বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
----------------
(পর্ব ৬)
▪▪▪চোরের উপর বাটপাড়ি▪▪▪
সেদিন অমাবস্যা! চারিদিকে অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আছে। কেবল জোনাকীগুলো মাঝে মাঝে পিটপিট করে জলছে—ঠিক যেন আঁধার-রাক্ষসের রাশি রাশি আগুন-চোখের মতন।
আমাদের বাড়ী কলকাতার প্রায় বাইরে, সেখানটা এখনে। শহরের মতন ঘিঞ্জি হয়ে পড়েনি। বাড়ীঘর খুব তফাতে তফাতে– গাছপালাই বেশী, বাসিন্দা খুব কম। অর্থাৎ আমরা নামেই কলকাতায় থাকি, এখানটাকে আসল কলকাতা বলা যায় না।
আমাদের বাড়ীর পরে একটা মাঠ, সেই মাঠের একপাশের একটা চুঝোপের ভিতরে বিমল আর আমি সুযোগের অপেক্ষায় লুকিয়ে বসে আছি। মাঠের ওপারে করালীর বাড়ী।
মশারা আমাদের সাড়া পেয়ে আজ ভারি খুশি হয়ে ক্রমাগত ব্যাণ্ড বাজাচ্ছে—বিনি পয়সার ভোজের লোভে! সে-তল্লাটে যত মশা ছিল, ব্যাণ্ডের আওয়াজ শুনে সবাই সেখানে এসে হাজির হল এবং আমাদের সর্বাঙ্গে আদর করে শুড় বুলিয়ে দিতে লাগল। সেই সাংঘাতিক আদর আর হজম করতে না পেরে আমি চুপি চুপি বিমলকে বললুম, ওহে, আর যে সহ হচ্ছে না।
বিমল খালি বললে, চুপ?
—আর চুপ করে থাকা যে কত শক্ত, তা কি বুঝছ না?
—বুঝছি সব! আমি চুপ করে আছি কি করে?
এ কথার উপরে আর কথা চলে না। অগত্যা চুপ করেই রইলুম।
ক্রমে মুখ-হাত-পা যখন ফুলে প্রায় ঢোল হয়ে উঠল, তখন নিশুত রাতের বুক কাঁপিয়ে গির্জে ঘড়িতে টং করে একটা বাজল।
বিমল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, এইবার সময় হয়েছে।
আমি তৈরী হয়েই ছিলুম—একলাফে ঝোপের বাইরে এসে দাঁড়ালুম!
বিমল বললে, আগে এই মুখোসটা পরে নাও! বিমল আজ দুপুরবেলায় রাধাবাজার থেকে দুটো দামী বিলাতী মুখোস কিনে এনেছে। ছুটোই কাফ্রীর মুখ,-দেখতে এমন ভয়ানক যে, রাত্রে আচমকা দেখলে বুড়ো-মিন্সেদেরও পেটের পিলে চমকে যাবে। মুখোস পরার উদেশ্য, কেউ আমাদের দেখলেও চিনতে পারবে না।
মুখোস পরে দুজনে আস্তে আস্তে করালীর বাড়ীর দিকে এগুতে লাগলুম। তার বাড়ীর পিছন দিকে গিয়ে বিমল চুপিচুপি বললে, মালকোঁচ মেরে কাপড় পরে নাও।
আমি বললুম, কিন্তু এদিকে তো বাড়ীর ভেতরে ঢোকবার দরজা নেই?
বিমল বললে, দরজা দিয়ে ঢুকবে কে? আমরা কি নেমস্তন্ন খেতে যাচ্ছি? এদিকে একটা বড় বটগাছ আছে, সেই গাছের ডাল করালীর বাড়ীর দোতলার ছাদের ওপরে গিয়ে পড়েছে। আমরা ডাল বেয়ে বাড়ীর ভেতরে যাব? বিমল তার হাতের মেরা লণ্ঠনটা উচু করে ধরলে,—একটা আলোর রেখা ঠিক আমাদের বটগাছের উপরে গিয়ে পড়ল।
বাড়ীতে ঢুকবার এই উপায়ের কথা শুনে আমার মনটা অবশ্ব খুশি হল না— কিন্তু মুখে আর কিছু না বলে, বিমলের সঙ্গে সঙ্গে গাছের উপর উঠতে লাগলুম।
অনেকটা উঁচুতে উঠে বিমল বললে, এইবার খুব সাবধানে এস। এই দেখ ডাল। এই ডাল বেয়ে গিয়ে ছাদের উপরে লাফিয়ে পড়তে হবে? .
আবছায়ার মতন ডালটা দেখতে পেলুম। বিমল আগে ডাল ধরে এগিয়ে গেল—একটা অস্পষ্ট শব্দে বুঝলুম, সে ছাদের উপরে লাফিয়ে পড়ল।
আমি দু-ধারে দু’পা রেখে আর দু'হাতে প্রাণপণে ডালটা ধরে ধীরে ধীরে এগুতে লাগলুম—প্রতি মুহুর্তেই মনে হয়, এই বুঝি পড়ে যাই। সেখান থেকে পড়ে গেলে স্বয়ং ধন্বন্তরিও আমাকে বাঁচাতে পারবেন না।
হঠাৎ বিমলের অস্পষ্ট গলা পেলুম—ব্যাস। ডাল ধরে ঝুলে পড়।
আমি ভয়ে ভয়ে ডাল ধরে ঝুলে পড়লুম।
—“ইবার ডাল ছেড়ে দাও।
ডাল ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ধুপ করে ছাদের উপরে গিয়ে পড়লুম।
বিমল আমার পিঠ চাপড়ে বললে, সাবাস।
আমি কিন্তু মনের মধ্যে কিছুমাত্র ভরসা পেলুম না। এসেছি চোরের মত পরের বাড়ীতে, ধরা পড়লেই হাতে পরতে হবে হাতকড়া। তারপর আর এক ভাবনা-পালাব কোন পথ দিয়ে? লাফিয়ে তো ছাদে নামলুম, কিন্তু লাফিয়ে তো আর ঐ উঁচু ডালাঁ ফের ধরা যাবে না। বিমলকেও আমার ভাবনার কথা বললুম।
বিমল বললে, ‘সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ বলেই আমাদের গাছে চড়তে হল। পালাবার সময় দরজা খুলেই পালাব।
—কিন্তু বাড়ীতে দরোয়ান আছে যে?
—তার ব্যবস্থা পরে করা যাবে। এখন চল, দেখি নীচে নামবার সিঁড়ি কোন দিকে। পা টিপে টিপে এস।
ছাদের পশ্চিম কোণে সিঁড়ি পাওয়া গেল। বিমল আগে নামতে লাগল। আমি রইলুম পিছনে। সিঁড়ি দিয়ে নেমেই একটা ঘর। বিমল দরজার উপরে কান পেতে চুপি চুপি আমাকে বললে, এ ঘরে কে ঘুমোচ্ছে, তার নাক ডাকছে।
চোরা-লণ্ঠনের আলোয় পথ দেখে আমরা দালানের ভিতরে গিয়ে ঢুকলুম। একপাশে তিনটে ঘর—সব ঘরই ভেতর থেকে বন্ধ। বিমল চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। আমি তো একেবারে হতাশ হয়ে পড়লুম। এত বড় বাড়ী, ভিতরকার খবর আমরা কিছুই জানি না, এতটুকু একটা মড়ার মাথা কোথায় লুকানো আছে, কি করে আমরা সে খোঁজ পাব? বিমলও যেমন পাগল! আমাদের খালি কাদা ঘেটে মরাই সার হল!
হঠাৎ বিমল বললে, ওধারকার দালানের একটা ঘরের দরজ। দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। চল ঐদিকে৷
বিমল আস্তে আস্তে সেইদিকে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা ঠেলতেই একটু খুলে গেল। ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বিমল খানিকক্ষণ কি দেখলে, তারপর ফিরে আমার কানে কানে বললে, ‘দেখ’
দরজার ফাঁক দিয়ে যা দেখলুম, তাতে আনন্দে আমার বুকটা নেচে উঠল! টেবিলের উপর মাথা রেখে করালী নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, আর তার মাথার কাছেই পড়ে রয়েছে—আমরা যা চাচ্ছি তাই—সেই মড়ার মাথাটা। করালী নিশ্চয় সঙ্কেতগুলোর অর্থ বুঝবার চেষ্টা করছিল—তারপর কখন হতাশ ও শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। করালী তাহলে সত্যিই চোর।
বিমল খুব সাবধানে দরজাটা আর একটু খুলে, পায়ের আঙলে ভর দিয়ে ঘরের ভিতরে গেল। তারপর ঘুমন্ত করালীর পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে মড়ার মাথাটা টেবিলের উপর থেকে তুলে নিলে। তারপর হাসতে হাসতে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। এত সহজে যে কেল্লা ফতে হবে, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
এইবার পালাতে হবে। একবার বাইরে যেতে পারলেই আমর। নিশ্চিন্ত—আর আমাদের পায় কে।
দুজনেই একতলায় গিয়ে নামলুম। উঠান পার হয়েই সদর দরজা। কিন্তু কি মুস্কিল, বিমলের চোরা-লণ্ঠনের আলোতে দেখা গেল, একটা খুব লম্বা-চওড়া জোয়ান দরোয়ান দরজা জুড়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে, দিব্যি আরামে নিদ্র দিচ্ছে।

বিমল কিন্তু একটুও ইতস্ততঃ করলে না, সে খুব আস্তে আস্তে দরোয়ানকে টপকে দরজার খিল খুলতে গেল। ভয়ে আমার বুক চিপ টিপ করতে লাগল—একটু শব্দ হলেই সর্বনাশ!
কিন্তু বিমল কি বাহাদুর। সে এমন সাবধানে দরজা খুললে যে একটুও আওয়াজ হল না।
হঠাৎ আমার নাকের ভিতরে কি একটা পোকা ঢুকে গল—সঙ্গে সঙ্গে হ্যাচ্চো করে খুব জোরে আমি হেঁচে ফেললুম।
দরোয়ানের ঘুম গেল ভেঙে বাজখাই গলায় সে চেঁচিয়ে উঠল —‘কোন হায় রে!’—
লণ্ঠনটা তখন ছিল আমার হাতে। তার আলোতে দেখলুম, বিমল বিদ্যুতের মতন ফিরে দাঁড়াল, তারপর বাঘের মতন দরোয়ানের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তুই হাতে তার গল টিপে ধরল। খানিকক্ষণ গোঁ-গোঁ করেই চোখ কপালে তুলে দরোয়ানজী একেবারে অজ্ঞান।
তারপর আর কি—দে ছুট তো দে ছুট! ঘোড়দৌড়ের ঘোড়াও তখন ছুটে আমাদের ধরতে পারত না—একদমে বাড়ীতে এসে তবে ইপি ছেড়ে বাঁচলুম।
(ক্রমশ)
---------
।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now