বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জানোয়ার-০৫ (শেষ)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X জানোয়ার - শুভাগত দীপ . ৫ম পর্ব (অধ্যায় ১৪-১৮) . ১৪. - নোমান সাহেব, আপনাকে আমি আবারো কিছু প্রশ্ন করতে চাই। - জি, বলুন কি বলবেন। - আপনার বোন নীতুর কি কারো সাথে কোন অ্যাফেয়ার ছিলো? - আমার জানা নেই। - একটু ভাবুন। - না। আমার জানা নেই। - এমন কোন ব্যাপার কি গত একমাসে ঘটেছে, যা আপনার কাছে একটু অন্যরকম মনে হয়েছে? - নীতুর কোচিংয়ে একজন নতুন স্যার এসেছেন। উনি নীতুকে একবার উনার বাইকে করে বাসার সামনে ড্রপ করেছিলেন। - আপনি কি আনানের কথা বলছেন? - হ্যাঁ, ইন্সপেক্টর সাহেব। - একবার তার সাথে কথা বলেছি আমি। আবারো বলবো। - আর কি জানতে চান? - আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন, নোমান সাহেব? - না। কথা যেন আচমকাই শেষ হয়ে গেলো। ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া আর নোমান ওদের ড্রইংরুমের সোফায় বসে একমনে সিগারেট টেনে যাচ্ছে। ডুবে গেছে যে যার চিন্তায়। নোমানের বাবা সোবহান সাহেব সামান্য অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন গত রাতে। প্রেশারটা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে কাছের এক নার্সিংহোমে অ্যাডমিট করা হয়েছে। বাড়িতে নোমান আর বুয়াই ছিলো সকাল থেকে। ড্রাইভার মনসুরের আজ আসার কথা। - ইন্সপেক্টর সাহেব, আমার বোনটা কেন এমন করলো কিছু জানতে পারলেন আপনারা? - এখনো পারিনি। তবে... - আচ্ছা। আপনার কি আর কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে? - না। আমি তাহলে আসি নোমান সাহেব। - আচ্ছা। দরজার দিকে যেতে যেতেও থেমে গেলেন সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া। ঘুরে আবারো তাকালেন সোফায় বসে থাকা নোমানের দিকে। - নোমান সাহেব... - বলুন। - আপনার বোনের লাশ নিতে কি আপনিই আসবেন? - হ্যাঁ। - পোস্টমর্টেমের ব্যাপারে কিছুই তো জানতে চাইলেননা... - কি হবে জেনে? - নোমান সাহেব, আপনার বোনের পিঠে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখা গেছে। সেই সাথে তার হৃৎপিণ্ডে পাওয়া গেছে কিছু অদ্ভুত পাথর কণা। এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন? নোমান কোন উত্তর দিলোনা। তার ভেতর থেকে আবারো দলা পাকানো একটা কান্না যেন উঠে আসতে লাগলো। সে এখন জানে, নীতুর লাশের অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলোর কারন কি। কিন্তু সে কিছু বললোনা। - নোমান সাহেব, নীতুর পিঠের ওই অদ্ভুত জিনিসটা আর পাথর কণার কিছু ডেভেলপড ছবি আছে এই খামের মধ্যে। রেখে গেলাম। - আচ্ছা। - লাশ নিতে আসছেন কখন? - কাল সকালে। - আজকে কেন নয়? - কিছু কাজ সারতে হবে আমাকে ইন্সপেক্টর সাহেব, জরুরি কিছু কাজ। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া নোমানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। নোমানের চোখদুটো টেবিলের অ্যাশট্রেতে নিবদ্ধ, কিন্তু তার ভেতরে চলছে ভিন্ন কিছু চিন্তার ঝড়। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া নোমানের এই অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে সতর্ক হয়ে উঠলেন। নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন তার ওপর। নোমানদের বাসা থেকে বেরিয়ে নিজের জিপের দিকে এগোতে এগোতে পকেট থেকে ফোনটা বের করলেন তিনি। ডায়াল করলেন একটা নাম্বারে। - আসলাম, কোথায় তুমি? - আমি ফাঁড়িতে, স্যার। - নোমান সাহেবের ওপর তোমাকে নজর রাখতে হবে। দূর থেকে নজর রাখবে। - ওকে স্যার। - প্রতি ঘন্টায় আমাকে সব জানাবে। - জি স্যার। স্যার, আজকে কি কিছু ঘটতে চলেছে? - সম্ভবত আসলাম। আমি মেয়েটার কোচিংয়ের দিকে যাচ্ছি। আরো কিছু খোঁজখবর নিতে হবে। - ওকে স্যার। ১৫. হলঘরের মত প্রশস্ত ঘরটিতে শুধু দুটো হ্যাজাক জ্বলছে। সেই আলোতে ঘরটির অন্ধকার যেন আরো রহস্যময় হয়েছে। গুমোট এই হলঘরটি একসময় চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সে-ও আজ থেকে অনেক বছর আগে। চার্চের পুরোনো ক্রুশটি মেঝেতে নামিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা রাখা আছে উল্টো করে। ক্রুশের যীশুর মুখটিকে ছেনি বাটালি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। সেখানে শোভা পাচ্ছে একটা পাথরের মুখোশ। লালচে পাথরের এই মুখোশটির সাইজ একটা টেনিস বলের সমান। মুখটা যারপরনাই বিভৎস। দুই চোখ যেন পুঁতির মত জ্বলছে হ্যাজাকের আলোয়। ঠোঁট বেঁকে আছে পৈশাচিক হাসির ভঙ্গিতে। মেঝেতে আরো কিছু জিনিস রাখা আছে। কয়েকটা মাটির পাত্রে লালচে কিছু তরল, মানুষের একটা উরুর হাড়, কয়েকটা তাবিজের মত জিনিস আর একটা বই। বইটার নাম পড়া যাচ্ছেনা। তবে মলাটটা অদ্ভুত। ওটা সাধারণ কোন চামড়ায় না, মানুষের চামড়ায় তৈরি। উল্টানো ক্রুশটির সামনে নগ্ন একজন মানুষ উবু হয়ে বসে আছে। তার সারা গা চকচক করছে ঘামে। চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত। বদমেজাজি শিক্ষকের সামনে জানা জিনিস ভুল করে ফেললে ছাত্র যেমন ভীত হয়, তারও অবস্থা সেই রকমই। লোকটার অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে সে মারা গেছে। শুধু তার জীবন্ত হওয়া নিশ্চিত করছে তার দুই চোখ। গুমোট ঘরটিতে বাতাসের কোন চলাচল নেই। তারপরো ফিসফিস শব্দ হচ্ছে। শব্দটা আসছে ক্রুশের সামনে থেকে। লোকটি যেন উল্টানো ক্রুশের মুখোশটার সাথে কথা বলছে। মুখোশটাও যেন কিছু বলছে। কি বলছে বোঝা যাচ্ছেনা। শুধু ফিসফিস, ফিসফিস! হঠাৎ করেই উবু হয়ে বসে থাকা নগ্ন লোকটা একটা বিকট আর্ত চিৎকার দিয়ে উঠলো। মাটিতে শুয়ে নিজের গলা চেপে ধরে শরীর মোচড়াতে লাগলো। মনে হলো, অদৃশ্য কেউ তার গলা টিপে ধরে আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, উল্টানো ক্রুশে ক্রুসিফাইড যীশুর মুখে লাগানো ছোট্ট লালচে মুখোশটা যেন থেকে থেকে কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। সারা ঘরে ফিসফিস শব্দটা যেন আরো বেড়ে গেছে। মেঝেতে শরীর মোচড়াতে থাকা লোকটা আতঙ্কিত স্বরে বিড়বিড় করতে লাগলো। সে বলছে - - আমাকে ক্ষমা করো, প্রভু সেনযাল! মেয়েটা এমনভাবে আত্মহত্যা করবে, আমি বুঝতে পারিনি। এর আগের মেয়েটাও আত্মহত্যা করেছিলো, কিন্তু বিশ্বাস করো প্রভু, এতে আমার কোন দোষ ছিলোনা। নরক থেকে তোমাকে এই পৃথিবীতে আসার পথ করে দেয়ার জন্য আমি কি না করেছি! আমাকে ক্ষমা করো! আমি নতুন আরেকটা শরীর যোগাড় করবো! জ্যান্ত শরীর। প্রভু সেনযালের পৈশাচিক মুখোশটা হঠাৎ যীশুর মুখ থেকে খসে পড়লো। বাটি চালানের মত করে ওটা আতঙ্কিত লোকটার সামনে এগোতে লাগলো। বিজাতীয় ফিসফিস শব্দটা এখন একেবারে কাছে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকা লোকটা আতঙ্কে যেন একেবারে জমে গেছে। সেনযালের পাথুরে মুখোশটা হঠাৎ থেমে গেলো। কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা বাড়িয়ে লোকটা পাথুরে সেনযালকে তুলে নিলো। ওর কণ্ঠে এখন অন্যরকম দৃঢ়তা। অদৃষ্টকে এড়াতে না পারার দৃঢ়তা। - তবে তুমি এটাই চাও, প্রভু? তাই হবে। তুমি যা চাও তাই হবে। লোকটা মুখোশটাকে নিজের মুখমণ্ডলের ওপর স্থাপন করলো। ছোট মুখোশটা তার মুখমণ্ডলের পুরোটা দখল করতে না পারলেও ভোঁতা নাক আর থ্যাবড়ানো মুখটা ঠিকই দখল করলো। পাথরের মুখোশটা যেন উষ্ণ রক্তের কোন প্রাণী দেহের মতই গরম! ওটা একেবারে এঁটে বসেছে লোকটার নাক মুখের ওপরে। ধীরে ধীরে চাপ বাড়াচ্ছে। নগ্ন লোকটা আর উবু হয়ে বসে বা গড়াগড়ি দেয়া অবস্থায় নেই। সে উঠে দাঁড়িয়েছে। ধনুকের ছিলার মত টানটান হয়ে আছে লোকটার দেহ। গভীর করে শ্বাস টানলো সে। তার মনে হলো, নিশ্বাসের সাথে গরম কিছু শক্ত পদার্থ যেন চলে গেলো শরীরের ভেতরে। অস্পষ্ট গলায় হেসে উঠলো কেউ একজন - খুব কাছ থেকেই। লোকটার নগ্ন পিঠের কিছুটা জায়গার মাংসপেশিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করলো। হ্যাজাকের আলোয় তাকে আরো ভয়াবহ দেখাচ্ছে। সেনযালের পাথুরে মুখোশটার ঠোঁটের বাঁকা হাসি যেন আরেকটু চওড়া হলো। নরক থেকে পৃথিবীতে আগমনের সময় হলো তার। পাশবিকতার জয় হবে এবার। পোষক শরীরে ধীরে ধীরে সেনযাল নিজের দখল বুঝে নিতে লাগলো। বাইরে তখন গভীর হচ্ছে রাত। ১৬. সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া ভয়াবহ দোটানায় ভুগছেন। আজকে যখন নীতুর কোচিংয়ে তিনি ওদের নতুন স্যার আনানের ব্যাপারে খোঁজ নিতে যান, তখন সেখান থেকে কৌতুহল জাগানিয়া কিছু তথ্য পান আনান সম্পর্কে। নীতুর মৃত্যুর পরের দিন থেকে আনান অসুস্থতার কথা বলে কোচিং থেকে ছুটি নিয়েছে। তার ফোনও বন্ধ। লোকটার আসল বাড়ি কোন জেলায় তা কোচিংয়ের কর্তাব্যক্তিদের কেউ বলতে পারেনি। গত দিন পনেরো আগে এসে জয়েন করেছে। এই কোচিংটা ঢাকার নামকরা কয়েকটা কোচিংয়ের একটা। যে কারনে, এখানকার শিক্ষকের চাকরি মানেই লোভনীয় কিছু। সেটার জন্য উপযুক্ত যোগ্যতাও দরকার। আনানের সেটা ছিলো। তাই তার একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যতিত অন্য কিছু চেক করার প্রয়োজন মনে করেনি কোচিং কর্তৃপক্ষ। আনানের কলিগরা জানায়, লোকটা খুব চুপচাপ ধরণের। কারো সাথেই খুব একটা মেশেনা। ছাত্র-ছাত্রীদের সাথেও খুব একটা মাখামাখি যে আছে তা-ও না। তবে শিক্ষকদের বেশ কয়েকজন আনানকে নীতুর সাথে কথা বলতে দেখেছে। ভেতরে ভেতরে দারুন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি। রাত নয়টা। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া কোচিংয়ের অদূরেই আনানের ভাড়া বাড়িতে হানা দিলেন। সাবেকি আমলের বাড়ি। তালাবন্ধ একতলা বাড়িটি খাঁখাঁ করছে। পাখি কি উড়ে গেছে? - ভাবলেন তিনি। তালাটা ভাঙ্গার প্রবল তাগিদ অনুভব করলেন সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া। কিন্তু ওয়ারেন্ট ছাড়া ওটা রীতিমত বে-আইনী হবে। ওটাও বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। মনের গভীর থেকে তিনি কাজটা করার অদম্য উৎসাহ বোধ করতে লাগলেন। জিপের কাছে ফিরে গিয়ে একটা বড় রেঞ্জ নিয়ে এলেন তিনি। তালাটা ভাঙ্গতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা না। এই এলাকাটা বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে পরিপূর্ণ। নানা রকম ধাতব শব্দে এখানকার বাসিন্দারা অভ্যস্ত। তালার ওপর রেঞ্জের আঘাতের শব্দ কানে গেলেও কেউ দেখতে আসবেনা। আর যদি আসেও, পুলিশের ইউনিফর্ম দেখলে কেটেও পড়বে। আনানের বাড়ির দরজার দিকে এগোতে লাগলেন সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া। এমন সময় প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা যেন আর্তনাদের মত করে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। তিনি কলটা রিসিভ করলেন। - হ্যাঁ আসলাম, বলো। - স্যার, নোমান সাহেবের তো কোন খবর নেই। দুপুরের পর থেকেই বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছি। এর মধ্যে একবার শুধু উনি বেরিয়েছিলেন। - কি জন্যে? - সম্ভবত সিগারেট কিনতে। - আচ্ছা। দুপুরের পর উনাদের বাসায় কাউকে ঢুকতে দেখেছো? - জি স্যার। লোকটা সম্ভবত নোমান সাহেবদের ড্রাইভার। কিছুক্ষণ পর লোকটা নার্সিংহোমের দিকে চলে গেছে, যেখানে সোবহান সাহেব অ্যাডমিট আছেন। - ওকে। তুমি নজর রাখতে থাকো। - ওকে স্যার। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া কলটা কেটে দিলেন। হাতের রেঞ্জটা বগলে চেপে ধরে একটা সিগারেট জ্বালালেন। ফোনটা পকেটে রাখার আগে সেটার ফ্ল্যাশলাইটটা অন করে বুক পকেটে রাখলেন। হালকা আলো পাওয়া যাচ্ছে। এতেই কাজ হবে। রেঞ্জটা ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে গায়ের জোরে গোটা তিনেক বাড়ি মারতেই পুরোনো তালাটা ভেঙ্গে একপাশে পড়ে গেলো। ভারি কাঠের দরজাটা একপাশে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন তিনি। রেঞ্জটা পেছনের পকেটে আধা আধি ঢুকিয়ে রাখলেন। তার বামহাতে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালানো ফোন আর ডান হাতে বেরিয়ে এসেছে একটা কোল্ট। ১৭. শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে মাথাটা নিচু করে রেখেছে নোমান। শীতল জল তার মাথা ছুঁয়ে সারা শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, তবু সে কোন শীতলতা অনুভব করছেনা। সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। কান্নায় না, সীমাহীন প্রতিহিংসায়। কিছুক্ষণ আগে সে নীতুর ডায়েরিটা পড়ে শেষ করেছে। খুব বেশি কিছু লিখতে পারেনি মেয়েটা, কিন্তু যা লিখেছে, তা এক কথায় ভয়ঙ্কর। ডায়েরির পাতাগুলো যেন মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিচ্ছে নোমানের কাছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে গত রাতের বিভৎস স্বপ্নটা। মানুষের মাংস খাওয়ার আরো পরিষ্কার চিত্র গতকাল রাতে নোমানের ভেতরটা একেবারে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। সে পাগল হয়ে যাচ্ছে - এমন একটা চিন্তা বেশ ভালোভাবেই পেয়ে বসেছে তাকে। আর আজ নীতুর লাশের অস্বাভাবিকতা পূর্ণ ছবিগুলো দেখার পর একেবারে বোধবুদ্ধিহীন মানুষে পরিণত হয়েছে ও। নীতুর ডায়েরিতে ও একটা লাল পাথরের তৈরি ছোট মুখোশের কথা লিখেছে। ওটা একটা অপদেবতার মুখের ছাঁচ, যার নাম সেনযাল। আফ্রিকার দুর্গম একটি পাহাড়ি এলাকার অধিবাসীদের উপাস্য দেবতা এই সেনযাল। তাকে নরকের অন্যতম অত্যাচারী হিসেবে মনে করে ওই অধিবাসীরা। সেনযাল শয়তানের অন্যতম সহচর। দানবতত্ত্বে তাকে নিয়ে অনেক কিছুই বলা আছে। ডায়েরিতে নীতু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আনানের ব্ল্যাকমেলিংয়ের কথা লিখেছে। ওই অংশটুকু পড়তে পড়তে নোমানের চোখ বেয়ে ঝরঝর করে ঝরছিলো পানি। ব্ল্যাকমেল করে আনান প্রায়ই নীতুকে একটা পরিত্যক্ত চার্চে নিয়ে যেত। সেখানে নীতুকে বাধ্য করতো সেনযালের উপাসনায় অংশগ্রহণ করতে। মাঝে মাঝে নীতু বেঁকে বসলে শারীরিক ভাবে আঘাতও করতো ওর ওপর। কোচিং থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে যেত ওরা। তারপর সেনযালের বিকৃত উপাসনায় অংশ নিতো। একজন স্বেচ্ছায়, আরেকজন অনিচ্ছায়। আনান কিভাবে সেনযালের উপাসক হলো, সে বিষয়ে ডায়েরিতে কিছুই লেখা নেই। তবে বিকৃত আচারগুলোর যতটা সম্ভব নিখুঁত বর্ণনা দেবার চেষ্টা করেছে নীতু। প্রায়ান্ধকার হলঘরে নিয়ে গিয়ে উল্টানো একটা ক্রুশের সামনে ওপর হয়ে শুয়ে পড়তে বাধ্য করা হত নীতুকে। তারপর আনান তার শরীরের অনাবৃত জায়গা গুলোতে মৃত মানুষের রক্ত মাখাতো। সেই সময় নীতুর থুতনিটা থাকতো মেঝের ওপরে, একেবারে খাড়া ভাবে। আনান তারপর সেনযালের মুখোশটা উল্টানো ক্রুশ থেকে খুলে এনে ওটা নীতুর নাক ও মুখের ওপর স্থাপন করতো। তারপর পুরোপুরি নগ্ন হয়ে বিকৃত স্বরে অচেনা কোন ভাষায় মন্ত্র পড়তো। মাঝে মাঝে মন্ত্র পড়া থামিয়ে নীতুকে নির্দেশ দিতো জোরে শ্বাস নেয়ার জন্য। যখনই নীতু শ্বাস টানতো, মনে হতো মুখে লাগানো মুখোশটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে, ভেঙ্গেচুড়ে পাথর কণা গুলো ঢুকে যাচ্ছে ওর গলায়। অবর্ণনীয় যন্ত্রণা হতো তখন। কিন্তু কিচ্ছু করার ছিলোনা। সেনযালের অশুভ মুখোশটা ওর মুখে লাগানোর পর কি যেন হয়ে যেতো। শরীর পুরোপুরি অবসন্ন হয়ে যেতো ওর। এই আচারের শেষ পর্যায়ে আনান ওর মুখ থেকে সেনযালের মুখোশটা খুলে নিয়ে ওর পিঠে একটা করে বিশেষ চিহ্নের ছ্যাঁকা দিতো। এরকম নারকীয় ঘটনা বেশ কিছুদিন চলার পর নীতু ওর পিঠে প্রবল ব্যাথা অনুভব করতে থাকে। শুধু ফোস্কা পড়ার ব্যাথা না। ওর মনে হতো, ওর কশেরুকার সাথে কিছু একটা আটকে আছে - জীবন্ত! আনান প্রায়ই বলতো, নীতুর পিঠের এই চিহ্নের বৃত্ত সম্পূর্ণ হলেই পুরোপুরি জেগে উঠবেন প্রভু সেনযাল। তারপরই নীতুর মুক্তি। কিন্তু নীতু বুঝতে পেরেছিলো, এর থেকে কোনদিনও ওর মুক্তি নেই। আর এটাও টের পাচ্ছিলো, ওর বুক থেকে শুরু করে পিঠ পর্যন্ত জীবন্ত কিছু একটা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। আনান বলেছিলো, সেনযাল ধীরে ধীরে নীতুর হৃৎপিণ্ডে নিজের আবাস গড়ে তুলবে। প্রয়োজন হলে চালনা করবে ওর দেহটাকে। কাজ হয়ে গেলে ছেড়ে দেবে। কিন্তু পিঠের অসহ্য ব্যাথার ব্যাপারে আনান মুখ খোলেনি, তাই নীতু জানতেও পারেনি কিছু। শেষ পর্যায়ে এসে এইসব নারকীয় কর্মকাণ্ড থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া নীতু আনানকে নিজের সম্ভ্রমও দিতে চেয়েছে। কিন্তু আনান জানিয়েছে সে পুরুষত্বহীন। সেনযাল অনেক আগেই অর্ঘ্য হিসেবে আনানের পুরুষত্ব নিয়ে নিয়েছে। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আর বাঁচার উপায় না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় নীতু। সে শুধু তার জীবনকেই না, ঘেন্না করতে শুরু করে নিজের শরীরটাকেও। কারন, ও সবসময়ই নিজের ভেতরে শয়তানটার অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলো। তাই কেটেছিঁড়ে ফেলে অনেক জায়গা। এটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলো সে। এসব পড়তে গিয়ে আর কান্না আসছিলোনা নোমানের। ওর ভেতরে বেড়ে উঠছিলো একটা জান্তব ক্রোধ। একটু একটু করে যা গ্রাস করে নিচ্ছিলো ওকে। ডায়েরির একেবারে শেষের পাতায় নীতু সেই পরিত্যক্ত চার্চের ঠিকানা লিখে গেছে। যেখানে অপদেবতা সেনযালের পাথুরে মুখোশ আর তার উপাসক আনানকে পাবে নোমান। ঠিকানার নিচে লেখা আছে - 'অশুভ শক্তিকে শুভ শক্তিই ধ্বংস করতে পারে, কথাটা সবক্ষেত্রে ঠিক না। অশুভকে ধ্বংস করতে গেলে নিজেকেও মাঝে মাঝে অশুভ শক্তির ধারকে রূপান্তর করতে হয়। জানোয়ারকে ধ্বংস করতে চাইলে জানোয়ার হতে হবে নিজেকেও।' প্রতিশোধ নিতে হবে নোমানকে। ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ধীরেসুস্থে পোষাক পরলো নোমান। ড্রাইভার মনসুরকে দুপুরের পরেই যে নার্সিংহোমে বাবা অ্যাডমিট আছেন, সেখানে পাঠিয়েছে নোমান তাঁর দেখাশোনা করার জন্য। বাবাকে নিয়ে আপাতত না ভাবলেও চলবে। বাইকের চাবিটা নিয়ে গ্যারেজের দিকে এগোলো আনান। ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। সেল্ফ স্টার্ট দিয়ে বাইক ফার্স্ট গিয়ারে এনে পিক আপ টেনে ধরলো নোমান। বাইকের প্রাণ থাকলে সে-ও বুঝতে পারতো, ওর ওপরে এখন একটা পশু বসে আছে। পশুটার গন্তব্য পরিত্যক্ত সেই চার্চ, যেখানে লুকিয়ে আছে ভয়ানক অশুভ কিছু। ১৮. আনানের বাড়িতে রুম আছে মোট তিনটা। তার মধ্যে একটা রুম তালাবন্ধ, আর বাকি দুটো রান্নাঘর ও শোয়ার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপে শোয়ার রুম ও রান্নাঘর চেক করলেন। সেখানে সন্দেহ জাগার মত কিছু খুঁজে পেলেননা তিনি। বাড়ির সবগুলো লাইটই জ্বালিয়েছেন তিনি। নিশ্চিত - বাড়িতে কোন বিপদ লুকিয়ে নেই। আচ্ছা, তালাবন্ধ রুমটিতে কি আছে? সেই রুমেও ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলেন ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া। যথারীতি ডানহাতে উঠে এসেছে রেঞ্জ। সদর দরজার মত এটার তালা ভাঙ্গতেও সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়াকে কোন কষ্ট করতে হলোনা। রুমে ঢুকে কোন সুইচ বোর্ড দেখতে না পেয়ে আবারো নিজের ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের সাহায্য নিতে হলো। গোটা ঘরে আলোটা ঘুরে আসার আগেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া। সারা ঘরে ছড়ানো ছিঁটানো নানা বিচিত্র জিনিস। মড়ার হাড়, বিভিন্ন তরলে ভর্তি জার, দেয়ালে ঝোলানো লতাপাতা, একটা প্রমাণ সাইজের খড়্গ, দেয়ালের নানা জায়গায় লাল কালিতে (সম্ভবত রক্ত) আঁকা নানা চিহ্ন - এটুকু দেখেই যা বোঝার বুঝে নিলেন তিনি। এসব তো পিশাচ সাধনার উপাচার! দ্রুতপায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসে থানায় ফোন করলেন। - হ্যালো... - জি স্যার, বলছি। - এক্ষুনি একটা লোকের হদিস বের করার কাজে পুরো একটা টিমকে লাগাতে হবে। - স্যার, ডিটেইলে বলুন। সাব ইন্সপেক্টর শাহজালাল মিয়া অপারেটরকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে দিতে আনানের ওই পিশাচপুরী থেকে বেরিয়ে এলেন। আনানকে খুঁজে বের করতেই হবে। কিন্তু উনি তখনও জানেননা, কেউ একজন তার খোঁজ ইতোমধ্যেই বের করে ফেলেছে। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জানোয়ার-০৫ (শেষ)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now