বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটি অসমাপ্ত দৌড়ের গল্প-১২
- সালেহ তিয়াস
২৬
মামা এলেন। আমি তখনও ঘরের মেঝেতে বসে
আছি। বোধশূন্য, অনুভূতিহীন।
তিনি মামীর কাছে সব ঘটনা শুনলেন। মামী আমার
‘বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন’ সংক্রান্ত ভুল
বোঝাবুঝিপ্রসূত গল্পটা তাকে বলেছেন কি না
জানতে পারলাম না। বললেই বা কি। যথেষ্ট
হয়েছে। আর না।
মামা হঠাৎ আমার রুমে ঢুকে পড়লেন। ওনার ঐ দৃষ্টি
আমার একদমই অপরিচিত।
তিনি বললেন, তুই এই ঘর থেকে নড়বি না। আমি না
বলা পর্যন্ত একদম নড়বি না।
অন্য সময় হলে ভয় পেয়ে যেতাম। কিন্তু এখন
ভয় পেলাম না। আল্লাহই জানে ভাগ্যে কি আছে।
মামা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি
বসেই থাকলাম।
বাইরে কি হচ্ছে তা নিয়ে আমার কোন ধারণাই ছিল
না। শুধু একটু পর পর হাঁটাহাঁটি, জোরে জোরে
বলা দু একটা কথা, কথা কাটাকাটি, কোন ধাতব বস্তুর
ঠোকাঠুকি, একটু কান্না-ইত্যাদি শব্দ কানে আসছিল।
বসে থাকতে থাকতেই সকাল হয়ে গেল। কেউ
খাবার জন্য ডাকল না। কেউ বলল না, তাড়াতাড়ি ওঠ,
কোচিঙে যাবি না?
কখন যেন মেইন গেটে তালা মারার শব্দ পেলাম।
কি ব্যাপার? কে কোথায় যাচ্ছে?
তারপর থেকেই বাসাটা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল।
কি ব্যাপার? সবাই কোথায় গেল?
এক ঘণ্টা কেটে গেল।
আমি দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। মামী, দরজা
খোলো।
সাড়াশব্দ নেই।
মামী, দরজা খোলো।
কেউ নেই।
আরে, কি ব্যাপার? আমি এবার গা দিয়ে জোরে
জোরে ঠেলা মারা শুরু করলাম। খুবই জোরে।
কিন্তু কিছুই হল না। এবার আমি লাথি মারা শুরু করলাম।
ওয়ান, টু, থ্রি...মার লাথি!
আশ্চর্য, আর গোটা পাঁচেক লাথি দিতেই দরজাটা
খুলে গেল। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
দেখলাম, যে তালাটা দরজার ওপাশে মারা ছিল তা
খোলা।
সম্ভবত খোলা অবস্থায়ই তালাটা ঝুলিয়ে তারা চলে
গেছে। আর আমার ক্রমাগত ধাক্কাধাক্কিতে
অবশেষে তালাটা আলগা হয়ে পড়ে গেছে।
কিন্তু এটা কি ইচ্ছাকৃত? যদি হয়, তো কেন?
বাইরের গেটটা চেক করলাম। আরে, এখানেও
একই ব্যাপার। তালা ঝুলানো, কিন্তু খোলা। একটু
খেয়াল করলেই যে কেউ বাইরে যেতে বা
ভিতরে ঢুকতে পারবে।
আমি পুরো বাসায় একটা ছোটখাটো সার্ভে
করলাম। অন্য সব ঘরে তালা মারা। কেউ নেই।
বাইরে এলাম। কোথাও গেছে এরা? ভেবে
কোন কূলকিনারা পেলাম না।
আরেকটু বাইরে এলাম। রাস্তা দেখা যাচ্ছে।
এমন সময় পাশের বাসার আন্টি কোথা থেকে
এসে বললেন, ও কি, তুমি যাও নি?
অবাক হলাম। কোথায়?
কেন, তুমি জানো না? তোমার বোন লন্ডনে
স্কলারশিপ পেয়েছে, আজকে ফ্লাইট। এই
তো, বারোটায়।
স্কলারশিপ? আমার বোন?? কিভাবে সম্ভব? কিসের
স্কলারশিপ?
আমি তো কিছুই জানি না আন্টি!
সে কি, তুমি কিছুই জানো না? ওনারা তো
ঘণ্টাখানেক আগে বেরিয়ে গেছেন, তুমি
ঘুমাচ্ছিলে বুঝি?
মাথা আমার তখন ভোঁ ভোঁ করছিল। কিভাবে কি
হয়ে গেল। এত বড় একটা ঘটনা ঘটছে অথচ আমি
জানি না।
আন্টিকে বিদায় দিয়ে আমি রাস্তায় নেমে এলাম।
পকেটে কয়েক টাকা আছে মাত্র।
এয়ারপোর্টের দিকে ৩ নাম্বার বাস যায়। আমি
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখি একটা ৩ নাম্বার বাস
আসছে। বাসের ভিতর ভয়াবহ ভিড়। গেটে অন্তত
পনের জন মানুষ অভেদ্য দুর্গ রচনা করে দাঁড়িয়ে
আছে।
আমি উঠতে গেলাম, সবাই হই হই করে উঠল।
মানে, ওঠা যাবে না।
তবু ধাক্কাধাক্কি করে ঝুলে থাকার চেষ্টা করলাম।
এরই ফাঁকে বাসটা ছেড়ে দিল।
পাদানিতে একটা পা রেখেই ফেলেছি প্রায়, এমন
সময় শক্ত কনুইর প্রচণ্ড গুঁতোয় রাস্তায় ছিটকে
পড়ে গেলাম। পাশ দিয়েই সাঁই করে চলে গেল
আরেকটি বাস।
আমার অবস্থা দেখে কেউ ভ্রূক্ষেপও করল না।
একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতেও চাইল না। এগিয়ে এসে
সাহায্য করা তো দূরের কথা।
ঐ বাসটা যেতে না যেতেই আরেকটা বাস চলে
এল। এটারও একই অবস্থা। গেটের কাছে এক
ব্যাটালিয়ন যাত্রী রূপী সৈন্য ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব
সুচাগ্র জায়গা’ মনোভাব নিয়ে দণ্ডায়মান।
কিন্তু আমি ছেড়ে দেবার পাত্র নই। ছোটবেলা
থেকেই ভালো লাফ দিতে পারি, সেই কারিশমাটাই
এখানে কাজে লেগে গেল। এক লাফে অন্য
কারও পায়ে পাড়া দিয়ে দ্বিতীয় লাফে আরেকটা পা
রাখলাম কাছের জানালাটার কিনারে। ব্যস, জানালা গলে
ঢুকে পড়লাম ভিতরে।
লোকজন হই হই করে উঠল। পারলে এই মারে
তো সেই মারে। আমি মুখ চোখ করুণ করে
বললাম, প্লিজ ভাই, পেশেন্ট মারা যাচ্ছে, প্লিজ।
মজাটা নষ্ট হয়ে গেল দেখে লোকজন হতাশ
হয়ে নিজেদের কাজে মন দিল। আর আমি বারবার
ভাবতে লাগলাম, বাস এত আস্তে চলছে কেন?
এতবার থামছে কেন?
সাথে ঘড়ি ছিল না। পাশের এক যাত্রীকে
জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, কটা বাজে?
জবাবে সে সময়টা না বলে ঘড়ি পরা হাতটা আমার
চোখের আড়াল করে ফেলল। যেন আমি
প্রফেশনাল পকেটমার, অন্যের হাতে ঘড়ি
দেখলে উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে ওঠে
আমার অন্তরাত্মা।
ধুর। নিজেই টেনে হাতটা বের করে ঘড়িটা
দেখলাম। সাড়ে এগার। আর মাত্র আধ ঘণ্টা আছে।
ঐ ভদ্রলোক তো ভয়ে আরেকটু হলেই
অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম বাসটা থেমে গেছে। কি
ব্যাপার?
সামনে নাকি প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহর যাচ্ছে, তাই
বিশাল এক জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে। যতদূর দেখা যায়
খালি গাড়ি আর গাড়ি। এ জ্যাম কখন শেষ হবে কে
জানে?
আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেল। বাসটা নড়ল না
একচুলও।
আমি ক্রমশই নিজের থেকে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।
অজস্র ‘কেন? কেন? কেন?’ আমার মনের
মধ্যে ঠোকাঠুকি করছিল। কিন্তু কিছুতেই উত্তর
পাচ্ছিলাম না।
দু মিনিট পরে আমি সামনে আগাতে গেলাম। কিন্তু
এত ভিড়, একটুও আগাতে সক্ষম হলাম না।
জেদ চেপে গেল। ভদ্রলোককে বললাম,
উঠুন।
সে ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে বলল, কেন?
ধুর। আমি তার পরিষ্কার প্যান্টের উপর এক পা দিয়ে
আরেক পা জানালার ধারে রাখলাম। তারপর একটা
ছোট্ট লাফে ছিটকে পড়লাম রাস্তায়।
লোকটা বোধহয় ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
যতদূর তাকাই শুধু গাড়ি। শুধুই গাড়ি। একটা সিএনজিতে
উঠবো, লাভ নেই। কোনটাই চুল পরিমাণ নড়াচড়া
করছে না।
কিন্তু বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো হবে না।
একটা কিছু তো করতে হবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now