বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গন্ধ বাতিক
অনীক ঘোষ
আমার কথা...
রহমান সাহেবের পাশের ফ্ল্যাটে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছেন।
ভদ্রলোক একা থাকেন,তার একটা মধ্যবয়স্ক কাজের লোক আছে,যাকে কিনা দিনে দুবার দেখা যায়-বাজার করতে বেরোবার সময়-আর বাজার থেকে ফিরবার সময়।
ভদ্রলোকটিকে নিয়ে কৌতূহলের কোন শেষ নেই।তাঁর নাম কেউ জানে না,কি করেন,কোথায় ছিলেন,পরিবার পরিজন কে কোথায় আছে,আদৌ আছে কিনা -কেউ কিছু জানে না।
"কাজের লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন কটমট করে তাকায়-বাবা নিজেই ভয় পেয়ে যাই"-একদিন রহমান সাহেব কথায় কথায় আমায় বলছিলেন।
এই রহমান সাহেব ভদ্রলোকটি আমার বাবার বন্ধু মানুষ।একই গলিতে বাসা,প্রায় সন্ধ্যায় চলে আসেন আমাদের বাড়িতে।আমি কখনও সখনও ছুটিতে বাসায় থাকলে আমার সাথেই আড্ডা দেন।খেলাধুলা-বাজারনীতি-অর্থনীতি,কি হালের রাজনীতি
কিছুই বাদ যায় না আড্ডা থেকে।
তো এই রহমান সাহেবের কাছেই শুনি সেই ভদ্রলোকের কথা।
-'ব্যাটা নির্ঘাত চুরি করে এসে লুকিয়েছে,ওই কাজের ব্যাটা ওর সাগরেদ-আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট সিউর'
একদিন প্রায় ক্ষেপে গিয়ে বলেন রহমান সাহেব।আমি হাল্কা হেসে বলি,'আঙ্কেল খুনিও হতে পারে'।উনি দেখি দিগুন উৎসাহে বলেন,'হুম,এ কথাটা মাথায় আসে নি!'চিন্তায় পড়ে যান রহমান সাহেব।
এরপর ক্লাস আর পরিক্ষার চাপে অনেকদিন বাসায় যাওয়া হয় না।রহমান সাহেবের সেই রহস্যময় প্রতিবেশীর কথা আমি বেমালুম ভুলে যাই।মনে করিয়ে দেন রহমান সাহেব নিজেই-'আরে তোমাকে সেই যে লোকটার কথা বলেছিলাম,মনে আছে?'...'আরে ওই যে আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকে...'-আমার চট করে মনে পড়ে গেল।হেসে বললাম,'তা ভদ্রলোক খুনি না কি চোর?বের হল কিছু?'জবাবে রহমান সাহেব যে গল্প ফাঁদলেন -তা আমার কাছে বেশ জমাট লাগলো।ঘটনা অনেকটা এমন.........
রহমান সাহেবের কথা...
ওই লোকটিকে নিয়ে আমাদের উত্তেজনা যখন প্রায় ঝিমিয়ে এসেছে,তখনি এক ভরদুপুরে সে আমাদের দরজায় টোকা দেয়।তোমার আন্টি তো দরজা খুলে ভুত দেখার মত চমকে ওঠে!আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি,প্রায় কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ আর একমুখ দাড়িগোঁফে ঢাকা ভদ্র পোশাক পরা এক লোক।নিজে থেকে পরিচয় দেন,'আমি আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকি।হে হে পরিচিত হতে এলাম'।লোকটা ঘরে এসে বসে।নাম বলে সফিকুল ইসলাম।কি যেন একটা রোগে ভুগছে,তাই ফ্ল্যাট থেকে বেরোয় না।অনেকক্ষন থেকে গল্প করে সফিক ,আমার মন্দ লাগে না।কিন্তু লোকটাকে দেখে খুব অস্বস্তি হতে থাকে,কারন লোকটা প্রায় সবসময় নাকে একটা রুমাল চাপা দিয়ে ছিল।কারন জিজ্ঞেস করতে বলে,'অনেক বাজে গন্ধ চারপাশে '।আমার মেজাজ খারাপ হয়,তোমার আন্টী কতটা অরগ্যানাইজড তা তো তুমি জানই।একেবারে প্রথম দিন বলে আমি তাকে কিছু বলি না। তাছাড়া লোকটাকে কেন যেন ঘাঁটাতে মন চাইত না।
এরপর থেকে প্রায় আসতে লাগলো সফিক আমাদের বাসায়।বলি নি ওর বয়স বেশি না এই ধর ত্রিশ ট্রিশ হবে বোধহয়।আমি রিট্যারড পারসন,আমার খারাপ লাগত না।আড্ডা টাড্ডা দিতাম-আমার সময় ভালই কেটে যাচ্ছিল।কিন্তু তাঁর অভ্যাসের খুব একটা বদল এল না।নাকে রুমাল থাকতো সবসময়।কিছু বললেই বলত,'গন্ধ আসে নাকে...'ওর কাজের লোকটাও বলতো,'স্যারের সব ই ভাল,কিন্তু খালি গন্ধ গন্ধ করে-এইডাই ভাল লাগে না'আমার মেয়েটা ওর নাম দিল,গন্ধ বাতিক।
একদিন জিজ্ঞেস করেই বসলাম'বাবা,তোমার এই গন্ধ রোগের ব্যাপারটি একটু খোলাসা করবে?'এতে সফিক দেখি বেশ জুত হয়ে বসলো।খানিক্ষন নিরব হয়ে রইল,তারপর বলতে শুরু করল......
সফিকের কথা...
আমরা তখন মিরপুর ১৪ নম্বরে থাকি।আমরা মানে,আমি আর মা।মা কোয়াড্রিপ্লেজিয়ার পেশেন্ট,সারা শরীর প্যারালাইজড।সারাদিন শুয়ে থাকেন আর কিছুই করতে পারেন না।নিজের এই শারীরিক অক্ষমতার বিষয়টা তিনি খুব একটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেননি।তাই হয়ে উঠেছিলেন খুব খিটখিটে মেজাজের।সারাদিন হইচই,অভাব অভিযোগ।ঘরে দুই দণ্ড থাকা যেত না।তাছারা কিছু পারিবারিক ব্যাপার ছিল-বাবা মারা যাবার পর চাচারা জাল উইল করে তাঁর সব সম্পত্তি নিজেদের নামে করে নেন,আমরা হয়ে যাই পথের ফকির।এদিকে আমার কোন চাকরী বাকরি হচ্ছিল না,একের পর এক ইন্টার্ভিউ দিচ্ছিলাম শুধু।কাজের নামে লবডঙ্কা।হতাশ হয়ে পরছিলাম ক্রমশ।
সেদিন একটি ইন্টার্ভিউ ছিল,দিয়ে বেরোবার মুখে শুনি,আগেই নাকি সব সিলেকশন হয়ে আছে।এখন সব লোক দেখান,ভাওতাবাজি।মাথা গরম হয়ে গেল,বাসায় চলে আসি।কিন্ত এদিকে মার নিত্যকার ঝামেলা,
আমায় মেরে ফেল-আমি বেচে থেকে কি করব-জামাই একটা আগে আগে ভেগেছে আমায় ভোগান্তির জন্য ফেলে রেখেছে-ছেলে একটা জন্ম দিয়েছি কুলাঙ্গার, কোন কাজের না...
আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়,কি যে হয়- হুট করে উঠে মার রুমে যাই,পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা বালিশ নিয়ে মুখের উপর চেপে ধরি,গায়ের সব জোড় দিয়ে।মা কিচ্ছু করতে পারেন না।সারা শরীরই তো অবশ।
হঠাৎ করে মনে হয় কি করছি আমি?আমার মাংসপেশি শিথিল হয়ে আসে। তাড়াতাড়ি বালিশ সরাই মায়ের মুখ থেকে।মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি কেমন শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন,একটা কথাও বললেন না।শুধু চোখের কোল গড়িয়ে জল পরছিল।সেদিন থেকে মা আর আমার সাথে কথা বলেন না।কেমন যেন শান্ত হয়ে যান তিনি।
এর প্রায় তিন দিন পর ছোট মামা বাসায় আসেন।ঘরে ঢুকেই বলেন,'কি রে এত দুর্গন্ধ কেন?ইদুর মরল নাকি কোথাও?'আমি কিছু বলি না,চুপ করে বিছানায় এসে বসি।মামা মার খোঁজে ভেতর ঘরে যান...
তারপর অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে,মামার চিৎকার,বাসা ভরতি লোকজন।সাদা এপ্রন পরা কয়েকজন লোক ভেতর ঘর থেকে স্ট্রেচারে করে মাকে নিয়ে যায় যেন কোথায়।
আমি কিছু বলি না,মার দিকে তাকাই।দেখি মা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে।তখন ই কোথা থেকে যেন একটা বোটকা গন্ধ এসে আমার নাকে ধাক্কা দিল, মাথাটা বোঁ করে চক্কর দিয়ে উঠল।
সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই গন্ধ আমার নিত্য সঙ্গি।
******
এই বলেই সফিক চুপ মেরে গেল।
যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলাম।কিছু বলার সাহস হচ্ছিল না।এমন একটা ক্রিমিনাল আমার পাশে বসে,ভাবতেই রোমগুল খারা হয়ে গেল।
এর দিন দুইয়েক পর দেখি তাঁর ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে।কোথায় গেল কিছুই বুঝলাম না।কিন্তু আপদ বিদেয় হল এই ভেবে শান্তি পাচ্ছিলাম।
সফিকের কথা প্রায় ভুলেই বসেছিলাম।কিন্তু এইত সেদিন এক ভদ্রলোক এলেন,নিজেকে সফিকের বড় ভাই পরিচয় দিলেন।আমি অবাক,'সফিকের কোন বড় ভাই আছে বলে তো শুনি নি?'ভদ্রলোক অবাক হন না।আমাদের বাসায় এসে বসেন।আমার মুখ থেকে সফিকের বলা গল্প শনেন।ম্লান হেসে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেতে চান।পানি খেয়ে শোনান একেবারে বিচিত্র এক গল্প...
'সফিক schizofrenia'র পেশেন্ট।
চাকরি বাকরি হচ্ছিল না দেখে ডিপ্রেশনে ভুগত। তারপর হঠাৎ করেই কেমন বদলে যেতে থাকল। অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করা শুরু করল, প্রায়ই নাকে রুমাল চেপে বসে থাকতো,তাঁর নাকে নাকি বোটকা গন্ধ আসে।মাকে মেরে ফেলার অনুশোচনায় ভুগতো সারাদিন।মনগড়া গল্প করতো,অথচ আমাদের মা ছোট বেলায় মারা যান,রোড একক্সিডেন্টে, চাচারাই আমাদের মানুষ করে তোলেন।'
সফিক কোথায় জানতে চাইলে ভদ্রলোক বলেন,' অ্যাসাইলামে আছে।সরকার চাচা সেদিন হঠাৎ ফোন করে বলে,সফিক নাকি আবার পাগলাম শুরু করেছে'।
'বুঝলে বাবা,ছেলেটার জন্যে বড় কষ্ট হয় মাঝে মাঝে'- একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন রহমান সাহেব।
দীর্ঘ গল্প করে তিনি আমাদের বাসা থেকে বের হন।
কিন্তু শফিকুল ইসলাম আমার মাথায় থেকে যান এরপরও।
তাকে একবার দেখার ইচ্ছে আমার এখনো আছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now