বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
জলের কান্না
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সকালবেলার সূর্যটা তখনও পুরোপুরি উঠেনি। তবু রূপপুর গ্রামের মাঠের ওপারে হালকা সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে শিশিরের ঘ্রাণ, কিন্তু সে ঘ্রাণে এখন আর তেমন আনন্দ পায় না কেউ। কারণ, এই গ্রামের মানুষদের সবচেয়ে বড় দুঃখ—পানীয় জল। যে জলের জন্য প্রতিদিন শুরু হয় এক যুদ্ধ, এক অন্তহীন দৌড়।
রূপপুরের মাঝামাঝি একটা টিউবওয়েল ছিল—একসময় স্বচ্ছ, ঠান্ডা, মিষ্টি জল দিত। গ্রামের বাচ্চারা খেলা শেষে সেখানে ভিড় জমাত, হাঁসগুলো তার পাশে ঠোঁট ডুবিয়ে জল খেত। কিন্তু এখন সেই টিউবওয়েলটার মুখে তালা ঝুলে আছে। কেউ আর সেখানে জল নেয় না। বলা হয়, সেই জলে আছে আর্সেনিক—অদৃশ্য এক বিষ, যা ধীরে ধীরে মেরে ফেলে মানুষকে। গ্রামের কণ্ঠে এখন একটাই ভয়—“এই জলে মৃত্যু আছে।”
রূপপুরের বৃদ্ধ জলিল মিয়া প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে বের হন। পায়ের নিচে ফাটা মাটির খসখস শব্দে তাঁর জীবনের গল্প যেন শোনা যায়। একসময় তিনি ছিলেন ধানচাষি, ফসল ফলাতেন হাসিমুখে। কিন্তু এখন তাঁর মুখে এক গভীর হাহাকার। “মাটি শুকায়ে গেছে, কূপ শুকায়ে গেছে, মানুষও শুকায়া যাইতেছে,” তিনি বলেন। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলায় তাঁর ফসলি জমি এখন ফেটে গেছে, আর নিচের জল চলে গেছে অগম্য গভীরে।
বছর দুয়েক আগেও পাশের নদীটি ছিল প্রাণের সঞ্চার। গ্রীষ্মে শিশুরা সাঁতার কাটত, নারীরা কাপড় ধুত, আর জেলেরা গান গাইতে গাইতে জাল ফেলত। এখন নদীটির জল নোনতা। দূর থেকে দেখলে এখনো চকচক করে, কিন্তু ঠোঁটে ছোঁয়ামাত্র বোঝা যায়—এটা সমুদ্রের জল। সমুদ্রের অনুপ্রবেশে পুরো অঞ্চলের মিষ্টি জল হারিয়ে গেছে। একদিন যেই নদী দিত জীবন, এখন সেই নদীই মৃত্যু এনে দিয়েছে ফসলের জন্য।
গ্রামের পাশেই একটা ছোট স্কুল আছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মফিজ স্যার প্রতিদিন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের বলেন, “জল বাঁচাও, জীবন বাঁচাও।” কিন্তু বাচ্চারা জানে না, এই বাঁচানোর কথাটাই কত কঠিন বাস্তবতা। স্কুলের টয়লেটে জল নেই, হাত ধোওয়ার ট্যাংকে শ্যাওলা জমে গেছে। বৃষ্টির দিনে ছেলেরা বোতলে বৃষ্টি জমায়—সেটাই পরে খাওয়ার কাজে লাগে।
গ্রামের ডাক্তার সুলতানা আপা প্রায়ই বলেন, “আমাদের রোগীরা শুধু গরিব বলে অসুস্থ না, ওরা অসুস্থ কারণ তারা নোংরা জল খায়।” ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, চর্মরোগ—সব যেন এখন রূপপুরের প্রতিদিনের অতিথি। অনেক মা তাদের সন্তানকে দুধের সঙ্গে কলসির জল মিশিয়ে খাওয়ান, কারণ “আর কোনো উপায় নাই।” কিন্তু সেই জলই অনেক সময় শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেয়।
রূপপুরের একমাত্র ধনী মানুষ রশিদ সাহেব তাঁর বাড়িতে বড় একটা গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। চারদিক দেয়াল দিয়ে ঘেরা। গ্রামের লোকজন সেখানে জল নিতে আসে, কিন্তু প্রহরীরা বাধা দেয়। “এটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি,” বলা হয়। ফলে, গ্রামের দরিদ্র মানুষদের জল আনতে হয় প্রায় দুই মাইল দূরের বাজারপাড়ার ট্যাংক থেকে। অনেকে হাঁটতে হাঁটতে রোদে মাথা ঘুরে পড়ে যায়, কিন্তু বোতলটা তারা ছাড়ে না—কারণ তাতে আছে জীবন।
তবু আশা ফুরোয় না। একদিন গ্রামের কয়েকজন তরুণ—রুবেল, হেমন্ত, লায়লা আর মুন্না—একটা উদ্যোগ নেয়। তারা বলে, “আমরা বৃষ্টির জল জমাবো।” তারা স্কুলের ছাদে পুরোনো টিন আর ড্রাম দিয়ে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। প্রথমদিকে অনেকে হাসাহাসি করেছিল—“বৃষ্টি তো বছরে দুই-তিন মাস আসে, তাতেই কি হবে?” কিন্তু রুবেলরা হাল ছাড়েনি। সেই বৃষ্টির জল তারা ছেঁকে পান করার ব্যবস্থা করে। ধীরে ধীরে অন্যরাও আগ্রহী হয়।
গ্রামের প্রান্তে নদীর ধারে এখন একটা ছোট পরিশোধনাগার তৈরি হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের আওতায় এটি বানানো হচ্ছে, তবে আসলে উদ্যোগটা এসেছে গ্রামের লোকজনেরই। মফিজ স্যার বলেন, “সমস্যা আমাদের, সমাধানও আমাদের হাতেই।” তাঁরা নিজেরা শ্রম দিয়ে খাল পরিষ্কার করছেন, নোংরা ড্রেনগুলো ঢেকে ফেলছেন।
তবু সব কিছু এত সহজ নয়। পাশের শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিষাক্ত বর্জ্য এসে পড়ে খালে। মাছ মরে ভেসে ওঠে। কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু তারপর হুমকি পেয়েছে। এক রাতে রুবেলের বাড়িতে আগুনও লেগেছিল। তবে রুবেল বলেছিল, “ভয় পাবো না। জলকে বাঁচাতে হলে আগুনের ভয় করা চলে না।”
রূপপুর এখন এক শিক্ষার নাম। সেখানে মানুষ শিখছে—জল মানে শুধু তরল নয়, জল মানে জীবন। সেখানে শিখছে, একটি পাইপের ছিদ্রও হতে পারে দুর্ভিক্ষের কারণ। তারা শিখছে, একটি বৃষ্টির ফোঁটাও সঞ্চয় করা যায়, যদি মন চায়।
বছর ঘুরে আবার বর্ষা আসে। মেঘলা আকাশ, ঝুম বৃষ্টি। রুবেলরা দাঁড়িয়ে আছে তাদের তৈরি ট্যাংকের পাশে। টিনের ছাদ বেয়ে জল পড়ছে ড্রামে। একসময় বাচ্চারা হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে—“এই তো, জীবনের জল!” তাদের হাসিতে মিশে যায় বৃষ্টির শব্দ, মাটির ঘ্রাণ, আর নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।
রূপপুরের আকাশে সেইদিন একটি রঙধনু দেখা যায়—সাত রঙে জ্বলজ্বল করা এক প্রতীক, যেন প্রকৃতি নিজেই বলছে, “তোমরা যদি আমায় ভালোবাসো, আমি তোমাদের বাঁচাবো।”
সেদিন থেকেই রূপপুর আর আগের মতো থাকে না। এখন সেখানে প্রতিটি ঘরে ছোট ছোট জলাধার, প্রতিটি মানুষ জানে—এক ফোঁটা জলের দাম কতটা অমূল্য।
জলিল মিয়া এখনো ভোরে হাঁটেন, কিন্তু এবার তাঁর মুখে হাসি। তিনি বলেন, “জল আবার ফিরতেছে, জীবনও ফিরতেছে।”
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকান, যেখানে মেঘ ভাসছে, আর ফিসফিস করে বলেন—
“আমরা জলের জন্য কান্না করেছিলাম, এখন জল আমাদের জন্য গান গায়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now