বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যৌতুকের পরিণাম

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান জাকারিয়া আহমেদ (০ পয়েন্ট)

X তানহার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কিন্তু বেশিরভাগ পাত্র এসে ফিরে যায়। কারণ সে আট দশটা মেয়ের মতো সুন্দর নয়। তার শ্যামবর্ণের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করতে পারে না। যার জন্য দেখতে এসেই ফিরে যায় অনেকে। . পড়াশুনায় মেধাবী হলেও একটি মেয়ের বিয়ের বেলায় এসে পাত্রপক্ষ এটা দেখে না। বিয়ের পর বাচ্চাকাচ্চাকে ‘অ’ ‘আ’ পড়াতে পারলে আর নিজের সংসার সামাল দিতে পারলেই হয়। . মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই বোনের মাঝে ছোট মেয়ে তানহা। তার বড়বোনকে কোনো মতে বিয়ে দিতে পেরেছে। মাথা থেকে একটি বোঝা কমিয়ে নিয়েছেন তারা। কিন্তু তানহাকে যেই দেখতে আসে সেই ফিরে যায়। কারণ বড়বোনের মতো সে অতোটা সুন্দর নয়। কেউকেউ রাজি হয় মোটা অংকের অর্থের বিনিময়। কিন্তু একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে মোটা অংকের বিনিময় বিয়ে দেয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য। অসাধ্য সাধনের মতো এরূপ বটে। . মধ্যবয়সী পিতার তানহাকে নিয়ে বড় চিন্তা। কিভাবে উপযুক্ত পাত্রের হাতে তাকে পাত্রস্থ করা যায়। দেহে প্রাণ থাকতে ছোট মেয়েটাকে যে করেই হোক বিয়ে দিতে হবে। . মেয়েটি সবে মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে। তার মাঝেই বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন মা- বাবা। স্বপ্ন দু’চোখে অনেক বড় ডাক্তার হবে। ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে। . কলেজে শেষে বাড়ি ফিরে বাসায় ঢুকতেই দেখে কয়েকজন অপরিচিত লোক। তানহার বুঝতে বাকি রইলো না যে, আজকেও তাকে দেখতে এসেছে। কয়েকদিন পরপর দেখতে আসা তানহার কাছে বিরক্তকর হয়ে উঠেছে। কারণ সে নিশ্চিত হয়ে যায় তাকে পাত্রপক্ষ পছন্দ করবে না। তাই মুখটা মলিন করেই বাসায় প্রবেশ করলো সে। তাকে দেখেই বাবা বলে উঠলেন, . - “এসেছিস মা। এই যে, আমাদের ছোট মেয়ে বড় লক্ষী মেয়ে।” তানহা জবাব দিলো, - “জ্বি আব্বু।” . বাপমেয়ের আহ্লাদী কথা শুনে অপরিচিতদের মাঝে আসা মহিলাটি বলে উঠলেন, . - “মেয়েকে শাড়ি পরিধান করিয়ে আনুন। আমাদের তাড়া আছে।” . মহিলার কথাশুনে তানহার বাবা বড় মেয়েকে ডেকে তানহাকে শাড়ি পড়াতে পাঠালেন। বড়বোন খুব সুন্দর করে তানহাকে শাড়ি পড়িয়ে আনলো। খুব বেশি সুন্দর না লাগলেও খারাপও লাগছিলো না তানহাকে। . বিরক্তের ছাপ মুখে নিয়ে সবার সামনে বসে আছে সে। সে জানে এনাদেরও তাকে পছন্দ হবে না। শুধু শুধু কষ্ট করে এতোকিছু করা। . মেয়ে দেখতে আসলে পাত্রপক্ষ যেসব প্রশ্ন মেয়েকে করে থাকে অন্যদের মতো এনারাও জিজ্ঞেস করলো। তানহা খুব স্বাভাবিকভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিলো। উত্তর দেয়ার পর যেতে বললে পাশের রুমে চলে আসে সে। আর পাশের রুমে থেকেই বাবার সাথে কি কি কথা বলছে ছেলে পক্ষ তা শুনতেছে। . - “ছেলে আমাদের সোনার টুকরা ছেলে। দেখতেই তোতো পাচ্ছেন। আর আপনার মেয়েকেও আমাদের পছন্দ হয়েছে।” . মহিলার কণ্ঠে মেয়ে পছন্দের কথা শুনে তানহার বাবা “আলহামদুলিল্লাহ” বলতেই মহিলা অর্থাৎ ছেলের মা বলে উঠলেন, . - “তবে বিয়ের আগে এবং পরে আমাদের কিছু ডিমান্ড আপনাদের পূরণ করতে হবে। যদি ডিমান্ডগুলো সুন্দরভাবে পূরণ করতে পারেন তো আমরা সামনে আগাবো।” . তানহার বাবা মহিলার প্রত্যুত্তরে বললেন, . - “জ্বি বলুন, আমাদের কি কি ডিমান্ড পূরণ করতে হবে?” - “বেশি কিছু না। বিয়ের আগেই আমাদের নগদ দুই লক্ষ টাকা দিতে হবে। বিয়ের পর সামাজিক নিয়মানুসারে মেয়ের রুম জিনিসপত্র দিয়ে সাঁজাবেন।” . টাকার পরিমাণটা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পাহাড় সমতুল্য। কিন্তু ছেলে দেখতে যেমন সুদর্শন তেমনি সরকারি চাকরিও করে। তাই হ য র ল না ভেবে একটু কমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু বেশি কমাতে পারেন নাই। মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা কমাতে পেরেছেন। কিন্তু মেয়ের সম্মান রক্ষার্থে ঘর সাঁজানোর জিনিসপত্রের কথা কিছুই বললেন না। . - “তাহলে এই কথাই রইলো, সামনে মাসের প্রথম শুক্রবারেই শুভকাজটা সেরে নিবো। কি বলেন বেহাই সাহেব?” - “আপনাদের যেভাবে সুবিধে হয়।” - “আজ তাহলে আমরা উঠি।” . সুন্দরভাবে পাত্রপক্ষ বিদায় দিলেন তানহার বাবা। কিন্তু সে সাথে দেড় লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিবেন বলেও এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। . এতো টাকা যৌতুকে এমন পাত্রের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না তানহা। বিয়ের আগে তার বাবা এতো টাকা কোথায় পাবে? দেড় লক্ষ টাকা যেসে কথা নয়। নিশ্চয় মেয়ের মতো বাবাও এতো টাকা কিভাবে দিবেন এই চিন্তাটাই করছেন। . বাবাকে চিন্তামুক্ত করতে তানহা বাবার কাছে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানায়, . - “আব্বু।” - “বল মা।” - “আমি এ বিয়েটা করতে পারবো না। তোমরা এই বিয়ে বাদ দিয়ে দাও।” - “কি বলছিস এসব? এতো ভালো পাত্র আমরা কখনো হাত ছাড়া করবো না।” - “কিন্তু বাবা! এতো টাকা কোথা থেকে দিবে তাদের?” - “তার জন্য তোকে চিন্তা করতে হবে না। কোনো না কোনোভাবে জোগাড় হয়ে যাবে।” . অনিচ্ছা সত্ত্বেও তানহাকে বিয়েটা করতে হবে। নিজেকে তার অপছন্দ হয়েছে তা না, ছেলেকে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু ওর পরিবার থেকে এতগুলো টাকা যৌতুক দেয়া কিভাবে সম্ভব? বাবার উপরে কথাও বলতে পারছে না। . দেখতে দেখতে চোখের পলক ফেলার মতো বিয়ের দিনটা ঘনিয়ে গেলো। তানহাদের বাড়ি বিভিন্ন আলোকসজ্জা দিয়ে বেশ সুন্দর করে সাঁজানো হয়েছে। তানহাদের বাড়িটা খুব একটা গর্জিয়াছ করে সাঁজানো না হলেও নানা রঙের ছোটছোট বৈদ্যুতিক বাতি গুলো বাড়িটাকে অন্যরকম সৌন্দর্যে রূপ দিয়েছে। . বিয়ের মূল কাজ বিয়ে পড়ানোর সম্পন্ন করার আগে তানহার শ্বশুর তার বাবাকে একপাশে ডেকে পাঠালেন। তানহার বাবা কাছে আসতেই তানহার শ্বশুর জিজ্ঞেস করলেন, . - “বেয়াই সাহেব! টাকা রেডি তো?” . তানহার বাবা লোকলজ্জায় একটু ভীত হয়ে বললেন, . - “বেয়াই সাহেব! কিছু মনে করবেন না। আসলে আমি আপনাকে এই মুহূর্তে পুরোটাকে দিতে পারছি না। এখন আপাতত একলক্ষ টাকা দিচ্ছি, বাকি পঞ্চাশ হাজার বিয়ের কয়েকদিন পর পৌঁছে দিবো।” . কথাটা শুনে তানহার শ্বশুর একটু বিগর্হিত হয়ে বললেন, . - “আমার স্ত্রী এককথার মানুষ ও দু’কথা পছন্দ করে না। আপনি সব টাকা একত্রে দিলেই বিয়ে হবে নাহয় হবে না। এমনিতে পঞ্চাশ হাজার কম দিচ্ছেন। এখন আবার বলতেছেন আর পঞ্চাশ হাজার পরে দিবেন। না না, এ বিয়ে হবে না।” - “বেয়াই সাহেব! এমনটা করবেন না। আমি বিয়ের কয়েকদিন পরেই বাকি টাকাটা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিবো। দয়া করে বিয়েটা বন্ধ করবেন না।” - “ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিন্তু বিয়ের প্রথম মাসের মধ্যে টাকা দিতে হবে। আমি আমার স্ত্রীকে সামলিয়ে নিবো।” . করুণাময় এক অদ্ভুত হাসি দিলেন তানহার বাবা। অতঃপর সুযোগ্য পাত্রের সাথেই তানহার বিয়ে সম্পন্ন হয়। অবশেষে তানহার বাবার চিন্তাটা নিধন হলো। দুই মেয়েকেই সুযোগ্য পাত্রের হাতেই তুলে দিতে পেরেছেন। কিন্তু তানহার বেলায় যৌতুকটা দিতে হয়েছে বাধ্য হয়েই। . বিয়ের কয়েকদিন বেশ সুন্দরভাবেই কেটে যাচ্ছিলো তানহার। এদিকে যৌতুকের বাকি টাকা জোগাড় করতে হিম শিম খাচ্ছেন তানহার বাবা। বিয়ের সব খরচ থেকে শুরু করে যৌতুকের একলক্ষ টাকাও ধারদেনা করে জুগিয়েছেন। তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাকি টাকাটাও জোগাড় করার। . বিয়ের একমাস পার হয়ে দ্বিতীয় মাসের দশবারো দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো। কিন্তু টাকা এবং ঘরের জিনিস পত্র দেয়ার কোনো পাত্তা নেই তানহার বাবার। এদিকে টাকার জন্য তানহাকে শুনতে হচ্ছে নানা ধরণের কটূ কথা। দাঁতে দাঁত কামড়িয়ে সব সহ্য করে যাচ্ছে সে। এই বিয়ের কারণেই ডাক্তার হবার স্বপ্নটাও ভেঙ্গে যায় নিমিষে। কথা ছিলো ঘর সাঁজানো সেটাও পারছেন না তানহার বাবা। . তানহার বেশিদিন স্থায়ী হলো না শ্বশুড়বাড়িতে থাকার। শ্বশুড় কড়া কথায় জানিয়ে দিয়েছেন তানহাকে আর তাদের ঘরে তুলবে না বলে। তানহার স্বামীকে উঁচু পরিবারে নতুন করে আবার বিয়ে করাবেন বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। . তানহার সাথে এমনটা তানহার বাবা মেনে নিতে পারে নাই। মেয়েকে নিজের বাড়িতে ফেরত দেখে শোকে দুঃখে ব্রেনস্ট্রোক করে বসেন তিনি। আর চিরতরে হারিয়ে গেলেন এই পৃথিবী থেকে। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। . তানহার জীবনটা এমনিতে অন্ধকার ছাঁয়ার মাঝে মিশে গেছে। এখন নিজের জন্মদাতা পিতার চলে যাওয়াতে ভেঙ্গে পড়ে সে। সান্তনা দেয়ার তো মাথার উপরে আর কেউই রইলো না। পরিবারে চালানোর মতো কোনো বড় ভাইও নেই তার যার কারণে অভাবও দেখা দিতে দেরি করলো না। . নিজের মনকে শক্ত করে তানহা নিজেই কিছু একটা করবে বলে সিন্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ সময়ে কি করবে সে? কিছু ভেবো পাচ্ছে না। সে ছেলেও না যে কোনো কাজ করবে। . - ‘‘কিরে এখানে বসে কি ভাবছিস?’’ . জয়নাল চাচার ডাকে তানহার ভাবনা ভেঙ্গে গেলো। তাদের বাসা থেকে একটু দূরেই জয়নাল চাচাদের বাসা। খুব ভালো লোক জয়নাল চাচা। যখন তানহার বাবা মারা যায় তাদের পাশে উনিই বেশি ছিলেন। জয়নাল চাচার ডাকে তানহা সাড়া দিলো। . - ‘‘কিছু না চাচা, এমনিতেই বসে আছি।’’ - ‘‘কি এতো দুশ্চিন্তা করছিস?’’ - ‘‘মা আর আমি ছাড়া তো আমাদের পরিবারে কেউ নেই এখন। আমি না থাকলে মা আপুর বাসাতেই থাকতে পারবেন। দুলাভাই বলছিলো আমাকে নিয়ে যেন তাদের বাসায় যাই কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না। আপুর সংসারে আমরা বাড়তি ঝামেলা হতে। আমার কথা তো সবই জানেন।’’ - ‘‘তো কোথায় যাবি তোরা? কি খাবি কি পড়বি?’’ - ‘‘জানি না চাচা। এটাই ভাবছিলাম এতোক্ষণ। - ‘‘আমার নাতনি ‘অন্নি’ আর ‘মুন্নি’ বোন দুইটাকে পড়াতে পারবি? মায়ের কাছে একদম পড়তে চায় না দুষ্টামি করে বেশি তাই ছেলের বউ তাদের জন্য টিচার খুঁজতেছে। আর তুই তো এস এস সিতে জিপিএ-৫ ও পেয়েছিলি।’’ - ‘‘আপনার সেটা এখনো মনে আছে?’’ - ‘‘মনে থাকবে না কেন? তোর বাবা তোর রেজাল্টের খুশিতে আমাদের মিষ্টি খাইয়েছিলো, সেটা ভুলে যাই কি করে?’’ - ‘‘কিন্তু চাচা সে কয়টা টাকায় কি পরিবার চলবে?’’ - ‘‘আমরা যদি কোনো বাইরের কোনো টিচারের কাছে পড়াই তাকে কম করেও হলেও টিউশন ফি ছয় সাত হাজার টাকা দিতে হবে। সেটা নাহয় তোকেই দিলাম বিনিময় আমার দুষ্টু নাতনি দুইটাকে পড়াবি।’’ - ‘‘জ্বি চাচা আমি পড়াতে পারবো।’’ - ‘‘আচ্ছা তাহলে আমি বউমাকে বলে দিবো, তুই সন্ধ্যা থেকেই পড়াতে আসিস।’’ - ‘‘ঠিক আছে চাচা।’’ . এ দুঃখ + বিপদের সময় এমন খুশির সংবাদ শুনে তানহার এতো বেশি ভালো লাগছে যা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়। এতোদিন জয়নাল চাচা সুনাম শুনে আসছে আজকে হাতে নাতে প্রমাণ ফেলো। বাবার বয়সী জয়নাল চাচা তাই ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করলো না তানহা। . খুব সুন্দরভাবে যাচ্ছিলো তানহার দিনগুলো। জয়নাল চাচার নাতনি দুইটা পড়াতে পড়াতে সে পাড়ার আরও দুইটা বাচ্চাকে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। এখন সে সুন্দরভাবে মা মেয়ের পরিবার চালাতে পারতেছে। . মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে তারও পড়াশুনা করতে কিন্তু সেটা আর পারে না। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের কথা মনে হলে মন খারাপ করে বসে থাকে প্রায়ই। স্বপ্ন বুননের এই পৃথিবীতে তানহা তার স্বপ্নটা বুনতে পারছে না। সে ভাবনাতে মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। . আস্তে আস্তে দিন কেটে যাচ্ছে। আর এদিক দিয়ে শুনা যাচ্ছে জয়নাল চাচার ছোট ছেলে আরিফ কানাডা থেকে পুড়াশুনা করে দেশে আসছে। . দেখতে দেখতে আরিফও কানাডা থেকে চলে আসলো। চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে। এতো বগ হবার পরও সবার সাথেই দুষ্টামি করে বেড়ায়। তানহা আরিফের ভাতিজিদের পড়াতে আসে এটা সে লক্ষ্য করলো। মনে মনে প্লেন করে ফেলেছে তানহার সাথে কথা বলবে। তাই হুট করে একদিন... . - ‘‘হাই, আমি আরিফ।’’ . তানহা চুপ করে রইলো। আরিফের সাথে কোনো কথা না বলে অন্নি মুন্নিকে পড়াচ্ছে। আরিফ আবার বললো, . - ‘‘হাই, আমি আরিফ।’’ - ‘‘জ্বি জানি।’’ - ‘‘জানেন! কিভাবে?’’ - আপনি জয়নাল চাচার ছেলের জানবো না কেন? - ‘‘ওহ তোমার নাম কি?’’ - ‘‘আমার নাম জেনে আপনি কি করবেন?’’ - ‘‘কিছু না এমনিতেই।’’ - ‘‘এমনিতে হলে জেনে কি করবেন?’’ . কথাটা বলে শেষ না করতেই অন্নি বলে উঠলো, . - ‘‘চাচ্চু আপুর নাম তানহা।’’ - ‘‘তাই চাচ্চু। দেখছো তোমার আপুর না খুব ভাব। আমার আম্মুটা কত্ত ভালো।’’ . নিজের সামনে ছোট বোনের সুনাম দেখে মুন্নি রেগে বলে উঠলো। . - ‘‘চাচ্চু!’’ - ‘‘বলো চাচ্চু।’’ - ‘‘শুধু অন্নি ভালো, আমি ভালো না।’’ - ‘‘অন্নি মুন্নি তোমরা পড়ো। না পড়লে কালকে থেকে আমি আর তোমাদের পড়াতে আসবো না। আর এই যে, আপনি যান তো এদের পড়ার মাঝখানে এসে ডিস্টার্ব করবেন না দয়া করে।’’ . চাচ্চু আর ভাতিজির কথা মাঝে ব্রেক মেরে কথা বন্ধ করে দিলো তানহা। আরিফও ভদ্রছেলের মতো চলে গেলো। তবে মনে একটি প্রতিজ্ঞা নিয়ে বের হয়েছে সেটা হলো তানহার সাথে বন্ধুত্ব করা। . তারপর প্রায়ই তানহাকে পড়ানোর মাঝখানে বিরক্ত করা আরিফের নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে যায়। তানহাকে সে বন্ধুত্বের অফারও দেয়। তানহাও গ্রহণ করে নিলো তবে আরিফের বন্ধুত্বের অফারটা একটা শর্তে গ্রহণ করেছে। সেটা হলো পড়ানোর সময় কোনো ডিস্টার্ব করা যাবে না। আরিফও শান্তছেলের মতোই মেনে নিলো এ আবার কঠিন কি? . বন্ধুত্ব বেশ ভালোই চলছিলো কিন্তু বন্ধুত্বটা যে ভালোবাসা পর্যন্ত গড়াবে তা আরিফ নিজেও বুঝতে পারেনি। ইদানীং তানহাকে সে যত দেখে ততই ভালো লাগে। কিন্তু তানহাকে কিভাবে বলবে সেটা বুঝতে পারছে না। চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে সে তাই নয় ছয় না ভেবে একদিন বললো। . - ‘‘তানহা তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।’’ - ‘‘কি কথা? বলেন।’’ - ‘‘বলা কঠিন না, কিন্তু তুমি কিভাবে নাও সেটাই ভাবছি।’ - ‘‘কিভাবে নিই সেটা পরে দেখা যাবে আপনি বলুন।’’ - ‘‘আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’’ . কথাটা শুনে তানহা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। সে কখনো কল্পনাও করেনি আরিফ তাকে ভালোবাসবে। তার মতো শ্যামবর্ণের মেয়ে কিভাবে ভালোবাসতে পারে? এটা কি করে সম্ভব? মুহূর্তেই ভাবনার অবসান ঘটলো। . - ‘‘কি ভাবছো তুমি?’’ - ‘‘হুম, নাহ্, কিছু না। আমার দ্বারা সম্ভব না।’’ - ‘‘কেন সম্ভব না?’’ - ‘‘আমার সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না।’’ - ‘‘তোমাকে ভালোবাসি এর থেকে বেশি কিছু আর কি জানতে হবে?’‘ - ‘‘জানতে হবে অনেক কিছুই।’’ - ‘‘বলো কি জানতে হবে?’’ - ‘‘জানি না, আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারবো না।’’ - ‘‘কেন পারবে না?’’ - ‘‘কারণ আমি বিবাহিতা?’’ . একটু আগে যে নিস্তব্ধতা তানহার মাঝে কাজ করছিলো সেটা এখন আরিফের মাঝে বিরাজ করছে। নিজের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে তানহাকে জিজ্ঞেস করলো। . - ‘‘তোমার সাথে তো আমি কখনো তোমার বরকে দেখিনি।’’ . এটা শুনেই তানহা কেঁদে দিলো। কাঁদারই কথা, আরিফের কথাটি তার অভিশপ্ত অতীতের কথা মনে করিয়ে দিলো। যেখানে সে অনেকগুলো জিনিস বিসর্জন দিয়েও কিছুই পায়নি। পায়নি একটু সুখ, পায়নি একটু ভালোবাসা। . - ‘‘তুমি কাঁদছো কেন?’’ . তানহা অবিরত কেঁদেই চলেছে। একপ্রকার বিরক্ত নিয়ে আরিফ বলে উঠলো, . - ‘‘আরে তুমি কাঁদছো কেন?’’ . কান্না থামিয়ে তানহা তার অভিশপ্ত অতীতের বর্ণনা দিলো আরিফের কাছে। কান্না থামলেও চোখের কোণে যে অশ্রুর ঝর্ণাধারা বয়ে গেছে সেটা থামেনি। বর্ণনা দিতে দিতেই সেই ঝর্ণাধারা বয়ে গেছে আপন গতিতে। . তানহার কাছে সবশুনে কি বলবে আরিফ কিছুই বুঝতে পারছিলো না। কিছু না ভেবে সোজা বাবার কাছে গেলো। আর গিয়ে বললো, . - ‘‘বাবা আমার আগে এ মেয়েটার সম্পর্কে তুমিই বেশি জানো এবং সবই তোমার চোখের সামনে দিয়ে ঘটেছে। মেয়েটার স্বপ্ন ছিলো বড় একজন ডাক্তার হওয়া এবং অসহায় মানুষদের সেবা করা কিন্তু সে স্বপ্ন ভাঙ্গতে দেরি হলো না। আমি চাই ও তার স্বপ্ন পূরণ করুক। ফিরে পাক নতুন ভালোবাসা নতুন একটি ঘর।’’ - ‘‘আরিফ তুমি কি বলতেছো আমি বুঝতে পারছি না।’’ - ‘‘বাবা তোমার ছেলে আমি। তোমার শিক্ষায় শিক্ষিত। তাই তোমার শিক্ষাগুণ থেকে বলছি। মেয়েটাকে আমি আমার জীবনসঙ্গিনী করতে চাই।’’ . জয়নাল সাহেব ভাবতে পারিনি ওনারই মতো হবে ওনার ছেলে। গর্বে ওনার বুক ভরে যাচ্ছে। তাই আর দ্বিমত পোষণ না করে ছেলের কথাতেই সম্মতি জানালেন তিনি। . এদিকে তানহা ফিরে ফেলো একটি নতুন স্বপ্ন, নতুন একটি পরিবার, পেলো তাকে ভালোবাসার মতো একজন মনের মতোই মানুষ। . যৌতুক এমন একটা নাম যা একটি মেয়ের জীবনের সুখ, স্বপ্ন ও আশা সব শেষ করে দেয়। নিভিয়ে দেয় একটি পরিবারের আলোর বাতি। নেমে আনে অন্ধকারের মতো কালো ছাঁয়ার। .


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ যৌতুকের পরিণাম

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now