বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। অলংকরণঃ সৌরভ দে।
পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা। ********************★******************
২৫ জানুয়ারি, ২১৫৪ ঢাকা,
‘তাহলে প্রথম থেকে শুরু করা যাক।’ অনিল চট্টোপাধ্যায় বলে উঠলেন। প্রত্যয় নড়েচড়ে বসল। নিজের ভাগ্যকে এখনও তার বিশ্বাস হচ্ছে না। অনিল চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশের একজন বিজনেস টাইকুন। না, একজন নয়, বলা উচিত সর্বোচ্চ। তবে সেটাই শুধু তাঁর পরিচয় নয়। তিনি একজন আবিষ্কারকও বটে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর নিজস্ব আবিষ্কার কিছু কম নয়। সেইগুলোকেই বাজারজাত করে আর পেটেন্ট নিয়ে তিনি আজ বাংলাদেশের সবথেকে ধনী ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। বিজ্ঞানের আদি অকৃত্রিম পৃষ্ঠপোষক হিসাবে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের নাম আজ দেশের কোণে কোণে। সেই অনিল চট্টোপাধ্যায় তাকে নিজের থেকে ডেকে পাঠিয়েছেন! ভাবতেই আবার পেটটা গুর গুর করে উঠল প্রত্যয়ের।
“হুম, আমার কিন্তু পুরো পেপারটাই এখনও অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে।” ভদ্রলোক অনায়াস ভঙ্গীতে হেলান দিয়ে বসে আছেন বেতের সোফায়।
“ঠিক কোন জায়গাটাতে আপনার এমন মনে হচ্ছে?”
“পুরো সমাধানটাই।” অনিলবাবু বলে উঠলেন। “বিশেষ করে শুরুতেই তুমি কিছু স্বীকার্য ধরে নিয়েছ, আমার তো মনে হচ্ছে এগুলোতেই গণ্ডগোল আছে। যেমন তুমি ধরেই নিয়েছে আমাদের বিশ্বের সমান্তরালে আরেকটা প্রতিবিশ্ব আছে। কিন্তু এমনটা নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তোমার থিয়োরি তো কিছুই প্রমাণ করে না। এক কাজ কর, তুমি শুরু থেকে আমাকে সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝিয়ে বলো।”
প্রত্যয় নড়েচড়ে বসল। এটা তার প্রিয় কাজ।
“সমান্তরাল বিশ্ব বলতে কি বোঝেন আপনি?”
প্রত্যয়ের এই প্রশ্নে ভদ্রলোকের ঘন ভুরু সামান্য কোঁচকালো। চৌকো চোয়ালে বিরক্তির রেখা দেখা দিল, তাও তিনি উত্তর দিলেন, “প্রতিবিশ্ব মানে প্রতিপদার্থের বিশ্ব। যেখানে পদার্থের পরিবর্তে প্রতিপদার্থ নিয়ে জগৎ গঠিত। পদার্থ ও প্রতিপদার্থ মিলিত হলে বিপুল শক্তি নির্গত করে একক শক্তিতে পরিণত হয়। বিকট বিস্ফোরণে সব ধ্বংস হবে। অথবা মোবিয়াস এফেক্ট…”
“যেখানে কেউ যদি প্রতিবিশ্ব ভ্রমণ করে আসে তবে আগে সে ডানহাতি হয়ে থাকলে ভ্রমণ শেষ নিজেকে বাঁ-হাতি হিসাবে আবিষ্কার করবে। আর নয়তো, হৃৎপিণ্ড সরে যাবে বাঁ দিকে থেকে ডান দিকে।” কথাটা শুনেই প্রত্যয় আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সশব্দে হেসে ফেলল।
ভদ্রলোক প্রায় ধমকে উঠলেন, “এতে হাসার কি হল?”
“আজগুবি। সব আজগুবি, স্যার।” প্রত্যয় নিজেকে সামলে নিল।
“আজ তোমার কাছে যা হাস্যকর মনে হচ্ছে এক সময় এগুলোই ছিল যুগান্তকারী ধারণা। তোমার প্রস্তাবিত থিয়োরিও এমন হাস্যকরই মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার। মনে হচ্ছে তোমাকে এখনই ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, সোজা পাগলা গরাদে।” ধমকে উঠলেন ভদ্রলোক।
প্রত্যয় সোজা হয়ে বসল। না, আর ভণিতা না করে ভদ্রলোককে তার থিয়োরিটা বুঝিয়ে বলা যাক। মনে মনে বক্তব্যগুলো গুছিয়ে লম্বা দম নিয়ে শুরু করে, “ঈশ্বর এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। তাই…”
প্রত্যয়কে থামিয়ে দিয়ে অনিল চ্যাটার্জি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, “ঈশ্বর-এর চিন্তা ধর্মবিদদের হাতে ছেড়ে দাও। বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে কাজ করে না।”
“ঠিক আছে স্যার। এক অসীম শক্তির মহাবিষ্ফোরণের দ্বারা আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বিশ্ব কি শূন্য থেকে সৃষ্টি? না কী, কোনও একক শক্তি থেকে সৃষ্টি?”
“একক শক্তি?” অনিল চ্যাটার্জির ঘন ভুরু আকাশে উঠল। অনায়াস ভঙ্গী ছেড়ে একটু টান টান হয়ে বসলেন। “তুমি একক শক্তি বলতে ছয়টি মৌলিক বলের সমন্বয়সাধন করার কথা বলছ?”
“জ্বি স্যর।” কণ্ঠে অনিশ্চিত ভাব প্রত্যয়ের। মনে মনে কিছুটা শঙ্কিত, এই বুঝি চোখ রাঙিয়ে আহম্মক বলে ধমকিয়ে উঠবেন ভদ্রলোক।
ধমক দেওয়ার বদলে মুচকি হেসে অনিল চ্যাটার্জি বললেন, “হাঃ। কয়েকশো বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মৌলিক বলগুলোকে একিভূত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা কি জানো?”
প্রত্যয় একটু ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়ল, “জানি স্যার।”
উনি বলে চলেন, “উনিশ শতকের মাঝমাঝি ‘মহাকর্ষ, তড়িৎচুম্বকীয়, দুর্বল নিউক্লিয় ও সবল নিউক্লিয়’ এই চারটি মৌলিক বলের ব্যাপারে নিশ্চিত হয় পদার্থবিজ্ঞানীরা। তারপর প্রায় একশো বছর ধরে চলে সেই মৌলিক চারটি বলকে একিভূত করে ‘থিয়োরি অব এভ্রিথিং’ নিষ্পন্ন করার চেষ্টা। সেটা তো হলই না উলটে, একশো বছর আগে ডার্কম্যাটার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে পঞ্চম মৌলিক বলের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে বসেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। আর দুই দশক আগে ষষ্ঠ বল নিয়েতি-ম্যাটারের কথা জেনে বিষয়টা আরও ঘোলাটে করে ফেলেছে তারা। এখন তো পদার্থবিজ্ঞানীদের সামনে ‘থিয়োরি অব এভ্রিথিং’ এর কথা বললে এই মারে তো সেই মারে অবস্থা! আর সেই মৌলিক ছয়টি বলকে এতো সহজেই তুমি একিভূত করে ফেলার কথা ভাবছ?” কথা শেষ করে হাসি হাসি মুখে ঠান্ডা চোখে প্রত্যয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনিল চ্যাটার্জি।
প্রত্যয় আমতা আমতা করে বলে “আমি মৌলিক বলগুলোকে একিভূত করার পদ্ধতির কথা বলছি না, স্যার। আমি কেবল মহাবিশ্বের মাত্রার প্রকৃতি নিয়ে ভাবছি।”
“বিশ্ব কি শূন্য থেকে সৃষ্টি? না কী, কোনও একক শক্তি থেকে সৃষ্টি? এই কথাই বলছিলে তুমি।”
“হ্যাঁ স্যার। ওই প্রশ্নদুটি সৃষ্টিতত্ত্বের খুবই মৌলিক প্রশ্ন। অনেক বছর ধরে আমি এটি নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবনার এক পর্যায়ে মনে হল, আমরা যে কোনও ফাংশনের বিপরীত ফাংশন বা সংখ্যার ইনর্ভাস বের করতে পারি। যেমন ‘৫’ একটি মৌলিক সংখ্যা। এটির ইনভার্স সংখ্যাটি কি? ‘-৫’ না কী ‘১/৫’?”
অনিল চ্যাটার্জি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে প্রত্যয়ের দিকে। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে যেন।
আপন মনে বলে চলে প্রত্যয়, “আসলে দুটি উত্তরই সঠিক। যদি আমরা শূন্যকে রেফারেন্স হিসাবে ধরি তবে ‘-৫’ হচ্ছে ‘৫’ এর ইনভার্স সংখ্যা। দুটি সংখ্যা মিলিত হলে আবার শূন্য চলে আসে। আবার যদি ‘১’ কে রেফারেন্স হিসাবে ধরি তবে ‘১/৫’ হচ্ছে ‘৫’ এর ইনভার্স। সেক্ষেত্রে ‘৫’ ও ‘১/৫’ গুণ করলে উভয়ে মিলে হয় ‘এক’।”
কখন যেন চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসছেন অনিল চ্যাটার্জি। দেখে মনে হবে ঘুমিয়ে পড়েছেন, কিন্তু তাঁর সমগ্র চেতনা প্রত্যয়ের প্রতিটি কথার দিকে শিকারী ঈগলের মতো ফোকাস করে আছে।
“এখন যদি আমাদের মহাবিশ্বকে একটি ফাংশন (f (x)) হিসাবে চিন্তা করি, তবে এর ইনভার্স ফাংশন (f-1(x)) হবে আমার বর্ণনা করা প্রতিবিশ্বের মতো। গাণিতিক সমীকরণগুলো বাদ দিয়ে আমার থিয়োরিটাকে যদি সহজ ভাষায়, সংক্ষেপে বর্ণনা করি; তবে আমাদের প্রতিবিশ্ব দুই ধরণের হতে পারে।
প্রথম ক্ষেত্রে, মহাবিশ্ব কোনও একক আদিশক্তি হতে সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে প্রতিবিশ্ব হবে প্রতিমাত্রার বিশ্ব, যেখানে আমাদের তিনটি স্থানিক মাত্রা (x,y,z) ও একটি সময় মাত্রা (t) পরিবর্তে তিনটি ঋণাত্মক স্থানিক মাত্রা (-x, -y, -z) ও একটি ঋণাত্মক সময় মাত্রা (-t)-র অস্তিত্ব থাকবে। আর এই দুটি বিশ্ব এক বিন্দুতে মিলিত হলে একক শক্তি তৈরি করবে। ফলাফল হবে, এক।
সেক্ষেত্রে বোঝা যাবে, ঈশ্বর অথবা ওই একক আদি শক্তিপুঞ্জের হাত ধরেই মহাবিশ্ব ও প্রতিমহাবিশ্বের সৃষ্টি; এতেই ধ্বংস ও এতেই সমাপ্তি।”
অনিল চ্যাটার্জি নড়েচরে বসেন, “বুঝলাম। কার্তেসিয় স্থানাঙ্ক গণিতে মূল বিন্দুটি (০,০,০,০)। এই মূলবিন্দুর একদিকে ধনাত্মক স্থানাঙ্ক (+x,+y,+z,+t); আরেকদিকে ঋণাত্মক স্থানাঙ্ক (-x,-y,-z,-t)। প্রতিবিশ্বের সাপেক্ষে আমাদেরটা আবার ঋণাত্মক। মানে সেই প্রতিবিশ্বে অবস্থিত কেউ মনে করবে তারা ধনাত্মক বিশ্বে আছে আর আমরা ঋণাত্মক বিশ্বে আছি, যেমনটা এখন আমরা ভাবছি। অর্থাৎ দুটো বিশ্ব একে অপরের বিপরীত সীমায় অবস্থিত। সুতরাং সেই বিশ্বটা হবে অনেকটা আয়নায় আমাদের প্রতিবিম্বের মতো।”
“হ্যাঁ। এটাই আমাদের স্বাভাবিক পদার্থ–প্রতিপদার্থ মহাবিশ্বের মডেল। ওই ম্যাটার অ্যান্টিম্যাটারের সংঘর্ষ টাইপের কল্পনা যেগুলো।”
বয়োবৃদ্ধরা যেমন শিশুদের নিষ্পাপ আবোলতাবোলগুলোকে কৌতুকের চোখে দেখে, রাশভারী এই ভদ্রলোকের সামনে বসে প্রত্যয়ের ঠিক তেমন অনুভূতি হচ্ছিল। হাসি হাসি মুখে অনিল চ্যাটার্জি বললেন, “হুম, ঠিক আছে, তারপর বলে যাও। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কি?”
“দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা হচ্ছে প্রতি মহাবিশ্বের মাত্রা হবে ঋণাত্মক সময়ের তিনটি আর স্থানের একটি মাত্রা। এই প্রতি মহাবিশ্বটির সঙ্গে আমাদের মহাবিশ্বের অস্ত্বিত্ব সম্পূর্ণ বিপরীত। এই দুটি বিশ্ব মিলিত হলে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। এখন এটি সঠিক হলে ধরে নিতে হবে সকল সৃষ্টি শূন্য হতে পারে।” এটুকু বলে চুপ করে যায় প্রত্যয়। যেন সে অপরজনকে সময় দিচ্ছে এইমাত্র বলা কথাটা আত্মস্থ করার।
অনিল চ্যাটার্জির তীক্ষ্ণ চক্ষু দুটি কুঁচকে এল, “দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি আমার কল্পনায় ঠিক ধরা পড়ছে না, প্রত্যয়। ঋণাত্মক ‘স্থানের’ একটি ও ঋণাত্মক ‘সময়ের’ তিনটি মাত্রা কীভাবে সম্ভব?”
“আমাদের চারটি মাত্রার আপেক্ষিক দর্শনের বাইরে ভিন্ন কিছু কল্পনা করা মানুষের পক্ষে আসলেই বেশ কষ্টকর। এমনকি সময়কে একটি মাত্রা হিসাবে চিন্তা করাও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। যদি দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি সঠিক হয়, তবে মহাবিস্ফোরণের সময় আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে, পাশাপাশি এমন আরেকটি প্রতিবিশ্বেরও সৃষ্টি হয়েছে যার সময়ের মাত্রা তিনটি আর স্থানের মাত্রা একটি এবং এগুলো আমাদের মাত্রার বিপরীতে অবস্থিত। মানে, সম্পূর্ণভাবে একটা ইনভার্স ফাংশন।
“সেই বিশ্বে মাত্রাগুলো কীভাবে কাজ করে বলে তোমার মনে হচ্ছে?”
“আমাদের বিশ্বে সকল বস্তু; স্থানের তিনটি মাত্রায় চলাচল করতে পারে। আর সময়ের মাত্রা কেবল এক দিকে প্রবাহিত হচ্ছে; অতীত থেকে ভবিষ্যতে। আর এই দ্বিতীয় রকমের ইনভার্স বিশ্বের ব্যাপারটা হবে; স্থানের একটি মাত্রায় তারা ভ্রমণ করতে পারে, আর সময়ের তিনদিকে তারা পরিভ্রমণ করতে পারবে।
“তার মানে বলতে চাইছ তারা স্থির থাকে একটি স্থানেই। আর ঘুরে বেড়ায় অতীত ভবিষ্যতে। সময় তাঁদের বিচরণ ক্ষেত্র।” বলতে বলতে চিন্তিত মুখে ভদ্রলোক বসে থাকেন প্রত্যয়ের দিকে তাকিয়ে। সমস্ত শরীর স্থির। শুধু অদ্ভুত ভঙ্গিমায় গালে ঘষে যাচ্ছে আঙুলগুলো। কিছুক্ষণ পরে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ভদ্রলোক বলেন, “তারা বলতে কাদেরকে বোঝাচ্ছ?”
“সেটা জানি না। প্রতিবিশ্বে যদি কোনও বুদ্ধিমান স্বত্তার উদ্ভব হয়ে থাকে… শুধু যে তাদের বিশ্ব একস্থানে স্থির থেকে সময়ে ঘোরাফেরা করে ব্যাপারটা তা না হয়ে খানিক অন্যরকমও হতে পারে। হয়তো তাদের কাছে স্থানের মাত্রাটা অনেকটা বিমূর্ত ব্যাপার, যেমনটা আমাদের ক্ষেত্রে সময়ের মাত্রাটা বিমূর্ত। হয়তো স্থানের কেবল একদিকেই তারা গতিশীল, হয়তো তাদের সকল কার্যক্রম শুধু সময়কে নিয়ে। বিষয়টা আমাদের অনুধাবন করা একটু কষ্টকরই বটে। আদৌও এমন কিছু সম্ভব কিনা সেটার ব্যাপারেও নিশ্চিত নই। এমন কিছু আছে কি না সেটাও জানি না। আমি কেবল সম্ভাবনার কথা বলছি।” কিছুটা চিন্তিত কণ্ঠে বলে প্রত্যয়। সে কি বোঝাতে পেরেছে ওই উল্টোদিকের মানুষকে?
“তোমার কথাতে যা বুঝতে পারছি, বিগ ব্যাং এর ফলে আমাদের মহাবিশ্বে ইনভার্স বিশ্ব তৈরি হয়েছে। যদি ‘একক’ প্রকৃতির ইনভার্স হয়, তবে মহাশক্তিধর এক শক্তির কোনও কিছুর কারণে মহাবিশ্বদ্বয়ে উদ্ভব আর যদি ‘শূন্য’ প্রকৃতির ইনভার্স হয়, তবে সকল কিছু শূন্য হতে সৃষ্টি। এটাই তো তোমার সম্পূর্ণ থিয়োরির সারসংক্ষেপ?” সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বলেন প্রফেসর অনিল চট্টোপাধ্যায়।
মাথা নেড়ে সম্মতির মতো একটি অভিব্যক্তি দেখায় প্রত্যয়।
কারও মুখে কোনও কথা নেই। মনে হচ্ছে মুখোমুখি বসে ধ্যাণে মগ্ন দুজন জ্ঞানতাপস দাবার চালে একে অপরকে জেতার চেষ্টা করছে!
আচমকা নিরবতা ভেঙে বেতের হাতলে চাপড় মেরে প্রফেসর বলে ওঠেন, “আমি তোমার এই প্রজেক্ট এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো। পার্টিক্যাল কোলাইডার ল্যাব, ফান্ডিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটার। যা লাগবে, সব আমি জোগাড় করবো। তুমি শুধু মন দিয়ে এই থিয়োরিটা নিয়েই কাজ কর, বুঝলে।”
আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে প্রত্যয়ের অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে সে। অনিল চ্যাটার্জি হঠাৎ তাকে এত সাহায্য করছেন কেন? বহুদিন অনিল চ্যাটার্জির নামে নতুন কিছু আবিষ্কারের কথা শোনা যায় না। জীবনের শেষ সময়ে স্মরণীয় কিছু করে যেতে চাইছেন?
“এই মুহূর্তে থিয়োরিটায় পেটেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাগজ কটায় তোমার সিগনেচার লাগবে, প্রত্যয়।” প্রত্যয় চমকে উঠল। অনিল চ্যাটার্জির ইশারায় কখন যেন ওঁর সেক্রেটারি এসে এক গোছা কাগজপত্র রেখে গেছে সামনের টি টেবলটায়। তাহলে কী? তাহলে কী? এইভাবেই প্রত্যয়ের মতো নবীন আবিষ্কারকদের কাছ থেকে অনিল চ্যাটার্জি হাতিয়ে নেয় আবিষ্কার! হ্যাঁ, অনিল চ্যাটার্জি সম্পর্কে সেরকম কথাও অনেক শুনেছে প্রত্যয়। এই কারণেই নতুন বিজ্ঞানীরা অনিল চ্যাটার্জিকে ‘বাংলাদেশের এডিসন’ বলে।
প্রত্যয় বিমূঢ় চোখে তাকাল অনিল চ্যাটার্জির দিকে।
অনিলবাবু হাসলেন। “একি! তোমার মুখ ওরকম শুকিয়ে গেল কেন? আরে, তোমার থিয়োরির পেটেন্ট তোমারই থাকবে, প্রত্যয়। আমি শুধু ইনভেস্টর হিসাবে সমস্ত প্র্যাকটিক্যাল প্রবলেমের দায়িত্ব নিচ্ছি। তুমি সময় নিয়ে কাগজগুলো পড়ে দেখতে পারো। চাইলে কোনও ভালো উকিলকেও দেখিয়ে নিতে পারো। আমার কোনও অসুবিধা নাই।”
প্রত্যয় কাগজের লেখাগুলো পড়তে থাকে।
উল্টোদিকে বেতের সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন অনিল চ্যাটার্জি। তাঁর মাথার ভেতর ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে। সূক্ষ্ণভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে তার চোখের পাতি তিরতির করে কাঁপছে।
ঈশ্বর! ঈশ্বর! এক আদি অনাদি শক্তি! ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে যাচ্ছি আমরা! আমরা আবিষ্কার করতে যাচ্ছি ‘ঈশ্বরের গণিত’। সৃষ্টি ধ্বংস প্রলয় আমার হাতের মুঠোয়! এই বিশ্ব, এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র মালিক হব আমি! ঈশ্বর! ঈশ্বর হব আমি!!!
********************★*******************
তথ্যসূত্রঃ কল্পবিশ্ব।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now