বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ঘটনাটা বেশ কিছুদিন আগের। নীলক্ষেতে বই কিনতে এসেছি। ফুটপাতে থরে থরে বই সাজানো। আমি একটার পর একটা বই ঘেটে দেখছি। উদ্দ্যেশ নতুন কয়েকটি বই কেনা। ইদানীং বিদেশি ভাষা থেকে অনুবাদ করা বইগুলো বেশি পড়া হচ্ছে। তো বই ঘাটতে ঘাটতে চামড়ায় বাধানো খয়েরী রঙের একটা পুরনো মলাটের বই পেলাম। বইটির মলাটে সোনালী রঙে গোটগোট করে লেখা "দ্যা মিস্ট্রি অফ ইথার"। বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়,
- বাবা বইটার জন্য আমি টাকা নিতে পারব না। আপনি এমনেই এইটা নিয়ে যান
- চাচা বইটা তো আপনাকে কিনতে হয়েছে?
লোকটা জানালো বইটি তাকে কিনতে হয়নি। কেউ একজন এসে দিয়ে গ্যাছে। তাই কিছুতেই সে টাকা নেবে না। অগত্তা বইটি নিয়ে আরও দু চারটে বই নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
কয়েক দিনের কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনে এক খন্ড অবসর পেলাম। বিকেলে বিছানার ডিভানে মাথা দিয়ে বইটি হাতে নিলাম। নামটা কি রকম অদ্ভুত ঠেকল। লেখকের কোন নাম নেই! বইটির ভেতরের পৃষ্ঠা খুলতেই অবাক হয়ে গেলাম। কারণ ভেতরে প্রত্যেক পৃষ্ঠায় হাতে লেখা কারোর দিনলিপি! অথচ সেদিন দেখার সময় স্পষ্ট মনে আছে বইটা ইংরেজি ভাষায় লেখা। অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ঠেলে ফেলে ডায়েরিটা পড়া শুরু করলাম।
" সেদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে আবিস্কার করি এক অচেনা অজানা নদীর তীর ঘেষে একটা পথে দাড়ানো অবস্থায়। আবছা অন্ধকার দেখে বুঝতে পারলাম রাতেরবেলা। দূর আকাশের দিকে তাকাই.. একটা দূরবিত্ত মেঘ চাদকে ঢাকতে গিয়ে দারুণভাবে ঘোরাঘুরি করছে। চারদিকে কবরের মতন নির্জনতা। সামনে তাকালে চোখে পড়ল একটা নদী, পানির গভীরতা অল্প। সে পানিতে খেলছে চাঁদ, দু চারটে জোনাকি পোকা উড়োউড়ি করছে এখানে ওখানে। নদীর দুদিকে দুটো তীর ঘেষে দুটো পথ চলে গিয়ে দিগন্তে মিশেছে, এর বাইরে অন্য কোন পথ নেই। চারদিকে বিস্তৃত ফসলের ক্ষেতে, সেখানে ধানের চারা বেড়ে উঠেছে। আনমনে নদীর তীর ধরে হাটছি তো হাটছি। চারদিকে শুণ্য জনমানবহীন, ঝিঝিপোকার ডাক অবধি নেই। একা একা হাটতে বেশ ভয় লাগছিল। কতক্ষণ হেটেছি খেয়াল নেই। একটা বয়স্ক মানুষ আমার ঘোর ভেঙে দিল।
- মুরুব্বী শুনছেন.. এই পথের শেষ কোথায়? বের হব কি করে?
লোকটা আমার দিকে ফিরে তাকালো। গায়ে পাঞ্জাবীর মত সাদা রঙের আলখেল্লা, মাথায় টুপি, মুখে সাদা ধবধবে চাপ দাড়ি দেখে মনে হলো বোধহয় লোকটা নিষ্পাপ। লোকটাকে চেনার আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য হলো লোকটার কপালের মাঝ বরাবর কালো দাগ। আম্মা বলতেন যে মানুষ পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তার মাথায় এমন দাগ উঠে। অবশ্য এই ব্যাপারে সত্য মিথ্যা জানিনা। লোকটা হাসিমুখে ছিলেন সে হাসিতে কোন বাড়াবাড়ি নেই। লোকটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিলেন।
- এই পথের শুরু জন্ম, শেষে মৃত্যু
- কে আপনি?
- আমি আপনাদের গোত্রের নই। আপনার কৌতুহল মেটাতে আমার আগমন। জানতে চাইলে জিজ্ঞেস করুন
আমি ওনার এমন উত্তরে বিস্মিত হলাম। আচমকা পায়ের দিকে নজর গেল। উনার সাদা আলখাল্লা পা ঢেকে রেখেছে কিন্তু উনি মাটি থেকে সামান্য শুন্যে ভাসছেন। উনার এমন প্রকৃতি আমার মনে ভাবান্তর হলো না। অথচ অন্য সময় হলে হয়তো ভয়ে জ্ঞান হারাতাম। উনাকে আমার বেশ আপন মনে হলো তাই ভয় পাবার প্রশ্ন আসে না। আমি নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
- আমি কোথায় আছি?
- আপনি জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থায় আছেন
এবার আমি অবাক হয়ে গেলাম। জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থায়? ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না। পড়ে জেনেছি জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থাকে ইংরেজিতে "Limbo" (লিম্বো), "Intermediate State" অথবা বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় "Borderline state" বলা হয়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে মৃত্যুর ঠিক পূর্ববর্তী অবস্থাকে "Agonal state" বা মুমূর্ষু অবস্থা বলা হয়। ইসলামে জীবন ও মৃত্যুর এই মধ্যবর্তী অবস্থাকে "বারজাখ" বলা হয়। তবে ওই ব্যাপারে না ঘেটে পরের জিজ্ঞাসায় গেলাম।
- আমি এইখানে কেন? কিভাবে এলাম?
- এই নদীতীরের পুরো পথটা হচ্ছে আপনার জীবনের আয়ুস্কাল। পথের মাঝামাঝি কোথাও আপনি আছেন। নদীটির গন্তব্যস্থল হলো সমুদ্র, সমুদ্রর রুপক অর্থে মৃত্যুর জীবনের শুরু। সমুদ্র তথা মৃত্যুকে পেরিয়ে আপনি নদীর ওপারে যেতে রুহের(আত্না) পথে পরিভ্রমণ করতে পারবেন। এর শেষ হবে স্রষ্টার নিকট আপনার সমগ্র জীবনের আমল নামার হিসেব ও তার পুরুস্কার দিয়ে।
আমাদের আলাপচারিতার ভেতর নদীর ওপারের পথটা খানিক আলোকিত হলো। সেখানে এক লাইনে কতগুলো সাদা চাদরে মোড়ানো মানুষ ধীর পায়ে হেটে যাচ্ছে দূরে দিগন্তের দিকে। ওদের মুখের অবয়ব পরিস্কার নয়। হালকা আওয়াজ শুনে মনে হলো লোকগুলো গুনগুন করে কিছু একটা জপছে। আওয়াজ বেশ অস্পষ্ট তবে কানে আরাম দেয়। ওদের হাতে অথবা সাথে হারিকেনের মত সাদা ভেলভেট কাপড়ে মোড়া হলুদ আভার আলোক শিখা। যেগুলো মৃদু জ্বলছে। এবার আমার সামনে দাড়ানো মুরুব্বী বললেন -
- ওনারা রুহের জগতে পরিভ্রমণ করছেন
- উনারা তবে আত্না? আমরা কি নদী সাতরে আত্নাদের কাছে যেতে পারিনা?
- জনাব আপনার চিন্তায় গভীরতা আনুন উত্তর পেয়ে যাবেন। এই নদীর জল হচ্ছে জীবন ও মৃত্যুর মাঝে অদৃশ্য বাধা। চিরসত্য হলো দুনিয়ার জীবিত কেউ মৃতদের অতিক্রম করতে পারে না যতক্ষণ না সে তাদের(মৃতদের) অবস্থায় পৌছায়
- উনারা তো বেচে নেই। পথ চলতে সত্যি কি আলোর প্রয়োজন আছে উনাদের?
- তাদের পাশে উড়তে থাকা আলোক শিখাগুলো হলো তাদের জীবনের ভালো কাজের সমন্বয়। যে হৃদয় যতটা ভালো, কল্যাণময়, আলোকজ্জল, তার পাশের আলোক শিখা ততটা উজ্জ্বল
এবার শেষ প্রশ্নটা করতে চাই। দুনিয়ায় নিজের শেষ দিন সম্পর্কে। তাই কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জানতে চাই,
- আমি আমি কি তবে তাদের সাথী হচ্ছি?
- সে খবর আমার আয়াত্তের বাইরে। হয়তো কিছুটা দেরীতে অথবা শিঘ্রই। জন্মালে মরতেই হবে। তোমার পূর্বজরা চলে গিয়েছেন, তোমাকে সামনে চলে যেতে হবে, তোমার উত্তরসূরীদেরও চলে যেতে হবে, যারা হয়তো এখনো দুনিয়ায় আসে নি। তোমার সাথে কিছুই থাকবে না তোমার ভালো মন্দের হিসেব ব্যাতীত.. এ সত্য সহজ সত্য অথচ নিদারুণ নিষ্ঠুর নির্দয় সত্য।
কথা শেষ হওয়ার পর লোকটা কেমন অস্পষ্ট হয়ে গেল। নিজেও ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার অনুভুতি পাচ্ছিলাম। ঠিক মরে যাচ্ছি নাকি নতুন করে জ্ঞান হারাচ্ছি ঠাওর করতে পারলাম না। যখন চোখ মেললাম নিজেকে পেলাম বিছানায় শোয়া অবস্থায় উপরে ছাদ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বিপ বিপ করে কিছু একটার আওয়াজ ভেসে আসছিল কানে বোধহয় হারটের পালস রেট। বুঝতে পারলাম আমি এখন হাসপাতালে। শরীরের অসম্ভব ব্যাথা অনুভুত হলো বোধহয় শরীরে কাটাছেঁড়া আছে। আমার মস্তিষ্ক তখনও সচল ছিলো না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে যেমন সব কিছু ব্ল্যাংক লাগে সেরকম একটা পরিস্থিতি। ধীরে ধীরে নিজেকে আবিস্কারের চেষ্টা করলাম। আমার সাথে ঠিক কি ঘটেছে? মুহুর্তে ঠিক মনে হল আমি মাটিতে পড়ে আছি, কিছু মানুষ আমাকে ঘিরে গোল হয়ে তাদের হাতে থাকা চকচকে কিছু দিয়ে আঘাত করে যাচ্ছে। সেগুলো শরীরে বিধছে। তারপর আমার কিছু মনে নেই। আমার পরিচয় খুবই নগন্য। একটা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্য ছিলাম। আমাদের লিডার এমপির বিরুদ্ধে ছিলেন। সেদিন স্কুল মাঠে আমাদের লিডার বেশ পয়সা খরচ করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমপির ছেলেরা এসে ঘিরে ধরল। আমাদের প্রস্তুতি ছিল না তাই অনেকেই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল। আমি আয়োজনের দায়িত্বে ছিলাম তাই আমার প্রতি আক্রোশ ছিল বেশি। ছেলেগুলো আমাকে ঘিরে ধরল তারপর তো বলেছি।
ক্লিনিকে কতদিন ছিলাম মনে নেই। বোধহয় ঘুমের ইঞ্জেকশন দেয়া হতো। আমার বাবা একটা ছোট্ট কারখানার সামান্য সুপারভাইজার ছিলেন। আমার চিকিৎসার জন্য উনাকে জমি বিক্রি করতে হয়েছিলো। অথচ সুস্থ হবার পর আমাদের লিডার এলেন আমার সাথে লোকজন নিয়ে ছবি তুললেন, মিডিয়ার সামনে চিতকার চেচামেচি করে আমার জন্য বিচার চাইলেন। পাশে একজনকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলাম। আমাদের এমপি সাহেবকে! দলের হাইকমান্ড থেকে নাকি নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে যেতে বলা হয়েছে। অতচ সেদিন আমার সাথে সাথে আমাদের গ্রুপের আরও একজনকে এমপির লোকগুলো ঘিরে ধরেছিল। আমি টিকে গেলেও সেই ছেলেটা আজ দুনিয়াতে নেই। যাবার আগে আমাদের নেতা হাজার টাকার নোট দিলে আমি তা ফেরত দিয়ে চলে এলাম। আমার এমন আচারনে পেছন থেকে কেউ দেশদ্রোহী, কেউ রাজাকার কেউ অন্য কোন সম্ভাষনে সম্ভাষিত করলেন। আমি জানি আমার নেতার ঢাকা শহরে চারটি ফ্ল্যাট আছে, থানার চারমাথার সব চাদার টাকা ওনার পকেটে যায়। সেদিন উনার জন্য আমার প্রাণটা যাচ্ছিল। অথচ দেবার বেলায় বড্ড কৃপণতা! নেতার বাসা থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে কোন পথে যাচ্ছিলাম খেয়াল নেই। নিজেকে কেমন যেন লাগছিল। বড় মসজিদের সামনে এসে ইমাম সাহেবের তেলয়াত শুনে হৃদয়ের ভেতর তোলপাড় চলল। কেন যেন অযুখানায় ঢুকে অযু করা শুরু করলাম। মনে হলো অযুর পানির সাথে আমার সব রাগ, অহংকার, লোভ ধুয়েমুছে যাচ্ছে। মনের অজান্তে নিজেকে এক একত্ববাদীর দিকে শপে দিচ্ছি। ধীরে ধীরে বাকীদের সাথে নামাজে দাড়িয়ে গেলাম। সেদিন থেকে আমার রাজনীতির শেষ, নিজের জীবনের গল্প শুরু। বাবার সাথে প্রত্যেক দিন কাজে যেতাম, মসজিদে মনোযোগী হলাম। না,এরপর আমার কোন শত্রু ছিলো না, না আমি কারোর শত্রু ছিলাম।”
কথাগুলো শেষ হল। ডায়েরির বাকি পাতাগুলো শুণ্য। একটা পাতায় সোনালী অক্ষরে ছাপানোর মত করে কিছু লেখা চোখে পড়ল।
”পরাবাস্তব জগতে আপনার সাথে ঘটা ঘটনাটি এখানে লিপিবদ্ধ করুন”।
শর্ত জুড়ে দেয়া আছে। যেমন নিজের সাথে ঘটা ঘটনাটি ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করা গেলেও কারোর সাথে শেয়ার করা যাবে না। ডায়েরিতে আগে থেকেই লেখা ঘটনাটি চাইলে শেয়ার করা যাবে তবে পরিচয়, স্থান,কাল,পাত্র প্রকাশ যোগ্য নয়। শর্ত অনুযায়ী আমার সাথে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না তা আমি জানাতে পারছি না বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now