বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
#ফিনিক্স
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-১
“কোমড়ে এভাবে হাত বুলাচ্ছ কেনো?আমার কিন্তু খুব লজ্জা করছে।’’ নরম গলায়, শয়ন রত অবস্থায় কথাটা বলল রোহিনী।
“তোমার কোমড়ের বাম পাশটা কি কখনো কেটে গেছিল?’’ গভীর স্বরে বলল নীলয়।
“কই না তো! হঠাৎ এই কথা?’’
“হাত বুলিয়ে যতদূর বুঝলাম এখানে কাটা দাগ রয়েছে। অন্ধকারের কারণে ঠিক মতো বুঝতেও পাড়ছি না। ’’
রোহিনী কিছু একটা ভেবে আচমকা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “তা কিছু না! ওখান থেকে হাত সরাও। ভালো লাগছে না। ’’
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল, “আমার কৌতুহল কিন্তু বাড়ছে। হাত সরাতে পাড়ছি না। ’’
রোহিনীর তার বাম হাত দিয়ে নীলয়ের হাতটা চেপে ধরল। কোমড় থেকে হাতটা টেনে সে তার গালে রাখল, রেখে বলল, “শোনো,দেখতে হবে নার,পরে আমাদের বাসর নষ্ট হবে। ’’
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “কেনো? এখন কিন্তু আমার কৌতুহল পূর্বের তুলনায় হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার তো দেখেই ছাড়ব। ’’
নীলয় বিছানা ছেড়ে রুমের বাতিটা জ্বালিয়ে দিলো। সে রোহিনীর কাছে এসে দেখল রোহিনী মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পেরেছে রোহিনী কিছুটা রাগ করেছে। কিছুক্ষণ রোহিনীর চোখের দিকে সে তাকিয়ে রইল। মুখে তার এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠল।
কোমল গলায় সে বলল, “মায়াবতীটা! ’’
রোহিনী একটু রাগি স্বরে বলল, “আমার সাথে কথা বলবা না। ’’
নীলয় রোহিনীর রাগের দিকে ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে নিজের কৌতুহল মেটাতে রোহিনীর কোমড়ের দিকে তাকালো। খানিকটা পোড়া দাগের মতো, তবে তার কাছে তা পোড়া দাগ বলে মনে হচ্ছে না।
নীলয় ওই স্থানে একটা চুমু খেয়ে রোহিনীকে প্রশ্ন করলো, “দাগটা কিসের?’’
“জানি না। কখন, কিভাবে জানি কেটে গেছে ।’’
“কবে কেটে ছিল?’’
প্রশ্নটা শুনে রোহিনীর রাগ আরো বেড়ে গেলো। সে ওঠে বসল, নীলয়কে সে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিলো।
“শয়তান কোথাকার। বাসরটা দিলি নষ্ট করে। ’’
রোহিনী রেগে নীলয়ের গালে ঠাস করে একটা চড় মাড়ল। নীলয় হতভম্ব হয়ে রোহিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নীলয় কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইল। আজ তাদের বিয়ে হয়ে, বাসর রাত। দুইজন একে অপরকে অনেক আগে ধরেই চেনে। বলতে গেলে ভালোবেসেই বিয়ে। নীলয় রোহিনীকে যতদূর অব্দি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়ে, তা হতে সে জানে রোহিনী প্রচুর রাগি মনে। যেন একটা জলজ্যান্ত আগুনের গোলা। আর নীলয়ের কাছে এমন রাগি মেয়েই পছন্দ। রোহিনীর হাতে মার খাবার অভ্যাস আছে তার। এই অব্দি রোহিনীর হাতে শতাধিক চড় খেয়েছে সে। চড় খাওয়ায় অভিজ্ঞ সে। তবে রোহিনীর একটা বিষয় তার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে তা হলো রেগে যাবার পর কিছুক্ষণ পরই সে শান্ত হয়ে যায়। নিমেষের মাঝেই তার রাগ উধাও হয়ে যায়। তারপর আবার সে খুব সুন্দর করে ক্ষমাও চায়।
নীলয় গালে হাত দিয়ে বসে আছে। রোহিনী আড় চোখে বারবার নীলয়ের দিকে তাকাচ্ছে। মিনিট দুয়েক পর রোহিনী নীলের দিকে তাকালো।
নরম গলায় বলল, “সরি। একটু রেগে গেছিলাম। ’’
নীলয় কিছু না বলে গালে হাত দিয়ে বসে রইল। রোহিনী নীলয়ের গাল থেকে হাতটা সরিয়ে গালে একটা চুমু খেলো।
“নীলয় এবার তো রাগ ছাড়।’’
নীলয় একটা বড় হাসি দিয়ে বলল, “রাগ করলাম কখন?’’
“পাজি একটা।’’
“রুমের বাতিটা বন্ধ করে দিয়ে আসছি। ’’
“আসুন….!’’
.
.
রাত তখন আনুমানিক দুটো বাজে।
আচমকা রোহিনী আঁতকে ওঠল।
“প্লীজ ওখানে হাত দিও না। ব্যাথা পাচ্ছি।’’
পিঠ থেকে নীলয় হাত সরিয়ে দিলো। কিছুক্ষণ আগে রোহিনীর কোমড়ে যেই দাগটা সে হাত দিয়ে অনুভব করে ঠিক একই দাগ এই মাত্র সে পিঠেও অনুভব করেছে। দাগটাকে একটু হাত বুলাতেই রোহিনী আঁতকে ওঠল।
নীলয় রোহিনীকে কোনো প্রশ্ন করলো না। তাকে শক্ত ধরে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ শুয়ে পড়ল।
ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরতে যেয়ে রোহিনী টের পেলো তার পাশে নীলয় নেই। চোখে ওপরে থাকা লাল পাতাটা সরিয়ে তাকালো সে। দৃষ্টি তার ঘোলা, ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। সে দেখলো তার ঠিক বরাবর সামনে থাকা টেবিল সংলগ্ন চেয়ারে নীলয় বসে আসে। কম্পিউটারে গুঁতোগুতি করছে সে। আস্তে ধীরে সে ওঠে বসল। নীলয়কে উদ্দেশ্য করে রোহিনী বলল, “কখন ওঠলে? ’’
“ঘণ্টাখানেক হলো।’’
“তা কম্পিউটারে কী করো?’’
“লেখালেখি।’’
“কবি সাহেব একদিনও কী লেখালেখি ছাড়া থাকতে পারো না?’’
নীলয় পেছন ফিরে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। কবি যখন হয়েছি রোজ তখন লিখতে তো হবেই।
“কেন না লিখলে কী হয়?’’
“নেশা না করে একদিনও থাকতে যে পাড়ি না! মাদকের নেশা থেকে এই নেশা বেশি জটিল। মাদকের নেশা নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে কাটানো যায়। কিন্তু এই নেশা কাটানোর কোনো নিরাময় কেন্দ্র নেই, তাই সম্ভবও নয়। ল’’
“হ্যাঁ,বুঝেছি। সমস্যা নেই এখন আমি আছি না? আমার নেশা লাগিয়ে দিব।’’
“সাড়ে সাতটা বাজে। ফ্রেশ হয়ে নেও। তারপর তো আবার তোমায় রেডি হতে হবে।’’
“উফ! বিয়ে না একটা ঝামেলা। আজ আসবে বাপের বাড়ির লোকজন। আবার পুরো মহল্লার আণ্টিরা তো আছেনই। আসবেন, দেখবেন আবার নানান খোঁচা মূলক কথাও শোনাবেন। বিরক্তিকর।’’
নীলয় একটু হাসল। রোহিনী রেগে গিয়ে বলল, “দাঁত বের করবে না। রাগ হচ্ছে।’’
“বাথরুমে গিয়ে মাথায় পানি ঢালো।’’
সন্ধ্যা হতে আর কিছুক্ষণ বাকি। বারান্দায় কফি হাতে চেয়ারে বসে আছে নীলয়। পেছন থেকে রোহিনী ডাক দিয়ে বলল, “কী হলো কফিটা তো মনে হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কী ভাবছ তুমি?’’
“একটা গল্প ভাবছি।’’
“গল্পটা কী নিয়ে?’’
“কাল্পনিক গল্প। পেন্টাগ্রাম সংক্রান্ত বেশি কিছু নথিপত্র নেটে দেখেছি। স্টার আঁকা, মাঝখানে চোখের চিহ্ন বিশিষ্ট চিত্রগুলো কেমন রহস্যময় লাগছে আমার কাছে। ভাবছি এ নিয়ে একটা গল্প লিখব। কী বলো তুমি?’’
কথাটা বলেই নীলয় ঘুরে পেছনে তাকালো। রোহিনী অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবছে।
নীলয় মৃদু স্বরে বলল, “রোহিনী! ’’
রোহিনী হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ! কী জানি বলছিলে?’’
নীলয় ওঠে দাঁড়ালো, কফির মগটা চেয়ারের রেখে রোহিনীর দিকে সে এগিয়ে গেলো। দু'হাত রোহিনীর কাঁধে রেখে নীলয় বলল, “আগে তো তুমি এতো ভাবুক মেয়ে ছিলে না। হঠাৎ কী হলো? কোনো বিষয়ে কী তুমি চিন্তিত?’’
কিছুটা ইতস্তত হয়ে রোহিনী বলল, “কই না তো।’’
নীলয় রোহিনীর চোখে চোখ রেখে বলল, “রোহিনীকে আমি এক বছর ধরে চিনি। তার দিকে তাকালেই আমি বুঝে যাই তার অবস্থাটা কিরূপ। কোনো একটা বিষয় তোমাকে জ্বালাতন করছে। কিছু বলতে চাও আমায়, কিন্তু সংকোচ বোধ করছ।’’
রোহিনী স্থির দৃষ্টিতে বলল, “এত কিছু বোঝো কী করে?’’
নীলয় কথার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, “কবিরা বরাবরই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন হয়। বাহ্যিক অবস্থা দেখে তারা নিজ মনের ভুবনে ভেতরের অবস্থাটা বুঝে নেয়। কবিদের জন্যে শুধু কয়েকটা স্পর্শ আর নজরই যথেষ্ট ভেতরটা উপলব্ধি করতে। ’’
নীলয় আরো কিছু বলতে নেয়। রোহিনী তাকে বাঁধা দিয়ে বলল, “আর তাদের মনের ভুবনটা হয় রহস্যময়, কাল্পনিক। রূপকথার অতল গহ্বরে তারা বন্দি থাকে। চিন্তা চেতনা সাধারণ মানুষ থেকে কিছুটা ভিন্ন হয়। সাধারণে তারা অসাধারণ খোঁজে। অল্পতে হয় তারা মুগ্ধ । ’’
বাম চোখের ভ্রু কিছুটা নামিয়ে নীলয় বলল, “বাহ!’’
রোহিনী মুচকি হেসে বলল, “কবি সাহেব আপনাকেও আমি বুঝি, বুঝলেন। কফিটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে,খেয়ে নেও। ’’
রোহিনী চলে গেলো। নীলয় চেয়ার থেকে কফির মগটা হাতে তুলে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। কফির মগে কয়েকটা চুমুক দিয়ে সে ভাবতে লাগলো, “আপাতত রোহিনীকে জোর না দেয়াই উত্তম। পরিবার ছেড়ে নতুন পরিবেশে এসেছে সে, তাই হয়তো কিছুটা অন্যমনস্ক। পরিবারের কথা হয়তো মনে পড়ছে। গুরুতর কিছু হলে সে নিজ থেকেই আমাকে বলবে।
সন্ধ্যার দিকে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে চলে গেলাম সম্পাদকের ঠিকানায়।
“আজ কাল দেখি বিচিত্র ধরনের গল্প লেখা ধরেছ। ’’ নীলয়কে উদ্দেশ্য করে বলল সম্পাদক।
“হ্যাঁ, মাথায় এখন আমার ভুত চেপেছে। দেখেন না এবার কবর খোঁড়াখুড়ি নিয়েই লিখে ফেললাম।’’
“তা তো দেখতেই পাচ্ছি। লাশ চোরাদের বিভৎস পরিণতির গল্প।’’
“মাটির সাড়ে তিন হাত গভীরে চাপা পড়ে থাকা হাড় ভঙ্গুর লাশগুলোর চির নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটালে তো তার পরিণতি বিভৎসই হবে। তাদের শান্তির ঘুম হারাম করলে তো একটা বিভৎস উপহার পেতেই হয়।’’
“এমন গল্প লিখতে হলে কী করতে হবে?’’
“বালিশের নিচে হাড় কিংবা কোনো সিমেন্ট ঢালাই শাহী কবরের খানিকটা সিমেন্টের গুড়ো রাখবেন, দেখবেন ভয়ানক গল্প মাথায় আসছে।’’ হেসে বলল নীলয়।
“মশাই, তোমার বুদ্ধি শুনে আমার শখ মিটে গেছে! ’’
.
.
“কাজ শেষ?’’ দরজা ঠেলে নীলয় ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রশ্ন করলো রোহিনী।
“হ্যাঁ!’’ ঘরের ভেতর প্রবেশ করে কথাটা বলল নীলয়। রোহিনী কিছু বলার আগেই নীলয় বলে ওঠে, “কবি জামাই পাওয়ার একটা ভালো দিক কী জানো?’’
“কী?’’
“চল্লিশ ঘণ্টা জামাই বাড়িতেই থাকে।’’
রোহিনী হেসে বলল, “থেকে কী? বারো ঘণ্টা তো তুমি কম্পিউটারের সামনেই থাকো।’’
“তাও চোখের সামনে তো থাকি।’’
নীলয় ফ্রেশ হতে চলে গেলো। নীলয় পেশায় বলতে গেলে দুটো পত্রিকার সম্পাদক এবং বই ছাপায়। এ থেকে যা আয় হয় তাতেই দিব্যি চলছে সে। বাবার করেছিলেন সরকারি চাকরি, অবসর গ্রহণের পর এখন পেনশন পাচ্ছেন। তাদের পিছনে নীলয়ের তেমন একটা খরচা নেই, যা খরচা নিজের। তিন রুমের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকা তারা। নীলয়ের কোনো ছোটো ভাই বোন নেই, তাই টানাপোড়াও নেই। চিন্তা বিহীন এক জীবন তার, মুক্তহস্তে করছে আয়। তার চেয়ে শান্তিতে আর কেই বা আছে? নিজেকে নীলয় সুখী মানুষই মনে করে।
.
.
গভীর রাত। পুরো খরচ নিস্তব্ধ, দুটো একটা গাড়ির সো সো শব্দ মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে। দ্রুত গতির গাড়িগুলোর চাকার সঙ্গে পিচ ঢালা রাস্তার ঘর্ষণের শব্দ প্রচুর বিরক্তিকর। গ্রামে আজীবন থাকা কোনো ব্যক্তি যদি শহরে আসে, তাহলে এই শব্দ তাকে এক সেকেণ্ডের ভিতরই রাগিয়ে তুলবে।
নীলয় তার পাশ ফির হাত দিতেই দেখে তার ডান পাশ খালি। ঘুম ঘোরে নীলয় তার হাত এদিক সেদিক নিতে লাগলো ,রোহিনীকে খুঁজতে লাগলো সে। রোহিনীকে না পেয়ে নীলয় তার চোখ জোড়া ধীরেধীরে খুলল। ডান পাশ বরাবর থাকা ড্রেসিং টেবিলের বিশালাকার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোহিনী। রুমের ড্রিম লাইটের মৃদু আলোতে নীলয় দেখলো রোহিনীর গায়ে জামা নেই। আয়নাতে সে তার পিঠ দেখার চেষ্টা করছে। পিঠে থাকা দাগগুলো সে দেখছে। রোহিনী তার পিঠে থাকা কাটা দাগে নিজের হাত স্পষ্ট করতেই কাটা স্থান ধীরে ধীরে অগ্নি বর্ণ ধারণ করতে লাগলো। দৃশ্যটা দেখে নীলয়ের গলা দিয়ে মৃদু গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসলো।
.
.
নীলয়ের ঘুম ভেঙে গেলো। সোজা লম্বা হয়ে সে শুয়ে আছে। তার ডান পাশে পাশ ফিরে শুয়ে আছে রোহিনী। নীলয় কিছুটা অবাক হলো।
“আমি কী তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? রোহিনী তো আমার পাশেই শুয়ে আছে। তাহলে একটু আগে যা দেখেছি নিশ্চয়ই স্বপ্ন হবে। উফ! রোহিনীর পিঠ আর কোমড়ের কাটা দাগগুলো নিয়ে একটু বেশিই ভাবছি।’’
নীলয় চোখ জোড়া বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। নীলয়ের ডান পাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকা রোহিনীর চোখ জোড়া স্থির হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। সে জাগ্রত, কালো চোখের মণি দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে।
চলবে…..
পর্ব-২
“মিশর, রহস্য নামক উন্মাদ পাগলদের স্বপ্নের স্থানও বটে। আমার কর্ণে এই অব্দি পৃথিবীর রহস্যময় স্থানের যেসকল নাম পৌঁছেছে তার ভেতর সর্বাধিক রহস্য জনক হলো এই মিশর। মিশর শুধু একটি প্রাচীন শহর নয়, এর ভেতর রয়েছে সভ্যতার বিকাশ নিয়ে নানান প্রশ্ন। প্রশ্নগুলোর কথা আসলে মিশরের পিরামিডের কথা তো সবার উপরেই আসবে তাই না? পিরামিড নিয়ে এই অব্দি হাজার মতবাদ শুনেছি। তবে একটিও আমার কাছে গ্রহণ যোগ্য মনে হয়নি। হেতু, সব যুক্তিরই বিপরীত যুক্তি রয়েছে। সর্বাধিক প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যে প্রশ্নটা তা হলো, পিরামিড তৈরীতে ব্যবহৃত বিশালাকার পাথরের খণ্ডগুলো কিভাবে একটির ওপর আরেকটি এত নিখুঁত ভাবে বসানো হয়েছে? সেই সময়ে এমন যন্ত্রপাতি ছিল না যে এত বড় পাথর ওপর তুলবে। তাছাড়া মানুষের পক্ষেও সম্ভব নয় এত বড় বড় পাথরের খণ্ড তুলা। তবে আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে যে বর্তমান যুগের প্রযুক্তি দিয়ে কী একটা পিরামিড তৈরি করতে পারবে কী না? আমি হেসে তখন উত্তর দিব, শত বছর চেষ্টা করেও সম্ভব নয়। যদি বলে কেনো? তখন আমার উত্তরটা হবে পিরামিডের ভেতর জীবনে ঢুকেছ? ঢুকলে তুমি বললে বিজ্ঞান আরো শত বছর চেষ্টা করেও মনে হয় না এমন একটা পিরামিড বানাতে পারবে।’’
কম্পিউটারে বসে লিখছিল নীলয়। পেছন থেকে রোহিনী নীলয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল , “তা, কবি সাহেব আপনে পিরামিডের ভেতর কখনো গিয়েছেন?’’
নীলয় হেসে বলল, “আজ অব্দি বিজ্ঞান পিরামিডের রহস্য করতে পারেনি আবার পিরামিড তৈরি করবে। অসম্ভব!’’
নীলয় কম্পিউটারে মিনিমাইজ করে রাখা গুগলে প্রবেশ করল। সেখানে আগে থেকেই একটা পেইজ সার্চে রয়েছে। নীলয় সেখানে প্রবেশ করলো। কয়েকটা ছবি, পিরামিডের ভেতরের। একটা ছবি দেখে রোহিনী বলে ওঠে, “ছবিটি দেখি তো।’’
নীলয় রোহিনীর কথা মতো ছবিতে ক্লিক করলো। ছবিটি পুরো মনিটর জুড়ে প্রদর্শিত হতে লাগলো। রোহিনী ছবিটি জুম করে দেখতে লাগলো ।চোখের দৃষ্টি তার স্থির। কিছু একটা বিড় বিড় করে পড়ছে সে, যেন সে প্রাচীন মিশরীও ভাষা বুঝে। নীলয় এক দৃষ্টিতে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। রোহিনীর দৃষ্টি নীলয়ের দিকে পড়তেই সে কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল, “রান্না করতে হবে যাচ্ছি আমি।’’
নীলয় রোহিনীর হাত চেপে ধরল।
“ছবিতে কী খুঁজতেছিলে তুমি?’’
রোহিনী একটু ভেবে বলল, “ক'দিন আগে একটা নথি পত্র দেখেছিলাম। সেখানে এমনিই ছবি ছিলো। সেই ছবিতে মিশরীও লিখনীর বাঙ্গানুবাদ ছিল। এটার সাথে মিলল, তাই একটু মিলিয়ে দেখলাম। তেমন কিছুই না।’’
নীলয় হাত ছেড়ে দিলো। রোহিনী রান্নার কাজে চলে গেলে। বিষয়টা নিয়ে নীলয় এত আশ্চর্য হয়নি। কারণ রোহিনী এসব নিয়ে ঘটাঘাটি অনেক আগ থেকেই করে তা সে জানে। রোহিনী যে ছবিটি দেখছিল নীলয় সেই ছবিটি দেখতে লাগলো। একটা পাখির চিত্র পাথরের ওপর খোঁদাই করে অঙ্কিত। চিত্রটি দেখে যতদূর বোঝা যায়, তাতে মনে হচ্ছে পাখিটার ডানা থেকে আগুন বের হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ নীলয় পাখিটার নাম করণও করে ফেলল।
“অগ্নিপক্ষী।’’ অস্পষ্ট স্বরে বলল নীলয়।
.
.
বিকেলে
“কী হলো, কী খুঁজতেছো? রেগে এমন তেলে বেগুন হয়ে আছো কেনো? ’’ নীলয় কম্পিউটারে কাজরত অবস্থায় কথাটা বলল।
“উফ! দরকারী কিছু এই ঘরটাতে নেই। খালি স্টোডিয়াম একটা।’’
নীলয় হেসে বলল, “খালি স্টোডিয়াম তো টাক মাথা লোকদের বলা হয়।’’
“তোমার ঘরটাও একটা টাক মাথা। কাজের কোনো জিনিস পত্র নেই। এই রুমে একটা ঘড়ি অব্দি নেই। শুধু একটা টেবিল, কম্পিউটার, ড্রেসিং টেবিল আর একটা খাট। সংসারে কী আর কিছু লাগে না?’’
নীলয় নিচু স্বরে বলল, “একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছো।’’
“কী?’’
নীলয় হাতের ইশারায় সিলিং ফ্যানটার দিকে ইশারা করলো।
রোহিনী চোখ বড় করে নীলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী বলেছি? সংসারে কী আর কিছু লাগে না?’’
নীলয় মৃদু স্বরে বলল, “ আমি কী করে বলব! তুমিই বলো কী কী লাগবে। কিনে আনি!’’
রোহিনী খাটে বসে পড়ল, সে বলল, “অনেক কিছুই লাগবে।’’
“তাহলে এখনই মার্কেটে চলো।’’
.
.
রোহিনীকে নিয়ে কেনা-কাটা শেষে বাড়ি ফিরছে নীলয়।
“একটা জিনিসও না আমার কাছের মনে হচ্ছে না!’’ বলল নীলয়।
রোহিনী কিছু বলল না।
নীলয় আবার প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা! ঘড়ির দোকানদারের আচরণটা আমার কেমন জানি লাগলো। দেখলে তো কিভাবে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন ভুত দেখছে।’’
“তার নজর ভালো না! ’’ আনমনা হয়ে বলল রোহিনী।
“কিন্তু তার চোখে আমি কোনো প্রকার লালসা দেখিনি, বরং বিস্ময়ের ছাপ দেখেছি।’’
“ধ্যাত,বাদ দেও তো!’’
বাড়িতে
“কিরে তোরা ফিরেছিস! ’’বলল নীলয়ের মা।
“হ্যাঁ,মা যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছি।’’ বলল নীলয়।
.
.
ঘণ্টাখানেক পর
“এখন দেখো রুমটা কত সুন্দর লাগছে।’’ বলল রোহিনী।
“তা অবশ্য সত্য বলেছ কিন্তু রুমটা আমার কাছে এখন কেনো জানি মেয়েলি রুম মনে হচ্ছে! ’’ বলল নীলয়।
রোহিনী আর কথা বাড়ালো না।
.
.
ভোর হতে আর কিছুক্ষণ বাকি। আজও গত রাতের মতো নীলয় সেই একই স্বপ্ন দেখেছে। রোহিনীর পিঠ হতে অগ্নি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। নানান দুশ্চিন্তা সকাল অব্দি নীলয়ের মগজ দখল করে নিলো।
.
.
প্রতিদিনের অভ্যাস মতো নীলয় খবরের কাগজ পড়ছে। একটা সংবাদে তার চোখ আঁটকে গেলো। গত দিনের সেই ঘড়ির দোকানী নিহত হয়েছে। নিহত বললে ভুল হবে খুন করা হয়েছে। খবরের কাগজে পুরো ঘটনাটা পড়ে নীলয় যত দূর বুঝেছে তা হলো জ্যান্ত অবস্থায় লোকটাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার তরে আগুন ধরানো হয়নি, কিন্তু লাশ পুড়ে প্রায় গলে যাবার উপক্রম হয়েছে। অনেক তীব্র আগুন ছিল!
এবার বিষয়টা নীলয়কে বেশ ভাবাচ্ছে। চোখ গেলো রোহিনীর দিকে, কোনো একটা বিষয় নিয়ে সে খুব চিন্তিত।
নীলয় রোহিনীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রোহিনীর পিঠে সেই কাটা দাগের উপর জামার ওপর দিয়ে সে হাত দিলে। রোহিনী আঁতকে ওঠল, সে বলল, “কী করছ!’’
“সত্য করে বলো তো পিঠে এই দাগ কী করে এসেছে?’’
“নীলয় বলেছিলাম তো কিভাবে কেটেছে জানি না আমি।’’
নীলয় রোহিনীকে টেনে এনে খাটে বসাল,সে বলল, “তোমার মুখ দেখলেই বোঝা যায় তুমি কিছু লুকাচ্ছ। আমাকে বলো। ’’
“বলা যাবে না! ’’
“কিন্তু কেনো?’’
রোহিনী কিছুটা কাঁদো গলায় বলল, “আমি তোমাকে হারাতে চাই না!’’
নীলয় রোহিনীর হাত জোড়া শক্ত করে ধরে বলল, “বিয়ের আগে,বিগত এক বছর ধরে কী কোনো দিনও কোনো কারণে তোমায় আমি ছেড়ে গেছিলাম? এক মুহূর্তের জন্যেও কী অবিশ্বাস করেছিলাম?’’
রোহিনী কিছু বলল না, তার চোখে পানি টলমল করছে।
নীলয় আবার বলল, “সব সমস্যা নিয়ে তুমি আমার কাছেই আসতে, আর আমি সমাধানও করে দিতাম। এবার এই সমস্যাটাও বলো? ’’
রোহিনী কাঁদতে কাঁদতে বলল, “অনেক কিছু তোমার কাছ থেকে লুকিয়েছি, বলার মতো মুখ আমার নেই। আর এই সমস্যার কোনো প্রতিকারও নেই!’’
“সাহস দিয়ে কী হবে? সত্য বলতে কী সাহস লাগে নাকি? সাহস লাগে মিথ্যা বলতে, অনেক সাহস লাগে। সত্যকে মিথ্যা বানাতে সাহস লাগে, সত্য বলতে সাহস লাগে না।’’
রোহিনী নীলয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
রোহিনী একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমি একটা ধর্ষিতা মেয়ে। ’’
কথাটা বলে রোহিনী নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে দিলো। বুকের ভেতরটা তার কাঁপছে। শীতল একটা কাঁপুনি পুরো বুকে ছড়িয়ে পড়ল।
সেকেণ্ড দুয়েক পর রোহিনী তার কপালে একটা উষ্ণ ছোয়া অনুভব করলো। নীলয় রোহিনীর কপালে চুমু খেয়ে হেসে বলল, “সেটা অনেক আগ থেকে আমি জানি। ’’
বিস্মিত নয়নে রোহিনী নীলয়ের দিকে চেয়ে রইল।
নীরবতা ভেঙে নীলয় বলল, “ মাস ছয়েক আগ ধরে জানি। কথা বিষয়টা আমি জানলে তুমি ভেবেছিল আমি ছেড়ে চলে যাবো?’’
রোহিনী কিছু বলল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। টপ টপ করে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
নীলয় রোহিনীকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “কান্না থামাও!’’
কিছুক্ষণ কান্না করার পর রোহিনী বলল, “আরো একটা বিষয় তোমার থেকে লুকিয়েছি! ’’
“কী?’’
“আমি…!আমি কোনো সাধারণ মানুষ নই। ’’
“মানে!’’ ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল নীলয়।
“খাটের চাদরের দিকে তাকাও!’’
নীলয় খাটের চাদরের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো! চোখের জল যেই স্থানে পড়েছে সেই স্থানের চাদর পুড়ে গেছে। নীলয় হতভম্ব হয়ে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল।
মৃদু গলায় বলল, “খুলে বলো সবটা।’’
রোহিনী কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। একটু পর সে নীলয়কে বলল, “অগ্নিপক্ষী নামক করন করেছিলে তুমি মনে আছে?’’
“আছে! কিন্তু তখন তো তুমি রান্না ঘরে ছিলে! আমার কথা কী করে শুনলে?’’
“সেই অগ্নিপক্ষীর বাস্তব রূপ আমি!’’
কথাটা বলেই রোহিনী চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল, তার গায়ে থাকা জামা আগুনের উত্তাপে পুড়ে যেতে লাগলো। পুরো শরীরে তার আগুন আর আগুন। পিঠ দিয়ে বের হলো অগ্নির তৈরি দুটো ডানা!
নীলয় বেশ আশ্চর্য হলো, কারণ রোহিনীর আশে পাশে থাকা কিছুই পুড়ছে না এমনকি রোহিনীর পাশে সে বসে থাকার পরও এক ফোটাও আগুনের উত্তাপ অনুভব করতে পাড়ছে না। নীলয়ের চোখের সামনে রোহিনীর গায়ে থাকা আগুন এবং অগ্নি ডানা অদৃশ্য হতে থাকল।
.
.
মিনিট পাঁচেক ধরে দুইজনই চুপচাপ বসে রয়েছে। নীলয় কিছুক্ষণ ভেবে, ওঠে দাঁড়াল। একটা চাদর এনে নগ্ন রোহিনীর গায়ে প্যাঁচিয়ে দিলো।
নীলয় রোহিনীর হাত ধরে বলল, “এর কী কোনো প্রতিষেধক নেই।’’
রোহিনী ক্ষীণ গলায় বলল, “আছে!’’
নীলয় একটু ভেবে বলল, “শুরু থেকে আমায় সবটা বলবে, তবে এখন না!’’
রোহিনীকে নীলয় বিশ্রাম নিতে বলল, সে বলল, “আজ কোনো কাজ করতে হবে না। বাহির হতে খাবার আনবো। তুমি বিশ্রাম নেও, অনেক চাপ পড়েছে তোমার উপর।’’
রোহিনী নীলয়ের হাত চেপে ধরে বলল, “এত কেয়ার করছ কেনো?’’
নীলয় একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “স্বাভাবিক মানুষের তিনটি খারাপ অবস্থা রয়েছে। সেগুলো হলো রাগ,ঘৃণা আর কষ্ট। যেকোনো একটা পরিস্থিতিতে পড়লে খুব খুব খারাপ লাগে। বর্তমানে তোমার তিনটে অবস্থায়ই এক সাথে বিরাজ করছে। যেটা খুবই বিচ্ছিরি। ধর্ষনের বিভৎস স্মৃতি তোমার ভেতর এখন ঘৃণা আর রাগ জাগিয়েছে আর অগ্নিপক্ষী হবার ঘটনা শুধু কষ্ট! স্মৃতি কাতরতা সর্বদা ভালো ফল বয়ে আনে না।’’
রোহিনীর গায়ে কাঁথা দিয়ে নীলয় তার মাথা হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। দেখতে দেখতে রোহিনী ঘুমিয়ে পড়ল।
চলবে………..
পর্ব-৩
রোহিনীর ঘুম ভেঙেছে কিছুক্ষণ হলো। তার পাশে বসে আছে নীল, তার হাতে খাবারের প্লেট।
“ক'টা বাজে?’’ প্রশ্ন করলো রোহিনী।
“বিকেল পাঁচটা।’’
নীলয়ের কথা শোনে রোহিনী বিস্মিত নয়নে তার দিকে চেয়ে রইল। নীলয় একটু হেসে বলল, “অবাক হবার কিছু নেই। জ্বর এসেছে তোমার ,নিজের কপালে হাত দিয়ে দেখো। জ্বরের লম্বা ঘুম হয়েছে। ’’
রোহিনী নিজের কপালে হাত দিয়ে দেখলো আসলেই তার জ্বর এসেছে। নীলয় একটা ভেজা গামছা দিয়ে রোহিনীর মুখ মুছে দিলো, সে একটু দুষ্টুমি করে বলল, “আজ আমার মতো বউ পেয়েছেন বলে এত সেবা যত্ন পাচ্ছেন। আমি একজন জামাই সেবক বউ।’’
কথাটা বলে নীলয় নিজেই হাসতে লাগলো। আর রোহিনী ফিক করে হেসো দিলো। একটু পর রোহিনী বলল, “তোমার যত দেখি মুগ্ধ হই।’’
“এত অল্পতেই মুগ্ধ? অল্পতে তো শুনেছি কবিরা মুগ্ধ হয়। তা তুমি কবে থেকে কবি হলে?’’
“হয়েছি তো! লিখিও প্রতিদিন।’’
“কোথায় লিখেন?’’
“মনের আঙ্গিনায় প্রতি মুহূর্ত আপনাকে লিখি।’’
“হয়েছে এবার হা করুন, খাবারটা খেয়ে নিন।’’
রোহিনী আর কোনো কথা না বলে নীলয়ের হাতে খাবারটা খেয়ে নিলো। এমন সেবা যত্ন তো আর হাত ছাড়া করা যায় না। খাবার শেষে রোহিনী নীলয়কে প্রশ্ন করলো, “এত ভালোবাসো কেনো আমায়? কী আছে আমার ভেতর?’’
নীলয় রোহিনীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল, “আমিও তোমার কাছে একই প্রশ্ন। উত্তর আছে কী?’’
রোহিনী মাথা নাড়িয়ে বলল, “এ প্রশ্নের উত্তর হয় নাকি?’’
“আমারও একই উত্তর। এই প্রশ্নের উত্তর হয় না।’’
রোহিনী আর একটা কথাও বলল না। শুধু মুচকি হাসি হাসতে লাগলো। আচমকা রোহিনী নীলয়ের শার্টের কলার ধরে তার দিকে টান দিলো। নীলয় হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “ কী করছ কী!’’
দুষ্টামির ছলে রোহিনী বলল, “চুপ আর কোনো কথা নয়। ’’
“বুঝেছি আপনার মতলব।’’
.
.
কিছুক্ষণ পর
“তা এবার তোমার মন ভালো হয়েছে?’’প্রশ্ন করলো নীলয়।
কাঙ্ক্ষিত প্রত্যুত্তর না দিয়ে রোহিনী বলল, “তোমায় সবটা বলব। সব!একদম শুরু থেকে সবটা।’’
নীলয় কিছু বলল না। এক দৃষ্টিতে রোহিনীর দিকে চেয়ে রইল। রোহিনী নীলয়ের এমন দৃষ্টি দেখে বলল, “উহু বলতে দিবা কী? এমন দৃষ্টি অতি সহজে মনোযোগ বিগ্ন করে। ’’
নীলয় এবার একটু সাধারণ ভাবে তাকাতে লাগলো। রোহিনী একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলো……
ফিরে দেখা
এক বছর তিন মাস আগে
“অসুস্থ পিতার জন্যে রোগ প্রতিষেধক ঔষধ নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম। রাত তখন বেশি নয়। হাত ঘড়িতে দেখলাম ন'টা বাজে। তবে মনের ভেতর একটা ভয় কাজ করছে। আজও যদি পথে মাতালগুলো বিরক্ত করে!’’ ঔষধ হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিল রোহিনী। দুটো চিন্তা তাকে গ্রাস করে চলেছে। প্রথম এবং প্রধান চিন্তার হেতু হলো তার অসুস্থ পিতা। দ্বিতীয় কারণ সেই মাতাল ছেলেগুলো। এক কথায় চিন্তা আর ভয় দুটো তাকে চেপে ধরেছে। প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তাকে এই মাতালগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। লাস্যময়ী তয়না হওয়া তার কাছে এখন কোনো গৌরবের বিষয় নয়। বরং তার চিন্তার কারণ। আমাদের সমাজ আবার এই নারী উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে তেমন ওতটা সতর্ক নয়। সতর্ক তখনই হয় যখন নিজ বোনের উপর এই হায়নাগুলো নজর দেয় তখন।
পথটা নির্জন। এক দুটো কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছে। রোহিনী থমকে দাঁড়ালো। সামনে সেই তিনটে মাতাল ছেলেগুলো। হাতে তাদের মদের বোতল। মদ্যপানে ব্যস্ত তারা। রোহিনী ভাবলো দৌড় দিয়ে সে এখান থেকে পালাবে। তার ভাবনার সমাপ্তি ঘটার পূর্বেই মাতালগুলো তার সামনে হাজির। একটা মাতাল বলে ওঠল, “তোর হাতে ওগুলা কী? দে তো দেখি। ’’
রোহিনীর হাত থেকে ছেলেটা ঔষধ কেড়ে নিতে চাইল। ছেলেটা হয়তো ইয়াবার প্যাকেটই ভাবছে।
রোহিনী বরাবরই রাগি মেয়ে, মিনিট দুয়েক ধস্তাধস্তির পর ঠাস করে একটা চড় ছেলেটার গালে সে বসিয়ে দিলো। ছেলেটা চড় খেয়ে হাসতে লাগলো। বাকি দুটো ছেলে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। চড় খাওয়া ছেলেটা বাকি দুটো ছেলেকে অশ্লীল কিছু কথা বলল। রোহিনী বুঝতে পাড়ল তার সাথে তারা এখন কী করতে চলেছে। এখান থেকে তার পালাতে হবে। রোহিনী পালাতে চাইল, কিন্তু একটা ছেলে তার হাত চেপে ধরে। রোহিনী তাকে ধাক্কা দিতে নেয়, কিন্তু তার আগেই মাতাল ছেলেটা তার হাতে থাকা মদের বোতলটা দিয়ে জোরে আঘাত করলো।
রোহিনীর কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো। জ্ঞান হারাল সে।
.
.
বর্তমানে
নীলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এরপর জানো সকালে নিজেকে বস্ত্রহীন অবস্থায় পাই। ছেঁড়া জামা কাপড় দিয়ে কোনো মতে নিজের লজ্জাজনক স্থান ঢেকে বাড়ি অব্দি যাই। জানো পুরো পথ ধরে অনেক লোক ছিল, কিন্তু জানো সবাই শুধু তাকিয়েই ছিল। কেউ না একটুও এগিয়ে আসেনি। কেউ নিজ ইচ্ছে থেকে না কখনো কাউকে সাহায্য করে না। ’’
নীলয় রোহিনীর গালে হাত দিয়ে বলল, “সবাই এক নয়! যা-হোক তারপর কী হয়েছে?’’
“এরপর সেই এলাকা ত্যাগ করি। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলাম তারা ধর্ষণের প্রমাণ চায়। কিছু পরীক্ষা হয়, এরপর যখন প্রমাণ হয় ওরা আমাকে ধর্ষণ করেছে তারপর ওই ছেলেগুলোর কাছ থেকে হুমকি ধমকি। আরেক দিকে সমাজে মুখ দেখানোর মতো অবস্থা নেই। পরে এলাকা ত্যাগ করি। মামলা তুলে নিই! নতুন এলাকায় আসার পর জানো বাবা স্টোক করে মারা যান। আমি কয়েকবার আত্মহত্যার কথা ভেবেও করতে পারিনি। কারণ আমার ছোট বোন আর মা তো এখন পুরোপুরি আমার ওপর নির্ভরশীল। আর আমার সেই জবটাও কয়েক দিন অফিসে না যাওয়ায় হারিয়ে ফেলি। অসম্ভব বাজে ছিল দিনগুলি। জানো সেদিন একটা শিক্ষা আমি পেয়েছি। ’’
“কী শিক্ষা?’’
“সমাজ না ধর্ষক থেকে ধর্ষিতাকে বেশি ঘৃণা করে। কেনো জানো? ধর্ষক শাস্তি না পেলে তাকে কেউ আর ঘৃণা করবে না, করলেও ক'দিন। তারপর সবাই ভুলে যাবে। আর যদি বিচার হয় তাতেও কী লাভ? ছাড়া পাবার পর ক্ষমতা থাকলে তারা একটা ভালো বউ ঠিকই পায়। আর ধর্ষিতা? সে তো সমাজে লজ্জার কারণে মুখ দেখাতেই পারে না,আর বিয়ে? ধর্ষিতা শুনলে প্রথমে ছেলে পক্ষের লোকেরা বিস্মিত গলায় টেনে বলবে, “কিহ!’’।তারা তো মেয়েরই দোষ দিবে। বলবে পোশাক কিংবা চরিত্রের দোষ। আর বিচার পেয়েও কী? একটা নারীর কাছে তার সতীত্বের মূল্য পুরো পৃথিবীর চেয়েও বেশি,চরিত্রহীনদের কথা বাদই দিলাম। ’’
নীলয় কিছু বলল না। রোহিনীর কথাগুলোর যথার্থতা রয়েছে।
রোহিনী একটু থামল। এরপর সে আবার বলা শুরু করলো….
ফিরে দেখা
“জমানো টাকাগুলো প্রায় ফুরিয়ে গেয়ে। চাকরি না পেলে এবার না খেয়ে মরতে হবে। ’’ মনে মনে নিজেকে নিজে বলল রোহিনী।
.
.
“আমার সাথে ঘটে যাওয়া সেই বিভৎস ঘটনার প্রায় দেড় মাস পার হয়েছে। এই তিন মাস বাহিরে দরকার ছাড়া তেমন বের হয়নি, আর হলেও আমার দু'চোখ ছাড়া মানুষ আর কিছুই দেখেনি। আমি চাই না কেউ আমাকে চিনুক, কেউ আমার সম্বন্ধে জানুক। বিশ ডিসেম্বর দু'হাজার আঠারো দিনটি আমার স্মৃতি থেকে হয়তো আর কোনো দিনও মুছবে না। ছোটো খাটো একটা চাকরি পেয়েছি। কোনো মতে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পার করছি। জীবনটা আমার নিমেষের মাঝেই ধ্বংস হয়ে গেলো। আত্মহত্যা করা যদি মহাপাপ না হতো! ছোট বোনটা বায়না ধরেছে এবারের বই মেলায় সে যাবে। বয়স তার সবে মাত্র বারোতে পড়েছে। তার আবদার নাচক করতে পাড়লাম না, বলেছি আজ নিয়ে যাবো। ’’
বর্তমানে
রোহিনীকে থামিয়ে দিয়ে নীলয় বলল, “বই মেলায় আমি গিয়েছিলাম। আর এখানেই প্রথম তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। এক কাজ করি, তুমি তোমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলো আর আমি আমার সাথের। কিছুক্ষণ তুমি কিছুক্ষণ আমি। ’’
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
ফিরে দেখা
“সাদাত স্যার একটা সিগনেচার প্লিজ। ’’ ভিড় ঠেলে ভেতরে যেতে ব্যর্থ হলো নীলয়। হতাশ মনে সে হাঁটা ধরল। হেঁটে নীলয় নিজ স্টলের দিকে যেতে লাগলো। আজ একটা প্রকাশনী হতে তার প্রথম বই ছেপেছে। প্রকাশনীর স্টলের দিকে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিল নীলয়। আচমকা ধপ করে কারো সাথে সে ধাক্কা খেলো।
সে সামনে তাকিয়ে দেখলো একটা বারো থেকে তেরো বছর বয়সী মেয়ে। নীলয় সরি বলার পূর্বেই মেয়েটা নীলয়ের বুকে জোরে একটা ঘুষি দিয়ে বসল।
নীলয় ব্যথা পেয়ে আঁতকে ওঠে বলল, “পিচ্চির হাড় অনেক মজমুদ।’’
রোহিনী তার বোন রিয়েনাকে টেনে স্টলের সামনে এনে দাঁড়াল করাল। বোনকে সে বকতে লাগলো। আর এদিকে নীলয় ভাবতে লাগলো সে এই স্টলের সামনে কেনো এসেছে! স্টলের সামনে সাজিয়ে রাখা একটা বইয়ে তার নজর পড়ল। প্রচ্ছদে লেখকের নাম লিখা রয়েছে, সে লেখকের নাম পড়ল।
“বাহ! নীলয় আহসান! কবিটার নাম তো হুবহু আমার নামের সঙ্গে মিল।’’
স্টলের ভেতর থাকা দোকানী এবং প্রকাশক নীলয়ের কথাটা শোনে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রকাশক এবং দোকানীর এমন দৃষ্টি দেখে কৌতুহলের বসে রোহিনী নীলয়ের দিকে তাকালো।
নীলয় অবাক নয়নে সবার দিকে তাকালো। প্রকাশক নীলয়ের কাণ্ড দেখে ফিক করে হেসে দিলো সেই সাথে দোকানীও। নীলয় ভাবতে ভাবতে খেয়াল হলো বইটি তো সেই লিখেছে। এবারের বই মেলায় তার বই তো বের হবার কথা। তার বই বের হয়েছে যে সেটা দেখার জন্যেই তো সে এখানে এসেছিল!
নীলয় সবার হাসির সাথে তাল মিলিয়ে হাসতে লাগলো।
“আসলে, ইয়ে মানে, মানে আমি মানে! ’’
প্রকাশক বলে ওঠে, “বুঝেছি ভুলে গেছিলে তাই তো। ’’
নীলয় মাথা নাড়ালো। রোহিনীর বোন পুরো বিষয়টা বুঝতে পেরে অট্টহাসিতে মেতে উঠল।
নীলয় রোহিনীর বোন রিয়েনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এই পিচ্চি হাসবা না! তবে আমারই হাসি পাচ্ছে তোমায় আর কী বলব। ইহহহ!হি আমার প্রথম বই। ইয়াহু।’’
প্রকাশক নীলয়কে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুমি আর বদলাবে না।’’
নীলয়ের নজর পড়ল রোহিনীর দিকে, সে বলে ওঠে, “বোরকার ভেতর আপনিও মুচকি মুচকি হাসছেন তাই না? ’’
এই প্রথম রোহিনী মুখ ফুটে কিছু বলল, “হ্যাঁ,ঠিক ধরেছেন! কী করে বুঝলেন?’’
“কবিরা মনের চোখে পর্দা ওপাড়ে কী হচ্ছে সব দেখতে পায়।’’
রোহিনী প্রত্যুত্তরে বলল, “বেশ ভালোই লিখেন আপনি। ’’
“কী করে বুঝলেন?’’
নীলয়ের চোখ গেলো রোহিনীর হাতের দিকে। তার বইটি রোহিনীর হাতে। নীলয় বুঝতে পাড়ল এতক্ষণ ধরে এই বইটিই রোহিনী দেখছিল।
নীলয় জবাবের অপেক্ষা না করেই বলল, “হালকা পাতলা কোনো রকম লিখি।’’
রোহিনী বলল, “প্রথম পৃষ্ঠায় বিশ্বাস নিয়ে যে লিখাটা লিখেছেন সেটা আসলেই অন্য রকম চিন্তা ভাবনা। সচরাচর এমন চিন্তা ভাবনা সম্পন্ন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন।’’
নীলয় রোহিনীকে প্রশ্ন করলো, “আপনি বেশ শিক্ষিত এবং বই পড়ুয়া তাই না?’’
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। রোহিনী নীলয়ের বইটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,”আপনার একটি সাক্ষর পেতে পারি? ’’
নীলয় বিস্মিত চোখে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেরি না করে দ্রুত সাক্ষর দিলো। বইটি কিনে রোহিনী এবং তার বোন সেখান থেকে চলে গেলো। নীলয় এখনো একটা মোহে রয়েছে। তার প্রথম বইয়ের প্রথম কপি এই মাত্র বিক্রি হলো! তাও প্রশংসা এবং সাক্ষরের সহিত!
নীলয়ের কাঁধে প্রকাশক হাত রেখে বলল, “অনুভূতিটা কেমন?’’
“পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উপন্যাসে যতগুলো শব্দ রয়েছে ততগুলো শব্দ দিয়েও আমি পারব না আমার অনুভূতিটা বোঝাতে। স্বপ্ন পূরণ হলে আগে ভাবতাম মানুষ খুশি হয়, উল্লাস করে। কিন্তু আজ নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি আমার ধারণা ভুল ছিল। স্বপ্ন পূরণ হলে সর্ব প্রথম বিশ্বাসই হয় না, আর হলে অনুভূতিটা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। উল্লাস করেও এই অনুভূতি বোঝানো সম্ভব নয়।’’
বর্তমানে
নীলয় রোহিনীকে প্রশ্ন করলো, “বিশ্বাস নিয়ে লিখাটা কি এখনো মনে আছে?’’
রোহিনী হেসে বলল, “হ্যাঁ। তবে এখন তোমার মুখ থেকে এখন শুনতে ইচ্ছে করছে।’’
“ওকে! আবারও বলছি। বিশ্বাস নাকি ভঙ্গুর? মানুষ বলে একবার কারো বিশ্বাস ভাঙ্গলে নাকি আর তার কাছ থেকে বিশ্বাস ফিরে পাওয়া যায় না। বিশ্বাস নাকি খুবই ভঙ্গুর। তবে আমি তো বলবো বিশ্বাস এই পুরো সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে মজমুদ বস্তু। একে ভাঙা যায় না। কী হলো আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? ঠিক আছে তাহলে বিশ্বাস করিয়ে দিই। ছেলেটার ক্যান্সার ধরা পড়েছে, শেষ পর্যায়ে। ডাক্তার বলেছেন আর কয়েকটি দিনই বাঁচবে। কিন্তু মায়ের বিশ্বাস তার ছেলে একদিন সুস্থ হবেই। সে জানে এর চিকিৎসা নেই তবুও সে বিশ্বাস করে একদিন তার ছেলে সুস্থ হবে এবং বহু বছর বাঁচবে। প্রতিনিয়ত ছেলের জন্যে করছেন তিনি প্রার্থনা। দেখলেন ডাক্তারি রিপোর্টও কিন্তু মায়ের বিশ্বাস ভাঙ্গতে ব্যর্থ। তা এখনও কী বিশ্বাস হচ্ছে না যে বিশ্বাস ভাঙ্গে না? তাহলে একজন খুনের আসামীকে জিজ্ঞেস করবেন, যে কিনা প্রকৃত পক্ষে খুন করেছে তাকে এই প্রশ্ন করবেন, “আচ্ছা! তোমার মা কী বিশ্বাস করেন তুমি খুন করেছ?’’ তার উত্তর কী হবে জানেন? আমিই বলছি, “আমার মা তো বিশ্বাসই করেন না আমি খুন করেছি। তিনি তো প্রতি মুহূর্ত আইন এবং আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনে মনে অকথ্য গালি দিয়ে যাচ্ছেন।’’ খুনীর মাকে আপনি হাজার প্রমাণ দিন তাও তার মনের কোনো এক কোণে এই বিশ্বাসটা থেকেই যাবে, যে তার ছেলে খুন করেনি। এমন হাজারও অটুট বিশ্বাসের উদাহরণ আমি দিতে পারবো। সত্যি বলছি, বিশ্বাস কোনো দিনই ভাঙ্গে না। যে বিশ্বাস করে আপনাকে তার বিশ্বাসের যথাযথ মূল্য না দিলেও সে আপনাকে বিশ্বাস করেই যাবে। আর যে আপনাকে সন্দেহ করে, অবিশ্বাস করে তার বিশ্বাসই একমাত্র ভাঙ্গে। বিশ্বাসীর বিশ্বাস কোনো দিনও ভাঙ্গে না, ভাঙ্গে তো অবিশ্বাসীর বিশ্বাস।’’
চলবে……
পর্ব-৪
“রাত তো অনেক হলো, আমি তো আজ খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ি। বাকিটা ঘটনা না হয় কাল বলো?’’ রোহিনীকে বলল নীলয়।
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
খাওয়া দাওয়া শেষে শোবার জন্যে নীলয় বিছানা পরিপাটি করছিল,তখন সে রোহিনীকে জিজ্ঞেস করলো, “আজকে তুমি অতীত নিয়ে যা বললে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তুমি বেশ কয়েক মাস আগে অগ্নিপক্ষী হয়েছ তাই না?’’
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো, কিছু ভাবছে সে। ভাবনায় সে বিভোর। নীলয় আর কথা বাড়ালো না।
.
.
রোহিনীর পাশে শুয়ে আছে নীলয়। দুই জনই জেগে রয়েছে। আচমকা নীলয় বলে ওঠে, “আচ্ছা!সেদিন কম্পিউটারে পিরামিডের ভেতরে পাথরে অঙ্কিত ছবিটি কেনো দেখেছিলে? ’’
রোহিনী নীলয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। একটু ভেবে সে বলল, “চিত্রে আমার প্রতিষেধক খুঁজছিলাম। ’’
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল, “প্রতিষেধকের সঙ্গে পিরামিডের কী সম্পর্ক?’’
রোহিনী বলল, “সবটা বললেই বুঝবে।’’
“তাহলে আর দেরি না করে সবটা বলে ফেলো। আমার আর তর সইছে না।’’
ফিরে দেখা
“সন্ধ্যা হয়েছে মাত্র। উড়োউড়ো মন নিয়ে পথের ধার ঘেঁষে যাচ্ছি হেঁটে।’’ মনে মনে নিজেকে নিজে বলল নীলয়। আনমনা হয়ে হেঁটে যাবার কারণে সে খেয়ালই করেনি কখন যে সে রাস্তার মাঝে চলে এসেছে।
আচমকা নীলয় হাতে প্রচণ্ড টান অনুভব করলো। কেউ তার হাত ধরে হেঁচকা টান দিলো। নীলয় তাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে গেলো। অন্ধকার ঠেলে সে পাশে তাকিয়ে দেখলো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নীলয় তার পায়ের খুব নিকটে দিয়ে একটা দ্রুতগামী গাড়ি যেতে দেখল। সেকেণ্ড দুয়েকের ভেতর তার মস্তিস্কের নিউরনের সিনান্সগুলো সজাগ হয়ে ওঠল। নীলয় পুরে ঘটনাটার একটা চিত্র মস্তিস্কে তৈরি করে নিলো। ঘটনাটা কতটা বিভৎস হতে পারত তা সে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে সক্ষম হয়েছে।
নীলয় ওঠে দাঁড়াল। মেয়েটির নিকট গিয়ে সে বলল, “ধন্যবাদ!’’
নীলয় তৎক্ষণাৎ মেয়েটিকে চিনতে পাড়ল। চিনবে না কেনো? কোনো কবি কী তার সর্বপ্রথম পাঠিকাকে ভুলতে পারে নাকি?
নীলয় ম্লান হেসে বলল, “বাহ! পাঠিকা তো দেখি ক্ষিপ্র গতিশীলও বটে।’’
রোহিনী কোনো কথা বলে হেঁটে চলে যেতে লাগলো। নীলয় পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, “পুরুষ জাতিতে মনে হচ্ছে বেশ ঘৃণা করেন আপনি।’’
রোহিনী একবার পেছন ফেরে তাকালো। কিছু বলল না সে। নীলয়ের কাছে মনে হচ্ছিল যেন সে মনে মনে বলেছে সঠিক।
বর্তমানে
“হ্যাঁ! আসলেই তখন আমি মনে মনে সঠিক কথাটা বলেছিলাম। তা তুমি তো দেখছি একদম প্রথম দিন থেকেই আমাকে বুঝ।’’ বলল রোহিনী।
নীলয় হেসে বলল, “কে জানে! তবে প্রথম দিন থেকেই কেনো জানি তোমার প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। তুমি আমায় যতদূর চেন তা থেকে তুমি নিশ্চয়ই নিশ্চিত তোমার সাথে মোলাকাতের পূর্বে আমার জীবনে অন্য কোনো মেয়ে ছিল না।’’
“হ্যাঁ! তা খুব ভালো করে জানি। নারীর প্রতি আপনার কোনো আকর্ষণ পূর্বে ছিল না জানি আমি, সর্বদা সাধারণ বস্তু কিংবা ব্যক্তির ভেতর অসাধারণ খুঁজতে। সেদিন তুমি গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পারতে, বেঁচে যাবার পরও মগজে দুর্ঘটনা হবার একটা অবাস্তব চিত্র তৈরি করো শুধু মাত্র গল্পকে চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলতে। এখনো তাই করো। ’’ নীলয়ের গালে হাত দিয়ে কথাটা বলল রোহিনী।
নীলয় বলল, “কথা আর না বাড়াই; স্মৃতিতে চলো এক সাথে যাই পিছিয়ে।
ফিরে দেখা
তিন দিন পর হলো। এই তিন দিন নানান ভাবে রোহিনীর সাথে নীলয়ের বারবার সাক্ষাত হতে লাগলো। আর সবচেয়ে আশ্চার্যজনক বিষয় হলো নীলয় প্রতি সাক্ষাৎকারে রোহিনীর সঙ্গে কথা বলার একটা সুযোগও হাত ছাড়া হতে দেয়নি। নীলয় এতদিনে যা জানতে পাড়ল তা হলো রোহিনীর বাবা কিছু মাস আগেই ইন্তেকাল করেছেন, আর ঘরে রয়েছে তার ছোট বোন আর রোগা মা। রোহিনী স্বল্প বেতনের একটা চাকরি করে। মেয়েটির সাথে কথা বলতে বলতে সে বুঝতে পাড়ল মেয়েটি বেশ গম্ভীর স্বভাবের, মন ভাঙা তার। হয়তো পিতা হারানোর শোক সে এখনো কাটিয়ে ওঠতে পারেনি। রোহিনীর বাড়িও তার চেনা। বেশ ভালোই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠছে তাদের ভেতর। নীলয়ের ভিন্নধর্মী সাহিত্যিক কথা শোনতেই রোহিনী মজা পায়।
দেড় মাস পর
“ জানো কবিরা তাদের সারাদিনের কাজ কর্ম তাদের প্রিয় ডাইরীর পাতায় লিপিবদ্ধ করে থাকে, আর এখন তুমি আমার ডাইরীর পাতা হয়ে গেছ। ’’
নীলয়ের কথা শুনে রোহিনী ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল, “কিভাবে?’’
“পেটের থাকা যত কথা আছে সবটা তো তোমাকে বলি। দিনলিপির হাজিরা! ’’
রোহিনীর মা চা নিয়ে হাজির হলো।
নীলয় একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “এমা আন্টি অসুস্থ শরীর নিয়ে চা করতে গেলেন কেনো?’’
রোহিনীর মা বলল, “আমাদের বাড়িতে প্রথম আসলে, খালি মুখে যেতে দিতে পারি নাকি। ’’
নীলয় হেসে বলল, “খালি মুখ?’’
কিছুটা বাতাস মুখে নিয়ে গাল ফুলিয়ে নীলয় বলল, “এই দেখেন ভরা মুখ! ’’
দৃশ্যটা দেখে রোহিনীর মা, রোহিনী এবং রোহিনীর কোলে থাকা রিয়েনা ফিক করে হেসে দিলো।
রোহিনী বলে ওঠে, “তোমার হাসানোর এই দক্ষতাটা বেশ প্রশংসনীয়।তা নতুন বইয়ের নাম কী?’’
“দি হাউণ্ড। ’’
“নাম শুনে যতদূর বুঝলাম ভৌতিক গল্প। ’’
“সঠিক! দুটো ছবি দেখাচ্ছি, দেখে বলো তো প্রচ্ছদ এর জন্যে কোনটি বেশি মানান সই।’’
রোহিনীর মা কিছুক্ষণ নীলয় আর রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে তার হাজারও কথা, কিন্তু পাড়ছে না বলতে। রোহিনীর মা চলে গেলো। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর নীলয় চলে গেলো।
.
.
রোহিনী নিজ রুমে বসে রইল। গভীর ভাবনায় বিভোর সে।
“নীলয়কে আমার ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে দিচ্ছি না তো? একটা ছেলেকে এভাবে কাছে আশার সুযোগ দেয়া কী ঠিক?’’ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো রোহিনী। কিছুক্ষণ সে ভাবল।
“নীলয়ের মন বিশুদ্ধ, তাকে বিশ্বাস করা যায়। সে এখন অব্দি আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে। তার চোখে নম্রতা ছাড়া আর কিছুই আমি দেখিনি।
.
.
নিশি রাত! ঘুম রত অবস্থায় রোহিনী গোঙ্গাচ্ছে। সেই নারকীয় রাতের কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই। কিন্তু আজ তার সাথে তার মগজ নিমকহারাম করলো! ঝাপসা কিছু স্মৃতি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠছে। ছেলেগুলো হিংস্র হায়নার মতো…..!
.
.
রোহিনীর ঘুম ভেঙে গেলো। হাঁপাতে লাগলো সে।
বর্তমানে
রোহিনী করুন দৃষ্টিতে তাকালো নীলয়ের দিকে, সে বলল, “এরপর শুরু আমার জীবনের বাজে অধ্যায়। প্রতি রাতে সেই নিষ্ঠুর স্মৃতিটা নেড়ে চেড়ে বসত। বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে যেত, চিৎকার করে কাঁদতে চাইতাম কিন্তু পারতাম না। চুপচাপ চোখের জল ফেলতাম। প্রতিদিনই তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতে আমার কী হয়েছে। নানান ভাবে আমাকে মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করতে। আমি ধীরেধীরে তোমার ওপর নির্ভরশীল হতে থাকি। বুঝতে পারি অবুঝ মন তোমাকে ধীরেধীরে ভালোবাসতে শুরু করেছে। তখন আমার ভেতর বলতে গেলে তিনটে সত্তা বিরাজ করছিল। একটা রাতের ভিতু রোহিনী, একটা নীলয় পাগলি রোহিনী আরেকটা…!’’
“আরেকটা কী?’’
“আরেকটা সত্তা হলো নিষ্ঠুর রোহিনী! যে চাইত তার স্মৃতি থেকে পালাতে, যেত ভাবত সে নীলয়ের জীবন নষ্ট করছে, নীলয়কে ধোঁকা দিচ্ছে। এই সেই সত্তা যার দরান আজ আমার ভেতর অগ্নিপক্ষীর বিরাজ করছে।’’
নীলয় মনোযোগী দৃষ্টিতে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাঙ্ক্ষিত রহস্য এবার উন্মোচন হবে। নীলয় কানগুলো খাড়া করে রইল
ফিরে দেখা
পুরো রুমে মোমবাতি জ্বালান, একটা টেবিলের ওপর ছোট্ট একটা পিতলের বাটি। টেবিলের চার পাশে রয়েছে একাধিক মোমবাতি। মেঝেতে রক্ত দিয়ে অঙ্কিত দুটো স্টার চিহ্ন। যার মধ্যখানে রয়েছে একটি চোখ। পেন্টাগ্রাম!
বর্তমানে
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল, “পেন্টাগ্রাম তুমি ট্রাই করেছ? বলদ নাকি? পেন্টাগ্রামের প্রচলিত মন্ত্রগুলো সম্পূর্ণ নয়। তাছাড়া এটা করতে সক্ষম হলেও কোনো কাজ হবে না। মস্তিস্কে একটা বিরূপ প্রভার পড়বে। যার ফলে তুমি ভাববে যে তুমি যা চেয়েছিলে পেয়েছো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তুমি কিছুই পাওনি। ’’
রোহিনী কিছু বলল না। নীলয় একটু বলে ওঠে, “এক মিনিট তার মানে কী তোমার পেন্টাগ্রাম সফল হয়েছিল?’’
রোহিনী ক্ষীণ গলায় বলল, “চুপচাপ শুনতে থাকো। ’’
ফিরে দেখা
একটা ধারাল ছুড়ি হাতে টেবিলের পাশে থাকা একটা চেয়ারে বসে আছে রোহিনী। দৃষ্টি তার ছুড়ির দিকে স্থির। বাটির পাশে রয়েছে কিছু কাগজ। সেখানে কিছু প্রাচীন শব্দ ও চিহ্ন লিখা। রোহিনী আচমকা হাতের রগ লক্ষ্য করে ছুড়ি দিয়ে টান দিলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। রোহিনী তার হাতে বাটির ওপর রাখল। সেখানে হাত বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো। বাটিটি কিছুটা পরিপূর্ণ হতেই রোহিনী তার হাত হতে রক্ত পড়া বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়েছে পড়ল।
.
.
চোখ খুললেই রোহিনী নিজেকে হাসপাতালে পেলো। এক হাতে তাকে রক্ত দেয়া হচ্ছে আরেক হাত তার ব্যান্ডেজ করা। রোহিনী বুঝতে অধিক পরিমাণে রক্ত ক্ষরণের কারণে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রোহিনী জানলার দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো। আকাশে উড়ছে কতগুলো পেস্টাগ্রামের চিত্র! স্টারের মতো দেখতে চিহ্নগুলোর মাঝে থাকা চোখটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
চলবে……
পর্ব-৫
পেন্টাগ্রাম অর্থাৎ শয়তান আহ্বানের একটি পদ্ধতি। মূলত শয়তান পূজারীরাই শয়তানকে দেখার স্বাদ মেটাতে এবং নিজের ইচ্ছেগুলো শয়তানের কাছে তুলে ধরতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। তবে বর্তমানে এটি অচলও বলা চলে, কারণ যারা করেছে তারা কেউ কোনো ভালো সুফল পাননি। বেশির ভাগই অধিক রক্তক্ষরণের ফলে সম্পূর্ণ পূজা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়নি, আবার যারা সফল হয়েছে তাদের বেশির ভাগই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে মোমবাতি জ্বালাতে হয়, মেঝেতে রক্ত দিযে পেন্টাগ্রামের ছবি আঁকতে হয়, বাটিতে রগ কেটে নিজের রক্ত সংরক্ষণ করতে হয়। এরপর শয়তানকে ডাকার কাজ শুরু করতে হয়।
পেন্টাগ্রাম নিয়ে নীলয় তার ডাইরীতে কয়েক বাক্য লিখল। ভোর হয়েছে ঘণ্টাখানেক আগে, গত রাতে তারা আর কথা না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বাকিটা আজ রোহিনীর মুখ থেকে শুনবে নীলয়। কিন্তু হয়তো আজ আর বাকি ঘটনা শোনা হবে না; এর হেতু হলো নীলয় আজ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ দিতে পাচ্ছে সে ;যদি টিকে!।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে নীলয় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
“একটা কবি হঠাৎ গোয়েন্দা হতে চাচ্ছ? জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে কী আপনি অবগত? আর আপনার সেই পরিমাণ যোগ্যতা কী আছে?’’ প্রশ্ন করলেন নীলয়ের সামনের চেয়ারে বসে থাকা পরীক্ষক।
নীলয় মৃদু গলায় বলল, “চেষ্টা করব। ’’
পরীক্ষক না সূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন, “এই যে এখুনি আমার সামনে কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হচ্ছে, প্রতিকুল পরিবেশে কী হবে?’’
নীলয় কিছু একটা বলতে নিলো। নীলয়কে থামিয়ে দিয়ে পরীক্ষক বললেন, “লিখিততে ভালো করলেই হয়না, মৌখিক হলো আসল। ’’
নীলয়ের সামনে কয়েকটা ছবি এগিয়ে দিয়ে পরীক্ষক বললেন, “এই ছবিগুলো ভালো করে অনুধাবন করে খুনীকে বের করো। ’’
নীলয় পরপর ছবিগুলো দেখতে লাগল। পরীক্ষক বললেন, “গোয়েন্দা হতে হলে দরকার নিউরনের সিনান্সের নিখুঁত সংযোগ। কর্ণ হতে হবে সর্বদা খাড়া, প্রতিটা শব্দ যেন মস্তিস্কে পৌঁছায়। লক্ষ্য হতে হবে স্থির, চোখ জোড়া হতে হবে পাথরের মতো, মুখে থাকতে হবে হাসির দাগ। যে কেউ যেন দেখে বলতে পারি, লোকটা বেশ রসিক। ভেতরে থাকা তীক্ষ্ণতা যেন কেউ না বুঝতে পারে। সাধারণের চেয়েও সাধারণ হতে হবে। ’’
নীলয় মাথা তুলে মুচকি হেসে বলল, “কারণ অসাধারণেরা সর্বদা অতি সাধারণ হয়। আর সিনান্সের সংযোগ? অবাস্তব ঘটনার বাস্তব বিম্ব মস্তিস্কে সৃষ্টি করতে শুধু নিউরনের সিনান্সের নিখুঁত সংযোগই নয় দরকার দৃঢ় মনোবলও।’’
নীলয় ছবিতে থাকা একটা ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলল, “এ হলো খুনী। ’’
পরীক্ষক অবাক হয়ে নীলয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। সে সঠিক বলেছে, তাও খুব অল্প সময়ের মধ্যে।
নীলয় মুচকি হেসে বলল, “ছবিগুলো দেখে পুরো ঘটনার একটা অবাস্তব চিত্র মস্তিস্কে তৈরি করলাম। এরপর মুহূর্তের ভেতর খুনীকে শনাক্ত করে ফেললাম। ’’
পরীক্ষক হাতলবিহীন চেয়ারটা ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল, নীলয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটা কিছুক্ষণ পায়চারি করে আবার নিজ আসনে ফিরে আসলো।
“শব্দের খেলা জানো?’’
নীলয়ের এই সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই পরীক্ষক বলে ওঠে, “সাহিত্যিক মানুষ, তা তো বেশ পারবে। ’’
পরীক্ষক তার ডান হাত প্রশস্ত করে নীলয়ের দিকে এগিয়ে দিল। নীলয় হ্যান্ডশেক করে নিলো।
.
.
দরজা খুলতেই নীলয়ের হাসিমুখ দেখে রোহিনীও একটা বিজয়ী হাসি হাসল, সে বলল, “টিকেছ তাহলে?’’
“ভেতরে এসে বলি?’’
.
.
গোয়েন্দা প্রধান তার সহকারীকে বললেন, “সাহিত্যিক মানুষ গোয়েন্দা হতে প্রথম দেখলাম। এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ রয়েছে।’’
“আমি তো নিতে চাচ্ছিলাম না, আপনিই বললেন নিতে। আমার চেয়ে আপনিই ভালো বুঝবেন।’’
রুমের ভেতর পরীক্ষক পায়চারি করার নাটক করেছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন গোয়েন্দা প্রধানের নির্দেশের। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তিনি নিজ আসনে ফিরে আসেন।
গোয়েন্দা প্রধান একটু মাথা নাড়িয়ে বলল, “ছেলেটার উদ্দেশ্য জানতেই নিয়েছি। ওর ওপর নজর রাখো, ছেলেটার পুরো হিস্টোরি আমার চাই। ’’
“ঠিকাছে, স্যার। ’’
.
.
সন্ধ্যা হতে আর কিছুক্ষণ বাকি, বারান্দায় বসে নীলয় আবছা লাল আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একা মনে নিসাড়ে কিছু ভেবে চলেছে সে।
রোহিনী নীলয়ের চেয়ার ঘেঁষে চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। নীলয়ের হাতে রোহিনী চায়ের কাপটা দিলো, সে বলল, “চা কিন্তু গরম, ফু দিয়ে খেও।’’
নীলয়ের মন হলো অন্য দিকে, রোহিনী কথাগুলো নীলয়ের এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে ফুড়ুত করে বেরিয়ে গেলো।
চায়ের কাপে চুমুক দেবার সেকেণ্ড পাঁচেক পরে নীলয় আঁতকে ওঠল, মুখ দিয়ে একটা চাপা আর্তনাদ বের হলো। চায়ের কাপটা রোহিনীর হাতে দিয়ে নীলয় অর্ধহাত সমান জিহ্বা বের করে লাফাতে লাগল।
“ওরে মারে জ্বলে গেলো রে!’’
নীলয়ের কাণ্ড দেখে রোহিনী হাসতে লাগলো, সে বলল, “মন তোমার কোন দিকে?’’
জ্বালা কিছুটা প্রশমিত হলে নীলয় বলে ওঠে, “সামনের এক মাসের কার্যকলাপ ভাবছিলাম। ’’
“এ আবার কেমন ভাবনা? অদ্ভুত তো? ’’
নীলয় শুধু একটা রহস্যময় হাসি হেসে রুমে চলে গেলো।
.
.
রাত তখন দশটা, খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে রোহিনী আর নীলয় বসে আছে নিজেদের রুমের খাটের ওপর।
নীলয় মাথা হালকা ঝাঁকি দিয়ে বলল, “তো শুরু করা যাক?’’
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
ফিরে দেখা
হাসপাতালে বেডে শয়নরত অবস্থায় থাকা রোহিনীর অপলক দৃষ্টি জানলার বাহিরে। তার পাশে থাকে তিনজন ব্যক্তির দিকে তার বিন্দু মাত্রও লক্ষ্য নেই। রোহিনীর ডান পাশের টুলে বসে আছে নীলয় আর বাম পাশে রোহিনীর মা এবং ছোট বোন। জ্ঞান ফিরেছে দেখে নীলয় রোহিনীকে কয়েকবার ডাক দিলো। তেমন কোনো সাড়া দিলো না রোহিনী।
মিনিট পাঁচেক পর রোহিনীর চোখ গেলো তার মায়ের দিকে, সে ওঠে বসার চেষ্টা করল। নীলয় বাঁধা দিয়ে বলল, “শুয়ে থাকো। ’’
রোহিনী এক নজর নীলয়ের দিকে তাকালো, অপরাধীর মতো তার মুখ লজ্জিত এবং মাথা নিচু।
নীলয় কিছু ঔষধ আনতে নিচে চলে গেলো, রোহিনীর মা রোহিনীকে প্রশ্ন করলেন, “এমন কেনো করলি?’’
রোহিনী চুপ করে শুয়ে আছে।
“অতীতের কথা ভুলে যা! আর কোনো দিনও আত্মহত্যার চেষ্টা করবি না;আমাদের জন্য না হয়!’’
রোহিনী কিছু বলছে না, অন্য দিকে সে তাকিয়ে আছে।
রোহিনীর মা আবারও বলতে শুরু করলেন, “নীলয় ছেলেটা কিন্তু তোর এমন কর্মকাণ্ডে খুব কষ্ট পেয়েছে। ’’
রোহিনী তার মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “পাক কষ্ট আমার কিছু যায় আসে না। আমার থেকে দূরে গেলেই খুশি! ’’
রোহিনীর মা কিছু বলল না। চুপ করে তিনি বসে রইলেন, কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই জানেন তিনি।
.
.
ঔষধ হাতে ফার্মেসীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীলয়। একা মনে সে কিছু ভাবছে।
ঘণ্টাখানেক আগে…
হাসপাতালে রক্তের ব্যাগ নিয়ে হাজির হলো নীলয়। কিছুক্ষণের ভেতর রোহিনীকে রক্ত দেওয়া শুরু হলো। নীলয় রোহিনীর মায়ের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল, “আণ্টি,রোহিনী আচমকা আত্মহত্যার চেষ্টা কেনো করল?’’
“জানি না বাবা,আমিও বুঝতে পারছি না। ’’ অশ্রুভেজা চোখে বললেন রোহিনী মা।
“আপনার চোখের ভাষা আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি, দেখুন মিথ্যে বলবেন না। ’’
অনেক যাবৎ নীলয়ের জোরজুরিতে রোহিনীর মা বাধ্য হয়ে বললেন, “শোনো তার মন-মানসিকতা বাকি আট দশটা মেয়ের মতো। সে আগেও কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ’’
“কিন্তু কেনো?’’
“কারণ সে ধর্ষিতা! ’’ কাঁদতে কাঁদতে কথাটা বললেন রোহিনীর মা।
কথাটার অর্থ বুঝতে নীলয়ের কিছুক্ষণ সময় লাগল। কথার অর্থ বোঝার পর নীলয়ের চোখ দিয়ে পানি জড়িয়ে পড়ছে লাগল ,তার হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেলো। নিজেকে সামনে নিয়ে নীলয় বলল, “ধর্ষিতা বলছেন কেনো? বলুন কিছু নরপিশাচদের খাদ্যে পরিণত হয়েছিল নিরীহ মেয়েটা।’’
“তোমার সঙ্গ পেয়ে মেয়েটা একটু স্বাভাবিক হচ্ছিল, কিন্তু গত কয়েকদিন যাবৎ আবারও পুরোনো অতীতগুলো ওকে তাড়া করতে লাগল। সহ্য করতে না পেরে হয়তো আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিয়েছে। তোমার কাছ থেকে এতদিন ধরে এই বিষয়টা লুকানোর মূল কারণ রোহিনী তোমার সঙ্গ পেয়ে সুস্থ হচ্ছিল। আমি কখনো চাইনি তুমি সত্যটা জেনে যাও। ’’ চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাটা বললেন রোহিনীর মা।
নীলয় একটা মরা হাসি দিয়ে বলল, “ভেবেছিল সত্যটা জানলে আমি রোহিনীকে ছেড়ে চলে যাব।’’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল নীলয়। একটু পর সে বলল, “আমি রোহিনীকে ভালোবাসি, তাকে বিয়ে করতে চাই। ’’
রোহিনীর মা কিছু বললেন, চুপ করে নীলের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
ফার্মেসীর ছেলেটার কথায় হুস ফিরল নীলয়ের।
“ভাই, এভাবে দাঁড়িয়ে কেনো? আর কোনো ঔষধ লাগল কী?’’
নীলয় না সূচক মাথা নাড়িয়ে সেখানে থেকে চলে গেলো।
বর্তমানে
রোহিনীর মৃদু আর্তনাদে নীলয় থমকে গেলো। রোহিনী তার মাথা চেপে ধরে আছে, প্রচণ্ড প্রেশার নেওয়ার ফলাফল।
“মাথা আমার ব্যথা ফেটে যাচ্ছে..! ’’মাথা চেপে ধরে কথাটা বলল রোহিনী।
নীলয় রোহিনীর মাথা মলন লাগিয়ে দায়ে বলল, “আজ আর কিছু বলতে হবে না। তোমার উপর অনেক চাপ পড়ছে।’’
রোহিনী কিছু বলল না। নীলয় রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, সে বলল, “ঘুমিয়ে পড়ো। ’’
সকালে
আজ কর্ম সংস্থানে নীলয়ের প্রথম দিন। মুক্তহস্তে উপার্জন করা ছেলেটা হঠাৎ অন্যের জন্যে কাজ করতে শুরু করল? বিষয়টা নীলয়ের পুরো পরিবারকে অবাক করছে। হয়তো দায়িত্বের ভারে করছে সে।
.
.
গোয়েন্দা প্রধানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীলয়। গোয়েন্দা প্রধান খুঁটিয়ে দেখছে নীলয়কে।
গোয়েন্দা প্রধান একটা বড় হাসির রেখা টেেন বলল, “প্রথম এক সাহিত্যিক গোয়েন্দাকে দেখলাম। ’’
গোয়েন্দা প্রধান কিছু বলার আগেই নীলয় একটা ফাইল উনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “একটু দেখুন তো স্যার। ’’
গোয়েন্দার প্রধানের কথার প্রভাবে বাঁধা দেবার কারণে উনার মুখে থাকা হাসিটা নিমেষের মাঝেই মিলিয়ে গেলো। কিন্তু তবুও নীলয়কে কিছু না বলে ফাইল সে দেখে নিলো। সহজ সরল একটা কেস। গোয়েন্দা প্রধান চোখ গরম করে বলল, “এত পুরনো একটা কেস দেখতে বলছ? প্রথম দিনে এমন বেয়াদবি! প্রধানের মুখের ওপর কথা বলা। ’’
নীলয় কিছুটা নম্র ভাবে বলল, “স্যার, আমি কেসটা ওপেন করতে চাচ্ছিলাম। স্যার, না করবেন না।’’
গোয়েন্দা প্রধান তার পাশে থাকা কাচের টেবিলে একটা ঘুষি মেরে বলল, “এই ধর্ষণের কেস নিয়ে এত আক্ষেপ কেনো? এই জন্যেই কী জয়েন দিয়েছ? এই ধর্ষিতা মেয়ে তোমার কী লাগে? ’’
ধর্ষিতা! শব্দটা কয়েকবার নীলয়ের কানে বাজতে লাগল। নীলয়ের কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল, চোয়াল শক্ত হতে লাগল। নিঃশ্বাসগুলো হতে লাগল ভারি, একটা হিংস্র বাঘের মতো দেখাচ্ছে তাকে।
নীলয় তার পাশে থাকে কাচের টেবিলে তিন থেকে চারটে ঘুষি মারল। কাচে ভেঙে গেলো, কাচ ভাঙার শব্দে পুরো রুম কেঁপে ওঠল।
রুমের ভেতর তৎক্ষণাৎ রিভলবার হাতে দুইজন প্রবেশ করল। তারা কিছু করে ওঠার আগেই নীলয় বলে ওঠে, “মেয়েটি কোনো ধর্ষিতা নয়, সে আমার সহধর্মিণী।’’
গোয়েন্দা প্রধান হাতের ইশারা রিভলবার হাতে থাকা দুইজনকে থামতে বলল। গোয়েন্দা প্রধান নীলয়ের কাছ থেকে আর কিছু শুনতে চাচ্ছেন, হয়তো শুরু থেকে তিনি এটাই চাচ্ছিলেন- নীলয়ের উদ্দেশ্য।
চলবে….
ভালো, মন্দ, ভুল, ত্রুটি জানাবেন ……!
পর্ব-৬
চিৎকার দিয়ে নীলয় বলতে লাগল, “বিগত কয়েকটা মাস ধরে আমি হাজারও কেস স্টাডি করেছি, শুধু মাত্র এখান অব্দি আসার জন্যে। ভেবেছিলাম এখানে আসতে সক্ষম হলে আপনাদের কাছ থেকে সাহায্য পাব। কিন্তু ভুল ছিলাম আমি। ’’
নীলয় আরো কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো, গোয়েন্দা প্রধানের চোখের দৃষ্টিটা ভিন্নধর্মী।
আচমকা দরজা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করল এক সুদর্শন পুরুষ। লম্বা, প্রসারিত বক্ষ, মুখে এক গম্ভীর ভাব, চোখ দুটো পাথরের মতো।
ছেলেটা রুমে প্রবেশ করেই রিভলবার হাতে থাকা দু'জনকে চলে যেতে বলল। তারা ছেলেটার আদেশ মোতাবেক রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ছেলেটা রুমের ভেতর পায়চারি করতে লাগল, ভাঙা কাচের টুকরোগুলো সে দেখতে লাগল। রুমে এখন একরাশ নীরবতা। গোয়েন্দা প্রধান নিজ আসনে বসে আছেন আর নীলয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটা নীলয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, নীলয় হ্যান্ডশেক করল না। হাত সরিয়ে নিয়ে ছেলেটা নীলয়ের সামনে থাকা চেয়ারে বসে পড়ল, টেবিলের ওপর পরে থাকা ফাইলটা সে হাতে তুলে নিলো। ফাইলটায় চোখ বুলিয়ে ছেলেটা গোয়েন্দা প্রধানের দিকে এক বিজয়ী দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। একটা মুচকি হাসি দিয়ে ছেলেটা বলল, “স্যার?’’
গোয়েন্দা প্রধান চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ,মানছি তুমিই সঠিক ছিলে।’’
ছেলেটা তার আসনে বসে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “ধন্যবাদ।’’
নীলয় পুরো ঘটনাটা কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মস্তিস্কে চালনা করতে লাগল, বিষয়টা এখন তার মগজে ঢুকছে না। কী করতে তারা?
নীলয়ের দিকে ছেলেটা তাকিয়ে বলল, “নীলয় আহসান, নামটা খুব সুন্দর। নামের সহিত মিল রেখে কাজ করো তুমি। বেশ ভালো। চারিত্রিক গুনগুলোও যথেষ্ট ভালো,সাথে মেধাও আছে। আমার সহকারী হিসেবে তোমাকে পেয়ে সত্যিই আমি খুব সন্তুষ্ট। গায়েও ভালো জোর আছে। কিছু প্রশিক্ষণ দিলে হবে! ওহ! হ্যাঁ, আমি ফারহান। তোমার মতোই একজন গোয়েন্দা, শুধু পার্থক্য হলো আমি এখানে পাঁচ বছর ধরে আছি আর তুমি সবে মাত্র জয়েন দিয়েছ। তোমাকে নিতে আমিই গোয়েন্দা প্রধানের কাছে অনুরোধ করেছিলাম, হেতু তুমি আমার একটা কেসের সাথে সংযুক্ত। ’’
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে বলল, “আপনার একটা কেসের সাথে সংযুক্ত বলতে?’’
ঠোঁট জোড়া এক সাথে চাপ দিয়ে ফারহান বলল, “আপনি করে না তুমি করে সম্বোধন করো।’’
নীলয় হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
_ ‘মন দিয়ে কথাগুলো শ্রবন করো। তোমার পুরো অতীত আমার জানা, তোমার পেশা তোমার চরিত্র সবকিছু আমার জানা। ক'দিন আগে একজন ঘড়ির দোকানী আগুনে পুড়ে মারা যায়। হয়তো খবরের কাগজে তুমি পড়েছ।’
_ ‘পড়েছি! কেসের সাথে আমার সংযোগ কিভাবে?’ ফারহানের হাতের ইশারায় দেখানো চেয়ারে বসে পড়ল নীলয়। নীলয়ের মাথায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে হাজারও প্রশ্ন।
_ ‘শোনো একটা ফিনিক্স তার আগুনের তেজ দিয়ে দোকানীকে হত্যা করেছে। ফিনিক্স অর্থাৎ অগ্নিপক্ষী। আর এই মাত্র যেই কেসের ফাইলটা তুমি আমাকে দিয়েছ সেখানে তিনজন ধর্ষকের ছবি, নাম, ঠিকানা রয়েছে। আর ধর্ষক তিন জনের মধ্যে একজন হলো সেই দোকানী।’
কিছুটা ঝুঁকে বসল নীলয়, সে বুঝতে পেরেছে রোহিনী সেই লোকটাকে পুড়িয়ে মেরেছে ।
_ ‘আচ্ছা, একটা প্রশ্ন রূপকথার অগ্নিপক্ষী সম্পর্কে তুমি কী করে জানো?’’
ফারহান এক গাল হাসল, নিজের রিভলবারটা বের করে নীলয়ের হাতে দিল।
_ ‘এই রুম থেকে বের হয়ে সোজা ডান পাশে হাঁটতে থাকতে, শেষ মাথায় একটা রুম পাবে। সেখানে দুটো লোককে পাবে, গুলি করে তাদের মেরে ফেলো, যাও। ’’
নীলয় ফারহানের কথা শোনে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। ফারহান এক গাল হাসল।
_ ‘ভয় পাবার কিছু নেই। যেই লোক দুটো তুমি দেখতে পাবে তাদের তুমি সাথে সাথেই চিনে ফেলবে।’
ফারহানকে থামিয়ে দিয়ে নীলয় বলল, “কারণ সেই দু'জন হলো ধর্ষণ তাই না?’’
চেয়ারের হাতলে চাপড় মেরে তীক্ষ্ণ গলায় ফারহান বলল, “একদম সঠিক।’’
নীলয় চেয়ারটা টেনে ফারহানের দিকে কিছুটা এগিয়ে আসলো। নীলয় এখনো বুঝতে পারেনি ফারহান কী চায়!
_ ‘রহস্য আমায় খুব টানে, বিশেষ করে এসব অদ্ভুত কেস। আমি অগ্নিপক্ষী সম্পর্কে জানতে চাই, বুঝতে চাই, অনুধাবন করতে চাই। কিভাবে একটি মেয়ে অগ্নিপক্ষীতে রূপান্তর হতে পারে সেটা জানতে চাই। ’ রহস্য পিপাসুর মতো করে বলতে লাগল ফারহান।
নীলয়ের কাছে এবার বিষয়টা কিছুটা পরিষ্কার হতে লাগল।
_ ‘তুমি কী করে জানো অগ্নিপক্ষী একজন মেয়ে?’’
_ ‘দোকানের ভেতরে একটা ক্যামেরা ছিল, সেখান থেকে প্রাপ্ত ছবি বলছে অগ্নিপক্ষী একটা মেয়ে। আর আমার ধারণা মতে সেই মেয়েটি নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রী, প্রমাণ তোমার দেয়া ফাইলটা। কথা আর ঘুরিয়ে লাভ নেই, বুঝতেই পারছ আমি সবটা জানি।’
নীলয় কিছুক্ষণ ভাবল। একটু পর সে বলে ওঠল, “রোহিনীর মানসিক অবস্থা ঠিক নেই। আপাতত তাকে আমি জোর দিতে পারব না। অগ্নিপক্ষী কিভাবে সে হয়েছে সময় হলে সে নিজেই বলে দিবে আমায়, কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমাকে…!’’
নীলয় কথা শেষ করার আগেই ফারহান তাকে থামিয়ে দিল।
_ ‘নিশ্চয়তা দিচ্ছি, রোহিনীর কোনো ক্ষতি আমরা করব না। দোকানী আগুনে পুড়ে মরেছে এতে যথেষ্ট সন্তুষ্ট আমি। এমন পিশাচদের যত দ্রুত নরকে পাঠানো যায় ততই ভালো। আমি তো তোমাকে সহায়তা করতে চাচ্ছিলাম- রোহিনীকে সুস্থ করতে। ’
নীলয় মাথা নাড়ালো, সে বলল, “বিনিময়?’’
_ ‘বিনিময়ে আমার সহকারী হতে হবে, আর কিছুই না। রাজি?’
নীলয় ফারহানের দিকে তার হাত এগিয়ে দিল, ফারহান নীলয়ের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।
হুট করে ফারহান দাঁড়িয়ে গেলো, ক্ষীণ গলায় সে বলল দুঃখিত।
_ ‘কেনো?’ ফারহানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল নীলয়।
_ ‘কিছুক্ষণ আগে গোয়েন্দা প্রধানের ওমন আচরণের জন্যে দুঃখিত। আসলে আমিই স্যারকে বলেছিলাম তোমাকে যেন রাগিয়ে তুলেন। আসলে তোমার ভেতর কেমন জোর আছে তা দেখতেই আমি স্যারকে এমন করার অনুরোধ করি। ’’
নীলয় কিছু বলল না, চুপ করে বসে রইল। এতক্ষণ পর গোয়েন্দা প্রধানের মুখে বুলি ফুটল। _ ‘নীলয়, তোমাকে কিছু প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আগামীকাল সময় মতো চলে এসো।’ বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
নীলয় হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
মিনিট দশেক পর নীলয়কে নিয়ে ফারহান একটি কক্ষে আসলো, যেখানে সেই দুইজন ধর্ষককে বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছে। নীলয় শুধু এক নজর তাদের দেখল, কিছু বলল না সে, না কিছু করল। ওদের বিরুদ্ধে যা করার ফারহানই করবে, দায়িত্বটা এখন সম্পূর্ণ ফারহানের।
.
.
নীলয় এই মাত্র বাড়িতে ফিরেছে, মন মরা সে।
_ ‘কী হলো? তোমার মুখ এমন শুকনো কেনো? কিছু হয়েছে কী?’ প্রশ্ন করল রোহিনী।
_ ‘না,তেমন কিছুই না। নতুন চাকরি বোঝো-ই তো ..!’
_ ‘দুপুর তো হয়ে গেছে, তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।’
অপর দিকে
গোয়েন্দা প্রধান কিছু বলার আগেই রিভলবারের ট্রিগার টেনে দিলো ফারহান। রিভলবার থেকে বের হওয়া তিন ইঞ্চির গুলিটা চেয়ারে বাঁধা থাকা একজনের কপাল ছিদ্র করে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেলো। রিভলবারের সামনের অযশ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে, ধোঁয়ার হালকা রেশ পুরো রুমের বায়ুকে করে দিল ভারি। কক্ষ থেকে গোয়েন্দা প্রধান বেরিয়ে গেলেন। ঠিক একই ভাবে অপর ধর্ষককে গুলি করে নরকে পাঠাল ফারহান।
গোয়েন্দা প্রধান নিজ আসনে বসে কিছু ভাবছেন। সামনে বসে আছে নীলয়।
_ ‘এখন আমি নিশ্চিৎ হতে পারলাম না, তুমি নীলয়কে কেন নিতে চাচ্ছ?’
_ ‘আসলে সামনে এমন আরো কেস আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন নীলয় আমাদের অনেক সহায়তা করতে পারবে, কারণ এসব সম্পর্কে তার যথেষ্ট ভালো ধারণা রয়েছে। তাকে উপকার করলে সে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে, আর আমাদের সর্বদা সহায়তা করবে।’
_ ‘তোমার উপর আমার বিশ্বাস রয়েছে, আশা করি তোমার সিদ্ধান্তগুলো সঠিক। আশা করি সামনে মানুষ মাত্রই ভুল এই কথাটি আমাকে শুনতে হবে না। ’
ফারহান একটু হাসল, তবে হাসিটা কিসের ছিল তা গোয়েন্দা প্রধান বুঝলেন না। উনি বুঝার প্রয়োজনবোধও করেন না।
চলবে……..
পর্ব-৭
রুক্ষ চামড়া, প্রশস্ত কপাল, মুখে অসংখ্য কাটা দাগ। ঘোলা চশমা দিয়ে বৃদ্ধ লোকটা বই পড়ার বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছেন- ঝাপসা সবটা। এক পর্যায় বিরক্ত হয়ে চশমাটা খুলে টেবিলের এক কোণে রেখে দিলেন। লোকটার রুমও লোকটার মতই বয়স্ক, পুরনো কাঠের গন্ধে একটা আবেশ তৈরি হয়েছে। বৃদ্ধ লোকটার মাথার ওপর একটা সিলিং ফ্যান অনবরত ঘুরছে, বেশ পুরনো সেটা। লোহার সাথে লোহার ঘর্ষণের ফলে একটা শ্রুতিহীন শব্দের সৃষ্টি করছে। রুমে একটাই জানলা, সেটা দিয়ে দুপুরের তেজি সূর্যের আলো ঘরের ভেতর প্রবেশ করছে। সময়ের স্রোত দিন দিন লোকটার মেরুদণ্ড বাকা করে যাচ্ছে। লোকটার বয়স আনুমানিক আশির বেশি হবে।
চেয়ার ছেড়ে লাঠির ওপর ভর করে কোনো মতে লোকটা খাটে এসে বসল, হাত জোড়া তার থরথর করে কাঁপছে। এই বসে এমন হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। লোকটা খাটের ওপর হাত বুলিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিলেন ; শেষ বয়সে এসেও সিগারেটের নেশাটা উনি ছাড়তে পারেননি।
তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো লোকটি সিগারেট ধরাতে মোটেও দিয়েশলাই ব্যবহার করেননি, বরং তার হাত থেকে এক চিমটি আগুনের ফুলকি বেরিয়ে এসে সিগারেটের মাথা এসে পরে।
লোকটি কোনো সাধারণ মানুষ নন! সে অগ্নিপক্ষী!
.
.
_ ‘পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে সূর্যটা, আকাশটা পরিষ্কার। সূর্যের লাল কিরণ ছেয়ে আছে পশ্চিম আকাশ। দৃশ্যটা বেশ মনোরম কিন্তু লোকে সর্বদা দেখবে চাঁদের প্রশংসা করতে অধিক ভালোবাসেন। সূর্য কিন্তু কোনো অংশে কম নয়, কিন্তু তবুও চাঁদের রূপই বর্ণনা করে কবিরা। ’ জানলার বাহিরে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকে নিজেই বলল নীলয়।
নীলয় তার কাঁধে একটা উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করল, স্পর্শটা রোহিনীর।
_ ‘তোমার জ্বর এখনো কাটেনি। ঔষধ পত্র ঠিকঠাক খাচ্ছ তো?’ প্রশ্ন করল নীলয়।
_ ‘খাচ্ছি তো! তবে চিন্তিত আমি। ’
_ ‘কেনো?’
_ ‘শরীরের তাপমাত্রা কমছে না যে! মনে হচ্ছে ভেতরে থাকা আগুন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
রোহিনীর দিকে ফিরে তাকালো নীলয়। রোহিনীর হাত জোড়া শক্ত করে সে ধরল।
_ ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। যতদিন নিজেকে নিজে উপলব্ধি করতে পারবে না, ততদিন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগবে। নিজেকে উপলব্ধি করো, হুমম! ’
_ ‘নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই আর নিজেকে বিশ্বাস! আমি সুস্থ হতে চাই, প্রতিষেধক চাই।’
_ ‘তাহলে তুমি কিভাবে অগ্নিপক্ষী হয়েছ আমায় বলো।’
রোহিনী কিছুক্ষণ নীলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল, ভয় পাচ্ছে সে।
ফিরে দেখা
‘দেড়টা মাস কেটে গেলো নিজের ভেতর এখন আরেকটা সত্তা অনুভব করি। একের ভেতর দুয়ের মতো। সেদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পর বাসায় এসে বুঝতে পাড়লাম আমি বিরাট বড় এক ভুল করে ফেলেছি। হ্যাঁ, পেন্টাগ্রামের জন্যে সংগৃহীত মন্ত্রগুলো ভুল ছিল, শুধু তাই নয় আমি যে চিত্রগুলো অঙ্কন করেছিলাম সেখানেও ভুল ছিল, বিরাট ভুল! পাঁচমুখী তাঁরা আঁকার বদলে এঁকে ফেলেছি অন্য কিছু। পেন্টাগ্রামের জন্যে একটি অতিরিক্ত চিত্র আঁকতে হয়, সেটা মোক্ষম আর আমি সেটাই ভুল করে। আর অবাকজনক বিষয় হলো মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম উনি নাকি আমার ঘরে খালি আমায় পেয়েছেন। ঘরের মোমবাতিগুলো ছিল নেভানো, রক্তে ভরপুর বাটি ছিল খালি..! যেন কেউ রক্তগুলো চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছে। এই দেড় মাসে নানান অনাকাঙ্ক্ষিত, অদ্ভুত, ভুতুড়ে বলা যায় আবার রহস্যজনক ঘটনাও ঘটেছে। যেমন: একদিন রান্না করতে গিয়ে ভুলবশত গরম তেলের ছিটকা হাতে লাগে, কিন্তু তখন বিন্দু মাত্রও হাত জ্বালা পোড়া করেনি। এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, সবগুলো ঘটনাতে আগুনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এদিকে নীলয়ের সাথে আমার বিয়ের কথাও প্রায় পাকা হয়ে গেছে।’ ভাবনায় বিভোর রোহিনী।
সাতাশ সেপ্টেম্বর
‘মরে যেতে ইচ্ছে করছে, অভিশপ্ত আমি। আমার মৃত্যু নেই! আমি মরতে চাই.. ’
‘ আজ পরীক্ষা করতে আগুনে হাত দিলাম! ফলাফল আমার কিছুই হয়নি..!’
তেরো অক্টোবর
‘নিজের ভেতর থাকা দ্বিতীয় সত্তার উপস্থিতি বেশ ভালো করেই টের পাচ্ছি। প্রায়ই আমি নিজেকে নিজের ভেতর পাই না। কিছুক্ষণের জন্যে সব কিছু ভুলে যাই, তবে আজ ফোনের ভিডিও রেকর্ডিং এর সহায়তায় দেখলাম আমার দেহ আচমকা আগুনের হয়ে যায়। ’
সতেরো অক্টোবর
‘ লাইব্রেরীর হাজারটা বই ঘাটার পর একটি বইয়ে পেলাম অগ্নিপক্ষীর বিবরণ। প্রাচীন মিশরীও ভাষা কিছুটা জানা থাকায় অগ্নিপক্ষী সংক্রান্ত অনেক কিছুই জানতে পেরেছি, যা কাজে লাগিয়ে এখন আমি আমার দ্বিতীয় সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। ’
বিশ ডিসেম্বর
‘সময়ের চক্রে আমায় আবারও সেই পৈশাচিক দিনটায় নিয়ে আসলো। তবে আজকের দিনটা ভিন্ন, আজ আমার আর নীলয়ের বিয়ে। আর এই কয় মাসে অগ্নিপক্ষী হবার ক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। ভেবেছিলাম ওর দূরে যাবো, কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন আর চাইলেও সম্ভব নয়। যতদূর যেতে চাইব ওর থেকে ততই কাছে এসে যাবে সে। একটা ভালো জীবন উপহার দিতে চায় নীলয়,আমায় অসম্ভব বিশ্বাস করে। আমার অগ্নিপক্ষী সত্তা সম্পর্কে তাকে জানিয়ে তার বিশ্বাস আমি ভাঙতে চাই না। যেভাবে চলছে চলুক, ভাগ্যে যা আছে তাই হবে।’
বর্তমানে
নীলয় ভ্রু কুঁচকিয়ে রোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল।
_ ‘রোহিনী!সিরিয়াসলি! এই বিবরণ থেকে কিভাবে প্রতিষেধক বের করব?’
_ ‘আরে বাবা আছে একটা উপায়। আমায় বলতে তো দিবে।’
_ ‘হুম বলে যাও। ’
_ ‘ লাইব্রেরী হতে প্রাপ্ত বইয়ের সব লিখনী আমি বুঝতে পারিনি। সেখানে লাইব্রেরীতে এক বৃদ্ধ লোক ছিল, তিনিই সেদিন আমায় সহায়তা করেন। কিন্তু এরপর উনাকে আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি আর। আমার মনে হয় উনি কিছুটা হলেও এ বিষয়ে জানেন। তাকে খুঁজে বের করতে হবে।’
নীলয় বলল, "লোকটার মুখমণ্ডল মনে আছে? থাকলে স্কেচ বানিয়ে খুঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে।’’
রোহিনী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
.
.
_ ‘স্কেচ তৈরি স্যার। ’ কথাটা বললেন স্কেচ আর্টিস্ট নীলয় এবং ফারহানকে।
_ ‘লোকটাকে আমি চিনি! ’ বলল ফারহান।
_ ‘কোথায় তিনি? দ্রুত চলো তার কাছে।’ বলল নীলয়
ফারহান না সূচক মাথা নাড়ালো।
_ ‘লোকটার কাছে যেতে কোনো লাভ নেই। ফিনিক্স সম্পৃক্ত জ্ঞান আমি তার কাছ থেকেই আহরণ করেছি। লোকটা অনেক বুড়ো, এক পা বলতে গেলে কবরে চলে গেছে। তিনি একজন অগ্নিপক্ষী, তবে বয়সের ভারে তার অগ্নিপক্ষী শক্তি প্রায় শেষ পর্যায়। তিনি যতটুকু জানতেন আমায় বলেছেন। প্রতিষেধক জানা থাকলে তিনি নিজেও ওপরই প্রয়োগ করতেন, অহেতুক তিনশত বছর পুত্র, সন্তান পরিবার ছাড়া একটা কাটাতেন না। ’ স্কেচ হাতে নিয়ে ঘরে পায়চারি করতে করতে বলল ফারহান।
রোহিনী চুপচাপ বসে নীলয় এবং ফারহানের কথোপকথন শুনছে। স্থির গলায় নীলয় বলল, ‘শেষ চেষ্টা তো করে দেখতেই পারি..! ’
ফারহান মাথা নাড়ল, সম্মতি প্রদান করেছে সে।
.
.
দরজায় অনেকক্ষণ ধরে টোকা দিয়ে যাচ্ছে নীলয়। নীলয়কে থামিয়ে ফারহান বলল, “অপেক্ষা করো।’’
মিনিট পাঁচেক পর বৃদ্ধ লোকটা দরজা খুললেন। মুখ তুলে বাহিরে তাকিয়ে ফারহানকে দেখে বলল, “বাবা তুমি এখানে?’’
.
.
ঘোল টেবিল বৈঠকের মতো চারটি চেয়ারে ঘোলাকার বৃত্তের অন্য বসে আছে চার জন। তিনটে চেয়ারে সু-পরিচিত নীলয়, ফারহান এবং রোহিনী, আর অপর একটি চেয়ারে বসে আছে সেই বৃদ্ধা। রোহিনীর মুখে সব কিছু শুনে লোকটা বলল, “এই কোনো প্রতিষেধক আজ অব্দি আমি খুঁজে পাইনি। তবে জোড়ের তোড় থাকে, এরও প্রতিষেধক একটা হয়তো আছে। রহস্যের শহরের হয়তো পেতে পারো।’’
_ ‘রহস্যের শহর বলতে?’ প্রশ্ন করল ফারহান।
বৃদ্ধ লোকটাকে কাশতে লাগল। কাশ থামিয়ে সে বলল, “প্রাচীন মিশরে, পিরামিডের অতল গহ্বরে, কোন এক কোণে লুকয়িত রয়েছে অগ্নিপক্ষী আসল ইতিহাস। সেখানে হয়তো প্রতিষেধক সংক্রান্ত কিছু জানতে পারবে। তবে কোন পিরামিড আমি জানি !’’
_ ‘এত পিরামিডের ভেতর কাঙ্ক্ষিত পিরামিড খুঁজে বের করা অসম্ভব। ’ বলল ফারহান।
এতক্ষণ ধরে চুপ করে বসে ছিল নীলয়। ক্ষীণ গলায় সে বলল, “ আমার মনে হয় আমি কাঙ্ক্ষিত পিরামিডটা চিনি…!’’
উত্সুক জনতার মতো সকলে নীলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ লোকটা চশমাটা লাগিয়ে নীলকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন।
_ ‘সেদিন কম্পিউটারে যে পিরামিডের ভেতরকার ছবি দেখে রোহিনীর কাছে পরিচিত মনে হয়েছিল, আমার মনে হয় সেই পিরামিডের ভেতর সকল প্রশ্নের উত্তর রয়েছে।’ গম্ভীর স্বরে বলল নীলয়।
বৃদ্ধা কিছু বললেন না, এক দৃষ্টিতে নীলয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন তিনি নীলয়ের ভেতর অন্য কাউকে খুঁজার চেষ্টা করছেন।
চলবে…
পর্ব-৮
নীলয় থেকে চোখ ফিরিয়ে বৃদ্ধ বলল, “সেই ছবিগুলো আছে?’’
নীলয় ঝটপট ছবিগুলো ফোনে বের করে লোকটার দিকে এগিয়ে দিতে নিলো, লোকটা নীলয়কে থামিয়ে দিলো। হাতে থাকা চশমাটা নীলয়ের দিকে এগিয়ে দিল। গম্ভীর গলায় বললেন, “চশমাটা পরিধান করে ছবিগুলোর দিকে তাকাও। ’’
ঘোলা চশমা পরে ছবির দিকে তাকানো নীলয়ের কাছে এক প্রকার নিরর্থক মনে হলো। ফারহান চোখের ইশারা সম্মতি জানাল। নীলয় চশমাটা পরে নিলো।
চশমাটা পরে ছবির দিকে তাকাতেই নীলয় থমকে গেলো, ছবিতে থাকা চিত্রগুলো নড়তে লাগল। চিত্রগুলো একটা গল্প তুলে ধরছে, নীলয় মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগল।
.
.
মিনিট দশেক পর
_ ‘একটা ছুরি হবে?’ বৃদ্ধ লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল নীলয়।
_ ‘কী দেখেছ?’ প্রশ্ন করল বৃদ্ধ।
_ ‘একটি অগ্নিপক্ষীকে মানব করল একটি ছেলে। আর সে জন্যে…’
নীলয় আর কিছু বলার আগেই থামিয়ে দিলো বৃদ্ধ।
_ ‘আমার মুক্তির সময় তাহলে চলে এসেছে। ছবি হতে দেখা গল্প কোনো অতীত নয় ,বরং সেটা কিছুক্ষণ পর ঘটা ঘটনার চিত্র অর্থাৎ ভবিষ্যৎ। এই গল্পটা আমিও দেখেছি শত বছর আগে। তখন আমি সবে মাত্র অগ্নিপক্ষী হয়েছি। পুথিতে তখন এমনিই কিছু চিত্র ছিল। এই চিত্রগুলোতেই লুকয়িত রয়েছে প্রতিষেধক, এটা খুঁজতেই পিরামিডের অতল গভীরে যেতে হবে বলেছিলাম। তবে এটি এত সহজলভ্য হবে আমার জানা ছিল না। ’
_ ‘মরুর বালিতে চাপা পড়ে থাকা বহু পিরামিড আজ আবিষ্কৃত। তাই হয়তো এতটা সহজলভ্য হলো! আচ্ছা, আপনি বললেন এই ঘটনাতেই প্রতিষেধক রয়েছে আর আপনি চিত্রগুলো দেখেছেন তাহলে আমাদের প্রতিষেধক সম্পর্কে না বলে পিরামিড খুঁজতে কেনো বললেন?’ প্রশ্ন করল ফারহান।
বৃদ্ধ লোকটা দুই তিনটা কাশি দিলো।
_ ‘হেতু, পুরো চিত্র আমি দেখতে পারিনি, আংশিক দেখেছিলাম সেখানে প্রতিষেধক সম্পর্কে কোনো কিছুই ছিল না।’ বললেন বৃদ্ধ।
_ ‘প্রতিষেধকটা আমি জেনেছি, বিশুদ্ধ রক্ত লাগবে আর দেখলাম অপর একটি অগ্নিপক্ষী সেই রক্তের সাহায্যে কিছু করছে। তারপর আচমকা সেই অগ্নিপক্ষী আগুনে রূপান্তর হয় এবং মেয়েটির দেহ থেকে আগুন নিয়ে নেয়, তারপর উদাও। ’বলল নীলয়।
_ ‘বেশ সহজ উপায়। নীলয় তোমার রক্তের সাহায্যে আমি রোহিনীর ভেতরে থাকা আগুন নিয়ে নিতে পারব, অধিক আগুনের ধারক হবার কারণে আমার ধ্বংস ঘটবে অর্থাৎ আমি মুক্তি পাবো।’
বৃদ্ধ লোকটা কথাটা বলে ওঠে দাঁড়াল, কাঁপা তার প্রতি পদক্ষেপ। কোনো মতে হেঁটে টেবিল অব্দি এসেছেন, টেবিলের এক কোণে থাকা চাকুটা নিয়ে আবারও নিজ আসনে ধীরেধীরে ফিরে আসলেন।
নীলয়ের হাতে ছুরি দিয়ে লোকটা বলল, “শুভ কাজটা দ্রুত করে ফেলো..!’’
নীলয় ক্ষীণ গলায় বলল, “আপনি কী করে অগ্নিপক্ষী হয়েছেন, তা জানতে খুব ইচ্ছে করছে। ’’
পকেট থেকে লোকটা একটা সিগারেট বের করেন, হাতের আঙ্গুল নখের মাথায় হালকা আগুনে এনে সিগারেটের মাথায় লাগিয়ে দেন। সিগারেটের সামনের অংশে লাল আগুনের ক্ষুদ্র গোলাটা জ্বলে ওঠল, সিগারেটের মাথা হতে নির্গত ধোঁয়া ধীরেধীরে পুরো ঘরে ছড়িয়ে যেতে লাগল। ধোঁয়াটা যেন একটা চাপা আর্তনাদ বয়ে চলেছে!
গম্ভীর স্বরে বৃদ্ধা বলতে শুরু করল।
_ ‘রহস্য প্রেমিক ছিলাম আমি, সেই কত শত বছর আগের ঘটনা। তখনকার আমলে মানুষ ওতটা উন্নত ছিল না, আজকের মতো ছিল না প্রযুক্তি। সেই সময়ে আমাদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল। তখন আমরা এই বাংলাদেশে থাকতাম না, বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুসারে অতীতে পাকিস্তানে থাকতাম। অর্থ ব্যয়ের খাতিরে যাওয়া হয় মিশরে, আমার পিতার সঙ্গেই যাই। মরুতে ঘুরার সময় একটা কোণাকার পাথর আমরা পাই। কৌতুহল হয়, সেটা বের করার চেষ্টা চালাই। পাথরের কোনো এক পাশে চাপ পড়লে পাথর কেঁপে ওঠে, মরুর ভেতর থেকে ধীরেধীরে দন্ডায়মান হয় একটি পিরামিড, কৌতুহল শতগুণ বেড়ে যায়। মুখটা ছিল খোলা, ভেতরে প্রবেশ করি। দেয়ালে অঙ্কিত চিত্রগুলোর অর্থ আমার পিতা কিছুটা অনুমান করতে সক্ষম হন। তিনি বোঝার চেষ্টা চালান। পিরামিডের ভেতরে একটা চেম্বারে প্রবেশ করতেই কোথা থেকে সু-চালো লোহার খণ্ড এসে আমার পিতার উপর পরে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান, তখন তো আমরা বুঝতে পারিনি যে পিরামিডের বিশেষ কক্ষগুলোর সামনে ফাঁদ থাকে। কক্ষটায় আমি নিরাপদেই পৌঁছতে পারি, তখন আমি দিশাহারা ছিলাম। কী করব বুঝতে ছিলাম না। সেই রুমের কিছু চিত্র দেখে বুঝি একটা নিত্য করলে হয়তো পুনরায় বাবাকে জীবিত করতে পারব। পুরো চিত্র দেখিনি যার দরান নিত্য করার ফল স্বরূপ আমি অগ্নিপক্ষী হয়ে যাই। পিরামিডটি আবিষ্কৃত হবার আগ পর্যন্ত সেখানে ফেসে ছিলাম। এক চেম্বার থেকে বের হলে আরেক চেম্বার, এক গোলক ধাঁধায় ছিলাম ফেসে। ’
.
.
লোকটা আর কিছু বললেন না, চুপচাপ সিগারেটে একের পর এক টান দিতে লাগলেন।
_ ‘দ্রুত আমায় মুক্তি দেও। ’ আধ খাওয়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে কথাটা বললেন বৃদ্ধ লোকটা।
নীলয় ছুরিটা নিয়ে হাতের তালুতে একটা হেঁচকা টান দিল। তালু ছিড়ে রক্ত বেরুতে লাগল। রক্তগুলো বৃদ্ধ তারপর হাতের আঙ্গুলে লাগিয়ে নিলেন, বিড় বিড় করে কিছু পাঠ করলেন।
.
.
চোখের পলকে কী গঠল এখন নীলয় বুঝতে পারছে না। আচমকা বৃদ্ধা জ্বলন্ত উলকা পিণ্ডে পরিণত হয়, সেই সঙ্গে রোহিনী হয়ে পড়ে অগ্নিপক্ষীতে। তীক্ষ্ণ এক চিৎকারের পুরো রুমের বায়ু কেঁপে ওঠে। সেকেণ্ড দুয়েক পর পিন পতন নীরবতা, নিস্তব্ধতা। সাধারণ মানব রূপ মেঝেতে পরে আছে রোহিনী আর বৃদ্ধ.! তার কোনো চিহ্ন নেই।
পুরো ঘটনা জুড়ে এক মুহূর্তের জন্যেও ফারহান বিচলিত হয়নি। চেয়ারে চুপচাপ সে বসে রয়েছে, কিছু ভাবছে সে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার মাঝে, মুহূর্তের ভেতর পুরো ঘটনার জন্যে সে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে নিয়েছিল। হয়তো গোয়েন্দা যেকোনো অবস্থার জন্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
মেঝেতে পরে থাকা রোহিনীর পাশে গিয়ে বসল নীলয়। ধীরেধীরে রোহিনী তার চোখ খুলছে, মুখ তার টানা হাসি-বিজয়ী হাসি।
.
.
বাসায় ফিরে এসেছে রোহিনী এবং নীলয়, ফারহান কোনো কাজে অনত্র চলে গিয়েছে। বৃদ্ধের জন্যে রোহিনী আর নীলয়ের বড্ড খারাপ লাগছে, লোকটা ভালো ছিল। পরের সকাল সকাল নীলয় তার কর্মক্ষেত্রে গেলো, আজ থেকে তার প্রশিক্ষণ শুরু।
.
.
কয়েকদিন পর, প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা শেষ প্রায়। নীলয়ের পিঠে চাপড় মেরে ফারহান বলল, “প্রস্তুত তো?’’
_ ‘হ্যাঁ’
_ ‘গোয়েন্দা জগতে স্বাগতম তোমায়। এ জগতে বাহিরের আলোকিত জগতের মতোই, কিন্তু এ জগতে আলোর ভেতর থাকা সেই অন্ধকার পথকে খুঁজে বের করতে হয়, সে পথে থাকে পদে পদে বিপদ, জীবন ঝুঁকি। এখানে বুক ভরা সাহস থাকলে হয় না, সাহসের সঙ্গে প্রয়োজন বিচক্ষণতা।’
সমাপ্ত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now