বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
। হৃদয়হীন ।।
অবশেষে স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে
হার্টটা এখনও অল্প ধুকপুক করছে
হাতের মধ্যে স্পন্দনটা অনুভব করতে পেরে একটা হাসি খেলে গেল ওর মুখে
এখনও কাঁচা রক্ত ঝরছে হাত থেকে, তবে হার্টটা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরনো বন্ধ হয়েছে
সামনে পড়ে থাকা লোকটির দিকে এতক্ষণে চেয়ে দেখল ও। এখন আর কোন সাড়াশব্দ করছে না। ঘুমোক, এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোক সে। আর কোন কাজ বাকি নেই। তার প্রতিশ্রুতি তো রাখতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত। এবার নাহয় এখানেই ঘুমিয়ে থাকুক আপাতত।
প্রতিশ্রুতি, ভাবতেই মুখে একটা হাসি খেলে গেল ওর। সেই কবে, প্রপোজ করার দিনে ওকে বলেছিল - my heart will beat for you only/ till my last breath is taken away from me । কে জানে ঠি ক এই কথাগুলোই কেন বেছেছিল, বোধহয় ভেবেছিল হার্ট সার্জনকে প্রপোজ করার জন্য এর থেকে উপযুক্ত কথা আর হতে পারে না । জিজ্ঞেস করবো করবো করেও এতদিনে আর করা হয়ে ওঠেনি।
ও তো সম্পর্কের সেই প্রথম দিনে থেকেই তাকে বারবার সাবধান করেছিল, ও সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু মিথ্যে নয়। ওর সাথে যেন কখনও মিথ্যে না বলে। স্রেফ হেসে উড়িয়ে দিত, ভাবতো বুঝি কথার কথা। ওকে বলতো কোনদিন কষ্টের একটা বিন্দুকেও নাকি সে অ্যালাউ করবে না ওর শরীর মনকে ছুঁতে।
কেন যে সায়ন্তন ওকে সিরিয়াসলি নিল না!
এই তো মাসতিনেক আগে প্রথম জানতে পারে ওকে লুকিয়ে আরও অন্য এক মেয়ের সাথেও অ্যাফেয়ার চালাচ্ছে সায়ন্তন। ওকে ওর এক কলিগ আগেই সাবধান করেছিল ছেলেটা নাকি এর আগেও বহু মেয়েকে এভাবে ফাঁদে ফেলে চিট করেছে, কিন্তু ও বিশ্বাস করতে পারেনি। ভেবেছে এসব কান ভাঙানি, আর তাছাড়া করেও থাকলে এখন শুধরে গিয়েছে। আসলে এখন বুঝতে পারে স্রেফ একটা অন্ধের মত প্রেমে পড়েছিল ও।
আজ সেই কথাটা ভেবে নিজের বোকামির জন্য নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে ওর। গত তিন মাসে কিভাবেই না ভেঙে পড়েছে ওর পৃথিবীটা! সেই অন্যের মুখে শোনা থেকে শুরু, তারপরে ভেরিফাই করা, সায়ন্তনের সাথে তুমুল ঝগড়া, ঝামেলা। সে বারবারই ওকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করেছিল যে এসবই মিথ্যে, তার নামে ইচ্ছে করে কেউ এসব খবর রটাচ্ছে। প্রথম দিকে বিশ্বাসও করে ফেলছিল। কিন্তু তার পরে একদিন গোপনে সায়ন্তনকে ফলো করে সেই মেয়েটির ফ্ল্যাটে পৌঁছায় ও। তাকে বলে রেখেছিল যে মেডিক্যাল কনফারেন্সে বাইরে যাচ্ছে, তাই বোধহয় সতর্ক হওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি। পরে সেই ফ্ল্যাটের কাজের লোকটি এবং ফ্ল্যাটবাড়ির গার্ডকে জিজ্ঞেস করে আরও খবর জানতে পারে ও - কেমন করে সে ওর অজান্তে দিনের পর দিন এই ফ্ল্যাটে এসেছে সায়ন্তন, ফ্ল্যাটের মালকিন দিদিমনির সাথে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছে, দুজনে একসাথে ঘুরতেও গিয়েছে। আর ওকে কিনা বলতো যে অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছে। সেই দিনগুলোয় ও দিনরাত টেনশন করে বসে থাকতো যে কি করছে কেমন আছে, কাজে মন বসতো না ওর। আর সায়ন্তন কিনা সি সময়ে অন্য কারও সাথে ফুর্তি করে বেড়াতো!
অনেক ভেবেছে ও, অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়েছে লম্বা; কারণ জানতো এরকম মানসিক পরিস্থিতিতে কাজ করতে যাওয়া মানে রোগীকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। প্রথমে ভেবেছিল সুইসাইড করবে; কিন্তু পরে ভেবে দেখে ওর দোষটা কি যে নিজেকে শাস্তি দেবে। ওর বাবা তো ওকে চিরকাল শিখিয়েছে যে শাস্তি দিনের শেষে দোষীরই হয়, হয়েছে, হবেই।
হবেই, দোষীর শাস্তি হবেই। এই চিন্তাটাই ক্রমাগত মনে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল ওর। মাথার ভিতরে অসহ্য যন্ত্রণা, সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াটে, চিন্তাভাবনা ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল ওর। মনে হচ্ছিল সর্বক্ষণ যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সায়ন্তনকে ওই মেয়েটার সাথে, আর গুলিয়ে উঠতো শরীরটা। নিজের কোয়ার্টারে একলা বন্দী করে ফেলেছিল নিজেকে। বাড়ীর বা পরিচিত কারও সাথে যোগাযোগ রাখতো না, কারও ফোন ধরতো না। দরজায় কেউ নক করলে জবাবও দিত না। ক্ষুধাতৃষ্ণা, শারীরিক কষ্ট, চাহিদা সব যেন কেমন মুছে গিয়েছিল অস্তিত্ব থেকে, শুধু একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা পাক খেয়ে বেড়াত শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে। সাথে সেই অবশ করা যন্ত্রণা মাথায়। যন্ত্রণা কমাতে ওষুধে কাজ না হওয়ায় অবশেষে অ্যালকোহলের আশ্রয় নিয়েছিল ও; তাতেই একটু স্বস্তি পেত শুধু ।
সবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, শাস্তি দেবে ও। আফটার অল, দোষীকেই তো শাস্তি পেতেই হয়। কিভাবে দেবে একথা ভাবতে ভাবতেই মনে এসেছিল সেই স্মৃতিটা।
গত সপ্তাহে তাকে ফোন করেছিল ও, বহুদিন বাদে। ওর ফোন পেয়ে যেন বিশ্বাসই করতে পারেনি, বিশেষত ওর স্বাভাবিক গলার স্বর ও বাচনভঙ্গিতে। ও বলেছিল একটা বেড়াতে যেতে চায়, কোন নির্জন স্থানে শুধু দুজনে আর যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি। একটু গাঁইগুঁই করলেও শেষ পর্যন্ত সায়ন্তন রাজী হয়ে গিয়েছিল এখানে আসতে। তবে ওর একটা অনুরোধ শুনে ভীষণ অবাক হয়েছিল - এই বেড়াতে আসার খবরটা যেন কেউ জানতে না পারে, মানে আদৌ কোন কাকপক্ষীও নয়। অবাক হয়েছিল, তবে ভাগ্যিস সন্দেহ করেনি। অবশ্য ওকে খুশী করতে এতটাই উদ্গ্রীব ছিল যে এত কিছু ভাবার সুযোগই পায়নি হয়তো। খুশী করার দরকারও ছিল, জানতো ব্যাঙ্কের ধার মেটাতে সায়ন্তনের কাছে আপাতত ও ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
অবশেষে কাল এসে পৌঁছেছে এই অজ পাহাড়ি গ্রামের শেষপ্রান্তে ছোট্ট দোতলা বাড়িটায়। বাড়িটার কথা ও জানতে পেরেছিল বছর কয়েক আগে ওর এক ট্রেকিং পাগল বন্ধুর থেকে, সেই থেকে এই জায়গায় আসার ইচ্ছেটা থেকেই গিয়েছিল। অবশেষে সেই বন্ধুর থেকে ঠিকানানা জোগাড় করে, বেনামে এই বাড়ির মালিকের সাথে যোগাযোগ করে। দিন তিনেকে জন্য বুক করে, অবশ্য বুকিংই বা কি! ছোট বাড়িটা খালিই পড়ে থাকে। এই অজ পাহাড়ি গ্রামে আর কেই বা আসছে, যেখানে এখনও ইলেকট্রিসিটিই এসে পৌঁছায়নি পুরোপুরি! মালিক শখ করে মাঝে মাঝে এসে থাকে এই যা, আর কচ্ছিৎ কদাচিৎ তার কোন বন্ধু বান্ধব বা ট্রেকাররা। ভাড়ার টাকাটাও পাঠিয়েছে বেনামেই।
আজ বিকেলেই ড্রিঙ্কের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বেহুঁশ করেছে তাকে। ডাক্তারী অভিজ্ঞতায় হিসেব করেই মিশিয়েছিল, তাছাড়া নেশার ঘোরে সায়ন্তনের পক্ষে অত খেয়াল করাও সম্ভব ছিল না!
এই দোতলার ছোট্ট ঘুপচি ঘরটায় হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে সে। কাঠের মেঝেটা ভেসে যাচ্ছে রক্তে, সাথে আশেপাশের দেওয়ালেও ফিনকি দিয়ে বেরনো রক্তের ছিটে।
অবশেষে কথা রেখেছে সায়ন্তন, তার শেষ নিঃশ্বাসের হৃদ্স্পন্দনটা হয়েছে তারই জন্য। যদিও সেটা ভালবাসার নয়।
নিখাদ আতঙ্কের
নিজের সার্জারির অস্ত্রপাতি দিয়ে ও যখন বুকটা চিরে কেটে আনছে হার্টটা, সেই সময়ে জ্ঞান ফিরেছিল তার। অন্তিম যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠে বিস্ময়-আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখে দেখেছিল নিজের বুক থেকে হার্টটাকে বিচ্ছিন্ন হতে।
যন্ত্রনা, সেই যন্ত্রনা যা ওকে দিনের পর দিন সহ্য করতে হয়েছে। সেই যন্ত্রনা আর আতঙ্ক তার চোখে দেখতে পেয়ে তৃপ্তি পেয়েছে মেয়েটা।
তার রক্তমাখা নির্লিপ্ত বীভৎস মুখটাই ছিল আতঙ্কিত চোখ দুটোর শেষ স্মৃতি।
কেটে বের করা হার্টটা অল্প ধুকপুক করছে তার হাতের মধ্যে। মনে হয় মরণযন্ত্রনায় খিঁচুনি খাওয়া শরীরের অন্তিম রেশটুকু লেগে আছে তার প্রত্যঙ্গটায়। শরীরটা পড়ে থাক এখানেই, কেউ খোঁজ করবে না আপাতত। এখানেই নিশ্চিন্তে শেষ ঘুমটা ঘুমোক নাহয়।
সেই প্রপোজের দিনটার কথা মাথায় আসায় ঠোঁটের কোনে একটা মৃদু হাসি খেলে গেল। স্মৃতিটা মাথায় আসাতে অনেক সহজ হয়েছিল সিদ্ধান্ত নেওয়াটা।
হঠাৎ নিজেকে খুব দুর্বল আর অবসন্ন লাগলো। দুনিয়ার ক্লান্তি এসে জড়ো হয়েছে শরীরে, যেন সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে ওই হার্টটা। গত কয়েক মাসের যাবতীয় মানসিক চাপ, চিন্তা, যন্ত্রণার যেন আচমকাই উপশম হয়েছে, আর একবিন্দুও ক্ষমতা বাকি নেই ওর মধ্যে।
সাথে ভয়ঙ্কর খিদে, সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি যে।
আচমকা একটা চিন্তা মাথায় খেলে মাথায়। তার প্রেমকে অমর করে রাখলে কেমন হয়! ওর শরীরে সাথে মিশিয়ে, শরীরের মধ্যে !
পেটের মধ্যে
নিজের নামের সার্থকতা চিন্তা করে আবার একটা হাসি খেলে গেল সঞ্জীবনীর মুখে। সায়ন্তনকে চিরন্তন করে রাখবে সে নিজের কোষে কোষে
——
রক্তমাখা মুখটায় ঝুলে আছে একটা পৈশাচিক হাসি
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now