বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ঘরছুটি
আবুল ফাতাহ
_____________
ঘরটার জানালা খোলা। জানালাটা বেশ বড়, বড় বলেই
হুড়মুড়িয়ে বাতাস আসছে। জানালায় ঝোলানো
ধবধবে পর্দাটা তির তির করে কাঁপছে, দুলছে।
কখনো বাতাসের ঝাপটা বাড়লে নাড়িয়ে দিচ্ছে
টেবিল ক্লথ, বিছানার চাদরটা, বিছানায় নিঃসার শুয়ে থাকা
তিথির জামার আস্তিনটাও।
তিথি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রুমটা দেখছে, যেন
আজই প্রথম এল। রুমের সব কিছুই সাদা। সাদা জিনিস
পুরনো হলে লালচে হয়ে যায় অথবা ধোয়ার
সময় নীলের কারণে নীলচে আভা চলে
আসে। কিন্তু এই রুমের প্রতিটা জিনিসই দুধ সাদা।
কারণটা বের করতে পারল না তিথি।
সাদা পবিত্রতার প্রতীক- এই কারণে অথবা
কোনো এক অজানা কারণে আজ তিথির মন খুবই
ভাল। এত ভাল শেষ কবে কিংবা আদৌ ছিল কিনা মনে
পড়ছে না। ওর মন ভাল থাকার সমস্যা হল মন ভাল
থাকলেই ওর আর ঘরে থাকতে ইচ্ছে করে না।
ছোটবেলায়... এখনই বা বড়বেলা কই? মাত্র
তেইশ বছরে আবার কেউ বড় হয় নাকি! আরো
ছোট্টবেলা যখন, তখন স্কুল পালানোয় বিশেষ
নামডাক ছিল ওর। দেয়াল টপকে, দারোয়ান চাচাকে
ভুজুংভাজুং দিয়ে কি পেট ব্যথার অজুহাত- ওকে
আটকে রাখার ছিল দুঃসাধ্য। শুধু স্কুল না, মন ভাল
থাকলে বাড়ি থেকেও পালাত। অদ্ভুত ব্যাপার হল,
বাড়ি থেকে পালিয়ে ও স্কুলেই চলে আসত।
যদিও প্রায় সময়ই স্কুল তখন ছুটি হয়ে যেত।
স্কুলের বিশাল মাঠটার কোণে নজরুলের চুলের
মত যে ঝাঁকড়া বট গাছটা আছে ওটার নিচে গিয়ে
চুপচাপ বসে থাকত।
প্রথমদিকে পালানোটা মন ভাল থাকার সাথে সম্পৃক্ত
থাকলেও একপর্যায়ে সেটা মন খারাপের সময়ও
ঘটতে লাগল। তিথি এই ঘর পালানোর একটা নাম
দিয়েছে- 'ঘরছুটি'।
অভিজ্ঞতা থেকে তিথি জানে একা একা পালিয়ে
আনন্দ নেই। পালাতে হলে সঙ্গী লাগে। আজও
পালাতে হবে। একজনকে প্রয়োজন; বিশেষ
একজন। কাজটা বেশ কঠিন হবে তবুও তিথির কিছু
করার নেই। বহুদিন পর আজ ঘরছুটির ডাক এসেছে,
নিয়তি অবশ্যাম্ভী।
তিথি কাঁপাকাঁপা হাত বাড়িয়ে দিল বেডসাইডে রাখা
ফোনটার দিকে।
দুই
বিশাল নিরানন্দ ভবনটার বাইরে এসেই খিলখিল হাসিতে
ফেটে পড়ল তিথি।
রাত হয়েছে বেশ। মানুষজন ঘরে ফেরার পাঁয়তারা
কষছে। সবাই ব্যস্ত, ওদের দিকে নজর,
মনোযোগ কোনটাই দেবার মত পর্যাপ্ত সময়
নেই। তবুও কাছাকাছি দু'একজন তিথির হাসিতে বিরক্তি
ও কৌতূহলের মিলমিশ অনুভূতি নিয়ে ফিরে তাকাল।
'শশশ...' মুখে আঙুল চাপা দিয়ে ওকে নীরব
চোখ রাঙানি দিল জাহিদ। 'তুমি কি পাগল? এত রাতে
কেউ এমন পাগলামি করে?'
তিথি হাসি থামাল। 'রাত কম হলে কি পাগলামি করা যায়?'
বড় বড় চোখে নিষ্পাপ চাউনি।
জাহিদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তিথির দিকে। এ
ক'দিনে খুব বেশি বদলায়নি মেয়েটা। অসুখের
কারণে খানিকটা শুকিয়েছে, চোখদুটো স্বাভাবিক
নিয়মে প্রাণহীন হবার কথা থাকলেও উজ্জ্বলতা
বেড়েছে বরং। আটপৌড়ে সালোয়ার কামিজেও কি
অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে! এই
সৌন্দর্যের মধ্যে কিছু একটা আছে। কামনা জাগায় না,
মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে
হয়।
'কেমন আছো, তিথি?'
'বেঁচেই তো আছি মনে হচ্ছে।' জাহিদের
মুখটাকে আমসি হয়ে যেতে দেখে আবার
খিলখিল করে হেসে উঠল তিথি। 'মন খারাপ
কোরো না, আমি ভাল আছি। নইলে কি আর রাত
বিরেতে এডভেঞ্চারে বেরোই?!'
জাহিদ বিশ্বাস করল না।
'চলো।' বাচ্চা মেয়েদের মত তাড়া দিল তিথি।
'কোথায়?'
'আমি বিরিয়ানী খাব।'
'এত রাতে?'
'মোটেও এত রাত না। মাত্র এগারোটা বাজে।'
'কিন্তু তুমি তো বলেছিলে শুধু বাইরে
দশমিনিটের জন্য বের হবে।'
'মিথ্যে বলেছি। এখন আমরা বিরিয়ানী খেতে
যাব। এরপর রাস্তার পাশের টং দোকানে দাঁড়িয়ে
গরুর দুধের মালাই চা খাব... আচ্ছা কুদ্দুস চাচার সেই
দোকানটা আছে এখনও?'
'তিথি, পাগলামি কোরো না। চলো ফিরে যাই।'
'এরপর সারারাত আমরা হাত ধরাধরি করে রাস্তায় রাস্তায়
ঘুরব।' তিথি জাহিদের কথা শুনতে পেয়েছে
বলে মনে হল না।
'তিথি তোমার এখন বিশ্রাম দরকার।'
এবারও গ্রাহ্য করল না তিথি। 'আচ্ছা, আমার হাত
ধরলে তোমার বউ কি রাগ করবে?'
'কোথায় বিরিয়ানী খেতে যাবে?' জাহিদ তড়িঘড়ি
বলে ওঠে।
তিথি তৃতীয়বারের মত কাচভাঙা আওয়াজে হেসে
উঠল।
রাত এখন প্রায় বারোটা। বিরিয়ানী খাওয়া হয়েছে।
মালাই চা পাওয়া যায়নি, কনডেন্সড মিল্ক দিয়েই কাজ
চালাতে হয়েছে। এখন রাস্তা ধরে হাঁটছে তিথি
আর জাহিদ। তিথির আটপৌরে কামিজের কানাটা পাগলা
বাতাসে উড়োউড়ি করছে। ওড়নাটা হয়েছে
আরো বেয়াড়া। সামান্য পেছনে গোমড়ামুখে
হেঁটে আসা জাহিদের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার।
দুজনের কেউই চাইছে না ওড়নার বেয়াড়াপনা বন্ধ
হোক। যদিও জাহিদের ভাললাগাটা অস্বস্তিকর।
ব্যাপারটার নৈতিকতা নিয়ে মনে খচখচে কী একটা
যেন জ্বালাচ্ছে বড়।
'উর্মি কেমন আছে, জাহিদ?' নীরবতা ভাঙল।
'আমরা কখন ফিরব?' জাহিদ এদিক ওদিক তাকায়। রাত
আরো গভীর হয়েছে। লোকজনের দৃষ্টিতে
এখন সন্দেহ।
'ভোর হলে।' বিরতি 'তুমি তোমার বউয়ের
ব্যাপারে কথা বলতে না চাইলে বলে দিতে
পারো, কথা ঘুরাতে হবে না।' পেছনে না
তাকিয়েই বলল তিথি।
'চাচ্ছি না।'
তিথি জবাব দিল না।
'উর্মি ভাল আছে।'
হেসে উঠল তিথি। এবার মৃদু আওয়াজে, চাপা যন্ত্রণা
আছে তাতে।
জাহিদ স্পষ্ট বুঝতে পারছে তিথির প্রচন্ড কষ্ট
হচ্ছে হাঁটতে। কিন্তু ও এটাও জানে, কথাটা কখনই
স্বীকার করবে না এই অদ্ভুত মেয়ে।
'আমার কথা বলেছ ওকে?'
'হ্যাঁ, বিয়ের আগেই।'
কী বলেছ?'
'বলেছি, আমার এক খুব ভাল বন্ধু আছে, নাম-
তিথি।'
'তিথির সাথে যে তিন বছর প্রেম করেছ সেটা
বলোনি?'
জাহিদ নীরব রইল এক মুহূর্ত।
'বলেছি।'
'শুনে কী বলল?'
'তোমার শুনতে হবে না।'
'আমি শুনব।' সিদ্ধান্ত জানাল তিথি।
'বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উর্মি বলেছিল,
"তোমাদের মধ্যে কি কিছু হয়েছিল?"
'কিছু মানে?'
'কিছু না।'
'ফিজিক্যাল রিলেশন?'
জাহিদ চুপ করে রইল।
'তুমি কী বললে?'
'আশ্চর্য, তিথি, আমি কী বলব তুমি জানো না?'
'না, জানি না।'
জাহিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তিথির দিকে। তিথি
ফিক করে হেসে ফেলল।
'তুমি আগের মতই গাধা আছ। সেন্স অফ হিউমার
বলতে কিস্যু নেই!'
জাহিদ হেসে মাথা নাড়ল; সম্মতিসূচক।
'তিথি, চলো রিকশা নেই।'
'কেন তোমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে?'
তিথির গলায় রসিকতার ছোঁয়া উপেক্ষা করল জাহিদ।
'হ্যাঁ।'
'রিকশা নেয়া যাবে না।'
'ঠিকআছে, চলো তোমাকে দিয়ে আসি।'
'আচ্ছা, তোমার বউকে এটা বলোনি যে তুমি
আমার সাথে কী বেঈমানি করেছ?'
'তিথি, তুমি কি আমাকে অপমান করার জন্য
ডেকেছ?'
'না তো, অপমান করতে চাইলে তো ফোনেই
করতে পারতাম, শুধু শুধু ডেকে আনতে যাব
কেন?!'
জাহিদ দাঁড়িয়ে পড়ল।
'কী হল, রাগ করেছ?' তিথিও দু'পা
পা এগিয়ে থেমে দাঁড়াল।
'তিথি, আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।'
'খুব খারাপ, বউকে বলবে প্রতিদিন রাতে একগ্লাস
গরম দুধ দিতে।'
'তিথি, প্লিজ, একটু তো সিরিয়াস হও। আমাদের
বিয়ের পর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত আমি ভেতরে
ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছি। তীব্র অপরাধবোধ
আমাকে ঘুমাতে দেয় না। তিথি, আমি অনেক বড়
অন্যায় করে ফেলেছি। আমাকে তুমি মাফ করে
দাও।'
তিথি চোখ রাখল জাহিদের চোখে। তাতে
কোনো ভাব-অনুভূতি নেই।
'সত্যি বলতে, তুমি কোনো অন্যায় করোনি,
জাহিদ। যেদিন ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ডাক্তাররা আমার
সময় বেঁধে দিল আমি তো আসলে সেদিনই
মরে গেছি। একজন মরা মানুষের সাথে
জীবনটাকে বেঁধে ফেলার তো কোনো
মানে হয় না, তাই না? কিন্তু দুঃখটা কোথায় জানো?
তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে ধরে রাখব।
একবারও আমাকে জানাবার প্রয়োজন মনে করনি।
লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেললে। আমাকে
জানালে উর্মির মত ধনী বাপের একমাত্র কন্যাকে
পায়ে ঠেলার মত বোকামি আমি তোমাকে
করতে বলতাম, বল?'
'তিথি, আমাকে মাফ করে দাও, আমি...' কাঁপা গলায়
কথা আর এগোয় না।
'তোমার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই তবে
অপ্রাপ্তি আছে একটা।'
মাথা তুলল জাহিদ। 'কী, বলো না আমাকে?'
'একবার চুমু দেবে আমাকে?'
'ক..কীহ!'
'খুব বেশি অনৈতিক কিছু চেয়ে ফেললাম?' স্মিত
হাসল তিথি। 'আচ্ছা থাক। আমাকে হাসপাতালে রেখে
তুমি চলে যেও। আর কখনও ডাকব না তোমাকে।
সে সুযোগও বোধহয় আমি পাব না। শরীরটা খুবই
ভেঙে পড়েছে ইদানিং।' আর দাঁড়াল না তিথি। ঘুরে
হাঁটতে শুরু করল।
জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। তিথি ধীরে ধীরে
এগিয়ে যাচ্ছে। জাহিদের মনে হল ওর আত্মাটাই
যেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
জাহিদ পেছন থেকে ডেকে উঠল।
'তিথি!'
তিথি থমকে দাঁড়াল।
জাহিদ ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে
জাহিদকে আসতে দেখেই তিথির বুকে কাঁপন
উঠল। রাস্তাটা নির্জন। জাহিদ কি সত্যিই ওকে চুমু
খাবে? তিন বছরের ভালবাসায় যে সাহস ছেলেটা
করে উঠতে পারেনি এক বছরের বিবাহিত
জীবনে সে সাহস কি অর্জন করতে
পেরেছে জাহিদ? নাকি মৃত্যুপথযাত্রী এক নিঃসঙ্গ
মেয়ের জীবনের শেষ আশা পূরণের এক
দুঃসাহসিক প্রয়াস এটা?
তিথি চোখে মুখে চাপা উত্তেজনা নিয়ে দাঁড়িয়ে
রইল। জাহিদ এগিয়ে আসছে, আসছে....
ঠিক তখনই তিথির মাথার ভেতর তীব্র ব্যথা শুরু হল।
এ ব্যথা ব্যাখাতীত, সংজ্ঞাহীন, অবর্ণনীয়।
ভেতরে যেন দাপাদাপি করছে কোনো
নারকীয় পশু। তার দেহ থেকে ছিটকে
বেরোনো মরণবিষে মাথাটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে
যাচ্ছে ওর। সারাদেহে বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে
পড়ছে সেই যন্ত্রণা। শরীর কাঁপতে লাগল তিথির,
কুঁকড়ে যেতে লাগল। তিথি তখনও তাকিয়ে আছে
জাহিদের দিকে। জাহিদ এগিয়ে আসছে সেই
সাথে ওর দেহের অংশগুলো অদৃশ্য হয়ে
যাচ্ছে। ওর চোখের সামনে থেকে ধীরে
ধীরে অপার্থিব কোনো ইরেজার দিয়ে যেন
মুছে ফেলা হচ্ছে জাহিদকে। তিথি উপলব্ধি করল
এপর্যন্ত আসতে আসতে পুরোপুরি হারিয়ে
যাবে জাহিদ।
সব ভুলে সর্বস্ব দিয়ে চিৎকার করে উঠল তিথি,
'জাহিদ! যেও না তুমি, যেও না...'
ওর সে আর্তনাদ জাহিদের কানে গেল কি?
হয়ত।
পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার আগে জাহিদের চোখে
অতৃপ্তি দেখেছে তিথি, সত্যিই দেখেছে।
ওকে না পাবার অতৃপ্তি।
তিথি আজই প্রথম জানল, কখনও কখনও কারো
অতৃপ্তি কারো জন্য তৃপ্তির কারণ হতে পারে।
তিথির মুখে তখন তৃপ্তির হাসি।
তিন
ডাক্তার এহসান প্রবল দুঃখবোধ নিয়ে তাকিয়ে
আছেন বেডে শুয়ে থাকা নিঃসার দেহটার দিকে।
মেয়েটার জন্য মায়া পড়ে গেছে উপলব্ধি করে
একই সাথে তার দু'রকম অনুভূতি হল। দীর্ঘ
পেশাগত জীবনে এই প্রথম কোনো
রোগীর মৃত্যু তার বুকের কোথাও হাহাকার
তুলছে। ব্যাপারটা তাকে অবাকও করল।
প্রায় দু'মাস ধরে মেয়েটা এই হাসপাতালে আছে।
এক বছর আগে ক্যান্সার ধরা পড়ে ওর। শেষের
দিকে শারীরিক পরিস্থিতি বাড়াবাড়ি রকম খারাপ হয়ে
ওঠায় ওকে হাসপাতালে নিয়ে আসে ওর পরিবার।
কিন্তু সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে আস্তে
আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছিল ও। ডা. এহসান
ভেবেছিলেন মেয়েটা বোধহয় এত তাড়াতাড়ি
যাচ্ছে না পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। কিন্তু বুড়ো
পৃথিবীর মায়াও কমে গেছে আজকাল।
মেয়েটাকে ধরে রাখতে পারেনি।
ডা. এহসান রুমে ঢুকেই একটা ব্যাপার দেখে অবাক
হয়েছেন। মেয়েটা শেষমুহূর্তে কেন যেন
বেড সাইডে রাখা টেবিলের দিকে হাত
বাড়িয়েছিল। কিছু একটা ধরার আশায়। আঙুলগুলো
ছড়িয়ে রয়েছে। সম্ভবত হ্যালুসিনেশন হয়েছিল
মৃত্যুর আগে। তবে সান্ত্বনা, সেটা ভাল কিছুই
হবে। কারণ মেয়েটা মরার আগে তৃপ্তি নিয়ে
মরতে পেরেছে। তার প্রশান্ত চোখ মুখ তারই
সাক্ষ্য দিচ্ছে। নিষ্পাপ চেহারায় বিভীষিকাময় মৃত্যুর
ছাপ নেই বরং ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির এক
টুকরো হাসির আভাস।
পুনশ্চ
আচমকা ঘুম ভেঙে গেল জাহিদের। বুকটা ঘুমের
মধ্যেই মোচড় দিয়ে উঠেছে, ধড়ফড় করছে
এখন।
জাহিদ উঠে বসল। এমনটা কেন হচ্ছে জানে না।
তবে এটুকু মনে পড়ছে বাবা মারা যাবার সময় এমন
একটা অনুভূতি হয়েছিল ওর, যদিও মৃত্যুসংবাদটা ও
পেয়েছিল আরো পরে। আপনজনদের মধ্যে
বোধহয় অদৃশ্য সুতার এক বন্ধন তৈরি হয়ে যায়।
সে সুতোয় টান পড়লেই বুকটা হু হু করে ওঠে।
ওর কোনো প্রিয়জনের কি ক্ষতি হল তবে?
অনেক ভেবেও এমন কারো কথা মনে পড়ল না
ওর। মা পাশের ঘরেই ঘুমাচ্ছে। আর এই মুহূর্তে
ওর সবচাইতে প্রিয়জন তো ওর পাশেই শুয়ে।
উর্মির দিকে তাকাল জাহিদ। ডিমলাইটের মৃদু নীল
আলোয় মেয়েটার রূপ যেন আরো বেড়ে
গেছে। জাহিদ আলতো করে একটা চুমু খেল
ঘুমন্ত স্ত্রীর কপালে। এরপর পরম নিশ্চিন্তে
উর্মিকে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তলিয়ে
গেল ঘুমে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now