বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
'অরু!এই অরু!কখন থেকে বলছি ছাদ থেকে কাপড়গুলো তুলে নিয়ে আয়!ঝড় আসছে তো!তাড়াতাড়ি যা!’’
বারান্দায় দাঁড়িয়ে হা করে এলোমেলো বাতাসের উথাপাথাল দেখছিলাম,মায়ের চিৎকারে ধ্যান ভাঙ্গলো।
‘’যাই,মা!’’
এক দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাদে গেলাম।চারদিক যেন এক নিমিষে অন্ধকারে ডুবে গেছে।গমগম শব্দে মেঘ ডেকে বুকের মধ্যে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।তার থেকে কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ছাদের মাঝখানে ভুতের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম।ঝড়-বৃষ্টি-বাতাস আমাকে সম্মোহন করে,অবাক হয়ে দেখি!নিচ থেকে মায়ের ডাক আরেকবার শোনা গেল।উফ!মা টা জ্বালালো।ছাদ থেকে নেমে আসছি,হঠাৎ কে যেন দরাজ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘নীল নবঘনে,আষাঢ় গগনে
তিল ঠাঁই আর নাহিরে!
ওগো!আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে!’’
আমি ফিরে তাকালাম।রাশেদ ভাই।রাশেদ ভাইয়ের কন্ঠস্বর সুন্দর,ভরাট।কবিতা খুব মানায়।এরকম ঝড় ঝড় দিনে রাশেদ ভাইয়ের কবিতা শুনতে ভাল্লাগছিল।আমার পায়ে যেন শেকড় গজিয়ে গেল,নিচে মা ডাকছে,আমার যেতে হবে কিন্তু যেতে পারছি না।ঝড়-বৃষ্টির মতোন রাশেদ ভাইয়ের কবিতাও যেন আমাকে সম্মোহিত করেছে।রাশেদ ভাই পেছনে ফিরেই আমাকে দেখতে পেল!মুখে একটা মুচকি হাসি।
‘’অরু,আকাশের অবস্থা দেখেছো?হুড়মুড় কর বৃষ্টি এসে সব ভেসে যাবে মনে হচ্ছে।‘’
‘’জী!’’
‘’তুমি এভাবে কাপড় হাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আছো কেন?নিচে যাও।বৃষ্টি শুরু হলো বলে।‘’
‘’যাবো।ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আপনার ছাদের ঘরে থাকতে ভয় লাগে না?’’
রাশেদ ভাই হেসে ফেললেন!রাশেদ ভাইয়ের হাসি সুন্দর।মুগ্ধ হওয়ার মতো সুন্দর।
‘’ভয় লাগবে কেন?’’
‘’ছাদের ঘরের চালা তো টিনের,যদি উড়ে যায়?’’
‘’গেলে যাবে!এটা নিয়ে আগে থেকে ভয় পাওয়ার কি আছে?’’
রাশেদ ভাই চুপ হয়ে গেলেন।রাশেদ ভাইয়ের মুখ কিরকম দুঃখী লাগছে মুহূর্তেই।আমি আর কথা বাড়ালাম না,নিচে চলে আসবো,রাশেদ ভাই আবার ডাকলেন,
‘’অরু,তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল!’’
‘’জী,বলুন।‘’
‘’কাল তরু এসেছে,না?’’
আমি চমকে রাশেদ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম!সেই মুখে স্পষ্ট একটা যন্ত্রনার ছাপ,রাশেদ ভাইয়ের কপালের শিরা,চোখের মাঝ দিয়ে সেই গভীর যন্ত্রনাটা ফুটে বের হচ্ছে!আমার খুব অসহায় লাগছে,মনে হচ্ছে রাশেদ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলাই,মায়া নিয়ে জিজ্ঞেস করি,
‘’কোথায় কষ্ট হচ্ছে?আমাকে বলুন।আমি সব সারিয়ে দেবো।‘’
আমি কিছু বললাম না,শুধু ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকালাম।
রাশেদ ভাই গলা ছেড়ে হাসলেন,আমার কাছে কান্নার মতো শোনালো!আমি ছুটে নিচে চলে আসলাম।বাইরে ঝড়ের বেগ বাড়ছেই,আমার বুকের মধ্যেও ঝড় হচ্ছে,কেউ দেখতে পাচ্ছে না!রাশেদ ভাইয়ের বুকের মধ্যেও ঝড় হচ্ছে,সেই ঝড়টা আমি দেখতে পাচ্ছি!বেশিদিন তো নয়,এই সেদিনের কথা মনে হচ্ছে।এরকম ঝড়ের এক বিকেলেই ছিল।একই ঝড়,একই বিকেল,একই আমি!অন্যরকম হয়ে গেছে শুধু রাশেদ ভাই আর আপা!
সেদিন ঝড়-বৃষ্টিতে কারেন্ট চলে গিয়েছিল বেশ অনেকক্ষন,সর্বশেষ মোমবাতিটাও ছোট হয়ে আসছে।মা,ছোট খালার বাসায় আটকা পড়েছে।আমি আর আপা সেই ছোট হয়ে যাওয়া মোম বাতির আলোয় হাত-পা ছড়িয়ে মুড়ি মাখা খাচ্ছি!আপা গুনগুন করে গান গাইছে,আপার গানের গলা ভীষন সুন্দর,একটা গান থামলে আবার বলতে ইচ্ছা হয়, ‘’আরেকটা গাও না,আপা!’’ আপার শুধু গানের গলা না,আপার সবই সুন্দর।চোখ,নাক,মুখ,চুল,গায়ের রং সব সুন্দর।একবার দেখেই আপাকে সবার ভাল লেগে যায়।আপা যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন থেকে আপার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে!আপা ক্লাসের সময় বের হলে মোড়ের টং দোকানে বসে বসে সিগারেট টানা ছেলেরা আপার জন্য রিক্সা ডেকে আনতে মারামারি লাগিয়ে দেয়।স্কুলের সময় থেকেই আপার যে কত চিঠি আসতো তার হিসেব নেই!কে আপাকে কত ভালবাসে সেই স্ংক্রান্ত চিঠি।আমরা দুই বোন মিলে রাত জেগে মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে সব চিঠি পড়তাম,আর সব চিঠির হাতের লেখা,বাক্যের ভুল,বানান ভুল নিয়ে খিলখিল করে হাসতাম!আমি ঠিক আপার উলটো।শ্যামল শ্যামলা গোলগাল মুখ,একেবারে সাধারন,আপা বলে, "তুই একেবারে উপন্যাসের নায়িকা!"
আপা তখন ‘’মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো’’ মাত্র শুরু করেছে,আমার খুব প্রিয় একটা গান এমন সময় দরজায় খটখট শব্দ হলো।এইসব ফাইফরমাস খাটার কাজ যেমন দরজা খোলা,পানি দেয়া,ছাদ থেকে কাপড় তুলে আনা,রান্নার সময় এটা-ওটা মাকে এগিয়ে দেয়া এসব বরাবর আমার কাজ,আপা এসব কাজ কখনো ছুঁয়েও দেখে না!আমি দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে দরজা খুলতে চলে গেলাম।মোম হাতে নিয়ে দরজা খুলে আমি রীতিমতো একটা ধাক্কার মতো খেলাম।কাকভেজা হয়ে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে আর থরথর করে কাঁপছে,ভেজা কাপড় দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে,আমি মোম হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে লোকটাকে দেখতে থাকলাম!কারো কোন শব্দ না পেয়ে আপা উঠে এলো,
‘’কে এসেছে রে?মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’’
আপা লোকটাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো।গলার স্বর শক্ত করে জিজ্ঞেস করলো,
‘’আপনি কে?কাকে চান?আপনাকে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছে না!’’
লোকটা কাঁপতে কাঁপতেই উত্তর দিলো,
‘’আমি রাশেদ,হাসান সাহেবের ভাগ্নে,ওনারা কেউ বাসায় নেই,আমাকে দয়া করে একটা গামছা দেবেন?গা-মাথা মুছবো। খুব শীত করছে।শীতে মারা যাবো মনে হচ্ছে!"
আপা লোকটার মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো।আমি হতভম্ব হয়ে আপার দিকে তাকালাম।
‘’এটা কি হলো আপা?লোকটাকে একটা গামছা দিই?’’
‘’তুই কি গাধা?চেনা নেই,জানা নেই অপরিচিত একটা লোককে গামছা দিবো?বাসায় আমরা একা না?বাড়িওয়ালা চাচারাও যদি বাসায় না থাকে তাহলে পুরো বিল্ডিং এই আমরা একা,এর মধ্যে এই অপরিচিত লোককে কি দাওয়াত করে ঘরে বসাবো?সে যে বাড়িওয়ালা চাচার ভাগ্নে তার প্রমান কি?কি মতলবে এসেছে কে জানে!তুই তো দেখি একটা বিশাল গাধা!’’
আমি মন খারাপ করে আমার ঘরে চলে আসলাম।আপার কথা ঠিক কিন্তু কাকভেজা লোকটাকে দেখে আমার বিপদজনক কেউ মনে হয় নি,ভেজা চোখ একদম স্বচ্ছ,ভাল মানুষের মত গলার স্বর,কি অসহায় ভাবে একটা গামছা চাইলো!কি এমন ক্ষতি হতো দিলে?আপাটা কেমন জানি নিষ্টুর,মায়া-দয়া কম!পৃথিবীর সব রূপবতী মেয়েদের ই কি মায়া একটু কম থাকে? তারা কি এরকম পাথর পাথর টাইপ হয়?
সেদিনের সেই বৃষ্টিতে কাকভেজা লোকটা আমাদের বাসার ছাদের ঘরে থাকা শুরু করলেন।তিনি বাড়িওয়ালা চাচার ভাগ্নেই ছিলেন,বৃষ্টিতে ভিজে কঠিন নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে ফেলেছিলেন,এখন সুস্থ হয়েছেন।তার নিউমোনিয়া হওয়ার পেছনে আমার অনেকাংশে নিজেকে দায়ী মনে হলো!গামছা দিয়ে লোকটাকে ঘরে বসতে দিলে এরকম হয়তো হতো না!আপাকে কথাটা বলতেই আপার ঝাড়ি খেলাম,
‘’সারাক্ষন নিমাই এর লুতুপুতু উপন্যাস পড়ে পড়ে তুই একেবারে উপন্যাসের নায়িকা হয়ে গেছিস রে অরু!এসব ফালতু অপরাধবোধ নিয়ে প্যানপ্যান করবি না!যা করেছিলাম ঠিক করেছিলাম।রাস্তার অনেক মানুষজন সেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিল,সবাই এসে গামছা চাইলেই সবাইকে ঘরে ঢুকিয়ে চা-কফি খাইয়ে আপ্যায়ন করতে হবে নাকি?’’
আমার আপাটা কেমন জানি ভীষন কঠিন!কাউকে সহজে বিশ্বাসই করতে চায় না।আমার সেই ভীষন কঠিন রূপবতী আপা একদিন ছাদের ঘরের সহজ-সরল ,স্বচ্ছ চোখের সাধারন রাশেদ ভাইয়ের প্রেমে পড়ে গেলো!অসহায় ভাবে দুই চোখ ভর্তি জল নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘’কখনো যেন কারো প্রেমে পড়িস না অরু!প্রেমে পড়া কি ভীষন যন্ত্রনার।‘’
আমি শক্ত করে আপাকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম! আমার চোখের জল আপা দেখলো না!আপাকে বলা হলো না সেই ঝড়ের সন্ধ্যায় মোম হাতে নিয়ে যে স্বচ্ছ চোখ আমি দেখেছিলাম সেই মানুষটার জন্য আমার মনে সারাক্ষন কি দারুন ঝড় চলে!প্রেম নাকি?হ্যাঁ,প্রেমে পড়া যন্ত্রনার,বিশ্রি এক যন্ত্রনা!
সব মানুষজনকে লুকিয়ে আপা আর রাশেদ ভাইয়ের সেই গভীর প্রেমের কথা জানতাম শুধু আমি!দুজনকে কি সুন্দর মানাতো!রাশেদ ভাইয়ের চোখের দিকে মাঝে মাঝে তাকাতাম,আপা ছাড়া কার কারো ছবি সেই চোখে আমি দেখতাম না!রাতে ঘুমানোর সময় আপা কি ভালবাসায় রাশেদ ভাইয়ের চিঠি খুলতো!বারবার হাত বুলিয়ে দিতো,সহজে পড়তো না,পড়লেই তো ফুরিয়ে যাবে!আপা ঘুমিয়ে গেলে আমি চুপিচুপি সেই ভালবাসার চিঠি খুলতাম!তিন-চার লাইনের সেইসব চিঠি ভালবাসায় মাখামাখি।
‘’তরু,
মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি একটা অলীক স্বপ্ন,তুমি আসলে নেই,খুব অবিশ্বাস হয়,তোমার হাত ছুঁয়ে বসে থাকবো সারাজীবন,তবু আমার বিশ্বাস হবে না!তোমাকে ভালবাসার জন্য সারাটাজীবন খুব ছোট তরু,আরেক জীবন আমার লাগবে,শুধু তোমার জন্যই লাগবে!’’
খুব সাবধানে চোখের জল মুছে নিতাম,আমার চোখের জলে এত সুন্দর চিঠি ভেজানো যাবে না!আমার চোখের জল অভিশাপের মতো!
আমার চোখের জল চিঠিতে পড়ে নি তবু অভিশাপ লাগলো।আপা আর রাশেদ ভাইয়ের প্রেম মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেল।মাকে জীবনে কখনো আপার সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখি নি সেই আপার গায়েই মা হাত তুলে ফেললো।আপার ফর্সা গালে মায়ের হাতের পাঁচ আঙ্গুলের দাগ ফুটে থাকলো!বাড়িওয়ালা চাচা সেই রাতেই রাশেদ ভাইকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বললেন।রাশেদ ভাইয়ের কিছু করার ছিলো না,উনি তখন বিশাল এক অপরাধে অপরাধী একজন মানুষ!মাথা নিচু করে গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন।এর এক সপ্তাহের মধ্যে বিশাল বড়োলোক এক ডাক্তার ছেলের সাথে আপার বিয়ে হয়ে গেল!
বিয়ের দিন আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলো,আমার রূপবতী আপাকে বিয়ের দিন একটুকু সুন্দর লাগছিল না,মনে হচ্ছিল আপা একটা গাছ,ভয়াবহ ঝড়ে সেই গাছ একেবারে শেকড় থেকে উপড়ে গেছে!আপা শ্বশুড়বাড়ি চলে গেল,অনেক মানুষের মাঝে আমি রাশেদ ভাইকে দেখতে পেলাম,নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন,একদম নড়ছেন না,একদৃষ্টিতে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছেন,চোখে নির্লিপ্ততা।আমি যেয়ে রাশেদ ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম!
‘’রাশেদ ভাই!’’
‘’অরু,আমার ভেতরটা চুড়চুড় করে ভেঙ্গে গেছে,তবু দেখো আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি,এরকম করেই সারাজীবন আমার বেঁচে থাকতে হবে!জীবন এরকম কেন বলো তো!’’
রাশেদ ভাই কাঁদছেন।আমি রাশেদ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।কাঁদুক,উনি কাঁদুক,সব ধুয়ে-মুছে যাক,সব স্মৃতি,আপার প্রতি ভালবাসা সব কিছু!
আপার বিয়ের প্রায় এক বছর হতে চললো,গতকাল রাতে দুলাভাই আপাকে বাসায় রেখে গেছে,আপা কয়েকটা দিন এখানে থাকবে।রাশেদ ভাইও কিছুদিন থেকে ওনার মামার বাসায় আছেন একটা কাজের জন্য,কাজ শেষ হলেই চলে যাবেন।এই একবছরের মধ্যে আপা আর রাশেদ ভাইয়ের আর দেখা হয় নি।আপা আর রাশেদ ভাইয়ের ভালবাসার উপাখ্যানটা ওইটুকুই লেখা ছিল,এর বেশি সৃষ্টিকর্তা আর লেখেন নি!
আপাকে দেখে সুখী লাগছে,একটু মোটা হয়েছে,গায়ের রং আরো ফর্সা হয়েছে,আপাকে দেখতে আগের চেয়েও সুন্দর লাগছে।আপা সারাক্ষন হাসছে,আপাকে দেখে মনে হচ্ছে না তার জীবনে কোন দুঃখের অধ্যায় ছিল।আপাকে আমার একটা কথা বলার আছে!কতবার বলতে চেয়েছি,কখনো বলতে পারি নি।আমি আজকাল আয়নায় নিজেকে দেখি না,দেখতে পারি না,আয়নায় কখনো তাকালেই নিজেকে কুৎসিত কেউ মনে হয় যে নিজের স্বার্থের জন্য সব ধ্বংস করে ফেলতে পারে।আপা আমাকে উপন্যাসের নায়িকা বলতো,আমি কোন উপন্যাসের নায়িকা না,তারা এরকম হয় না,উপন্যাসের নায়িকারা হয় আপার মতো!আমি পাপে ভরা একজন কুৎসিত মানুষ যার অভিশাপের আগুনে সব পুড়ে গেছে!
‘’আপা,তোমাকে একটা কথা বলার ছিল!’’
‘’কি বলবি আমি জানি!রাশেদ এসেছে, এই তো?’’
আপা সুন্দর করে হাসলো।
‘’আমি সকালে দেখেছি ওকে।অনেক শুকিয়ে গেছে!এত সিগারেট খায় কেন?না করিস তো! ‘’
আপার মুখে কষ্টের কোন ছাপ দেখলাম না।আপা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে চুলায় পায়েস নাড়ছে।
‘’আমি পায়েস নামালে ওকে বাটিতে করে দিয়ে আসিস,পছন্দ করতো।‘’
আপা আবার হাসলো।আমার বুকের মধ্যে তোলপাড় করছে।আজকে আমার বলতেই হবে।
‘’আপা,আমি এখন যেই কথাটা বলবো সেটা জানার পরে তুমি আমাকে সারাজীবন ক্ষমা করতে পারবে না কিন্তু তবু তোমাকে আমার বলতেই হবে!’’
‘’তুই কি বলবি আমি জানি অরু!রাশেদের লুকানো চিঠিগুলো তুই মাকে দিয়েছিলে এইতো?’’
আপা এবার শব্দ করে হেসে ফেললো।আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল!আপার হাসি কেমন এলোমেলো!সেই হাসিতে রাগ,অভিমান,ক্ষোভ,জেদ,দুঃখ,যন্ত্রনা সব মিশে আছে!আপা জানতো?কবে থেকে জানতো?
‘’আমি কোথায় চিঠি লুকাই এটা তুই ছাড়া আর কারো পক্ষেই জানা সম্ভব ছিল না,ওখানে মায়ের কখনো নজরই পড়তো না,আমি জানি,যেদিন মায়ের হাতে চিঠিগুলো দেখি সেদিন থেকেই আমি জানি!অনেক ভালবাসিস রাশেদকে?আমি তোর বোন,আমি বুঝবো না?মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম তুই রাশেদের চিঠিগুলো হাতে নিয়ে কি আকুল হয়ে কাঁদছিস!আমার খুব ইচ্ছে করতো তোকে জড়িয়ে ধরতে,মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে! কি যে অসহায় লাগতো আমার!কিন্তু আমার তো কিছু করার ছিল না।জানিস,রাশেদ আর কখনো কাউকে ভালবাসতে পারবে না,তোকেও না,যদি পারে তাহলে বুঝবি তোর পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে!তোর উপর আমার কোন রাগ নেই।এদিকে আয় তো অরু,তোকে একটু আদর করে দি।এদিকে আয়!এত ভাল কেন বাসলি রে?"
আমি গুটিসুটি মেরে আপার বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লাম,আমার চোখের জলে আপার শাড়ি ভিজে গেল,আমার শান্তি লাগছে,ঝড় শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সব শান্ত হয়ে গেছে,কি সুন্দর বাতাস!আমার চোখের জলে আর কোন অভিশাপ নেই,সব শুদ্ধ হয়ে গেছে!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now