বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হিয়ার মাঝে-১১/১২

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Saniat Ahmed (০ পয়েন্ট)

X হিয়ার মাঝে সানিয়াত আহমেদ আবির পর্ব - ১১/১২ পৌষী ফজরের নামাজ পড়ে আজ আর ঘুমায়নি। মায়ের অসুস্থতার চিন্তা ওকে কাবু করে ফেলেছে। রান্নাঘরে ঢুকে মায়ের জন্য পাতলা স্যুপ রান্না করে নিয়ে এলো। সাহেদা শুয়েছিলেন। পৌষী মা'য়ের পাশে বসে স্যুপের চামচটা তার মুখের সামনে তুলে ধরতেই সাহেদা কেঁদে ফেললেন!পৌষী চামচ নামিয়ে মা'য়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালো! -"ওকি মা,কাঁদছো কেন?" সাহেদা কিছু না বলে শরীর কাঁপিয়ে নিরবে কেঁদেই চলেছেন! পৌষী স্যুপটা রেখে মা'কে জড়িয়ে ধরে বলল-"কেন কাঁদছো তুমি,মা? আমার জন্য?" সাহেদা মেয়ের গালে হাত রেখে বললেন-"আমার কিছু হলে তুই কার কাছে থাকবি?" পৌষী চুপ হয়ে গেলো! তারপর বললো-"আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা না একটা ব্যবস্থা করবেন!" -"আমি তো দেখতে পাচ্ছি,আল্লাহ আমার চিন্তা মোচনের একটা ভালো ব্যবস্থার পথ তৈরী করে দিয়েছেন। এখন তুই সেই পথে চলবি কিনা সেটাই আমার চিন্তা !" পৌষী চেয়ে রইল-"মানে? তুমি কিসের কথা বলছো মা?" -"তোর বড়মামা সেদিন নিজে থেকে তোর বিয়ের কথা বললেন!"বলে সাহেদা একটু থেমে একটু দম নিলেন। তারপর বললেন-"তিনি তোকে তার রাজের বউ করে নিতে চান!" বলে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। পৌষী একটু চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকালো-"কি বলছো মা? রাজ কোটিপতি বাবার একমাত্র ছেলে! ওরা আমাদের আশ্রয় দিয়ে অনেক বড় উপকার করেছে!মামা একথা হয়তো তোমাকে সান্তনা দেবার উপায় খুঁজে না পেয়ে বলেছেন। তাছাড়া রাজ শুনলেই বা কি বলবে? সে কেন তার বাবার চাপে পড়ে আমাকে বিয়ে করবে?মামীও এটা মেনে নেবেন না!" পৌষী এলোমেলো ভাবে কথাগুলো বলল।সাহেদা পৌষীর মুখে হাত বুলিয়ে বললেন-"তুই রাজী কি না সেটা বল্? তোর মামীকে তোর মামাই বোঝাবে। আর রাজের কথা বলছিস! ওর তো মানা করার কোনো কারনই নেই! "সাহেদার মুখে এতক্ষণে মৃদু হাসি দেখা গেলো! -"কেন,কারন নেই কেন? তার নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারেনা?" সাহেদা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন-"সে তোকে খুব....সাহেদা কথা শেষ করতে পারলেন না! রাহেলা ঘরে ঢুকে বলল-"বড়আম্মা আপনেরে ডাকে! " পৌষী মা'কে ছেড়ে ওড়না প্যাঁচালো গায়ে তারপর স্যুপের বাটিটা হাতে নিয়ে বলল-"এটা ঠান্ডা হয়ে গেছে মা! আবার গরম করে আনি!" বলে সে বেরিয়ে গেলো! ডাইনিং হলে আসতেই দেখলো রাজ পেপার পড়ছে।পৌষীকে দেখে রাজ একপলক তাকালো!পৌষী অনুভব করলো ওর মুখ গরম হয়ে গেছে। অন্যান্য দিন তো তার এমনটা হয়না আজ কেন হলো? নাকি একটু আগে শোনা মায়ের কথার সৃষ্ট প্রভাব এটা! পৌষী অকারনেই ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকলো! রাজ ততক্ষণে চোখ ফিরিয়ে পেপারে মনোযোগ দিয়েছে! পৌষী মামীর ঘরে নক করল-"জ্বী,মামী, ডেকেছেন?" মামী লেপের তলা থেকেই বললেন-"তোর বড় মামা আর রাজকে নাস্তা দিয়ে দে!" -"জ্বী...মামী! "বলে পৌষী চলে আসতে নিলে মামী আবার ডাকলেন! -"এ্যাই..শোন্..! তোর মায়ের কি অবস্থা....রে ? "বলে রানী পৌষীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন! পৌষীটা বড় মায়াবতী! দেখলেই মায়া লাগে। রানী ওর জন্য ভালো ছেলে নিজ দায়িত্বেই দেখবেন! নিজের ছেলের বউ করে নিতে তার কোন আপত্তি ছিলোনা যদি সাহেদা অন্তত সামাজিক স্ট্যাটাসটুকু মেইনটেন করতে পারতো। তার একটা মাত্র ছেলে। লোকেই বা কি বলবে! মেয়ে পাওনি খুঁজে যে শেষ পর্যন্ত এক এতিম মেয়েকে ধরিয়ে দিয়েছো? তাছাড়া পৌষী সামাজিকতা বোঝেনা। ঘোমটা দিয়ে ঘরে বসে থাকে,তার ছেলের জীবন একঘেয়ে হয়ে যাবে ওকে বিয়ে করলে! তারচে যে যার মতো জীবনসঙ্গী নিয়ে ভালো থাকুক। রাজ যেমন আধুনিক ছেলে ওর জন্যে তেমন আধুনিকাই চলবে!আর পৌষীর জন্য তিনি দ্বীনদারই খুঁজবেন। লোক লাগালে পাত্র ঠিকই পাওয়া যাবে! রাণী যেন ভাবনায় ডুবে গেলেন। পৌষীর কথায় ফিরে তাকালেন। -"মা আগের মতোই আছে মামী!" -"সে তোকে নিয়ে বড্ড বেশী ভাবে! আরে আমরা আছিনা? আচ্ছা...যা তুই ওদের নাস্তা দে ! "বলে লেপের ভিতর মুখ গুঁজলেন রানী। পৌষী রান্নাঘরে এসে নাস্তা বের করে ওভেনে গরম করতে বসলো! নানান চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে মনটা। মামীর কথার ভঙ্গিতে মনে হলো তিনিও চান তার রাজের সাথেই বিয়ে হোক! ওদিকে মা বলছেন বড় মামাও এটাই চান। রাজ কি চায়? সে যেমন উন্নাসিক ধরনের ছেলে তার তো পৌষীকে পছন্দ হবার কথা না! তবে রাজের প্রতি কৃতজ্ঞ সে। ওর মায়ের অসুস্থতার সময় রাজ যা করেছে তার ঋণ পৌষী শোধ করতে পারবেনা, তাছাড়া সে নিজে যতই আধুনিক হোক না কেন, পৌষীকে এতটুকু বিব্রত করেনি বরং পৌষীর পর্দা মেনে চলাকে সে পূর্ণ সমর্থন যুগিয়েছে। নইলে সেদিন হাসপাতালে সে ইচ্ছে করলেই ও পাশের বেডটাতে ঘুমাতে পারতো। কিন্তু পৌষীর অস্বস্তির কথা ভেবেই সে এই শীতে সারাটা রাত বারান্দায় কাটিয়েছে! হোক মায়ের ভাইপো। তবু এ যুগে কে কার জন্য এতটা করে!" নাস্তা বের করতে গিয়ে অন্য মনস্কতায় আঙ্গুলে ছ্যাঁকা লাগলে চমকে উঠলো পৌষী! রাহেলাকে ডেকে ওকে দিয়ে সব টেবিলে পাঠালো! তারপর চা বসালো! এদের নাস্তা হলে মা'কে স্যুপ খাওয়াবে! এরই মধ্যে বড়মামা ডাকলেন পৌষীকে।পৌষী রান্নাঘরের গেটে দাঁড়িয়ে বলল- -"জ্বী,মামা?" -"তুই নাস্তা খেয়েছিস?" -"একটু পর খাবো মামা!"বলে পৌষী অনিচ্ছাসতাত্বেও আড়চোখে রাজকে একপলক দেখলো। সে পত্রিকায় ডুবে আছে। ওর মনে হয় নাস্তা খাওয়া শেষ।পৌষী দ্রুতহাতে চা বানালো। রাহেলাকে হাত নেড়ে ডেকে ওর হাতে ওদের দুজনের চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে পৌষী ঘরে চলে এলো!" সেদিনের সেই তর্ক বিতর্কের পর আমজাদ চৌধুরী আর রানীর সাথে কথা বাড়াননি। তবে তাঁর স্থির সিদ্ধান্ত তিনি পৌষীকেই রাজের সাথে বিয়ে দেবেন। এতে রাজের জীবনটা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচবে বলে তিনি মনে করেন। বরং এটা তো আরো ভালো হয়েছে রাজ পৌষীকে বিয়ে করতে স্বচ্ছন্দে রাজী হয়েছে। ওকে নতুন করে বোঝাতে হয়নি! পৌষির সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের প্রভাব রাজের উপর পড়বেই! একটা সংসার সুন্দর হওয়ার মূল চাবিকাঠি থাকে নারীর আত্মত্যাগের উপর। ★আল্লাহ মেয়েদেরকে এমন বৈশিষ্ট্যে তৈরী করেছেন যে মেয়েরা যেখানে সংসার পাতবে সেখানে বটগাছের মতো শেকড় ছড়িয়ে চারপাশকে আঁকড়ে ধরবে! একজন সংসারী মেয়ে তার ভালোবাসার ডালপালা মেলে দেবে চারিদিকে যার উপর আশ্রয় করে সংসারের বাকি মানুষগুলো শান্তিতে থাকবে!★ সে নিজেই যদি হয় ছটফটে আর যুগের হাওয়ার সাথে উড়ে চলা মানুষ তাহলে সেই মেয়ে সংসারের হাল ধরবে কি করে?স্বামীকেই বা বাঁধবে কি দিয়ে? নাহ্ রাণীর স্ট্যাটাসের ভুত ওর ঘাড় থেকে নামাতে হবে। রানী নিজের একমাত্র ছেলেকে দিয়ে সমাজে নিজের ঠাটবাট জাহির করবে আর তিনি চান তার একমাত্র ছেলের বউ হবে একজন আদর্শ স্ত্রী,আদর্শ মা। যে একইসাথে তার স্বামী-সংসার-সন্তান এবং অন্য সবকিছু সততার সাথে সামলাবে। আর সেটা একজন ধীরস্থির ধার্মিক মনস্ক মেয়ের পক্ষেই সম্ভব। পৌষী ঠিক তেমনি একটা মেয়ে। আমজাদ চৌধুরী প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে রাজী আছেন কিন্তু একমাত্র ছেলে র জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে রাজী নন। কয়েক দিন পরের কথা! ইরা একাই মায়ের সাথে দেখা করতে এলো! রানী তো অবাক এবং খুশিও। কিন্তু ইরার মুখে তেমন হাসি ছিলোনা! রানী জানতে চাইলেন! -"কি হয়েছে মামনি? কোনো সমস্যা?" ইরা পুরো ব্যপারটা পরিস্কার করে না বললেও যা বললো তাতে বোঝা গেলো যে ইরার স্বামী নাকি কিছুদিন পর কানাডা যাবে! সাথে ইরাকেও নিয়ে যাবে। রানী শুনে তো মহাখুশি! -"এটাতো খুবই ভালো কথা। স্বামীর সাথে ইউরোপ,আমেরিকা ঘুরে বেড়াবি! আর আমি সবাইকে বড় মুখ করে বলবো যে আমার মেয়ে স্বামীর সাথে কানাডা বেড়াতে গেছে!" কিন্তু ইরা কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে বললো-"দুর থেকে সব চোখে দেখা যায়না মা!" -"বুঝলাম না! তোর যেতে সমস্যাটা কি?" -",সমস্যা কিছু না! তোমাকে শুধু এটাই বলতে এসেছি যে তুমি আমার সাথে যাবে।কেনাকাটার নাম দিয়ে হোক বা অন্যকিছু বলে হোক তোমাকে নিয়ে যেতে চাই আমি...! মোট কথা ওর সাথে একা যাবোনা আমি! "ইরার অস্বস্তিতে মায়ের দিকে ভালোভাবে তাকাতে পারছেনা! রানী ওর মুখ তুলে ধরে বললেন -"ঠিক করে বল তো কি হয়েছে?" ইরার চোখের কোণে এক বিন্দু পানি দেখা গেলো! -"আমি সব বলতে পারবোনা মা,শুধু অনুরোধ তুমি আমার সাথে চলো! তুমি সাথে থাকলে ও বুঝে শুনে চলবে,আমার সাথে যা খুশি করতে পারবেনা!" -"কি বলছিস এসব? স্বামীর সাথে থাকবি এতে সমস্যার কি হলো?" -"বললাম তো এখন এসব বলতে পারবোনা। তুমি আমার সাথে যাবে কিনা বলো?" -"দেখি রাতে তোর বাবা আসুক! তোর বাবাও তো জানতে চাইবে! কি বলবো?" -"যা ইচ্ছে হয় বলো শুধু তুমি আমার সাথে চলো,মীরাকেও নিয়ে নাও। মীরার প্রাকটিক্যাল চলছেনও থাক্! আর আমি যে তোমাকে বলে আমাদের সাথে নিচ্ছি একথা ওকে বলোনা! ও জানুক,তুমি নিজের প্রয়োজনেই যাচ্ছো!" -"কি জানি! তোর কথার আগামাথা আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা! তা কতদিনের জন্য যেতে হবে?" -"পনের বিশ দিন হতে পারে আবার মাসখানেকও লাগতে পারে। ওর ব্যবসার কাজের অবস্থা বুঝে!" ইরা বেশীক্ষন থাকলো না। শপিংয়ের কথা বলে বেরিয়েছিলো! সেই সুযোগে মায়ের সাথে এসে কথাগুলো বলে বিদায় নিলো। রাতে আমজাদ চৌধুরী ফিরলে রানী তাকে সব কথা জানালেন। আমজাদ চৌধুরী রানীকে ওদের সাথে যাবার পরামর্শই দিলেন। পরের সপ্তাহেই রানী বড় মেয়ের সাথে কানাডা চলে গেলেন। যাবার সময় পৌষীর হাত ধরে বললেন! -"জানি,তোর উপর চাপ পড়ে যাবে। কারন সাহেদা তো অসুস্থ। তবু বাড়ীতে একটু খেয়াল রাখিস। আমি না আসা পর্যন্ত কোনো কাজের লোককে ছুটি দিবিনা। তাহলে তুই হাবুডুবু খাবি। সব কাজ ওরাই করবে তুই কেবল দেখিয়ে দিবি কেমন?" রানী জানেন পৌষী পূর্ণ সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবে। এদিক দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত নইলে হুটহাট এদিক সেদিক তার যাওয়া হতোনা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার দেশে ফিরে ওকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে নিজের বাড়ীতেই রাখবেন। ওদের হেড অফিসের ম্যানেজার ছেলেটাও ভালো। অল্প বয়স।ওকে প্রয়োজনে বাড়ীর পেছনে কোয়ার্টার বানিয়ে দেয়া হবে। এতে পৌষীরও ঠাঁই হলো,সাহেদারও দুঃশ্চিন্তা কমলো আর তিনিও হাতের কাছে বিশ্বস্ত লোক পেলেন।পৌষীকেও তার হারাতে হলোনা! সাহেদার অবস্থা আজকে আরো খারাপ হয়ে গেলো। বুকের উপর নাকি প্রচন্ড চাপ অনুভব করছেন তিনি। আমজাদ চৌধুরী অফিসে বসেই ফোন পেয়ে রাজকে নির্দেশ দিলেন,এ্যাপোলোতে নিয়ে ভর্তি করাতে।তিনি কাজ সেরে আসবেন। পৌষীর হিমশিম খাওয়ার দশা। একদিকে মায়ের অসুস্থতা অপর দিকে বাড়ীতে মামী নেই,সবকিছু দেখাশোনা করা। কোনদিকে যাবে সে?এরিমধ্যে যথাসাধ্য কাজ গুছিয়ে নিরাকে বুঝিয়ে দিয়ে সাবুমিয়া আর রাহেলাকে বলে পৌষী হাসপাতালে চলে এলো! ইমারজেন্সীতে সাহেদার কিছু টেষ্ট করানো হলো! তার হার্টে কয়েকটা ব্লক ধরা পড়েছে। ইমিডিয়েট অপারেশন করানো লাগবে। ওপেন হার্ট সার্জারী করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তাররা। পৌষী তো কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। সে যতটুকু জানে এই অপারেশন করালে অনেকেই মারা যায়। অপারেশনের ধকলটা সবাই নিতে পারেনা! আমজাদ পৌষীকে ডেকে মাথায় হাত রেখে বললেন -"শোনরে মা! হায়াত মওত আল্লাহর হাতে! তোর মা'কে অপারেশন না করালেও ঝুঁকি করালেও ঝুঁকি। তারচে অপারেশন করানোটাই ঠিক হবে। আমি কেবল তোকে বলতে চাচ্ছি তোর মা'কে তুই মনের দিক থেকে হালকা করে অপারেশন টেবিলে পাঠা। এটা তার জন্যেও ভালো হবে!"বলে আমজাদ পৌষীর দিকে উত্তরের আশায় চেয়ে রইলেন! পৌষী বোকার মতো মামার দিকে তাকালো! -"মামা,আপনি কি বলছেন,আমি ঠিক...!' -"তোর মা তোকে বলেছে কিনা জানিনা!আমি চাই তোর মা তোকে একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে দেখে যাক। আমরা তো আশাকরি সে সেরে উঠবে। কিন্তু সে তো মনের মধ্যে প্রচন্ড চাপ পুষে রেখেছে যে তার কিছু হলে তোর কি হবে! তাই তার অপারেশনের আগে আমি তাকে চাপমুক্ত করতে চাই...তুই কি বলিস?" পৌষী এতক্ষণে কথাটার মর্ম ধরতে পারলো। মা সেদিনও ওর বিয়ে নিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এখন পৌষীর কাছে নিজের ভালোলাগা-মন্দলাগার চেয়ে মায়ের স্বস্তিটাই বেশী জরুরী। পৌষি মৃদু স্বরে বলল -"আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে মামা! আমি নিজে থেকে কিছুই ভাবতে পারছিনা!" আমজাদ পৌষীর মাথায় আবার হাত রেখে বললেন-"গুড...সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা অনেক বড় একটা যোগ্যতা। তোর মাকে আগামী পরশু অপারেশন টেবিলে তোলা হবে। আগামীকাল থেকে ওকে ফুল অবজার্ভেশনে রাখা হবে তখন ডাক্তার হয়তো রুগীর কাছে সবাইকে ভিড়তে দেবেনা! তাই আমি যা করার আজই করতে চাই! তোর মা'কে নিয়ে আজ বাসায় চলে যাবো আমরা! রাতেই তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো! আগামী কাল তোর মা নিজের মেয়ে মেয়ের জামাই নিয়ে নিশ্চিন্তমনে অপারেশনের প্রস্ততি নেবে। কি...ঠিক আছে?" পৌষীর বুকের বাতাস থেমে গেলো! এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে? এভাবে হুট করে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে ভাবেনি পৌষী। মামা ওর দিকে তাকিয়ে বললেন-"কি,কিছু বলবি রে মা?" -"মা..মী..রাজ ওদের মতা...মতটা..!" -"রাজের কোনো সমস্যা নেই! তোর মামী ফিরলে আমি ওকে বুঝিয়ে বলবো! তুই রাজী কিনা বল্! তোর হয়তো মনে হতে পারে আমি তোকে চাপ দিয়ে....!" -"না...মামা! আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন তার ঋণ...!" পৌষীর কথা থামিয়ে দিলেন মামা! -"এসব কথা বলিসনা। তোরা আমার দায়িত্ব। বরং তোদের প্রতি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে না পারলে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিহী করতে হবে। তোর কাছে আমার কেবল একটাই চাওয়া...."! পৌষী মুখ তুলে তাকালো! -"আমার ছেলেটাকে ভালো রাখিস! ওকে জীবনের মূল্য বুঝতে শেখাস। এইতো!" সাহেদার মনে হলো তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন। পৌষীকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না তার। পৌষীর মনে হলো সে তার মা' কে এতো খুশি কখনো দেখেনি। সবচে বেশী খুশি নিরা। সে দুজন বান্ধবী জুটিয়ে একা একাই বিকেলের মধ্যে শপিং করে আনলো।পৌষী দ্বিধাজড়িত কন্ঠে বলল -"এতোটা দরকার ছিলোনা নীরা।ঘরোয়াভাবেই তো সব হচ্ছে! বাইরের কেউ তো আসছেনা!" -"না আসুক,আমার দুজন বান্ধবী আর ভাইয়ার দুতিনজন বন্ধুবান্ধব,আব্বুর হয়ত দুএকজন থাকতে পারে! তাতে কি? আমার একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে। যখন ফাংশান হবে তখন দেখা যাবে। কিন্তু বিয়ে তো বিয়েই!একটা বিয়ের শাড়ী থাকবেনা এটা একটা কথা হলো? পৌষী দেখলো নিরা শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট জুতা কসমেটিকস,চুড়িটুরি সবই এনেছে! পৌষী বুক,ধুকধুক করছে, রাজ কি ভাবছে কে জানে!" রাজ দীর্ঘক্ষণ সিজদায় পড়ে থেকে মাথা তুললে দেখা গেলো ওর চোখের কোন ভেজা। বাবা যখন ওকে রাতেই বিয়ের খবরটা জানালেন তখন মনে হলো ওর হ্রৎপিন্ডটা থেমে গেছে। রাজ আগে নামাজ পড়তোনা। এখন নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করে। পৌষীকে ভালোবাসার পর থেকেই ওর একটাই দু'আ ছিলো আল্লাহর দরবারে! আমাকে পৌষী মিলিয়ে দাও যদি সে আমার ইহকাল পরকালের জন্য উত্তম ও কল্যানকর হয় আর আমাকে হেদায়েত দাও! আজ তার দুআ রঙীন হয়ে বাস্তবায়ন হতে চলেছে! রাজ তার মনের কথা কাউকে বলে বোঝাতে পারবেনা। ঐ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেনা ওর মনে কি পরিমাণ উথালপাতাল চলছে! রাত আটটার মধ্যেই কাজী সাহেব এসে পড়লেন। কোনো রকম বাগাড়ম্বর ছাড়াই সাদামাটাভাবে বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলো। আমজাদ চৌধুরী নিজে মেয়ের ওয়ালী হয়ে কন্যা সম্প্রদান করলেন নিজেরই ছেলের হাতে। রাজ সকাল থেকে সারাদিন পৌষীকে একবারের জন্যেও দেখতে পায়নি। সে যেন রাজের চোখ বাঁচিয়ে চলাফেরা করছিলো!কিন্তু কন্যা সম্প্রদান মুহূর্তে মেরুন বেনারসী পড়া পৌষীকে সে আশাই করেনি! রাজের বুকের ভেতর অজস্র দমকল যেন একসাথে ঘন্টা বাজাচ্ছে। পৌষী মুখ নিচু করে রেখেছে। সাহেদা হুইল চেয়ারে বসে ওদের দুজনের হাত মিলিয়ে দিলেন! রাজ সে হাত আঁকড়ে ধরলো। পৌষীর হাতগুলো উষ্ণ মনে হলো রাজের কাছে! বিয়ে পর্ব শেষে সাহেদাকে ঘরে শুইয়ে দেয়া হলো! আগত অতিথিদের খাবারের ব্যবস্থার জন্য একটা রেষ্টুরেন্টে বলে রাখা হয়েছিলো। সেখান থেকে প্রচুর খাবার দাবার আসলে তারাই খাবার সার্ভ করে গেস্টদের খাইয়ে দিলো! বিদায় নেবার আগে ফিন রাজের পিঠে চাপড় মারলো! -"অবশেষে রাজকন্যা জয় করলি!" রাজ মুচকি হাসলো -"হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ!" ওদিকে সাহেদার রুমে পৌষী মায়ের পাশেই চুপ করে বসেছিলো। সাহেদা ওকে প্রাণভরে দেখছেন। তার মিষ্টি মেয়েটা আজ স্বামীর অধীনে চলে গেলো। আহ্,আল্লাহ তাকে এতো বড় সুখ দিলেন। তার দরবারে কোটিবার শুকরিয়া। হঠাৎ তার রাণীর কথা মনে পড়লে ভয় লাগে,সে ফিরে এসব শুনলে কি বলবে কে জানে?" রাহেলা হাসিমুখে উঁকি দিলো। -"আফা ও থুক্কু ভাবী আমনেরে বড়সাবে ডাকছে!" পৌষী ত্রস্তে উঠে দাঁড়ালে ওর হাতের চুড়িগুলো টুংটাং শব্দে ঝংকার তুলল! -"মা...মামা ডাকছেন শুনে আসি!" ডাইনিং স্পেশে আসতেই আমজাদ চৌধুরী বললেন -"কি রে মা...নাকি বৌ মা বলবো? হা হা হা খিদে লেগেছে যে খেতে দিবিনা?" পৌষী মুচকি হেসে প্লেট ধুয়ে মামার সামনে দিয়ে খাবার দাবার গুলো বেড়ে দিতে লাগলে মামা ওকে থামালেন! -"রাজকে নিয়ে তুইও খেয়ে নে! যা ওকে ডেকে নিয়ে আয়!" পৌষীর পা গুলো মনে হয় কেউ চেপে ধরে রেখেছে। ভারী মনে হচ্ছে ওগুলো! ধীরে ধীরে পা বাড়ালো পৌষী! রাজের ঘরের বারান্দার সামনে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো! কি ভাবে ডাকবে ওকে..! পৌষীর যে ভীষণ লজ্জা লাগছে। তখনি পেছন থেকে রাজ বলল- -"আসসালামু আলাইকুম!" পৌষী চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের মাথার ওড়নাটা টেনে লম্বা করার চেষ্টা করলো! রাজ হেঁটে পৌষীর একেবারে কাছে এসে দাঁড়ালো! পৌষী মাটির দিকে চেয়ে আছে। রাজ মৃদু স্বরে বলল-"কি আমাকেই খুঁজছিলে?" পৌষীর কানে রাজের তুমি ডাকটা বড় আপন মনে হলো! মৃদু স্বরে বলল-"খেতে ডাকছে মামা!" -"তুমি ডাকবেনা?" পৌষী হঠাৎই হেসে ফেলে থেমে গেল -"খাবেন,চলুন!" -"একটা অনুরোধ ছিলো,রাখবে?" -"জ্বী...বলুন!" -"আমার দিকে তাকাও বলছি!" পৌষীর মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। লজ্জায় রাঙা চোখ তুলে তাকাতেই রাজ বললো -"একটিবার আমাকে তোমার কাছে ডাকো আমার নাম ধরে প্লিজ! আমি যে তোমার ডাকের অপেক্ষায় আছি বহুদিন ধরে!" পৌষী অবাক হয়ে শুনলো ওর কথাগুলো তারপর বাতাসের শব্দে ফিসফিসিয়ে বলল -"রা..জ...খেতে আসুন!" -"উঁহু তুমি বলে ডাকতে হবে!" পৌষী মুখ নিচু করে দু চোখ বন্ধ করে ফেলল-"এসো!" রাজ এগিয়ে এসে পৌষীর হাত তুটো তুলে ধরে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-"চলো!" পৌষী আগে আগে আর রাজ তার পেছনে হাঁটতে লাগলো! ডাইনিং হলে এসে পৌষী দেখলো বড়মামার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। রাতে তিনি খুব সামান্যই খান তাছাড়া তিনি অতিরিক্ত রিচ ফুড খেতে পারেননা! পৌষী রাজের প্লেট এগিয়ে দিলো! রাজ বলল-"আমাকে একা দিচ্ছো কেন,তুমিও বসে যাও!" একথা শুনে পৌষী লজ্জা পেলো কিছুটা।ছেলেরা কত দ্রুত লজ্জাকে ঝেড়ে ফেলতে পারে! মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই ওদের বিয়ে হয়েছে অথচ বাবার সামনে রাজ এমনভাবে কথা বলছে যেন দশ বছর ধরে পৌষীর সাথে ঘর সংসার করছে! আমজাদ চৌধুরী সাথে সাথে বললেন -"হ্যাঁ,দুজন একসাথে খেয়ে নাও! আর খাওয়া হলে দুজনেই আমার রুমে এসো!কথা আছে! " বলে আমজাদ চৌধুরী উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন। পৌষী এঁটো প্লেটগুলো গোছাতে লাগলো।ওর হাত পা গুলো অসাঢ় লাগছে ওর কাছে। সুইফটলি কাজ করতে পারছেনা।এর বড় একটা কারন হচ্ছে রাজ অপলক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! পৌষী প্লেটগুলো নিয়ে দ্রুত রান্নাঘরে চল গেলে রাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার টেনে বসলো!পৌষী বেরিয়ে এসে বললো -"আপনাকে নাহয় দিয়ে....."রাজের ভ্রুঁ কুচকানো দেখে পৌষী থেমে গিয়ে আরক্ত মুখে বললো -"এতো তাড়াতাড়ি আমার মুখ দিয়ে তুমি আসবেনা! সময় লাগবে একটু!" -"সময় লাগবে ঠিকআছে কিন্তু ট্রাই তো করো!" -"ইয়ে বলছিলাম রাহেলা, সাবু মিয়া ওদেরকে দিয়ে দেই,বেচারারা না খেয়ে বসে আছে!" রাজ মাথা নাড়লো-"ওদেরকে দিয়ে দাও!তুমি আর আমি একটু পরেই খাই!" -"জ্বী"! বলে পৌষী ফের রান্নাঘরে ঢুকে গেলো! রাজ উঠে গিয়ে পৌষীদের ঘরে সাহেদার কাছে গেলো! পৌষী সেদিকে চেয়ে মৃদু হাসলো! মিনিট পনের পরেই পৌষী রাজকে ডাকার উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকলো! রাজের গালে হাত রেখে সাহেদা কিছু বলছিলেন আর রাজ মাথা নিচু করে তা শুনছিলো! পৌষী এলে সাহেদা বললেন-"যা তোরা খেয়ে নে!" রাজ সাহেদার কপালে চুমু খেয়ে বলল-"গেলাম ফুপি!" পৌষী সেদিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস চাপলো!রাজের কিছু আন্তরিক ব্যবহার পৌষীর অন্তরকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মায়ের সাথে তার আচরণগুলো যথেষ্ট আন্তরিক। হাসপাতালেও পৌষী লক্ষ্য করেছে রাজের তৎপরতা। যেন সাহেদা তার মা,এতটা যত্ন নিয়েই সে তার ফুপিকে সেবা করেছে! টেবিলে রাজের সাথে এই প্রথম একত্রে খেতে বসা! পৌষী তুলে দিতে নিলে রাজ ওর হাত ধরে ফেলল! পৌষী নিজের হাত গুটিয়ে নিলো! রাজ প্লেটে খাবার সার্ভ করলো! তারপর পৌষী খাবারে হাত দিতেই বলল-"এক মিনিট! আমি তোমাকে খাইয়ে দেবো!"পৌষী কিছু বললোনা। রাজ একটা ছোট লোকমা ওর মুখে তুলে দিলো! তারপর বলল-"আমাকে দেবেনা?" পৌষী হাসি চেপে নিজের প্লেট থেকে খাবার তুলে রাজের মুখে দিলে রাজ বাম হাতে ওর হাতটা ধরে খাবারটা মুখে নিলো। নেবার সময় ইচ্ছে করে পৌষীর আঙ্গুলগুলো ঠোঁট দিয়ে একটু চেপে ধরে তারপর ছেড়ে দিলো! পৌষী কিছুটা কেঁপে উঠে মুখ নামিয়ে ফেলল! -"লজ্জায় টমেটো হয়ে গেলে দেখি! আচ্ছা মাংস তো দিলেই না! আরেকবার দাও!" পৌষী একটুকরো মাংস তুলে দিতে গেলে রাজ আবার ওর হাত ধরে একইকান্ড করলো! পৌষী এবার বলল- -"আর দেবোনা এবার নিজের হাতে খান!" এভাবে ছোটখাট দুষ্টামীর মধ্য দিয়ে ওরা খাওয়া শেষ করলো! রাজ বললো-"চলো আমি তোমার সাথে হাত লাগাই,কাজ দ্রুত শেষ হবে!" -"লাগবেনা,কাজ তেমন কিছুই নেই, খাবার গুলো ফ্রিজে রাখতে হবে! এটা রাহেলাই পারবে! চলুন,মামার ঘরে যাই! উনি জেগে বসে আছেন!" -"ওহ্..ইয়েস চলো!"বলে দুজন একসাথে আমজাদ চৌধুরীর রুমে এলো! আমজাদ চৌধুরী রিমলেস চশমা চোখে দিয়ে অফিসের কাগজপত্রগুলো দেখছিলেন! ওদের প্রবেশ করতে দেখে তিনি সেগুলো রেখে উঠে এলেন। ওদের সোফা দেখিয়ে ইশারায় বসতে বললেন!চশমাটা খুলে একটু ভেবে বললেন- -"তোমাদের দুজনকেই বলছি! দ্যাখো আজ শরীয়ত সম্মতভাবে তোমাদের দুজনের বিয়ে হয়েছে! আজ আমি রাজের শুধু বাবা হলেও পৌষীর মামা এবং অভিভাবক বা ওয়ালী দুটোই! সেই হিসেবে আমি রাজকেই বলবো! যেহেতু তোমাদের বিয়েটা এখনো সামাজিকভাবে প্রচার পায়নি কারন ছেলের পক্ষ থেকে একটা ওয়ালিমা করার যে সুন্নতটা রয়েছে যা ইসলামের একটি বিধানও বটে যে, ছেলে ওয়ালিমার মাধ্যমে সমাজকে জানাবে যে আমি এই মেয়েটিকে বিয়ে করেছি। মেয়েপক্ষের কোনো অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই! এক্ষেত্রে ইসলাম কন্যাদায় গ্রস্ত পিতার উপর কোনো বার্ডেন রাখেনি! আমাদের সমাজে মেয়েপক্ষ যে বরযাত্রার একটা বিরাট ধকল সহ্য করে এটা সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী! মেয়ের বাবার উপর জুলুম! যাক্...যা বলছিলাম,যেহেতু ওয়ালিমা হয়নি! তোর মা'ও এখন পর্যন্ত বিষয়টা জানেনা সেহেতু তোদেরকে আমি শুধু এতটুকু অনুরোধ করবো,অনুষ্ঠানটা না হওয়া পর্যন্ত তোরা একটু ধৈর্য্য ধরবি আমি বলছিনা যে দেখা সাক্ষাৎ কথা বলা বন্ধ!সবই করবি কিন্তু বুঝেশুনে। তোর মা ফিরলে আমি তাকে ভালোভাবে বোঝাবো এবং তার দোয়াও তোদের প্রয়োজন কারন সে "মা"! তাই আমি বিশেষ করে রাজকে বলে দিচ্ছি যে,পৌষী তোর কাছে আমানত! এর অমর্যাদা করিসনা! যদিও পৌষীর মা এবং আমি পৌষীকে তোর হাতে তুলে দিয়েছি তবু বিশৃংখলা এড়াতে তোদের কে কিছুদিন একটু ধৈর্য্যের সাথে চলতে হবে।তোরা দুজনই শিক্ষিত, বুদ্ধিমান তাই আমি কি বলতে চাচ্ছি তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়! কি...ঠিক আছে?" পৌষী যেন লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছে কথাগুলো শুনে। রাজ মাথা নেড়ে বলল-"জ্বী,ঠিকআছে!" -"আচ্ছা তোরা এবার যেতে পারিস!" পৌষী মামার কাছে এসে দাঁড়ালো! মামা তাকিয়ে বললেন-"কি, কিছু বলবি মা?" -"মামা - মামী কিছুই জানেন না! কাজটা কি ঠিক হলো? আমার ভয় লাগছে!" -"আরে দুর পাগলী! শোন্...আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। আর তোর পিতার অবর্তমানে আমি তোর অভিভাবক!তোর বিয়েটা তোর মা এবং আমার সম্মতিতেই হয়েছে। যদিও এখানে তোর মামী কোনো ফ্যাক্ট না তবু রাজের মা হিসেবে তাকে এই অনারটুকু করছি। নইলে তোদের এখন সংসার শুরু করতে কোনো বাধা ছিলোনা ! বুঝতে পারছিস রে মা?" পৌষী মাথা নাড়লো! -"মনে রাখিস,আজ থেকে রাজ তোর স্বামী আর তুই তার স্ত্রী। আমি বিবাদ এড়াতে তোদের কাছে এই সময়টুকু চেয়ে নিলাম। জানিস বোধহয় রাজ তোর মোহরানাও পরিশোধ করে দিয়েছে সে হিসেবে তোরা পরস্পর পরস্পরের জন্য হালাল বা বৈধ।কেবল লৌকিকতাটুকু বাকী এই যা! আর হ্যাঁ..রাজ! তোর ফুপির অপারেশন হয়ে গেলে অফিসে বসবি! -"জ্বী,ইনশাআল্লাহ্! বারান্দার শেষ প্রান্তে পৌষীদের রুমটা।নীরার রুমের সামনে দিয়ে যাবার সময় ভেতর থেকে ওর বান্ধবীদের চটুল হাসির শব্দ শোনা গেলো! সম্ভবত নীরার বান্ধবীরা আজ রাতে এখানেই থাকবে! বারান্দা পেরোবার আগেই রাজ পৌষীকে থামালো! বলল-"সব কথা তো শুনলে এবার তোমার কোনো বক্তব্য থাকলে বলো!" পৌষী মৃদু স্বরে বলল-"কি বলবো! ভাবতে অবাক লাগছে এসব আমাকে কেন্দ্র করে ঘটছে!" -"আসলে আমাদের জীবন মাঝে মাঝে নাটকের চেয়ে বেশী নাটকীয় হয়ে যায়!বাবা র কথা মতো আমরা দুজন দুপ্রান্তে থাকবো। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকবে তোমার কাছে!" পৌষী একবার মুখ তুলে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে ফেলল! রাজ বলল- -"এতোদিন তোমাকে যে কথাটা বলার সাহস করিনি,আজ সে কথাটা তোমাকে বলি! যেদিন তোমাকে প্রথম দেখি সেদিন থেকেই তোমার প্রেমে পড়ে গেছি। বিশ্বাস করো, তোমাকে ভালোবাসার পর থেকে দ্বিতীয় কোন মেয়ের দিকে তাকাইনি, কারো কথা একমুহূর্তের জন্যে ভাবিনি! আমি হয়তো তোমার মতো মেয়ের উপযুক্ত নই।কিন্তু আমি নিজেকে ধীরে ধীরে বদলে ফেলতে চাই! তুমি আমাকে সাহায্য করবে প্লিজ?" পৌষী রাজের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলো -"এভাবে বলছেন কেন?" রাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-"তোমার সাথে বলার মতো অজস্র কথা বুকের ভেতর জমে আছে! ইচ্ছে করছে কথা বলেই রাত কাটিয়ে দেই যাবে আমার ঘরে? চলোনা, শুধু দুজনে কথা বলবো!" -"উম..মা যে ঘরে একা?" -"হমম তাও ঠিক। আচ্ছা তাহলে চলো তোমাকে ঘরে দিয়ে তারপর আমি আমার রুমে যাই!" পৌষী দীর্ঘশ্বাস চেপে পা বাড়ালো। রাজ ডাকলো-"শোনো!" পৌষী ফিরে তাকালো! রাজ নিরবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো! যেন চোখ দিয়ে নিজের অব্যক্ত কথাগুলো বলতে চাচ্ছে রাজ। পৌষী ভ্রুঁ তুলে জিজ্ঞেস করলো -"কি?" -"কাছে এসো!"রাজ গম্ভীর স্বরে যেন আদেশ করলো! পৌষী ভীরু পায়ে কাছে এলো! রাজ দুহাতে ওর মুখ তুলে ধরলো!রাজ পৌষীর চেয়ে প্রায় ছয় ইঞ্চি লম্বা! যার ফলে পৌষীর কপালে চুমু খেতে ওকে কিছুটা ঝুঁকতে হলো! পৌষী দুচোখ বন্ধ করে ফেললো! কিছুক্ষণ পরেই ও নিজের ঠোঁটের উপর রাজের ঠৌঁটের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো! রাজ ভেবেছিলো আলতো ছুঁয়ে সরে যাবে কিন্তু পৌষীর ছোঁয়া ওকে পাগল করে দিলো যেন। রাজের আবেগের রেশ পৌষীর মাঝেও ছড়িয়ে পড়লো! সে দুহাতে রাজকে জড়িয়ে ধরল। কয়েক মিনিট পর রাজ থামলো! তারপর ছোট ছোট চুমু খেলো আর প্রতিটি চুমুর বিরতিতে বলতে লাগল-"লাভ ইউ..লাভ ইউ...লাভ ইউ..লা...!" পৌষি এবার হালকা ধাক্কা মেরে ওকে সরিয়ে দিয়ে বললো-"হয়েছে....এবার যান তো! রাত বাড়ছে!" রাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর কপালে চুমু দিয়ে দ্রুত নিজেকে যেন ছাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে গেলো ওর ঘরের দিকে! পৌষী সেদিকে চেয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেদের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো! পরদিন সকালে নাস্তা তৈরী করে পৌষী নিজেই গেলো রাজকে ডাকতে! পৌষীর নিজেই কাছেই খুব অদ্ভুত লাগছে! কাল রাতের পর থেকে ও কত সহজেই রাজকে আপন ভাবতে পারছে। আজ মায়ের পরে রাজের মতো আপন ওর আর কেউ নেই! টুকটুক করে দু তিনটে টোকা দিতেই রাজ দরজা খুললো! খালি গায়ে কেবল একটা ট্রাউজার পরনে রাজকে দেখে চোখ সরিয়ে নিলো পৌষী-"নাস্তা খাবেন না?" রাজ চারিদিক তাকিয়ে চট করে পৌষিকে টান দিয়ে নিজের ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো! পৌষী ভীষণ চমকে উঠে বলল -"আরে একি? ছাড়ুন একটু পরেই মামা খুঁজবে! প্লিজ গেট খুলুন, যেতে দিন আমাকে!" পৌষীকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে বলল রাজ -"তুমি অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছো!সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, তুমি এসে সেটা ভেঙ্গে দিলে,এখন সেটার খেসারত দিতে হবে!"বলে পৌষীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে বসালো!পৌষী অনুনয় করলো- -"প্লিজ মামা নামলে লজ্জার সীমা থাকবেনা। এরকম করলে কিন্তু আর ডাকতে আসবোনা এই বলে দিলাম!" -"থ্রেড দিচ্ছো?"পৌষীর গালে চুমু দিলো রাজ। ওর শরীরের ভার অনেকটাই পৌষীর ওপর। পৌষীর মনে হলো এখনি রাজকে সরানো দরকার। ধাক্কা দিয়ে রাজকে সরিয়ে দিয়ে বলল-"সরেন আমি যাবো!" -"প্লিজ মাত্র একটা!" -"না বাসি মুখে গন্ধ লাগে...! "পৌষী মুখ সরিয়ে নিলো! -"কিহ্ কে বলেছে তোমাকে? রাতে দাঁত ব্রাশ করেছি, এই দ্যাখো! "বলে রাজ মুখ এগিয়ে নিতেই পৌষী ওকে জোরে ধাক্কা মেরে উঠে গেলো! -"আমি আর আসবোনা বলে দিলাম।"পৌষী তর্জনী তুলে শাসালো ওকে! রাজ দুহাত দিয়ে কান ধরে বলল-"এই কানে ধরছি,এবার থেকে কন্ট্রোল করবো তবু এই শাস্তিটা দিওনা জান্ একদম মরে যাবো!" পৌষী ওড়না দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে ঢেকে বলল-"ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে আসুন!" রাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-"আসছি...!" সারাটা দিন রাজ মায়ের ঘরেই একরকম কাটালো! এরি মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে রান্নাঘরে এসে পৌষীকে দেখে গেলো! যেহেতু কয়েকদিন হাসপাতালে থাকা লাগবে তাই পৌষী বেশী করে কয়েক পদের তরকারী রান্নাঘরে ফ্রিজে রেখে যাবে যেন নিরা বা মামার কোনো অসুবিধা না হয়। রাজ বলছে সে হাসপাতালেই থাকবে। কাজেই ওর জন্য বাড়তি রান্নার দরকার পড়বেনা! বাকী কাজের লোক তো আছেই। তবু পৌষী নীরাকে সব বুঝিয়ে বলল! রাতে সাহেদাকে কেবিনেই রাখা হলো! নার্স জানালো সকালে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে।দুপুর দুটোয় ও.টি! রাতটা ওদের কেবিনেই কাটলো।পৌষী বারবার কান্না করছিলো। রাজ ওকে বোঝালো-"তোমার এখন শক্ত থাকা উচিত।তোমার কান্না ফুপির মনোবল ভেঙ্গে দিতে পারে!" এটা শুনে পৌষী শান্ত হলো! রাজ সাহেদাকে চিয়ার আপ রাখার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে হালকা গল্প বলতে লাগলো!পৌষীকে নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবে তার প্ল্যান বর্ণনা করলো। সাহেদা মুচকি হেসে ওর কথাগুলো শুনছিলেন! বেলা এগারোটার দিকে যখন সাহেদাকে ওটির দিকে নিয়ে যাওয়া হলো তখন পৌষী কেবিনে রাজকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো! চলবে........?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ হিয়ার মাঝে-১১/১২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now