বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দরজাটা খুট করে খুলে ভেতরে একজন মানুষ ঢুকল । সে এক হাতেমিশকাকে ধরে রেখেছে । গত কয়েক ঘন্টায় দরজাটা অনেকবার খুট করেখুলেছে এবং অনেক রকম মানুষ এসেছে । অনেক কিছু করে গেছে । তাইপ্রত্যেকবার যখন খুট করে দরজাটা খুলে যায় তিষা আর জন ভয় পেয়েচমকে ওঠে ।
এই প্রথম বার তারা ভয় পেয়ে চমকে উঠল না । মিশকাকে দেখেতাদের দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল । তিষা হাত বাড়িয়ে বলল, “মিশকা!তুমি।”
মিশকা মানুষটির হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে তিষার কোলেঝাঁপিয়ে পড়ল । তিষা মিশকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিস ফিস করেবলল “কোথায় ছিলে তুমি দুষ্ট ছেলে? কোথায় ছিলে?”
এরকম সময় সব সময় মিশকা যা করে তাই করল, খিল খিল করেহাসল । তারপর সেও তার ছোট ছোট শীতল হাত দিয়ে তিষার মাথায় মুখেহাত বুলিয়ে দিল, তারপর তার গালে চুমু খেল ।মিশকাকে রেখে ঘর থেকে বের হয়ে গেল | খুট করে আবার দরজা বন্ধ হয়ে
গেল ।
মিশকা তার হাত নেড়ে সাইন ল্যাংগুয়েজ দিয়ে বলল, “তুমি বন্ধ।তুমি ঘরে বন্ধ। তুমি কেন ঘরে বন্ধ?”
তিষা বলল, “আমরা তো জানি না কেন আমাদের ঘরে বন্ধ করেরেখেছে।”
মিশকা বলল, “খারাপ । মানুষ খারাপ।”
তিষা বলল, “হ্যা ৷ মানুষগুলো খুব খারাপ।
মিশকা বলল, “এখানে না । বাসা যাব ।”
তিষা ম্রান মুখে হেসে বলল, “হ্যা । আমরা কি এখানে থাকতে চাই?
চাই না। আমরাও তো বাসায় যেতে চাই । বাসায় আববু আম্মু না জানিকতো চিন্তা করছে ।” কথা বলতে বলতে সে কেদে ফেলল, মিশকা কীকরবে বুঝতে পারে না, একটু হাসে তারপর তিষার চোখ মুছে দেয় ।
জন বলল, “যদি কোনোভাবে এই ঘর থেকে বের হতে পারতামতাহলে চেষ্টা করে দেখতাম।”
তিষা বলল, “কেমন করে ঘর থেকে বের হবে?”
“সেটাই তো জানি না।”
মিশকা সাইন ল্যাংগুয়েজে বলল, “দুই চার দুই পাঁচ।”
“দরজা ।”
“দরজার কী?”
মিশকার ভাষা জ্ঞান যথেষ্ট না তাই সে ঠিক বোঝাতে পারল না,কয়েকবার বোঝানোর চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল ।
আধা ঘন্টা পর আবার খুট করে দরজা খুলে গেল । আগের মানুষটিএসে মিশকাকে তিষার' কোল থেকে টেনে সরিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েগেল | মিশকা যেতে চাচ্ছিল না। দুই হাত দিয়ে তিষাকে ধরে রাখল কিন্তুলাভ হল না । মানুষটা হ্যাচকা টান দিয়ে তাকে সরিয়ে নিল ।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তিষা দরজায় একটু খুট খুট শব্দ শুনতে পেল, মনেহল কেউ দরজা খোলার চেষ্টা করছে কিন্তু খুলতে পারছে না । তিষা দরজায়কান লাগিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কী হচ্ছে, কেন জানি তার মনে হল
এখানকার কোনো মানুষ নয় মিশকা দরজা খোলার চেষ্টা করছে!
সত্যি সত্যি হঠাৎ দরজা খুলে গেল এবং দেখা গেল দরজার সামনেমিশকা দীড়িয়ে আছে । তার মুখে বিজয়ীর মতো হাসি । সে বলল, “দুই চারদুই পাচ।”
তিষা আর জন এবারে দুই চার দুই পাঁচের রহস্যটা বুঝতে পারে ।দরজার বাইরে যে ইলেকট্রনিক নাম্বার লক লাগানো সেটা খুলতে নাম্বারপ্যাডে দুই চার দুই পাঁচ নম্বর বোতামে চাপ দিতে হয় । মিশকাকে নিয়ে
যখন মানুষটি এসে দরজা খুলেছে তখন যমিশকা সেটা লক্ষ্য করেছে । এখন সে নিজে এসে দরজা খুলে দিয়েছে । কিন্তু সে কোথা থেকে এসেছে? কেমন
করে একা একা চলে এসেছে?
মিশকা নিজেই বলল যে তাকে একটা ঘরে তালা মেরে রেখেছিল।সেই ঘরের ছাদে বাতাস প্রবাহের যে সরু ডাক্ট আছে তার ভেতর দিয়ে সেবের হয়ে এসেছে। মানুষগুলো বুঝতে পারেনি সে এভাবে পালিয়ে যেতে
পারবে ৷ তিষা তার পিঠ চাপড়ে বলল, “চমৎকার কাজ মিশকা!“
মিশকা বিজয়ীর মতো মুখ ভঙ্গি করে হাসল ।
তিষা বলল, “চল, এখন পালাই।”
মনে হয় না । আবার আমাদের ধরে ফেলবে ।
“তবু চেষ্টা করি।”
মিশকাকে কোলে নিয়ে তিষা আর জন খুব সাবধানে ঘর থেকে বরেহল। এদিক সেদিক তাকিয়ে যখন দেখল কেউ নেই তখন সাবধানেকরিডোর ধরে হাটতে থাকে । আশে পাশে যে এই মূহুর্তে কোনো মানুষ নেইসেটা অনেক ভাগ্যের কথা।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুপার কম্পিউটারের সিস্টেম ম্যানেজার, একধরনের কৌতুকের দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়েছিল। একটা এনিম্যানযে দরজার কোডটা মনে রেখে সেই কোড ব্যবহার করে দরজাটা খুলেফেলতে পারবে সেটা সে কখনো কল্পনা করেনি । কী ভাবে এনিম্যানটা মুক্তহয়ে এসেছে সেটা সে এখনো জানে না । খোজ নিতে হবে । কিন্তু একদিকভালোই হল, তার সফটওয়ারটির একটা ফিল্ড টেস্ট হবে! এই ছেলে আরমেয়ে জানে না তাদের সম্পর্কে সব তথ্য এমন ভাবে লোড করা আছে যেআগামী এক ঘন্টা তারা কী করবে সে এখানে বসে নিখুঁত ভাবে বলে দিতে
পারবে | ইচ্ছে করলেই সে এলার্ম বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিতে পারেকিন্ত সেটা করল না । আজ রাতে সবাই পাগলের মতো কাজ করছে । এরমাঝে হঠাৎ একটা এলার্ম বাজিয়ে সবাইকে আলাদাভাবে দুশ্চিন্তিত করেদেয়ার প্রয়োজন নেই । সে জানে ঠিক কোথায় তাদেরকে পাওয়া যাবে,সিকিউরিটির মানুষ দিয়ে তাদেরকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে আসলেই হবে।
দশ মিনিট পর করিডোরের শেষ মাথায় সিড়ির নিচে লুকিয়ে থাকা তিষা আরজনকে ধরে নিয়ে আসার জন্যে । এর আগে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজননেই। দশ মিনিট পর তিষা আর জন সেখানে লুকিয়ে থাকবে।
ঘর থেকে বের হয়ে করিডোর ধরে হাটতে হাটতে তিষা জনকে জিজ্ঞেসকরল, “আমরা এখন কোনদিকে যাব?”
জন মাথা নেড়ে বলল, “জানি না । কোনোভাবে ধরা না পড়ে একটুহেঁটে হেটে আগে জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করি।”
“লুকিয়ে থাকতে হবে।” তিষা বলল, “এ যে সিঁড়ির নিচে মনে হয়কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকা যাবে।”
জন বলল, “হ্যা চল ওদিকে এগিয়ে যাই।”
মিশকা হঠাৎ করে তিষার হাত ধরে অন্যদিকে টেনে নিতে থাকে।তিষা একটু অবাক হয়ে মিশকাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
মিশকা জানাল, “আস। আমার সাথে আস।”
“কোথায় ?”
“হ্যা।”
“কী আছে তোমাদের ঘরে |”
“আমরা আছি।”
“তোমরা?”
“হ্যা।"
কোথায় যাবে সেটা যেহেতু তারা কেউই জানে না তাই মিশকা যেখানেনিয়ে যেতে চাইছে তারা সেদিকেই রওনা দিল । মিশকা মনে হয় এলাকাটাতারা বড় একটা গুদাম ঘরের মতো জায়গায় পৌছাল । একটা বড় লোহারগেট । গেটে ইলেকট্রনিক তালা ।
মিশকা বলল, “তিন তিন সাত চার।”
সংখ্যটা কী এবারে তারা চট করে বুঝে গেল । তিষা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কেমন করে জান?"
“আমি দেখেছি। একটু আগে আমাকে নিয়ে তিন তিন সাত চার করেভিতরে ঢুকেছে।”
তিষা ইলেকট্রনিক তালায় তিন তিন সাত চার সংখ্যা ঢুকাতেই তালাটাখুট করে খুলে গেল। ভারী লোহার গেটটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে তিষা আর জনহতবাক হয়ে গেল । ফুটবল মাঠের মতো বিশাল একটা হল ঘর সেখানেযতদূর তাকানো যায় ততদূর শুধু এনিম্যান আর এনিম্যান । হাজার হাজারনয়, মনে হয় লক্ষ লক্ষ এনিয্যান! গেট খোলার শব্দ শুনে সবগুলো এনিম্যান
তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, বড় বড় চোখে এক ধরনের কৌতুহল আরবিস্ময় । তিষা আর জন হতবাক হয়ে এই অসংখ্য এনিম্যানগুলোর দিকে
তাকিয়ে রইল ।
তিষা এক পা এগিয়ে যেতেই সবগুলো এনিম্যান তার থেকে সরেযায় । সে একটা চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেল। তিষা জানে এই হাসির শব্দআসলে প্রকৃত হাসি নয় । এটা তাদের ভয় পাওয়ার প্রতিক্রিয়া । হাসি কান্না
দুঃখ ভয় সবকিছুর জন্যেই তাদের একটা মাত্র প্রতিক্রিয়া সেটা হচ্ছে হাসি।এনিম্যানগুলো তাদেরকে দেখে ভয় পেয়েছে ।
তিষা নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে একটা এনিম্যানকে ডাকল। এনিম্যানটাএকটু সরে গিয়ে কৌতৃহল নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তিষা সাবধানেতার হাতটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে এনিম্যানটাকে আস্তে আস্তে স্পর্শ করে ।
এনিম্যানটাও তখন খুব সাবধানে তিষার হাতটা স্পর্শ করল । তিষা হাসিহাসি মুখে এনিম্যানটাকে নিজের কাছে ডাকল, তখন এনিম্যানটা খুব সতর্কভাবে তিষার কাছে এগিয়ে আসে ।
তিষা তাকে সাবধানে কোলে তুলে নেয়, তারপর আদর করে তারগায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এনিম্যান শিশুটি এই আদরটুকু বুঝতেপারল এবং হঠাৎ করে তার ভেতরে তিষাকে নিয়ে যে দ্বিধা বা সংকোচ ছিল
তার সবটুকু দূর হয়ে গেল । এনিম্যান শিশুটি তখন তিষার গলা জড়িয়ে ধরেতাকে গভীর ভাবে আলিঙ্গন করে | তিষা হঠাৎ করে বুঝতে পারল তারসামনে এই বিশাল হলঘরের হাজার হাজার এনিম্যান শিশুর সবাই আসলেভালোবাসার কাঙ্গাল । তাদের জন্যে কেউ কখনো ভালোবাসা দেখায়নি। তাদেরকে কেউ কখনো আদর করেনি । এগুলো মানবশিশু কিন্তু তারাকখনো মানুষের সম্মান, মানুষের মায়া মমতা পায়নি ।
একটি একটি করে এনিম্যান শিশুগুলো তখন তিষা আর জনের দিকেহেঁটে আসতে থাকে । তারা সেগুলোকে কোলে নেয় আদর করে । এরাসবাই একটি করে মানব শিশু । একটি মানব শিশুর আসলে বিশাল হলঘরেএভাবে গাদাগাদি করে থাকার কথা নয় । তাদের মায়ের ভালোবাসা নিয়ে বড় হবার কথা | তিষা এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে এই শিশুগুলোর দিকেতাকিয়ে থাকে । পৃথিবীর মানুষ কেমন করে এতো বড় একটা অবিচারকেমেনে নিল?
তিষা মেঝেতে বসে এনিম্যান শিশুগুলোকে আদর করতে থাকে ৷তারা ভয়ংকর একটা বিপদে আছে, তাদের কী হবে তারা জানে না, কিন্তুএই মুহূর্তে তিষার আর কিছুই মনে রইল না, সে শুধু মাত্র ভালোবাসার
কাঙ্গাল এই মানব শিশুগুলোর দিকে গভীর মমতা নিয়ে তাকিয়ে রইল।
-----------------------------------------------------------------
লিডিয়া হিংস্র গলায় বলল, “কী বলছ হারিয়ে গেছে?"
কম বয়সী সিস্টেম ম্যানেজার শুকনো মুখে বলল, “ছেলেটা আরমেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্র্যাগনন সুপার কম্পিউটার যেখানেথাকবে বলে ভবিষ্যৎবাণী করেছে সেখানে নেই । আমাদের সিকিউরিটি তন্নতন্ন করে খুঁজছে, ওদের পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তোমার সুপার কম্পিউটার ভূল ভবিষ্যৎবাণী করছে?”
“তাইতো দেখছি ।”
লিডিয়া টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব?”
“বুঝতে পারছি না।” সিস্টেম ম্যানেজার শুকনো গলায় বলল,“আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে ।”
“কী সন্দেহ?”
“ক্র্যাগনন সুপার কম্পিউটার এই ছেলেটা আর মেয়েটার সব তথ্যলোড করেছে তাই তারা কখন কী করবে বের করে ফেলতে পারে । কিন্তু
তার কাছে এনিম্যানটার কোনো তথ্য নাই ।যদি এনিম্যানটা কোনো সিদ্ধান্তনেয় তাহলে সুপার কম্পিউটার সেটা সম্পর্কে জানবে না। তাই ভূল
ভবিষ্যতবাণী করবে।”
“তুমি বলতে চাইছ এই ছেলেটা আর মেয়েটা নিজেদের বুদ্ধি দিয়েচলছে না? একটা এনিম্যানের বুদ্ধি দিয়ে চলছে?”
“আমি সেটাই সন্দেহ করছি ।”
লিডিয়া দাঁতে দাত চেপে একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, “এখনতোমরা কী করছ?”
হচ্ছে । সিসি টিভির ফুটেজ দেখা হচ্ছে । সিকিউরিটির মানুষেরা ঘরে ঘরেগিয়ে খুজছে।”
“আমার হাতে সময় নেই । এই ছেলে আর মেয়েটাকে আমারদরকার। এই মুহুর্তে দরকার ।”
সিস্টেম ম্যানেজার বলল, “আমরা পেয়ে যাব | নিশ্চয়ই পেয়ে যাব।আমাদের এখানে মানুষ খুব কম। এত বিশাল একটা কম্পাউন্ড এতো অল্পকয়েকজন মানুষ দিয়ে চালানো হয় সেটাই হচ্ছে সমস্যা।”
লিডিয়া কঠিন মুখে বলল, “আমি কোনো কৈফিয়ত শুনতে চাই না।দশ মিনিটের মাঝে আমি এই ছেলে আর মেয়েটাকে চাই।”
সিস্টেম ম্যানেজার নিঃশব্দে দাড়িয়ে রইল ।
অবিশ্যি দশ মিনিট থেকে বেশী সময় লাগল না । সিসি ক্যামেরাতে দেখাগেছে তারা দুজন একটা এনিম্যানকে নিয়ে বড় হলঘরের দিকে এগিয়েগেছে । সিকিউরিটির মানুষেরা হলঘরে গিয়েই তাদের পেয়ে গেল । হাজার
হাজার এনিম্যান শিশু ছোটাছুটি করছে, তার মাঝে তিষা আর জন খুবসাবধানে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে । এনিম্যান শিশুগুলো প্রথমে তাদেরথেকে দূরে দূরে ছিল, কীভাবে বুঝে গেছে তাদেরকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই,তখন তাদের কাছে এসে ভীড় করেছে । জন আর তিষা হলঘরের শেষমাথায় যেতে চাইছিল, সেখানে কয়েকটা উচু জানালা রয়েছে । এই জানালা
দিয়ে বের হওয়া যায় কী না তারা একবার চেষ্টা করে দেখতে চাইছিল কিন্তুতার আর সুযোগ হল না। বড় লোহার গেট খুলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে সাথে সাথে এনিম্যান শিশুগুলো ছোটাছুটি করতে থাকে । আনন্দবেদনা দুঃখ বা আতংক সবকিছুতেই তাদের প্রতিক্রিয়া এক রকম, তাইতারা খিল খিল করে হাসতেও শুরু করে । ভয়ংকর আতংকে যখন কেউহাসতে থাকে সেটি অত্যন্ত বিচিত্র একটি দৃশ্য । তিষা আর জন বিশালহলঘরের মাঝে দীড়িয়ে এনিম্যান শিশুদের এই বিচিত্র প্রতিক্রিয়াটির দিকেঅবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
সিকিউরিটি গার্ডের একজন চিৎকার করে বলল, “তোমাদেরপালানোর কোনো জায়গা নেই।আমাদের সাথে এসো।”
কথা বলেই সেশেষ করল না তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে তিষা আর জনের দিকে এগুতেথাকে । এনিম্যান শিশুগুলো সরে গিয়ে গার্ডকে জায়গা করে দেয় । তিষা আর জনের কাছাকাছি গিয়ে সিকিউরিটি গার্ড তার হাতের অস্ত্রটা ঝাকিদিয়ে বলল, “এসো।”
তিষা আর জন একজন আরেকজনের দিকে তাকাল | তাদের আর,বলল, "চল আমাদের সাথে।”
তিষা আর জন এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু সাথে সাথে এনিম্যানশিশুরা তাদেরকে জাপটে ধরে, তারা তিষা আর জনকে যেতে দেবে না।একটি শিশুর গায়ে তেমন জোর না থাকতে পারে কিন্তু যখন একসাথে
অনেকে জাপটে ধরে তখন সেটা একজনকে আটকে ফেলার জন্যে যথেষ্ঠ।তারা জোর করে এগুতে চেষ্টা করে- কিন্তু লাভ হলো না । এনিম্যান শিশুরাকথা বলতে পারে না, তাদের একমাত্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে হাসি তাই তারা তিষাআর জনকে জাপটে ধরে খিল খিল করে হাসতে থাকে।
সিকিউরিটি গার্ড তখন এগিয়ে এসে এনিম্যান শিশুদের প্রথমে হাতদিয়ে ধরে টেনে সরিয়ে দেয়, তাতে খুব একটা লাভ হয় না একজনকেসরাতেই অন্য একজন ছুটে এসে ধরে ফেলে । সিকিউরিটি গার্ড তখন শক্ত
বুট দিয়ে লাথি মেরে তাদেরকে সরিয়ে দিতে থাকে । প্রচণ্ড যন্ত্রণায় এনিম্যানশিশুদের আর্তনাদ করার কথা-তারা আর্তনাদ করতে পারে না তাই তারা
এবারে অট্টহাসির মতো শব্দ করতে থাকে। সিকিউরিটি গার্ড দুজন শেষ পর্যস্ত তাদেরকে শক্ত করে তাদের কাপড়ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে টেনে নিতে থাকে। হলঘরের হাজার হাজার এনিম্যানশিশু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে, তাদের মুখে হাসি কিন্তু সেই হাসিতে কোনোআনন্দ নেই ।
তিষা আর জনকে যখন লিডিয়ার ঘরে আনা হল | তখন লিডিয়া গভীরমনোযোগ দিয়ে তার মনিটরে একটা ভিডিও দেখছে, পায়ের শব্দ শুনে সে
মাথা ঘুরিয়ে তাকাল । সেই মুহূর্তে মনিটরে তিষা আর জনের একটি দৃশ্য,তারা খুবই অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে একজন অন্যজনকে ধরে রেখেছে, জনের হাতে
একটা সিরিঞ্জ | ভিডিওতে দেখা গেল তিষা তার বাম হাতটি এগিয়ে দিয়েছেতখন জন সেখানে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে দিয়েছে । তিষা তীব্র আনন্দের একটা শব্দ
করল, দেখতে দেখতে তার শরীর কাপতে থাকে।
তিষা হতবাক হয়ে ভিডিওটার দিকে তাকিয়ে থাকে, এই ভিডিওটি কিভাবে তৈরি করেছে? লিডিয়া সিকিউরিটি গার্ড দুজনের দিকে তাকিয়েবলল, “এক্সিকিউশান টিমকে খবর দাও।”
“খবর দেওয়া হয়েছে।”
“আমাদের হাতে সময় নেই । খুব দ্রুত শেষ করতে হবে।”
“ঠিক আছে ।” গার্ডটি সাথে সাথে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ।
তিষা মনিটরটির দিকে দেখিয়ে বলল, “এই ভিডিও কীভাবে তৈরীকরেছ?”
লিডিয়া বলল, "পছন্দ হয়েছে?"
“কীভাবে তৈরী করেছ?”
“পুরোটা দেখলে তোমরা মুগ্ধ হতে । দেখতে চাও?”
তিষা মাথা নাড়ল, বলল, “না । দেখতে চাই না।”
লিডিয়া হাসার ভঙ্গী করল, তার মুখের মাংশপেশি হাসিতে অনভ্যস্ত
তাই তার হাসিটি কেমন যেন ভয়ংকর দেখায় । মুখে ভয়ংকর সেই হাসিটি ফুটিয়ে রেখে বলল, "আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা তোমাদেরদুইজনকে মেরে ফেলব তাই তোমাদের বলতে এখন কোনো সমস্যা নেই।”
তিষা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, আতংকের একটা শীতল স্রোত তার মাথা থেকে মেরুদণ্ড দিয়ে নিচের দিকে বয়ে যেতে থাকে।সে জনের দিকে তাকাল, জন মানুষের ঠোটের ভঙ্গী দেখে কথা বুঝে নেয়,সবসময় যে সমান ভাবে বুঝতে পারে তা নয়। এতো সহজে কাউকে মেরেফেলার কথা বলা যেতে পারে জন সেটা জানে না তাই সে লিডিয়ার কথাটাবুঝতে পেরেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। তিষার আতংকিত মুখ দেখেবুঝতে পারল কথাটা সত্যি, লিডিয়া সত্যিই তাদের মেরে ফেলার কথা
বলছে।কীভাবে পরিকল্পনা করেছ যে আমাদের ব্লাকমেল করার জন্যে তোমরাতোমাদের এনিম্যানকে নিয়ে সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখানোর একটা ভূয়াভিডিও তৈরী করবে । তারপর দেখানো হবে তোমরা এনিম্যানের হাত ধরেসেই হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে তাকে দিয়ে সাইন ল্যাংগুয়েজের ভান করেবানিয়ে বানিয়ে কথা বলাচ্ছ_ দেখতে চাও?”
তিষা মাথা নাড়ল, সে দেখতে চায় না। সত্যি কথা বলতে কী কোনোকিছুতেই এখন আর কিছু আসে যায় না। ভয়ংকর একটা আতংকে তারমাঝে এখন ক্রোধ হতাশা দুঃখ বা অন্য কোনো অনুভূতি নেই | লিডিয়া
টেবিলে টোকা দিতে দিতে বলল, “ভিডিওটার শেষ দৃশ্যে দেখানো হবেতোমরা ড্রাগ নিতেই থাকবে, নিতেই থাকবে । ড্রাগের ওভারডোজ হয়েতোমরা মারা যাবে । উচ্ছৃঙ্খল লোভী অনৈতিক দুশ্চরিত্র দুইজন টিন
এজারের অকাল মৃত্যু । সেই মৃত্যু দেখে কারো মনে বিন্দুমাত্র সমবেদনাহবে না । আমরা পুরোটা একটু একটু করে তৈরী করেছি- পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
সফটওয়ার ব্যবহার করে সেটা একটু একটু করে তৈরী হয়েছে । শেষ দৃশ্যটাআমরা তৈরী করব না। শেষ দৃশ্যটি হবে অরিজিনাল, সেইজন্যে আমরাতোমাদের এখানে ধরে এনেছি । খাটি ড্রাগস ওভারডোজ করে আমরা তারভিডিও নিব! সেটা ব্যবহার করব । কী মনে হয় তোমাদের, আমাদেরপরিকল্পনায় কোনো খুত আছে?”
তিষা আর জন কেউ কোনো কথা বলল না । তিষা এক ধরনের বিস্ময়নিয়ে এই মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রইল, পৃথিবীতে সত্যিই এরকম মানুষেরজন্ম হতে পারে? একজন মানুষ সত্যিই এরকম রাক্ষুসী হতে পারে?
এসে দাড়াল, তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার নিজের একটা দেশ ছিল, গরীব মানুষের দেশ সেই দেশ ছেড়ে বড়লোকের এসেছ । কাজটা ভালো হয় নাই । নিজের দেশে থাকলে ড্রাগ ওভারডোজেমারা যেতে না। এখন তোমাকে ড্রাগ ওভারডোজে মারা যেতে হবে! কেমনলাগছে চিন্তা করে?”
লিডিয়া তার মুখটা তিষার একেবারে কাছাকাছি নিয়ে আসে, তিষারকী মনে হল কে জানে হঠাৎ প্রচণ্ড ঘৃণায় থু করে লিডিয়ার মুখে থুতু ফেলল।ঘরে যারা ছিল তারা এতো চমকে উঠল যে সবাই কয়েকমুহূর্ত স্থির হয়েরইল । তিষাকে যে সিকিউরিটি গার্ড ধরে রেখেছিল, সে খপ করে তার হাতধরে মোচড় দিতেই তিষা ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে। সিকিউরিটি গার্ডতাকে মারার জন্যে হাত উপরে তুলল, লিডিয়া তাকে থামাল, বলল, “নাগায়ে হাত দেবে না । শরীরে মারের বা আঘাতের চিহ্ন থাকতে পারবে না।”
লিডিয়ার চোখ এবং গালে তিষার থুতু ল্যাপটে আছে, সে টেবিলথেকে একটা টিস্যু তুলে তার মুখটা মুছে নেয়। টিসুটার দিকে তাকিয়ে তারমুখটা ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়ে যায় । সে মাথা ঘুরিয়ে তিষার দিকে তাকিয়ে হিস
হিস করে বলল, “মেয়ে তোমার খুব সৌভাগ্য যে তোমার ড্রাগ ওভারডোজহয়ে খুব আনন্দের একটা মৃত্যু ঠিক করে রাখা আছে সেটা আর পাল্টানোযাবে না। কিন্তু জেনে রাখ আমি তোমার বাবা মা থেকে শুরু করে তোমারচৌদ্দগুষ্টির সবাইকে টিপে টিপে পোকার মতো মারব!”
ঠিক তখন দরজা খুলে কয়েকজন ঘরে ঢুকল । সবার সামনে সাদাগাউন পরা একজন বয়স্ক মানুষ | হাতে একটা ব্যাগ । ভেতরে ঢুকেইটেবিলে ব্যাগটা রেখে সেখান থেকে একটা সিরিঞ্জ, কয়েকটা এমপুল বের
করে সে কাজ শুরু করে দেয় । তাকে দেখে মনে হল এই ঘরে যে অন্যমানৃষেরা আছে সেটা সে লক্ষ্য পর্যন্ত করে নি।
বয়স্ক মানুষটির পেছন পেছনে বেশ কয়েকজন মানুষ এসে ঢুকল ।তাদের কারো হাতে টেলিভিশন ক্যামেরা কারো হাতে স্ট্যান্ডের উপরলাগানো লাইট, কারো হাতে রিফ্লেক্টর ৷ সবার শেষে দুজন মানুষের হাতেবড় একটা সবুজ রংয়ের পর্দা। চশমা পরা স্কুল মাস্টারের মতো দেখতে শুকনো একজন লিডিয়াকেজিজ্ঞেস করল, “কোথায় শুট করব?”
লিডিয়া বলল, “সেটা তোমাদের ব্যাপার । তোমরা ঠিক কর।”
স্কুল মাষ্টারের মত মানুষটি চারিদিকে তাকিয়ে জানালার কাছাকাছি একটা জায়গা দেখিয়ে তার লোকদের বলল, "ক্রমা কীয়ের জন্য সবুজ স্ক্রীনটা এখানে টানাও।”
মানুষগুলো তখন তখনই কাজে লেগে গেল । স্কুল মাস্টারের মতোমানুষটি তখন অন্য মানুষগুলোকে বলল, “তোমরা লাইটিং শুরু কর।ন্যাচারল লাইটিং হবে, বিকাল বেলা, গাছের ছায়ার কাছাকাছি ।”
মানুষগুলো মাথা নেড়ে তাদের ঘাড়ে করে আনা স্টুডিও লাইটগুলো বসাতে শুরু করে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now