বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
হ্যারি পটার এন্ড দি ফিলসফারস স্টোন - জে. কে. রাওলিং (৩য় পর্ব)
X
হ্যারি পটার এন্ড দি ফিলসফারস স্টোন
লেখিকাঃ জে. কে. রাওলিং
পৌনে দশ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে যাত্রাঃ
ডার্সিলি পরিবারে হ্যারির শেষ মাসটা খুব আনন্দে কাটেনি। ডাডলি তাকে এমন ভয় পেত যে সে তার সঙ্গে কোন সময়ই এক ঘরে থাকতে চাইত না। অন্যদিকে তাকে কাবার্ডে ভরতে, ধমক দিতে বা জোর করে কিছু করতে ডার্সলিরা সাহসও পেতেন না। প্রকৃতপক্ষে, কেউই হ্যারির সাথে পারতপক্ষে কথা বলতেন না। কিছুটা ভয়, কিছুটা রাগের কারণে হ্যারি সামনে বসে থাকলেও তারা মনে করতেন চেয়ারটা খালি। ওখানে কেউ নেই। এটা অনেক দিক থেকে ভালো হলেও হ্যারির কাছে এই উপেক্ষা বিষাদে পরিণত হয়েছিলো।
সঙ্গী হিসেবে পেঁচাকে হ্যারি তার ঘরে রেখেছে। পেঁচার নাম দিয়েছে সে হেডউইগ। এ নামটি সে পেয়েছে এ হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক গ্রন্থে। তার বইগুলো ছিল খুব মজার। সে গভীর রাত পর্যন্ত বইগুলো পড়ত। হেডউইগ জানালা দিয়ে ইচ্ছেমত ঘরের বাইরে যেত আবার আসত। ভাগ্য ভালো যে, আন্ট পেতুনিয়া কখনো হ্যারির ঘরে ঢুকতেন না, কারণ, প্রতিদিনই হেডউইগ ঘরে মরা ইঁদুর নিয়ে আসত। শোবার আগে সে প্রতি রাতেই দেয়ালে পিন দিয়ে আটকানো একটা কাগজে লেখা একটি করে তারিখ কেটে দিত। এভাবেই সে হিসাব রাখতো ১লা সেপ্টেম্বর আসতে আর কদিন বাকি আছে।
আগস্টের শেষ দিন হ্যারি কিভাবে সে কিংসক্রসে যাবে সে বিষয়ে আঙ্কল–আন্টের সঙ্গে একটু কথা বলে নেয়া ভালো। হ্যারি যখন তাদের বসার ঘরে গেল তখন তারা টিভিতে একটি কুইজ দেখছিলেন। হ্যারি গলা দিয়ে কাশির মতো শব্দ করল। তাকে দেখেই ডাডলি চিৎকার করে পালিয়ে গেল।
হ্যারি কাশি দিয়ে নিজের আসার কথা জানান দিল।
ভার্নন আঙ্কল, হ্যারি বলতে শুরু করল।
আঙ্কল কোন কিছু বললেন না, তবে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি হ্যারির কথা শুনছেন।
হ্যারি বলল–আঙ্কল কাল আমি কিংস ক্রস স্টেশনে যাব। আমাকে হোগার্টস যেতে হবে। আপনার গাড়িতে আমাকে লিফট দিতে পারবেন?
আঙ্কল ভের্নন কথা না বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
ধন্যবাদ। হ্যারি বলল।
হ্যারি যখন ওপরতলায় ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল তখন তার আঙ্কল কথা বললেন, জাদুকরদের স্কুলে যেতে আবার ট্রেনের প্রয়োজন হয় কেন? ওদের ম্যাজিক কার্পেটগুলো কি ফেঁটে গেছে? তারপর হ্যারিকে জিজ্ঞেস করলেন–তোমার স্কুল কোথায়?
আমি ঠিক জানি না। হ্যারি জবাব দিল। হ্যারি তখনই উপলব্ধি করলো যে সে বিষয়টি আগে খেয়াল করেনি। সে পকেট থেকে হ্যাগ্রিডের দেয়া টিকিট বের করলো।
কী জানো তাহলে?
হ্যারি জবাব দিল-এতটুকু জানি পৌনে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ঠিক এগারোটায় ট্রেনে চড়তে হবে।
কী প্ল্যাটফর্ম বললে? আন্ট ও আঙ্কল তার দিকে বিস্ময়ে তাকালেন।
পৌনে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম। হ্যারি বলল।
যত্তসব রাবিশ–
এ নামে তো কোন প্ল্যাটফর্ম নেই। আঙ্কল ভার্নন মন্তব্য করলেন। টিকিটে তো তাই লেখা আছে। হ্যারি মরিয়া হয়ে জবাব দিল।
যত্তসব পাগলের কাণ্ড। আঙ্কল ভার্নন মন্তব্য করলেন–ঠিক আছে। অপেক্ষা করো, তুমি নিজেই দেখতে পাবে। তোমাকে কিংস ক্রস স্টেশনে নামিয়ে দিতে আমার কোন অসুবিধে নেই। কারণ কাল আমরাও লন্ডন যাচ্ছি।
পরিবেশ লঘু করার জন্য হ্যারি প্রশ্ন করল–আপনারা লন্ডন যাচ্ছেন, কেন?
ডাডলিকে হাসপাতালে নিতে হবে। বড় হওয়ার আগেই তার পেছনের ছোট লেজটায় অস্ত্রোপচার করতে হবে। সে-ই লেজটাই, যেটা গজিয়েছিল ঝড়ের রাতে, হ্যাগ্রিডের জাদুমন্ত্রে। সে রাত থেকে হ্যারিকে ডাডলির জ্বালাতন করাতো দূরের কথা, ওর ধারে কাছে যেতে সাহস পায় না।
পরদিন ভোর পাঁচটায় হ্যারি ঘুম থেকে উঠল। ভেতরে টান টান উত্তেজনা। তাই দ্বিতীয়বার আর ঘুমোতে গেল না। সে তার জিনসের কাপড় বের করল, কারণ জাদুকরের পোশাক পরে সে স্টেশনে যেতে চাচ্ছিল না। ট্রেনে উঠে সে পোশাক পালটে নেবে। হোগার্টসের জন্য যা যা জিনিস, তার তালিকা হ্যারি একবার যাচাই করে নিল। কারণ হোগার্টসে গিয়ে দেখা যাবে যে এমন কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা দরকার ছিল কিন্তু সেগুলো আনা হয়নি।
তারপর হ্যারি অপেক্ষা করতে লাগল–ডার্সলি পরিবারের সদস্যদের কখন ঘুম ভাঙে। দু ঘণ্টা পর হ্যারির ভারী ট্রাংক ডার্সলির গাড়িতে ওঠানো হলো। আন্ট পেতুনিয়া ডাডলিকে বলে দিলেন–গাড়িতে ও যেন হ্যারির পাশে বসে। ভয়ে ভয়ে হলেও ডাডলি হ্যারির পাশে গাড়িতে বসলো, গাড়ি চলতে শুরু করলো।
সাড়ে দশটায় তারা কিংস ক্রস স্টেশনে পৌঁছলেন। আঙ্কল ভার্নন হ্যারির ট্রাংকটা ট্রলিতে উঠিয়ে দিলেন এবং নিজেই ট্রলিটি স্টেশনে ঠেলে নিয়ে গেলেন। হ্যারি আঙ্কলের ওই কাজকে একটা আশ্চর্য সদয় ব্যবহার বলে মনে করল। একটু পরে যখন আঙ্কল ভার্নন প্ল্যাটফর্মে পৌঁছলেন তখন তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি।
আঙ্কল ভার্নন বললেন-এই তোমার প্ল্যাটফর্ম প্ল্যাটফর্ম নয়… প্ল্যাটফর্ম দশ। তোমার প্ল্যাটফর্ম এ দুটি সংখ্যার মাঝামাঝি হওয়া উচিত। মনে হচ্ছে–প্ল্যাটফর্ম এখনও তৈরি করেনি। আঙ্কল ভার্নন ঠিকই বলেছেন। প্ল্যাটফর্মের কোন এক জায়গায় প্লাস্টিকে বড় অক্ষরে নয় এবং অন্য এক স্থানে দশ লেখা আছে। এ দুয়ের মাঝামাঝি জায়গায় কোথাও কোন কিছু লেখা ছিল না।
ভালো থেকো। এই বলে তার সে-ই অদ্ভুত ও সংশয়মিশ্রিত হাসি হেসে আঙ্কল ভার্নন আর কোন কথা না বলেই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেলেন। হ্যারি তাকিয়ে দেখল ডার্সলিরা গাড়ি চালিয়ে চলে যাচ্ছেন। তাদের তিনজনই হাসছে। হ্যারির মুখ শুকিয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল সে এখন কি করবে? পেঁচা হেডউইকের কারণে লোকজন তার দিকে তাকাচ্ছে। ট্রেনের ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞেস করা উচিত। হ্যারি গার্ডের কাছে গিয়ে হোগার্টসের ট্রেনের কথা জানতে চাইল। প্ল্যাটফর্ম নম্বর পৌনে দশ বলতে হ্যারির সাহস হচ্ছিল না। হোগার্টস কোথায়? জানতে চাইল গার্ড। হ্যারিও তাকে বলতে পারল না হোগার্টস দেশের কোন জায়গায় অবস্থিত। হ্যারি কি বলবে, তার মাথায় কিছু আসছিলো না। এবার প্রশ্ন করল–আচ্ছা এগারোটার সময় কোন ট্রেন আছে কি?
তাতো বলতে পারলাম না। গার্ড জবাব দিল। তখন এগারোটা বাজতে মাত্র দশ মিনিট বাকি। সে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। ট্রেনের মাত্র দশ মিনিট বাকি। সে স্টেশনের মাঝখানে ভারি ট্রাঙ্ক, পেঁচা ও পকেটভর্তি জাদুকরদের টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক এই সময়ে পেছনে একদল লোক দেখতে পেল যারা আলাপে মাগল শব্দটি বারবার বলছিল। এক মোটা মহিলা চারজন লাল চুল যুবকের সাথে কথা বলছিলেন। হ্যারি তাদের দিকে এগিয়ে গেল। শুনতে পেল মহিলা বলছেন–
–তোমাদের প্ল্যাটফর্ম নাম্বার কত?
পৌনে দশ। একটি ছোট মেয়ে জবাব দিল। তারও লালচুল। মাম, আমিও কি ওদের সাথে যেতে পারি না।
না, না, গিনি তুমি ছোট এখনো বড় হওনি। এখন চুপ কর। আর পার্সি তুমি আগে আগে যাও।
ছেলেদের মধ্যে যাকে সবচে বেশি বয়সের মনে হলো তাকে প্ল্যাটফর্ম নয় ও দশের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেল। হ্যারি তাকে অপলক দৃষ্টিতে লক্ষ্য রেখে তার পেছনে পেছনে অগ্রসর হলো। ছেলেটা যখন এই দুটো প্লাটফরমের মাঝামাঝি পৌঁছলো, তার সামনে দলে দলে পর্যটক। যখন সর্বশেষ ব্যাগটিও ট্রেন থেকে খালাস করা হলো তখন দেখা গেল যে ছেলেটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফ্রেড, তারপর তোমার পালা। ভদ্রমহিলা বললেন।
আমি ফ্রেড নই। আমি জর্জ। ছেলেটি জবাব দিল। তুমি কি আমাকে জর্জ বলে ডাকতে পারো না?
দুঃখিত, জর্জ। ভদ্রমহিলা বললেন।
ঠাট্টা করছিলাম। আমিই ফ্রেড। এই বলে সে চলে গেল।
তারপর তৃতীয় ভাইটি বদ্ধ দেয়ালের দিকে অগ্রসর হলো। তাকে আর দেখা গেল না। মুহূর্তের মধ্যে দেখা গেল তারও কোন হদিস নেই। হ্যারির পাশে কেউ আর রইল না।
মাফ করবেন। ভদ্রমহিলার কাছে এসে হ্যারি বলল।
হ্যালো! হ্যারিকে সম্বোধন করে ভদ্র মহিলা বললেন–তুমি কি প্রথমবারের জন্য হোগার্টসে যাচ্ছে? রনও প্রথমবারের মতো যাচ্ছে।
তিনি তার ছোট ছেলের প্রতি ইশারা করলেন।
রন লম্বা, পাতলা। হাত পা বড় বড়। চোখা নাক।
হ্যাঁ হ্যারি জবাব দিল। কীভাবে যাব তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি
কেন, তুমি কি প্লাটফর্ম খুঁজে পাচ্ছি না।
না। হ্যারির জবাব।
চিন্তা নেই। তোমাকে শুধু দু প্লাটফর্মের মাঝখানে যেতে হবে। নয় ও দশের মাঝখানে। ওই দেয়ালের দিকে যাও। ঘাবড়াবার কারণ নেই। চেষ্টা কর যাতে রনের আগে পৌঁছতে পারো।
ঠিক আছে। হ্যারি বলল।
হ্যারি তার ট্রলি ধাক্কা দিল এবং সামনের বদ্ধ দেয়ালের দিকে তাকাল। দেয়ালটা একেবারে নিরেট।
হ্যারি হাঁটতে শুরু করল। যাওয়ার পথে লোকজনের সাথে হ্যারির ধাক্কাধাক্কি হলো। হ্যারি আরও দ্রুত হাঁটতে লাগল। টিকিট বাক্সের সাথে হ্যারির ধাক্কা লেগে গিয়েছিল প্রায়। ধাক্কা লাগলে তার জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে যেত। ভাগ্য ভালো। হ্যারিকে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়নি।
জনাকীর্ণ প্লাটফর্মের পাশে একটি লাল রঙের বাস্পীয় ইঞ্জিন অপেক্ষা করছিল। ইঞ্জিনের ওপর লেখা ছিল হোগার্টস এক্সপ্রেস।
১১টা। হ্যারি পেছনে তাকাল। তাকিয়ে দেখল। নয় ও দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে লেখা ভেসে উঠল–প্লাট ফরম পৌনে দশ।
কথাবার্তায় ব্যস্ত লোকজনের মাথার ওপর দিয়ে ইঞ্জিনের ধোঁয়া ভেসে চলেছে। নানা রঙের বিড়াল পায়ের ফাঁক গলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। অনেক পেঁচা এদিক–সেদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাংক টানাটানির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
প্রথমদিকের কামরাগুলোতে ছাত্ররা গা ঘেষাঘেষি করে বসে আছে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে মুখ গলিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলছে। একটা ছেলে তার ব্যাঙ হারিয়ে ফেলেছে। হ্যারির ভাগ্য ভালো। সে মোটামুটি একটি খালি কামরা পেয়ে গেল।
ফ্রেড নামের ছেলেটা হ্যারিকে জিজ্ঞেস করল–তুমি কি হ্যারি পটার?
হ্যাঁ। হ্যারি জবাব দিল।
হ্যারির দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে লালচুল যমজভাই দুজন ট্রেন থেকে নেমে এল। হ্যারি জানালার পাশে বসেছিল। সেখান থেকে নিজেকে অনেকটা আড়ালে রেখে হ্যারি প্ল্যাটফর্মে লালচুল পরিবারের সবাইকে লক্ষ্য করছিল এবং তারা কি বলছিল তা শুনছিল। মা এইমাত্র তার রুমাল বের করলেন।
রন, তোমার নাকে ওটা কি?
ছোট ছেলেটি তার মার কাছ থেকে সরে যাচ্ছিল। তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে তার নাক মুছে দিলেন।
যমজ ভাইদের একজন বলে উঠল–রনের নাকে কি কিছু আছে?
চুপ কর। রন ধমক দিল।
পার্সি কোথায়? তার মা জানতে চাইলেন।
সে আসছে
বড় ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে এল। এরই মধ্যে সে তার পোশাক বদলে হোগার্টসের জাদুর স্কুলের পোশাক পরে নিয়েছে। হ্যারি দেখল ইংরেজি পি বর্ণ দিয়ে তার বুকের ওপর একটি উজ্জ্বল ব্যাজ।
মা, বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। ছেলেটি বলল।
আমি প্রিফেক্টদের কামরা থেকে এলাম। তারা তাদের জন্য দুটি কামরা পৃথক করে রেখেছেন।
পার্সি, তুমি কি একজন প্রিফেক্ট? যমজদের একজন প্রশ্ন করল।
যমজদের একজন আবার প্রশ্ন করল–পার্সি প্রতিদিন নতুন পোশাক পায় কিভাবে?
কারণ সে একজন প্রিফেক্ট। মা জবাব দিলেন। ভালোভাবে থেকো। যখন সুযোগ পাবে তখন আমাকে একটা পেঁচা পাঠাবে।
তিনি পার্সির কপালে চুমু দিলেন। পার্সি চলে গেল! এরপর তিনি যমজ ভাইদের দিকে নজর দিলেন।
হ্যারি লক্ষ্য করল ট্রেন বাঁক নেবার সাথে সাথেই মা ও মেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ট্রেনে চড়তে পারায় হ্যারির অনেক আনন্দ হচ্ছিল। সে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। হঠাৎ করে সামনের দরোজা খুলে গেল। একজন লালচুলের বালক কামরায় প্রবেশ করে হ্যারির উল্টোদিক দেখিয়ে জানতে চাইল-এখানে কি কেউ আছে? হ্যারি না বলাতে বালকটি ওই আসনে বসে পড়ল।
প্রথমে সে হ্যারিকে লক্ষ্য করল। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে এমনভাবে তাকাল যেন সে হ্যারিকে দেখতেই পায়নি। হ্যারি লক্ষ্য করল এর ভেতরে দু যমজ ভাই ফিরে এসেছে।
যমজ ভাইদের একজন বলল আমাদের কি পরিচয় হয়েছে? আমরা ফ্রেড ও জর্জ। এ হলো আমাদের ভাই রন। আবার দেখা হবে।
বিদায়, হ্যারি ও রন বললো। যমজ দু ভাই অন্য কামরায় গিয়ে দরোজা বন্ধ করে দিল। তুমি কি আসলেই হ্যারি পটার? রন আবার প্রশ্ন করল।
হ্যাঁ। মাথা নেড়ে হ্যারি বলল। রন আবার বলল–আমি ভেবেছিলাম ফ্রেড বা জর্জের মধ্যে কেউ একজন হবে।
রন হ্যারির কপালের দিকে ইঙ্গিত করে বলল।
হ্যারি, এখানেই কি ইউ-নো-হুর…।
হা হ্যারি জবাব দিল–কিন্তু আমার কিছু মনে নেই।
তোমার কি কিছুই মনে নেই? রন আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করল।
তীব্র সবুজ আলোর কথা আমার মনে পড়ে। এর বাইরে কিছুই মনে করতে পারি না। হ্যারি জবাব দিল।
ওহ। এই বলে রন বসে পড়ল ও হ্যারিকে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের জন্য। তারপর সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
তোমাদের পরিবারের সবাই কি জাদুকর? হ্যারি রনকে প্রশ্ন করল। রনকে হ্যারির খুব ভাল লেগেছে।
রন জবাব দিল–আমার তাই মনে হয়। মায়ের এক দূরসম্পৰ্কীয় ভাই আছেন যিনি হিসাবরক্ষক। আমরা তাকে নিয়ে খুব একটা আলোচনা করি না।
তাহলে তুমি অনেক জাদু জানো। হ্যারি মন্তব্য করল।
ওয়েসলি পরিবার পুরনো জাদুকর পরিবারের অন্যতম। ডায়াগন এলির সেই ছেলেটি এ ধরনের মন্তব্য করেছিল।
আমি শুনলাম তুমি মাগলদের সাথে থাকতে গিয়েছিলে। তারা কেমন? রন হ্যারিকে প্রশ্ন করল।
খুবই খারাপ। তবে তাদের সবাই নয়। হ্যারি জবাব দিল। মাগল চেনার জন্য আমার চাচা, চাচী ও চাচাতো ভাইই যথেষ্ট। আমার যদি তিনজন জাদুকর ভাই থাকত।
পাঁচ–রন বলল। যেকোন কারণেই হোক রনকে একটু মনমরা দেখাচ্ছিল। রন বলে চলল–আমাদের পরিবারে আমি ষষ্ঠ ব্যক্তি যে হোগার্টসে যাচ্ছি। তুমি হয়তো বলতে পার বিল আর চার্লি যা রেখে গেছে তার অনেক কিছুই আমি পেয়েছি। বিল ছিল হেডবয়, আর চার্লি কিডিচ দলের অধিনায়ক। এখন পার্সি একজন প্রিফেক্ট। ফ্রেড আর জর্জ অনেক হইচই করে বেড়ায়। তবুও তারা ভালো নম্বর পায়। সবাই মনে করে তারা খুব মজার। প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা আমিও তাদের মত ভালো করব। আমি যদি ভালো করি তাতেও আমার কোন কৃতিত্ব থাকবে না। কারণ এ রকম ফলাফল ওরা সবাই আগে করে গেছে। যার পাঁচ ভাই আছে সে কখনো নতুন কিছু পায় না। আমি বিলের কাছ থেকে তার পুরনো পোশাক, চার্লির কাছ থেকে জাদুদণ্ড এবং পার্সির কাছ থেকে পুরনো ইঁদুর পেয়েছি।
রন তার জ্যাকেটের ভেতর হাত দিয়ে একটা মোটা ধূসর রঙের ইঁদুর বের করল। ইঁদুরটা তখন ঘুমোচ্ছিল। এর নাম স্ক্যাবাস। এটা কোন কাজের নয়। কখনও ঘুম থেকে ওঠে না। পার্সি প্রিফেক্ট হওয়ার পর আমার বাবার কাছ থেকে এক পেঁচা পেয়েছিল। আর আমি পেলাম এই স্কাবার্সকে। রনের কান গোলাপী বর্ণ ধারণ করল। তার মনে হল সে অনেক বেশি কথা বলছে। তাই সে আবার জানালার বাইরে তাকাল। কারো কাছে যদি একটি পেঁচা না থাকে তাহলে তাকে দুঃখিত হতে হবে এমন কোন কথা নেই–হ্যারির কাছে তাই মনে হলো। একমাস আগেও হ্যারির কাছে কোন টাকা পয়সা ছিল না। হ্যারি রনকে জানাল যে তাকে সব সময় ডাডলির পুরনো কাপড় পরতে হয়েছে এবং জন্মদিনে সে কখনো কোন উপহার পায়নি।
হ্যারির কথা শুনে রন খুশি হয়ে উঠল।
হ্যারি রনকে আরও বলল–হ্যাগ্রিডের সাথে সাক্ষাতের আগে বুঝতে পারিনি যে আমাকে জাদুকর হতে হবে। তার সাথে সাক্ষাতের আগে আমি আমার বাবা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।
রন একটি দীর্ঘশ্বাস নিল।
কি ব্যাপার? হ্যারি প্রশ্ন করল।
তুমি ইউ-নো-হু-এর নাম বললে। আমিও ভেবেছিলাম তোমরা সবাই… রন বলল। তাকে একই সাথে অভিভূত আবার দুঃখিতও মনে হচ্ছিল।
আমি তার নাম উল্লেখ করে বাহাদুরি দেখাতে চাইনি।
হ্যারি বলল আমি মনে করি আমি যে শব্দগুলো উচ্চারণ করেছি সেগুলো তোমার না জানাই ভালো। আমাকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে। আমার মনে হয় আমি ক্লাশের সবচেয়ে খারাপ ছাত্র হবো?
না, তুমি তা হবে না। রন বলল-এখানে অনেকেই মাগল পরিবার থেকে আসে। তারা অল্প সময়েই সব শিখে ফেলে।
তারা যখন কথা বলছিল ঠিক তখনই ট্রেনটি লন্ডন শহরের বাইরে চলে গেল। তারা জানালা দিয়ে মাঠে গরু–ছাগল–ভেড়া দেখতে লাগল।
ঠিক সাড়ে বারোটার সময় তারা ট্রেনের করিডোর থেকে কথাবার্তা ও হাসির শব্দ শুনতে পেল। তাদের কামরার দরোজা খুলে এক ভদ্রমহিলা এসে হাসি মুখে তার টেনে আনা খাবারের ট্রলির দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–তোমাদের কারো কোন খাবার লাগবে?
হ্যারি সকালে নাশতা করতে পারেনি। তাই সে উঠে দাঁড়ালো। রন বলল তাকে বাইরে যেতে হবে না। তার কাছেই স্যান্ডউইচ আছে।
হ্যারি যখন ডার্সলি পরিবারের সাথে থাকত তখন তার কাছে কোন টাকা–পয়সা থাকত না। অবশ্য এখন তার পকেট গরম। তার পকেট ভর্তি সোনা ও রূপার মুদ্রা। মহিলাটির ট্রলিতে সব আজব ধরনের খাবার, যা সে জীবনে দেখেনি। সে কোনটাই হারাতে চাইলো না, সবকিছুই অল্প অল্প করে কিনলো এবং মহিলাকে এগারটি সিলভার সিকেল ও সাতটি ব্রোঞ্জ নাটস দিল।
হ্যারি অনেক খাবার দাবার এনে খালি আসনে রাখল।
রন জিজ্ঞেস করল–তোমার কি খুব খিদে পেয়েছে? কুমড়োর একটি প্যাস্ট্রি মুখে দিতে দিতে হ্যারি বলল–হ্যাঁ আমার খিদে পেয়েছে।
রন প্যাকেট খুলে চারটি স্যান্ডউইচ বের করল। হ্যারিকে বলল, তুমি এখান থেকে কিছু নেবে? অবশ্য স্যান্ডউইচগুলো শুকনো। বুঝতেই পারছো। আমরা পাঁচ ভাই, মা খুব একটা সময় পায় না।
হ্যারি তার প্যাস্ট্রি রনের সামনে রেখে বলল নাও, এখান থেকে নাও। এ পর্যন্ত ভাগাভাগি করে খাবার সুযোগ হ্যারির হয়নি। রনের সাথে ভাগাভাগি করে খাওয়াতে হ্যারির মনে এক আনন্দময় অনুভূতির সৃষ্টি হলো। রনের সাথে হ্যারি প্যাস্ট্রি ও কেক খেল। স্যান্ডউইচের কথা তারা একেবারেই ভুলে গেল।
চকোলেট ফ্রগের একটি প্যাকেট বের করে হ্যারি রনকে জিজ্ঞেস করল-এটা কী?
হ্যারি বলে চলল-এগুলি নিশ্চয়ই ব্যাঙ নয়।
হ্যারি যেকোন বিস্ময়ের জন্য প্রস্তুত ছিল।
না ব্যাঙ নয়। রন জবাব দিল। দেখো সাথে একটি কার্ড আছে।
কি? হ্যারি প্রশ্ন করল।
তুমি জানো না। রন বল–চকোলেট ফ্রগের ভেতর কার্ড থাকে। এসব কার্ডে বিখ্যাত জাদুকর ও জাদুকরণীদের ছবি থাকে। আমি এ পর্যন্ত পাঁচশ কার্ড সংগ্রহ করেছি, কিন্তু কোনো কার্ডেই এগ্রিপা বা টলেমির ছবি পাইনি।
হ্যারি তার চকোলেট ফ্রগের প্যাকেটটি খুলল। কার্ডে একজন মানুষের ছবি। তার চোখে অর্ধচন্দ্রাকার চশমা। লম্বা বাঁকা নাক। রূপালী চুল, দাঁড়ি ও গোঁফ। ছবির নিচে লেখা
আলবাস ডাম্বলডোর
রন বলল, আমি একটা ফ্রগ চকোলেট নেই, দেখি এগ্রিপা বা টলেমির ছবি পাই কিনা।
হ্যারি পড়তে লাগলো…
আলবাস ডাম্বলডোর হোগার্টস-এর বৰ্তমান অধ্যক্ষ, যাকে বিবেচনা করা হয় এ যুগের শ্রেষ্ঠতম জাদুকর হিসেবে। ১৯৪৫ সালে কালো যাদুকর গ্রিনডে ওয়াল্ডকে পরাজিত করেই ডাম্বলডোর বিখ্যাত হন; ড্রাগন রক্তের ১২টি ব্যবহার উদ্ভব ও সহকর্মী নিকোলাস ফ্লামেলের সাথে আলকেমির উপর কাজ করাও তার অন্যতম কীর্তি। প্রফেসর ডাম্বলডোর উপভোগ করেন চেম্বার মিউজিক ও টেনপিন বোলিং।
হ্যারি এবার কার্ডটি উল্টাল। এবার তাকিয়ে দেখে কার্ডে ডাম্বলডোরের কোন ছবিই নেই।
কই, তিনি তো নেই। হ্যারি অবাক বিস্ময়ে মন্তব্য করল।
তুমি তো আশা করতে পার না তিনি সারাক্ষণ কার্ডের সাথে লেগে থাকবেন। রন বলল–তিনি আবার আসবেন। আমি আবার মর্গানাকে পেয়েছি।… তার ছটা ছবি পেয়েছি।
তুমি কি কার্ড জমাতে চাও?
রনের দৃষ্টি চকোলেট ফ্রগের প্যাকেটগুলোর দিকে।
না–ও না–ও হ্যারি বলল, তুমি তো জান, মাগল জগতে ছবির ভেতর মানুষ স্থায়ীভাবে থাকে।
সত্যিই কি তারা তাই করে? তারা কি একটুও নড়াচড়া করে না। রন আশ্চর্য হয়ে মন্তব্য করল–সত্যিই কী অদ্ভুত!
হ্যারি দেখল যে ডাম্বলডোরের ছবি পুনরায় কার্ডে চলে এসেছে এবং তিনি হ্যারির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বিখ্যাত জাদুকরদের ছবির চেয়ে রন-এর মনোযোগ ছিল খাবারের দিকে। একটু পর হ্যারি কার্ডে শুধু ডাম্বলডোরই নয়–আরো বিখ্যাত জাদুকরদের ছবি দেখল। এরপর হ্যারি বেরটি বোটস-এর বিচিত্র গন্ধের মটরশুটির প্যাকেট খুললো। এ সব বিষয়ে তোমাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। রন হ্যারিকে সাবধান করে বলল। যখন তারা বলে সকল প্রকার গন্ধ, তার মানে সকল প্রকার গন্ধ–তুমি জান, চকোলেট, পিপারমেন্ট এবং মার্মালেড-এর মত সাধারণ জিনিসে যা পাও, আবার তুমি পালং শাক, কলিজা বা ষাড়ের ভুঁড়ির গন্ধ।
রন একটি সবুজ মটরদানা হাতে নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল এবং মটরদানায় কামড় বসাল।
তারা বেশ মজা করে খাচ্ছিল। হ্যারি টোস্ট, নারকেল, সেকা মটরশুটি, স্ট্রবেরি, তরকারি, ঘাস, কফি ও সার্দিন খেল। এবং সাহস করে একটি ধূসর রঙের খাবারে এক কামড় দিল যা রন কখনো করবে না, ওটা আসলে ছিল মরিচ।
এবার তারা জানালা দিয়ে দেখল, খেত–খামার নয়, ট্রেনটি বন, আঁকাবাঁকা নদী ও ঘন সবুজ পাহাড় অতিক্রম করছে। তাদের কম্পার্টমেন্টের দরজায় টোকা দেয়ার শব্দ পেল এবং দরজা টেনে গোলমুখ ছেলেটি ভেতরে ঢুকলো, ওকে হ্যারি পৌনে দশ প্লাটফর্মে দেখেছিল। কাঁদো কাঁদো মুখ তার। বলল, তোমরা কি একটি ব্যাঙ দেখেছো? তারা যখন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না। সে কেঁদে ফেলো, আমি ওটা হারিয়ে ফেলেছি। হ্যারি তাকে সান্ত্বনা দিল–পেয়ে যাবে। ঘাবড়িওনা।
যাহোক, যদি দেখতে পাও, আমাকে জানিও বলে ছেলেটি চলে গেল। একটু পর আবার সে ফিরে এল। এবার সাথে একটি মেয়ে। তার গায়ে হোগার্টসের ইউনিফর্ম। তোমরা কি কেউ একটা ব্যাঙ দেখেছো, নেভিল হারিয়েছে। মেয়েটি বলল।
আমরা আগেই ওকে জানিয়েছি–আমরা দেখিনি। রন বলল। রনের হাতে জাদুদণ্ড।
একি, তুমি কি ম্যাজিক দেখাবে? রনের হাতে জাদুকাঠি দেখে মেয়েটি বলল।
দেখি কি ম্যাজিক করছো, বলে মেয়েটি বসে পড়লো।
রন একটু ভয়ই পেয়ে গেল, তারপর বলল, ঠিক আছে। কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করলো সানসাইন, ডেইসিস, বাটার মেলো টান দিস স্টুপিড, ফ্যাট র্যাট ইয়েলো। বলে সে জাদুকাঠিটি ঘুরালো। কিন্তু কিছুই হলো না। ইঁদুরটা ধুসরই থেকে গেল এবং ওটা তখনও ঘুমাচ্ছিল।
আমি রন ওয়েসলি। রন মৃদুস্বরে বলল।
আমি হ্যারি পটার। হ্যারি বলল।
তুমি কি সত্যিই হ্যারি পটার? অবাক হয়ে হারমিওন প্রশ্ন করল। তারপর হারমিওন বলে চলল–আমি তোমার সবকিছুই জানি। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও আমি কিছু বই পাই। মডার্ন ম্যাজিকাল হিস্ট্রি, দি রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দি ডার্ক আর্টস এবং গ্রেট উইজার্ডিং ইভেন্টস অফ দি টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি বইগুলোতে তোমার নাম উল্লেখ আছে।
সত্যিই? বিস্ময়ের সাথে হ্যারি প্রশ্ন করে।
আশ্চর্য, তুমি কিছুই জান না। হারমিওন বলল–আমি যদি তোমার জায়গায় হতাম তাহলে আমি সবকিছু খুঁজে বের করে ফেলতাম। আচ্ছা, তোমরা কি কেউ জানো তোমরা কোন হাউজে থাকবে? আমি গ্রিফিল্ডর হাউজে থাকতে চাই। আমার মনে হচ্ছে ওটা ভাল হবে। আজ আমি যাচ্ছি। নেভিলের ব্যাঙ খুঁজতে হবে। আর তোমরা জামা–কাপড় পালটে নাও আমরা শিগগিরই পৌঁছে যাব।
যে ছেলেটি ব্যাঙের খোঁজে এসেছিল তাকে নিয়ে হারমিওন বিদায় নিল।
আমি যে হাউজে থাকি না কেন আমি চাই যেন এই মেয়েটি সেখানে না থাকে। একথা বলে রন তার জাদুদণ্ড ট্রাংকে ভরল।
তোমার অন্য ভাইরা কোন হাউজে আছে? হ্যারি জানতে চাইল। গ্রিফিল্ডর হাউজ। রন জবাব দিল। রনের চেহারা একটু বিবর্ণ হলো। তবুও সে বলে চলল–বাবা ও মা এই হাউজে ছিলেন। আমি যদি এই হাউজে থাকতে না পারি তাহলে বাবা–মা কী ভাববেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। হাউজ হিসেবে ব্যাভেনক্লও খারাপ নয়। কিন্তু ভেবে দেখ, তারা যদি আমাকে স্লিদারিন হাউজে রেখে দেয়।
এই হাউজেই… ইউ নো হু ছিল।
হ্যারি ভাবছিল স্কুল ত্যাগ করার পর জাদুকররা কী করে।
রন জানাল–ড্রাগনশাস্ত্রে অধ্যয়নের জন্য চার্লি রোমানিয়া গিয়েছে এবং গ্রিংগটসের প্রস্তুতি নেবার জন্য বিল আফ্রিকায় গেছে। তুমি কি গ্রিংগটসের নাম শুনেছ? ডেইলি প্রফেটে এর ওপর অনেক লেখালেখি হয়েছে। মাগলদের কাছে সে পত্রিকাটা পাবে না। কেউ একবার ভল্ট ভেঙ্গে ডাকাতির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি।
হ্যারি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সত্যিই? এরপর কি ঘটেছিল?
কিছুই নয়, এই জন্যই তো বড় খবর হয়েছিল সেই ঘটনা। রন বলল–আমার বাবার ধারণা ওটা ছিল কোন কালো জাদুকরের কাজ। কিন্তু ওরা মনে করে না যে, কেউ সেখান থেকে কিছু নিয়ে যেতে পেরেছে। এগুলো খুবই খারাপ জিনিস। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সকলেই শঙ্কিত হয় এবং এর সাথে যদি ইউ নো হু-এর হাত পেছনে থাকে, তা হলে তো কথাই নেই। যদিও সে জেনেছে এসব জাদু জীবনের বিষয়। কিন্তু ভোলডেমর্ট নামটি তেমন তাকে অস্বস্তিতে ফেলে না বা তাকে ভয় পাইয়ে দেয় না।
কিডিচ খেলা সম্পর্কে তোমার কি কোন ধারণা আছে? রন হ্যারিকে প্রশ্ন করে।
এ ব্যাপারে আমার কোন ধারণাই নেই। হ্যারি জবাব দিল।
তুমি কি বললে নাম শোননি? বিস্ময়ের সাথে রন প্রশ্ন করে-এটা তো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলা।
তারপর রন কিডিচ খেলার বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কে হ্যারিকে বলল। তারা যখন গল্প করছিল তখন তাদের কামরার দরোজা খুলে গেল। এবার কামরায় ব্যাঙ হারানো ছেলে নেভিল নয়, হারমিওন গ্রেঞ্জার। তিনটি বালক তাদের কামরায় প্রবেশ করল। হ্যারি মাঝখানে বিষণ্ন মুখের বালকটিকে মুহূর্তেই চিনতে পারল। তাকে মাদাম মালকিনের পোশাকের দোকানে দেখেছিল। ডায়াগন এলির চেয়ে এখন বেশি আগ্রহ নিয়ে সে হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইল।
এটা কি সত্য? ছেলেটি বলল–সবাই বলাবলি করছিল এই কামরায় হ্যারি পটার আছে। তাহলে তুমিই সেই হ্যারি পটার?
হ্যাঁ হ্যারি জবাব দিল। হ্যারি অন্য দুই ছেলের দিকে তাকাল। তারা দুজনেই খুব মোটা ও তাদের দুজনকেই সংকীর্ণ মনা মনে হলো। তারা দুজনেই বিষণ্ন মুখের বালকটির দুপাশে এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল, যেন তারা ওর বডিগার্ড।
এরা দুজন হলো ক্ৰেব ও গয়েল। বিষণ্ণ মুখের ছেলেটি বলল আমার নাম ম্যালফয়–ড্রেকো ম্যালফয়।
রন কাশি দিল। ড্রেকো ম্যালফয় তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমার নামটি কি কৌতুককর মনে হয়। তুমি কে সেটা জিজ্ঞাসা করার কোন প্রয়োজন নেই। আমার বাবা আমাকে বলেছেন ওয়েসলি পরিবারের সদস্যদের মাথার চুল লাল এবং তাদের পরিবারে অনেক বেশি ছেলেমেয়ে।
সে হ্যারির দিকে দৃষ্টি ফেরাল।
পটার, তুমি অল্পদিনেই বুঝতে পারবে যে কিছু জাদুকর পরিবার অন্য পরিবার থেকে ভালো। তুমি খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। আমি তোমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি।
হ্যারির সাথে করমর্দনের জন্য সে তার হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু হ্যারি সাড়া দিল না।
ধন্যবাদ, কে ভালো কে মন্দ সেটা আমিই বলতে পারব। শীতলভাবে সে কথাগুলি বলল।
ড্রেকো ম্যালফয়ের চেহারা লাল না হলেও তার চেহারায় একটা গোলাপী আভা দেখা গেল।
আমি যদি তুমি হতাম তাহলে আমি আরো সতর্ক থাকতাম। সে আস্তে আস্তে বলল–তুমি যদি আর একটু নম্র না হও তাহলে তোমাকেও তোমার বাবা–মার পথে যেতে হবে। তারা বুঝতে পারেনি কোন জিনিসটি তাদের জন্য কল্যাণকর ছিল। তুমি যদি ওয়েসলির মত মাস্তান আর হ্যাগ্রিডের সাথে মেলামেশা কর, তাহলে তোমার ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো যাবে না।
হ্যারি এবং রন দুজনেই দাঁড়াল। ওয়েসলির চেহারা তার চুলের মত লাল হয়ে উঠল।
রন বলল–কথাটা আবার বলতো।
তোমরা কি আমাদের সাথে মারামারি করতে চাও? ম্যালফয় ধমকের সুরে বলল।
যদি তোমরা এক্ষুণি এখান থেকে বিদেয় না হও। হ্যারি খুব কড়াভাবে বলল। একটু বেশি কড়াভাবেই। কারণ ওর সাথে অপর দুজন ক্রেবে আর গয়েল ওদের উডয়ের চেয়ে গায়ে–গতরে বড়সড় ছিল।
আমাদের এখান থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমাদের খাবার সব শেষ হয়ে গেছে এবং মনে হচ্ছে তোমাদের কাছে এখনও কিছু খাবার আছে।
রনের কাছে রাখা চকোলেট ফ্রগের দিকে গয়েল এগুল। রন লাফ দিয়ে আগে বাড়ল। গয়েলকে স্পর্শ করার আগেই বিকট শব্দ করে গয়েল আর্তনাদ করে উঠল।
স্ক্যাবার্স, রনের ইঁদুরটি তার আঙুলের ডগায় ঝুলছিল। ইঁদুরটি তার ছোট ধারাল দাঁত গয়েলের আঙুলে বসিয়ে দিয়েছে। ক্রেবে আর ম্যালফয় পেছনে সরে দাঁড়াল। স্কাবার্সের কামড়ে গয়েল হাউ–মাউ করছিল। গয়েল ইঁদুরটাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্য হাত মুরাতে লাগলো। এক সময় ইঁদুরটা ছুটে গিয়ে জানালায় আঘাত করলো। এরপর তারা তিনজনই ছুটে পালালো। হতে পারে তারা ভেবেছিল ঘরে বোধহয় আরো অনেক ইঁদুর আছে। পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে ঘটনার এক সেকেন্ড পরই হারমিওন গ্রেঞ্জার কামরায় প্রবেশ করল।
এখানে এতক্ষণ কী ঘটলো? মেঝেতে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিষ্টি দেখে হারমিওন প্রশ্ন করল। রন লেজ ধরে টেনে স্ক্যাবার্সকে হাতে তুলে নিল।
আমার মনে হচ্ছে সে আঘাত পেয়েছে। রন হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল। সে স্ক্যাবার্সের দিকে তাকাল। তারপর বলল–না, না–আমার বিশ্বাস হয় না… সে বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে।
আসলে সে ঘুমিয়েই পড়েছিল।
তোমার সাথে ম্যালফয়ের এর আগে কখনও দেখা হয়েছে?
হ্যারি তাকে বলল, ডায়গন এ্যালিতে তাদের দেখা হওয়ার বিষয়।
আমি এই পরিবারের কথা শুনেছি। রন খুব গুরুগম্ভীর ভাবে বলল। ইউ-নো-হু অদৃশ্য হয়ে যাবার পর যারা আমাদের সাথে প্রথমে এসেছিলেন ওর মধ্যে ওরাও ছিল। ওরা বলেছিল ওদের ওপর জাদু করা হয়েছিল। আমার বাবা অবশ্য এ গল্প বিশ্বাস করেন না। কালো জাদুর দিকে যেতে ম্যালফয়ের বাবার অজুহাত বের করতে কোন রকম অসুবিধে হয় না।
রন হারমিওনের দিকে তাকিয়ে বলল–আমরা কি কোনভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।
তোমাদের উচিত তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নেয়া। আমি ট্রেনের চালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন–আমরা গন্তব্যে এসে গেছি প্রায়। তোমরা তো মারামারি করছিলে এখানে, করছিলে কিনা? আমাদের সবার নামার আগে তোমরা যদি সেখানে নাম, তোমাদের বিপদ হতে পারে।
রন জবাব দিল–স্ক্যাবার্স মারামারি করেছে। আমরা করিনি। আমরা এখন পোশাক পরিবর্তন করব। তুমি কি একটু বাইরে যাবে?
হারমিওন বলল–ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি। আমি এখানে এসেছি, কারণ ছোট ছেলেমেয়েদের মত এখানকার লোকজন করিডোরে দৌড়াদৌড়ি করছে। আর তুমি কি জানো তোমার নাকে ময়লা লেগেছে।
রন হারমিওনের যাবার দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যারি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে অন্ধকার হয়ে আসছে। মেঘলা আকাশের নিচে পাহাড় ও বন দেখা যাচ্ছে। মনে হলো ট্রেনের গতি কমে আসছে।
হ্যারি ও রন তাদের জ্যাকেট খুলে হোগার্টসের জন্য কালো পোশাক পরে নিল।
ট্রেন থেকে একটি ঘোষণা এলো–আমরা পাঁচ মিনিটের ভেতর হোগার্টস পৌঁছব। তোমাদের মালামাল ট্রেনেই রেখে দিও! মালামালগুলি পৃথকভাবে হোগার্টস স্কুলে পাঠানো হবে।
ট্রেনের গতি কমল। এক সময় ট্রেন থামল। নামার জন্য সবাই দরোজায় ভিড় করছে। প্ল্যাটফর্মে বেশ ঠাণ্ডা। হ্যারি হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেল প্রথম বর্ষের ছাত্র যারা তারা ডানদিকে এসো। হ্যারিও এদিকে এসো। এটা ছিল হ্যাগ্রিডের কণ্ঠস্বর।
হ্যাগ্রিড বললেন–যারা প্রথম বর্ষের ছাত্র তারা আমাকে অনুসরণ কর প্রথম বর্ষের আরও কেউ আছে? সাবধানে পা ফেলো। আমাকে অনুসরণ করো।
পা পিছলিয়ে ও হোঁচট খেতে খেতে তারা হ্যাগ্রিডকে অনুসরণ করে খাড়া ও সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে আগে বাড়ল। দুপাশেই এত অন্ধকার ছিল যে হ্যারি ভাবল এখানে সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। যাবার পথে কেউ তেমন কোন কথা বলল না। হ্যাগ্রিড বললেন–তোমরা সবাই প্রথম বারের মতো হোগার্টস জাদুবিদ্যায় স্কুলে এসেছে।
হঠাৎ জোরে উ–উ–উ–ধ্বনি শোনা গেল।
সংকীর্ণ পথটি যেখানে গিয়ে থামল সেখানে সামনে একটি বড় লেক।
লেকের দুপাশে পাহাড়। আকাশে তারা। কাছাকাছি কয়েকটি দুর্গ আছে বলে মনে হলো।
হ্যাগ্রিড এক সারি নৌকা দেখিয়ে বললেন একটা নৌকায় চারজনের বেশি উঠবে না।
সবাই ঠিকমতো উঠল কিনা হ্যাগ্রিড তা ভাল করে দেখে নিলেন।
অনেকগুলো ছোট ছোট নৌকা এগিয়ে যেতে থাকল। লেকের পানি স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ। সবাই চুপ করে আছে। নৌকাগুলো দুর্গের কাছাকাছি এল।
হ্যাগ্রিড চিৎকার করে বলল–তোমরা সবাই মাথা নিচু কর।
তারপর একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গ। মনে হলো দুর্গের নিচ দিয়ে নৌকা চলছে।
শেষ পর্যন্ত মাটির নিচে বন্দরের মত একটা স্থানে পৌঁছালো। সম্পূর্ণ জায়গাটাতে নুড়ি–পাথর ছড়ানো।
সবাই নৌকা থেকে নামছে কিনা হ্যাগ্রিড দাঁড়িয়ে দেখছিলো। নেভিলকে দেখে হ্যাগ্রিড জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি তোমার ব্যাঙ? নেভিল ব্যাঙটা দেখে আনন্দে বলে উঠলো, ট্রেভর! ট্রেভর তার ব্যাঙটির নাম।
পাথরের সিঁড়ি বেয়ে তারা ওপরে উঠতে থাকলো। পাথুরে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে ওক গাছের দরোজা। হ্যাগ্রিড বললেন, সবাই ঠিকমত এসেছে, আর তুমি তোমার ব্যাঙ পেয়েছ। তিনি তার বিশাল মুষ্টি দিয়ে দরজায় তিনবার আঘাত করলেন।
???? সেই হ্যাট
মুহূর্তেই দরোজা খুলে গেল। লম্বা, কালো চুলের এক মহিলা পান্নার মত সবুজ রঙের পোশাক পরে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চাহনি খুব কড়া। হ্যারি ভাবল, এ মহিলাকে পেরিয়ে সামনে যাওয়া ঠিক হবে না।
হ্যাগ্রিড বললেন, অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল, এরা প্রথম বর্ষের ছাত্র।
ধন্যবাদ হ্যাগ্রিড। আমি ওদেরকে এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি।
ম্যাকগোনাগল সবাইকে হল ঘরে নিয়ে গেলেন। হল ঘরটি বিশাল। পাথরের দেয়ালে মশালের আলো। ছাঁদ অনেক উঁচুতে।
তারা সবাই অধ্যাপক ম্যাকগোনাগলকে অনুসরণ করলো। পাথরের মেঝেতে নানা রকম চিত্র আঁকা। হ্যারি ডানদিকের দরোজার ওপাশ থেকে শত শত লোকের কণ্ঠ শুনতে পেল–স্কুলের বাকি অংশটুকু নিশ্চয়ই এখানে কিন্তু অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল তাদেরকে হল ঘরের মধ্যে একটা খালি ছোট কামরায় নিয়ে গেলেন। তারা সবাই পরস্পরের গা ঘেঁষে কোনমতে সেখানে দাঁড়ালো, সাধারণত এতক্ষণ তাদের দাঁড়ানোর কথা নয়। তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এদিক–ওদিক তাকাচ্ছে।
ম্যাকগোনাগল বললেন–তোমাদের সবাইকে হোগার্টসে স্বাগত জানাচ্ছি। টার্ম শুরুর ভোজসভা শিগগিরই শুরু হবে। গ্রেট হলে আসন গ্রহণ করার আগেই তোমাদের কে কোন হাউজে যাবে তা বণ্টন করা হবে। এই কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ হাউজটাই হবে তোমাদের পরিবার। তোমরা হাউজের ডর্মিটরিতে থাকবে। অবসর সময় কমনরুমে কাটাবে।
এখানে চারটা হাউজ আছে–গ্রিফিল্ডর, হাফলপাফ, র্যাভেন ক্ল ও স্লিদারিন। প্রত্যেকটা হাউজের ম্যাজিকের ইতিহাস আছে। হাউজে থাকার ব্যাপারে কিছু নিয়ম–কানুন আছে। অনিয়ম করলে পয়েন্ট কাটা যাবে। বছরের শেষে হাউজ-কাপ দেয়া হয়। যে হাউজ সবচে বেশি পয়েন্ট পাবে সে হাউজই কাপ পাবে। হাউজ কাপ পাওয়া একটা সম্মানের ব্যাপার।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্কুলের সামনে বাছাই অনুষ্ঠান হবে, তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল নেভিলের জামা ও রনের নাকের দিকে লক্ষ্য করলেন। হ্যারিকে খুব নার্ভাস দেখাছিল। সে যথাসম্ভব তার চুল ঠিক করে নিলো।
তোমরা শান্তভাবে অপেক্ষা কর। আমি সময়মতো ফিরে আসবো। এই বলে অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল বিদায় নিলেন।
তারা কিসের ভিত্তিতে আমাদের হাউজ ভাগ করে দেবেন? রন জানতে চাইল।
আমার মনে হয় তারা কোন একটা পরীক্ষা নেবেন। ফ্রেড বলছিল এই পরীক্ষা বেশ কষ্টকর। ফ্রেড বোধহয় ঠাট্টা করেছে। হ্যারির বুক কাঁপছে। আবার পরীক্ষা দিতে হবে। কিসের পরীক্ষা!
হ্যারির বুক ভীষণভাবে কেঁপে উঠলো। পরীক্ষা? স্কুলের সবার সামনে। সে তো এখন পর্যন্ত কোন জাদু জানে না। তাকে কি করতে হবে? এই সময় যে এই ধরনের কিছু হবে, আসার আগে সে ভাবেনি।
কেউ বিশেষ কোন কথা বলছে না। শুধু হারমিওন ফিস ফিস করে নিজের জাদুর ক্ষমতার কথা বলল।
হ্যারি চারিদিকে দেখল যে প্রত্যেকের চেহারায় একটা আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠেছে।
তারপর হঠাৎ কিছু একটা ঘটলো, হ্যারি লাফ দিয়ে এক ফুট ওপরে উঠলো–তার পেছনের কয়েকজন চিৎকার করে উঠলো। প্রায় বিশটা ভূত পেছনের দেয়াল থেকে স্রোতের মত আসছে। দেখতে মুক্তোর মত সাদা ও কিছুটা স্বচ্ছ। তারা একে অপরের সাথে কথা বলতে বলতে ভেসে বেড়ালো। প্রথম বর্ষের ছাত্রদের দিকে তারা খুব একটা তাকালো না। একজন মোটা সন্ন্যাসীর মতো ভূত বলছে–ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ। আমার মনে হয় ওকে আরেকটা সুযোগ দেয়া উচিত। আরেকজন বলছে—না না। তাকে অনেক সুযোগ দেয়া হয়েছে। আর দেয়া যায় না।
একটা ভূত হঠাৎ করে ছাত্রদের দেখে বলল, এখানে তোমরা কী করছ?
কেউ জবাব দিল না।
মোটা সন্ন্যাসী বলল-এরা নতুন ছাত্র। একটু পরে এদের বাছাই পর্ব শুরু হবে।
কয়েকজন নীরবে সম্মতি জানাল। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল ফিরে এসে বললেন-এখন অন্যসব কাজ বন্ধ। এখন বাছাই পর্ব শুরু হবে।
এরপর ভূতগুলো পেছনের দেয়াল দিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
যাবার আগে একটা ভূত বলল–আশা করি, তোমাদের সাথে হাফলপাফে দেখা হবে। আমি ওই হাউজের সদস্য ছিলাম।
সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াও এবং আমাকে অনুসরণ কর। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নির্দেশ দিলেন।
পায়ে ব্যথার কারণে হ্যারি খুব দ্রুত হাঁটতে পারছিল না। তার সামনে ছিল বালু রঙের চুলের একটি ছেলে, আর তার পেছনে ছিল রন। তারা কামরা থেকে বের হয়ে হল ঘর পার হয়ে গ্রেট হলে প্রবেশ করল।
জায়গাটা খুবই মনোরম। হ্যারি এ ধরনের অপূর্ব সুন্দর জায়গা কল্পনা করতেও পারে না। চারটা লম্বা টেবিলের ওপর হাজার হাজার মোমবাতি মৃদু বাতাসে জ্বলছে। মঞ্চে একটা লম্বা টেবিল। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগলসহ শিক্ষকগণ এই টেবিলটাতে বসলেন। তাদের দিকে যে শত শত মুখ তাকিয়ে ছিল, তাদের দেখে মনে হচ্ছিল উজ্জ্বল মোমবাতির সামনে ক্ষণপ্রভা লণ্ঠন। ছাত্রদের মাঝে দুএক ভূতকেও দেখা যাচ্ছিল। সামনের চেহারাগুলো দেখার জন্য হ্যারি ওপরে তাকাল। ওপরে সে কালো ভেলভেটের সিলিং ও তারা দেখতে পেল। হারমিওন হ্যারির কানে কানে বলল, হোগার্টস, এ হিস্টরি–বইতে আমি পড়েছি, বাইরের আকাশের মতই এটা আকর্ষণীয়। এখানে কোন ছাদ আছে এবং এই গ্রেট হলটা স্বর্গের কোন স্থান নয়। এটা একেবারেই মনে হয় না।
হ্যারি নিচে তাকিয়ে দেখলো অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল একটা চার–পায়া টুল তাদের সামনে রাখলেন। টুলের ওপর ছিল জাদুকরের একটা চোখা হ্যাট। হ্যাটটা খুবই পুরনো ও জরাজীর্ণ। আন্ট পেতুনিয়া হলে এটাকে কোনদিন বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না। একটু পরে এই হ্যাটটা গান গাইতে শুরু করল। ছাত্রদের মাঝখানে এখানে সেখানে ভূত ঘোরাফেরা করছিল।
হে তুমি হয়তো ভাবনি আমিও সুন্দর
শুধু চোখের দেখা দিয়ে করো না বিচার
যদি আমার চেয়ে চৌকস কোনো হ্যাট
দেখাতে পারো তুমি; আমি নিজেই,
নিজেকে গিলে খাবো।
তুমি তোমার টুপিকে কালো রাখতে পারো
তোমার উঁচু হ্যাট মসৃণ ও লম্বা
কিন্তু আমার জন্যে আছে হোগার্টসের সর্টিং হ্যাট
এবং আমি সবাইকে তা পরাতে পারি
তোমার মাথায় কিছুই নেই গোপন
সর্টিং হ্যাট দেখতে পায় না কিছু
অতএব আমাকে পরীক্ষা করো, বলে দেবো
কোথায় তুমি যেতে চাও?
হতে পারো তুমি গ্রিফিল্ডরের বাসিন্দা
যেখানে হৃদয়ে বাস করে সাহস
তাদের সাহস, স্নায়ু ও মর্যাদা
গ্রিফিল্ডরদের করে তোলে মহীয়ান
হতে পারো তুমি হাফলপাফের বাসিন্দা
যেখানে তারা ন্যায়বান ও অনুগত
আর ধৈর্যশীল হাফলপাফেরা হচ্ছে সৎ
এবং পরিশ্রমে অকাতর।
অথবা বিজ্ঞ পুরনো র্যাভেন ক্লর বাসিন্দা
যদি থেকে থাকে তোমার তৈরি মন
যেখানে ধীমান ও শিক্ষিতেরা সহযাত্রী খুঁজে পাবে
কিংবা হতে পারো বাসিন্দা স্লিদারিনের
যেখানে খুঁজে পাবে তুমি প্রকৃত বন্ধুকে
ধূর্ত লোকেরা উদ্দেশ্য হাসিল করতে
বেছে নেয় যেকোন উপায়।
অতএব আমাকে ভয় পেও না, করো না হৈচৈ
(আমার কেউ না থাকলেও) তুমি রয়েছ
ঠিক নিরাপদ হাতে, যে কারণে আমি থিংকিং ক্যাপ।
হ্যাটের গান শুনে হলভর্তি সবাই আনন্দে করতালি ও শীস দিয়ে উঠল। হ্যাট সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে চুপ হয়ে গেল।
এই হ্যাট নিয়ে কি আমাদেরকেও পরীক্ষা দিতে হবে। রন হ্যারিকে জিজ্ঞেস করল।
হ্যারি খুব নিস্পৃহভাবে মুচকি হেসে বলল–জাদু শেখার চেয়ে হ্যাট নিয়ে নাড়াচাড়া করাও অনেক ভালো।
হ্যাটটাকে দেখে হ্যারি বুঝতে পারল যে সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই হ্যারি হ্যাটটার কাছে যেতে সাহস পেল না।
এবার অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল পার্চমেন্টের একটা ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এলেন।
ম্যাকগোনাগল বললেন–আমি যখন তোমাদের রোল কল করব তখন তোমরা এই হ্যাটটা পরে টুলের ওপর বসবে।
গোলাপী বর্ণের ও বাদামী চুলের একটা মেয়ে হ্যাট পরল। পরার সাথে সাথেই হ্যাটটা চিৎকার করে উঠল–হাফল পাফ।
ডানদিকের টেবিলের সবাই হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল। হান্না হালপাফের টেবিলে গিয়ে বসল। হ্যারি দেখল আগে দেখা সেই ভূতটাও আনন্দ প্রকাশ করছে।
এরপর ডাকা হল–বোনস, সুজান।
হালপাফ আবার হ্যাটটা চিৎকার করল। সুজান হাননার পাশে বসল।
বুট, টেরি।
এবার হ্যাটটা চিৎকার করল–র্যাভেন ক্ল।
বাঁ দিকের দ্বিতীয় টেবিলের সবাই করতালি দিল। টেরি র্যাভেন ক্লর জন্য নির্দিষ্ট টেবিলে বসল।
ম্যান্ডি ও ব্রকলহার্স্ট র্যাভেন ক্ল হাউজে গেল। তবে ল্যাভেন্ডার ব্রাউন গেল গ্রিফিল্ডর হাউজে। বাঁ দিকে দূরের টেবিলটা যেন আনন্দে বিস্ফোরিত হল। হ্যারি দেখতে পাচ্ছিল রনের যমজ দু ভাই বিদ্রূপ করে শব্দ করছে।
মিলিসেন্ট বালসট্রোড স্লিদারিন হাউজের সদস্য হয়ে গেল। হ্যারি ভাবছিল তার ভাগ্যে স্লিদারিন হাউজ পড়বে। হ্যারির মনে হলো ওদের বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। তার কল্পনাও হতে পারে।
হ্যারির এখন নিজেকে অসুস্থ মনে হতে লাগলো। মনে পড়ল তার স্কুলে খেলার জন্য যখন কোন দলে তাকে বেছে নেয়া হত, সব সময় তাকে সবার শেষে বেছে নেয়া হত। সে যে খারাপ খেলতো সে কারণে নয়, তারা বরং ডাডলিকে বোঝাতে চাইতো না যে, তারা হ্যারিকে পছন্দ করে।
ফিনচ, ফ্লেচলি, জাস্টিন
তার ভাগ্যে হাফলপাফ হাউজ পড়ল।
হ্যারি লক্ষ্য করল কারো কারো নাম ডাকতে হ্যাটটার তেমন কোন সময়ই লাগছে না। অথচ কারো কারো জন্য অনেক সময় নিচ্ছে।
হ্যারির পাশে দাঁড়ানো বেলেচুলের ছেলেটি সিমাস ফিনিংগাম টুলের ওপর বসল। এবার হ্যাটটি ঘোষণা দিল–গ্রিফিল্ডর।
গ্রেঞ্জার, হারমিও।
হারমিওন দৌড়ে গিয়ে টুলে বসল। মাথায় হ্যাট লাগাল। এবার আওয়াজ এল–গ্রিফিল্ডর।
হ্যারির মনে একটি দুর্ভাবনার উদয় হলো। আসলে যখন কেউ খুব নার্ভাস থাকে তখন তার মনে নানা দুর্ভাবনা হয়। যদি তার নাম একেবারেই না ডাকা হয়!
যদি এমন হয় যে সে হ্যাট মাথায় দিয়ে টুলের ওপর বসে আছে দীর্ঘক্ষণ কিন্তু হ্যাট কোন কিছু বলছে না। যদি অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল হ্যাটটা খুলে নিয়ে হ্যারিকে বলেন–নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে, তোমার আর ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। তুমি ট্রেনে ফেরত চলে যাও।
ব্যাঙ হারানো ছেলেটা নেভিল লংবটমকে যখন ডাকা হলো, টুলে যাবার পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। দীর্ঘ বিরতির পর হ্যাট ঘোষণা করল গ্রিফিল্ডর। অনেক হাসি–ঠাট্টার ভেতর দিয়ে নেভিলকে ফিরে যেতে হলো।
নাম ডাকা হলে ম্যালফয় আগে বাড়ল। মাথায় হ্যাট লাগাবার সাথে সাথেই ঘোষণা এল–স্লিদারিন।
খুশি মনে ম্যালফয় তার বন্ধু ক্রেব ও গয়েলের কাছে গেল।
আর বেশি নাম ডাকতে বাকি নেই।
তারপর ডাকা হলো মুন…নট….. পার্কিনসন যমজ বোন, পাতিল ও পাতিল-এরপর পার্ক, স্যালি, অ্যানাকে। প্রায় শেষের দিকে দু একজনের আগে ডাকা হলো হ্যারি পটারকে। পটার, হ্যারি? যেই হ্যারি এগিয়ে গেল অমনি গুঞ্জন শুরু হল
পটার, তিনি কি ঠিক তা-ই বলেছেন?
হ্যারি পটার?
হ্যাট পরার আগে হ্যারি দেখলো সবাই তাকে ভাল করে দেখার জন্য উঁচু হয়ে তাকাচ্ছে। পরের মুহূর্তে সে হ্যাটের ভেতরের কালো রং দেখছে। হাম, তার কানে এল। কঠিন। খুব কঠিন। অনেক সাহস। মনটাও খারাপ নয়। প্রতিভাও আছে–কিছু করার আগ্রহও আছে।
হ্যারি টুলের কোণা শক্ত করে ধরে উচ্চারণ করল–না, স্লিদারিন নয়….. স্লিদারিন নয়।
স্বরটি তাকে বলল–তুমি তাহলে স্লিদারিন হাউজে যেতে চাও না। তুমি ভালো করে ভেবে দেখ। স্লিদারিন হাউজ তোমাকে সাহায্য করবে। স্লিদারিন হাউজ তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি স্লিদারিন হাউজে তুমি একেবারেই যেতে না চাও তাহলে তোমাকে গ্রিফিল্ডর হাউজে দেয়া হবে।
হ্যাটের কাছ থেকে ঘোষণা শুনে হ্যারি মাথা থেকে হ্যাটটা নামাল। তারপর ধীরে ধীরে গ্রিফিল্ডরের টেবিলের দিকে অগ্রসর হলো। স্লিদারিন হাউজের বদলে গ্রিফিল্ডর হাউজ পাওয়ায় হ্যারি বেশ স্বস্তি বোধ করছে।
প্রিফেক্ট পার্সি উঠে দাঁড়াল ও শক্ত হাতে হ্যারির সাথে করমর্দন করল। ওয়েসলি পরিবারের যমজ দুভাই অন্যদের সাথে চিৎকার করে উঠল। হ্যারি পটারকে আমরা পেয়েছি। হ্যারি পটারকে আমরা পেয়েছি। আগে দেখা ভূতটার উল্টো দিকে হ্যারি বসল। ভূতটি মৃদুভাবে হ্যারির কাঁধে চাপড় দিল।
হ্যারি এখন উঁচু টেবিলটা ভালভাবে দেখতে পারছে। হ্যারি হ্যাগ্রিডের কাছাকাছি বসল। হ্যাগ্রিড বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হ্যারিকে অভিনন্দন জানাল। একটি সোনার চেয়ারে বসে আছেন আলবাস ডাম্বলডোর। হ্যারি তাকে চিনতে পারল। আরো কয়েকটা মুখ হ্যারির পরিচিত যেমন অধ্যাপক কুইরেল।
হাউজ বাছাইয়ের জন্য আর মাত্র তিনজন বাকি। তারপিন, লিসা গেল র্যাভেন ক্ল হাউজে! তারপর রনের পালা। রনের মুখ শুকিয়ে সবুজ হয়ে গেল। ওর জন্য হ্যারি টেবিলের তলায় ফিঙ্গার ক্রস করল। হ্যাট ঘোষণা দিল–গ্রিফিল্ডর।
আনন্দে হ্যারি অন্যদের সাথে মিলে হাততালি দিল। রন হ্যারির পাশের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লো।
শাবাশ রন। চমৎকার। হ্যারির পাশে পার্সি উইসলি হর্ষধ্বনি করল। জেবনী ব্লেইজ গেল স্লিদারিন হাউজে। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল রোল কলের কাগজ গুটিয়ে হ্যাট তুলে নিয়ে ঘোষণা দিলেন–বাছাই পর্ব শেষ।
হ্যারি তার স্বর্ণের থালার প্রতি দৃষ্টি দিল। সে এই প্রথম অনুভব করল যে সে খুব ক্ষুধার্ত। সে কদুর প্যাস্ট্রি তুলে নিল। আঃ কী মজা।
আলবাস ডাম্বলডোর উঠে দাঁড়ালেন। দুই হাত বাড়িয়ে তিনি বললেন নবীন ছাত্রগণ। তোমাদেরকে স্বাগত জানাই। এই হোগার্টসে তোমরা স্বাগত। আমাদের খাওয়ার পর্ব শুরু হওয়ার আগে আমি চারটি শব্দ উচ্চারণ করব। সেগুলি হলো–নিটউইট! ব্লুবার! অডমেন্ট! টুইক। ধন্যবাদ।
তিনি বসে পড়লেন। সবাই করতালি ও হর্ষধ্বনি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দিত করলো। হ্যারি ঠিক বুঝে উঠতে পারল না-এখন কী করবে।
উনি কি পাগল। হ্যারি পার্সিকে জিজ্ঞেস করল।
পার্সি বলল–কী বলছ তুমি। তিনি তো এক অসামান্য প্রতিভা। তিনি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাদুকর। একজন অসাধারণ ব্যক্তি। অবশ্য অসাধারণ ব্যক্তিরাই এক আধটু পাগল হয়। তোমাকে আলু দেব, হ্যারি।
হ্যারির খিদে পেয়েছে। সামনে খাবারের পাহাড়। খাবারে কী নেই রোস্ট, চিকেন, ল্যাম্ব চপ, সসেজ, শূকরের মাংস, আলু সেদ্ধ, পুডিং, আরো নানা রকমের সস।
ডার্সলি পরিবারে হ্যারিকে অনাহারে থাকতে হয়নি। তবে সে কখনোই পেট পুরে বা ইচ্ছেমত খেতে পায়নি। তার পছন্দের খাবার তার কাছ থেকে সব সময় ডাডলি কেড়ে নিত। এই মুহূর্তে হ্যারির খুব খিদে পেয়েছে। সে একটা প্লেটে সব খাবারই অল্প অল্প করে নিয়ে খেতে শুরু করলো। পাশ থেকে ভূত তাকে লক্ষ্য করছিল।
ভূতটা বলল-এগুলো খুব সুস্বাদু খাবার।
তুমি খাবে না। হ্যারি ভূতকে বলল।
আমি প্রায় চারশ বছর কিছুই খাইনি। ভূতটি জবাব দিল। আমার এখন খাবার প্রয়োজন নেই। তবে সুযোগ পেলে কে ছাড়ে? আমি তো এখনও আমার পরিচয় দিইনি। আমার নাম স্যার নিকোলাস দ্য মিমসি পর্পিংটন। আমি তোমার সেবায় নিয়োজিত। আমি গ্রিফিল্ডর হাউজের আবাসিক ভূত।
আমি তোমাকে চিনি। হঠাৎ করে রন বলে উঠল–আমার ভাই তোমার কথা বলেছে, তুমি তো মুণ্ডহীন গলা।
আমাকে স্যার নিকোলাস দ্য মিমসি বলে ডাকলে আমি খুশি হব। ভূত বলল।
মুণ্ডহীন? কীভাবে তুমি মুণ্ডহীন হলে? বেলেচুলের সিম্মাস ফিননিগান জিজ্ঞেস করলো।
ভূতটাকে খুব বিব্রত মনে হলো। কারণ প্রশ্নটা তার পছন্দ হয়নি।
এভাবেই–সে রেগে বলল। সে তার বাম কান টান দিয়ে পুরো মাখাঁটি নিচে নামিয়ে ঘাড়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখল। মনে হলো কেউ যেন তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। নিকোলাস কিছুক্ষণ পর তার মাথাকে ঘাড়ের সাথে সংযুক্ত করল। একটু কেশে বলল–গ্রিফিন্ডারের নবীন ছাত্ররা। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপারে তোমরা আমাদের সাহায্য করবে
হ্যারি এবার স্লিদারিন টেবিলের দিকে তাকাল সেখানেও একটা ভূত বসে আছে। ভয়ঙ্কর চেহারা। সারা পোশাকে রূপালী রক্ত।
ওর জামায় রক্ত কেন?–সিমাস জিজ্ঞেস করলো।
প্রায় মুণ্ডহীন ভূতটা বলল–আমি তো তাকে জিজ্ঞেস করিনি।
সবাই পেট পুরে খেল তারপর অবশিষ্ট খাদ্য প্লেট থেকে উধাও হয়ে গেল। প্লেটগুলো আবার ঝকঝকে তকতকে হয়ে গেল। এক মুহূর্ত পরেই টেবিলে পুডিং দেখা গেল। সব ধরনের ও সব স্বাদের আইসক্রিম ও উপস্থিত। তারপর এল আপেল, পাই, চকোলেট, জেলি, বাদাম, স্ট্রবেরি, চালের পুডিং…. যখন একটা খাবার নেবার জন্য হ্যারি হাত বাড়াল তখন তাদের পরিবারের বিষয়ে কথা উঠল।
এরপর চললো নানা বিষয়ে কথাবার্তা। মাগল পরিবারের সব দুষ্কর্মের কথা। নেভিল এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা দিল। হ্যারির ঘুম পাচ্ছে। সে উঁচু টেবিলের দিকে তাকাল। অধ্যাপক মাকগোনাগল ডাম্বলডোরের সাথে কথা বলছেন। অধ্যাপক কুইরেলের মাথায় একটা অদ্ভুত পাগড়ি। অধ্যাপক কুইরেল কথা বলছেন চকচকে কালো চুলের এক শিক্ষকের সাথে। শিক্ষকটার লম্বা বাঁকানো নাক ও গায়ের রঙটা হলুদাভ। হঠাৎ করেই ঘটনাটা ঘটলো। বাঁকানো নাক শিক্ষকটা কুইরেলের পাগড়ির পেছন থেকে হ্যারির চোখাচুখি হলেন–তিনি হ্যারির কপালের দিকে তাকালেন। সাথে সাথেই হ্যারি তার কপালের দাগে তীব্র ব্যথা ও গরম অনুভব করতে লাগল।
আ…. উ….
পার্সি প্রশ্ন করল–কি ব্যাপার, তোমার কী হয়েছে?
না–কিছুনা হ্যারি জবাব দিল।
ব্যথাটা যত তাড়াতাড়ি এসেছিল, ঠিক তত তাড়াতাড়ি চলে গেল।
অধ্যাপক কুইরেল যে শিক্ষকের সাথে কথা বলছেন তিনি কে? হ্যারি পার্সিকে প্রশ্ন করে।
ওহ, তুমি তাহলে অধ্যাপক কুইরেলকে আগে থেকেই চেনো? পার্সি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
পার্সি বলে চলল–তিনি প্রফেসর স্নেইপ, তিনি তরল পানীয় ও ওষুধ বিষয়ে পড়ান।
অবশেষে পুডিংও অদৃশ্য হয়ে গেল। অধ্যাপক ডাম্বলডোর আবার দাঁড়ালেন। হলরুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা। তিনি বললেন–তোমাদের কাছে আমার কিছু বলার আছে। প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জানানো যাচ্ছে যে মাঠের জঙ্গলে যাওয়া তোমাদের নিষেধ। সিনিয়র ছাত্ররাও একথাটি মনে রাখলে ভালো করবে।
ডাম্বলডোরের দৃষ্টি হঠাৎ করে উইসলি যমজ ভাইদের ওপর পড়ল।
তিনি বললেন–আমাদের কেয়ারটেকার মি. ফিলচ একটা সংবাদ তোমাকে জানাবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। দু ক্লাসের মাঝখানের বিরতিতে করিডোরে জাদুবিদ্যার কোন অনুশীলন চলবে না। টার্মের দ্বিতীয় সপ্তাহে কিভিচ খেলার অনুশীলন হবে। যারা এ খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায় তারা তাদের হাউজের মাধ্যমে মাদাম হুচের সাথে যোগাযোগ করবে।
তোমাদেরকে আরেকটি কথাও আমাকে জানাতে হচ্ছে, চতুর্থতলার ডানদিকের করিডোরটি তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। যারা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবে তাদের পরিণাম হবে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
হ্যারি হাসল, কিন্তু তার সাথে আর কেউ হাসল না।
তিনি আসলে সত্যি কথা বলছেন না, ভয় দেখাচ্ছেন। হ্যারি পার্সিকে বলল।
তিনি সত্যি কথাই বলে থাকেন। পার্সি জবাব দিল–তিনি যখনই কোন কিছু আমাদের নিষেধ করেন তার কারণও জানিয়ে দেন। সবাই জানে বনে অনেক হিংস্র প্রাণী আছে। আমি মনে করি তিনি এ তথ্যটি প্রিফেক্টদের জানাতে পারতেন।
ডাম্বলডোর এবার তার জাদুদণ্ডে মোচড় দিলেন। একটি সোনালী রিন উড়ে গেল। টেবিলের ওপর সাপের মত উড়তে উড়তে সে কতগুলো শব্দ লিখে ফেলল–
হোগার্টস হোগার্টস হোগি ওয়ার্টি হোগার্টস
দয়া করে আমাদের কিছু শেখাও
আমরা বুড়ো বা টেকো মাথা হই
কিংবা ইস্পাত দৃঢ় হাঁটুর তরুণ
আমাদের মাথায় আছে কিছু কৌতূহলী জিনিস
এখন সেগুলো খালি, বাতাসভরা
কিছু মরা মাছি, কিছু পেজা তুলা
মূল্যবান কিছু আমাদের শেখাও
মনে করিয়ে দাও, যা আমরা ভুলে গেছি
যা উত্তম তাই তুমি করো
বাকিটা আমাদের জন্যে রেখে দাও
এবং মাথার ঘিলু পচে না যাওয়া তক
আমরা শিখতে থাকবো।
সবাই বার বার এ গান গাইতে লাগল। শেষ দিকটা যেন শব যাত্রার সঙ্গীতের মত। ডাম্বলডোর জাদুদণ্ড ঘোরালেন। আবার হর্ষধ্বনি।
তিনি বললেন-এখন শোবার সময়। তোমরা ঘুমোতে যাও।
সবাই গ্রেট হলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। হ্যারি খুব ক্লান্ত। সে খুব বেশি খেয়েছে। তার খুব ঘুম পাচ্ছে। তাই চারপাশের কথা তার কানে আসছে না। সিঁড়ির দুপাশে বিচিত্র দৃশ্য চোখে পড়ছে না। এর পর কিছু বেলুন উড়ল। কিছু হাঁটার ছড়ি আকাশে উড়ল। ব্যারনের কথা শোনা গেল। করিডোরের শেষে একটা মোটা মহিলার ছবি দেখা গেল। গোলাপী রঙের পোশাক। ছবিটা বলল–তোমার পাসওয়ার্ড জানাও।
পার্সি বলল–ক্যাপুট ড্রাকোনিস।
সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা এগিয়ে গেলে দেখা গেল দেয়ালে একটা গোল ছিদ্র।
ওরা ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ল। আর এটাই নাকি কমনরুম। বাঃ বেশ আরামের। বেশ কয়েকটা আরাম চেয়ার রয়েছে।
পার্সি মেয়েদের ডর্মিটরি যাবার দরোজাটা দেখিয়ে দিল। ছেলেদের দরোজা পৃথক। একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে তারা ওপরে উঠল। সুন্দর শোবার ঘর। লাল ভেলভেটের পর্দা। কয়েকটা পোস্টার ঝুলছে। শোবার পাজামা পরে তারা বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।
হ্যারি একটু বেশি খেয়ে ফেলেছে। তাই সে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে লাগল। স্বপ্নে দেখল, সে অধ্যাপক কুইরেলের পাগড়ি পরেছে এবং পাগড়ি তার সাথে কথা বলছে, তাকে বলছে সে যেন এক্ষুণি স্লিারিনে বদলি হয়, কারণ এটাই তার নিয়তি। হ্যারি পাগড়িকে বলল, সে শ্লিদারিনে বদলি হতে চায় না। পাগড়িটা ক্রমশই ভারি হয়ে উঠছে, সে ওটা খুলে ফেলতে চাইলো, কিন্তু সেটা খুব শক্ত হয়ে আঁকড়ে আছে। ব্যথাও দিচ্ছে তাকে। তার সাথে কথা বলছে। ম্যালফয় হাসছে। হঠাৎ এক লম্বা নাকওয়ালা শিক্ষক–ক্ষেইপ হয়ে গেল। স্নেইপ হাসছে কখনও উঁচু কখনও নিচু স্বরে তীব্র সবুজ আলোর ঝলক! হ্যারি জেগে উঠলো, সে ঘামছে ও কাঁপছে।
একটু পর হ্যারি অন্যদিকে কাত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে ওঠার পর হ্যারি আগের স্বপ্নের সবকিছুই ভুলে গেল।
???? ওষুধের ওস্তাদ
ওইদিকে তাকাও।
কোনদিকে?
লম্বা লাল চুল ছেলেটার পরের ছেলেটা।
চশমা পরা?
ওর মুখটা দেখতে পাচ্ছ কি?
ওর কপালের দাগটা দেখেছ কি?
হ্যারি পরের দিন ডরমিটরি থেকে বের হলেই চারদিকে এ রকম ফিসফিস, গুঞ্জন। ক্লাসরুমের বাইরেও লোকজন পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে ওকে দেখে বা হ্যারি যখন করিডোরে হেঁটে যায় তখন লোকেরা ওকে ভাল করে দেখার জন্য দ্বিতীয়বার ফিরে আসে। এসব হ্যারির ভালো লাগে না। হ্যারি লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে চায়।
হোগার্টসে একশ চল্লিশটা সিঁড়ি আছে–কোনটা চওড়া, কোনটা খাড়া, কোনটা সরু, কোনটা অস্থায়ী কাঠের। কিছু সিঁড়ি শুক্রবার দিন অন্য স্থানে নিয়ে যায়। কিছু সিঁড়ি আর মাঝপথে মাঝামাঝি গিয়ে শেষ হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন এগুলো পার হতে হবে লাফ দিয়ে। কিছু দরোজা আছে নম্রভাবে কথা না বললে বা যথাস্থানে হালকাভাবে টোকা না দিলে খুলবে না। কিছু স্থান দরোজার মত মনে হয়, কিন্তু আসলে দরোজা নয়–শক্ত দেয়াল। এখানে কোন কিছু মনে রাখা কঠিন, কোন কিছু স্থির নয়, সব সময় স্থানের পরিবর্তন ঘটছে। মানুষের প্রতিকৃতিগুলোরও পরিবর্তন ঘটছে, এক ফ্রেমের ছবি থেকে অন্য ছবির ফ্রেমে চলে যাচ্ছে। হ্যারির ধারণা তা হলে নিশ্চয়ই অস্ত্রাগারে রাখা কোটগুলোও নিশ্চয়ই হেঁটে বেড়ায়।
ভূতেরাও কোন রকম সাহায্য করে না। কেউ কোন দরোজা খুলে কোথাও যাবে, হঠাৎ করে অপরদিক থেকে ভূতেরা সেই দরোজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চমকে দেয়। এদের মধ্যে মুণ্ডুহীন নিক ব্যতিক্রম, খুশি মনে পথ দেখিয়ে দেয়। কিন্তু পিভস তার চিরাচরিত অভ্যাস মত আড়ালে থেকে কিছু ফেলে তার উপস্থিতি জাহির করে, কেউ যদি ক্লাসে যেতে দেরি করে ফেলে তাকে দুটো তালাবদ্ধ দরজা ও গোলমেলে সিঁড়ি পার হতে যেটুকু সময় লাগে তার চেয়ে বেশি দেরি করিয়ে দেবে ক্লাসে যেতে। সে কারো মাথায় ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট ফেলবে, পায়ের তলা থেকে কম্বল টেনে নেবে, চক ছুঁড়ে মারবে, চমকে দেয়ার জন্য দেখা না দিয়ে কারো পেছনে এসে দাঁড়াবে, পেছন থেকে নাক চেপে ধরে বলবে, কেমন লাগছে এখন।
পিভসের চেয়ে আরো বেশি খারাপ হলো কেয়ারটেকার আরগুস ফিলচ। প্রথম দিন সকালে হ্যারি ও রন ওর ধারে–কাছে না গিয়ে ভিন্ন পথে গেল। তারা দুর্ভাগ্যক্রমে ভুল করে তৃতীয় তলার নিষিদ্ধ করিডোরের প্রবেশ পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফিলচের বিশ্বাসই হয়নি যে ওরা পদ্ধ হারিয়ে ওই পথে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সে ভাবল ওরা ইচ্ছে করেই এটা করছে এবং এখানে তাদের আটকে রাখার ভয় দেখাল।
প্রফেসর কুইরেল সে সময় যদি ওই পথ দিয়ে না যেতেন তা হলে নিশ্চয়ই তাদের ফিলচের হাতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো।
ফিলচের একটা বিড়াল ছিল। বিড়ালটার নাম মিসেস নরিস। ধূলো রঙের গোঁফধারী বিড়ালটা ছিল অনেকটা মনিব ফিচের মত। বিড়ালটা যেন এখানকার নিয়মরক্ষক। একটু এদিক–ওদিক হলেই বিড়ালটা ফিলচকে ডেকে আনে। যারা ভুল করে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হয়। সকলে তাকে এত ঘৃণা করে যে সুযোগ পেলেই নরিসকে লাথি লাগায়।
বুধবার মাঝ রাতে দুরবী এর সাহায্যে নানা গ্রহ–নক্ষত্রের আসা–যাওয়া দেখানো হলো। অধ্যাপক স্পাউট সপ্তাহে তিনবার অদ্ভুত সব উদ্ভিদের কিভাবে যত্ন নিতে হয় তা পড়াতেন।
সবচে বিরক্তিকর ক্লাস ছিল জাদুর ইতিহাস। এটাই একমাত্র ক্লাস যা নিতেন এক ভূত–শিক্ষক। বৃদ্ধ প্রফেসর বিনস শিক্ষকদের স্টাফ রুমের ফায়ার স্পেস-এর সামনে অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়তেন আবার পরদিন সকালে তার শরীরটা সেখানে রেখেই ক্লাস নিতে চলে যেতেন।
অধ্যাপক ফ্লিটউহক ছিলেন বশীকরণ বিদ্যার শিক্ষক। তিনি ক্লাসে অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে মনোমুগ্ধকর গল্প শোনাতেন। আকারে ছোটখাটো, একগাদা বই এর ওপর দাঁড়িয়ে তাকে টেবিল থেকে উঁচু হতে হতো। হাজিরা খাতায় হ্যারির নাম ডাকতে গিয়ে অদ্ভুত শব্দ করে নিজেই হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেন তিনি।
অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল একটু অন্য ধরনের। মেজাজ কড়া হলেও তিনি মানুষ হিসেবে ভালো। ছাত্ররা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। তিনি বলেন যে শরীর বদল অথবা অন্যরূপ ধারণ করা সবচে জটিল জাদুবিদ্যা।
তিনি আরও বলতেন, আমার ক্লাসে কোন উল্টা–পাল্টা করবে না। করলে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আর ফিরে আসতে পারবে না।
একটু পরে তিনি তার টেবিলটাকে বাচ্চা শূকরে রূপান্তরিত করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার তা টেবিল হয়ে গেল। সকল আসবাবপত্রই মাঝে মাঝে একদল পণ্ড হয়ে যায়। একদিন ছাত্রদের দেশলাই দিয়ে বলা হল–কাঠিকে সূচ বানাও। একমাত্র হারমিওন গ্রেঞ্জারই সফল হয়। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল ওদের দেখালেন কিভাবে কাঠিটি ধাতব পদার্থে পরিণত হলো এবং সূচালো হলো।
যে ক্লাসটা তাদের সবচে ভালো লাগতো সেটা ছিল কালো জাদু টোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। মাঝে মাঝে হাসি–ঠাট্টা হয়। সারা ক্লাসে রসুনের গন্ধ। রোমানিয়া থেকে রক্তচোষা এসেছে এবং তার পাগড়ির ভেতর থেকে এই গন্ধ আসে। পাগড়ির ভেতরের রসুন নাকি অধ্যাপক কুইরেলকে নানা রকম বিপদ–আপদ থেকে রক্ষা করে। তাকে এই পাগড়িটা দিয়েছে আফ্রিকার কোন এক রাজপুত্র।
হ্যারি এই ভেবে আশ্বস্ত যে সে পড়াশোনায় খুব একটা পেছনে পড়ে নেই। মাগল পরিবার থেকেও অনেক ছেলে এখানে এসেছে। তারই মত। ডাইনি জাদুকর সম্পর্কে তাদের অনেকেরই সামান্যতম ধারণা নেই। এমন কি রনের মাথাতেও অনেক কিছু আসে না।
শুক্রবার দিনটা কারি ও রনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওইদিন তারা সঠিক পথে গ্রেট হলে এসে নাশতা করত।
পিরিজে চিনি ঢালতে ঢালতে হ্যারি রনকে জিজ্ঞেস করল–আজ আমাদের কি কাজ?
স্লিদারিনদের সাথে দ্বিগুণ ওষুধের উপাদান মেশানো রন বলল। গেইপ ছিলেন স্লিদারিন হাউজের প্রধান। সবাই বলে তিনি নাকি তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন। আমরা দেখবো এটা সত্যি কিনা।
অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল যদি আমাদের পক্ষে থাকতেন। হ্যারি বলল। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল ছিলেন গ্রিফিল্ডর হাউজের প্রধান। তা সত্ত্বেও তিনি ছাত্রদের গাদাগাদা হোমটাস্ক দিতে কার্পণ্য করতেন না।
ডাক আসার সময় একশ পেঁচাকে গ্রেট হলে প্রবেশ করতে দেখে সে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। তারা তাদের মালিকদের খুঁজে নিয়ে চিঠি বিলি করলো। কিছু কিছু পারসেল ছিল।
হেডউইগ এ পর্যন্ত হ্যারির জন্য কোন চিঠি আনেনি। হেডউইগ খুবই অলস। তবে চিঠি আসলে সে নিশ্চয়ই নিয়ে আসবে। তার কাজ একটিই, সেটা হলো ঘুমোবার আগে তার কানের লতি ছুঁয়ে আদর করা ও শুভরাত্রি বলে পেঁচাঁদের থাকার জায়গায় যাওয়া।
অবাক কাণ্ড। আজ সকালে হেডউইগ হ্যারির জন্য একটা চিঠি টেবিলে রাখল। হ্যারি বিস্মিত হয়ে ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলে পড়তে থাকে। চিঠিতে লেখা আছে–
প্রিয় হ্যারি,
আমি জানি, তুমি প্রতি শুক্রবার বিকেলে বাইরে যাও। তুমি কি বিকেল তিনটায় আমার সাথে এক কাপ চা পান করতে আসতে পারো? আমি জানতে চাই ডর্মিটরিতে তোমার প্রথম সপ্তাহ কেমন কাটল? অপর পৃষ্ঠায় জবাব লিখে হেডউইগ মারফত পাঠিয়ে দিও।
ইতি
হ্যাগ্রিড
হ্যারি রনের কাছ থেকে পালকের কলম নিয়ে লিখল–হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেখা হবে। সে চিঠিটি হেডউইগের কাছে দিল। হেডউইগ চিঠি নিয়ে শো করে উড়ে চলে গেল।
হ্যারিও হ্যাগ্রিডের সাথে দেখা করার জন্য উৎসুক ছিল। কারণ ওষুধ তৈরির উপকরণের ক্লাস হ্যারির সবচে বিরক্তিকর মনে হত। কোর্সের প্রথম দিকেই হ্যারি বুঝতে পেরেছিল যে, স্নেইপ তাকে অপছন্দ করেন না শুধু, মৃণাও করেন।
ওষুধ ডোজের ক্লাসগুলো হতো নিচে বন্দিশালার মত একটা কক্ষে। এই কক্ষটা অনেক বেশি ঠাণ্ডা ছিল। শেইপ হাজিরা খাতা নিয়ে নাম ডেকে ক্লাস শুরু করতেন। তিনি জারি পটারের নাম এভাবে ডাকলেন–হ্যারি পটার… আমাদের নতুন বিখ্যাত ব্যক্তি।
হ্যারির অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে ম্যালফয় ক্রেব ও গয়েল খুব আনন্দ পেত। নামডাকা শেষ হলে স্নেইপ ক্লাসের দিকে তাকালেন।
তার চোখও হ্যাগ্রিডের চোখের মত কালো। কিন্তু সে চোখে হ্যাগ্রিডের চোখের উষ্ণতা নেই। তার চোখ দুটি শীতল ও শূন্য। তার চোখ দেখলে গভীর সুড়ঙ্গের কথা মনে পড়ে। স্নেইপের ক্লাস ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। ছাত্ররা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনত। এজন্য ক্লাসে কোন গোলমালও হত না। তিনি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তার ক্লাসকে প্রাণবন্ত রাখতে পারতেন।
হ্যারি পটারকে স্নেইপ হঠাৎ করে প্রশ্ন করে বসলেন–আচ্ছা হ্যারি বল তো–আমরা যদি অ্যাসফোডেল পাউডারের রুটের সাথে তিক্ত গুল্মরস মিশিয়ে দিই তাহলে আমরা কী পাব?
হ্যারি বলল–আমি ঠিক বলতে পারব না। স্নেইপ হ্যারিকে কটাক্ষ করে বললেন–তু, তু–খ্যাতিই সবকিছু নয়।
হারমিওন হাত তুললেও তিনি সেদিকে নজর দিলেন না।
স্নেইপ এবার বললেন–আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যাক। আমি যদি বলি আমাকে একটা বিজোয়ার দেখাও তাহলে তুমি কি করবে? হারমিওন হাত তুলল। বিজোয়ার সম্পর্কে হ্যারির বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
হ্যারি জবাব দিল–আমি জানি না স্যার।
ম্যালফয়, ক্রেব ও গয়েল হাসল। হ্যারি নিশ্চিত ম্যালফয়, ক্রেব বা গয়েল–ওদের কারোরই ওই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।
স্নেইপ মন্তব্য করলেন–পটার আমার মনে হয়, তুমি ক্লাসে আসার আগে বই খুলে দেখনি।
হ্যারি স্নেইপের চোখের দিকে তাকাল। তারপর মনে মনে বলল ডার্সলি পরিবারের সাথে থাকার সময়ও আমি বইপত্র দেখেছি। অধ্যাপক স্নেইপ কি মনে করেন যে One Thousand Magical Herbs and Fungi–র সবকিছুই আমার মুখস্থ থাকবে।
হারমিওন আবার হাত তুললেও স্নেইপ সেদিকে মনোযোগ দিলেন না।
এভাবে আরো প্রশ্ন করে স্নেইপ হ্যারিকে বিব্রত করলেন। অবশেষে অধ্যাপক স্নেইপের ক্লাস শেষ হল। হ্যারি পটারের মন এমনিতেই ভালো ছিল না, কারণ সেসনের প্রথম সপ্তাহেই গ্রিফিল্ডর হাউজের দু নম্বর কাটা গেল। আর হ্যারি গ্রিফিল্ডর হাউজের সদস্য। পাঁচটা বাজার তিন মিনিট আগে তারা গ্রিডের ঘরের দিকে রওনা হলো। নিষিদ্ধ বনের পাশে একটা কাঠের বাড়ি ছিল। দেখতে কুঁড়েঘরের মত। সেটাই হ্যাগ্রিডের আবাসস্থল।
তারা যখন দরোজায় করাঘাত করল তখন ভেতর থেকে ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা গেল। একটু পর শোনা গেল হ্যাগ্রিডের কণ্ঠস্বর ব্যাক ক্যাগে, ব্যাক।
দরোজার ফাঁক দিয়ে হ্যাগ্রিডের বিরাটকায় চুলভর্তি মুখ দেখা গেল। দরজা খুলতে খুলতে হ্যারি ও রনকে দেখে হ্যাগ্রিড বলল–দাঁড়াও।
হ্যাগ্রিড একটা বিরাট কালো বোর হাউন্ড কুকুরের শিকল ধরে রেখে ওদের ভেতরে ঢুকতে বললেন।
ভেতরে একটামাত্র ঘর। এক কোণায় বিছানা। আমার কেতলিতে পানি ফুটে ধোয়া বেরুচ্ছে। কুকুরটার নাম ফ্যাংগ।
কুকুরটাকে ছেড়ে দিয়ে হ্যাগ্রিড হ্যারি ও রনকে বললেন–আরাম করে বসো। ফ্যাংগকে যত হিংস্র মনে হয় আসলে সে তত হিংস্র নয়।
হ্যারি হ্যাগ্রিডের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল-এই হচ্ছে রন।
হ্যাগ্রিড তখন সেদ্ধ পানি একটা বড় টি-পটে-ঢালছিলেন এবং প্লেটে রক কেক সাজাচ্ছিলেন।
রক কেকে কামড় দিতে গিয়ে তাদের অবস্থা কাহিল। তবে হ্যারি আর রন এমন ভাব দেখাল যে তারা বেশ মজা করে রক কেক খাচ্ছে। তারা তাদের লেখাপড়া সম্পর্কে হ্যাগ্রিডকে জালাল। ফ্যাংগ হ্যারির হাটুর ওপর যাথা রেখে হ্যারির কাপড় শুকতে লাগল।
কথা প্রসঙ্গে ফিলচের কথা আসলো। হ্যারিরাই আসলে তার বিষয়ে কথাটা বলল। হ্যাগ্রিড ফিলচকে বোকা বৃদ্ধ বলায় হ্যারি আর রন উডয়েই খুশি হলো।
ফিলচের বিড়াল নরিস সম্পর্কে হাহ্যাগ্রিড বললেন–আমার কুকুর ফ্যাংগের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেব। শুধু তোমাদের কেন ওর বিড়ালটা আমাকেও অনুসরণ করে। ফিলচ–ই তাকে এই কাজে লাগিয়েছে।
হ্যারি হ্যাগ্রিডকে জানাল যে অধ্যাপক স্নেইপ তাকে ঘৃণা করেন। রন বলল–দুঃখ করে লাভ নেই। অধ্যাপক স্নেইপ কাউকেই পছন্দ করেন না।
বাজে কথা। হ্যাগ্রিড মন্তব্য করেন সে তোমাকে ঘৃণা করবে কেন?
হ্যারির কাছে মনে হলো হ্যাগ্রিড তার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
রনের দিকে তাকিয়ে হ্যাগ্রিন্ড বললেন–তোমার ভাই চার্লি কেমন আছে। তাকে আমার খুব ভালো লাগে।
এরপর হ্যাগ্রিড রনের সাথে তাদের পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করলেন। হ্যারির টেবিল থাকা ডেইলি প্রফেট পত্রিকার একটা কাটিং চোখে পড়ল :
গ্রিংগটস–সর্বশেষ বার্তা
গ্রিংগটসে ডাকাতির বিষয়টি নিয়ে ৩১শে জুলাই থেকে তদন্ত চলছে। মনে করা হচ্ছে এটি কালো জাদুকর ও ডাইনিদের কাজ।
গ্রিংগটসের গবলিনরা দাবি করছে সেখান থেকে কিছুই খোয়া যায়নি। ভল্টগুলো এইদিনই খালি করা হয়েছিল।
কিন্তু সেখানে কি ছিল এ ব্যাপারে আমরা কিছু বলতে পারব না। তোমাদের মঙ্গলের জন্য এ ব্যাপারে নাক না গলানোই ভালো–গবলিনদের একজন মুখপাত্র জানান।
হ্যারির মনে পড়ল–ট্রেনে তাকে রন বলেছিল যে গ্রিংগটসে ডাকাতির চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু কোন তারিখে হয়েছিল-এটা সে উল্লেখ করতে পারেনি। হ্যাগ্রিডকে হ্যারি বলল যেদিন গ্রিংগটসে ডাকাতি হয় সেদিনটা ছিল আমার জন্মদিন। আমরা যখন সেখানে ছিলাম হয়ত তখনই ঘটনাটা ঘটে। হ্যাগ্রিড বললেন–হ্যারি তুমি ঠিকই বলেছ। এই বলে হ্যাগ্রিড আরেকটা রক কেক হ্যারির দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
হ্যারি পত্রিকার কাটিংটা আরেকবার পড়ল। ভল্টটা ওইদিনই খালি করা হয়েছিল যেদিন গ্রিগেটস থেকে হ্যারির জন্য টাকা তোলা হয়। হ্যারি আর রন যখন রাতের খাবার জন্য দুর্গে আসছিল তখন তাদের পকেট ছিল হ্যাগ্রিডের দেওয়া বক কেকে ভর্তি। তারা হ্যাগ্রিডকে না বলতে পারেনি।
হ্যারির মনে হলো এতদিনে লেখাপড়ায় যতটুকু এগুনো দরকার ছিল ততটুকু সে পারেনি। তার এটাও মনে হলো সেই সম্পর্কে হ্যাগ্রিড অনেক কিছু জানেন কিন্তু তাকে কিছু বলেননি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now