বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটি অসমাপ্ত দৌড়ের গল্প -
পর্ব ৯
- সালেহ তিয়াস
২০
আমি গেলাম আবার রিকশায় চড়ে সেই জায়গায়,
যেখানে ও দাঁড়িয়ে ছিল।
গিয়ে দেখি, একদম ওখানেই দেয়ালে ঠেস
দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
দেখে কেমন যেন করুণা হল। আমার জন্যেই কি
দাঁড়িয়ে ছিল নাকি? ও কিভাবে বুঝল যে আমি
আসবই?
আমি রিকশা থেকে নামলাম। ওর সামনে গিয়ে
দাঁড়ালাম। ‘চল, বাসায় চল’।
উত্তর নেই।
‘কি ব্যাপার, চল’।
নির্বিকার।
‘সিন ক্রিয়েট কোর না। চল তো’; আমি ওর হাত
ধরে টান মারলাম।
‘যাব না’।
‘কেন যাবা না?’
‘যাব না’।
‘আহ, ঝামেলা কোর না। চল না তাড়াতাড়ি’।
‘যাব না বলেছি না?’
আমাদের দেখে আশেপাশের অত্যুৎসাহী মানুষ
থমকে দাঁড়াচ্ছে। এভাবে ছোটখাটো একটা ভিড়ই
জমে গেল।
একটা পাংকু তো হাতা ভাঁজ করে এগিয়ে এসে
বলেই ফেলল, ‘কি হয়েছে ভাইজান?’
কি আশ্চর্য, এটা শুনেই মেয়েটা তাড়াতাড়ি বলল, ‘কি
হল, চল’। বলে আমার হাত ধরে ওখান থেকে
বের করে নিয়ে এল।
বাহ! সারাজীবন মেয়েদের বিচারবুদ্ধির উপর সকল
প্রকার আস্থাহীন এই আমি মনে মনে তার
উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না।
আসার পথে আমরা একই রিকশায়। হুড তোলা।
উদ্দেশ্য একটাই, প্রখর রোদ থেকে
আত্মগোপন।
পাঠক শুনলে মনে করবেন আহা কি রোমান্টিক
সিন। একই রিকশায় হুডের নিচে নায়ক নায়িকা। মন
তাদের উড়ু উড়ু, বুক তাদের দুরু দুরু। মুখে খালি
ন্যাকা ন্যাকা প্রেমের কথা।
কিন্তু এইসব যে এইখানে সম্ভব হল না, তা
বোধহয় একমাত্র আমার জন্যেই। ঘড়ি যেমন
ওয়াটারপ্রুফ, আমি তেমন মেয়েমানুষ প্রুফ।
বাসার কাছাকাছি এসে ও বলল, ‘আপনাকে কিছু কথা
বলতাম’।
একবার ভুল করেছি, আর করা যাবে না। বললাম,
‘তাড়াতাড়ি বল’।
ও একটু ইতস্তত করল। তারপর বলল, ‘আমি জানতাম
আপনি আবার আসবেন’।
অ্যাঁ! আরে গাধা মেয়ে, আমি তো এমনি এমনি
আসিনি, তোমার জননী পাঠিয়েছেন বলেই কিনা
এসেছি। তিনি না বললে আমার কি ঠেকা পড়েছে
এই ভর দুপুরে মজা দেখতে আসি?
মুখে কিছু বললাম না।
সে এবার বলল, ‘সরি’।
এইরে, আবার ন্যাকামি! আমি বললাম, ‘কিসের সরি?’
‘আপনার সেদিন খুব লেগেছে তাই না?’
‘কোনদিন?’
‘আব্বু আপনাকে যেদিন খুব মারল...আপনি কি
আশ্চর্য শক্ত মানুষ একটুও কাঁদেন নি...’
আমি শুনে তো থ। আমাকে যে সেদিন মামা
মোটেও মারে নি সেটা কি এই মেয়ে জানে
না?
‘আমাকে তো...’
‘হ্যাঁ আমি জানি আব্বু আপনাকে কি মারটাই না
মেরেছে, আব্বু শোবার সময় আম্মুকে
বলেছে...আমার খুব কষ্ট লেগেছে
জানেন...আমার জন্যই তো আপনি মার
খেলেন...’
‘না, মানে...’
‘ভাইয়া আমি সরি। রিয়েলি রিয়েলি সরি। আমি আর
কখনও আপনাকে জ্বালাবো না’।
‘আচ্ছা ঠিক আছে...’
‘না ঐভাবে বললে হবে না। বলেন যে আপনি
আমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন’।
‘আচ্ছা ঠিক আছে’।
‘মুখে বলেন যে দিলাম ক্ষমা করে’।
‘আচ্ছা যাও। দিলাম ক্ষমা করে’।
‘বলেন যে আপনি আর আমার প্রতি কোন রাগ
মনে পুষে রাখবেন না’।
‘আচ্ছা ঠিক আছে রে বাবা, রাখব না। হল তো?’
এবার মেয়েটি এক চিলতে করুণ হাসি উপহার দিল।
বাসা চলে এল। আমরা নেমে পড়লাম।
বললাম, ‘তুমি ভিতরে যাও, আমি একটু পরে আসছি।
আর মামীকে বলবে...থাক আমায় নিয়ে কিছু বলার
দরকার নেই। বলবে আমার সাথে তোমার দেখাই
হয় নি’।
মেয়েটা কি বুঝল জানি না। সে ভিতরে চলে
গেল।
আমি যে নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাকে
আনতে গিয়েছিলাম বোকা মেয়েটার এ বিশ্বাস
অটুট থাকুক। হা হা হা, বোকা মেয়ে।
এই বিশ্বাসটাই কবে কাজে লেগে যায় কে
জানে?
২১
দুম করে মামা একদিন বিদেশ চলে গেলেন। কি
একটা সেমিনার আছে। অন্তত সাতদিন পর
আসবেন।
ব্যস, অনেকদিন পর মুক্তির স্বাদ পেলাম। কি
আনন্দ আকাশে বাতাসে! এতদিন এই একটা মানুষের
ভয়েই অযথা প্রকম্পিত হয়েছে আমাদের হৃদয়।
স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়েও
জড়াতে হয়েছে পরাধীনতার শিকলে।
জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে উড়তে পারিনি মুক্ত
বিহঙ্গের মত। অথচ আজ? আজ মনে হচ্ছে আমি
কেবল জন্মলাভ করেছি, ছেড়ে এসেছি
মাতৃগর্ভ, পৃথিবীর রঙে হয়েছি আত্মহারা...
অকস্মাৎ স্বাধীনতা পেয়ে আমার প্রথম যে
চিন্তাটা মাথায় এল, তা হচ্ছে, স্কেলিটনটা সরাতে
হবে।
কিন্তু সরাবে কে? আমি বাপু সরাতে পারব না, আমার
ওদিকে দেখলেই কেমন যেন গা কাঁটা দিয়ে
ওঠে। তাহলে কাকে বলব? মামীকে? উনি তো
এই কথা শুনেই হা হা করে বিশ্রী একটা হাসি উপহার
দেবেন, শুনে গা জ্বলে যাবে, তার
মেয়েকে তো বলা সম্ভবই না...থাক, আপাতত
প্ল্যানটা মুলতুবি থাক।
মামা নেই, সুতরাং তার বেঁধে দেয়া কোন নিষেধ
মানারও কোন প্রয়োজন নেই। ফলাফল, আমার
আর ঐ মেয়ের প্রায়ই দেখা হতে লাগল।
এবং মজার ব্যাপার, মেয়েটা চান্স পেলেই আমার
সাথে খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। আমি যে তার
বাপের আশ্রিত, এই কথাটিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার
আমায় মনে করিয়ে দিতে লাগল সে।
আমার খারাপ লাগল, কিন্তু মুখে কিছু বললাম না।
পরীক্ষার বেশি বাকি নেই। এখন এসব করলে
পরীক্ষায় অশ্বডিম্ব প্রসব থেকে কেউ আমায়
ঠেকাতে পারবে না।
আমি কখনও ওর দিকে ভালোভাবে তাকাই না, তবু
ওর মধ্যে যে আশ্চর্য একটা পরিবর্তন এসেছে
তা আমার চোখ এড়ায় না। এখন আর সে মুরগির বিষ্ঠা
কালারের নেলপলিশ ব্যবহার করে না। এখন আর
সে ঠোঁটে প্যাস্টেল কালার মাখে না। এখন আর
সে মাথার চুল দিয়ে টুইন টাওয়ারের মত উঁচু খোঁপা
বানানোর চেষ্টা করে না।
তাহলে কি মেয়ে সোজা হয়ে গেল? কিন্তু
তাহলে আমার সাথে অকস্মাৎ এরকম বিহ্যাভের
কারণ?
নাহ, মেয়েদের মন বোঝা আমার সাধ্যে নেই।
খালি এই জিনিসটা মনে রাখতে হবে, কুত্তার লেজ
আর মেয়েদের ঘাড় - কখনও সোজা হয় না।
২১
সম্পূর্ণ নতুন এক ধরণের উপদ্রব শুরু হল সেদিন
রাত থেকেই।
আমি কোনদিন মশারি খাটাই না, কিন্তু এর মানে এই
নয় যে আমায় কখনও মশা কামড়ায় না। কিন্তু মশারি না
খাটানো আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস (মামীর ভাষায়
বদভ্যাস); সুতরাং মশা টশার কামড় এখন গা সওয়া হয়ে
গেছে।
সে রাতে ঘুমিয়েছি, সকালে উঠে প্রথমেই
ধন্ধে পড়ে গেলাম, আমি কোথায়? এমন লাগছে
কেন চারপাশ?
একটু পরে বোঝা গেল, আমি আসলে আমার
জায়গাতেই আছি। শুধু দৃষ্টিকে সসীম করে বসে
আছে সুন্দরভাবে খাটানো একটি মশারি।
কি ব্যাপার? কে খাটাল এই মশারি? আমি তো অবশ্যই
না। তাহলে কে?
মামী? নাহ, মামী তো আমার সাথে সেই ‘মশারির
উপকার ও অপকারসমূহ’ সংক্রান্ত বিতর্কে সেই যে
পরাজয় ঘোষণা করেছে আর কখনও আমার
সামনে মশারির নামও উচ্চারণ করে নি।
ঐ মেয়েটা? প্রশ্নই আসে না। অন্তত যেরকম
Cold War চলছে আমাদের ভেতরে।
তাহলে বাকি থাকে একটাই অপশন, ভুত!
এই কথাটাই আমি পরদিন খেতে বসে মামীকে
বললাম। ফাজলামি করে। বললাম যে ‘মামী জানো,
ভুত আমার প্রেমে পড়েছে’।
‘কেন?’
‘তা জানি না। ভুত আমার মশারি খাটিয়ে দিচ্ছে, জুতা
পালিশ করে দিচ্ছে, হোমটাস্ক করে দিচ্ছে...’
‘যা, ফাজিল!’
দিল মামী পুরোটা উড়িয়ে। উড়িয়ে দেয়াই উচিৎ।
তারমানে মামীকে লিস্ট থেকে বাদ দেয়া যায়।
তাহলে কি এটা ক্লিয়ার হল যে কে কাজটা
করেছে?
পরের রাত। গভীর রাতে কেন যেন ঘুম
ভেঙ্গে গেল, মাথা তখনও কাঁথার নিচে। হঠাৎ
শুনলাম একটা কড়কড় কড়কড় শব্দ...
এমনিতে গভীর রাত, তার উপর আমি আবার
খেতাবপ্রাপ্ত ভিতুর ডিম, তার উপর কঙ্কালের সাথে
আমার নিত্য সহবাস। ঠকঠক করে কাঁপা শুরু করলাম
নিজের অজান্তেই। আরও ভালো করে কাঁথা মুড়ি
দিলাম।
হঠাৎ যেন একটু বেলিফুলের গন্ধ পেলাম, খুব
কড়া গন্ধ, নাক দিয়ে মস্তিষ্কে ধাক্কা মারতে লাগল
গন্ধটা।
এক মুহূর্তের জন্য খুব ইচ্ছা করল কাঁথাটা সরিয়ে কি
হচ্ছে দেখতে। কিন্তু সাহসে কুলাল না।
একসময় শব্দ থেমে গেল। বেলিফুলের গন্ধটা
আস্তে আস্তে মিইয়ে যেতে লাগল।
প্রায় পনের মিনিট পর আমি কাঁথা তুললাম। তুলেই
একটা চিৎকার দিয়ে ছিটকে একদম দেয়ালের সাথে
বাড়ি খেলাম!
বাইরের মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছে, আমার পাশেই
শুয়ে আছে আমারই কঙ্কালটা, মুখে তার গা
শিউরানো খনখনে হাসিটা, এবং তার গলায় যে সাদা
জিনিসটা দেখা যাচ্ছে, তা একটি বেলিফুলের মালা
হবারই চান্স বেশি...!!!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now