বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গরীবের ঘোড়ারোগ

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X সাদা কালারের প্রাডো গাড়ি থেকে এক তন্বী সুন্দরী মহিলা নেমে এল। ঘরে ঢুকতেই ‘ওয়েল কাম, ম্যাডাম। প্লিজ বি সিটেড। আমরা সব সময় আপনাদের সেবার জন্য প্রস্তুত। বলুন, কী চাই? কথাগুলো একনাগাড়ে বলে, ‘হেভেন ফর চিলড্রেন’-এর মালিক শামসুদ্দীন চৌধুরী। চট্টগ্রাম শহরের নামকরা দোকান। এক ডাকে সকলেই চেনে। দোকানের নাম ইংরেজিতে লেখা, তাতে কী!। বরং নামের নীচে, ছোট্ট সুন্দর সোনালি অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘বিজ্ঞানসম্মত এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত মানের খেলনা সামগ্রীর বিপণন প্রতিষ্ঠান।’ শামসুদ্দীন চৌধুরীর কথা শুনে মহিলা একটু ফিক করে হাসে। দোকানে সাজানো হরেকরকম খেলনাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলে, ‘আমার ছেলের জন্য একটা খেলনা কিনব।’ বয়স কত ম্যাডাম? এই ছয়ে পড়বে। কাল ওর জন্মদিন। ‘ও সিওর। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্যই আমরা বিদেশী শিশু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে অর্ডার দিয়ে স্পেশাল খেলনা তৈরি করে নিই।’ ‘কেন, আমাদের দেশে কি চাইল্ড স্পেশালিস্ট নেই?’ প্রশ্ন করে মহিলা। ‘কি আর বলব ম্যাডাম। সত্যি কথা বললে, নিজেদের মুখেই থুথু পড়ে। তবুও বলছি। আজকাল আমাদের দেশে বিশেষ করে বাঙালিদের মাথা থেকে কিছু বেরুচ্ছে না। সব সেকেলে। আর ফরেন কান্ট্রির দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, কি সব ইউনিক আবিষ্কার। যাক, এসব কথা। আমি ভালো খেলনা দেখাচ্ছি। একেবারে কারেন্ট’। ‘একটু তাড়াতাড়ি দেখান। সাহেব লাঞ্চ সেরেই অফিসে যাবেন। ছেলের জেদ এখুনি খেলনা চায়।’ ‘এই মতি ও’ পাশ থেকে তেরো নম্বর এবং পনেরো নম্বর মডেল দুটো নিয়ে আয়। দ্যাখ ওখানে দুটোই আছে। সাবধানে আনবি।’ মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘স্টকে থাকছে না ম্যাডাম। ডিমান্ড অনুপাতে সাপ্লাই কম।’ শামসুদ্দীন চৌধুরীর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। গা থেকে তেল যেন চুঁইয়ে পড়ছে। চোখ দুটো বেশ বড় বড়। মুক্তার মতো ঝকঝকে দাঁত। কথা বলায় একটা আর্ট আছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে। মতি দু’হাতে দুটো ঘোড়া নিয়ে এল। মেঝেতে রাখার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া দুটো দুলতে লাগল। যেন এখুনি ছুটবে। ‘দেখুন ম্যাডাম কি নিখুঁত ফিনিশিং। আর রংটা চমৎকার। একেবারে সেগুন কাঠের বডি। শামসুদ্দীন চৌধুরী হাসতে হাসতে বলে। মতি ঘোড়া দুটোর পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে দেখে। এই মতি কি দেখছিস? সরে দাঁড়া, ম্যাডামকে দেখতে দে।’ ধমক দেয় শামসুদ্দীন। মহিলা একটু ইতস্তত করে বলে, ‘ভাবছি এই ঘোড়া নেব, না অন্য কিছু।’ ‘হোয়াই নট ম্যাডাম?’ মনোবিজ্ঞানী বেকন সাহেব তো বলেই দিয়েছেন, ‘রাইডিং শিশুদের বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে’ ওই কথা শুনে মহিলা আর একবার হাসল। একটু থেমে, ‘তা তো বুঝলাম। কিন্তু আমার ছেলে কি এতে চড়তে পারবে।’ ‘নিশ্চই পারবে। শুধু ছেলে নয়। ইচ্ছে হলে চেয়ারের পরিবর্তে আপনিও এর উপর বসে রাইডিংয়ের আরাম অনুভব করতে পারবেন। জীবনে বৈচিত্র্য চাই। চেয়ারে তো সবাই বসে। এতে কোন নতুনত্ব নেই।’ ‘আমি বসলে তো ভেঙে যাবে।’ একটু মস্করা করে বলে মহিলা। ‘হোয়াট? কি বললেন, ভেঙে যাবে? ইমপসিবল। আপনি এখুনি বসুন।’ জোর দিয়ে বলে শামসুদ্দীন । মহিলা এবার শ্লেষের সঙ্গে বলে, ‘তা দরকার হবে না। এটা আমার বসার জন্য নয়। আমার ছেলের খেলার জন্য। আমাদের বিলেতি প্যাটার্ন অনেক সোফা রয়েছে।’ শামসুদ্দীন একটু খোঁচা খেয়ে মাথা চুলকায়। তারপর বলে, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম। আমি পরীক্ষা করেই দিচ্ছি। মতি এই দিকে আয়। পা তুলে উঠে বস তো।’ মালিকের হুকুম পেয়ে মনের আনন্দে ঘোড়ার পিঠে বসে মতি। দু’পা সামনের দিকে বাড়িয়ে উঁচু করে রাখার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটা দুলতে লাগল। যেন পঙ্খীরাজ। ‘দেখুন ম্যাডাম ওর বয়স তো দশ-বার। আপনার ছেলের চেয়ে অনেক বড়ো। মতি এটা পরিস্কার করে ভালভাবে প্যাকিং করে ম্যাডামের গাড়িতে উঠিয়ে দে।’ মহিলা চলে গেলেন। শামসুদ্দীনের ছোটো ভাই দোকানে এল। ভাইকে শামসুদ্দীন বলে, ‘খুব দেরি হয়ে গেল। আমি ব্যাঙ্কে যাচ্ছি। ফিরতে সময় লাগবে। তুই এ দিকটা দেখ। আর মতি ঘোড়াটা যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই রেখে দিবি।’ এই বলে স্কুটারে চেপে চলে গেল। চৈত্রের দুপুর। রোদে যেন বিষ্ফোরণের ঝাঁঝ। বাতাসে আগুনের তাপ। গলা শুকিয়ে পাথর। পানির ফিল্টার থেকে দু’গ্লাস পানি খায় মতি। দরজায় দাঁড়ায়। দোকান থেকে দেখা যায় রাস্তার ধারে টিউবওয়েলের প্লাটফর্মের মাঝখানে ক্ষয়ে যাওয়া এক চিলতে গর্ত। সেখান থেকে পানি খেয়েও একটা নেড়ি কুকুর শুয়ে জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে। সকাল আটকা থেকে মাইকে চিৎকার করে একজন বলছিলো, ‘লটারি জগতের সুবর্ণ সুযোগ। মাত্র একশ’ টাকার বিনিময়ে আপনিও ভাগ্য পরীক্ষা করুন। ফাস্ট প্রাইজ আপনিও পেতে পারেন।’ এখন সে-ও চিল্লানো বন্ধ করেছে। এই মুহূর্তে সব কিছু যেন ঝিম মেরে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মতি। শামসুদ্দীনের ছোট ভাই রাশেদ সিলিং ফ্যানের নীচে ক্যাম্পখাট পেতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। এ সময় সচরাচর কোনো খদ্দের দোকানে আসে না। ফ্যানের নীচে টুলটা টেনে নিয়ে মতি আরাম করে বসে। বাতাসের অনুকূলে ভোঁকাট্টা কাটা ঘুড়ি যেমন ঘাই মারতে মারতে ভেসে যায়, মতির মনেও একরাশ চিন্তা উঁকি মারে। ক’বছর আগে মতির কাঠমিস্ত্রি বাবা এই দোকানের কয়েকটা শেলফ তৈরি করতে আসে। সেও বাবার সঙ্গে এসেছিল টুকটাক সাহায্য করতে। সেদিন সে বাড়ি ফিরে গিয়ে বায়না ধরে একটা ঘোড়া কিনে দেওয়ার জন্য। মা ধমক দিয়ে বলে, গরীবের ঘোড়া রোগ ভাল না। ভয়ে সে চুপ করে যায়। তখন বয়সে ছোট হলেও কথাটা তার এখনও মনে আছে। বিশেষত ‘গরীবের ঘোড়া রোগটি’ কি তার জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল। একদিন সে তার বাবাকে বলে, ‘গরীবের ঘোড়া রোগ কি বাবা?’ তার বাবা হেসে উত্তর দেয়, ‘গরীবের ঘোড়া রোগ হল ঘোড়ায় চড়ার সখ।’ তাহলে আমি একটা ঘোড়া চাই। ‘ঠিক আছে আমি তোকে একটা ঘোড়া তৈরি করে দেব।’ কিন্তু ক’মাস পরে একদিন রাতে মতির বাবার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে টুপ করে মরে গেল, সে সময় এই শামসুদ্দীনই তাদের সাহায্য করেন। তাঁর দয়ায় এই দোকানে কাজ। প্রথমে মতির মা আপত্তি করলেও পেটের দায়ে পরে রাজি হয়। প্রায় শুক্রবারে শামসুদ্দীন বিকেলবেলায় মতিদের খালের ধারে বাড়িতে যান। কোনদিন মতির হাতে দু-দশ টাকা ধরিয়ে বাজার থেকে এটা-ওটা আনতে বলেন। কখনও বলেন, আগ্রাবাদ শিশু পার্কে যা। কত কী দেখবি! নানারকম খেলনা আছে। সাঁতার কাটা পুকুর। ফোয়ারার পানি ছিটকে ছিটকে পড়ছে। আর তালে তালে গান হচ্ছে। মতির মা-ও তাকে যেতে বলে। কোনদিন আপত্তি করেন নি। সে ঘুরে ঘুরে সব দেখে। যে নাগরদোলায় অনেকগুলো ঘোড়া ঝোলানো আছে তার পাশে এসে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তার চড়া আর হয় না। ঝকমকে জামাকাপড় পরা ছেলে-মেয়েরা ঝটপট উঠে বসে। তারপর আরেক দল। কেউ ওকে চড়ার সুযোগ দেয় না। সন্ধ্যে গড়িয়ে গেলে দারোয়ান গেট বন্ধ করে দেয়। মতিও ফিরে আসে। এমন সময় একটা দমকা হাওয়ায় একরাশ ধুলো দোকানের সব কিছুর উপর ছড়িয়ে পড়ে। মতির চিন্তায় ঘা লাগে। উঠে দাঁড়ায়। রঙ্গিন ফেদারস ব্রাশ দিয়ে ঘোড়াটির গায়ের ধুলো ঝাড়ে। ঘোড়াটি ব্রাশের স্পর্শে দুলতে থাকে। মতির মনটাও কেন যেন নড়ে ওঠে। রাশেদ গভীর ঘুমে নাক ডাকছে। এমন সময় ‘ঘোড়া রোগ’ কথাটা আবার তার নতুন করে মনে পড়ে। ছাতি ফাটা তৃষ্ণায় মানুষ পানি দেখে যেমন পানির রকমফের ভুলে যায় মতিও তেমনি কিছু না ভেবেই ঘোড়ায় চড়ে বসে। পা দুটো সামনে বাড়িয়ে দেয়। দুলতে থাকে ঘোড়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীরে এক আলস্যের আমেজ। দু’চোখে ঘুমের ঘোর। আস্তে আস্তে সে ঘোড়ার মাথায় নিজের মাথা রেখে দু’হাতে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরে। দু’চোখ আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে আসে। এক সময় ঘোড়ার দোলন থেমে যায়। মতি সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে। লটারির ঘোষণাটা তার মাথায় যেন বারবার টোকা দিচ্ছে আর বলছে ‘মাত্র একশ’ টাকার বিনিময়ে আপনিও ভাগ্য পরীক্ষা করুন, জিতে নিন দশ লক্ষ টাকার প্রথম পুরস্কার।’ মালিককে বলে-কয়ে সে যদি আগাম একশ’ টাকা নিতে পারে তা হলে সে একটা টিকিট কাটবে। তার ভাগ্যে যদি ফার্স্ট প্রাইজটা বেধে যায় তা হলে সে একটা মস্ত বড়ো খেলনার দোকান দেবে। দোকানে আসা-যাওয়ার জন্য একটা জ্যান্ত ঘোড়া থাকবে। আরও কত কি। এমন সময় শামসুদ্দীন চৌধুরী দোকানে আসে। রাশেদ তখনও নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। মতি ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরে আরাম করছে। এমন অবস্থায় কেউ ঘরে ঢুকে একটা কিছু নিয়ে গেলেও এরা টের পাবে না। শামসুদ্দীন চৌধুরীর মাথা গরম হয়ে যায়। পা টিপে টিপে সে মতির কাছে গেল। তবুও মতির হুঁশ হয় না। এতে শামসুদ্দীনের আরও রাগ হয়। আচমকাই সে দুম করে মতির পিঠে একটা লাথি মারে। মেঝের ওপর ছিটকে পড়ে মতি। শামসুদ্দীনের মুখে অশ্রাব্য গালাগালি। রাশেদের ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে ভয়ে দাদার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মতির কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে রাশেদ তার গায়ে হাত রাখে। ধাক্কা দেয়। নিস্তেজ ভাব দেখে রাশেদ বলে, ‘ভাইয়া, মতি অজ্ঞান হয়ে গেছে।’ ‘তো আমি কি করব’। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে উত্তর দেয় শামসুদ্দীন চৌধুরী। ‘হাসপাতালে নিয়ে যাব’? ‘ঠিক হবে না।’ ‘তা হলে ‘নিরাময় নার্সিং হোমে’ নিয়ে যাই? সেখানে তোমার বন্ধু ডা. সাইফুল আছেন।’ ‘সেই ভালো। তেমন অবস্থা হলে নিয়ে যা।’ প্রায় ঘন্টাখানেক পর দোকানের টেলিফোনটা বেজে উঠল। শামসুদ্দীন একটু আতঙ্কিত। তাড়াতাড়ি রিসিভার তোলে। ‘হ্যালো, আমি শামসুদ্দীন বলছি। কি বললি মাথায় খুব চোট লেগেছে? ইনটারন্যাল হেমারেজ? হ্যাঁ, হ্যাঁ বল।’ অপর প্রান্তের কন্ঠস্বরে একটু তিক্ততা। ‘আর বলিস না। টুলের ওপর বসে থাকতে থাকতে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে এই দুর্ঘটনা।’ শাহনেওয়াজ বিপ্লব


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গরীবের ঘোড়ারোগ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now