বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লিখেছেনঃ মাসুদ শরিফ
অনেকবার শুনেছি। জনপ্রিয় কোনো উপন্যাস বা গল্প নিয়ে যখন ছবি বানানো হয়েছে তখন সেটা বেশিরভাগ পাঠকদের আশাহত করেছে। তাদের কল্পনার সাথে একেবারেই কোনো মিল নেই। একটা চরিত্রকে কিংবা জায়গাকে তারা মনে মনে যেভাবে রাঙিয়েছিল, সিনেমার পরিচালক সেভাবে ফোটাতে পারেননি। তাদের মন ভরেনি।
.
আবার অনেকসময় এমন হয়—বিশেষ করে উপন্যাসটির যদি দ্বিতীয় খণ্ড থাকে, বা ঐতিহাসিক কোনো উপন্যাস হয়—একবার মূল চরিত্রে যাকে নেওয়া হয়, পরেরবার সেই উপন্যাস পড়ার সময় তার চেহারাই মনে ভাসে। সিরাজউদ্দৌলা নাম শুনলে এখনো আমার প্রবীর মিত্রের মতো আলাভোলা, গোবেচারা, দাড়িবিহীন লোকটার মুখ মনে পড়ে। কিংবা হ্যারি পটারের নাম শুনলে ড্যানিয়েল রেডক্লিফের চেহারা ভাসে।
.
গল্প যদি কাল্পনিক বা ফ্যান্টাসি জগৎ নিয়ে হয় তাহলে কখনো কখনো তা হাস্যকর হয়। আলিফ লায়লার জ্বিন দ্রষ্টব্য!
.
হাতে গোনা দুএকটি সিনেমা কখনো কখনো পাঠকের প্রত্যাশা মেটাতে পারে বা ছাপিয়ে যেতে পারে।
.
আসলে একজন ভালো লেখক তার কল্পনার সাথে শব্দের বুননে যে প্রায়-নিখুঁত চিত্র আঁকেন তা তার একান্ত নিজস্ব। সাদা জমিনে কালো হরফের সেই বুনট পাঠকের মনে যে ছাপ ফেলে তা-ও পাঠকের ব্যক্তিগত। একই কাহিনি দুজনের মনে দুধরনের ছবি তৈরি করে। যার যার মনের ছবি তার তার মতো। সেটা তার কাছেই সেরা। এর কোনো বিকল্প, বাস্তব মূর্তি হয় না। শব্দ দিয়ে ছবি নির্মাণের লেখকদের এই যে কারিশমা তা মোটেও সহজ না।
.
এখন এই লেখক যদি হোন লেখকদের স্রষ্টা নিজে, তাহলে সেই বর্ণনা কতটা সচিত্র, কতটা স্পষ্ট, কতটা রঙিন হতে পারে তা কি চিন্তা করা যায়? একটা উদাহরণ দেখি:
أُوْلَئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِّن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُّتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ نِعْمَ الثَّوَابُ وَحَسُنَتْ مُرْتَفَقًا
“তাদের জন্য থাকবে স্বর্গীয়সুখের বাগান। এর নিচ দিয়ে থাকবে ঝরনাধারা। সোনার কঙ্কণে সজ্জিত থাকবে তারা। গায়ে থাকবে মিহি আর বুটি রেশমের সবুজ পোশাক। মখমলের আসনে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। আহ! কী সৌভাগ্যময় পুরস্কার! থাকার জন্য কী মনোরম জায়গা!” [কুর’আন ১৮:৩১]
.
কী, পড়তে পড়তে মনে কল্পনা ডালপালা মেলেছে না?
.
একটা বাগান, তার নিচ দিয়ে কুলকুল ঝরঝর ঝরনা, হাতে সোনার কঙ্কন, গায়ে রেশমি পোশাক—সবুজ পোশাক, সোফায় হাতের উপর ভর করে হেলান দিয়ে বসা কিছু পবিত্র মুখশ্রী—যেন দেখতে পাচ্ছি সবকিছু।
.
মহান আল্লাহর কথার নির্যাসটুকু নিজের শব্দে এঁকেছেন তাঁর মনোনীত বার্তাবাহক মুহাম্মাদ (তাঁর উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও শান্তি বর্ষিত হোক) এভাবে: “ওদের খানাপিনার পাত্রগুলো হবে সোনা আর রূপোর। এমনকি চিরুনিটাও হবে সোনার। ওদের ধূপের লাকড়ি থেকে সুবাস ছড়াবে। আর ঘাম থেকে ভুরভুর করবে মিশকের খুশবু।” (বুখারি, ৩২৬৪)
.
বিশ্বাস করুন, এই হাদীসটা অনুবাদ করার সময় আমার জানালা বেয়ে লাকড়ির চুলোর গন্ধ ভেসে আসছিল। আপনাদের কেমন লাগে জানি না, এই লাকড়ির গন্ধেও এক ধরনের মাদকতা আছে। সেই মাদকময় গন্ধে যদি সুঘ্রাণ মিশে থাকে তাহলে তো মনে হয় শুধু ঘ্রাণের রাজ্যেই হারিয়ে যেয়ে এক জীবন পার করে দেওয়া যাবে। শুনেছি ফোর-ডি সিনেমা হল নাকি বানাচ্ছে। ওখানে নাকি ঘ্রাণও সাপ্লাই করা হবে। জান্নাতি মিশকের সুবাস কোথায় পাবে তারা?
.
জান্নাতের আরও কিছু ছবি দেখুন:
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُّتَقَابِلِينَ
.
“তাদের মন থেকে দূর করে দেব সব ধরনের তিক্ততা। ভাইভাইয়ের মতো সোফায় সামনাসামনি বসে থাকবে তারা।” [কুর’আন ১৫:৪৭]
.
ঠিক যেমন আজ দীনি ভাইয়েরা একসাথে বসে পবিত্র কিছু সময় কাটান। জান্নাতি সাথীরাও তেমনি সামনাসমানি বসে আলাপ করবেন। সুখদুখের কথা কইবেন। কী হবে তাদের সংলাপ?
قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا مُشْفِقِينَ o فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ o إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلُ نَدْعُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْبَرُّ الرَّحِيمُ
.
“কেউ কেউ আলাপ করবে, ‘দুনিয়াতে থাকতে কী ভয়ের মধ্যেই-না ছিলাম। আল্লাহ আমাদের অসম্ভব করুণা করেছেন। প্রচণ্ড উত্তপ্ত শাস্তির হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আমরা তো তাঁর কাছে এই দু‘আই করতাম ভাই। তিনি সত্যিই দানশীল। করুণার আধার।’” [কুর’আন ৫২:২৬-২৮]
قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ o يَقُولُ أَئِنَّكَ لَمِنْ الْمُصَدِّقِينَ o أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَدِينُونَ o قَالَ هَلْ أَنتُم مُّطَّلِعُونَ o فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاء الْجَحِيمِ o قَالَ تَاللَّهِ إِنْ كِدتَّ لَتُرْدِينِ o وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ
.
কেউ বা বলবে, “‘জানেন, দুনিয়াতে আমার এক কাছের বন্ধু ছিল। সে বলত, ‘তোমার কি আসলেই মনে হয় মরে যাওয়ার পর যখন হাড্ডিমাংস মাটির সাথে মিশে যাবে, তখন আবার বিচারের জন্য আমাদের তলব করা হবে?’
.
“আল্লাহ বলবেন, ‘তাকে দেখতে চাও?’ লোকটা তখন নিচে তাকিয়ে দেখবে সেই লোক জাহান্নামের আগুনে পুড়ছে। তাকে দেখে বলবে, ‘আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে খাদের কিনারায় ফেলে দিচ্ছিলে প্রায়। আমার প্রভুর করুণা না-থাকলে তো আজ তোমার মতো আমাকেও জাহন্নামে ছুড়ে ফেলা হতো।’” [কুর’আন ৩৭:৫১-৫৭]
.
আচ্ছা এ তো গেল গপসপের ছবি। কথা বলতে বলতে তো খিদে পাবে। তখন কী খাবে তারা? ভোজনপর্বটা কেমন হবে?
يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ o وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ o لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْهَا تَأْكُلُونَ
.
“সোনার থালা আর গ্লাস তাদের সামনে দিয়ে যেতে থাকবে। এতে থাকবে তাদের মন যা যা চায় তার সব। যা দেখে চোখ ভরে যায়। তোমরা সেখানে থাকবে নিরবধি।
“দুনিয়াতে তোমরা যা করে এসেছ, তার বিনিময়ে তোমাদেরকে এই জান্নাতের বাগান একেবারে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের খাওয়ার জন্য এখানে আছে অঢেল ফলমূল।” [কুর’আন ৪৩:৭১-৭৩]
.
বুফে লাঞ্চের ছবি মনে আসছে না? কিংবা সকালে নাশতার টেবিলে লাল-হলুদ বাহারি রঙের, রকমারি স্বাদের ফলমূলের ডেলা?
খাওয়াদাওয়ার পর তো তৃষ্ণা পাবে। তখন কী খাবে?
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارٌ مِّن مَّاء غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِّلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاء حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءهُمْ
.
“জান্নাতে থাকবে পানির নদী, যার স্বাদে-গন্ধে কোনো পরিবর্তন আসবে না। থাকবে দুধের নদী। এরও স্বাদে কোনো পরিবর্তন হবে না। [বেমাতাল] শরাবের নদী। পানকারীদের জন্য অত্যন্ত মজার। আরও আছে ছাঁকা মধুর নদী। …” [কুর’আন ৪৭:১৫]
.
যেন দিব্য চোখে নদীগুলো দেখতে পাচ্ছি!
.
সূরা আর-রাহমানের ৪৬-৭৮ আয়াতে জান্নাতের অনেকটা স্ন্যাপশটের মতো আছে প্রায়। চলুন স্ন্যাপশটটা খুলি:
“যারা তাদের প্রভুর সামনে দাঁড়াবার ভয় মনে রাখে, তাদের জন্য থাকবে দুটো বাগান…
তাতে ছায়াঘেরা ডালপালার বিস্তৃতি…
সাথে থাকবে একজোড়া ঝরনাধারা…
সব ধরনের ফল থাকবে থোকায় থোকায়…
নকশি কাপড়ে মোড়া সোফায় বসে ফল পেড়ে পেড়ে খাবে তারা…
তাদের জন্য আছে আয়তনয়না কুমারী, যাকে এর আগে স্পর্শ করেনি কোনো মানুষ কিংবা জ্বিন…
যেন লালকান্তমণি কিংবা ঝিনুকের মাঝে সযতনে লুকিয়ে রাখা মুক্তো…
ভালোর প্রতিদান ভালো ছাড়া আর কিছুতে কি হয়?…
এই দুটো ঝরনা বাদেও থাকবে আরও দুটো বাগানে…
সবুজে সবুজময় বনানী…
তাতেও থাকবে একজোড়া ঝরনাধারা…
থাকবে ফল—খেজুর আর ডালিম…
কোমনীয় আর রূপবতী কুমারী…
ডাগর কালো চোখ, থাকবে সুসজ্জিত নিরাপদ শিবিরে …
যাকে এর আগে ছুঁয়ে দেখেনি কোনো মানুষ না জ্বিন…
তারা সবাই বসবে সবুজ সোফা আর মিহি গালিচায়,
এরপরও তোমরা তোমাদের প্রভুর কোন অনুগ্রহটাকে অস্বীকার করবে?” [কুর’আন ৫৫:৪৬-৭৭]*
.
নিজের কল্পনা আর ভাষাশক্তির সীমাবদ্ধতায় এর চেয়ে ভালোভাবে আর স্ন্যাপশটটা ফুটিয়ে তুলতে পারছি না। আর তাছাড়া কখনো কল্পনা এমন বাঁধ ভাঙে যে তা ভাষায় ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা খোদ বড় বড় সাহিত্যিকরাও ছেড়ে দেন। আর এই বর্ণনা যখন স্বয়ং আল্লাহর, তখন কার সে সাধ্যি? আমরা শুধু আমাদের চেনাজানা পৃথিবীর অভিজ্ঞতায় কিছুটা আঁচ করতে পারি। ঠিক যেভাবে শীতের রাতে খড়কুটো কুড়িয়ে চারপাশে গোল হয়ে বসে মানুষ আগুনের তাপ নেয়। সে আগুনে পুড়তে হলে যে ঝাপ দিতে হবে। পরকালে জান্নাতে না-ঝাপ দিয়ে তা খুটিয়ে খুটিয়ে বলার সাধ্য কার?
.
জান্নাতের ছবির সবচেয়ে সেরা দৃশ্য আল্লাহর দর্শন। সেই মহামহিম, সেই মহান প্রভু, সেই স্রষ্টা, যিনি তাঁর নিজের হাতে গড়েছেন আমাদের, প্রাণ দিয়েছেন, সুখভোগের নানা জিনিস ছড়িয়ে দিয়েছেন, সব সুন্দরের স্রষ্টা যিনি, সেই সুন্দরতম সত্ত্বাকে জান্নাতিরা তাদের চর্মচক্ষে দেখবে। নজরের পর নজর কেটে যাবে। যুগের পর যুগ। আলোর গতিতে পার হয়ে যাবে কয়েক লগন কিংবা বছর। তবু আল্লাহর সৌন্দর্যের ঝলক কাটবে না। রেশ ফুরোবে না। সৃষ্টি তার স্রষ্টার সৌন্দর্যে অবগাহিত হবে কালান্তর। আছে কোনো গ্রাফিক্স ডিজাইনার, অ্যানিমেশন মুভির পরিচালক যিনি এই দৃশ্যের রূপ দিতে পারবেন? আছে?
.
অতএব টিকেট কেটে যদি কোনো ছবি দেখতেই হয়, তাহলে মানুষ এই জান্নাতের ছবির টিকেট কাটুক। “প্রতিযোগিতা যদি করতেই হয় মানুষ এর জন্য প্রতিযোগিতা করুক” [৮৩:২৬], “শ্রম যদি দিতেই হয় মানুষ এর জন্যই শ্রম দিক” [৩৭:৬১]। কারণ, এই জান্নাত, এই সুরলহরি, এই শান্তির পরশ “কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, কোনো হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি” [বুখারি # ৩২:১৭] —“কেউ জানে না তার কাজের বিনিময় হিসেবে কী সব মনজুড়ানো আনন্দ গুছিয়ে রাখা হয়েছে”। কেউ না!
——————————————
*গ্রন্থপঞ্জি ড. ‘আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী, দ্যা নব্ল লাইফ অফ দ্যা প্রফেট, খণ্ড ১, রিয়াদ: দারুস-সালাম পাবলিকেশন, ২০০৫।
* গদ্যের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য শেষের “ফাবি আয়্যি ‘আলা…” আয়াতের ভাবানুবাদ ছাড়া বাকিগুলো স্কিপ করেছি।
.
__________________________
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now