেখল। আহমদ মুসা মনে মনে বলল হাজী সাহেব ইতিমধ্যে ঘরটা পরিষ্কার ও ঠিক-ঠাক করতে পাল কিনা? মোবাইল তুলে নিয়ে আহমদ মুসা হাজী আবদুল আলী আবদুল্লাহকে দুগাড়ি পুলিশ হোটেলে যাচ্ছে তা জানাল। হাজী আবদুল্লাহ আহমদ মুসাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘তোমার ঘরটা ধুয়ে ফেলার পর এখন মুছে ফেলা হচ্ছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘরটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’ শহরের মাঝখানে একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে আহমদ মুসা গাড়িটা একটা গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে গাড়ির আলো জ্বেলে পোর্ট ব্লেয়ারের রোডম্যাপ বের করল গভর্নর হাউজে সোজা যাবার পধটা আর একবার দেখে নেয়ার জন্যে। রাতে পোর্ট ব্লেয়ারে গাড়ি চালাবার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আলো জ্বলতেই আহমদ মুসার হাতের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠল শাহ বানু, তার বাম হাতটা রক্তে ভেসে গেছে। সাহারা বানুও দেখতে পেয়েছে। বলল আর্তকণ্ঠে, ‘বেটা, আহত হাতটাকে আবার আহত করেছ? দেখি, কিভাবে হলো?’ ‘আম্মা, প্রাচীরের মাথা অমসৃণ। সিমেন্ট ও পাথরের তীক্ষè কণা রয়েছে প্রাচীরের মাথা জুড়ে। প্রাচীর থেকে সকলকে নামিয়ে দেবার সময় সব ভার তো বাঁ হাতের উপর পড়েছিল। সিমেন্ট ও পাথরের ঐ সব তীক্ষè কণায় হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে।’ ‘বেটা, আল্লাহ তোমাকে এত ধৈর্য্য দিয়েছেন? নিজের এতবড় অসহনীয় কষ্টটাও কাউকে বুঝতে দাওনি। তার উপর আমাদের কষ্টের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করছ! শুনলাম তুমি আমাদের রেখে ভাইপার দ্বীপে যাবে গংগারামকে উদ্ধারের জন্যে। সেখানে কি ঘটবে তুমি ভাল করেই জান। এ অবস্থায় তুমি কি করে যাবে সেখানে?’ বলতে বলতে কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল সাহারা বানুর কণ্ঠ। শাহ বানুরও চোখ থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার দুগ- বেয়ে। এক সময় আহমদ মুসা ছিল তার স্বপ্নের মানুষ। কিন্তু বাস্তবের মানুষটি সব স্বপ্ন, সব কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছেন। দড়ির মই ছিড়ে তাঁর কোলে পড়ে গিয়েছিল শাহ বানু। দুহাতে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে শাহ বানুকে রক্ষা করেছে সে। কিন্তু তিনি বললেন, কিভাবে কভন কি ঘটেছে তার কিছুই মনে নেই। পাথরে যেমন স্পন্দন ওঠে না, ইনি ঠিক তেমনি হবেন। ভাবতে গা শিউরে উঠছে তার। মানুষের ওজনের প্রবল চাপে একটি মাত্র হাতে পাথর ও সিমেন্ট কণা প্রবেশ করে হাতকে যখন ক্ষত-বিক্ষত করছিল, তখন কি অদ্ভুত স্বাভাবিকতার সাথে তিনি কাজ করে যাচ্ছিলেন এবং তার অসুবিধা একটু তিনি জানতে দেননি। গাড়িতে আলো না থাকলে হয়তো জানাই যেত না। ইসলামের সোনালী যুগের মানুষ সে দেখেনি। নিশ্চয় এমন মানুষই ছিল তারা। তা না হলে জগত জয়ের সাথে জগতের মানুষকে কেমন করে জয় করল তারা! চিন্তায় ছেদ নামল শাহ বানুর। আহমদ মুসা কথা বলে উঠেছিল তার মায়ের কথার জবাবে, ‘হাতের আঘাতটা খুব বেশি কিছু নয় মা। ভাইপার দ্বীপে যাওয়ার প্রোগ্রাম এক ঘণ্টাও পিছিয়ে দেয়া যাবে না।’ ‘শাহ বানু, গাড়িতে দেখ ‘ফাষ্ট এইড বক্স’ আছে। হাতে ভাল করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দাও।’ বলল সাহারা বানু। আহমদ মুসা রোড ম্যাপ গুটিয়ে রেখে গাড়ি ষ্টার্ট দিয়ে বলল, ‘এখন সময় হবে না। আপনাদের ওখানে পৌছে দিয়ে হাজী আবদুল্লাহ সাহেবের আগেই আমাকে ভিক্টোরিয়া ব্রীজ-এর গোড়ায় পৌছা দরকার। সেখানে গিয়ে আমি ব্যান্ডেজটাকে বেঁধে নেব, কথা দিচ্ছি মা। হাজী সাহেব নিশ্চয় ভাল ব্যান্ডেজ বাঁধতে পারেন।’ ‘কিন্তু গভর্নর হাউজের লোকরা এ সব রক্তারক্তি দেখে কি বলবে?’ বলল সাহারা বানু পাল্টা যুক্তি হিসেবে। ‘আমি সেখানে গাড়ি থেকে নামবো না।’ বলে আহমদ মুসা সুষমার দেয়া মোবাইলে সুষমার ‘ওয়ানটাচ’ ডায়ালে মোবাইল করল। ওপারে টেলিফোন ধরেই সুষমা বলে উঠল, ‘আমার কি সৌভাগ্য। আস্সালামু আলাইকুম।’ ‘ওয়াচ্ছালাম। শাহ বানুদের নিয়ে আসছি সুষমা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ও! নাইস। ধন্যবাদ ভাইয়া। কতক্ষণের মধ্যে পৌছবেন? আমি গেটে যাচ্ছি।’ সুষমা ওপার থেকে বলল। ‘ধরো আধা ঘণ্টা। অন্তত তোমার মাকে এ ব্যাপারে সঙ্গে সঙ্গেই জানানো উচিত।’ ‘অলরেডি আমি জানিয়েছি ভাইয়া। মাও তাঁদের ওয়েলকাম করবেন। তবে গ্রামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসাবে, মোঘল পরিবারের সদস্য হিসাবে নয়।’ ‘তুমি কিন্তু ঝুঁকি নিচ্ছ সুষমা। তুমি একটি মোঘল পরিবারকে আশ্রয় দিচ্ছ।’ বলল আহমদ মুসা। ‘অবশ্যই। কিন্তু এটা কি ইতিহাসে নতুন? মারাঠী নেতা শিবাজী ও তাঁর পুত্র শম্ভুজী আওরঙ্গজেবের হাতে মোঘল কারাগারে বন্দী থাকলেও তারা মেহমান হিসাবে ব্যবহার পেয়েছেন। শত্রুতা সত্ত্বেও মারাঠীরা আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে মোঘলদের সহযোগিতায় গেছে। আমাদের চতুর্থ পেশোয়া প্রথম মাধব রাও মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে ইংরেজের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন এবং বন্দীদশা থেকে তাকে মুক্ত করে মোঘল সাম্রাজ্য পুন:প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৭৭২ সালে।’ সুষমা রাও বলল। ‘তাহলে বলা যায় সুষমা এখন দ্বিতীয় মাধব রাও।’ হেসে উঠল সুষমা। একটু থেমে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমি মাধব রাও এই অর্থে যে, আমি আমার যে কোন মূল্যে আহমদ আলমগীরকে মুক্ত দেখতে চাই। একটি মোঘল পরিবারের সাথে সম্পর্কের আমি সেতুবন্ধ হতে চাই। কিন্তু তাঁর মুক্তির জন্যে তো কিছুই করতে পারবো না, কোন সহযোগিতা আপনি নিলে আমি বাধিত হবো।’ ‘শাহ বানুদের কাছে রাখছ, এখন এটাই সবচেয়ে বড় সহযোগিতা। ওদের একটা নিরাদ হোটেলে রেখেছিলাম। কিন্তু শয়তানরা সন্ধান পেয়ে যায়। অল্পের জন্যে আজ এঁরা শয়তানদের হাতে পড়া থেকে বেঁচে গেছেন।’ বলল আহমদ মুসা। ‘অশেষ ধন্যবাদ ভাইয়া যে, আপনি আমার কথা মনে করেছেন।’ বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল সুষমা। একটু থেমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবার বলে উঠল, ‘ওঁর মুক্তির ব্যাপারে কি ভাবছেন ভাইয়া?’ ‘আমি নিশ্চিত সুষমা, আহমদ আলমগীর মুক্ত হবে। আমি অনেকটা পথ এগিয়েছি। রহস্যের অন্ধকারটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন।’ বলল সুষমা। ‘এখনকার মত কথা শেষ, রাখছি সুষমা।’ মোবাইলের কল অফ করে দিল আহমদ মুসা। মুখ ফিরাল সাহারা বানুর দিকে। বলল, ‘সুষমার সাথে কথা হলেঅ আম্মা। ওর মাকে সে আগেই বলে রেখেছে। তার মা তাদের আত্মীয় হিসাবে স্বাগত জানাবে। তাদের আত্মীয় পরিচয়েই ওখানে থাকবেন। আর এখন সুষমা গেটে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। কোন ঝামেলা হবে না।’ ‘ধন্যবাদ বেটা, তোমার কাজে কোন ফাঁক নেই। আল্লাহ তোমাকে আরও সাহায্য করুন।’ বলল সাহারা বানু। সাহারা বানু থামতেই শাহ বানু আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনি তো সুষমাকে চিনতেন না। মাত্র একবার দেখা হয়েছে। কিন্তু আপনাদের কথা শুনে মনে হলো এক যুগ থেকে আপনাদের পরিচয়। কি করে এটা সম্ভব?’ ‘তোমাদের সাথেও আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু তোমরা কি আমাকে তোমাদের পরিবারের একজন করে নাওনি?’ ‘আমার প্রশ্ন এখানেই। কেন, কেমন করে এটা হতে পারে?’ বলল শাহ বানু। ‘শোন, তোমার কাজ যদি ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ হয়, তাহলে তাতে এমন একটা শক্তি সৃষ্টি হয়, এমন একটা বরকত আল্লাহ তাতে দেন যে, তোমার সততা, স্বার্থহীনতা ও উদ্দেশ্যের পবিত্রতার কথঅ আর বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না, প্রমাণ করার প্রয়োজন পড়ে না। এ কারণে ফলের জন্যে সময়ের প্রয়োজন হয় না। এক যুগের রেজাল্ট এক দিনেও পেয়ে যেতে পার।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ তো আল্লাহর জন্যে কাজ করা।’ বলল শাহ বানু। ‘হ্যাঁ, শুধু আল্লাহরই সন্তুষ্টির জন্যে, আল্লাহকে খুশি করার জন্য কাজ করা। আল্লাহ খুশি হন সেই কাজে যে কাজ নিরপরাধ কাউকে আঘাত করে না, যে কাজে কোন অন্যায় অবিচার নেই, যে কাজে কোন অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করা হয় না, যে কাজ মানুষের কল্যাণের জন্যে হয় এবং যে কাজ কারও ক্ষতির বিনিময়ে কারও কল্যাণ করে না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘অনেকে ভাল কাজ বা কল্যাণের কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত করতে চায় না। আল্লাহকে মানে না, এমন লোকও ভাল কাজ, কল্যাণেল কাজ করে বা করতে পারে।’ বলল শাহ বানু। ‘হ্যাঁ। করে, করতে পারে। এ ধরনের ভাল কাজের লোকদের উদাহরণ পচা ফলের মত। পচা ফলের কিন্তু সবটাই পচা হয় না। হয়তো ফলের বৃহত্তর অংশ, এমন কি ৯০ ভাগ অংশও ভাল থাকতে পারে। কিন্তু এর পরও মানুষ একে পচা ফলই বলে এবং মানুষ কিনতে চায় না সেটা পচা ফল সেজন্য। যাদের কাজের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ নয়, যারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও পছন্দ-অপছন্দের অনুসরণে কাজ করে না, তারা পচা ফলের সাথে তুলনীয় এই কারণে যে, তাদের সব কাজ মানুষের কল্যাণে হয় না, তারা সব ক্ষেত্রে অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। যেমন, একজন সহৃদয় ধনী লোক মানুষের কল্যাণে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, যে ধন তিনি অর্জন করেছেন, তার মধ্যে কালো টাকা আছে, তার সাথে জড়িয়ে আছে বহু বঞ্চিতের দীর্ঘশ্বাস, আর নির্যাতিতের কান্না। দেখা যাচ্ছে, এই ধনীর খরচটা প্রশংসার, কিন্তু উপার্জনটা নিন্দার। আল্লাহর প্রতি ঈমান নেই, বা ভয়-ভালবাসা নেই, এমন লোকদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাদের শতকরা নব্বই জনই এই ধরনের মানুষ। দুচারজন এর ব্যতিক্রম হতে পারেন, যেমন আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারেও হযরত আবু বকর (রা) ভাল লোক ছিলেন, নবী হওয়ার আগে আল্লাহর রসূল (স) সব দিক দিয়ে ভাল ছিলেন এবং হযরত খাদিজা (রা) সবদিক দিয়ে ভাল মহিলা ছিলেন।’ থামল আহমদ মুসা। ‘চমৎকার। ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু ‘ফি সাবিলিল্লাহর অনুসারী, মানে ভালো মানুষ হওয়া খুব কঠিন।’ বলল শাহ বানু। ‘না, খুবই সহজ। তুমি যদি আল্লাহকে ভালবাস এবং তার সৃষ্টিকে ভালবাস, তাহলে তোমার অলক্ষ্যেই তুমি ভাল মানুষ হয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি ভালবাসাটা গাড়ির ষ্টিয়ারিং হুইল-এর মত। ষ্টিয়ারিং হুইল যেমন গাড়ির গতিকে নিয়ন্ত্রিত করে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ও ক্ষতিগ্রস্থ করা থেকে গাড়িকে রক্ষা করে, তেমনি আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আল্লাহর সৃষ্টির জন্যে ভালবাসা মানুষের জীবনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে যাতে তার দ্বারা মানুষ শুধু কল্যাণই পায়, ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এবং এই ভালবাসাই তাকে অন্যায়ের প্রতিবিধান ও প্রতিরোধে এমন কি জীবন-উৎসর্গেও উদ্বুদ্ধ করে।’ থামল আহমদ মুসা। থেমেই আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘সামনেই গভর্নর হাউজ আম্মা। আমরা এসে গেছি।’ নড়ে-চড়ে বসল শাহ বানু ও সাহারা বানু। কাপড় ও চুল ঠিক-ঠাক করার দিকে মনোযোগ দিল তারা। আহমদ মুসা নীরব। তার দৃষ্টি সামনে। গাড়ির গতি কমে এসেছে আগের চেয়ে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ কালাপানির আন্দামানে চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now