বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প : জানোয়ার
- শুভাগত দীপ
.
পর্ব - ২ (অধ্যায় ৫-৭)
.
৫.
আজকের আকাশটা খুব মেঘলা। যেকোন সময় বৃষ্টি আসবে। নীতুর শরীরটাও খুব একটা ভালো না। আজকে ওর কোচিংয়ে যাওয়ার একেবারেই কোন ইচ্ছা নেই। কিন্তু যেতে হবে। আজ একটা ক্লাস টেস্ট হওয়ার কথা। মনমরা ভাব নিয়ে নীতু রেডি হতে লাগলো কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য। নোমান বাসায় নেই। এক বন্ধুর বিয়ের বউভাতে গেছে। নীতুকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু ওর ক্লাস টেস্ট আছে বলে বেশী জোর করেনি। বাসায় এখন নীতু আর বুয়া।
বাইরে বের হয়ে রিক্সাতে উঠে অর্ধেক পথ যেতেই প্রচন্ড বৃষ্টি এলো। ছাতা বা রিক্সার কভার - কোনকিছুই রক্ষা করতে পারলোনা নীতুকে। একেবারে কাকভেজা হয়ে গেলো সে। বাসায় ফিরে যাবে কি যাবেনা এই আপাত সহজ সিদ্ধান্তটা নিতে নিতেই কোচিংয়ের সামনে চলে এলো রিক্সা। ততক্ষণে নীতু ভিজে একেবারে চুপসে গেছে। বৃষ্টি আরো জোরে এলো। নীতু কোনমতে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দৌড় দিলো কোচিংয়ের দরজার দিকে।
কোচিংয়ে আজকে মাত্র কয়েকজন এসেছে। আকাশ মেঘলা দেখে বুদ্ধিমানের মতই বাসা থেকে আর বের হয়নি। নীতু তার আপাদমস্তক ভেজা শরীর নিয়ে যখন কোচিংয়ে ঢুকলো, তখন চারিদিক রাতের মতই কালো হয়ে গেছে। ভেজা শরীরে বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে তার। কিন্তু কি করবে তাও ভেবে পাচ্ছেনা।
আজকে নীতুর কাছের বান্ধবীদের মধ্যে কেউ আসেনি। যারা আছে, তাদের সাথে ওর সম্পর্কটা আসলে মুখ চেনাতেই সীমাবদ্ধ। ওরাও নীতুর এই দুরবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে। এমনই এক সময়ে নীতুদের নতুন স্যার - আনান ক্লাসে ঢুকলো।
- নীতু! সর্বনাশ! ভিজে কি অবস্থা হয়েছে তোমার!
- আমি কি আজ চলে যাবো, স্যার?
- বাইরে তো এখনো খুব বৃষ্টি হচ্ছে। তুমি এক কাজ করো, ওয়াশরুমে গিয়ে ড্রেসটা একটু নিংড়ে নাও। তারপর ফ্যানের নিচে এসে বসলেই শুকিয়ে যাবে।
স্যারের পরামর্শটা নীতুর মনে ধরলো। সে ওয়াশরুমের দিকে রওনা দিলো। আনান স্যার অন্যদের সাথে এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে লাগলো। নীতু পেছনে তাকায়নি। তাকালে দেখতে পেত, আনানের ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুতরকম হাসি খেলা করছে।
৬.
সপ্তাহখানেক পর। কোচিং প্রায় শেষের দিকে। আনান স্যার হঠাৎ বললো নীতু বাদে সবাইকে চলে যেতে। ওর গত ক্লাস টেস্ট নিয়ে নাকি কিছু কথা বলবে। নীতুর বান্ধবীরা সহ অন্যরা মুখ টিপে হাসতে হাসতে বিদায় নিলো। সবাই চলে গেলে আনান ওর দিকে এগিয়ে এলো। তার পুরো চেহারা কি যেন এক উত্তেজনায় চকচক করছে। নীতু নিজের ভেতরেই ভয়ে কুঁকড়ে গেলো।
- নীতু...
- জি স্যার...
- তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো।
আনান শয়তানি ভরা হাসি নিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটা স্মার্টফোন বের করলো। কিছুক্ষণ পর সে একটা ভিডিও প্লে করে ফোনটা নীতুর সামনে ধরলো। স্ক্রিণে চলতে থাকা ভিডিওটি দেখে আপাদমস্তক শিউড়ে উঠলো নীতু। এ কি দেখছে সে!
- জিনিসটা কেমন হয়েছে বলো তো?
- স্যার... আপনি এটা কেন করলেন!
- তোমাকে একটা বিশেষ কাজে লাগানো হবে, নীতু। সেজন্য তোমার অনেককিছু স্যাক্রিফাইস করতে হবে। তা না হলে... আমার অনেকদিনের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যাবে।
স্ক্রিণের ভিডিওটা রিপ্লে করা হয়েছে। নিজের নগ্ন শরীর আবারো দেখতে পেলো নীতু। নিজের পরনের পোষাকগুলো খুলে নিংড়ে পানি বের করে দেয়ার চেষ্টা করছে আপনমনে। ওয়াশরুমের অনুজ্জ্বল আলোয় ওর নগ্ন শরীরটা একেবারে নিখুঁত ভাবে দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে ওটা ও-ই।
আচমকা কি যেন হয়ে গেলো নীতুর। বুনো পশুর মত আঁচড়ে কামড়ে আনানের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলো ও। পারলোনা, বলাই বাহুল্য। আনান এক ঝটকায় ফোনটা সরিয়ে নিয়ে পকেটে ভরে ফেললো। কিছুক্ষণের জন্য নীতুর কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়েছিলো সে। এবার ঠোঁট টিপে বিশ্রী ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে নীতুর দিকে এগিয়ে এলো সে। ডান হাতের গাঁট দিয়ে নীতুর কপালে জোরে একটা আঘাত করলো আনান। পুরো পৃথিবীটা যন্ত্রণায় দুলে উঠলো নীতুর। কাতর অবস্থাতেও ও আনানের হিসহিসে কণ্ঠস্বর বেশ ভালোভাবেই শুনতে পেলো।
- চালাক মেয়েদের আমার ভালোই লাগে। তোমার আগেও জুটেছিলো একজন। ওটাও খুব জ্বালিয়েছিলো। জ্বালা জুড়িয়েছে নিজেই। আমি যা যা বলবো তোমাকে তাই তাই মুখ বুঁজে করতে হবে। আমি যা চাই তা আমাকে পেতে হবে। আর সেটার জন্য তোমার মত মেয়েই আমার প্রয়োজন। কাজ হয়ে গেলেই তোমাকে আর বিরক্ত করবোনা।
নীতু কোনমতে কপালের ব্যাথাটা একটু সামলে উঠেছে। জায়গাটা ফুলে গেছে, বুঝতেই পারছে। ওই অবস্থাতেই কাঁপা কাঁপা গলায় ও জিজ্ঞেস করলো :
- আমাকে কি করতে হবে?
প্রশ্নটির উত্তরে আনান যা বললো, তাতে আপাদমস্তক শিউড়ে উঠলো ও। সেসবে ও রাজী না হলে ভিডিও ক্লিপটি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার হুমকিও দিলো আনান। কাঁপতে কাঁপতে ওর বিকৃত চিন্তাধারার ঘেঁষা কথাগুলো শুনলো নীতু।
- তোমাকে কি আমার পরিকল্পনাটা বোঝাতে পেরেছি, নীতু?
অস্ফুট স্বরে নীতু কি উত্তর দিলো বোঝা গেলোনা। ওর সামনে আর কোন রাস্তা খোলা নেই। শয়তানটার অশুভ ও বিকৃত উদ্দেশ্য পূরণ না করলে যে কি হতে পারে তা সহজেই বুঝতে পারছে। কিন্তু আনান যা চায় সেটা তার চেয়েও যেন বেশি ভয়াবহ। আচ্ছা, লোকটা কি পশু! পশুদেরও তো এমন ধর্ম হয়না!
সন্ধ্যা প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছে। বাইরে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে, তবে বৃষ্টির তোড় কমে এসেছে। আনানের পেছন পেছন নীতু হেঁটে চলেছে। পিশাচ সামনে, আর পেছনে আসছে তার শিকার। গভীর কষ্টের মধ্যেও তিক্ত এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো নীতুর মুখে।
৭.
নোমান ছোটবেলা থেকেই বইপ্রেমী ছেলে। পাঠক হিসেবে তাকে সর্বভূক বলা যায়। প্রায় সব ঘরানার বই-ই তার পাঠ্যতালিকায় থাকে। ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণ নিয়ে ইদানীং সে খুবই আগ্রহী। ব্যাপারটা ওর ভেতরে যেন একটা অবসেশন তৈরি করেছে। এই মাঝরাতেও ওর বিছানায় ইতস্তত ভাবে বেশ কিছু ক্যানিবালিজম বিষয়ক বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ল্যাপটপটা ভর্তি এই বিষয়ের বহু ডকুমেন্টারি ও মুভি দিয়ে।
সন্ধ্যা থেকে বাড়িটা চুপচাপ হয়ে আছে। অন্যদিন দুই ভাই বোনের নানান খুনসুটি এই আধা নির্জন বাড়িটাকেও যেন জ্যান্ত করে তোলে। মাথা ব্যাথা বলে নিজের ঘরে লাইট নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে নীতু। কোচিংয়ে ঢোকার সময় দরজার সাথে নাকি কপাল ঠুকে গেছিলো। জায়গাটা ফুলে আছে দেখে নীতুকে জিজ্ঞাসা করায় সে এই কথাটাই বলেছে। কথাটা বলার সময় নীতুর গলার কাঁপুনিটা ধরতে পারেনি নোমান। তাহলে হয়তো অনেক কিছুই বদলে যেতো।
নামমাত্র কিছু মুখে দিয়ে আবারো নিজের ঘরে চলে গেলো নীতু। ওর চেহারা কেমন যেন ফ্যাকাশে আর ভীত বলে মনে হলো নোমানের। আহা! মাথার যন্ত্রণায় বেচারি কতই না কষ্ট পাচ্ছে। ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইলো নোমান। না করে দিলো নীতু। বললো, মাথা ব্যাথার ওষুধ খেয়ে শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। নোমানও আর কথা বাড়ায়নি। নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে।
সহজে তো ঘুম আসেনা। তাই ক্যানিবালিজম নিয়ে লেখা একটা কেস স্টাডির ওপর চোখ বুলাচ্ছিলো ও। জিনিসটা ইংল্যান্ডের এক মনোবিজ্ঞানীর। ১৮৯০ সালের দিকের ঘটনা। ভদ্রলোক তার রোগী, যে কিনা একে একে সাতাশ জনকে খুন করে তাদের অণ্ডকোষ খেয়ে ফেলেছিলো তার কথা বিস্তারিতভাবে লিখে গেছেন। লোকটাকে গ্রেফতার করার পর আদালত তাকে মানসিক রোগী সাব্যস্ত করেন। তখন তার চিকিৎসার দায়িত্ব পড়ে মনোবিজ্ঞানী ভদ্রলোকের ওপর। দারুন আগ্রহ জাগানিয়া কথাবার্তা বলতো নরমাংস ভোজী লোকটা। এসবের ওপর নানা যুক্তিতর্ক খাটিয়ে লোকটার নরমাংস ভোজী হওয়ার পেছনে কিছু কারন দাঁড় করিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী ভদ্রলোকটি। কারনগুলো খাপে খাপে মিলুক বা না মিলুক পড়তে বেশ মজাই লাগছে নোমানের।
একটু তন্দ্রার মত এসেছিলো নোমানের। ওইটুকু সময়ের মধ্যে সে একটা বিভৎস স্বপ্নও দেখে ফেললো। একজন মানুষ দেয়ালে হ্যালান দিয়ে বসে আছে। মানুষটা মৃত। তার বুকের ঠিক নিচে একটা বড়সড় ক্ষত। হাড় ফেটে গেছে। নোমান সেই ক্ষতস্থান থেকে একটু একটু করে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে। তার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে একটা আবছা ছায়ামূর্তি।
এটুকু দেখেই নোমানের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থার সমাপ্তি টানলো ওর সচেতন মন। সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। আচ্ছা, এমন ভয়াবহ স্বপ্ন ও কেন দেখলো! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, স্বপ্নে ও যে মৃত মানুষটার ক্ষত থেকে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছিলো, তাকে ও কোথায় যেন দেখেছে। কোথায়! না, ও মনে করতে পারছেনা। আর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকা ছায়ামূর্তিটাই বা কে! সবকিছু অদ্ভুত মনে হলো ওর।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now