বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
.
আমি এক গৃহবধূকে চিনি। বাংলার গৃহবধূ কেমন হতে পারে তা ঐ মেয়েটিকে না দেখলে বুঝতামনা। একজন নারী তার স্বামী সংসারকে কতটা ভালবাসতে পারে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত মেয়েটি।
.
ছেলেটির নাম হুমায়ন। আমরা তাকে সম্রাট আকবরের ছেলে বাদশাহ হুমায়ন বলেই ডাকতাম। তিন বোনের সাথে একটি মাত্র ভাই বাদশাহ হুমায়ন। কখনো প্রাইমারী স্কুলে পড়ত কিনা জানা ছিলনা।
তবে বাজে ছেলেদের সাথে মিশে নেশাগ্রস্থ জীবন ছিল তার।
এতটাই বাজে ছিল যে, কখনো কখনো নেশার টাকার জন্য বাবা মায়ের উপর হাত তুলতেও তার বিবেকে বাধতনা। কখনো কখনো নেশার টাকার জন্য মানুষের এটা ওটা চুরি করে নিয়ে বিক্রি করে দিত।
.
এলাকার মানুষজন তেমন কিছু বলতনা, কারন তার বাবা ছিল খুবই ভাল একজন মানুষ। কারো কোন ক্ষতি কোনদিন করেনি, আর নামাজ রোযায় খুব ধার্মিকক লোক ছিলেন।
অনেকেই হুমায়নের বাবাকে পরামর্শ দিত, তোমার ছেলেকে একটি বিয়ে করিয়ে দাও তাহলে হয়তো বউ পেয়ে তোমার ছেলে ভাল হয়ে যাবে। তিনি উত্তর দিতেন, আমার এই নেশাখোর ছেলেকে কে বিয়ে করবে? কারন বছর খানেক আগে হুমায়নকে বিয়ে করিয়েছিল, চারদিন পরই বউ চলে গেছে। কে চায় এমন নেশাখোর স্বামী নিয়ে ঘর করতে?
.
আবারো বিয়ের আয়োজন হচ্ছে হুমায়নের। এবার বিয়ে করানো হচ্ছে পল্লী গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের মেয়েকে। ঐ মেয়ের সৎ মা যেন মেয়েটিকে বিয়ে দিতে পারলেই বেঁচে যায়। হুমায়নের দ্বিতীয় বিয়ে হওয়াতে তেমন একটা বড় আয়োজন হয়নি।
বিয়ে করে বউ নিয়ে বিকেলে ফিরল হুমায়ন, আর এলাকার সবাই নতুন বউ দেখতে ভীড় জমাল তাদের বাড়িতে।
হুমায়নের এবারের বউ সবার নজর কেড়েছে। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এত সুন্দর একটা বউ সে পাবে। গায়ের রং দুধে আলতা, মোটকথা এলাকার সবার বউ থেকে হুমায়নের বউ দেখতে তুলনাহীন সুন্দর।
.
বিয়ের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। না, এবার হুমায়নের বউ আর চলে যায়নি। সংসার গুছিয়ে নিতে তার বেশী সময় লাগেনি। এলাকাবাসীরও সবার মন জয় করে নিয়েছে তার অকৃত্রিম হাসি আর ব্যাবহার দিয়ে। তার মুখে যেন সবসময় হাসি লেগেই থাকত।
হুমায়ন কিন্তু নেশা ছাড়েনি। বিয়ের পনেরো দিনের মাথায় হুমায়ন রাতে নেশা করে এসে প্রথমবারের মত তার বউয়ের উপর হাত তুলে। তার বউ কিছু বলেনি, বালিশে মুখ গুজে কেঁদেছিল। তার অপরাধ হল সে কেন হুমায়নকে নেশা করতে বারণ করল। হুমায়নের কথা হল, তোর ভাত কাপড়ের অভাব হলে বলবি, নেশা করার ব্যাপারে কিছু বলতে পারবিনা।
পরদিন সকালে বধূটির গালে আর গলায় মারের দাগ দেখা যায়। সুন্দর মেয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্নগুলো লালবর্ণ ধারন করেছে। অনেকেই হুমায়নকে নানা কথা বলে, এত সুন্দর নিষ্পাপ বউয়ের গায়ে কেউ হাত তুলে? হুমায়ন উল্টো কটুকথা শোনায়, এটা নাকি তাদের স্বামী স্ত্রীর ব্যাপার।
.
হুমায়নের মা ছিল বাংলা চলচিত্রের দাজ্জাল চরিত্রের অভিনেত্রী রিনা খানের মত। সারাক্ষনই বউটির দোষ খুঁজে বের করত। গালি দিত, অলক্ষী, অপয়া। সে নাকি তার মা'কে জন্মের সময় মেরেছে। আর বউটি এই কথাতে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেত। নিজের মা'কে কেউ মেরে ফেলতে পারে?
হুমায়ন বাড়ি ফিরলে হুমায়নের মা তার কাছে বউয়ের নামে ইনিয়ে বিনিয়ে নালিশ করত। আর নেশাখোর হুমায়ন তার বউকে ইচ্ছেমত মারত।
কিছু বলতনা মেয়েটি, বলেনি কোনদিন। শুধু মুখ লুকিয়ে কাঁদত।
.
হুমায়নের বউ যখন গর্ভবতী তখনও তাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজকর্ম করাইত।
যখন খুব বেশী খারাপ লাগত, তখন বলত "মাগো আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি কাজগুলো পরে করে দেই?"
হয়তো বিধাতার লেখন এমনি, মায়ের মন গলল। শাশুড়ী এই প্রথম বলল, যারে মা আজ থেকে তোর সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত সব কাজ আমি করব।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি হুমায়নের মা বাকি দিনগুলো সংসারের সব কাজ করত, তবুও হুমায়নের বউ অনেক কাজে সহযোগীতা করত।.
.
দুঃখ নিয়েই যার জীবন, তার কপালে সুখতো আশায় গুড়োবালি, মরীচিকার মত।
হুমায়নের মেয়ে সন্তান হওয়াতে তারা তেমন একটা খুশিনা। শুরু হয়ে গেল আবারো সেই বিয়ের প্রথম দিনগুলোর মত অসহ্য যন্ত্রনা।
এলাকার অনেকে বুঝাইত বউটিকে, "তুই চলে যা, এভাবে স্বামি আর শাশুড়ীর অত্যাচার সইতে সইতে তুই মরে যাবি।"
বউটি বলত, নাগো আমার স্বামী আমাকে যথেষ্ট ভালবাসে, অনেক ভালবাসে। আর সৎ মায়ের অত্যাচার থেকে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে স্বামীর পায়ের কাছে পড়ে থাকা অনেক সুখের।
.
হুমায়নের মেয়েটি বড় হতে লাগল, ঠিক হুমায়নের বউয়ের মতই চেহারার ধরন। একদিন হুমায়নের বউ আবারো বলেছিল, আমাদের মেয়ে বড় হচ্ছে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে এবার নেশা করাটা ছেড়ে দাও।
আহহহ, শুরু হয়ে গেল চুলের মুঠি ধরে মারধোর। ঘরের দরজা বন্ধ করে মারে, যেন কেউ ফিরাতে না পারে।
সেদিনই হুমায়নের বউ কেঁদে কেঁদে বলেছিল,,,,,
*তুমি আমাকে এভাবে মারলে আমি মরে যাবগো, মরে গেলে আর কাকে মারবা? বেঁচে থাকলে আবার মারতে পারবা।
জন্মের সময় মা'কে হারিয়েছি, এলাকার মানুষের কাছে অলক্ষী অার অপয়া শুনতে শুনতে অপমান কাকে বলে ভুলে গেছি। আর সৎ মায়ের মারধোর খেতে খেতে ভুলে গিয়েছিলাম কষ্ট কাকে বলে। তুমি আমাকে মারলে আমার কষ্ট হয়না, আমি যে তোমাকে ভালবাসি। তবে মারতে মারতে যদি মেরেই ফেলো তোমাকে আর ভালবাসবে কে?
আর মেরোনাগো আমাকে, তাহলে মরেই যাব*
.
হাসপাতালের বিছানায় হুমায়নের বউ। সেদিন হুমায়ন যদিও আর মারেনি, এর চার পাঁচদিন পর অসম্ভব জ্বর উঠছে হুমায়নের বউয়ের শরীরে। ডাক্তাররাও কিছুই করতে পারছেনা। ঔষধ খাচ্ছে আর হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে।
এই প্রথম হুমায়নের মনে মায়া হল। হুমায়ন বউটির হাত ধরে কান্না জুড়ে দিল,,," বউগো, তোর মত আমাকে কেউ কোনদিন ভালবাসেনি। আমাকে তুই মাফ করে দে। বিশ্বাস কর বউ আমি নেশা করা ছেড়ে দিছি। আমার মেয়ের মাথা ছুঁয়ে বলছি, আমি আর কোনদিন নেশা করবনা। তুই আমাকে মাফ করে দে বউ"
হুমায়নের বউ আরো বেশী কান্না করতেছে আর বলতেছে, "একি করছ? তুমি আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে কেন আমাকে পাপের ভাগী করতেছো? তুমি নেশা করা ছেড়ে দিছো সেটাই আমার পরম পাওয়া। "
.
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হুমায়নের বউকে বাঁচাতে পারেনি কেউ। এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। হাসপাতালে এক সপ্তাহ থাকার পর মৃত্যু বরণ করেছে বউটি। যে কেউ দেখলে বলবে বউটি মরেনি, ঘুমিয়ে আছে। কত সুন্দর করে চোখ বুজে আছে নিষ্পাপ মুখটি। যতটা দিন ছিল পৃথিবীতে ততদিন কষ্টকেই সুখ মনে করে বেঁচেছিল। কারন সুখ তার হাতে কখনো ধরা দেয়নি। সে ছিল জনমদুঃখী, সারা জীবনই কষ্টই ছিল নিত্য সঙ্গী।
.
হুমায়ন আর এবার নতুন করে বিয়ে করেনি। আর নেশার জগতেও প্রবেশ করেনি। মেয়েটিই যেন তার সবকিছু।
নিজের মেয়েটিকে নিয়েই সে বাকিটা জীবন পাড়ি দিতে চায়।
তবে গভীর রাতে তার বাড়ির আঙ্গিনায় প্রায়ই শোনা যায় হুমায়ন বিলাপ করে কাঁদতেছে,"বউ তোর মত আমাকে কেউ ভালবাসেনি, আমি তোকে মেরে ফেললাম। তুইও আমাকে মেরে ফেলে তোর কাছে নিয়ে যা"
.
.
(বিঃদ্রঃ কেঁদে থাকলে চোখের পানি মুছুন, আমিও আমারটা মুছে ফেলতেছি)
.
.
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,,,,,,,,
,,,,,,,, ওমর ফারুক শ্রাবণ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now