বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ইন্দুমতী
কাহিনী : বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়
"....এই ভাই, শোন...!"
হঠাৎ একটা পরিচিত কন্ঠস্বরের ডাকে ফিরে দেখল সুরজিৎ। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছে। দিদির গলার স্বর।
রাত প্রায় বারোটা এখন। লাস্ট ট্রেনে বাড়ি ফিরছে সুরজিৎ। এরকম হয় মাঝেমধ্যে। লেখালেখির কাজে যেতে হয় কলকাতায়, পত্রিকা অফিসে ঘোরাঘুরি করতে করতে রাত হয়ে যায়। কিন্তু দিদি এত রাত্তিরে এখানে কেন? ধন্ধে পড়ে যায় সুরজিৎ।
পথের যে জায়গায় তারা দাঁড়িয়ে সে অঞ্চলটুকু আলো-আঁধারিতে ঘেরা। খানিক দূরে রাস্তার মোড়ে একটা আলো জ্বলছে। রাস্তার অন্যান্য অংশে আলো চুরি গেছে। মোড়ের ওই আলোটিই আবছা এসে পড়েছে।
কাছাকাছি একটা বাগানবাড়ি। একটা মস্ত কাঁঠাল গাছের দু-একটা ডাল ঝামরে পড়েছে পাঁচিল ডিঙিয়ে। সুরজিতের পিঠ পাঁচিলের দিকে।
"...এত রাত্তিরে তুই এখানে কেন দিদি?" জিজ্ঞেস করল সুরজিৎ।
"...কি করব বল, ট্রেন মিস করেছি", তড়বড়িয়ে জবাব দেয় ইন্দু।
"...ঠিক আছে, বাড়িতে চ এখন"।
"...চ "।
দুজনে হাঁটতে থাকে। খানিক দূরে রাস্তাটা দু'ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা রাস্তা চলে গিয়েছে লাইন পারে, অপরটা গঙ্গার দিকে। দুটো পথ ধরেই সুরজিতদের বাড়ি যাওয়া যায়।
ইন্দু এই জায়গায় এসে লাইন পারের পথটাই ধরল। ওদিকে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না সুরজিতের। জায়গাটা খারাপ বলে শুনেছে অনেকের মুখে। কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই ইন্দু ওই পথে ধাঁ করে ঢুকে পড়ায় সুরজিতকেও পিছু নিতে হলো। কিন্তু ইন্দুকে দেখা যাচ্ছে কই? এত দ্রুত কোথায় গেল সে? সুরজিৎ হাঁক পাড়ে, "দিদি!"...
"...এই তো আমি", ঘাড়ের কাছে ফিসফিস করে জবাব দেয় ইন্দু।
"...বাব্বা..." হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সুরজিৎ।
দুজনে চলতে থাকে ফের।
সুরজিতদের বড়দিদি ইন্দুমতী। ক্লাস এইটে পড়তে পড়তেই তার বিয়ে হয় বারুইপুরে। শ্বশুরবাড়ির অবস্থা খুব ভালো। ইন্দুর দিন কাটছিল ভালোই।
হঠাৎ অঘটন ঘটল একটা। ব্যবসার কাজ সেরে এক রাতে বাড়ি ফিরছিল ইন্দুর স্বামী দেবব্রত। স্টেশনে নেমে লাইন পেরোতে গিয়ে মেল ট্রেনে আচমকা কাটা পড়ল বেচারা।
বিয়ের বছর ঘোরেনি তখনও। স্বামীর রক্তমাখা ছিন্নভিন্ন দেহটা দেখে কেমন গুম মেরে গেল ইন্দু। কাঁদল না, চিৎকারও করল না।
সেই শুরু। তারপর আট বছর কেটে গিয়েছে। ইন্দুমতী এখন আর সুস্থ নেই। কখনো গুম মেরে থাকে, কখনো বকবক করে একটানা। বাপের বাড়ি চলে আসে যখন তখন, কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে যায়। তবে এতটা রাত সচরাচর করে না। কাউকে কিছু জানান না দিয়েই চলে এসেছে হয়তো। জানলে শ্বশুরবাড়ির লোক রাতের বেলায় তাকে ছাড়ত না নিশ্চয়ই।
আবার দেখা যাচ্ছে না ইন্দুকে। অসহিষ্ণু হয় সুরজিৎ। বিরক্ত গলায় ডাকে, "দিদি"।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। কোথায় যে গেল! নিশুতি রাতে লোকজন সব শুয়ে পড়েছে। আচ্ছা ঝামেলা তো! মনে মনে গজরাতে থাকে সুরজিৎ।
"...দি...দি...!" উচ্চকন্ঠে হাঁক পাড়ে সুরজিৎ। সুনসান রাতে আওয়াজটা বেশ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
"...কি হলো?" একটা গলি থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে ইন্দু।
"....কোথায় গেছিলি?" রাগত কন্ঠ সুরজিতের।
"....এই ঘুরছিলুম একটু", হাসি মুখ ইন্দুর।
"...ঘোরার সময় এখন? এই রাতদুপুরে? তাড়াতাড়ি বাড়ি চ"।
"...চ ভাই, চ"।
লঘু পায়ে হাঁটতে থাকে ইন্দু।
দিদিকে বকাবকি করে মন খারাপ হয়ে যায় সুরজিতের। তার দুই দিদি। ভাই বলতে সে একাই, শিবরাত্রির সলতে। মা মারা গেছেন অনেক বছর আগে। ছোটবেলা থেকে ইন্দুই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিল তাকে। কাজেই ইন্দু তার মায়ের মতো।
ইন্দুকে ডাক্তার বদ্যি দেখানো হয়েছে অনেক। সুরজিৎ নিজে কলকাতায় গিয়ে তাকে অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছে। কিন্তু উন্নতি কিছুই হয়নি। বরং গোলমাল দিনে দিনে আরও বেড়েছে।
দিদির কথা ভাবলেই ভীষণ মন খারাপ হয় সুরজিতের।
লাইন পারে লম্বা পাঁচিল। লোকালয়ের মধ্য দিয়ে রেল লাইন, হঠাৎ কোনো বিপর্যয় যাতে না হয়, তাই এই সতর্কতা। জায়গায় জায়গায় চড়কি গেট। ওই গেট দিয়ে লোক পারাপার করে।
বেশ আসছিল ইন্দু। চড়কি গেটের কাছে এসে হঠাৎ উঠে পড়ল লাইনে। এমনটা হওয়ার কথা নয়। কারণ সুরজিতদের বাড়ি যেতে লাইন পার হতে হয় না। এপারের লাইনের গা ঘেঁষে খানিকদূর গেলেই তাদের বাড়ি।
দিদির ব্যাপার তো, মাথায় কখন কি চাপে! এরকম ভাবতে ভাবতে সুরজিৎও উঠে এলো রেললাইনে। হ্যাঁ, যা ভেবেছে তাই। আপ লাইন ধরে আপন খেয়ালে হেঁটে চলেছে ইন্দু। চড়কি গেটের আলোয় পেছন থেকে আবছা দেখা যাচ্ছে তাকে।
হঠাৎ মুখ তুলতেই সুরজিৎ দেখে একটা জোরালো আলো তীব্র বেগে ছুটে আসছে। মেল ট্রেন হবে বোধহয়। সর্বনাশ! দ্রুত লাইনে নেমে পড়ল সুরজিৎ। দিদিকে বাঁচাতেই হবে।
এগিয়ে চলেছে সুরজিৎ, আগে আগে ইন্দু। চেষ্টা করেও দিদির নাগাল পাচ্ছে না সুরজিৎ। আলো এখন অনেকটা বড়, জোরালো। তীক্ষ্ণ হর্ন বেজে উঠছে কেঁপে কেঁপে।
তন্দ্রা ছুটে যায় গেটম্যানের। ঘুম চোখ খুলে দেখে, বেশ কয়েক হাত দূরে লাইনের ওপর একজন মানুষ। ওই লাইনেই ছুটে আসছে ট্রেন।
মূহুর্তে মনস্থির করে ফেলে গেটম্যান। এক ছুটে এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় সুরজিতকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হু হু রবে বেরিয়ে যায় ট্রেন।
"...আমার দিদি!" কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে সুরজিৎ।
"...অওর তো কোই নেহি থা, বাবু", জবাব দেয় গেটম্যান।
সত্যিই দিদির চিহ্ন খুঁজে পায় না সুরজিৎ। অবাক বিস্ময়ে সে বলে, "আমার দিদির মাথার ঠিক নেই। ও ছিল এই লাইনে। ওকে বাঁচাতেই তো আমি যাচ্ছিলাম...!"
"....উধর তো কোই নেহি থা বাবু। লাগতা হ্যায় উও কোই জ্বিন হ্যায়"।
গেটম্যানের কথা শুনে ভয় ধরে যায় সুরজিতের। লাইন থেকে নেমে প্রায় এক ছুটে বাড়ি পৌঁছে যায় সে।
পরদিন সকালে ঘটনাটা বাড়ির সকলকে খুলে বলল সুরজিৎ। এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারল না কেউ। সকাল আটটা নাগাদ ইন্দুর শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর এলো, গতরাতে ঠিক এগারোটায় হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে ইন্দু।
বড় ঠাকুমা দুঃখ করে বললেন, "আহা! খেপীটা অকালেই চলে গেল। সুরজিৎকে বড় ভালোবাসত তো, ওকে তাই নিতে এসেছিল "।
ইন্দুর নাম করে কেঁদে ওঠেন বড়ঠাকুমা। বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল।
দু'হাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল সুরজিৎ।
( সমাপ্ত)
copy
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now