বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ছোট্ট একটা হাত আবির ওর চোখের সামনে দেখতে পায়। আনমনেই মুখে হাসি ফুঁটে উঠে ওর। হাতটা ধরেই আবির বিছানায় উঠে, শুয়ে পরে। পাশাপাশি বালিশে দুজন শুয়ে আছে। নিশ্চুপ আবির পিচ্চি নীলিমার হাসি দেখছে। যখন থেকে পরে গেছে সে, তখন থেকেই হাসার শুরু। একটু একটু করে হাসি বাড়তেই আছে। একপর্যায়ে শুয়া থেকে উঠে বসে হাসতে থাকতে। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেছিল বোধ হয়, তাই ওমাগো করে পেটে হাত দিয়ে মাঝখানে বিরতি নিয়েছিল। এখন আবার হাসার শুরু করছে। হাসতে হাসতে পাশে রাখা কোলবালিশ জড়িয়ে ধরছে আর বলছে- ওমাগো! এতবড় হয়েও পরে যায়….!!! চুপ করো! ভদ্রতার রেশ মাত্র নেই ভেতরে। কারো বিপদ থেকে মানুষ হাসে??? অনেকটা ধমকের স্বরেই কথাটা বলে আবির। চুপ হয়ে যায় নীলিমা। অভিমানে নাক, গালটা ফুলে গেছে নীলিমার। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বিছানা থেকে উঠে চলে যায় সে। প্রথমে আবির ভাবছে হয়তো ওয়াশরুমে গেছে কিন্তু ২৫ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন নীলিমা ফিরেনি তখন শুয়া থেকে উঠে, কি করছে নীলিমা এটা দেখার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াই। নিশ্চুপ নীলিমাকে ওয়াশরুমের ঠিক পাশেই মাথা নিচু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। কাছে যায় আবির। ঠোঁট বাকিয়ে বালিকা নিঃশব্দে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে নীলিমা, সাথে নখ দিয়ে নখও কাটছে। মৃদু হেসে কাছে যায় আবির। অনেক দিন হলো পিচ্চিদের কান্না দেখে না, আজ সেই কান্না দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে পিচ্চির ঠোঁট বাকানো কান্না দেখতে। আর তাইতো আদর করে কাছে টানার পরিবর্তে ধমক দেয় আবির- কত করে বলছি নখ দিয়ে নখ কাটবে না, তারপরও এরকম করছ।আমার কথা কি কানে যায় না? কেঁপে উঠে নীলিমা। ছোট বাচ্চাদের মতই মাথা উঁচু অবস্থায় থেকে’ই চোখটা ঘুরিয়ে আবিরের দিকে নেয়। আবিরের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে আবার নখ কাটায় ব্যস্ত হয়ে পরে নীলিমা, সেই সাথে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে কান্না। এক টানে বুকে নিয়ে আসে আবির নীলিমাকে। পিঠে, মাথায় হাত বুলাতে থাকে। আদর পেয়ে থামার পরিবর্তে আহ্লাদী আরো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। দিনগুলো এভাবেই কাটছিল হাসি আনন্দে, দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটিতে। সেদিন ছিল বুধবার___ নীলিমার মনটা প্রচন্ড খারাপ। কারণ, পরদিনই ওর স্কুলের শেষ দিন। অথচ ও যেতে পারছে না। নীলিমাদের ব্যাচের বিদায়ী অনুষ্ঠান। যেহেতু বিদায় অনুষ্ঠানটা ফেব্রুয়ারির ২১তারিখ স্থির হয়েছে, তাই সব মেয়েরা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল সবাই মিলে একই রঙের শাঁড়ি, চুড়ি আর চুলগুলো খোঁপা করে তার সাথে বেলীর মালা পরে স্কুলে সমবেত হবে। নীলিমার মন খারাপ কারন একদিকে ও ঢাকায় আছে, অন্যদিকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ও যেতে পারবে না। কারণ, আবিরের কলেজে নাকি কি পরীক্ষা চলছে। আর না যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ, ও শাঁড়ি পরতে পারে না। ও বাড়িতে আবিরের বোন আদিবা পরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখানে তো তেমন কেউ নেই। মন খারাপ করে নীলিমা যখন সোফায় বসে তখন তার পাশে এসে আবির বসল। মন খারাপ??? মাথা নাড়ে নীলিমা। প্রশ্ন করে আবির, মন খারাপের কারণটা কি জানা যাবে? নীলিমা জানায়, কালকে বিদায় অনুষ্ঠান হবে আমাদের স্কুলে অথচ আমি যেতে পারব না। প্রশ্ন করে আবির, যেতে পারবে না মানে? স্কুলের শেষ দিন আর তুমি যাবে না?! কেন??? জবাব আসে, আপনার স্কুলে পরীক্ষা। কালতো ১১টার সময় অনুষ্ঠান শুরু হবে। পরীক্ষা শেষ। মন খারাপের কিছু নেই, গাড়ি আছে তো! তো আর সমস্যা কী? সকাল সকাল আমরা রওয়ানা দিয়ে দিব। —তারপরও যেতে পারব না।(নীলিমা) —- কেন?(আবির) —– ওরা সবাই লাল সবুজের শাঁড়ি, লাল চুড়ি, খোপায় বেলীর মালা পরে আসবে।আমার তো আর ওদের মত এতকিছু নেই।(নীলিমা) বোকা মেয়ে! এই জন্য কেউ মন খারাপ করে? আবির বসে থেকেই ফোন করে ফোন করে ওর বন্ধুর কাছে। বন্ধুকে নীলিমার শাঁড়ি, চুড়ি আর বেলী ফুলের মালার কথা বলে ফোনটা রেখে নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে। ব্যস! বন্ধুকে বলে দিয়েছি। ও নিয়ে আসবে। যেহেতু ও তোমাকে দেখেছে তাই ঠিকঠাক মাপেই সবকিছু কিনবে, কোনো সমস্যা হবে না। এখন চলো তো! খিদে পেয়েছে খুব! আবির-নীলিমা খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে বসে থেকে, আসর নামাজটাও আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু বন্ধুর ফেরার কোনো নাম নেই। আবির ফোন করে বন্ধুকে। জিজ্ঞেস করে, কিরে! শাঁড়ি কি তৈরি করে আনছিস নাকি? এত দেরী কেন হচ্ছে? উত্তর দেয় জোবায়ের, ঠিক’ই ধরেছিস। তৈরি’ই করছি, তাই লেইট হচ্ছে। তবে সেটা শাঁড়ি নয় ব্লাউজ। মেচিং করে কাপড় কিনে বানিয়ে তবেই ফিরছি। “এইরে! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। বলেই জিহ্বায় কামড় দেয় আবির।” সন্ধ্যা ৭টায় জোবায়ের শাঁড়ি, চুঁড়ি, বেলির মালা, সেফ্টিপিন আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস আবিরের বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়। রাত্রি ১০টার দিকে খাওয়া দাওয়া করে একটু শুয়েছিল আবির। তখন’ই ডাক দেয় নীলিমা। শুনছেন…..!!! আবির ফিরে তাকায় নীলিমার দিকে। কিছু বলবে? নীলিমা মাথা নিচু করে জবাব দেয়, আমি শাঁড়ি পরতে পারি না। বিছানায় উঠে বসে আবির, পরতে পারো না মানে? আমাদের বাসায় কিভাবে পরেছিলা? মন খারাপ করে জবাব দেয়, ঐটাতো আমি এমনিই পরেছি। পরে দেখলেন না পরে গিয়েছিলাম? তারপর আদিবা আপু পরিয়ে দিয়েছিল…… কিন্তু এখন তো ওরা নেই!(আবির) —- এজন্য’ই বলছিলাম দরকার নেই যাওয়ার। আমি না হয় পরে ১দিন গিয়ে এডমিট কার্ডটা নিয়ে আসব।(মন খারাপ করে নীলিমার জবাব) ধমক দেয় আবির! আবিরের ধমকে কেঁপে উঠে নীলিমা। —যাও শাঁড়ি নিয়ে আসো। কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি আলমারি থেকে শাঁড়ি বের করে আবিরের দিকে এগিয়ে দেয়। —– শুধু শাঁড়ি কেন? শাঁড়ির সাথে কি আর কিছু পরতে হয় না নাকি? এবারো নীলিমা তাড়াতাড়ি কাপড় বের করে এনে আবিরের সামনে দাঁড়ায়। আবির মুখে দুষ্টু হাসির রেখা টেনে বলে, ওগুলোও কি আমি পরিয়ে দিব নাকি? এভাবে এগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছ যে? লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে নীলিমা। মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে। নীলিমার লজ্জা পাওয়া দেখে আবির রসিকতার স্বরে বলে, ওহ! ম্যাডাম তাহলে চাচ্ছে আমি এগুলো পরিয়ে দেই! ওকে, দাও। আবির মুখে দুষ্টু হাসি নিয়ে হাত বাড়াতেই আবিরের হাত থেকে শাঁড়ি নিয়ে দৌঁড় দেয় নীলিমা। আবির হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মিনিট দশেক পর চেঞ্জ করে পরণে কোনো রকম শাঁড়িটা প্যাঁচিয়ে রুমে আসে নীলিমা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক ট্রাই করেও নীলিমা পারেনি ঠিক করে কুঁচি দিতে। না পেরে আয়নার দিকে রাগে চিরুনি ছুঁড়ে মারে। আড়চোখে সবটা দেখছিল আবির। স্মিতহাস্যে এবার বিছানা থেকে নেমে নীলিমার কাছে যায়। আয়নার ভিতর দিয়ে আবিরকে দেখতে পেয়ে মলিন মুখে ঘুরে তাকায় নীলিমা। আমাকে দাও, আমি পরিয়ে দিচ্ছি। হাসি আটকিয়ে অনেকটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবির কথাটা বলে। আহারে! মেয়েটা ঠিক আমার মতই, সহজ সরল বোকা সোকা। তাইতো দুষ্টু আবিরের এক কথায়’ই রাজি হয়ে যায়। এগিয়ে যায় আবিরের দিকে। সুন্দর করে কুঁচি তুলে নীলিমার দিকে তাকায়। বোকা নীলিমা কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন করে আবির, গুজে দেই??? নীলিমা মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” সূচক সম্মতি জানায়। আবিরের চোখে মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। কোনো কথা না বলেই কুঁচিগুলো গুজে দিতে দিতে আবির নীলিমার দিকে তাকিয়ে হাসি দেয়। কেঁপে উঠে নীলিমা, তারপরও আবিরের দিকে তাকিয়ে আবিরের সাথে তালমিলিয়ে হাসি দেয়। প্রশ্ন করে নীলিমা, হয়েছে? আবির লক্ষ করেছে লজ্জায় নীলিমার চোখ মুখ কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। বিষয়টা আবির এনজয় করছে। আর তাইতো নীলিমার প্রশ্নের উত্তরে বলেনি, হয়নি! সবেতো প্রস্তুতি ম্যাচ। আবির আবারো শাড়ি নিজ ইচ্ছাতে এলোমেলো করে শাঁড়িতে কুচি তুলতে থাকে। যতবার আবির কুচি গুজে দিচ্ছিল, ততবার’ই শিউরে উঠছিল নীলিমা। পরক্ষণে আবিরের সাথে তালমিলিয়ে অকারণেই হেসে উঠছিল সেও। এখনো হয়নি? অনেকটা হাফিয়ে উঠে কথাটা বলে নীলিমা। উত্তর দেয়, হ্যাঁ! এদিকটা হয়ে গেছে। এবার উপরে ঠিক করতে হবে। আঁচলটা দাও তো! নীলিমা আমতা আমতা করে বলে, মামামানে…..?!!! উত্তর দেয় আবির, সুন্দর করে ভাঁজ করে সেফ্টিপিনে আটকাতে হবে তো। না হলে তোমার বান্ধবীরা হাসাহাসি করবে না তোমাকে নিয়ে? দাও, দাও! দেখি, কিভাবে পরাবো সকালে। নীলিমা কিছু না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির নীলিমার শাঁড়ির আঁচল ভাঁজ করছে আর মুখটিপে হাসছে। আঁচলটা সেফ্টিপিন দিয়ে আটকানোর সময় আবিরের হাত নীলিমার ঘাড় স্পর্শ করলে নীলিমা কেঁপে উঠে। নজর এড়ায় না আবিরের। নীলিমাকে ছেড়ে দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকটা হিরোর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করে, সত্যি করে বলো তো এই যে কুচি তুলে গুজে দিলাম, আঁচল ঠিক করে দিলাম, এতে তোমার কেমন ফিল হয়েছে? মানে তোমার অনুভূতিটা জানতে চাইছি। নীলিমা মাথা তুলে আবিরের দিকে তাকায়। আবির উৎসুক দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় নীলিমার উত্তর, আআআপনি…… আবির খুশি হয়ে বলে, হ্যাঁ আমি….. আপনি আআমায়….. হ্যাঁ, বলো আমি তোমায়……. —- কাতুকুতু কেন দিছেন?(নীলিমা) ওরে, আমারে কেউ মাইরালা…!!! কথাটা বলেই ধপাস করে বিছানায় পরে যায় আবির…. যায় হোক! পরদিনও আবির নীলিমাকে নিজ হাতে শাঁড়ি, চুড়ি পরিয়ে দিয়ে খোঁপায় বেলীর মালা গুজে দেয়। সকাল ১০টা নাগাদ আবির নীলিমাকে নিয়ে নীলিমাদের বাসায় পৌঁছে। কোনো রকম কুশল বিনিময় করেই আবিরকে আবারো রওয়ানা দিতে হয়। নীলিমাদের বাসা থেকে স্কুল খুব কাছেই। ৭মিনিটের পায়ে হাটা রাস্তা। গাঁড়ি নিয়ে যাওয়াতে দু’মিনিটও লাগেনি। নীলিমার আসার পূর্বেই ওর বান্ধবীরা জমায়েত হয়ে গেছে স্কুলে। নীলিমাকে দেখে দুর থেকে একটা হাসি দেয় “তামান্না”। ও’ই প্রথম নীলিমা আসার খবরটা সবাইকে দেয়। খবর শুনে দৌঁড়ে আসে সবাই। এসেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় একটা মেয়ে। আসলে অনেকগুলো দিন পর বান্ধবীকে পেয়েছে তো তাই হয়তো চোখে জল এসে গেছে। ইতোমধ্যে গাড়ির চারিপাশে ভিড় জমে গেছে। স্কুলের সবচেয়ে সেরা ছাত্রী, সবার প্রাণের “নীলি” এসেছে, সেই সংবাদ শুনে ক্লাস সেভেন, এইটের বাচ্চারাও ছুটে আসে। কেউ কেউ তো দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে আর বলছে- নীলি আপা আইছে, আমাগো নীলি আপা আইছে….. মুহূর্তেই পুরো স্কুল কোলাহলে ছেয়ে যায়। ভিড় ঠেলে কাছে আসেন গ্রন্থাকারের শামীমা মেম। সালাম দিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে গল্প জুড়ে দেন ওনি। আজ অনেকগুলো দিন পর স্নেহের “নীলিমা”কে পেয়ে কথার বলার মাঝখানে চোখের জল ছেড়ে দেন ওনি। নীলিমাকে ওর সহপাঠী বন্ধুরা একরকম টেনে মঞ্চের কাছে নিয়ে যায়। নীলিমা বান্ধবীদের সাথে হাসি, আনন্দ, গল্পে মত্ত হয়ে যায়। অদূরে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আবির ওর ছোট্ট ডানাকাটা পরীটার প্রাণখোলা হাসি দেখছে। কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের চোখ যায় মাঠের শেষ প্রান্তে পলাশ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ও তার পাশের ভদ্রলোকটির দিকে। প্রশ্ন করেন ওনি- ” কে ওনি?” ছেলে- মেয়েরা নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা উঠে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে প্রশ্নোত্তরে বলে, স্যার! ওনি আমার সাথে এসেছেন। প্রধান শিক্ষক এতক্ষণে বুঝতে পারেন আসল ঘটনা। দপ্তরীকে ডেকে কিছুটা ধমকের স্বরে বলেন, “স্কুলের অতিথিকে যদি এভাবে দাঁড়িয়েই থাকতে হয় তাহলে আপনারা কিসের জন্য?” মাথা নিচু করে দপ্তরী হাফিজ উদ্দিন জনাব আবির সাহেবকে সসম্মানে অফিসে নিয়ে আসে। অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াত করবে অত্র বিদ্যালয়ে গর্ভ, বিদায়ী ছাত্রী “নীলিমা”। ইংরেজী স্যারের মাইকে ঘোষনা শুনে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় নীলিমা। যদিও সবসময় ও’ই শুরু করে কুরআন তেলওয়াত থেকে, তবে আজকে কেমন জানি লাগছে। ইতোমধ্যে মাইকে আরো একবার নীলিমাকে ডাকা হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে নীলিমা ও,প্রান্তে অতিথি আসনে বসে থাকা আবিরের দিকে তাকায়। আবির মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে নীলিমাকে তেলওয়াত করতে বলে। নীলিমা মঞ্চে উঠে তেলওয়াত শুরু করে। তেলওয়াত শেষ করে সোজা মাথা নিচু করে নিচে নেমে আসে সে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর আবিরের আসনের দিকে তাকায় নীলিমা। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আবির তখনো নীলিমার দিকে তাকিয়ে। মানপত্র পাঠ শুরুর আগে শহীদদের স্মরণে এবার একটা দেশাত্মবোধ গান নিয়ে আসছেন আমাদের অত্র স্কুলের বিদায়ী ছাত্রী “নিলীমা”। নীলিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এমনিতে এখনো হার্টভিট দ্রুত উঠানামা করছে, এখন আবার গানও গাইতে হবে ওনার সামনে। না, না! পারব না। নীলিমা হাত দিয়ে স্যার’কে ওর নাম না বলার বিনীত অনুরোধ করে। স্যার আবারো ঘোষনা করেন, নীলিমাকে অনুরোধ করা হচ্ছে মঞ্চে আসার। বাধ্য নীলিমা মঞ্চে যায়। মাইক হাতে নিয়ে বামে আবিরের দিকে তাকায়। আবির হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে। নীলিমা গায়- ” যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা, দেনা, তোরা দে….না….. সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দেনা….” সবাই করজোড়ে হাততালি দিয়ে নীলিমাকে অভিনন্দন জানায়। তারপর একে একে সকল কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। সবাইকে মিষ্টি বিতরণ শেষে আলাদা করে পরীক্ষার্থীদের হাতে সুন্দর করে মিষ্টি প্যাক করে দেয়া হয়। অফিস কক্ষে আবিরকেও যথাসাধ্য অতিথীর মর্যাদা দেয়া হয়। সবাইকে সালাম দিয়ে এডমিট কার্ড নিয়ে বিদায় হয় আবির ও নীলিমা। দেখতে দেখতে পরীক্ষা সন্নিকটে এসে যায়। আবির ওর কলেজ থেকে ৩দিনের ছুটি নিয়ে নীলিমাকে ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে পরীক্ষার যাবতীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে আসে। আসার আগে নীলিমার হাতে একটা ফোন দিয়ে আসে, যাতে করে জানতে পারে নীলিমা কখন কি করছে, কিভাবে পড়ছে? রাত্রিতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে এবং শেষ রাত্রিতে কল দিয়ে ঘুম থেকে তুলে আবির নীলিমাকে পড়তে বসাতো। পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট দেয়। আবিরের দেখাশুনা এবং নীলিমার মেধার জোড় ও আল্লাহর অশেষ রহমতে নীলিমা ভালো রেজাল্ট করে। পুরো বাংলাদেশ থেকে মেধাক্রমে নীলিমা প্রথম হয়। নীলিমাকে আবির ওর কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়। নীলিমাও এ নিয়ে আর কোনো বাকবিতণ্ডায় যায় নি। কারণ, ও শুনেছে আবিরের কলেজটা খুব নামকরা। অনেক বছরের সুনাম ও গৌরব রয়েছে কলেজটির। কলেজের প্রথম দিন’ই মিশুক নীলিমা ফ্রেন্ডস জুটিয়ে ফেলে। হিয়া নীলিমার বেস্ট ফ্রেন্ড সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। হিয়া ছাড়াও নীলিমার আছে আরো ৪,৫জন বান্ধবী। এরা একেকজন একেক গ্রুপের হলেও এদের সাথে নীলিমার রয়েছে আন্তরিকতা। নীলিমা সাইন্সের স্টুডেন্ট। তাই শুধুমাত্র বাংলা এবং ইংরেজী ক্লাসের সময় নীলিমা ওদের সাথে একত্রে বসতে পারত, আড্ডা দিতে পারত। সেদিন ছিল বোধবার….. আবিরের বাংলা ক্লাস। নীলিমা ও তার কমার্সের কিছু বন্ধুরা কর্ণারে দুটো বেঞ্চে বসে। সেদিন হিয়া আসেনি বিধায় নীলিমা ওদের সাথেই আড্ডা জুড়ে দেয়। আড্ডা দেয়ার একপর্যায়ে নীলিমাকে একটা বান্ধবী প্রশ্ন করে, কিরে! তোর না বাচ্চা হবে? তো পরীক্ষা করেছিস? নীলিমা শুকনো মুখে উত্তর দেয়, স্যারকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। রিপোর্ট নেগেটিভ আসল। নীলিমার বান্ধবীরা জেনে গিয়েছিল নীলিমা সহজ-সরল, বোকা-সোকা একটা মেয়ে। তাই ওরা ওকে নিয়ে একটা মজা করতে চাইল। আর এক্ষেত্রে নীলিমার বড় দুর্বলতা “বাচ্চা”। সেদিন নীলিমার হাতে ওরা একটা ঔষধ ধরিয়ে দেয়। বলে দেয়- “নীলি তোর বাচ্চা হবে যদি তুই স্যারের অজান্তে এই ঔষধটা স্যারের জন্য তৈরিকৃত স্যুপ কিংবা অন্য কিছুর সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দিতে পারিস।” বান্ধবীদের কথা শুনে নীলিমার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল। লাফিয়ে উঠে বলল, সত্যি বলছিস তোরা? এটা খাইয়ে দিলেই হয়ে যাবে? ওরা হাসি আটকিয়ে বলল, হুম! হয়ে যাবে….. তুই গোপনে খাইয়ে দিস। আর হ্যাঁ, রাত্রে ঔষধ খাওয়ার পর স্যারের রিয়েকশনটা কিন্তু আমাদের বলতে হবে…! না বললে কিন্তু বাচ্চা হবে না বলে দিলাম… নীলিমা হেসে বলে, আরে! এ নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি রাতেই ফোন করে জানাবো। স্কুল ছুটি শেষে আবিরের সাথে বাসায় চলে যায় নীলিমা। নীলিমার খুশি আর দেখে কে? বাসায় আসার পর থেকে একা একা শুয়ে হাসছে নীলিমা। আবির কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে না। সন্ধ্যায় নামাজের বিছানায় বসে হাসি, কুরআন তেলওয়াত করা থেকে উঠে হাসি, পরতে বসে হাসি, টিভি দেখতে বসে হাসি, রুমে আবিরের সামনে বসে রাতের খাবার খেতে গিয়ে ভাত মুখে নিয়ে হাসি। হাসতে হাসতে নীলিমার নাক দিয়ে ভাত বেরিয়ে আসে। ওমাগো, ঝাল লাগছে, পানি, পানি বলে চিৎকার করতে থাকে নীলিমা। পরীক্ষার খাতা দেখছিল আবির। বসা থেকে উঠে পানি আনার জন্য খাবার টেবিলে রাখা পানির জগটা আনার জন্য জগে হাত দিতেই থমকে যায় আবির। জগের ঠিক পাশেই আবির পাউডার জাতীয় কিছু দেখতে পায়। ঐটা হাতে নিয়েই আবির রুমে যায়। আবিরের হাতে বান্ধবীদের দেয়া ঔষধটা দেখে ভয়ে চুপসে যায় নীলিমা। আবিরের বলার আগেই বসা থেকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পরে। ধমকের স্বরে প্রশ্ন করে আবির- ” কি এটা? কে দিয়েছে তোমাকে?” নীলিমা কাঁপা গলায় জবাব দেয়, স্যা স্যা স্যাস্যার…. আমার কোনো দোষ নেই। ওরা আমায় দিয়েছে। ওরা কে? আর কি কারনে দিয়েছে? দ্বিগুন রেগে প্রশ্ন করে আবির। উত্তর দেয় নীলিমা- পপি, জোনাকি, ফাতেমা, ঝুমা… ওরা বলেছে আপনাকে এটা গোপনে স্যুপের সাথে খাইয়ে দিতে। তাহলে আপনি আমায় আদর করবেন। তবেই আমার বাচ্চা হবে। রাগে কাঁপতে থাকে আবির। ভেবেছিল, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ম্যাচিওরিটি’টা চলে আসবে, বুঝতে শিখবে নীলিমা। কিন্তু তার আর হলো কই? কলেজে উঠেও একের পর এক যা ঘটিয়ে চলছে আবিরের তাতে তো মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। অন্যদিন মাথা ঠান্ডা করলেও আজ আবির পারেনি নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে। তাইতো ঔষধ বাইরে ফেলে দিয়ে এসে নীলিমাকে ঝাঁঝালো গলায় কড়া কথা শুনিয়ে দেয়, সেই সাথে বলে দেই ওদের সাথে যেন আর কখনো না দেখি তোমাকে। নিশ্চুপ নীলিমা ভয়ে ভয়ে মাথা ঝাঁকায়। পরদিন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছে নীলিমা ওর ফ্রেন্ডদের। কিন্তু বাংলা ক্লাসের সময় ওরা ঝেঁকে বসে নীলিমার পাশে। কিরে রাতটা কেমন কাটলো? কিংবা কি হয়েছিলরে রাত্রে? একেকজনের একেক প্রশ্ন আর সেটা নিয়ে হাসাহাসি। নীলিমা উত্তরে কিছু বলার জন্য পিছনে ফিরতেই ক্লাসে আসে আবির। ক্লাসে ঢুকেই আবির নীলিমাকে পিছনে তাকানো অবস্থায় দেখতে পায়। রাগে ফুসতে থাকে আবির। এটা দেখে নীলিমার ভিতরটা কেঁপে উঠে। শুকিয়ে যায় গলা। আবির পড়া জিজ্ঞেস করলে সব গুলিয়ে ফেলে আবিরের লাল চোখ দেখে। বেঞ্চের উপর এক ঠ্যাংয়ে আবির নীলিমা ও তার পড়া না পারা বান্ধবীদের দাঁড় করিয়ে রাখে। প্রায় ১০মিনিট এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখছে, তবুও রাগ কমছিল না দেখে আবির সবগুলারে সামনে আনে। অতঃপর কান ধরে ১০০বার উঠাবসা করতে বসে। একবার কম হলে পরবর্তীতে দ্বিগুন শাস্তি এটা শুনে নীলিমা মনে মনে একদুই গুনতে থাকে আর উঠবস করতে থাকে। ক্লাস ভর্তি স্টুডেন্টসদের সামনে এভাবে কান ধরে উঠবস করা, ব্যাপারটা খুব লজ্জার। একশ বার কান ধরে উঠবস করেই নীলিমা ওর জায়গায় গিয়ে বসেছে যদিও অন্য মেয়েরা ২০বারের অধিক উঠবস করেনি। পাশেই ছেলেরা মিটমিট করে হাসছে আর ফিসফিস করে কথা বলছে, লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকা অবস্থা’ই নীলিমার চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু নিচে বইয়ের মাঝে পরে। মাথা নিচু অবস্থায়’ই নীলিমা এক হাত দিয়ে ভেঁজা চোখ মুছে নেয়। সেদিন আর কোনো ক্লাস না করে নিঃশব্দে নীলিমা কলেজ ত্যাগ করে। যে ছেলেরা পাশ থেকে ফিসফাস আর হাসাহাসি করছিল, সেই ছেলেদেরও আবির মাঠের মধ্যে দাঁড় করিয়ে প্রত্যককে একেক ঠ্যাংয়ে ১০টি করে, ২০ ঘা বসিয়ে দেয়। কলেজ ছুটির পর ছেলেরা এ নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নালিশ করে যায়। প্রিন্সিপাল স্যার আবিরকে ওনার কক্ষে ডেকে নেক্সট টাইম যাতে এরকম নালিশ না আসে সে ব্যাপারে হুশিয়ার করে দেন। রাগে গজগজ করে আবির বাসায় চলে যায়। নীলিমাকে ইচ্ছে করেই আবির নেয়নি। কিন্তু আশ্চর্য হলো তখন, যখন বাসায় গিয়ে দেখল নীলিমা তার আগেই বাসায় পৌঁছে গেছে। কলেজ ড্রেস চেঞ্জ না করেই বিছানার এককোণে বালিশ বুকে জড়িয়ে চুপটি করে চোখ বোজে আছে নীলিমা। কিচ্ছু বলেনি আবির। না ধমক, না চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে খাওয়ার কথা। নীলিমাও আবিরের আগমনের শব্দে চোখ টা যে বন্ধ করল, সেটা খুলল আবির সন্ধ্যার আগে বাহিরে চলে যাওয়ার পর। আবির বাহিরে চলে গেলে উঠে বসে নীলিমা। চোখের পাশে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর রেখা মুছে, ড্রেসটা চেঞ্জ করে নেয়। মাগরিবের আজান দিলে নামাজ পড়ে পড়তে বসে। রাত্রি ৮টার দিকে রাতের খাবারের জন্য রান্না বসানো হয়। আবির ফিরে আসে বাসায়। আজ আর কোনো পাগলামি করেনি নীলিমা। আবির আসার পর একবার শুধু তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। আবিরও কোনো কথা না বলে সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টসদের পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসে পরে। রাত্রি ১০টার দিকে টেবিলে খাবার পরিবেশন করে রুমে যায় নীলিমা। ধীর কন্ঠে আবিরকে জানায়- “টেবিলে খাবার দিয়ে আসছি, খেয়ে আসেন।” খাতাগুলো রেখে টেবিল থেকে একটা প্লেট নিয়ে সোফায় নীলিমার পাশে এসে বসে। ভাত মেখে নীলিমার মুখের দিকে এগিয়ে দিতেই, উঠে দাঁড়ায় নীলিমা। ” বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে হিয়াদের বাসা থেকে বিরিয়ানি খেয়ে আসছি। আমার দ্বারা আর আজকে খাওয়া সম্ভব না। আপনি খেয়ে নিন।” কথাটা বলেই বিছানায় একপাশে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে পরে নীলিমা। জবাবে কিছুই বলেনি আবির। শুধু সিক্ত নয়নে একবার নীলিমার দিকে তাকালো। তারপর প্লেটটা টেবিলে রেখে অন্যান্য খাবারগুলো ঢেকে রেখে কিচেনের লাইটটা অফ করে দেয়। চুপটি করে এসে বিছানায় শুয়ে পরে আবির। নীলিমার বিপরীতমুখী হয়ে শুয়ে চোখের জল ছেড়ে দেয়। মনে মনে বলতে থাকে, আমি ওকে এত বড় শাস্তি দিলাম? এ আমি কি করলাম? কিভাবে এটা করতে পারলাম? নিঃশব্দে গুমড়ে কেঁদে উঠে আবির। তারপর একটা সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। রাত্রে হাড় কাঁপানো জ্বর আসে নীলিমার। ছটফট নীলিমা কিছু না বলে নিঃশব্দে শুধু বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে। তারপর ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পরে। সকাল হয়ে গেছে। ফজর নামাজটাও পরেনি আবার এখনো শুয়ে আছে। রাগ করলে মানুষ এমন করে? নামাজ ছেড়ে দেয়??? প্রশ্নটা করেই নীলিমার হাত ধরে টান দেয় আবির। চমকে যায়। নীলিমার শরীরটা এতটাই গরম ছিল যে আবির তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে আনে। ” হায় আল্লাহ! এত গরম কেন এর শরীর?” কথাটা বলেই ঘুমন্ত নীলিমার কপালে হাত রাখে। আঁতকে উঠে আবির। পুরো শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে নীলিমার। এখন আমি কি করব? এত সকালে তো কোনো ফার্মেসীও খোলা পাব না। উপয়ান্তর না দেখে আবির ওর রুমাল ভিঁজিয়ে নীলিমার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে। নীলিমার শরীরের তাপমাত্রা এতটাই প্রকট ছিল যে ঐ তাপের প্রভাবে কপালে রুমাল দেয়া মাত্র’ই রুমাল গরম হয়ে যাচ্ছিল। ওমাগো, শরীরটা নাড়াতে পারছি না আমি, খুব ব্যাথা করছে, এসব বলে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করতে থাকে নীলিমা। ” আজ শুধু মাত্র আমার অবিবেচকের মত কাজের জন্য ওর এই অবস্থা হলো, কথাটা বলেই চোখের পানি ছেড়ে দেয় আবির।” সকাল ১০টায় ফার্মেসী থেকে ঔষধ আনিয়ে গরম ভাত তরকারী রান্না করে আবির নীলিমার পাশে এসে বসে। ধীর গলায় নীলিমাকে ডাকে। ” নীলিমা! শুনছো…. আর কত ঘুমোবে? সকাল হয়েছে। উঠে পরো এবার” নীলিমা তড়িগড়ি করে উঠে বসে বিছানায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে দিনের ১০টা নাকি রাত্রের নয়টা বাজে? শুকনো মুখে আবিরের জবাব, দিনের ১০টা। সকালের নামাজটা দু’জনেই ঘুমের জন্য মিস দিয়েছি। যায় হোক, পরে কাযা করে নিও। চলো এখন….. নীলিমা ওর ঘাড় থেকে আবিরের হাতটা ছাড়িয়ে দেয়। ” আপনি আমায় এভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন যে? আমি কি যেতে পারি না নাকি?” নরম স্বরে আবিরের জবাব, তোমার শরীরে জ্বর নীলিমা। পরে যেতে পারো। এখন কথা না বাড়িয়ে চলো তো….. আবির পিছন থেকে নীলিমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর নীলিমা আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছে। ওয়াশরুমে নিয়ে আবির নিজ হাতে নীলিমাকে ব্রাশ করিয়ে দিয়েছে, চোখে মুখে পানিরছিটা দিয়ে দিয়েছে। তারপর আবির ওর কাঁধে রাখা তোয়ালে দিয়ে ভেঁজা মুখটাও মুছে দিয়েছে। হন্যে হয়ে নীলিমা তখনো আবিরের চোখে মুখে কিছু একটা খুঁজে চলেছে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে নিজ হাতে আবির যখন নীলিমাকে খাইয়ে দিচ্ছিল, তখনো নীলিমা আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছিল। ট্যাবলেটের পাতা থেকে আবির যখন ট্যাবলেট বের করছিল তখন সেদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে দেয় নীলিমা। মনে মনে চিৎকার দিয়ে নীলিমা ওর ভেতরের সত্তাকে জানান দেয়, “নীলি! পেরেছিস তুই! তুই পেরেছিস…. যে চোখে একদিন তুই তোর জন্য ঘৃণা দেখতে পেয়েছিলি, আজ সেই চোখে’ই তোর জন্য ভালোবাসার অথৈ সাগর দেখতে পাচ্ছিস। তুই আসলেই পেরেছিস নীলি…..” সেদিনের পর থেকে নীলিমা পাল্টে যায়, ঘোর পাল্টে যায়। আগের সেই বাচ্চা, বাচ্চা ভাবটি আর ওর মধ্যে নেই। আগের মতো আর পাগলীও করে না। করেনা কারনে অকারনে আবিরকে জ্বালাতন। অতিবাহিত হয়ে গেল অনেকগুলো বছর। সেদিনের সেই ঘটনা, কলেজে কান ধরে উঠবস করানোর দিন আবির ওর নীলিকে হারিয়ে ফেলেছে, হারিয়ে ফেলেছে আগের সেই বাচ্চা নীলিকে। ওর নীলি এখন আর আগের মত হাসে না, বাচ্চাদের মত আসে না ছুটে ওর কাছে। কাজ থেকে টেনে নিয়ে বলে না, চলুন না! ডাক্তারের কাছে যায়। বাবুটার বয়স কত হয়েছে জেনে আসি। এখন আর কেউ চশমা চুরি করে নিজ চোখে দিয়ে রাখে না। সর্বোপরি, আবির এখন আর কাউকে ধমকাতে পারে না। পারবে কিভাবে? ওর নীলির দিন যে এখন মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে পড়াশুনা করে কাটে। মাসে কোনো একদিন মন চাইলে আসে, সাথে সাথে আবার চলেও যাও। যে একটু সময়ের জন্য আবির নীলিমাকে পায়, সে সময়টুকু আবিরের নীলিমাকে চিনতে চিনতেই চলে যায়। নীলিমা চলে গেলে মনকে প্রশ্ন করে আবির- ” এ আমার সেই নীলি তো? যে একসময় আমি ধমক না দিলে খেত না?!” ” এ আমার সেই নীলি তো! একটু ব্যস্ত থাকলেই যে বলত, হু! বুঝি তো আমার দিকে তাকাতে এখন আর ভালো লাগে না, তাই ব্যস্ততার বাহানায় দুরে থাকুন।” নীলিমা যে সময়টা হোস্টেলে বান্ধবীদের আনন্দে দিন কাটাতো আর আবির সে সময়টা একাকী অন্ধকারে বসে চোখের জল ফেলে কাটিয়ে দিত। কোর্স শেষে নীলিমা হোস্টেল ছেড়ে দেয়। বান্ধবীদের থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে। ২দিন পর’ই আবার ইন্টার্নির জন্য নীলিকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। সেখানকার হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে ইন্টার্নি শেষে তবেই ঢাকায় ফিরবে। ব্যস্ত নীলিমা বিরামহীন ভাবে যখন ওর জিনিসপত্র গুছাচ্ছে, আবির তখন চুপিসারে বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে নীলিমার ডায়েরীর পাতায় চোখ বুলায় যেখানে লিখা_____ ” যে রাত্রি থেকে একজন নারী ও একজন পুরুষের এক নবজীবনের সূচনা ঘটে, অভিনয়টা শুরু ঠিক তার পরদিন থেকে। একটা মেয়ে নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয় পরিজন সবাইকে ছেড়ে শূন্য হাতে শ্বশুর বাড়িতে পা রাখে। সবাইকে ছেড়ে চলে আসলেও তার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আঁকা থাকে অচেনা পুরুষটিকে ঘিরে, যাকে সে কখনো দেখেনি, চিনেনি, জানে নি। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বাবাকে হারিয়ে একরকম বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির চাপে পরে যখন বিয়ের পিড়িতে বসলাম, তখন চোখ ভর্তি স্বপ্ন ছিল সেই অদেখা রাজকুমারকে নিয়ে, এক মাস্টারমশাইকে নিয়ে। আমার আবিরকে নিয়ে। ৭দিনে একটু একটু করে যে স্বপ্ন আমি আমার বুকে লালন করেছিলাম, সেই লালিত স্বপ্ন নিমিষেই ভেঙে তছনছ হয়ে যায় ভয়ানক সেই ফুলশয্যার রাত্রিতে ওর কথার করাল গ্রাসে। ভালোবেসে বুকে টানার পরিবর্তে ও আমায় তাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন। শারীরিক আঘাত নয়, সে ওর অপ্রিয় কিছু কথার তলোয়ার দ্বারা আমায় আঘাত করেছিল। আমার দিকে চাদর-বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল আমার সঠিক স্থানটা। যে আমি কখনো অন্যায় কিছু সহ্য করিনি, সেই আমি চুপটি করে রুমের এককোণে শুয়ে পরলাম। চোখ থেকে পানি পরেছে কিন্তু ভেঙে পরিনি। পরদিন যখন ও আমার দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল, “অভিনয়টা তাহলে ভালো’ই পারো! আমিও এটাই চাই”…. তখন মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম_ ” যে চোখে আজ আমার জন্য একরাশ ঘৃণা দেখছি, সেই চোখে একদিন আমার জন্য ভালোবাসার অথৈ সাগর দেখতে চায়।” সেদিন থেকেই শুরু হলো অভিনয়ের পালা। হা, হা! কত বোকা’ই না ও….. যে আমি অজপাড়া গায়ে বেড়ে উঠেছি, তাকেই কি না বাচ্চা হওয়ার কারন শিখাতে আসে। ওরে! তোদের মত শহুরে ছেলে মেয়েদের চেয়ে আমরা গ্রামের ছেলে মেয়েরা এদিক দিয়ে একধাপ এগিয়ে। যে বিষয়টা তোরা প্রযুক্তির কল্যানে জানতে পারিস, সে বিষয়টা আমরা দাদি, নানি, ভাবীদের থেকে তার অনেক আগেই শিক্ষা পায়। সর্বোপরি আমি একজন সাইন্সের স্টুডেন্ট। আর তাকেই কি না তুই……(……)…..??? নীলিমা সবকিছু গুছিয়ে আবিরের আলমারি শেষমেষ একবার গুছানোর জন্য কাপড়ে হাত দিয়েই ভেতর থেকে আবিরের একটা তালাবন্ধ ডায়েরী নিচে পরে যায়। ডায়েরী তুলে আগের জায়গায় রাখতে গিয়ে নীলিমার ওর নিজের ডায়েরীর কথা মনে হয়। ” কোথায় গেল? খাটেই তো ছিল।” নীলিমা খাটে রাখা সমস্ত কাপড় এলোমেলো করে ফেলে, খুঁজতে থাকে ওর ডায়েরী। আবিরের সব কাপড় চোপড় এলোমেলো করে তার ভিতরেও খুঁজে নেয়। আলমারির কোনো বক্সে’ই নীলিমা ওর ডায়েরীটা খুঁজে না পেয়ে মাথায় হাত রেখে ফ্লোরে বসে পরে। পিছন থেকে কাঁধে হাত রাখে আবির। ফিরে তাকায় নীলিমা। মলিন মুখে আবির হাতের ডায়েরীটা নীলিমার দিকে এগিয়ে দেয়। আবিরের চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। নীলিমা বুঝতে পারে আবির ওর ডায়েরী পড়ে নিয়েছে। আর এখন ওকে অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু আমি তো আজকে কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রস্তুত না। মাথা নিচু করে বিছানায় বসে পরে নীলিমা। আবির নীলিমার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ধীর গলায় প্রশ্ন করে- ” ডায়েরীর পাতার কথাগুলো সত্যি?” মাথা নেড়ে হ্যাঁ-বোধক উত্তর জানায় নীলিমা। আবিরের ভেতরটা ভেঙে চূড়ে গুড়িয়ে যায়। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পরে যাবে। তারপরও নিজেকে শক্ত করে। নীলিমার দুটো হাত চেপে ধরে বলে- ” আমি জানি নীলিমা তুমি আমার সাথে মজা করছ। তুমি কোনো অভিনয় করতে পারো’ই না। আমার নীলিমা তো এমনি’ই বাচ্চা। ও আমার সাথে কোনো বাচ্চা বাচ্চা অভিনয় করতে পারেই না……” হ্যাঁচকা টানে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় নীলিমা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, “আমার নীলিমা, তাই না?” উত্তর দেয়, হ্যাঁ! আর আমি জানি তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না। তুমি আমায় ভালোবাসো….. হা, হা! ভালোবাসা?!!…… অট্টহাসিতে মেতে উঠে নীলিমা। হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করে, আয়নাকে নিজেকে দেখেছেন আজকাল? চুল অর্ধেক পেকে গেছে, পুরাই একটা বুড়ো বুড়ো লাগে। আর সেই বুড়োকে ভালোবাসবে ডাক্তার নীলিমাকে….?!!! ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় আবির! বার বার প্রতিধ্বণিত হতে থাকে নীলিমার বলা শেষ কথা, “সেই বুড়োকে ভালোবাসবে ডাক্তার নীলিমা?” ভিষণ কষ্ট পায় আবির কিন্তু ভেঙে পরেনি। মুখে জোর করে একটা হাসির রেখা টেনে নীলিমার হাতটা ধরে। হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে হাসিমুখেই বলে, আমি জানি! আমার নীলি আমার সাথে মজা করছে। ও আমার সাথে এমন করতেই পারে না। কারণ, ও যে আমাকে নিজের থেকেও বেশী ভালোবাসে…!!! একটা ধাক্কা দিয়ে আবিরকে ফ্লোরে ফেলে দেয় নীলিমা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, হা, হা, ভালোবাসা?!!! সেতো ফুলশয্যার রাতেই মরে পঁচে গেছে; ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ায় আবির, নীলিমার সামনে দাঁড়িয়ে ওর দু’গাল স্পর্শ করে বলে, আমি জানি তো! তুমি এসব রাগ করে বলছ, অভিমান থেকে বলছ…. হাত দুটো ছাড়িয়ে দেয় নীলিমা। আবিরের চোখে চোখ রেখে বলে, অভিমান…?!!! সে’তো তার সাথেই মানায়, যাকে মন থেকে ভালোবাসা যায়। এমন কেন করছ? একটু শান্ত হও তুমি…. এই কথা শুনে আবিরের কাছে চলে আসে নীলিমা। চোখে চোখ রেখে জোর গলায় বলে উঠে, বুঝতে কেন পারছেন না, আমি সত্যি বলছি…. আমি আপনাকে ভালোবাসি না, বাসতে পারি না…. আবির দু’হাত দিয়ে নীলিমার একটা হাত চেপে ধরে। দু’চোখ দিয়ে অথৈ জলরাশি নিচে গড়িয়ে পরছে। কান্না ভেঁজা গলায় প্রশ্ন করে আবির, ” কেন করলে এমন’টা?” নীলিমা আবিরের হাতের দিকে চোখ ইশারা করে উত্তর দেয়, এই যে আজকের এই দিনটি দেখার জন্য…. আবির হাতটা ছেড়ে দেয়। নীলিমা সেই অবস্থায়’ই কাপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে আবিরের দিকে তাকায়। আবির তখনো সে স্থানে’ই ঠায় দাঁড়িয়ে। কাঁপা গলায় “আসি” বলে বিদায় নেয় নীলিমা…. আবিরের রুম থেকে বেরিয়ে নিচে রাস্তায় গিয়ে সরাসরি রিক্সায় উঠে পরে নীলিমা। অতঃপর বাসস্টপে গিয়ে বাসে উঠে রওয়ানা দেয় নরসিংদীর উদ্দেশ্যে। মাকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে, “ছোট ভাই আর লিমাকে নিয়ে দু’দিন পর’ই চিটাগাং মামার বাসায় যাচ্ছি। ঐখানকার হসপিটালে একবছর কাজ করতে হবে। তোমরা রেডি থেকো।” নীলিমা বাসায় পা রাখা মাত্র’ই কল করে নীলিমার শ্বশুর। ভয়ে ফোনটাই অফ করে ফেলে নীলিমা। বুঝতে পারে, আবির ওনাকে নিশ্চয় কিছু একটা বলছে। তাই আজ হঠাৎ এ সময়ে ফোন করছে। আবির যদি সব বলে দিয়ে থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিত ওনি এ বাড়িতে চলে আসবে। মা, কাকা, কাকিমা’রা এসব জানবে। সাথে তুলকালাম সৃষ্টি হবে। নাহ, আর একমুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না। সে রাতটা কোনো মতে কাটিয়ে পরদিন ভোরের ট্রেনে নীলিমা ওর মা ও ছোট ভাই বোনদের নিয়ে চিটাগাং চলে যায়। কেটে যায় দু’দিন____ ” বাবা! কি হলো? ফোন ধরেছে নীলিমা? কথা বলেছ ও বাড়িতে?” সেদিন আবিরের বাবা ও মা এসেছিল তাদের বউ-ছেলেকে দেখতে। এসে আবিরের অগোছালো রুম ও রক্ত লাল চক্ষু দেখে ভড়কে যায়। জানতে পারে, আসল ঘটনা। আবিরের বাবা মা দু’জনেই স্তম্ভিত। হওয়ার’ই কথা। এরকম কিছু ওরা যে কল্পনাতেও নীলিমার থেকে প্রত্যাশা করেনি। যায় হোক! ছেলের মাথায় হাত বুলাতে থাকে মা। আবিরের বাবা এবার কল দেয় নীলিমার মায়ের ফোনে। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে জানতে পারে, নীলিমা ওদের নিয়ে চিটাগাং মামার বাসায় উঠেছে। কোনো বনিতা না করে আবিরের বাবা সোজাসাবটা নীলিমার মায়ের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলে। লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায় নীলিমার মায়ের। কারণ ওনি জানেন আর যায় হোক আবিরের বাবা কখনো মিথ্যে কথা বলার মানুষ না। সে রাত্রে’ই মেয়ের মুখোমুখী হয় মা। প্রশ্ন করেন- কিরে জামাই কল দেয় নি যে আজকে একবারও, জামাইয়ের সাথে কি কিছু হয়েছে? মায়ের প্রশ্নে রেগে যায় নীলিমা। সামনে থাকা গ্লাসটা ছুড়ে মারে ফ্লোরে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে জবাব দেয়, আর কখনো যদি এই জামাই জামাই শুনি, তাহলে কুরুক্ষেত্র বয়ে যাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে স্থান ত্যাগ করে নীলিমার মা। মায়ের সাথে এরকম চোখ রাঙানোতেই বুঝতে পারেন ওনি, ওনার মেয়ে নিচে নামতে নামতে এতটাই নিচে নেমে গেছে যে ঘৃণা করতেও ওকে মানুষের বিবেকে বাঁধবে। দুপুরে লাঞ্চ করে রুমে বসেছিলেন নীলিমার মা, তখনি কল আসে নীলিমার শ্বশুরবাড়ি থেকে। রিসিভ করতেই ওনারা জানান- আবিরের অবস্থা খুব খারাপ, আপনারা যত শিগ্রয় সম্ভব একবার ঢাকায় আসুন। হসপিটাল থেকে কেবল ফিরছিল নীলিমা। ড্রেসটা চেঞ্জ করে, জরুরী একটা কাজে খাতা কলম নিয়ে বসেছিল। ঠিক তখনি রুমে মায়ের আগমন। অনেকটা ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠেন- ” নবাবজাদী! কলম ঘুরাতে হবে না। আগে আমার সাথে ঢাকায় চল।” রাগ উঠে যায় নীলিমার। অনেকটা জোর গলায় কলম নাড়িয়ে অসময়ে রুমে আসা এবং নবাবজাদী কথাটা বলার জন্য মাকে কতগুলো তিক্ত কথা শুনিয়ে দেয়। মাথায় রক্ত উঠে যায় নীলিমার মায়ের। ড্রেসিংটেবিলের উপর পরে থাকা ধারালো ছুড়ি হাতে এগিয়ে যায় মেয়ের দিকে। এক হাত দিয়ে নীলিমার হাতটা টেবিলের উপর চেপে ধরে, তারপর আরেক হাতে রাখা ছুড়িটা আঙুলের উপর চেপে ধরে নীলিমার মা। দাঁতে দাঁত চেপে শরীরের সবটুকু ভর দিয়ে মা তার মেয়ের আঙুলে ছুড়িটা চেপে ধরে। রাগে জ্ঞানশূন্য মায়ের কানে মেয়ের আর্তনাদ না পৌঁছলেও পাশের রুমে ভাই বোন এবং মামীর কানে ঠিক পৌঁছে। চিৎকার শুনে দৌঁড়ে আসে ওরা। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওমাগো করে বিছানায় চিতল মাছের মতো তড়পাতে তড়পাতে সবার চোখের সামনেই জ্ঞান হারায় নীলিমা। নীলিমার ডান হাত থেকে বৃদ্ধা আঙুলটা আলাদা করে ফেলেছে ওর মা। এটা দেখে ওর ভাই জ্ঞান হারায়। বোন লিমা ও মামি একটা চিৎকার দিয়ে নীলিমার কাছে ছুটে আসে। লিমা ওর বোনকে জড়িয়ে ধরে আপু, আপু বলে আর্তনাদ করতে থাকে। একি করলেন আপা? হাত থেকে একটা আঙুল’ই আলাদা করে ফেললেন? পাশ থেকে নীলিমার মামি প্রশ্নটা করে। উত্তর আসে- বেশ করেছি! ভাগ্য হাতটা কেটে ফেলিনি এখনো। কলম নাড়ানো…!!! জন্মের মত কলম নাড়ানোর শখ মিটিয়ে দিতাম। কথা বাড়ায়নি নীলিমার মামি। লিমাকে সাথে করে নীলিমাকে ধরে সিএনজিতে করে হসপিটালে নিয়ে যায়। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরে নীলিমার ছোট ভাইটার। মায়ের দিকে একরাশ ঘৃনার চোখে একবার তাকিয়ে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে সেও ছুটতে থাকে হসপিটালের উদ্দেশ্যে। জ্ঞান ফিরে নীলিমার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে রাত্রি ১১টায় বাসায় নিয়ে আসা হয় ওকে। পরদিন ভোর বেলা একরকম জোর করে নীলিমার ছোট দু’ভাই বোন নিয়ে ওর মা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আসার আগে একমাত্র ছোট ভাই ও ভাবিকে মেয়ের কৃতকর্ম সম্পর্কে সবকিছু জানিয়ে আসেন। এত অসুস্থতার খবর পাওয়া সত্ত্বেও নীলিমা আসেনি, এটা শুনে আবির বুঝে যায় নীলিমার জীবনে ওর স্থানটা কোথায়…! নীলিমা চলে যাওয়ার পর আবির প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। বাসায় চিৎকার করে কেঁদে উঠত। পরিপূর্ণ জীবনে হঠাৎ বিশাল শূন্যতা ও সামলে উঠতে পারছিল না। বন্ধুরা এসে ওকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। কিন্তু কোনো সান্ত্বনা ওকে বাঁধতে পারল না। আবির কলেজ থেকে ছুটি নিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যানে একা একা ঘুরতে লাগল। আবার শিক্ষকতা শুরু করল। প্রথমে প্রতিটি কাজে ভুল হতো। পরে আস্তে আস্তে সব ঠিক হতে লাগল। আবির স্বাভাবিক হতে লাগল। দুই বছর পর আবিরের ফোনে একটা কল এলো। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই নারী কন্ঠে বলল, কেমন আছ? চিনতে অসুবিধে হয়নি, এ নীলিমা। উত্তর দিল আবির, ভালো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো, স্যরি। পুরনো ক্ষতকে নতুন করে জাগানোর কোনো ইচ্ছে’ই আবিরের ছিল না। তাইতো কল কেটে ফোনটা বন্ধ করে ফেলল। অপরপ্রান্তে অন্ধকার রুমে হু, হু করে কেঁদে উঠল নীলিমা। গত একবছর ধরে নীলিমা ঢাকা শহরে। একই শহরেই দু’জনের বসবাস। অথচ নীলিমা পারছে না আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলতে। হয়তো আর কখনো বলা’ই হবে না….!!! ফাল্গুনের দু’সপ্তাহ আগে, প্রিন্সিপাল স্যার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন। আলোচ্য বিষয় এবারের বসন্তের প্রথম দিন ঠিক কিভাবে উৎযাপন করবেন। আলোচনা চলল টানা ৩ঘন্টা, আলোচনার এক পর্যায়ে বক্তব্য রাখেন হিসাববিজ্ঞানের সাইফুল স্যার। ওনি চান, কলেজে এবার বসন্ত উৎসবের পাশাপাশি প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্নমিলনীর ব্যবস্থা হোক। প্রিন্সিপাল ওনার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান। জানিয়ে দেয়া হয় ২০** সালের ব্যাচের সকল প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের কল করে যাতে বিষয়টা জানিয়ে দেয়া হয়। আবিরকে বলে দেয়া হয় আবির যেন নীলিমাকে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। সেদিন কলেজের হয়ে মেসেজের মাধ্যমে আবির নীলিমাকে বিষয়টা জানায়। খুশিতে লাফিয়ে উঠে নীলিমা। অনুষ্ঠানের দিন নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই নীলিমা কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছিল, পথিমধ্যে এক বৃদ্ধার এক্সিডেন্ট হলে ওনাকে হসপিটালে দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তবেই রওয়ানা দেয়। নীলিমা কলেজে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেকটা দেরী হয়ে যায়, ততক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গীত অনুষ্ঠান পরিচালনার পুরো দায়িত্ব ছিল বাংলার অধ্যাপক আবিরের উপর। ” কলেজের সকল প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের নিজ নিজ আসন গ্রহন করার বিনীত অনুরোধ করা হচ্ছে। কলেজ গেইট থেকেই নীলিমা মাইকে আবিরের কন্ঠটা শুনে নেয়। কম্পন শুরু হয়ে যায় ভিতরে। ভীরু পায়ে কলেজ মাঠে মঞ্চের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে। এখানে এসে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে নীলিমার। সবাই কিরকম সুন্দর করে সেজে এসেছে। ছেলেরা পাঞ্জাবী আর মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাঁড়ি। কি সুন্দর’ই লাগছে সবাইকে। বিশেষ করে আবিরের থেকে তো চোখ’ই সরানো যাচ্ছে না। পাঞ্জাবী’তে অস্থির লাগছে আবিরকে। ইশ! কেন যে আজকে শাঁড়ি পরে এলাম না….!!!!” নীলিমা মুগ্ধ দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আবিরকে দেখার তৃষ্ণা এ জন্মে ওর মিটবে না। আবির পাশে বসে থাকা অতিথি মেম জ্যোতি মেয়েটার সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে যেন হাসাহাসি করছিল, তখন’ই পিছন থেকে ইতিহাসের অধ্যাপক জনাব মামুনুর রশিদ মাইক হাতে নিয়ে বলতে থাকেন, আবির স্যার! অনেক অপেক্ষা করিয়েছেন। এবার তো শুরু করুন। ওরা যে আপনার কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হওয়ার জন্য অধির আগ্রহে বসে আছে। আবির মাইকের অনেকটা কাছে গিয়েই বলে, কি করে শুরু করব স্যার? জ্যোতি মেম এত সুন্দর করে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারে, ওনাকে বললাম আমার সাথে গাওয়ার জন্য, ওনি রাজি হচ্ছেন না…!!! মন খারাপ করে আবির বলে, ঠিক আছে, আমি একা একা’ই শুরু করছি….. সবাই নড়েচড়ে বসে। আবির গাইতে শুরু করে- ” যদি তারে নাই চিনি গো সেকি…..” এটুকু বলে আবির থামতেই ডান পাশ থেকে খালি গলায় গেয়ে উঠে নীলিমা- ” যদি তারে নাই চিনিগো সেকি….. সেকি আমায় নিবে চিনে এই নব ফাল্গুনের দিনে জানিনে…..” চমকে উঠে আবির মঞ্চের বামপাশে তাকালো, আবিরের সাথে অন্যান্য শিক্ষকরাও তাকালো। রুগ্ন দেহ, মলিন চেহারার নীলিমাকে চিনে নিতে একটু কষ্ট’ই হচ্ছিল আবিরের। দু’বছরে মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে সেটি নীলিমাকে না দেখলে আবির বোধ হয় জানতেই পারত না। শুকিয়ে আগের চেয়ে লম্বা হয়ে গেছে, চোখের নীচে দাগ পরে গেছে, দাতগুলো কেমন ভেসে গেছে। না চাইতেই আবিরের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পাশে বসা অর্থনীতি মেম নীলিমার হাতে একটা মাইক ধরিয়ে দিয়ে গান গাওয়ার জন্য বলে। আচমকা আবির মাইকে ঘোষনা করে দেয়- ” সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ___ এখন এই মুহূর্তে মঞ্চে আপনাদের সামনে গান নিয়ে আসছেন এ কলেজের’ই প্রাণ, কলেজের একসময়ের সেরা ছাত্রী মিস নীলিমা। নীলিমার জন্য একটা জোড়ে হাত তালি হবে। সকল ছাত্র ছাত্রীরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পরে। নীলিমাকে করজোড়ে অভিবাদন জানায়। আবির আবারো মাইকে ঘোষনা করে, নীলিমাকে মঞ্চে আসার জন্য বিনীত অনুরোধ করা হচ্ছে। কাঁপা পায়ে নীলিমা মঞ্চে উঠে। ভীরু চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে, মাইক’টা মুখের সামনে নিয়ে গাইতে শুরু করে- “তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার তাই জনম গেল, শান্তি পেলি নারে…!! মন, মনরে আমার তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার। যে পথ দিয়ে চলে এলি সে পথ এখন ভুলে গেলিরে!! কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে মন, মনরে আমার তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার। নদীর জলে থাকিরে কান পেতে কাঁপেরে প্রাণ পাতার মর্মরেতে….!! মনে হয় যে পাবো খুঁজি ফুলের ভাষা যদি বুঝিরে…!! যে পথ গেছে সন্ধ্যা তারার পানে মন, মনরে আমার…. তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার তাই জনম গেল, শান্তি পেলি নারে….!! মন, মনরে আমার তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মনরে আমার….” গান শেষে মঞ্চ থেকে নেমে দৌঁড়ে কলেজ মাঠ ছেড়ে পালায় নীলিমা। কলেজ লাইব্রেরি’টা খোলায় ছিল, সেখানে গিয়ে হু, হু করে কেঁদে উঠে নীলিমা____ ” তুমি আমাকে এভাবে অপমান করলে? আমি তো শুধু একটু গান’ই গাইতে চেয়েছিলাম…” অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরছিল আবির, পথিমধ্যে পথ আগলে দাঁড়ায় নীলিমা। গাড়ি থামিয়ে জানালার গ্লাসটা নামিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে নীলিমার তাকায় আবির। প্রশ্ন করে, ” দুনিয়াতে এত গাড়ি থাকতে আমার গাড়ির সামনে এসেই মরতে হলো?” দৌঁড়ে গাড়ির জানালার পাশে যায় নীলিমা। করুণ গলায় বলে, প্লিজ! আপনি আমার কথাটা শুনোন….. দেখুন মিস নীলিমা! এটা কলেজ নয়, পাবলিক প্লেস। তাই প্লিজ অযথা বাড়াবাড়ি করবেন না এখানে। আমার তাড়া আছে। রাস্তা ছাড়ুন। প্লিজ, আপনি আমার কথাটা তো শুনোন। তারপর না হয় চলে যাব….. ওকে, বলুন! কি বলতে চান আপনি? কথাগুলো একান্ত’ই ব্যক্তিগত, এখানে বলা ঠিক হবে না। আমি কি আপনার সাথে আপনার বাসায় গিয়ে ধীরে সুস্থে কথাগুলো বলতে পারি…??? আবির নীলিমার দিকে একবার ফিরে তাকায়। তারপর গাড়ির দরজাটা খুলে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে- ওকে, ফাইন! চলুন….. নীলিমা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসে। গেইটের ভিতর গাড়ি’টা ঢুকাতে ঢুকাতে নীলিমা উপরে নিজ রুমে চলে যাচ্ছিল, পিছন থেকে ডাক দেয় আবির। নীলিমা পিছনে ফিরে তাকালে আবির জানায়, “রুম চেঞ্জ করে ফেলেছি। এখানে আমার এক কাজিন থাকে। উপরে আমার রুম। চলুন….” নীলিমা আবিরের পিছুপিছু ওর রুমের দিকে পা বাড়ায়। দরজার লক খুলে ভিতরে ঢুকে আবির, তার পিছু পিছু নীলিমা। অনেক সুন্দর গুছানো দুটো রুম। একটা আবিরের বেডরুম, আরেকটা স্টাডি রুম। নীলিমাকে আবির স্টাডি রুমে বসার অনুমতি দিয়ে নিজে বেডরুমে চলে যায়। মিনিট পাঁচেক পর ফ্রেস হয়ে ফিরে আসে আবির। স্টাডি রুমে একজন বসা যাবে এরকম একটা ছোট্ট সোফা আছে। আবির সেখানে বসে নীলিমার দিকে জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে তাকায়। নীলিমা কিছু না বলে চুপসে বসে আছে। ভ্রু-কুচকে প্রশ্ন করে আবির, কি হলো? বলুন কি বলতে চান…?!!! নীলিমা বার কয়েক বলতে গিয়েও আটকে যায়, পারেনি বলতে। অতিবাহিত হয়ে যায় ত্রিশ মিনিটেরও অধিক সময়। এরই মধ্যে আবিরের স্টুডেন্ট’রা এসে যায়। বিরক্তির দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে একবার তাকিয়ে সোফা থেকে উঠে ওদের পড়াতে চলে যায় আবির। ঘন্টা’খানেক পর ওদের বিদায় দিয়ে স্টাডি রুমে ঢুকে আবির। নীলিমাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে আবারো বলে উঠে, ” আপনি এখনো এখানে বসে আছেন যে?” করুণ গলায় উত্তর দেয় নীলিমা, আমার কথাটা যে বলা হয়নি আপনাকে। স্বাভাবিক হওয়ার বৃথা চেষ্টা করে আবির। জ্বি, বলুন। কি বলতে চান…..? জবাব আসে, একটা বাসা ভাড়া দিবেন? বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছে আবির। কোনো রকম রাগকে কন্ট্রোল করে বলে, এই কথাটা আপনি রাস্তায় বললেই পারতেন। যায় হোক! আমার এখানে কোনো বাসা খালি নেই। কথাটা বলে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় আবির। ওয়াশরুম থেকে মাগরিবের নামাজের জন্য অজু করে ফিরে এসে দেখে নীলিমা তখনো সে স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে আবির, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আপনি এখনো এখান থেকে যাচ্ছেন না যে? মাথা নিচু করে জবাব দেয় নীলিমা, “আজ রাতটা কি এখানে থাকতে পারি আমি? অবাকের চরম সীমায় আবির- “What?” কেঁপে উঠে নীলিমা। আমতা আমতা করে বলতে থাকে, না মানে আমি যে বাসায় থাকি সে বাসাটা এখান থেকে মাইল তিনেক দুরে। ঐ এলাকার ছেলেরা খুব খারাপ। দিনে দুপুরে রাস্তাঘাটে মেয়েদের জ্বালাতন করে। তাই আজ রাতটা যদি আমাকে এখানে থাকতে দিতেন…. ঠিক আছে, থাকুন! তবে আজ রাতটাই। কাল সকালে উঠে যাতে স্টাডি রুমটা পরিষ্কার দেখি…!!! নীলিমা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায়। পরদিন সকালবেলা___ অটো রিক্সার ক্রিং ক্রিং আওয়াজে ঘুম ভাঙে আবিরের। জানালা মেলে নিচে তাকায় আবির। কিছুটা ঘুম গলায় প্রশ্ন করে, ” ও ভাই! সকাল সকাল কি শুরু করছেন এসব?” অটোচালক আবিরকে দেখে জোরে হাকিয়ে বলে, ” ভাই! ডাক্তার আপা আছে এখানে?” আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে, কোন আপা? অটোচালক চিল্লানোর স্বরে জবাব দেয়, ডাক্তার নীলিমা আপা…. ওনাকে একটু ডেকে দিন। আবির ওর স্টাডিরুমের দরজায় গিয়ে নক করে, মিস নীলিমা! আপনাকে নেয়ার জন্য অটো এসেছে। নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ধরমরিয়ে বিছানা থেকে উঠে দৌঁড়ে নিচে নামে নীলিমা। আবির ওয়াশরুমে চলে যায়। ততক্ষণে নীলিমা অটো থেকে ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নামিয়ে অটোওয়ালাকে দিয়ে ব্যাগপত্র উপরে তুলে। সবশেষে অটোওয়ালাকে বিদায় দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে উপরে উঠে নীলিমা। ওয়াশরুম থেকে কেবল বেরিয়েছিল আবির। নীলিমার জিনিসপত্র দেখে “থ” হয়ে যায় ও। নীলিমা আপনমনে আলমারির লক খুলে কাপড় গুলো আলমারিতে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পরে। চোখ কপালে উঠে যায় আবিরের। পিছন থেকে বলে উঠে আবির- ” বসতে বলেছিলাম, এখন তো দেখি শুয়ে পরার ব্যবস্থা করেছেন আপনি…
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now