বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তখন অল্প কয়েক বছর হল ভারত স্বাধীন
হয়েছে। আমার দাদু দূর বীরভূমের রামপুরহাট
শহরে স্কুলে মাস্টারি করেন। মেজোমামার – নাম
দেওয়া হল অরুণ – বয়স তখন মাত্রই মাসকয়েক।
সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে দিদা কলকাতায় বাপের বাড়ি
আছেন। বাসাবাড়িটা উত্তর কলকাতায়, শিয়ালদা’তে।
শিয়ালদা হল কলকাতার প্রাচীন বসতি অঞ্চল।
পুরোনো কলকাতা মানেই অসংখ্য গলি আর তার
ধারে পুরোনো পুরোনো জীর্ণদশার বাড়ি।
এই বাড়িটা অবশ্য তখন খুব পুরোনো হয়ে যায়নি।
দিদার বাবা কলকাতায় এসে চাকরির রোজগারে
আস্তে আস্তে এই বাড়িটা তৈরী করেছিলেন।
বাড়ির ছাদে উঠে বেশ শহর দেখা যেত।
গলিটার নাম ডিক্সন লেন। সরু, আঁকাবাঁকা গলি দুপাশে
দুই-তিনতলা উঁচু উঁচু বাড়ি নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে
চলে যায়। অল্প দূরেই সার্পেনটাইন লেন। নাম
শুনেই এধরনের গলির চরিত্র বুঝে নেওয়া যায়।
সব বাড়িতেই একটুখানি রোয়াক। আর বাড়িগুলো
খুবই গায়ে-গায়ে। যে একহাত ফাঁকটুকু না দিলেই
নয়, কেবল সেটুকুই দূরত্ব পরষ্পরের মধ্যে।
এই অঞ্চলটা হিন্দু পাড়া। একটু দূরেই রাজাবাজার হল
মহমেডান এরিয়া। আগে এরকমটা ছিল না। কম-বেশি
হলেও সব পাড়াতেই হিন্দু-মুসলমান বাসা করে থাকত।
ওই দাঙ্গাটা সব কিছু পালটে দিয়ে গেছে।
প্রতিবেশী এক ঘর মুসলমানকে দিদার বাবা প্রথম
দিন বাড়ির কোনায় লুকিয়ে রেখে দ্বিতীয় দিন
রাত্রে রাজাবাজার যাওয়ার একটা নিরাপদ গলি ধরিয়ে
দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম রাত্রেই যেন
কীভাবে খোঁজ পেয়ে তাদের কাটতে বাসার
দরজায় একদল লোক এসেছিল। তবে নিষ্ঠাবান
ব্রাহ্মণ যে তাদের মুখের উপর মিথ্যা বলবেন
এতটা অবিশ্বাস তারা করেনি। দোতলার ঘরগুলো না
খুঁজেই তারা চলে গিয়েছিল। সেই থেকে
সাফসুতরো ডিক্সন লেন হয়ে রয়েছে হিন্দু
পাড়া।
সেই সময় একদিন গরমকালের রাত্রিবেলা। বাড়ির
সবার খাওয়া হয়ে গেছে, বাড়ির মেয়েরাও
খেয়ে রান্নাঘর পরিষ্কার করে শুয়ে পড়েছে।
সেই আমলের সব বাড়ির মতই মাঝখানে বড়
উঠোন, লাগোয়া কলতলা আর রান্নাঘর। উঠোনার
এক পাশ দিয়ে টানা বারান্দা। তারই শেষে, একতলারই
কোনার একটা ঘরে দিদা তাঁর ছেলেকে নিয়ে
শুয়েছেন। ছেলেটার খুব শরীর খারাপ।
টাইফয়েড। ডাক্তাররাও ভরসা দিতে পারছেন না।
রাতটাই কাটে কি কাটে না। রোগীর জন্য তাই
পূর্বদিকের একটা ঘর দেওয়া হয়েছে, তাতে
দুটো জানলা। জানলার পরে ওই হাতখানেক ফাঁক, তার
পরেই পাশের বাড়ি। সে বাড়ির উল্টোদিকের
ঘরটাতেও অবশ্য এক মরণাপন্ন বৃদ্ধা থাকেন। তবে
ওই বাড়িটা একতলা, তাই খানিক হাওয়া-বাতাস আসে।
সেদিন অবশ্য একটুও হাওয়া নেই। গুমোট গরম।
দিদা জেগে বসে অসুস্থ শিশুকে হাতপাখা দিয়ে
হাওয়া করছেন। এমনিতেই বা এমন পরিস্থতিতে কি
মায়ের ঘুম আসে। সেদিন আবার পূর্ণিমা। মাঝরাত্তির,
চাঁদও তাই আকাশে প্রায় মাঝামাঝি। একতলার ছাদ
ছাড়িয়ে তাই জানলা দিয়ে খানিকটা আলো আসছে।
জানলায় লম্বা লম্বা লোহার গরাদ, সিমেন্টের
মেঝেতে তাদের সমান্তরাল ছায়া। জানলার বাইরে
কিন্তু চোখ চলে না, পাশের বাড়ির দেওয়ালে
ছায়ায় নিরেট অন্ধকার। রাত অনেক হল। অন্যান্য
ঘরেতে বাড়ির সবাই হাতপাখা করতে করতে ক্লান্ত
হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
দিদা একটু করে পাখা করছেন, আর একটু করে
চোখ ঢুলে আসছে। জানলা দিয়ে তাই এমনিই
বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। এমন
সময় মনে হল, জানলার বাইরে যেন কী নড়ে।
তাকিয়ে মনে হল, লোহার যেন একটা কিছু।
বাতাসে যেন ভেসে বেড়াচ্ছে। তারপর সেটা
জানলার বেশ কাছে চলে এল। মনে হল লোহার
একটা বড়’মতন চকচকে গোলক। চাঁদের
আলোয় বেশ দেখা যাচ্ছে। যেন
উদ্দেশ্যহীন ভাবে গলিটায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
দিদার মনে হল, পাড়ার কোনো দুষ্টু ছেলের
কাজ হয়ত। কাছে গিয়ে এক ধমক দেওয়ার জন্য
বিছানা থেকে নামতে গেলেন।
এমন সময় সেটা জানলা গলিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
জানলার সামনেই চাঁদের আলোয় সেটা ভেসে
বেড়াতে লাগল, যেন ঘরের কোন দিকে যাবে
চিন্তা করছে। কাছ থেকে চাঁদের আলোয় দেখা
গেল, বেশ ফুটখানেকের বড় একটা চকচকে
ধাতব গোলক। গোলকেতে উঁচুনিচু কিছু বোঝা
যায় না, তবে দিদার মনে হল, সেটা যেন একটা বড়
মাথার মত লাগে। একটু ভয় পেয়ে পিছিয়ে
এলেন।
সেই সময় সেটা হঠাৎই ঘরের মাঝখানে খাটের
উপর যেখানে মামাকে শোয়ানো আছে
সেখানে ভেসে চলে এল। মামার মাথার উপর
এসে এক পলকে স্থির হয়ে রইল। জানলার
সামনেটুকু ছাড়া ঘরের বাকিটা অন্ধকার, আবছায়ায়
অবয়বটুকু দেখা যায় মাত্র। যেটাকে একটা কাটা মাথার
মত মনে হয়েছে, তাকে হঠাৎ ছেলের মাথার
উপর চলে আসতে দেখে দিদা খুব ভয় পেয়ে
গেলেন। দারুণ ভয়। হাত থেকে পাখাটা পড়ে
গেল। চিৎকার করে মা’কে ডেকে উঠলেন।
এই আওয়াজে খুব দ্রুতই জিনিসটা অন্য জানলাটা দিয়ে
ভেসে বেরিয়ে গেল। জানলার বাইরে অন্য
বাড়ির ছায়ায় আর কিছু দেখা যায় না, তবুও মনে হল
সেটা যেন সোজা উলটো দিকের ঘরটার
জানলাতেই ঢুকে পড়ল। ততক্ষণে বাড়ির সবাই
ধড়ফড় করে জেগে উঠেছে। পাশের ঘরেই
থাকেন দিদার এক ভাই, তার বউই এই আকুল চিৎকার
শুনে প্রথমে ছুটে ঘরে ঢুকলেন। তখন অবশ্য
আশপাশে আর কিছুরই চিহ্নমাত্র নেই। সবাই
বোঝাল, এ কেবল চোখের ভুল। বাকি রাতটা
দুজনে দিদার মায়ের ঘরে গিয়ে শুলেন।
সকাল হতেই দেখা গেল, মামার অসুখ প্রায়
অনেকটাই সুস্থ। একজন বড় ডাক্তারকে খবর
দেওয়া হয়েছিল, এসে তাঁর বিশেষ কিছুই করার
থাকল না। অনেকে দিদাকে প্রবোধ দিতে লাগল,
এইরকম উদ্বেগের সময়ে ওটা নিশ্চয়ই মনের
ভুল ছিল, গরাদওয়ালা জানলা দিয়ে কি অত বড় একটা
গোলক কখনও ঢুকতে পারে? না একটা লোহার
গোলক ওভাবে ভেসে বেড়াতে পারে?
এর মধ্যে পাশের বাড়ি থেকে এল খবর, কাল
মাঝরাত্রেই ওই বৃদ্ধা ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন।
তখন এক বয়স্কা মহিলার কথা সবাই সমর্থন করলেন –
কাল রাত্রে ওটা তবে ছিল যমদূত – বুড়িকে নিতে
এসে অসুস্থ দেখে ভুল করে অরুণের কাছে
চলে এসেছিল। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে...
(সংগৃহীত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now