বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১।
ফাহিমের মেজাজ প্রচন্ড খারাপ আজ সকাল
থেকে। মেজাজ খারাপের অনেকগুলা কারন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কারনটা হলো তার রাগের
কোন মূল্য নাই এ পরিবারে। বাবা-মা কেউই তাকে
মানুষের তালিকায় ধরে না। দশম শ্রেনীতে পড়া
একটা ছেলে কিভাবে “বাচ্চা” হয় ফাহিমের মাথায়
ঢুকে না। এই “বাচ্চা” শব্দটা শুনতে শুনতে তার কান
পঁচে গেছে। ফাহিমের মতে তার পরিবারের মত
“ওর্থলেস” পরিবার দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টা নাই।
এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে
যাওয়া ঢের ভাল।
মুন্না, সৈকত, রাহবাত সবাই যখন তখন হুটহাট তাদের
বাসায় দাওয়াত দিয়ে ফেলে। এজন্য বন্ধুদের
মধ্যে এদের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ফাহিমেরও তো
ইচ্ছা করে বাসায় তার বন্ধুদেরকে ডেকে
আনতে। কিন্তু উপায় নাই। তাদের বাসার টেলিভিশনটা
যে নষ্ট এটা ওরা জেনে গেলে সর্বনাশ। সবাই
জানে ফাহিমের বাসায় ২৮ ইঞ্চি টেলিভিশন। মুন্না
সৈকতরা রবিবার কিংবা সোমবার সকালে গিয়ে ইংলিশ
প্রিমিয়ার লীগ কিংবা স্প্যানিশ লীগের ম্যাচগুলার ধারা
বিবরনী দেয়। ফাহিম সে সময় এমন মুখভঙ্গী
করে যেন এগুলা তার সবই তো দেখা। মাঝে
মাঝে সেও গল্প বলে। বলার সময় রোনালদোর
৩৬ গজ দূর থেকে নেয়া ফ্রি-কিক শটটা সে
যেন সত্যি সত্যি দেখতে পায়। ডেভিড সিলভার
ছয়জনকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে
গোল দেয়া সে রসিয়ে বর্ননা করে। এখনো
বন্ধুদের কাছে ধরা না পড়বার কারন বড় ভাইয়া। প্রতি
রবি-সোমবার ম্যাচের সকল তথ্য সে ফোনে
জানিয়ে দেয় ফাহিমকে। তাই বন্ধুদের থেকে
ফাহিমের বর্ননা থাকে আরো পুংখানুপুংখ।
আজকাল ক্লাস সেভেন-এইটে পড়া “বাচ্চাকাচ্চা”দ
ের কাছেও মোবাইল ফোন আছে অথচ
ফাহিমের কাছে একটা মোবাইল নাই। ফাহিম তার বাবার
মতন এমন পিচ্ছিল চামড়া আর কারো দেখে নাই।
ওদের ক্লাসের রাব্বি নোকিয়া এন সিরিজের
ফোন নিয়ে ক্লাসে আসে। ক্লাসের
সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে বৃষ্টিকে তো সে
এভাবেই প্রায় পটিয়ে ফেলেছে। অথচ ফাহিম
নিশ্চিত যে বৃষ্টি মেয়েটা ফাহিমকে পছন্দ করে।
সে ক্লাসের ফার্স্টবয়। তাকে পছন্দ না করার
কোন কারন নাই। মেয়েটা যেদিন ফোন কিনল,
ফোন নাম্বারটা প্রথমে ফাহিমকেই জানিয়েছিল তার
গনিত বইয়ের ৪২ নম্বর পৃষ্টায় পেন্সিলে লিখে।
ফাহিমের কাছে যে ফোন কখনোই ছিল না তা
নয়। বাবার অর্ধেক ডিসপ্লে নষ্ট হওয়া ফোনটা
সে মাস দুয়েক ব্যবহার করেছে। তখন বৃষ্টির
সাথে দিনে অন্তত চার-পাঁচটা মেসেজ চালাচালি
তো হতোই। ফাহিমের লম্বা মেসেজের
বিপরীতে মেয়েটা এক লাইনের উত্তর দিত।
কিন্তু সে এক লাইনে যে কি যাদু সেটা শুধু ফাহিমই
জানে। দুঃখের বিষয় সে এক লাইনের দু একটা
গুরুত্বপূর্ন শব্দ মাঝে মাঝে বাবার পরিত্যক্ত
ডিসপ্লেহীন সেটে ধরা দিত না। ফাহিম শব্দগুলো
কল্পনা করে বাক্য পরিপূর্ন করে নিত। দিনভর
মিসকল খেলা চলত। স্ক্রল বাটন কাজ করে না
বলে ফোনবুকে ঢোকা যায় না। তাতে সমস্যা
নাই। এগার ডিজিটের, শেষে ৫০ ওয়ালা নাম্বারটা ফাহিম
গড়গড়িয়ে বলতে পারে।
ফাহিমের ফোনটা সম্পূর্নভাবে ডেড হয়ে যায় দুই
সপ্তাহ আগে। বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি খেলা তখন
থেকে বন্ধ। আর এই সুযোগটা রাব্বি নেয়। তার
ফোনের ফাইভ মেগা পিক্সেল ক্যামেরা দিয়ে
সে বৃষ্টির ছবি তুলে দেয়। বৃষ্টি সেই ছবি
ব্লুটুথে নিয়ে নাকি ফেসবুক নামক ওয়েবসাইটে
প্রোফাইল ফটোতে দেয়। এই ফেসবুক
ব্যাপারটা ফাহিম বিশেষ বুঝে না। তার ক্লাসের
অনেকেই দেখে সারাদিন ক্লাসে ফেসবুক
ফেসবুক করতে করতে শহীদ হয়ে যায়। বৃষ্টির
সাথে যোগাযোগ একেবারে নেই তা নয়। ভাইয়া
বাসায় আসার পর ভাইয়ার ফোনে সে চুপিচুপি মাঝে
মাঝে নিজের সিমকার্ড ঢুকিয়ে মেসেজ পাঠায়।
রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা করতে সাহস হয় না। ভাইয়া
প্রচন্ড রাগী। জানতে পারলে ছিড়ে ফেলবে
ফাহিমকে। প্রতিদিনের মেসেজের রিপ্লাই সে
পায় পরেরদিন। ভাইয়া যখন থাকে ঘুমে।
কিন্তু আজকের পর থেকে তো আর সেটাও
সম্ভব না। ফাহিমের মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে বাসা
থেকে পালাতে। বাবা মায়ের এমন নির্লিপ্ততা তার
আর সহ্য হয় না। তারও তো একটা মানসম্মান আছে।
সে আর ক্লাস ফোরে পড়া ছোট ফাহিম নাই।
২।
- হ্যালো শুনতে পারি না তো। কি বল? স্পষ্ট
করে বলো।
- গাধা স্পষ্ট করেই বলছি। শুনতে পারিস না কেন?
কানে সমস্যা?
- কানে সমস্যা না। তোমার কথায় সমস্যা আছে।
হিন্দী সিরিয়ালের নায়িকাদের মত এলিয়েন
ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বল। আমি হোমো স্যাপিয়েন
ভাই। আমার সাথে চলতে হলে আমার ভাষায় কথা
বলতে হবে।
- শোন, তুই তোর ফোনটা ফেলে দে বুঝলি।
দরকার নাই এই ফোনের। ফোনের দোষ
আমার ঘাড়ে চাপে সবসময়। কষ্ট লাগলে আমাকে
দিবি। আমি ২০ টাকা বাসভাড়া দিয়ে মতিঝিলে গিয়ে সিটি
সেন্টারের ছাদে উঠে ৩৭ তলা থেকে
ফেলে দিব।
- তাহলে যোগাযোগ হবে কিভাবে?
- লাইলি মজনুর মত চিঠিতে। ৫ টাকার ডাকটিকিট লাগিয়ে
পাঠিয়ে দিবি।
- তুই জানিস ছোটবেলায় যে আমি ডাকটিকিট
জমাতাম। একটা ছোট খাতায় স্টিকারের পিছে ভাত
দিয়ে আটকে দিতাম স্টিকারের মত। ফেভিকলের
চেয়েও কড়া জোড়। আমার ডাকটিকিট যত আছে
তোকে আজীবন চিঠি পাঠান যাবে বুঝেছিস ?
টেনশন নিস না। যা হোক, এসব বাদ দে। তোর
মেকানিকাল ড্রয়িং এসাইনমেন্ট কতদূর হলো?
ইলেকট্রিক্যালে পড়ে মেকা ড্রয়িং। তোদের
ইঞ্জিনিয়ারিং কি অদ্ভূত ! তোর প্রানপ্রিয় বন্ধু অমিত
কি সাহায্য করল? হ্যালো... ??
ওপাশ থেকে কোন জবাব নাই। ফোনের
ক্রেডিট শেষ হবার কথা না। রনির হিসাবমতে ৩৫
মিনিট কথা বলা যাবে। বড়জোর ৫ মিনিট হয়েছে।
কান থেকে ফোন সরিয়ে দেখে ফোন সুইচ
অফ হয়ে গেছে। এমন হবার কথা না। নিজের
উপার্জনের সাড়ে নয় হাজার টাকা জমিয়ে সে
কিনেছে। যদিও চাইনিজ তবে অপারেটিং সিস্টেম
লেটেস্ট। এন্ড্রয়েড আইসক্রিম স্যান্ডউইচ।
যদিও আরো লেটেস্ট ভার্শন জেলিবিন আসি আসি
করছে বাজারে। সেটা কথা না। কথা হলো ফোনটা
নষ্ট হয়ে গেছে সম্ভবত। চার্জে দিয়েও
ফোনের কোন ভাবান্তর নাই। ওয়ারেন্টি হয়ত
এখনো আছে। এক বছর পূর্ন হয়নি। তবে
ওয়ারেন্টি কার্ডটা সে ঢাকায় হলে রেখে
এসেছে। সুতরাং এই সপ্তাহটা ফোন ছাড়াই চালাতে
হবে।
রনি ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ডিজিটাল যুগে তার ডিজিটাল ভাগ্য খুব বাজে।
ছোটবেলায় প্রান জুসের বোতলে পানি ভরে
বাগান থেকে গোলাপ ছিড়ে পানিতে ডুবিয়ে
“ফুলদানি ফুলদানি” খেলতে খেলতে
টেলিভিশনের উপরে রাখতে গিয়ে পানি ফেলে
দিয়ে টেলিভিশনের আই,সি পুড়ে নষ্ট করে
ফেলে। বাবা সেদিন প্রচন্ড রেগে গিয়ে
ফ্যানের সাথে উলটো করে ঝুলিয়ে পেটাতে
চেয়েছিলেন রনিকে। আম্মা বাঁচিয়েছিলেন।
তারপর অবশ্য টেলিভিশনটা ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু
মাসখানেক পরপরই নষ্ট হয়ে যেত। বাবা একদিন
বিরক্ত হয়ে ঘোষনা দিলেন টেলিভিশন আর ঠিক
করতে দেয়া হবে না দোকানে। নতুন
টেলিভিশনও কেনা হবে না। ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে।
ছয় বছর আগের সে দিনটার পর এ বাড়িতে আর
টেলিভিশন চলেনি। যদিও মোটা মাথার টেলিভিশন
সেটটা এখনো দামি ট্রলির উপর বিষন্ন বদনে
শোভা পায়।
এখন বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে। মেডিকেলে
যেখানে একটু দম ফেলার ফুসরত নাই, রনি
সেখানে ধুমিয়ে পারলে প্রতিটা ম্যাচ ইঞ্জুরি
টাইমসহ মিস দেয় না। তিনমাস হয়ে গেল বাসায় আসা
হয়নি। তাই এই ছুটিতে কোয়ার্টার ফাইনাল দেখার
ইচ্ছাটা মাটিচাপা দিয়ে বাসায় চলে এসেছে। তবে
ফোনের ইন্টারনেটে সে খবর রাখে। তার
প্রিয় দল ব্রাজিলের ইন-ফর্ম প্লে-মেকার
এলানো ইনজুরিতে। কিন্তু ফ্যাবিয়ানো ফর্মে
আছে। আশা করা যায় আজকে ব্রাজিল জিতে
যাবে। প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ড। তেমন কঠিন কিছু
না। ম্যাচটা রিনি আপুর বাসায় গিয়ে রিনি আপু আর উল্লাস
ভাইয়ার সাথে দেখবে কিনা ভাবে রনি। রিনি আপু
কাকাকে (ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার) দেখলে কেমন
আবেগে গলে যায়। উল্লাস ভাইয়া আর রনি দুজনে
সেটা দেখে হেসে বাঁচে না।
৩।
ছোট ছেলেটা সেই যে দুপুরবেলা বকা খাওয়ার
পর থেকে দরজা বন্ধ করেছে, সন্ধ্যা হয়ে
গেল খোলার নাম নেই। নুপূর আজ গরুর মাংস
রেঁধেছেন। এ বাড়িতে খুব বেশি একটা আমিষ
খাওয়া হয়ে ওঠে না। গতকাল মেডিকেল পড়ুয়া বড়
ছেলে বাসায় এসেছে। দিন তিন চারেক থেকে
চলে যাবে। রবিউল কষাইয়ের কাছ থেকে তাই
অর্ধেক বাকি তে দেড় কেজি মাংস আনিয়েছেন।
ফাহিম হতচ্ছাড়াটাকে তিনি কোনভাবেই বুঝাতে
পারেন না পরিবারের অবস্থা। এই মাংস যে রনি চলে
গেলে আর জুটবে না এটা ছোট ছেলেকে
কে বোঝাবে? এই ছেলেটা এত বেয়াদব
হয়েছে যে বাবার কথাও শুনে না। লোকটা
“আব্বুজি আব্বুজি” করে এত গেট নক করল তবুও
খুলল না।
ছোট ছেলের মন খারাপের কারন বাড়িতে একটা
টেলিভিশন নাই। আজকে বিশ্বকাপে ফুটবল না
ক্রিকেট কি যেন একটা খেলা আছে। সেটা
দেখতে পারবেনা বলে এত রাগ। আবার তার
মোবাইল ফোনও চাই। নুপূর কোনভাবেই
ছেলের হাতে এখন মোবাইল দেয়ার পক্ষপাতী
না। ঠিক যে এই বয়সের সবার হাতেই এখন
মোবাইল থাকে কিন্তু এতে করে বাচ্চাগুলো
বখে যাচ্ছে। তার বড় ছেলে এরকম ছিল না।
অনেক লক্ষী। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ
করে ছোট মামার ব্যবহার করা ফোনটা দিয়ে
তিনমাস চালিয়েছে। তারপর মেডিকেলে চান্স
পেয়ে নিজেই টিউশনি করিয়ে একটা মোবাইল
কিনেছে। ছেলেটা যখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পায়
তখন পরিবারে স্বচ্ছলতা ছিল। মাহতাবের ব্যবসা
তুঙ্গে ছিল। সে পরদিনই ছেলেকে কম্পিউটার
কিনে দিয়েছিলেন। সেটাও নষ্ট হয়েছে বহুবার।
যে হারে মোটরসাইকেল গেম খেলত হওয়াটাই
স্বাভাবিক। সারতে নাকি দুই-তিন হাজার টাকা লাগে।
হিসাবের পরিবারে এটা কয়েকদিনের খাবার খরচ।
তাই ওটা আর ঠিক করা হয়নি। ওভাবেই পড়ে থেকে
ধুলো জমে গেছে। মাঝে মাঝে তিনি রনিকে
বলেন, “হ্যারে রনি, কম্পিউটারটা তো একটু ঠিক
করালেও পারিস। টাকা যে সবসময় থাকে না তা তো
না।“ রনি পেন্টিয়াম-কোর কি সব দাঁতভাঙ্গা শব্দ
বলে মাথায় ঢুকে না। মূলকথা এই যে “এই
কম্পিউটার এখন আর চলে না।“
আসলে ওদেরও দোষ না। দোষটা তার
নিজেদেরই। অভাবের সংসারে তারাই
সন্তানদেরকে প্রয়োজনমত কিছু দিতে পারেন
না। মনে পড়ে অনেক বছর আগে রনিটা যখন
ছোট ছিল, নুপূরের এক বান্ধবীর বাসায়
বেড়াতে গিয়ে ফ্রিজের পানি খাবার জন্য কি
আদিখ্যেতা শুরু করেছিল ছেলেটা। বান্ধবীর
অগোচরে কষে এক থাপ্পড় দিয়েছিলেন নুপূর
ছেলেকে। বড় ছেলেটার আদব ছোটবেলা
থেকেই বেশি। সে পরের বাড়িতে টু শব্দটা
করেনি থাপ্পড় খেয়ে। বান্ধবী যখন ফ্রিজ
থেকে গায়ে বিন্দু বিন্দু জলীয় বাষ্প জমে
যাওয়া শীতল কাঁচের বোতল এনে টেবিলের
উপর রাখল, নুপূরেরও তৃষ্ণানালীতে শিহরন
জেগেছিল। প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছিল ঢকঢক করে
পুরা বোতল শেষ করে দিতে। ফ্রিজের পানি
খাবার সৌভাগ্য প্রতিদিন হয় না।
সেদিন নিজের কাছে প্রচন্ড ছোট হয়ে
গিয়েছিলেন। বাসায় ফিরে ছোট রনিকে বুকে
জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিলেন। রনিটা
ছোটবেলা থেকেই কেমন জানি বড় বড়। সে
চোখের পানি কচি হাতে মুছে দিয়ে বলেছিল,
“মামনি, তাঁদেনা।“
৪।
মাহতাব উদ্দিন তার পরিবারের সাথে বসে রাতের
খাবার খাচ্ছেন। অন্যদিন খাবার টেবিলে অনেক কথা
হয়। আজ হচ্ছে না। পরিস্থিতি আজ তিনি গম্ভীর
রেখেছেন। সংসার চালাতে গেলে এরকম
গাম্ভীর্য মাঝে মাঝে রাখা দরকার। ছোট
ছেলে ক্ষুধা না সামলাতে পেরে বেরিয়ে
এসেছে। এখন গোগ্রাসে গরুর মাংস খাচ্ছে।
মাহতাব সাহেব গোগ্রাসে খেতে পারেন না।
নুপূরের হাতের সুস্বাদু অমৃত কংকরের মত লাগে।
মাংসের টাকা সময়মত শোধ না করায় একবার পথে
মৃদু অপদস্ত করেছিল রবিউল কসাই। বাকির মাংস গলা
দিয়ে নামে না। ভাগ্যিস রান্নাটা নুপূরের।
নুপূর মেয়েটা আসলেই একজন সাক্ষাত লক্ষী।
এই মেয়েটা সংসারে না থাকলে মাহতাব সাহেবের
এতদিনে আত্মহত্যা করা লাগত। পরিবারের সকল
অভাব এই মেয়ে কিভাবে যেন কৌশলে ঢেকে
ফেলে যাদু দিয়ে। অভাব থেকেও অনুভূত হয় না।
অনেকদিন আগে বাড়িওয়ালা রহমত সাহেবের
ফ্রিজে মাছ রাখতে গিয়ে রহমত সাহেবের
স্ত্রীর কাছে চরম অপমানিত হয়েছিল নুপূর। রহমত
সাহেবের স্ত্রী বলেছিলেন, “ফ্রিজের
অর্ধেক জায়গা তো ভরে গেছে আপনাদের
জিনিসে। আমাদের পরিবারের তো জিনিসপত্র
ফ্রিজে রাখতে হয় । নাকি সব আপনারাই দখল
করবেন? বলেন দিয়ে দিই ফ্রিজটা। আপনার ঘরে
নিয়ে গিয়েই রাখেন।“
নুপূর ২২ বছরের বিবাহিত জীবনে মাহতাব
সাহেবের সাথে উচু গলায় কথা বলেছে শুধু
সেদিন। অনেক কথা বলে বাবার বাড়িতে চলে যায়।
মাহতাব সাহেবের প্রথমে খুব রাগ হয়েছিল। ইচ্ছা
হয়েছিল নুপূরকে থাপ্পড় লাগিয়ে দিতে। এই
মেয়েটার হাত একটু জোরে চেপে ধরলে
গোলাপী বর্ন হয়ে যায়। তাকে মারার স্পর্ধা তিনি
করেননি। তবে রাগ উঠেছিল। সামর্থ্য থাকলে
তো তিনি ফ্রিজ কিনতেনই। এটা নুপূর বুঝবে না?
পরে তার রাগ কেটে গিয়েছিল। খুব ইচ্ছা
করেছিল নুপূরের বাবার বাড়িয়ে গিয়ে হাতজোড়
করে নুপূরকে নিয়ে আসতে। দুই সপ্তাহ এই
মেয়েকে ছাড়া তার থাকা সম্ভব না। সাথে ছিল
দেড় বছরের ফাহিম। ফাহিম বাবার বুকের উপর ছাড়া
ঘুমাত না। ফাহিমকে ছাড়া বুক ফাঁকা লাগত। যাওয়া হয় নি।
মাহতাব উদ্দিনের মত লোকেদের অনেক
আবেগ লুকাতে জানতে হয়।
বাংলা সিনেমার শেষদৃশ্যে পুলিশ যেমন চারিদিক
থেকে শত্রুকে ঘিরে ফেলে মাইক বাজায়,
রাতে খাবার সময় মাহতাব সাহেবের মস্তিষ্কে
সেরকম মাইক বাজায় খরচের হিসাব। দুই ছেলের
পড়ালেখার খরচের হিসাব, বাড়িভাড়ার হিসাব, ধারের
টাকার হিসাব। তিনমাসের বাড়িভাড়া বাকি। বাড়িওয়ালা রহমত
সাহেব দেখতে যতটা দেখায়, লোক ততটা খারাপ
না। চার-পাঁচমাসের বকেয়া বাড়িভাড়াও সয়ে নেন।
কিন্তু মাঝে মাঝেই খারাপ সময় যায়। এখন যেমন
যাচ্ছে। রাতে বাসায় ফেরা সময় বাড়ির সামনে অন্য
ভাড়াটিয়াদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে ভাড়া চাইলেন।
ব্যবসাটা চাঙ্গা ছিল একসময় খুব। টেলিভিশন
কিনেছিলেন সেই ৮৫ সালে। রাতের বেলা বন্ধুরা
তার বাসায় দলধরে টিভি দেখতে আসত। শহরে
হাতে গোনা ধনীদের একজন ছিলেন তখন।
ঠিকাদারিতে ছিলেন শহরের স্তম্ভ। আর্মি অফিসাররা
পর্যন্ত খাতির করে চলত। সময় পেরোতে
লাগল। দূর্নীতি বাড়তে থাকল। সহকারী ঠিকাদাররা
ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদামত সময়ের সাথে সাথে
হালনাগাদ করে নিজেদের বদলে নিলেন। সকলে
জুতসই রাজনৈতিক পরিচয় বেছে নিলেন। মাহতাব
উদ্দিন থেকে গেলেন ৮৫ তে। কালের
আবর্তনে তার কাছে ঠিকাদারি শেখা জুনিয়র
ছেলেটা একদিন সংসদ সদস্যও হয়ে গেছে
এখন। রাজনৈতিক মারপ্যাচে আবার কখনো বা
পার্টনারদের প্রতারনার শিকার হয়ে সহজ সরল মাহতাব
চলে গেছেন তলানিতে। আজকাল ব্যবসা নাই
বললেই চলে। মোবাইল একটা কেনা খুব দরকার।
মোবাইল ছাড়া ব্যবসা প্রায় অচল আজকের যুগে।
মাংসের এক টুকরো নিজের প্লেট থেকে
ছোট ছেলের প্লেটে তুলে দিতে
যাচ্ছিলেন। এমন সময় চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।
লোডশেডিং। প্রচন্ড গরমের সময় চলছে। নুপূর
মোমবাতি ধরাতে গিয়ে দেখেন পাশে সব
বাড়িতে বিদ্যুত আছে। মোমবাতি ধরিয়ে ফিরে
এলেন টেবিলে। মাহতাব উদ্দিনকে জিজ্ঞাসা
করলেন,
“আজকে বিদ্যুতের বিল জমা দেয়ার শেষ তারিখ
ছিল। দিয়েছিলে?”
মাহতাব উদ্দিন কোন জবাব দেন না।
৫।
নিজেদের ঘরের সাথে বারান্দাটায় পা মেলে
বসে আছে রনি আর ফাহিম। দোতলায় সাব্বির আর
তার মায়ের মধ্যে সিরিয়াল নাকি ফুটবল এই
উচ্চস্বরের বাকবিতন্ড রাতের নিরবতা চিরে
দিচ্ছে। খানিক ভাংচুরের শব্দও পাওয়া যায়।
-“ আচ্ছা ভাইয়া, আমি কি আসলেই এত খারাপ? সবাই
বলে আমি নাকি কিছু বুঝি না। আমি কি রাহবাতের মত
“কল অফ ডিউটি” কিংবা “ফিফা” এসব খেলতে চাই
বলো? সবাই তো এখন এগুলা খেলে। আর আমি
তো তোমাকেও কখনো বলি নাই ফেসবুকে
একটা একাউন্ট খুলে দিতে। আমাদের বন্ধুদের
সবার একাউন্ট আছে। ওরা সবাই অনেক মজা করে
ফেসবুকে। আমি কি কখনো ফেসবুক চালাতে চাই
বলো?”
- না তো। চাসনা।
- ভাইয়া তোমার একাউন্ট আছে ফেসবুকে?
- নাহ নাই।
-তুমি একাউন্ট খুলতে পারো না তাহলে, না?
- একাউন্ট খুলতে পারি।
- আচ্ছা ভাইয়া, ঢাকা ফিরে মোবাইল ঠিক করে
আমাকে একাউন্ট খুলে দিবা একটা?
-তুই কিভাবে চালাবি?
-সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে চালাব প্রতি সপ্তাহে
একবার। কত বন্ধু থাকে হারিয়ে যায়, তাদের নাকি
ফেসবুকে খুঁজে পাওয়া যায়।
- কোন বন্ধুকে খুঁজবি? বৃষ্টি বন্ধু?
ফাহিম হঠাৎ থতমত খেয়ে যায়। আমতা আমতা করে
কিছুক্ষন স্থির দাঁড়িয়ে থেকে “ভাইয়া যাই, ঘুমাব”
বলে প্রায় দৌড়ে পালায়। রনি মনে মনে হাসে। তার
ছোটভাই তাকে জমের মত ভয় পায়। আবার এটাও
জানে যে সবচেয়ে আব্দারের জায়গা এটাই।
এন্ড্রয়েডে যে মেসেজ থ্রেড সিম চেঞ্জ
করলেও পার্মানেন্ট থাকে এটা তার পড়ুয়া
বোকাসোকা ভাইয়ের জানা নাই। মেসেজগুলাও ওর
মতই বোকাসোকা। ছেলেটা চঞ্চল এবং বোকা।
হাল্কা একটু ব্রিফিং দিতে হবে একদিন। কোন ভুল
যাতে না করে। চেপে ধরা যাবে না, কারন বয়সটাই
ভাল লাগার। কোন মেয়েকে ভাল না লাগাই বরং
অস্বাভাবিক।
বোকারা ঘুমায় তাড়াতাড়ি। রনির এসে দেখে ফাহিম
ঘুমিয়ে গেছে। এখন আর ঘুমের মধ্যে বুড়ো
আঙ্গুল মুখে পুরে দেয় না। ক্লাস এইট পর্যন্তও
দিত। রনি ঘুমের ভিতর হাত টেনে বের করে
দিলে আবার মুখে পুরে ফেলত। খুব তাড়াতাড়ি কি
বড় হয়ে গেল হামাগুড়ি দিয়ে সারাদিন মুখে “ নিনি
নিনি নিনি” সুরে গান গাওয়া ফাহিম? এখন সে বৃষ্টি
নামের এক মেয়েকেও নাকি পছন্দ করে !
আবার হাসি পায় রনির।
এসব ভাবতে গিয়ে নিজের প্রনয়িনীর কথা মনে
পড়ে রনির। এই মেয়েটা বিরাট ঝামেলা। এর সাথে
কখনো কোন গ্যাঞ্জাম বাঁধিয়ে সাপ্তাহিক ছুটি
বানিয়ে নিয়ে আরামসে শফিকের গন কম্পিউটারে
বসে ফিফা খেলা যায় না রাতভর। গ্যাঞ্জাম বাঁধলে
এই মেয়ে প্রতিবেলায় কেজি দশেক করে
ওজন হারায়। রনির ধারনা কোন একবার ভুল করে
ঝগড়া দুইদিন স্থায়ী হলে মেয়ে হলোম্যানের
মত অদৃশ্য হয়ে যাবে। মেয়েটা সারাদিন কি অবস্থায়
আছে কে জানে। ফোনের ঘটনা ওর বোঝার
কথা। বুঝেছে কি? নাকি চিন্তা করছে? রাতেরবেলা
অন্তত কিছুক্ষন কথা না বললে ঘুম আসে না।
যান্ত্রিক আলোবাতাসহীন ঘরে হাতঘড়ির রেডিয়াম
আলো জানান দেয় রাত দুইটা। রনি শেষ
ফোনালাপের কথা ভাবে। আইডিয়াটা খারাপ না। উঠে
বসে মোমবাতিটা জ্বালায়। ব্যাগ থেকে A4
সাইজের অফসেট পেপার বের করে। ক্ষয়িষ্ণু
মোমের লালাভ আলোয় গোটা গোটা অক্ষরে
চিঠি লিখে,
“প্রিয় নীলাঞ্জনা”
৬।
তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে ঘুমন্ত দুই
ছেলের কপালে চুমু দেন নুপূর। ছেলেদের
সামনে কখনো নরম হওয়া হয়ে ওঠে না। এই
কাজটা তাই প্রতিদিন তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে
করেন। আচ্ছা তার ছেলেরা কি টের পায়?
আজকে জ্যোৎস্না রাত। মাহতাব উদ্দিন বারান্দায়
মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে আছেন। নুপূর
পাশে বসে তালপাখা দিয়ে বাতাস করছে। এই
মেয়েটাকে তিনি যখন বিয়ে করেন, মেয়েটার
বয়স ছিল ১৭ বছর। কিশোরীভাব তখনো কাটেনি।
বিয়ের হয়ে যাবার পর গাড়িতে উঠতে চাচ্ছিল না।
শক্তসমর্থ মাহতাব পুরা বিয়ের ব্যাপারে চুপচাপ
ছিলেন। হঠাৎ মেয়ের এই গোয়ার্তুমিতে ভয়
পেয়ে বাড়িভর্তি দুইপক্ষের আত্মীয় স্বজনের
সামনে পাখির পালকের ন্যায় হালকা লালরঙ্গা নুপূরকে
কোলে তুলে মাইক্রোবাসে উঠে পড়লেন।
সেই নুপুর, যে পুরা বাসর রাত জুড়ে মাহতাবের
পিঠে লাখখানেক কিল মেরে কাঁদতে কাঁদতে
যমুনা বইয়ে দিয়ে বলেছিল “তুই আমাকে আব্বা-
আম্মার কাছ থেকে চুরি করে আনলি কেন?”
রাত বাড়ছে। জ্যোৎস্না যেন অপার্থিব সব রুপ
নিয়ে বারান্দায় আছড়ে পড়ছে। বাইরের আকাশ,
ঝিঁঝিঁপোকার অনর্গল আওয়াজ, নিশিপক্ষীর হঠাৎ
ডেকে ওঠা, মাঝে মাঝে মৃদু বাতাসে অদূরে
কোন গাছে তালপাতায় ঘষাঘষি দিয়ে যাওয়া ঘোরলাগা
শব্দে মাহতাবউদ্দিনের চোখ বুজে আসছে।
সময় বিভ্রম হয়। মনে পড়ে সত্তরের দশকে
উত্তরবঙ্গের ছোট্ট কোন এক গ্রামের
টিনের চালার মাটির ঘরের উঠোনের কথা। যে
গ্রামে বিদ্যুত ছিল না। জ্যোষ্ঠ মাসের মাংসগলা
গরমের রাতে মা ঘন্টার পর ঘন্টা অনর্গল তালপাখায়
বাতাস করে যেতেন। সে রাতে সোনার কাঠি-
রুপোর কাঠি ওলট পালট হয়ে রুপকথার রাজকন্যার
ঘুম ভাংত, রাজকুমার সমুদ্রের মাঝখান হতে
বাক্সবন্দী প্রানভোমরা খুঁজে নিয়ে হত্যা করত
ভয়ংকর দৈত্যকে। রুপকথা শেষ হত। কত রাত ভোর
হত। মায়াময় হাতে তালপাখা চলত অবিরাম-অবিরত।
বাতাসে ঘুমের রাজ্যে চলে যেত শিশু মাহতাব।
সলতে নাবিয়ে দেয়া হারিকেনের শিখা উঠোন
কোণে জ্বলত মিটমিট করে।
নুপূরের চোখ ঘুমে টেনে আসছে। তালপাখায়
হাত মাঝে মাঝে শিথিল হয়ে আসছে ঘুমের
ঘোরে। মাহতাব উদ্দিন রাতের শেষ প্রহরে
কোন স্বপ্ন দেখে মৃদু কেঁদে ওঠেন “ও
মা...মা, মা গো...“। নুপূর আচল দিয়ে সযতনে
মাহতাবের চোখ মুছে দেন।
ঝিঁঝিঁপোকাদের ডাক ভারি হয়। সেই সাথে ভারী
হয় ওদের গাঢ় শান্তিঘুমের নিঃশ্বাস। জ্যোৎস্না
আলোয় ভেসে যায় মাঠঘাট বারান্দা। মায়াময় হাতে
তালপাখা আবার চলে। অবিরাম-অবিরত। টাংস্টেন
ফিলামেন্টের বাতিটা কিংবা স্থবির ধাতব তেপায়া
ইলেকট্রিক ফ্যানটা অপরাধীর মুখ করে দাঁড়িয়ে
থাকে।
- নাজমুস সাকিব অনিক
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now