বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“মুক্তচিন্তা ব্লগ (ড. লজিক্যাল বাঙালি) থেকে সংগৃহীত। লেখাটি নাস্তিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা।”
********************★********************
জাতি কিঃ
ইহুদি জাতি সম্পর্কে লেখার প্রারম্ভে আমরা দেখে নিতে চাই জাতি ও জাতীয়তার সংজ্ঞা। সাধারণ অর্থে জাতি (Nation) বলতে কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গঠিত এক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। জাতি এক ধরণের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্প্রদায়। জাতি হল কতগুলি সাধারণ বৈশি্ষ্ট্যের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ এক জনগোষ্ঠী। বিশিষ্ট্য সমাজবিজ্ঞানী ও লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের জাতীয়তাবাদ বিষয়ক অধ্যাপক অ্যান্টনি দ্য স্মিথ (Anthony D. Smith) জাতিকে এক নামকরণ করা মানবগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা এক সাধারণ ঐতিহাসিক ভূখন্ড, ঐতিহাসিক স্মৃতি, অতিকথা (Myth), গণ-সংস্কৃতি, আর্থনীতিক ধারণার ভিত্তিতে গঠিত। যেমন ইহুদিরা এ সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি জাতি (তাদের সাধারণ এক ঐতিহাসিক ভূখন্ড ও সাধারণ অতীতের স্মৃতি বা মিথ রয়েছে)। অধ্যাপক রাশটন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপর জরীপ চালিয়ে দেখিয়েছেন যে, বংশানুগত সাদৃশ্যই জাত-কেন্দ্রিকতার (Ethnocentricity) ভিত্তি। উদাহরণ হিসেবে রাশটন ইহুদি জাতির উল্লেখ করে বলেন, “ইহুদিরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, তাদের নিজেদের মধ্যে বংশানুগত সাদৃশ্য তাদের সাথে অ-ইহুদিদের বংশানুগত সাদৃশ্যের চেয়ে ঢের বেশী”।
জাতীয়তা কিঃ
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিট্যানিকায় জাতীয়তার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে, ‘মেম্বারশিপ ইন অ্যা ন্যাশন অর সভেরেইন স্ট্যাট’ “একটি জাতি বা সার্বভৌম রাষ্ট্রের সদস্য”। উইকিপিডিয়া বলছে, ‘ন্যাশনালিটি ইজ দ্য লিগ্যাল রিলেশনশিপ বিটুয়িন অ্যান ইনডিভিজ্যুয়াল হিউম্যান অ্যান্ড অ্যা স্ট্যাট’ “ব্যক্তি বিশেষ ও রাষ্ট্র বিশেষের মধ্যকার বিধিগত সম্পর্কই জাতীয়তা”। উইকিপিডিয়ায় নাগরিকত্ব সম্পর্কেও ওই একই কথাবলছে অর্থাৎ জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব সমান। দূর অতীতে একসময় রাষ্ট্র ছিল না, মানুষ তখনো ছিল জাতিভুক্ত। সময় বদলে গিয়েছে এবং ক্রমে তখনকার জাতির অনিবার্য জায়গা দখল করে নিয়েছে এখনকার রাষ্ট্র। আধুনিক পৃথিবীতে বহুজাতিক রাষ্ট্র আছে, বহুরাষ্ট্রিক জাতিও আছে। আরব জাতি একটি বহুরাষ্ট্রিক জাতি এবং ভারত একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত। হাজার বছর আগে যেমন এখনকার মতো দেশ ছিল না, হাজার বছর পরে তেমনি জাতিভেদ থাকবে না। মানুষ ফিরে যাবে তার শেকড়ে। সে হবে মূলতই মানুষ, কেবলই মানুষ। সৃষ্টির প্রভাতে মানুষ যেমন মানুষ ছিল, মানুষ ফিরে যাবে তার সেই আদি ও আসল পরিচয়ে। বাঙালি-বিহারি-অস্ট্রালয়েড-নিগ্রোয়েড-ইহুদি-আরব-মুসলিম মিলেমিশে একাকার হবে সেই দিন। প্রতিষ্ঠা পাবে মানুষের জাতীয়তা, মানবিক জাতীয়তাবাদ। বনী-ইস্রায়েল বা ইহুদি সম্প্রদায় একটি জাতির অন্তর্গত এবং জাতিগতভাবে ইহুদি ধর্মের অনুসারী একটি জাতি বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠি।
জাতি হিসেবে ইহুদি ও ইসরাইল রাষ্ট্রের মিথঃ
ইয়াকুবের পুত্র ইয়াহুদা‘র নাম থেকে হিব্রু “ইয়াহুদী”, অতঃপর আরবী “ইয়াহুদী” হয়ে বাংলায় “ইহুদি” শব্দের আগমন। ইব্রাহীমের পুত্র ইসহাক, তার পুত্র ইয়াকুব ওরফে ইসরাইল এর বংশধরগণ বনী-ইস্রায়েল নামে পরিচিত। ইয়াকুবের বারো পুত্রের নামে বনী-ইস্রায়েলের বারোটি গোষ্ঠির জন্ম হয়, যার মধ্যে ইয়াহুদা‘র ছেলেমেয়েরা যারা যুডিয়া প্রদেশের কেনানে বসবাস করতো তারা ইহুদি নামে পরিচিত।
ইহুদি ( יְהוּדִים ) শব্দটা হিব্রু। সেমেটিক (মধ্যপ্রাচীয়ও) ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ধর্ম হল ইহুদি ধর্ম (JUDAISM)। অনেকে ভাবেন, ইহুদিদের ইংরেজিতে JEW বলে কেন? হিব্রু শব্দের শুরুতে Y ভাওয়েল থাকলে সেটা ইংরেজি বা গ্রিকে J দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সে হিসেবে ইহুদি –> জিহুদি –> জিউ (জ্যু)। ২০১০ সালের হিসেব মতে বিশ্বে ইহুদি জনসংখ্যা বিশ্বের ১৩৪ লক্ষ অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.২% !! মোট ইহুদির ৪২.৫% ইসরাইলে, আর ৩৯.৩% আমেরিকায় বাস করে।ইহুদিরা আমাদের মতই বংশ পরম্পরা হিসেব করে ইব্রাহিম (আ) থেকে। অর্থাৎ পিতা ইব্রাহিম। ইব্রাহিমের প্রধান ২ ছেলে ইসমাইল আর ইসহাক। ইসহাক (আ) (Isaac) এর ছেলে ইয়াকুব (আ) (Jacob); ইয়াকুব (আ) এর আরেক নাম ছিল ইসরাইল (আ); এ নামটাই ইহুদিরা গ্রহণ করেছে। ইহুদিদের ভাষা হিব্রু। হিব্রুকে তারা বলে “পবিত্র ভাষা”; আনুমানিক ২০০ সাল পর্যন্ত হিব্রুর ব্যবহার ছিল ভালই কিন্তু এরপর ইহুদি জাতির নানাবিধ সংঘাত ও সংগ্রামে হিব্রু ছিল কেবল একটা মৃত ভাষার মত! কিন্তু ১৮৮১ সালে এলিয়েজার বিন ইয়াহুদা এ মৃত ভাষাকে পুনর্জীবিত করেন। এখন ইসরাইলের এটি রাষ্ট্র ও একটি জীবন্ত শক্তিশালী ভাষা হচ্ছে হিব্রু।
ইহুদি জাতির বিষয়ে ধর্মীয় মিথ হচ্ছে – আদম আর হাওয়ার প্রথম দুই পুত্রসন্তান হাবিল আর কাবিল। হাবিলকে খুন করে কাবিল হল অভিশপ্ত। আর তাই ঈশ্বর আদমকে আরেকটি পুত্র সন্তান দিলেন যার নাম শীশ। আমরা সবাই এই শীশের বংশধর। শীশের এক বংশধর নূহের সময় মহাপ্লাবনে তাঁর ৩-ছেলে, ছেলের ৩-বউ, আর স্ত্রী ছাড়া আর সবাইকে ঈশ্বর ধ্বংস করে ফেলেন। ফিরে তাকাই আরো একটু পেছনে, সেই ৩০০০ বছর আগের দিকে মধ্যপ্রাচ্য ছিল জনবহুল জনপদ। এখানেই বাস করত ইহুদি জাতি। তখন অবশ্য তাদের ইহুদি বলা হত কিনা তা ইতিহাসের গবেষণার বিষয়। ইয়াকুব বা ইসরাইল (আ) এর ছিল ১২ পুত্র। সেই ১২ পুত্রের বংশধর থেকে হল ইসরাইলের ১২ গোত্র তথা বনী ইসরাইল। নূহের ৩ ছেলের এক ছেলের নাম শাম। তাঁর বংশধররা সেমেটিক জাতি (আরব, ইহুদি) নামে পরিচিত। অপর ছেলে হামের বংশধারা হ্যামিটিক (মিশরীয়, বার্বার) নামে পরিচিত। তৃতীয় ছেলে ইয়াফাসের বংশধররা হল ইন্দো-ইউরোপীয় (ইউরোপীয়, ইরানী, ভারতবর্ষীয়)। শামের এক বংশধর, যার এক উপশাখা ছিল হাবিরু, এর বংশধর তাই হিব্রু নামে পরিচিত। ইব্রাহিম একজন হিব্রু ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে ইসহাক ও ইসমাঈল। ইসমাঈলের বংশধররা আরব। ইসহাকের ছেলে ইয়াকুবের (বা ইসরাইলের) বার ছেলের এক ছেলে ইউসুফকে মিশরে তাঁর ভাইদের ষড়যন্ত্রে দাস ব্যবসায়ীরা বিক্রি করে দেয় কিন্ত ইউসুফ মিশরের ফারাওয়ের প্রিয় এবং শাসক শ্রেণির ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি ভাইদের ক্ষমা করে পিতা ইয়াকুব আর বনী ইসরাইলকে ফিলিস্তিন (কেনান) ভূখন্ড থেকে মিশরে নিয়ে আসেন। ইউসুফ মারা যাবার অনেক বছর পর অন্য এক ফারাও এর আমলে বনী ইসরাঈলদের প্রতি মিশরীয়দের নিপীড়ন শুরু হয়। ইয়াকুবের ১২ পু্ত্রের এক পুত্র লেভির বংশে মুসার জন্ম হয়। কাজেই মুসা একজন লিভাইট ইহুদি। তিনি ইউসুফের দেহাবশেষ মিশর থেকে পবিত্র ভূখন্ডে (কেনানে) নিয়ে আসেন। তাঁর সাথে পুরা বনী ইসরাঈলও ফিলিস্তিন (কেনানে) ভূখন্ডে চলে আসে। ইয়াকুবের বার ছেলের এক ছেলের নাম ইয়াহুদা। এই ইয়াহুদার বংশধররাই ইয়াহুদী নামে পরিচিত। দাউদ, সোলায়মান আর ঈসা এই ইয়াহুদার বংশধর বা ইয়াহুদী। বনী আমিন বা বেঞ্জামিনের বংশধরেরা বেঞ্জামাইট নামে প্রসিদ্ধ (যেমন:বাদশাহ তালুত)। পরবর্তীকালে বার ছেলের বংশের মধ্যে ইয়াহুদার বংশই ব্যাপক হয়ে উঠে, আর বাকীরা এর সাথে মিশে যায়। এদেরকেই সাধারণভাবে ইহুদি বলা হয়, যারা কিনা আরবদেরই সৎ-ভাই। মিশরীয়রা ইসরাইলিদের ডাকত “হিব্রু”। এর অর্থ যারা “পার হয়ে এসেছে” কারণ, তারা নদী পার হয়ে মিসরে এসেছিলো। মিসরের হিব্রুদের উপর (ইহুদিদের উপর) নেমে আসল ভয়াবহ অত্যাচার। মাদায়েন থেকে সপরিবারে ফেরার পথে মুসা (আ) তূর পাহাড়ে আগুন দেখেন এবং এরপরের ঘটনা সবার জানা, মানে তিনি নবুয়ত পেলেন। যিহোবা তাঁর সাথে একটি জ্বলন্ত ঝোপের মধ্য দিয়ে সরাসরি কথা বললেন, তাঁকে ২টি মুজেজা দিলেন। ইহুদি জাতির হিস্টোরি বলছে, মুসার জন্মের সময় ফিরাউন ছিলেন SETI the 1st কিন্তু মিসরে রিটার্ন করার সময় ছিলেনRAMESES (II) the GREAT. তাওরাতও বলছে, আগের ফিরাউন মারা যায়, রামেসিস ফারাও হন। তবে কুরআন এ নিয়ে কিছু বলেনি, ঐ দুই ফারাও এক নাকি ভিন্ন। ফিরাউন যেতে দিলেন না হিব্রুদেরকে মিসর থেকে। এ কারণে ইহুদি মতে গজব শুরু হলো মিসরে, যা হল : ১) পানি রক্তে পরিণত হল ২) ব্যাঙ ৩) উঁকুন ৪) মাছি ৫) গবাদি পশুর রোগ ৬) মিসরিদের চামড়ায় ফোস্কা ৭) শিলা আর বজ্র ৮) পঙ্গপাল ৯) টানা অন্ধকার এবং ১০) সকল পরিবার এবং গবাদি পশুর প্রথম বাচ্চার মৃত্যু। এত গজব সহ্য না করতে পেরে মিসরিরাই বরং অর্ডার করল হিব্রুদেরকে মিসর থেকে বের হয়ে যেতে। অবশেষে মুসা তাঁর অনুসারী বিশাল ইসরাইল জাতিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, যা বিখ্যাত EXODUS নামে পরিচিত। অবশ্য বের হয়ে যাবার সময় তিনি ইউসুফ (আ) এর কফিন নিয়ে নিলেন পবিত্র ভূমিতে সমাধিস্থ করার জন্য যেমনটা ইউসুফ ওয়াদা নিয়েছিলেন। নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর যিহোবা (ঈশ্বর) প্রদত্ত প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে গলে ইহুদি বা ইসরাইল জাতি। পৃথিবীর অন্য যেকোন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মুসলিমদের সাথে ইহুদিদের মিল সবচেয়ে বেশী। একজন মুসলিম পুরুষ ইহুদিদের জবেহকৃত পশু খেতে পারে, তাদের নারীদের ধর্মান্তরিত না করে বিয়ে করতে পারে, ইহুদিরা মুসলিমদের মতনই খাৎনা করে, শুকরের মাংস খায়না। টুপি-দাড়িওয়ালা ধার্মিক মুসলিম ও ইহুদি রাব্বির যত মিল পাবেন, খ্রীষ্টান পাদ্রী বা মিনিস্টার প্যাস্টরের সাথে তার ভগ্নাংশও পাবেন না। ইহুদিদের সিনাগগে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের পুত্রের কোন মুর্তি পাবেন না। মুসলিম আর ইহুদিরা একই নিরাকার ডেইটিকে মানে। এরপরও বিরোধ কেন এত বেশী? তার আগে আরেকটি কথা বলা জরুরী। খ্রিষ্টানদের সাথে ইহুদিদের বিরোধ কিন্ত আরও গভীরে। প্রথম কথা হল ইহুদিরা ঈসাকে কখনই মেসিয়াহ বলে মানেনি। দ্বিতীয়তো তারা ঈসার ভার্জিন বার্থ বা ঈশ্বরত্ব মানতে পারেনি। ইহুদিদের বলা হত “ক্রাইস্ট কিলার” বা “খ্রীষ্ট হন্তারক”। নিউ টেস্টামেন্টের একটি মাত্র লাইন যুগ যুগ ধরে ইহুদিদের নির্যাতন হত্যার ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। বাইবেলের (নতুন খন্ডের) বর্ণনা অনুসারে ইসরাইল ভূখন্ডের তৎকালীন রোমান গভর্নর পিলেত যীশুকে মৃত্যুদন্ড দিতে আগ্রহী ছিল না। ইহুদি মবের চাপে সে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করতে বাধ্য হয়। আর এই ইহুদি মব নিজেদের বংশধরদের উপরও খ্রীষ্ট হত্যার দায়ভার গ্রহণ করে।
ইহুদি-বিদ্বেষঃ
ইহুদি-বিদ্বেষ বলতে ইহুদি জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মের প্রতি যেকোনো ধরনের বৈরিতা বা কুসংস্কারকে বোঝানো হয়ে থাকে। এধরনের বিদ্বেষের মধ্যে ব্যক্তিগত ঘৃণা থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ জাতি-নিধনও পড়ে। ইংরেজিতে একে বলা হয় এন্টি-সেমিটিজম (Anti-Semitism), যার অর্থ দাঁড়ায় সেমিটিয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ। সেমিটিয় একটি বৃহৎ ভাষাভাষী গোষ্ঠী, যার মধ্যে হিব্রুভাষী ছাড়াও আরবি ভাষীরাও অন্তর্ভুক্ত। তথাপি অ্যান্টি-সেমিটিজম ইহুদি-বিদ্বেষ বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়। উনিশ শতকের পূর্বে ইহুদি-বিদ্বেষ ছিল মূলত ধর্ম-ভিত্তিক। খ্রিস্টান ও মুসলমানরা ইহুদি ধর্মের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিকোণের আলোকে এই বিদ্বেষভাব পোষণ করতো। তৎকালীন খ্রিস্টান-শাসিত ইউরোপে বৃহত্তম সংখ্যালঘু ধর্মীয়-গোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিরা বিভিন্নসময় ধর্মীয় বিদ্বেষ, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হত। ধর্মীয় নির্যাতনের মধ্যে ছিল ধর্ম-পালনে বাধা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, দেশ থেকে বিতাড়ন ইত্যাদি। শিল্প-বিপ্লবের পর ইহুদিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতিঘটতে থাকে দ্রুত। এসময় ইউরোপে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটলে ইহুদিদের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ দেখা দেয়। জাতিতত্ত্ব সংক্রান্ত অপ-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এই বিদ্বেষে ইন্ধন যোগায়। ইহুদিরা অনার্য ও আর্যদের চেয়ে হীন, এমন মতবাদ দেয়া হয় এবং জাতিগতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অর্থলিপ্সা, শ্রমবিমুখতা, ধূর্ততা,গোত্রপ্রীতি ও দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ আনা হয়। তৎকালীন ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষকে অসংস্কৃত আচরণ মনে করলেও, এই বংশানুগতিক অপতত্ত্বকে ‘বৈজ্ঞানিক’ তত্ত্ব মনে করে এধরণের জাতিগত সংস্কারের যথার্থতা স্বীকার করে নেয়। ১৯৪১, বাবি ইয়ার (Babi Yar) এর গণহত্যা,দুইদিনের ব্যবধানের যেখানে নাৎসী ও স্থানীয় ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় ৩৩,০০০ ইহুদিকে গুলি করে হত্যা করে। এই জাতিগত বিদ্বেষ ভয়াবহ চরম আকার ধারণ করে বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে,হিটলারের নাৎসি দল-শাসিত জার্মানিতে। ইহুদি-বিরোধী এই জাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের দায়ও ইহুদিদের উপর চাপিয়ে দিয়ে তারা বিভিন্ন অত্যাচার এবং নিধনমূলক আইন-কানুন প্রণয়ন করে। ১৯৩৯ সালে হিটলার বিভিন্ন দেশ আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালে ইউরোপে ইহুদি নির্যাতন ও নিধন চরমরূপ নেয়। তারা আইন করে ইহুদিদের নিজস্ব নিবাস অধিগ্রহণ করে বন্দী-নিবাসে প্রেরণ করে এবং পর্যায়ক্রমে ইহুদিদের হত্যা করে। প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসে ‘হলোকস্ট‘ (Holocaust) নামে পরিচিত।
আর্ক অফ দ্যা কভনেন্টঃ
ইহুদিদের জন্য অন্যতম পবিত্র ও ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় বস্তু যার নাম “আর্ক অফ দ্যা কভনেন্ট”। আর্ক অফ দ্যা কভনেন্ট এর বাংলা মানে দাঁড়ায় চুক্তির সিন্দুক। এটাকে আর্ক অফ টেস্টিমনি বা বিবৃতিও বলা হয়। আর্ক অভ দ্যা কভনেন্ট সরাসরি সৃষ্টিকর্তার আদেশে হযরত মুসা তৈরি করেন। বর্তমান ইসরায়েলের দখলকৃ্ত সিনাই পর্বতমালায় আল্লাহর সাথে কথা বলার সময় তিনি এই আদেশ পান। ধারণা করা হয়, আর্ক অভ দ্যা কভনেট একটি কাঠের বাক্স বা সিন্দুক, যেখানে লেখা রয়েছে স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত ১০ টি আদেশ। Book Of Exodus এবং Book of Number এর মতে, আর্কের ভেতরে রয়েছে ঈশ্বর প্রদত্ত খাদ্য এবং আসমানী কিতাব “তাওরাত” যা হযরত মুসা কর্তৃক স্বহস্থে লেখা। এর মানে হল, আল্লাহ ইহুদিদের কাছে তার বার্তা দিয়েছেন এই আর্কের মধ্যে। Book of Exodus (বনি ইসরাইলিদের মিশর থেকে প্রস্থান) এর মতে, আল্লাহ হযরত মুসাকে নির্দেশ দেন আর্ক টি বানাতে। আর্কটি টি বানাতে হযরত মুসাকে সিনাই পর্বতমালায় থাকতে হয় প্রায় ৪০ দিন। হযরত মুসাকে দেখানো হয়েছিল কিভাবে আর্কটি বানাতে হবে। মুসা সেই অনুসারে বেজালেব এবং ওহলিয়াক কে নির্দেশ দেন কিভাবে আর্কটি বানাতে হবে। আর্কটির উচ্চতা হয় প্রায় আড়াই হাত এবং চওড়া হয় প্রায় দেড় হাত। সঠিক মাপটি হল (4.29 × 2.59 × 2.59 ফিট)। ইতিহাসে এবং বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, বনি ইসরায়েলরা যখন মিশর ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে, তখন বনি ইসরায়েলের পুরোহীতরা সৈন্য বাহিনীসহ আর্কটি-কে জর্ডান নদীর প্রান্তে নিয়ে যায়। আর্কটি জর্ডান নদীর প্রান্তে আসা মাত্রই নদীটি দ্বীখন্ডিত হয়ে রাস্তা করে দেয়।
সেই রাস্তা পার হয়ে বনি ইসরাইয়েল দল জেরিকো শহরে পৌছে। জেরিকো শহরে পৌছানোর পর পুরোহীতরা প্রায় ৭ দিন সৈন্য বাহিনী নিয়ে আর্কটিকে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করায়। ৭ম দিনে আর্কের ক্ষমতায় জেরিকো শহরের দেয়াল ভেঙ্গে পরে এবং জেরিকো শহর তাদের দখলে আসে। আর্কের ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা অনেক যায়গায়ই বলা হয়েছে। আর্ক অভ দ্যা কভনেন্ট ছিল এমন একটি বস্তু যা কিছু সংখ্যক মানুষ ছাড়া কেউ ই সেটাকে স্পর্শ করতে পারতে না। যদি কেউ করতো, তাহলে সে প্রাণঘাতী রোগের কবলে পরত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসাও আর্কটি তৈরি করার সময় দুরত্ব বজায় রাখতেন। তিনি একটি বিশেষ পোশাক পরে আর্কটি তৈরি করেন। এ ছাড়াও বনি ইসরায়েলরা আর্ক পাহারা দেয়ার জন্যে আলাদা বাহিনী গঠন করেছিল। প্যালেস্টাইনিরা যখন ইহুদিদের কাছ থেকে জেরিকো শহর দখল নেয়, আর্কটি তখন ইহুদিদের হাত ছাড়া হয়ে যায়। আর্কটি তখন হস্তগত হয় প্যালেস্টাইনিদের। তবে ইহুদিদের এই মহা মুল্যবান বস্তুটি প্যালেস্টাইনিদের জন্যে অভিশাপ বয়ে আনে। আর্ক এর ক্ষমতার কারণ জেরিকো শহরে ছড়িয়ে পরে প্লেগ-রোগসহ বিভিন্ন ধরনের টিউমার জাতীয় রোগ। এর কারণ আর্কটি সরিয়ে শহরের বাহিরে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আধুনিক মতবাদে বলা হয়েছে, আর্কটি হয়ত ছোটখাটো একটা নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর ছিল, যার প্রভাবে রেডিয়েশন ছড়িয়েছে এবং রোগ বালাই হয়েছে। বনি ইসরায়েল এর সর্বশেষ রাজা সলোমন যখন ফারাও এর মেয়েকে বিয়ে করেন, তখন তাদের থাকতে দেয়া হয় জিয়ন-এর বাহিরে একটি বাসায়। জিয়ন বানানো হয়েছিল আর্কটি রাখার জন্যে। ৫৮৬ খৃষ্টপূর্বেব্যাবিলনিয়ানরা জেরুজালেম ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে আর্ক অফ দ্যা কভনেন্ট ও নিখোজ হয়ে যায়। কারণ এর পরে আর কোনো বইয়ে আর্কের কোনো কথা খুজে পাওয়া যায়নি।
তবে গ্রিক এযরা বইয়ের ৩য় সংস্করণ বলা হয়েছে যে, ব্যাবিলনিয়ানরা জেরুজালেম ধ্বংসে করার আগে পবিত্র সব জিনিস আগে থেকেই সরিয়ে ফেলেছে। বইতে বলা হয়েছে, তারা ছোট বড় সব পবিত্র জিনিস,সৃষ্টিকর্তার দেয়া আর্ক এবং রাজার ধনসম্পদ ব্যাবিলনে নিয়ে গিয়েছে। র্যাবিনিক লিটারেচারে বলা হয়েছে, আর্কটির সর্বশেষ সংরক্ষণ গোপন করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, আর্কটি ব্যাবিলনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যা আর কখনোই ফেরত আসেনি। কেউ কেউ বলেন, ইথিউপিয়ায় রাজা সলোমনের সমাধিতে আর্কটি লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তবে সলোমনের সমাধি এখনো পর্যন্ত খুজে পাওয়া যায়নি। খৃষ্টান সম্পর্কিত বই Book of Revelation এ বলা হয়েছে, আর্কটি মহান সৃষ্টিকর্তার বেহেস্তে রয়েছে। তবে আর্ক অফ দ্যা কভনেন্ট সত্যিই আছে কিনা এ নিয়ে অনেক মতবাদ রয়েছে। তবে বেশির ভাগ ইতিহাসবীদ বিশ্বাস করেন,আর্কটি রয়েছে এবং হয়ত পৃথিবীর কোথাও রয়েছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now