বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জীবন পদ্মপাতায় জল

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "আফা, যতই লেহা-পরা করেন না ক্যান আমাগো মাইয়াগো জীবন কম-বেশি এক্কই! কী লাভ এতো লেহা-পরা হিক্কা যদি হেই জামাই বাড়ির মাইর-ই খাইতে অয়?' কথা গুলো আমার বুয়ার। তার মানে কি বুয়া বুঝে গেলো কাল রাতের ঘটনা?! আমার মুখে কোন জবাব নেই। যেন ওঁর কথায় আমি আবারও গালে তপ্ত হাতের ক্ষিপ্ত আঘাত টের পেলাম! কিছু না বলেই ছুটে আসি নিজের ঘরে। আয়নার সাম্নে দাঁড়াই। তারপর ভাল করে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে দেখতে থাকি নিজের গাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে! হাত দিয়ে ঘসে তুলতে থাকি কাল রাতের সকল চিহ্ন। যেন এর সাথে মুছে যাবে আমার লাঞ্ছিত হবার গ্লানি! বুয়া বড় বেশি সত্য বলে ফেলেছে! আসলেই তো। প্রতি মাসে 'ও' ওর স্বামীর আর শাশুড়ির মার খায়। এটা ওর কাছে খালি ভাতে "লবন-মরিচ খাওনের" মত সুস্বাদু। প্রথম বার এই তুলনা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম! আমি এমন কথায় অভ্যস্ত নই। এতো সরাসরি কথা বলতে আমি খুব কম মানুষকেই দেখেছি। বুয়ার কথায় কোন রাখ-ঢাক নেই। কোন বিহ্বলতা নেই। চটপটে কিন্তু ভীষণ সহজ। আর দশটা শহুরে বুয়ার মত নয় অবশ্যই। প্রথম দিন-ই বলে দিয়েছে- "আফা, টাইম মতই আমারে পাইবেন। খালি যেই দিন দেরি করমু, বুইঝা নিবেন ভাতারের মাইর খাইসি। মাইর দেওনের সময় হুশ থাহে না, খালি ট্যাহা গুননের সময় হিসাব পাক্কা থাহে"। কথা শুনে এতটাই ভরকে গিয়েছিলাম যে ভাবছিলাম- “কাজে রাখব? নাকি বিদায় করে দেব?!” বুয়া কে রেখে দিয়েছিলাম। এর পর থেকে 'ও' আমার জীবনের একটা অংশে পরিনত হয়ে গেছে। জানি না কিভাবে। বুয়ার সাথে এমন সখ্যতা কম মানুষেরই হয় হয়তো। আমার কাছে বুয়া 'স্বভাব জ্ঞানী' মানুষ। যার সব কিছু বোঝার ক্ষমতা খুব প্রখর; কেবল প্রকাশ ভঙ্গিটা ভিন্ন। একদিন কাজের ফাঁকে হঠাৎ বলে বসলো, "পরা- লেহা না করলে কি হইব! আমি আর আপনি এক্কই"। আমার অবাক চোখের চাহনি দেখে হেসে বলল, "আমাগো জীবন যাইব চুলার লাকড়ি ঠেইল্লা, আর আপনার গ্যাসের চুলার চাক্কা ঘুরাইয়া"! কি সহজ সংজ্ঞা জীবনের! চাকরি- কাজ-সংসার (সং- সার) এসব সামলে নিজের কথা ভাবার অবসর হয়নি কখনো। ওঁর কথায় এক নিমিষে আমার কাছে জীবনের সব চেয়ে সরলতম ব্যাখ্যা পাওয়া হয়ে গেলো। কাল রাতের কথা কেউ জানে না। এমন রাত এই নিয়ে বেশ কবার-ই এসেছে। আমরা শিক্ষিত মানুষেরা হয়তো কাগজে-কলমে শেখা অংকের মত করে এক একটা পা ফেলার সব রকম চেষ্টা চালাই। কিংবা ভেবে নেই আমি যা জানি সেটাই ঠিক। কিংবা আসলে গভীরে গিয়ে ভাবি না। নিজেকে সব চেয়ে বুদ্ধিমান ভাবার মত বোকামিটা আমরা সবচে' বেশি করি। অন্তত আমার নিজেকে তাই মনে হয়। খুব সাধারন কিছু আটপৌরে স্বপ্ন নিয়ে ঘর বাঁধা। আসলেই কি ঘরটা বেঁধেছিলাম? নাকি ঘোরের মধ্যে খেলাঘর বাঁধবার বৃথা চেষ্টা করে গেছি! আমার কাছে ঘর আর ঘোরের কোন পার্থক্য নেই এখন আর। আমার স্বপ্ন এখন কেবলি দুঃস্বপ্ন মনে হয়। আমি সব কিছু আমার করতে চেয়েছিলাম। পুরোটাই 'আমিময়' ছিল। একবারের জন্যও ভাবিনি অন্যদের "আমিময়" জগত টাতে আমার গ্রহন যোগ্যতা কতখানি। আমি আজ খুব সহজ ভাবে জানি সংসার বিষয়টা 'আমি- তুমি' মিলে নয়। সেখানে আমাদের আপন জনদের চাওয়া-পাওয়ার মশলা সেই জীবনের স্বাদ-গন্ধের তীব্রতা বাড়ায়ে দেয়! আমরা আমাদের চাওয়া-পাওয়া গুলো নিয়ে সুখী ছিলাম। অন্যদের অনমনীয় চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা গোলক ধাঁধায় সব গুলিয়ে ফেলেছি। সে এমনি গোলক ধাঁধা যা আমার খুব কাছের মানুষটিকে এক নিমিষে আলোকবর্ষ দুরের মানুষে সরিয়ে নিয়ে গেছে। যাকে জানতাম 'প্রগতিশীল', আজ সে বড্ড বেশি "গোঁড়া"! আজ সে ঠাণ্ডা কণ্ঠে সবচে ঝাঁঝালো কথাটা আমাকে বলে দিতে পারে..."আমি চাই তুমি কেবল সংসার সামলাও"! অথচ এই মানুষ টাই কোন পোশাকে বাইরে বেরবে এই রকম সহজ সিদ্ধান্ত -ও আমাকে ছাড়া নিতে পারত না! আমি জানাতে চেয়েছি আমি কি চাই! হয়তো সেটা প্রতিবাদ ছিল। প্রত্যুত্তরে যা পেলাম তা আজকাল প্রায় রাতেই জোটে। কাল-ও জুটেছে। একটা সময় আমার আয়ের পুরোটা উজার করে দিয়ে জোড়া – তালি দিয়ে সংসার টাকে দুজনে মিলে হাসতে হাসতে টেনে নেয়েছি। তখন কারো কোন অভিযোগ ছিল না। বরং ছিলাম “লক্ষ্মী ছেলে-বউ”! এখন আমার স্বামীর ভাল চাকরি; আয় টাও ভালো। তাই এখন ঘরের- বউয়ের (কিংবা ছেলে-বউএর) আর বাইরে বের হবার কি দরকার?’ মাঝে মাঝে অবাক লাগে আমাদের যোগ– বিয়োগের হিসেব কষা দেখলে। যখন তাদের এই ছেলেটাই ভালো রোজগার করতে পারত না, তখন ছেলে বউয়ের কবে বেতন হবে সেটার প্রতীক্ষায় থাকতো সবাই। তখন ‘বউ’ এর আয়ে হাত দিতে কারো বাঁধে নি; মনে হয় নি ছেলের চাইতে, ছেলে-বউয়ের আয় বেশি! কিন্তু আজ আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে যাবো, সেটা আটকাতে এরা সবাই কোমর বেঁধে লেগেছে! সমস্যা একটাই। সামাজিক মর্যাদায় আমি তাদের ছেলের চেয়ে অনেক ওপরে উঠে যাবো বিদেশি ডিগ্রী নিয়ে সেই লজ্জায়! অবশ্য অন্যদের কথা কেন বলছি? আমার অনেক চেনা মানুষটাই তো চায় না! তার চোখে- মুখে – দেহ ভঙ্গিমায় আমার জন্য কেবল ঘৃণা উপচে পড়ে! আমি মেলাতে পারি না অনেক কিছু। মানুষ কি বদলে যায়; নাকি সময় মানুষ কে বদলে দেয়? এই মানুষটাই একদিন বড় গলায় বলতো- “আমার বউ আমার চেয়ে বেশি কামাই করে; আমি তার গর্বিত জামাই!” কেউ তখন ওকে নিয়ে ঠাট্টা করার সাহস পেত না। এতোটাই ঠোঁট- কাঁটা ছিল এই মানুষ টা। এখনো তাই আছে; কেবল বদলে গেছে দৃষ্টি ভঙ্গি। আজকাল ওর আত্মসম্মান বোধটাও অনেক প্রখর হয়েছে টের পাই – ‘একবার ভাবতো সবাই আমাকে বলবে ‘বিদেশি ডিগ্রীওয়ালা’ বউয়ের জামাই!” “আমি কিন্তু তোমার চেয়ে বেশি বেতন পেতাম যখন সংসার শুরু করি”- আমার প্রত্যুত্তর। “তখন আর এখন পুরোটাই ভিন্ন! ঠিক আছে তুমি তখন অনেক করেছ। আমার আয় ভালো ছিল না... আমার পাশে থেকে সাহায্য করেছ... কিন্তু রোজগার আর পড়াশোনা কি এক হল? আমি... কি লাভ এতো পড়ে বোলো?” ‘ও’ নিজের মনের কথাটা বলতে গিয়েও চেপে যায় টের পাই। আমার প্রগতিশীল স্বামীর দামি উক্তি... আসলেই কি হবে এতো পড়ে? দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে দু জনেই বের হয়েছিলাম। কিন্তু ভাবনার জায়গাটা এখনো ‘উচ্চ’ হতে পারেনি আমাদের। এখনো আমরা ছেলে – মেয়ের ‘উচ্চতার’ দোহাই দিয়ে নিজেদের এক ঝটকায় মাটিতে নামিয়ে আনি! আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওকে বলি,- “এখন আমি তোমাকে আমার পাশে চাই সবাই যখন আমার বিপরীতে...!” আমার ইচ্ছের ইচ্ছে-মৃত্যু দেই কথাটুকু নিজের মাঝেই চেপে রেখে। বেশ বুঝতে পারি এমন কথার কোন মুল্য আজ ওর কাছে নেই। ওর নিত্য নতুন কায়দা চলে আমাকে ফাঁদে ফেলার। কেউ একজন বুদ্ধি দিয়েছে- “বাচ্চা নিয়ে নাও; বিদেশ যাত্রার যাত্রাভঙ্গ হয়ে যাবে!” এখন ‘ও’ সেটা নিয়েই আমার ওপর জোর করছে। কোনভাবে না পারুক, ঐ একটা ‘আপাত’ নৈতিক এবং সবচেয়ে সহজতম উপায়ে আমাকে আটকে ফেলা যাবে। মেয়েদের কে আটকে রাখার কিংবা ছুঁড়ে ফেলে দেবার জন্য এই চর্চা অনাদি কালের। বুয়ার কথাই সত্যি। আমাদের মেয়েদের জীবন টা পড়াশোনা আর চাকরি করে খুব একটা বদলে যায় নি। কেবল জীবন কে উপলব্ধি করবার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে হয়তো। কিন্তু প্রতিবাদ করবার শক্তি কি আমাদের হয়েছে? কি করবো আমি? এই একটা জীবন কি গ্যাসের চুলোর চাকা ঘুরিয়েই কাটাবো? নাকি বুকের ভেতর চাপা আগ্নেয় গিরির মুখটা উস্কে দেব? আমি ভাবছি ভিন্ন কিছু...। আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে। বুয়া সামনে। আগের মতই সাদামাটা শান্ত ভঙ্গি। “আফা, গেরামে যাই গা। আর থাকুম না এইহানে। আমার সোয়ামি আবার বিয়া বইছে আর আমারে তালাক দিছে। আর ক্যার লাইগা কামাই করমু। গেরামে গিয়া মা’র লগে ধান ভাঙ্গার কাম করমু। হেই হানেই শান্তি। দোয়া কইরেন।” এই লেখাপড়া না জানা মানুষটা কিভাবে যে এক পলকে আমার মনের কথা পড়ে ফেলে! “আফা, একটা কথা কই। বাজান একটা কথা কইত – ‘সাদা কাপর পরলে তো আর মন ডা সাদা হয় না’। আফনে লেহা পড়া জানা মানুষ। বুঝবেন। আর নিজের মন যা চায় তাই কইরেন,আফা”! হুট করেই কথা শেষ করে বুয়া চলে গেলো। আর ভাবনা জুড়ে ঝড় বইয়ে দিলো- “‘সাদা কাপর পরলে তো আর মন ডা সাদা হয় না’! ভীষণ ঝড়ের তাণ্ডব থেমে গেলে কেমন যেন ধুলো ময়লা হীন পালকের মত পল্কা মনে হয় সব কিছু। সকাল থেকে আমার তেমনি মনে হচ্ছে। একটু আগে চার দেয়ালের গাঁথুনি আঁটা সংসার নামক জায়গাটি হতে আমি বের হয়ে এসেছি; সাথে করে একটা দুই-চাকাওয়ালা ট্রলি তে বন্দী করে এনেছি আমার ভবিষ্যৎ। জানি না কোথায় গিয়ে সেই ভবিষ্যৎ শেকড় গাড়বে। কি হবে এতো ভেবে? আসুন আমার সাথে গান করবেন... "ভাবছ তুমি ভাবনা নিয়ে কোথায় যাবে? ভয় পেয়োনা জীবন তোমায় পথ দেখাবে... "!!! Shahinoor Moon


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জীবন পদ্মপাতায় জল

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now