বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তিষা বাসায় ঢুকে তার মাকে বলল, “আম্মু, বল দেখি এটার মানে কী?”
তারপর সে প্রথমে তার ডান হাতটা নিজের বুকের উপর রাখে,তারপর দ্বিতীয় হাতটাও বুকের উপর নিয়ে আসে তারপর দুই হাত দিয়েতার আম্মুকে দেখায় । আম্মু বললেন, “জানি না বাপু ।”
তিষা বলল, “এর মানে হচ্ছে আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আম্মু বললেন, “তুই কাউকে ভালোবাসলে সোজাসাঁজ মুখ ফুটে বলেফেল । হাত পা নেড়ে এতো কায়দা করে বলতে হবে কেন?”
তিষা বলল, “এটা হচ্ছে সাইন ল্যাংগুয়েজ । আমাদের ক্লাসে একটাছেলে এসেছে সে কানে শুনতে পায় না, ঠিক করে কথাও বলতে পারে না।সবকিছু সাইন ল্যাংগুয়েজ দিয়ে বলে । আমাদেরকে সে সাইন ল্যাংগুয়েজশেখাচ্ছে ৷”
আম্মু বললেন, “ব্যাপারটা খারাপ হয় না । তুই যতক্ষণ বাসায় আছিসসারাক্ষণ সাইন ল্যাংগুয়েজ কথা বললে বাসাটা একটু নিরিবিলি থাকবে!”
তিষা তার মা'কে ছোট একটা ধাকা দিয়ে বলল, “যাও আম্মু । তোমারসবকিছু নিয়ে ঠাট্টা।”
টুইটি তিষাকে সমর্থন করে ভারী গলায় ডাকল । তাকে যখন প্রথমআনা হয়েছিল তারপর দুই বছর পার হয়ে গেছে- এখন সে আর ছোটকুকুরটি নেই, রীতিমত বড় হয়ে গেছে। তেজী শরীর, মসৃণ অবয়ব,কৌতুহলী চোখ । যতক্ষণ তিষা স্কুলে কিংবা বাইরে থাকে টুইটি ততক্ষণখুবই দায়িত্বশীল একটা কুকর । সে বাসায় আসা মাত্র তার দুষ্টুমি শুরু হয়েযায় । সে লাফ ঝাঁপ দিতে থাকে, তিষাকে ঘিরে ছোটাছুটি করতে থাকে ৷তার প্রিয় খেলা হচ্ছে তিষার একপাটি জুতো মুখে নিয়ে ছুটে পালিয়েযাওয়া । ঘরের ভেতরে না থেকে বাইরে ছোটাছুটি করা টুইটির অনেক বেশীপছন্দ । যতদিন শীত না পড়েছে ততদিন সমস্যা ছিল না কিন্তু বরফ পড়তে শুরু করার পর তিষা বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে টুইটি সেটা বুঝতেপারে না । সে যেরকম বরফে ছোটাছুটি করতে পারে তার ধারণা সবাই বুঝিসে রকম পারে!
এই দুই বছরে তিষাও অনেক বড় হয়েছে । তার ক্লাশের আমেরিকানবান্ধবীরা অবশ্যি আর কিশোরী নেই সবাই তরুণী হয়ে গেছে । তিষা এখনোহালকা পাতলা, চোখে মুখে একটু বাড়তি বুদ্ধির ছাপ, চাল চলনে একটু
বেশী আত্মবিশ্বাস তা না হলে হয়তো বোঝাই যেতো না তার বয়স এখনপনেরো ।
রাতে খাবার টেবিলে তিষা আবার তার ক্লাশের কানে না শোনাছেলেটির কথা তুলল, বলল, “আব্বু, তুমি জান আমাদের ক্লাসে একটাছেলে এসেছে, ছেলেটা কানে শুনতে পায় না কিন্তু কম্পিউটারেরজিনিয়াস ।”
আববু বলল, “হতেই পারে । কানে না শুনলে একজন কী জিনিয়াসহতে পারে না? বিটোভেন কানে শুনতেন না-তাতেই কতো বড় শিল্পী-কানে শুনলে না জানি কী হতো !”
তিষা বলল, “ছেলেটার নাম জন | জন উইটক্যাম্প | খুবই সুইট ।একদিন বাসায় নিয়ে আসব দেখো।”
“নিয়ে আসিস।”
“আমাদেরকে সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখাচ্ছে।”
“ইন্টারেস্টিং” আব্বু বললেন, “আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখনসাইন ল্যাংস্তয়েজের কথা জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে কী করতামবল দেখি?”
“কী করতে?”
“পরীক্ষার হলে নকল করা খুব সোজা হতো । আমাদের ফার্স্ট বয় এককোনায় বসে সাইন ল্যাংগুয়েজ দিয়ে বলতো আর পুরো হলের আমরা সবাইলিখে ফেলতাম। একেবারে নিঃশব্দে |”
আব্বু আজকাল পরীক্ষায় নকল করার জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ লাগে না । কতো রকম ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বের হয়েছে তুমি জান?”
“তা ঠিক।”
আম্মু বললেন, “এই যে ছেলেটা কানে শুনতে পায় না তার ক্লাশকরতে সমস্যা হয় না?
“মোটেও না । লিপ রিডিং করতে পারে । ঠোট নাড়া দেখে সব কথাবুঝতে পারে । একটু একটু বলতেও পারে, কষ্ট করে বুঝতে হয় ।”
“ইন্টাররেস্টিং।” আব্বু বললেন, “আমরা যখন লেখাপড়া করেছিতখন কেউ কল্পনাও করতে পারত না এরকম একজন আমাদের সাথেলেখাপড়া করবে ।”
তিষা বলল, “জন তো মোটামুটি স্বাভাবিক । আমাদের স্কুলে একজনআছে অন্ধ । আরো দুইজন হুইল চেয়ারে।”
“সত্যি?”
“হ্যা, যে মেয়েটি অন্ধ সে তার ক্লাশের মনিটর |”
“বাহ”
“আমরা কেউ অবশ্য অন্ধ বলি না, সবসময়েই বলি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৷”
“তাইতো বলা উচিত ।”
পরের কয়েকদিন প্রচুর তুষারপাত হল, চারদিক বরফে ঢেকে গেল । এরমাঝে তিষা একদিন খবর আনল কাছাকাছি সাসকুয়ান হ্রদটা বরফে ঢেকেগেছে, সবাই তার ওপরে স্কেটিং করছে ।
আম্মু বললেন, “জানি না বাপু ॥হদের উপর বরফ জমে গেছে সেখানেস্কেটিং করার সময় বরফ ভেঙ্গে যদি নিচে পড়ে যায়?”
তিষা বলল, “কী বল আম্মু? বরফ কতো শক্ত হয় জান? লেকের ওপররীতিমত গাড়ী যেতে পারে!”
“সত্যি?”
“হ্যা । চল একবার দেখে আসি ।”
“তোর আব্বুকে বল, গিয়ে দেখে আসব । খোদার দুনিয়ায় কতোবিচিত্র জিনিষই না আছে!”
“আমি আমার স্কেট নিয়ে যাব ।”
“ঠিক আছে ।”
এই বয়সী মেয়েরা যা করে তিষাও সেগুলো করে । রোলার স্কেটিং করে আইস স্কেটিং করে, উইক এন্ডে দলবেধে মলে বেড়াতে যায় । সবাইমিলে সিনেমা দেখে। দেশের অনেক মানুষ এখানে এসে তাদের ছেলেমেয়েদের ঘরে বেধে রাখতে চেষ্টা করে, তিষার আব্বু আম্মু কখনোসেটা করেন নি ।
দুই সপ্তাহ পর এক উইক এন্ডে তিষাকে নিয়ে তার আব্বু আম্মু জমে যাওয়াসাসকুয়ান লেক দেখতে গেল৷ আববু গাড়ী চালাচ্ছেন সামনে আম্মু । পিছনেতিষা আর টুইটি । টুইটির উত্তেজনা চোখে পড়ার মত, অনেকদিন পর ঘরথেকে বের হতে পেরে তার আনন্দের শেষ নেই ।
প্রায় দুই ঘণ্টা ড্রাইভ করে তারা সেই জমে যাওয়া হুদে উপস্থিতহলো । এমনিতে দেখে বোঝার উপায় নেই কোথায় শক্ত মাটি কোথায় হ্রদসবকিছু ধবধবে সাদা বরফে ঢাকা । একটু লক্ষ করলে বোঝা যায়, যেখানে
হৃদ ছিল সেখানে গাছ নেই, আশে পাশে পাতা ঝড়ে যাওয়া অনেক গাছ ।
উইক এন্ড বলে আজকে অবশ্যি অনেক মানুষ । দূরে গাড়ী পার্ক করেসবাই,হুদের উপর স্কেটিং করতে চলে এসেছে । উজ্জল রঙ্গীন কাপড় পরেনানা বয়সী মানুষ ছোটাছুটি করছে, দেখতে ভারি ভালো লাগে । তিষা গাড়ীথেকে নেমে তার স্কেটগুলো হাতে নিযে সামনে ছুটে যেতে থাকে, তার ভাবদেখে মনে হয় সামনে যে বিশাল আনন্দোৎসব চলছে একটু দেরী করলেইসেটা বুঝি শেষ হয়ে যাবে । টুইটিরও উৎসাহের শেষ নেই, সে তিষারপিছনে পিছনে ডাকতে ডাকতে ছুটতে থাকে ৷
আব্বু আর আম্মু গাড়ী থেকে বের হয়ে আসেন । দুই হাত ঘষে একটুউষ্মতা তৈরী করতে করতে তারা বরফে ঢেকে যাওয়া হুদের একটু কাছেএগিয়ে যান ।
তিষা কতোক্ষণ স্কেটিং করছিল মনে নেই, এই শীতের মাঝেও তারশরীর প্রায় ঘেমে গিয়েছে । তাদের ক্লাসের কয়েকজন এতো চমতকার আইসস্কেটিং করতে পারে যে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় । বরফের ওপর এতো
সুন্দর করে ঘুরপাক খায় যে দেখে মনে হয় কাজটা বুঝি খুবই সহজ । তিষাচেষ্টা করে দেখেছে, কাজটা মোটেও সহজ নয়, চেষ্টা করতে গিয়ে একটুপরপর বরফের ওপর আছাড় খেয়ে পড়েছেতিষা ঘুরপাক খেতে খেতে হ্রদের একপাশে চলে এসেছিল ঠিক তখনসে প্রথমে একজনের তারপর হঠাৎ করে সম্মিলিত মানুষের একটা ভয়পাওয়া আতংকের চিৎকার শুনতে পায় । তিষা দাড়িয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টাকরল কী হয়েছে, তখন সে মানুষের চিৎকারের পাশাপাশি বরফ ভাঙ্গার
একটা চাপা আওয়াজ শুনতে পেল এবং পরমুহূর্তে তার পায়ের নিচ থেকেকিছু একটা সরে যাওয়ার অনুভূতি হল । কী ঘটছে সেটা বুঝতে কয়েক মুহূর্তসময় নেয় ।হ্রদের উপর যে বিশাল বরফের স্তর রয়েছে সেটা হঠাৎ করেভেঙ্গে যেতে শুরু করেছে এটা সত্যিই ঘটা সম্ভব কী না সেটা নিয়ে এইমুহূর্তে ভাবার সময় নেই, এখন এখান থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে । তিষাদেখল আতংকে চিৎকার করতে করতে সবাই হ্রদের তীরে ছুটে যেতে শুরুকরেছে । তিষা মাথা ঘুরিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল কোন দিকে গেলে সেসবচেয়ে তাড়াতাড়ি তীরে পৌঁছাতে পারবে, তারপর ঘুরে সে সেদিকে ছুটতেথাকে ঠিক তখন তার সামনে হঠাৎ করে বরফের এটা ফাটল বের হয়ে নিচথেকে কুচকুচে কালো হিমশীতল পানি বের হয়ে আসে । তিষা প্রাণপণেনিজেকে থামানোর চেষ্টা করে কিন্তু সে থামতে পারল না । তিষা বরফেরউপর শুয়ে পড়ে বরফকে খামচে ধরে নিজেকে থামাতে চেষ্টা করল কিন্তু তবু
নিজেকে থামাতে পারল না । তিষা বরফের ফাটল দিয়ে হিমশীতল পানিতে পড়ে মুহূর্তের মাঝে তলিয়ে গেল । টুইটি ঠিক তখন ছুটতে ছুটতে সেখানেএসেছে, বরফের ফাটলের সামনে দাড়িয়ে সেটি একবার হাহাকার করে
ডাকল, তারপর কেউ কিছু বোঝার আগে কালো হিমশীতল পানিতে ঝাপিয়েপড়ল ।
তিষার আব্বু আর আম্মু এক ধরনের আতংক নিয়ে হ্রদের দিকেতাকিয়েছিলেন, কী ঘটছে বুঝতে তাদের একটু সময় লাগল | এতো মানুষেরভীড়ে তিষাকে খুঁজেও পাচ্ছিলেন না, যখন সব মানুষ নিরাপদে সরে এসেছেএবং তাদের ভেতরে কোথাও তিষা কিংবা টুইটিকে খুজে পেলেন না । তখনহঠাৎ করে একটা অচিন্ত্যনীয় ভয়াবহ আতংকে তারা পাথর হয়ে গেলেন।
যারা ছুটে এসেছে তাদের মুখে আব্বু আম্মু শুনতে পেলেন বরফের ফাটলদিয়ে লাল পার্কা পরা একটি মেয়ে পড়ে গেছে আর তার পিছু পিছু একটা
কুকুর সেখানে ঝাঁপ দিয়েছে, তখন হঠাৎ করে তিষার আব্বু আম্মুর পুরো জগৎটি মুহূর্তে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল | আম্মু চিৎকার করে সেখানে ছুটেযেতে চাচ্ছিলেন কিন্তু তাকে কেউ যেতে দিল না, সবাই মিলে তাকে ধরেরাখল |
বেশ কয়েকজন সতর্ক ভাবে তিষার খোজে এগিয়ে গেল, বরফেরতিষা সাতার জানে কিন্তু এই হিমশীতল পানিতে ডুবে বরফের নিচে চলেগেলে সেখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব ব্যাপার । নিঃশ্বাস নিতে না পারলে
মানুষ কয়েক মিনিটের বেশি বেচে থাকতে পারে না । এর মাঝে বেশ কয়েকমিনিট সময় পার হয়ে গেছে । দেখতে দেখতে সময় পার হয়ে যাচ্ছে এইবরফের নিচ থেকে তিষাকে জীবিত উদ্ধার করার সব আশা খুব দ্রুত শেষহয়ে যেতে শুরু করল ।
উদ্ধারকারীদের খবর দেওয়া হয়েছে, তারা কিছুক্ষণের মাঝে চলেআসবে, কিন্তু যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান তখন এই উদ্ধারকারী দলেরএখানে পৌছে কিছু করার থাকবে না । তারা এসে হয়তো তিষার মৃতদেহটাশুধু উদ্ধার করবে ।
ঠিক এরকম সময়ে মানুষজনের চিৎকার শোনা গেল, বরফের ফাটলেরএক জায়গায় লাল পার্কার একটা অংশ দেখা যাচ্ছে তার পাশে কিছু একটাহিমশীতল শরীরটি টেনে তোলে ৷ ক্রান্ত শ্রান্ত টুইটি বরফের ফাটলে পা রেখেওঠার চেষ্টা করে, উঠতে পারে না । একজন তাকে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা
করে কিন্তু তার হাত পিছলে টুইটি আবার পানিতে পড়ে গেল । কিছুক্ষণেরজন্যে টুইটিকে দেখা যায় না, একটু পর সে আবার ভেসে উঠে, আবার সে
ওঠার চেষ্টা করে । উঠতে পারে না, একজন তাকে ধরে টেনে তোলার চেষ্টাকরল, পারল না, টুইটি আবার তলিয়ে গেল, আর তাকে দেখা গেল না।
তিষা বেচে মাছে না নেই কেউ সেটা পরীক্ষা করার চেষ্টা করল না,তাকে নিয়ে ছুটে যেতে থাকে, ততক্ষণে একটা এম্বুলেন্স চলে এসেছে ।এমুলেন্সের স্ট্রেচারে শুইয়ে দিতেই এম্বুলেন্সটি সাইরেন বাজাতে বাজাতে
ছুটে যেতে থাকে ।
আম্মু আব্বুর বুকের কাপড় ধরে ঝাকুনি দিয়ে বললেন, “আমার তিষা বেচে যাবে? বেচে যাবে?”
আব্বু কিছু বললেন না । এতো দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকলেকেউ বেঁচে থাকে না কথাটি কেমন করে বলবেন? যদি বা বেচে থাকে সেইবেঁচে থাকার অর্থ কী? মস্তিষ্কে অক্সিজেন না গেলে সেই মস্তিষ্কের যে ক্ষতিহয় সেই ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিয়ে বেচে থাকা একজন মানুষের জীবন কতো
ভয়ংকর সেটি কী কেউ কল্পনা করতে পারবে?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now