বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
জাদরেল জনি পার্ট ২
"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ʀɪᴍᴜ (০ পয়েন্ট)
X
জনির বাবা আনোয়ার চৌধুরী জীবনে অনেক কিছুই করতে চেয়েছিলেন। কিছুই হয়নি। কলেজে থাকার সময় খুব ভালো বিতর্ক করতেন, আবৃত্তিতে প্রথম স্থান ছিল তার বাঁধা। স্যারদের সবার বিশ্বাস ছিল একদিন এই ছেলে দেশ মাতিয়ে দেবে। দেশ মাতানোর একটা সুযোগ এসেছিল তার সামনে। তার কলেজ দল গিয়েছিল টিভি বিতর্কে। পুরো শহরে তুমুল উত্তেজনা। এবার আনোয়ারের খবর পুরো দেশ জানবে। কিন্তু কিসের কী! রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি স্ক্রিপ্ট ভুলে গেলেন। তাতেও সমস্যা ছিল না কোনো, নিজে থেকেই যুক্তি দিতে পারতেন, প্রতিপক্ষদের উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা ছিল তার। আশ্চর্য, সেদিন মাথায় আসে না কিছুই। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেই খুব চেনা কবিতাটাও সময়ে মনে এলো না। কলেজের প্রিন্সিপাল অনুষ্ঠান শুরুর আগে সবাইকে বলছিলেন, ‘দেখবেন ছেলে একটা!' তিনি অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সময় বাথরুম করার নাম করে গিয়ে আর ফিরে এলেন না। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বললেন, 'এই আপনাদের দেশ কাঁপানো বিতার্কিক। ছি!'
বিস্তর গঞ্জনা সইতে হলো। শহরের আনাচে-কানাচে তাকে নিয়ে হাসাহাসি। এরপর আর বিতর্ক চলে না। গান তবু চলেছিল। সেখানেও তুখোড় ছিলেন তিনি। সবার আশা ছিল জায়গামতো যেতে পারলে তার গানের সুরে পুরো দেশ উথাল-পাথাল হবে। হয়নি কিছুই। অফিসের বার্ষিক বনভোজনে গান গাওয়ায় এসে ঠেকেছে তার গায়কী ক্যারিয়ার। আনোয়ার চৌধুরী অবশ্য দমে গেলেন না। তাঁর বারবার মনে হলো, নিজের যে স্বপ্নগুলো অপূর্ণ রয়ে গেছে সেগুলো পূরণ করবেন সন্তানদের দিয়ে। জীবন হচ্ছে একটা ওয়ানডে ম্যাচ, একবারই সুযোগ কিন্তু এখানেও টেস্ট খেলার সুযোগ আছে। নিজে না পারলে বাচ্চাদের দিয়ে সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করা যায়। তাঁর সেই অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণের ভার চাপিয়ে দিয়েছেন দুই ছেলের কাধেঁ । দুই ছেলে জনি আর মনিকে তিনি গান শেখাচ্ছেন, ছবি আঁকা শেখাচ্ছেন, অভিনয় করাচ্ছেন, বক্তৃতার অনুশীলন করাচ্ছেন। এই বিষয়ে তিনি এত কঠোর যে মাঝেমধ্যে স্ত্রীর সঙ্গে লেগে যায়। মা সহ সরল মফস্বলের মহিলা, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে তাঁর কোনো উৎসাহ নেই, তার মতে গান-ছবি এসব হচ্ছে পড়াশোনার পথের বাধা, কাজেই প্রায়ই তিনি ঝগড়া বাধিয়ে বসেন। আজ যখন আনোয়ার চৌধুরী বললেন জনি আমাদের সঙ্গে যাবে না তখন তিনি স্বভাবতই জানতে চাইলেন, কেন? আজ তো আর স্কুল নেই।
স্কুল নেই কিন্তু এর চেয়েও বড় কাজ আছে।
কী কাজ?
ওকে আমি শনিবার পাঁচটা কবিতা মুখস্থ করতে দিয়েছিলাম। এখনো দুটো বাকি। আজ শুক্রবার। আজকের মধ্যেই করতে হবে।
মা অবাক হয়ে বললেন, আমরা সবাই বিয়ে খাব আর ও ঘরে বসে বসে কবিতা মুখস্থ করবে? বসে কিংবা দাঁড়িয়ে কিংবা শুয়ে যেভাবে ইচ্ছে করবে। সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু আমি ফিরে এসে ওর গলায় সব কবিতা
শুনতে চাই।
তোমার এসব পাগলামি বাদ দাও তো।
পাগলামি! আমি পাগলামি করছি?
পাগলামি না তো কী? মানুষ যদি জানতে চায় জনিকে আনোনি কেন তখন কি আমি বলব যে কবিতা মুখস্থ হয়নি বলে ও আসেনি! মানুষ শুনলে বলবে কী?
মানুষকে শোনানোর দরকার কী? ঠিক আছে তুমি যাও। আমি যাব না।
ওহ হো। তুমি যাবে না কেন? তোমার তো আর কবিতা মুখস্থ করা বাকি নেই।
আমার ছেলেকে রেখে আমি যাব না। আনোয়ার চৌধুরী উত্তেজিত না হয়ে বলেন, এমন না যে ও দুধের
ছেলে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। ক্লাস সেভেনের ছেলেকে রেখে তার মা কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারবে না এটা কোথায় লেখা আছে?
আমি যাব না।কোনো অসুবিধা নেই। তুমি যেয়ো না। আমি যাব মনি তুই কি যাব? নাকি তুই... মনি লাফ দিয়ে উঠে বলল, আমি যাব না মানে... বাবা আমরা দুজন
গিয়ে চারজনের খাবার খাব। কী মজা।
আনোয়ার চৌধুরী একটু হতাশ বোধ করেন। বিচিত্র কারণে তাঁর ক্লাস সিক্সে পড়া এই ছেলেটির খাবারের প্রতি মারাত্মক লোভ। বড় লজ্জার কথা । মা অবশ্য শেষমেশ যেতে রাজি হলেন। কারণ, বিয়ে উপলক্ষে তিনি নতুন একটা শাড়ি কিনেছেন। এটা সবাইকে দেখাতে হবে। কিনেছেন এক হাজার টাকা দিয়ে। কিন্তু ঠিক করেছেন বলবেন, আড়াই হাজার টাকা দাম।
সাড়ে তিন হাজার টাকা চেয়েছিল কিন্তু তিনি এমন কায়দা করেছেন যে
দোকানদার বাধ্য হয়েছে আড়াই হাজারে ছেড়ে দিতে। এমন একটা তৈরি
করা গল্প প্রচারের সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না।
শাড়ির গল্পটা খুব জমল। তারা বরপক্ষের হয়ে গেছেন, কনেপক্ষের একজন গল্পটা শুনে বললেন, বাহ্! দারুণ তো। এরপর থেকে আপনাকে নিয়ে শাড়ি কিনতে যাব। আমাকে খুব ঠকিয়ে ফেলে। এই যে দেখেন, এই শাড়িটা কিনেছি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কিন্তু আপনারটা এর চেয়ে কত সুন্দর! কেউ বলবে আমারটার দাম পাঁচ হাজার টাকা?
শাড়ি এবং মহিলাদের গল্প দুই বিষয়েই জনির মায়ের খুব স্পষ্ট ধারণা আছে। তিনি বুঝতে পারেন মহিলা শাড়ির দামটা বাড়িয়ে বলছেন ৷ কিন্তু কী আর করা! বানানো গল্প বলতে হলে কিছু বানানো গল্প শুনতেও হয়।
গল্প-টল্প নিয়ে ভালোই ছিলেন। কিন্তু খাওয়ার টেবিলে গিয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তার ছেলে একা বাসায়, এমন কিছু খাবার নেই, কাল রাতের বাসি ছোট মাছ দিয়ে খেতে হবে, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ঠিকমতো খাবার গলায় উঠল না। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে তিনি ফেরার তাড়া দিতে থাকলেন। শাড়ির গল্প বলার আরেকটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর আর ভালো লাগে না। বারবার মনে হয়, একটু খাবার যদি কোনোভাবে তাঁর ছেলেটার জন্য নিয়ে যাওয়া যেত!
তাঁর চোখে পানি এসে যায়। আনোয়ার চৌধুরীর ওপর খুব রাগ হয়। লোকটা দিব্যি খাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে হেসে গল্প করছে। ছেলেটার প্রতি কোনো মায়াই নেই। বড় নিষ্ঠুর ।ফেরার পথে তাই ঝগড়াও হলো একদফা ঠিক করলেন বাসায় ফিরেই
তিনি ছেলের জন্য পোলাও রান্না করবেন। ঘরে মুরগির মাংস নেই, কিছু
গরুর মাংস বোধহয় ফ্রিজে আছে, সেগুলো বের করে বিয়ের খাবারের মতো
একটা রেজালা রান্না করবেন। ঘরে ঢুকেই তাই তিনি জনির কাছে জানতে চাইলেন, তুই খেয়ে ফেলেছিস বাবা?
প্রশ্নটা শুনেই জনির বুক শুকিয়ে যায়। খায়নি, এটা বললে তো বাবা খেপে আগুন হয়ে যাবেন। জনি একটু ভেবে বলল, পানি ছিল না তো। তাই গোসল করা হয়নি। ভেবেছিলাম গোসলের পর খাব।
খুব ভালো করেছিস। খুব ভালো। তুই গোসল কর। এই ফাঁকে আমি
তোর জন্য...
মা ছুটে যান রান্নাঘরের দিকে। তাঁর এই ব্যস্ততায় জনি অবাক। খুশিও। মা আজ পুরোপুরি তার পক্ষে থাকবেন। আচ্ছা বাবা কোথায়? উনি সঙ্গে আসেননি। নিরাপত্তার জন্য এই সময়ের মধ্যে দুটো কাজ করতে হবে তাকে। প্রথমত, লোকটাকে বের করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কবিতা দুটো মুখস্থ করার চেষ্টা করতে হবে। এই সময়ে এটা সম্ভব নয়, একটা কবিতা খুব লম্বা আর দীর্ঘ কিন্তু হাতে বই নিয়ে বসে আছে দেখলে বাবা খুব বেশি শাস্তি দেবেন না।
জনি কায়দা করে নিজের ঘরের দরজা লাগিয়ে উপুড় হয়ে বসতেই লোকটি বলল, তোমার খাটের নিচে শুয়ে থাকা তো খুব আরামের। আরাম!
হ্যা। বেশ ওম লাগছে। মাঝেমধ্যে এসে এখানে থেকে যাব। খুব
আরাম।
বলেন কি! এখান থেকে তো ইঁদুর বের হতে দেখি। ইঁদুর মারার ওষুধও দেয়া হয়।
ও ওষুধের গন্ধ! আমি তো ভেবেছিলাম এখানেও বোধহয় পারফিউম দেয়া হয়। যাই হোক আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, আমি সুবিধামতো সময়ে বেরিয়ে যাব।
তাড়াতাড়ি করতে হবে। বাবা চলে আসলে কিন্তু সর্বনাশ। এ সময়ই আবার কলিং বেল। জনির কলজা শুকিয়ে গেল। আবার কে
এলো!বাবা। হাতে বেশ কয়েকটা প্যাকেট ে সোজা চলে গেলেন রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে প্যাকেটগুলো রেখে বললেন, এই নাও মুরগির মাংসও নিয়ে এসেছি। রোস্ট বানাও। আমরা যা যা খেয়েছি তার সবই ছেলের জন্য রান্না করো।
জনির মায়ের চোখে পানি এসে যায়। উনি মানুষটাকে কী ভুল বুঝেছিলেন। আবার বুঝতে পারেন, বাবা আর মায়ের আদরের ধরন দুই রকম। মাদেরটা হয় খুব প্রকাশ্য। বাবাদেরটা গোপন কিন্তু গভীর। তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রান্নায় হঠাৎ তাঁর খেয়াল হলো, পোলাওয়ের
চালটা রাখা আছে জনির খাটের নিচের একটা ব্যাগে।
তিনি জনির ঘরে গিয়ে দেখেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে আবার জনির গলা শোনা যাচ্ছে। কার সঙ্গে কথা বলে?
দরজা ধাক্কা দিলেন। কথা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু দরজা খোলে না।
আবার ধাক্কা দেন। বেশি জোরে না। তাহলে জনির বাবা চলে আসবেন। ভেতরে যদি এখন সত্যিই কেউ থাকে তাহলে হুলস্থূল কাণ্ড বাধাবে। আস্তে আস্তে তিনি দরজা ঠেলতে থাকেন।
দরজা খুলে দেয় জনি। ওর চেহারায় কেমন যেন একটা ভয়ের ছাপ । মা ভালো করে চেয়ে বলেন, কবিতাগুলো মুখস্থ হয়নি, না!
না।
চিন্তা করিস না। তুই প্রথম দুই লাইন করে শিখে রাখ। শুধু শুরু করবি, বাকিটা আমি সামলে নেব।
জনি মাথা নাড়ে।
মা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলে যান ওর খাটের দিকে। তারপর ওকে
বিস্মিত করে বসে যান। জনি আর্তনাদের মতো করে বলে, মা।
কী?
তুমি ওখানে কী খুঁজছ?
চাল। পোলাওয়ের চালটা খাটের নিচে ।
পোলাও লাগবে না। ভাত খাব আমি। ভাত খুব ভালো। খুব মজা।
মা একটু অবাক হয়ে বলেন, রাগ করেছিস বাবা? আমি তোকে রেখে
চলে গেছি বলে... না। মা ভাত খুব ভালো। পোলাওয়ে ঘি-ডালডা এসব দেয়া হয়, ওগুলো খেলে পেট খারাপ হয়। খুব খারাপ।মায়ের চোখে পানি এসে যায় প্রায় বলেন, রাগ করিস না বাবা। তোর বাবাও দেখ, ঘরে মুরগির মাংস নেই জেনে ফেরার পথে নেমে মুরগি নিয়ে এসেছে। তোর বাবা মানুষটা খারাপ না, তোদের নিয়ে ওঁর স্বপ্নটা অনেক বেশি।
মা পোলাও খুব খারাপ।
মা আবার বলেন, আমার বাবা রাগ করেছে। রাগ করিস না বাবা। বলে মা খাটের নিচে ঢুকে যান।
জনির বুকে কেউ যেন পাথর দিয়ে আঘাত করছে। এখন কী হবে? বাবা লোকটাকে দেখে নিশ্চয়ই ওর কান টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন। উফ!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now