বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

এক মনমরা সন্ধ্যার গল্প

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ ছহিনুর রহমান বিন মনির (০ পয়েন্ট)

X // তুলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফর্সা গালের একপাশে চারটে আঙ্গুল লাল হয়ে বসে গেছে। তুলি মাথা নিচু করে আছে কারণ তার চোখে অশ্রু, তবে সেটা সে সামনের মেয়েটিকে দেখাতে চায়না। সামনে বিছানায় রাগী চোখে বসে থাকা মেয়েটির নাম মনিরা। তুলি সামান্য মাথা উঁচু করে জলভরা চোখে তাকানোর চেষ্টা করলো মনিরাকে। মনিরা যদি তুলির নিচু করা মাথা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, তবে তুলি আস্তে আস্তে হেঁটে বাইরে চলে আসবে। তারপর পা টিপে টিপে ছাদে যাবে। বাঁদিকের কোনাটায় বসে চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। মনিরা তুলির নিচু হয়ে থাকা মাথার উপর থেকে দৃষ্টি সরায়নি এখনো, চোখে আগুন নিয়ে তাকিয়ে আছে তুলির নিচু করা মাথার দিকে। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মনিরা শান্তস্বরে বলার চেষ্টা করলো, শান্তস্বরে বললেও আওয়াজ টা চিৎকারের মতোই শোনালো, -- বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকবিনা সামনে। এক্ষুনি চোখের সামনে থেকে দুর হ। আমি পাঁচ পর্যন্ত গুনবো। এর মধ্যে আমার থেকে গুনে গুনে পঞ্চাশ হাত দুরে যাবি। কয়েকঘন্টা সামনে আসবিনা আর। নির্লজ্জ্ব বদ মেয়ে কোথাকার। তুলি পা টিপে টিপে ছাদে আসলো। ছাদের বাঁ দিকটায় একটা বড় গাছ। গাছটার শুদ্ধ নাম কি জানেনা তুলি। ওরা বলে কড়াই। গাছের ডাল গুলো দুতলা বিল্ডিং এর ছাদ ছাড়িয়ে উপরে উঠেছে। ছাদের বাঁ দিকের কোনাটায় তাই ছায়া। এটা তুলির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তুলির কান্না পেলে এখানে চলে আসে। আকাশের দিকে তাকায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে তুলি একটা ধারণা মনে মনে দাঁড় করিয়েছে। মাঝে মাঝে কাঁদা শরীর, মন দু'টোর জন্যেই ভালো। একদম না কাঁদা আবার একদম বেশি কাঁদা... দু'টোই ক্ষতিকর। আকাশ ও কাঁদে, বেশি কাঁদলে বন্যা হয়, একদম না কাঁদলে খরা হয়। মাঝে মাঝে কাঁদলেই ব্যালেন্স হয় সবকিছু। তুলি ও মাঝে মাঝে কাঁদে। আর সবসময় এর একমাত্র কারণ থাকে মনিরা। তুলির বড় বোন। বয়সে সাত বৎসরের বড়। ভার্সিটি তে পড়ে, অনার্স করছে ফিলোসফি তে। দ্বিতীয় বর্ষ। ভীষণ রাগী। তুলি সপ্তাহে দুই তিন দিন নিয়মিত চড় থাপ্পড় খায় বড়আপুর হাতে, কাঁদে কিন্তু বড় আপুর উপর এতোটুকু রাগ জন্মায় নি এখন পর্যন্ত। বড় আপুকে সে বুঝতে পারেনা। নাকি বড় আপুই নিজেকে বুঝতে দেয়না কখনো কে জানে! তুলি বড় আপুর সবচেয়ে বড় একটা দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত আছে শুধু। বড় আপু কাঁদতে পারেনা। বয়স হওয়ার পর থেকে তুলি কখনো বড় আপু কে তীব্র কষ্টে ও কাঁদতে দেখেনি। অথচ তুলি খুব দ্রুত কাঁদতে পারে। তুলির ক্লাসের বন্ধুগুলাও খুব ইমোশনাল। তুলি ক্লাস নাইনে পড়ে। ম্যাডাম ক্লাসে একটু বকা দিলেই চোখে জল চলে আসে তার। তুলি কখনোই চড় থাপ্পড় দেয়ার মতো অপরাধ করেনা। আজ বড় আপু যখন ভার্সিটি থেকে সদ্য ফিরে বিছানায় বসে ছিলো, তুলি তখন সবে গোসল সেরে এসেছে। তুলি গোসল সেরে বের হয়ে খেয়াল করেনি বড়আপু বিছানায় বসে আছে চুপচাপ। চুলগুলো খুলে দিয়ে একটা বড় তোয়ালে মাথার পেছনে নিয়ে বারকয়েক জোরে জোরে উপর নিচ করলো চুলের পানি একদম সরে যাওয়ার জন্যে। তুলি এটাও খেয়াল করেনি চুল থেকে পানির কিছু ফোঁটা গিয়ে বিছানায় বসা বড় আপুর মুখে পড়েছে। বড় আপু শান্ত চোখে তাকিয়ে তুলি কে ডাকলো, -- এদিকে আয় তুলি। তুলি বড় আপুর গলার আওয়াজে চমকে উঠলো। আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায়ে বড় আপু থেকে একটু দুরত্ব নিয়ে দাঁড়ালো। কি ভুল করেছে কে জানে। ভয়ে চুপসে গেলো তুলি। বড় আপু আবারো শান্ত স্বরে ডাকলো, -- এতো দুরে দাঁড়িয়ে কেন? আরো একটু সামনে আয়। তুলির পা কাঁপতে লাগলো ভয়ে, গুটি গুটি পায়ে সামনে যেতেই বাম গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় খেয়ে মাথা ঘুরতে লাগলো তুলির। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। এতটুকু রাগ জন্মালোনা বড়আপুর উপর। অনেক ভালোবাসে সে এই মানুষটিকে। সে জানে এই লালচে গালে গভীর রাতে কেউ একজন আঙ্গুল ছুঁয়ে দেবে, চুমু দেবে.. সরি বলবে কানে ফিসফিস করে। চোখে জল নিয়ে আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে ছাদে উঠে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো তাকিয়েছিলো তুলি, বড়আপুর দিকে। বড় আপু খোলা জানালা দিয়ে রোবটের মতো তাকিয়ে আকাশ দেখছেন। একটু আগের রাগী চোখ ভর্তি শূণ্যতা এখন। তুলির শরীর কাঁপিয়ে কান্না আসলো, এই মানুষটিকে সে বুঝতে পারেনা ঠিকমতো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট কিসে? একটি মানুষকে বুঝতে না পারা? হয়তো। কে জানে? ....... কিছুক্ষণ আগেঃ -- মনি, এমন করিসনা প্লিজ। মনিরা ভ্রুঁ কুঁচকে অর্পির চোখের দিকে তাকালো। অর্পির চোখে দলা দলা সিমপ্যাথি। কার জন্যে? মনিরার জন্যে? মনিরা চুপ করে বসে রইলো আগের মতো। অর্পি মনিরার হাতে হাত রাখলো, তারপর কষ্ট কষ্ট গলায় বললো, -- রণ'র সাথে যখন ব্রেকআপ হয়েছিলো আমার, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদেছি। ওর সামনে, রাস্তায় অসংখ্য মানুষের সামনে। অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম, হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে হয়েছিলো আমায়। তুই এমন কেন? মনিরা আবার পাথর টাইপের দৃষ্টি নিয়ে অর্পির চোখের দিকে তাকালো, জিজ্ঞেস করলো, -- কেমন? -- তিন বৎসরের সম্পর্ক ভেঙ্গেছে তোর। এতটুকু ও কষ্ট হচ্ছেনা তোর? তুই কেমন মেয়ে বলতো। মনিরা শান্ত চোখে সামনের সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠের দিকে তাকায়। মাঠের মাঝখানে কড়া রোদ, কোনায় গাছ আছে। ছায়া আছে। তেমনই একটা কোনায় মনিরা আর অর্পি বসে আছে। এখানে বসার জায়গা আছে। অর্পির গলার আওয়াজ শুনতে পেলো মনিরা, -- আমি জানিনা, তুই আসলেই কষ্ট পেয়েছিস কিনা। স্বাভাবিক মানুষ হলে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক, তোকে আমার স্বাভাবিক কখনোই মনে হয়নি। তারপরেও বলছি, যদি কান্না পায়.. কেঁদে ফেল। কান্না পুষে রাখবিনা প্লিজ। দেখ আমার চোখে ই জল এসে গেছে.. তুই এতো অদ্ভুত কেন? মনিরা আড়চোখে অর্পির দিকে তাকায়। অর্পির চোখে সত্যি সত্যিই জল। এই মেয়ে প্রচন্ড ইমোশনাল। একিই ঘটনায় নিজের পুরোনো কষ্ট মনে করে করে কাঁদছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার। মনিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, -- ক্লাস করবি আর? অর্পি প্রশ্নের জবাব দিলোনা, জলভরা চোখে তাকিয়ে রইলো। মনিরা সবগুলো ক্লাস করলো। ক্লাসে কাব্য বারকয়েক তাকিয়েছিলো তার দিকে, খেয়াল আছে তার। ক্লাস শেষ হওয়ার পর ভার্সিটির গেইট থেকে বাসার পথ ধরার জায়গাটুকু পর্যন্ত কাব্য তার পাশে পাশে এসেছিলো। এই সময়টায় কিছু কথা হয়েছিলো দু'জনের মধ্যে। কাব্যই প্রথমে অস্বস্তি নিয়ে বলেছিলো, -- তুমি একদম স্বাভাবিক আছো, আমার ভালো লাগছে দেখে। আজকাল ছেলে মেয়েরা যেসব করে, হাত টাত কেটে সুইসাইড টুইসাইড করে হুলস্থুল কান্ড...! মনিরা হাসতে চেষ্টা করলো, মনিরা প্রচন্ড হাসি না পেলে হাসেনা। এখন হাসি পায়নি তার, তবুও হাসতে হলো। এবং ঠিক এই মুহূর্তে নিজেকে তার প্রচন্ড অস্বাভাবিক মনে হলো। কাব্য কে কিছু বললোনা সে। কাব্য বললো, -- আসি.. মনি। আশা করবো আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হবেনা..! আজ রিকশায় চড়তে ইচ্ছে করলোনা মনিরার। হাঁটতে ইচ্ছে করলো। রাস্তার এক পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের লম্বা লাইন। রিকশায় করে আসার সময় এতো ভালো করে খেয়াল করা হয়নি এতোদিন তার। মনিরা মুগ্ধ হলো, গাছে গাছে আগুন জ্বলছে। ব্যাপার টা মুগ্ধ হওয়ার মতোই। কাব্য প্রায়ই বলতো, -- কৃষ্ণচূড়া দেখে যে মুগ্ধ হয়না বুঝে নিও সে কখনো কাঁদেনি। মনিরা চুপ করে কিছুক্ষণ রাস্তার একপাশে দাঁড়ালো। হাঁটতে আর ইচ্ছে করছেনা তার। একটা রিকশা রাস্তার পাশে দাঁড় করানো, রিকশাওয়ালা পেছনের সিটে বসে পা সামনে ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছে, লুঙ্গি বারবার বাতাসে উঠে যেতে চাইছে। বিশ্রি একটা ব্যাপার। মনিরা এগিয়ে গেলো রিকশার দিকে, রিকশাওয়ালা ঘুমায়নি। মনিরা সামনে যেতেই উঠে বসলো। মনিরা রিকশায় উঠে হুড় ফেলে দিলো। ফুরফুরে বাতাস। কৃষ্ণচূড়া দুলছে। কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মনিরার ভীষণ ইচ্ছে করলো কাব্য কে ক্ষমা করে দিতে..। বাসায় ঢুকেই মনিরার মনে হলো তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হওয়া দরকার। খেয়ে দেয়ে বড়সড় একটা ঘুম দিতে হবে। রুমে ঢুকেই বুঝতে পারলো, তুলি বাথরুমে। মেয়েটির গোসল করতে সর্বনিম্ম পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগে। কখন গোসল করতে ঢুকেছে কে জানে? কাজের মেয়েটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যেতো, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলোনা মনিরার। চুপচাপ বিছানায় গিয়ে বসলো। জানালা খোলা। বাইরে আকাশ। তুলি গোসল সেরে বের হয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল থেকে পানি সরাতে গিয়ে থাপ্পড় খেলো মনিরার হাতে। মনিরার ইচ্ছে করলো চুল ধরে আরো কয়েকটা থাপ্পড় দিতে। কিন্তু বোনের লালচে গাল দেখে থেমে গেলো। এই তুলতুলে গালে একটার বেশি চড় দেয়া পাপ। তুলি এখন গিয়ে ছাদের কোনাটায় বসবে। কাঁদবে। এই মেয়ে প্রচুর কাঁদতে পারে। মনিরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। আকাশ টাকে আজ ভয়ংকর বিষন্ন লাগছে। কারণটা কি? ......... তার কিছুক্ষণ আগেঃ -- মনি। সম্পর্কটা ঠিক এগুবেনা আমাদের। আমি আর পারছিনা। কাব্য মনিরার বাম হাতে হাত রেখে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো। মনিরা একটু চমকালো। মনিরার চমকানো কাব্যের চোখ এড়ালোনা। বললো, -- মনি। মনি প্লিজ ভুল বুঝবেনা আমায়। এই সম্পর্ক টা তিন বৎসর পর্যন্ত একা টেনেছি আমি। তোমার কাছ থেকে এতটুকু হেল্প পাইনি। মনিরা অবাক চোখে তাকিয়ে বললো, -- কি বলছো? কি বলতে চাচ্ছো তুমি? কাব্য মনিরার চোখ থেকে চোখ সরালোনা। তাকিয়ে থেকে কঠিন গলায় বললো, -- ব্রেকআপ চাচ্ছি। আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিৎ। আমি আর নিতে পারছিনা। মনিরার গা কেঁপে উঠলো, তবে চোখ দিয়ে সেটা বোঝা গেলোনা। রাগ হচ্ছে তার ভীষণ। এই মুহূর্তে রাগ করা উচিৎ নাকি অনুচিৎ বুঝতে পারছেনা সে। জিজ্ঞেস করলো, -- কাব্য, দুষ্টুমি করছো না তো? -- না মনি। আমরা সম্পর্ক টা অযথাই টানছি। তুমি আমায় বুঝো। আমি তোমায় এতটুকু ও বুঝতে পারিনা। অথচ একটা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে, একে অন্যকে বোঝা। তুমি কারণে অকারণে পারো শুধু রাগ করতো... হাসোনা, কাঁদোনা, ভালোবাসতেও জানো কিনা সন্দেহ আছে। প্রায়ই সময় আমার মনে হয়, এই রাগী স্বভাব টা না থাকলে তুমি আর রোবটের মধ্যে এতোটুকু ও পার্থক্য থাকতোনা। মানুষের এই একটাই স্বভাব পেয়েছো, তাও সবচেয়ে বাজে টা। আমাদের সম্পর্কটা তিন বৎসরের, অথচ এই তিন বৎসরে তুমি আমায় এতোটুকু ও বুঝতে দাওনি নিজেকে। তুমি জানো, আমি কখন খুশি হই, কি করলে খুশি হই, কাঁদি.. হাসি। কি করতে ভালোবাসি, কি ঘৃণা করি। কোনটা পছন্দের, কোনটা অপছন্দের। কি আমায় কষ্ট দেয়, কি আমায় আনন্দ দেয়। অথচ আমি এখনো এটাই জানিনা, তুমি কিসে খুশি হও, কিসে কাঁদো। এই তিন বৎসরের সম্পর্কে আমি তোমায় কখনো না হাসতে দেখেছি মন খুলে, না কাঁদতে। না কষ্ট পাও, না কোনো ফিলিংস আছে তোমার। মনি তুমি প্রচন্ডরকমের দুর্বোধ্য একজন মানুষ। আমি একটা সহজ সরল মানুষ চেয়েছি। এই সিদ্ধান্ত টা হুট করে নেয়া নয়। প্রায় ছ'টা মাস ধরে ভাবছি। আজকে বললাম। কাব্য একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে গেলো। মনিরা ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। কাব্য একটু জিরিয়ে নেয়ার অপেক্ষা করলো সে, তারপর জিজ্ঞেস করলো, -- আমায় বুঝতে পারোনা। শুধুমাত্র এটির জন্যেই ব্রেকআপ চাচ্ছো? কাব্য বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, -- বলতে পারো এটিই অন্যতম কারণ। একমাত্র নয়। মনিরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। সম্ভবত শক টা সামলে নেয়ার জন্যে। তারপর হঠাৎ কি যেন হলো, ডান হাত দিয়ে কাব্য কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সে। তারপর বুকে মাথা ঠেকিয়ে জড়ানো গলায় বললো, -- কাব্য.. কাব্য। এই দেখো আমি কাঁদছি। দেখো.. চোখের দিকে তাকাও, এই যে চোখে জল..! ফিলিংস আছে আমার। কিন্তু সবসময় হয়তো প্রকাশ করতে পারিনা। এটা করোনা। প্লিজ। আমি চেষ্টা করছি তো স্বাভাবিক হওয়ার। এটা কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবুও চেষ্টা করছি। সবাই তো সবার মতো হয়না, তাইনা কাব্য? আমায় আরো একটু সময় দাও। আমি নিজেকে চেঞ্জ করবো একদম। পুরোপুরি বদলে যাবো। যখন তখন রাগ করবোনা আর। একদম বদলে যাবো। কাব্য.. শুনতে পাচ্ছো..। প্লিজ এটা বলোনা.. কাব্য হকচকিয়ে গেলো মনিরার আচরণে। অস্বাভাবিক মানুষের অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে দেখতে যখন অভ্যস্ত হয়ে পড়ে কেউ, তখন ঐ মানুষটির স্বাভাবিক আচরণ ই অস্বাভাবিক মনে হয়। মনিরা তাকে হারানোর ভয়ে তাকেই জড়িয়ে ধরে আছে, জড়ানো গলায় কথা বলছে। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। অথচ এই স্বাভাবিক ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক লাগছে। কাব্য নিজেকে শক্ত করলো। এই মেয়েটাকে যে সে ভালোবাসেনা তা নয়। কিন্তু সম্পর্কটা এগিয়ে নেয়া আর অসম্ভব। এখানেই ইতি টানা জরুরি। নতুন করে শুরু করতে হবে তাকে, তিনটি বৎসর কেড়ে নিয়েছে তার থেকে এই মেয়েটি। এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যত আছে বলেও মনে হয়নি কখনো তার। মনিরার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়েছে তুলির যখন পাঁচ বৎসর বয়স। কেমন অদ্ভুত মহিলা, দু'টো মেয়ে ফেলে চলে গেছেন। এতোটুকু ফিলিংস ছিলোনা মহিলাটির? মনিরার সাথে মায়ের কিছুটা মিল আছে। রোবটের সাথে আর যাইহোক, সংসার হয়না। কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুক থেকে মাথা সরিয়ে দিলো মনিরার, মনিরা তখনো শক্ত করে হাত ধরে আছে কাব্যের। কোথাও যেতে দেবেনা কাব্য কে। কাব্যের চোখের দৃষ্টি মনিরা কে শান্ত করলোনা, এই দৃষ্টি তে চলে যাওয়ার গন্ধ। মনিরা আবারো ডান হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো কাব্য কে। শরীর কেঁপে উঠলো তার, কাঁপা গলায় বললো, -- আমি.. আমি.. ঠিক হয়ে যাবো কাব্য। একটু সময় দাও...! কাব্য কিছু বলেনি আর। শক্ত করে ধরে রাখা হাতটা আলগা করে চলে গেলো। মনিরা চোখ মুছে বসে রইলো চুপচাপ সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠের কোনাটায়। গাছের ছায়ায়। অর্পি কে দৌড়ে আসতে দেখলো সে। এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মনিরার দিকে তাকালো। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো, -- মনি, এমন করিস না প্লিজ। মনিরা ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো অর্পির দিকে। মাঠের মাঝখানে কড়া রোদ। আজ কি রোদের ও ভীষণ মন খারাপ। কেন? ....... তার ও কিছুক্ষণ আগেঃ -- মনিরা, নিজেকে কন্ট্রোলে রেখো। কন্ট্রোল করতে শেখো। এটা কোনো রোগ নয়। তুমি বুঝতে পারো, তুমি অকারণেই রাগ করো। অনুতপ্ত ও হও। এটা তখন ই রোগ, যখন রাগ টা যে অনর্থক, সেটা তুমি বুঝতে পারবেনা। তুমি তো তেমন নও। আর তোমার এই সামান্য রাগে কেউ তো খুন হচ্ছেনা, মার্ডার হচ্ছেনা। এইসব অল্প আধটু বেশি রাগ সবারই থাকে। নিজের প্রতি একটু কন্ট্রোল রেখো..। তবেই সব ঠিকঠাক। মনিরা চুপ করে তাকিয়ে রইলো সামনের টেবিলের ওপাশে চেয়ারে বসা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোকটির দিকে। ভদ্রলোকের মাথায় চুল কম, পাতলা। ইনি একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। মনিরা সপ্তাহে একবার এখানে আসে। যদিও ভদ্রলোক বলেছেন, এটা কোনো রোগ নয়। তবুও মনিরা আসে এখানে। ভদ্রলোকের সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। নিজেও অনেক কিছু বলে। এখানে এই মানুষটির সাথে কথা বলতে বেশ লাগে তার। রাগী স্বভাবটা নিয়ে মনিরা আজকাল বড্ড অস্বস্তি তে থাকছে। দুই দিন আগে কাব্যের গালে থাপ্পড় পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছিলো। বন্ধুদের সামনে। কেমন লজ্জ্বা পেয়েছিলো কাব্য। মুখ লাল হয়ে গিয়েছিলো। মনিরা বাসায় এসে হাতটা নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবলো, কি করা যায়। পুড়িয়ে ফেলবে নাকি হালকা পাতলা কেটে দেবে ব্লেড দিয়ে। অল্প একটু শাস্তি তো দরকার আছে হাত টার। হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিলো গ্যাসের চুলোর উপর হাত মেলে দেয়ার দশ সেকেন্ডের মধ্যে। তুলি এসে "আপু" বলে চিৎকার দিয়ে চুলোর উপর থেকে হাত না সরালে, পুড়ে কয়লা হয়ে যেতো। ভদ্রলোক মনিরার শান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, -- মনিরা, তুমি যে সিচুয়েশনে বড় হয়েছো, সেটা বুঝতে পারছি কতোটা ভয়ানক। কিন্তু সবকিছু সামলাতে হবে তোমাকে। তুমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসার ট্রাই করো। জোকসের বই পড়ো বেশি বেশি। কষ্ট পেলে কাঁদার চেষ্টা করো। রাগ যেভাবে প্রকাশ করো, অন্যসব ফিলিংস ঐভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করো। তাহলে অতিরিক্ত রাগ এমনিতেই কন্ট্রোলে চলে আসবে...! মনিরা হাসলো, ভদ্রলোক হাসি মুখে তাকালেন তার দিকে। মনিরা বললো, -- আমার আজকে অনেক স্পেশাল একটা দিন। আমার তিন বৎসরের সম্পর্ক আছে একটা ছেলের সাথে। বাবা কে বলতে পারিনি এতোদিন। গতকাল বলেছি। বাবা তেমন কোনো রিএ্যাক্ট দেখান নি। তবে ভোরে এসে বিছানার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "আব্বু, ছেলেটা কি করে? কেমন? ডিটেইলস টা জানাস আমায়। কেমন? আমি অফিসে গেলাম...।" কাব্য কে বলা হয়নি এখনো। সারপ্রাইজ দেবো ওকে। ভদ্রলোক হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলেন, -- কাব্য? ভালোবাসার মানুষটির নাম বুঝি কাব্য? মনিরা মাথা নিচু করে বললো, -- হুম। কাব্য কে সারপ্রাইজ দেবো, কিন্তু আজকেও ওর উপর রেগে টেগে যাই নাকি, ভয়ে আছি ভীষণ। ছোটখাটো ভুল করলেও ওর উপর রেগে যাই আমি। তবে ও আমায় খুব ভালো বোঝে, কখনোই রাগ করেনা। আজ সারপ্রাইজ পেয়ে খুশি হবে খুব..! ভদ্রলোকের চেম্বার থেকে বের হয়ে মনিরা রিকশা নিলো। ভার্সিটি যেতে লাগবে পঁচিশ মিনিট। সকাল টা আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বের হচ্ছে, মিষ্টি রোদ। কাব্য কে দেখা গেলো মাঠের কোনাটায় বসে আছে। কয়েকজন বন্ধু সহ। মনিরা কাছে যেতেই বন্ধু রা বিদায় নিলো। মনিরা ঠিক বুঝতে পারলোনা, কথাগুলো কি করে বলবে। মনে মনে গুছিয়ে নিতেই ত্রিশ মিনিট কেটে গেলো। ততক্ষণে কাব্য মনিরার বাম হাতে হাত রেখে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, -- মনি। সম্পর্কটা ঠিক এগুবেনা আমাদের। আমি আর পারছিনা। মনিরা চমকালো। সকালটা খোলস ছেড়ে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। এখন খোলা রোদ, একটু আগের রোদে মিষ্টি স্বাদ ছিলো, এখন একটু ঝাঁঝালো। সকাল আজ এতো তাড়াতাড়ি খোলস ছেড়ে বের হলো কেন? সকাল ও কি কারো উপর ভীষণরকম রেগে আছে..? ....... এখনঃ তুলি কিছুক্ষণ ছাদে বসে কাঁদলো। গালে হাত দিতেই ফোলা জায়গাটায় চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করলো। জ্বলছেও একটু একটু। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো বাসায়। পা টিপে টিপে রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো, বড় আপু নেই। ফ্রেশ হচ্ছে বোধহয়। রুমে ঢুকে বিছানায় বসে থাকলো তুলি। পড়ার টেবিলে একটা খাতা। খাতার উপরে কলম। খাতায় হিজিবিজি লেখা, আঁকি-বুকি রয়েছে বড় আপুর। ভয়ে ভয়ে খাতা উল্টাতেই চোখ পড়লো, -- আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি কাব্য। কখনো যদি প্রানভরে কাঁদতে শিখি, তোমার জন্যে কাঁদবো। ক্ষমা না করলে কাঁদতে পারবোনা, ঘৃণা জন্মাবে। ঘৃণা মানুষকে কাঁদায়না। আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি কাব্য...। এরপর আর কখনো তোমার জানা হবেনা, এই প্রথমবারের মতো কৃষ্ণচূড়া দেখে মুগ্ধ হয়েছি আমি...! হয়তো বদলে যাচ্ছি, যেটা চেয়েছিলে তুমি.. যেটা আমি চেয়েছিলাম..! কিন্তু এই চাওয়ার বিনিময়ে তোমায় হারাতে চাইনি। অথচ তুমি সেটা চেয়েছো। অপরাধ করেছো কাব্য; অনেক বড় অপরাধ। তোমার ছোটখাটো ভুলচুকে আমি প্রচন্ড রেগে যাই। অথচ আজ তোমার এতোবড় অপরাধেও আমি এতোটুকু রাগিনি। বদলে যাচ্ছি আমি কাব্য...! এই যে দেখো, ক্ষমা করে দিয়েছি তোমায়...! সন্ধ্যেয় ঘুম ভাঙ্গলো মনিরার। বাবা ফিরে এসেছেন অফিস থেকে। বসে আছেন সোফায়, রান্নাঘরে কাজের মেয়েটি কি করছে কে জানে; বড্ড আওয়াজ আসছে হাড়ি পাতিলের। বাবার হাতে একটা ম্যাগাজিন। মনিরা ঘুম ভাঙ্গা চোখে বাবার পাশে গিয়ে বসলো, তারপর বাবার ডানহাত আঁকড়ে ধরে ঘুম জড়ানো গলায় বললো, -- বাবা। ছেলেটার ডিটেইলস জানতে চেয়েছিলে। তার আর দরকার হবেনা। আমরা আলাদা হয়ে গেছি। বাবা ম্যাগাজিন রেখে অবাক চোখে মনিরার দিকে তাকালেন। মনিরা আস্তে করে মাথা রাখলো বাবার কাঁধে। তারপর আগের মতোই জড়ানো গলায় বললো, -- বাবা। তিন বৎসর ধরে যে মানুষটিকে আমি জানি বলে জানি.. আমায় ভালোবাসে বলে জানি.. যতকিছুই হোক, এই মানুষটি আমায় কখনো ছেড়ে যাবেনা বলে জানি.. এই আজ সকালেই জানতে পারলাম, আমি তাকে তিন বৎসর ধরে ভুল জানি। অথচ যাওয়ার আগে এই দুর্বোধ্য মানুষটি আমায় "দুর্বোধ্য" বলে চলে গেলো। মানুষ এতো জটিল হয় কেন বাবা? বাবা চুপ করে আছেন। কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করলেন সম্ভবত। তারপর মেয়ের মাথায় হাত রেখে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। মনিরা ডান হাতের তালুর উল্টা পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে বাবাকে থামিয়ে হুট করে জিজ্ঞেস করলো, -- ছাদে যাবে বাবা? সন্ধ্যের আকাশ হচ্ছে বিষন্ন আকাশ। বিষন্ন আলো, বিষন্ন হাওয়া, বিষন্ন সূর্য। ছাদের কোনায় কোনায় ও বিষন্নতায় ছড়ানো। বাবা, মনিরা আর তুলি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের ঐ কোনাটায়। মনিরার কাঁধে বাবার হাত, মনিরার মাথা বাবার কাঁধে, তুলি শক্ত করে মনিরার ডান হাত ধরে রেখেছে। মনিরার শরীর কাঁপছে, চোখে অশ্রু আজ বাঁধ ভেঙ্গেছে। এমন করে কখনো কাঁদা হয়নি তার। বাবার পাঞ্জাবির ডান কাঁধ ভিজে গেছে। বাবা শক্ত করে শক্ত হাতে শুকনো চোখে মেয়েকে আঁকড়ে ধরে আছেন। তার এই একটু অদ্ভুত স্বভাবের ভীষণ রাগী মেয়েটি কে এর আগে কখনো এমন করে কাঁদতে দেখেন নি তিনি। তুলির চোখে জল জমলো। ডান হাত শক্ত করে ধরা মানুষটিকে সে বুঝতে পারছে আস্তে আস্তে। হাত শক্ত করে ধরে রাখতে গিয়ে হুট করে তুলির মনে হলো, দুপুর বেলার "কষ্ট" সম্পর্কিত ধারণা টা সম্পুর্ণ ভুল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট, একটা মানুষকে বুঝতে না পারা নয়.. মানুষটিকে পুরোপুরি বুঝে ফেলা...! আঁধার ঘনিয়ে আসছে, ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ পেলো তুলি। কি অদ্ভুত! এই গাছপালাহীন ইট পাথরের শক্ত শহরে একটুকরো গ্রাম চলে আসলো কোথা থেকে? এতো আঁধার আজ চারোপাশে; আকাশে চাঁদ ও নেই। আচ্ছা, এই সন্ধ্যের মতো চাঁদের ও কি আজ মন খারাপ? কে জানে...!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ এক মনমরা সন্ধ্যার গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now