বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দুশ্চরিত্রা
গোধূলি বিশ্বাস সীজন
অহনার ঘুম ভেঙ্গে গেল। এই অবস্থায় এমন অদ্ভুত সব স্বপ্নই কি দেখে মেয়েরা? স্বপ্ন ছিল নাকি স্মৃতিচারণ- সন্দিহান অহনা। পালাগান দেখতে গিয়েছিল অপুর সাথে ট্রেনে করে। রামসীতার পালাগান ছিল। সীতাহরণের পর রাম বানররাজা সুগ্রীবের সাহায্য চায়। সুগ্রীব বিনিময়ে রামের সাহায্য চায় বড়ভাই বালিকে হারাতে। রামের সহযোগিতায় অন্যায়যুদ্ধে সুগ্রীব বালিকে বধ করে। বালির স্ত্রী তারা বালির মৃতদেহের পাশে বসে কাঁদতে থাকে, রামকে অভিশাপ দিয়ে বলে,
“আমি যদি সতী হই ভারত ভিতরে
কান্দিবে সীতার তরে চিরদিন ধরে”
তারার এই অভিশাপই কাল হয়েছিল রামসীতার ভালবাসায়। রামসীতা এক হতে পারে নি। সীতাকে বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে সতীত্বপ্রমাণে।
অহনা পালা দেখার সময় ভাবতো, রামও তো ছিল চৌদ্দবছর বনের মধ্যে। রামকে নিয়ে কেউ তো প্রশ্ন তোলে নি কখনো।
অপুর সাথে দূর-দূরান্তে ঘুরতে যেত অহনা। কখনো পালাগান দেখতে, কখনো যাত্রা দেখতে, কখনো বা নৌকাবাইচ দেখতে। অপুর ভ্রমণসঙ্গী ছিল অহনা। বিয়ের পর হানিমুন ছাড়া কোথাও তেমন ঘুরতে যাওয়া হয় নি। রাজ্য লোকটা বেশ অলস ধরনের। নড়তে চড়তে চায় না। হানিমুনেও তাই সময় কেটেছে রিসোর্টে। অহনার ইচ্ছে ছিল সারাদেশ ঘুরবে। আশায় গুঁড়ে বালি। এখন লং জার্নি নিষেধ।
ফোন বেজে উঠল।
“হ্যালো”
“হ্যালো, কেমন আছিস, অহো?”
“ভাল। তুই?”
“ভাল আছি। ব্যস্ত থাকলে কারো কথা মনে পড়ার সুযোগ থাকে না। ক্লান্তিতে ভালো ঘুম হয়”
“ও। বলতে চাচ্ছিস, এখন আর আমাকে মনে পড়ে না?”
“পড়ে তো। ঘুম থেকে উঠলে”
অহনা চুপ করে থাকে। একটু আগে স্বপ্নে অপুকেই দেখছিল। আচ্ছা, এটাই কি টেলিপ্যাথি? একজন আরেকজনের কথা ভাবলে, সেও তার কথা ভাববে?
অপু বলল, “এই অহো, চল না একটা কাজ করি?”
“কী?”
“ঘুরতে বের হবি?”
“না”
“আমার সব প্রশ্নের উত্তর কি ‘না’?”
“জানি না”
“পরকীয়া করবি?”
“কি!!!”
“শোন, ব্যাভিচারের জন্য মেয়েদের আইনত কোন শাস্তি নেই। শাস্তি যা হবার আমার হবে। তোর কিছু হবে না”
“চুপ থাক! আমি এরপর থেকে তোর ফোনই আর ধরব না। আমার ঘর ভাঙতে চাস?”
“হুম। তোর ঘর না ভেঙ্গে তো আমার ঘর গড়া সম্ভব না”
“মদ-টদ খেয়েছিস নাকি? কিসব বকছিস!”
এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। অপু বলে, “তোর বর এসছে নাকি? তোর সাথে কথাও বলা যাবে না নাকি?”
“আমাকে আর ফোন দিবি না। রাখছি” বলে ফোন কেটে দেয় অহনা।
দরজা খুলতেই দেখে ক্লান্ত-শ্রান্ত রাজ্য দাঁড়িয়ে। রাজ্য ঢুকে অহনার পেটে হাত দিয়ে বলে, “ লাথিগুলো কি আমি থাকতে মারা যায় না?”
অহনা মৃদু হাসে। রাজ্য অহনাকে বলে, “সারাদিনে কয়টা দিয়েছে?”
“গুনিনি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম”
রাজ্য ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে ঢোকে। মিনিটবাদেই রাজ্যর ফোনে এসএমএস আসে। জিপি অফারের এসএমএস মানে জিপি-যাতনা। অহনা রাজ্যর ফোনের এসএমএস চেক করতে লাগে। ১ সপ্তাহ আগের একটা এসএমএস চোখে পড়ে, অপরিচিত নাম্বার থেকে-“আমি ভালো নেই। বাচ্চাটার জন্যই লোকটার সাথে আছি। নাহলে সব ছেড়ে দিতাম। তোমাকে ভীষণ মিস করি, করছি, করবো”।
অহনা রাজ্যর ফোনটা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। রাজ্য বের হয়ে অহনাকে বলে, “কী ব্যাপার? এভাবে বসে আছো কেন? আমার ফোন নিয়ে কী করছো?”
“দেখছিলাম”
“কী দেখলে?”
“দেখলাম-‘তোমাকে ভীষণ মিস করি, করছি, করবো’”
“ও”
“এখনো যোগাযোগ চলছে?”
“মানুষ সামাজিক জীব”
“ও। আপনিও মিস করেন তাহলে, তাই না?”
“‘মিস’ শব্দের মানে জানো?”
“জানবো না কেন?”
“এক্সেট বাংলায় অর্থটা বলো”
অহনা চিন্তা করতে লাগলো। তারপর বলল, “কি ভীষণ ধূর্ত আপনি! আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করার জন্য এখন এসব জিজ্ঞেস করছেন?”
“তুমি পারবে না- বললেই পারো”
“পারবো। মানে হল- কারো প্রতি মায়া জন্মানো এবং তাকে পাশে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা” ধীরে ধীরে বলল অহনা।
“হুম। সুন্দর ব্যাখ্যা করলে। এক কথায় ‘অনুপস্থিতি অনুধাবন’। আমার রোজ কি ইচ্ছে করে, জানো?”
“কী?”
“রাতে একটু আগে ফিরে আসতে। আমার বাবু ও বাবুর মায়ের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। সময়ই পাই না। কাউকে মিস করার সময় কোথায়? তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছো?”
“না। পাই নি। সময় পেলে কি মিস করতেন?”
“কঠিন প্রশ্ন। এর উত্তর জানা নেই। তবে এর উত্তর নির্ভর করে তোমার উপর”
“মানে?”
“তুমি কি আমাকে অন্য কাউকে মিস করার ফুসরত দিতে?”
“উফ! অসহ্য আপনি! সরাসরি উত্তর দিতে পারেন না? এখন তো মনে হচ্ছে-”
“কী মনে হচ্ছে?”
“আপনার প্রাক্তন প্রেমিকা যে কারণে আটকে পড়েছে আপনি সেই একই কারণে বাঁধা”
রাজ্য অবাক হয়ে তাকায় অহনার দিকে। তারপর হেসে বলে, “অহনা-অনুরাগ বোঝানোর জন্য কি রোজ রোজ বলতে হবে ‘ভালবাসি’?”
এতোক্ষণ ধরে ফোঁস ফোঁস করছিল অহনা। কথাটা শুনেই গলে গেল। রাজ্য ভাবে, নারীবশীকরণ মিষ্টিবাক্য বিনা সম্ভব না।
কিছুক্ষণ বাদে অহনা বলে, “আচ্ছা, শোনেন, আপনার প্রাক্তন প্রেমিকা যেন আর এসএমএস না করে”
“করতেই পারে। অন্য একজনের সাথে বিয়ে হয়েছে বলে কি অনুভূতিগুলো হারিয়ে গেছে নাকি?” বলে মিটমিট করে হাসতে লাগে রাজ্য।
“মানে?”
“মানে আবার কী? মায়া, সবই মায়া”
“তো, যান। বিয়ে করেন ওকে”
“কিভাবে করবো, বলো? আমি তো বিবাহিত”
“ডিভোর্স চাচ্ছেন?”
রাজ্য মুচকি হাসে, চুপ করে থাকে।
অহনা বলে ওঠে, “চুপ করে আছেন কেন?”
“বোঝার চেষ্টা করছি”
“কী?”
“এটাই যে আমি যদি ওর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করি, তুমি কী করবে”
“কী করবো আমি? দেখতে চান?”
“আমার তো মনে হচ্ছে, হয় আমাকে নয়ত ওকে খুন করবে তুমি”
“কি! আমাকে খুনী মনে হয়?”
“উহু, তুমি খুনী নয়, রমণী”
অহনার চোখ ছলছল করতে থাকে। রাজ্য বলে, “কী করবে, অহনা?”
“কী আর করবো? বসে বসে কাঁদবো...” বলেই ধুপ করে বিছানায় বসে পড়ে, তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। রাজ্যর ইচ্ছে করছিল, অহনার কাছে গিয়ে ভেজা গাল মুছে দিতে। ইচ্ছেটাকে দমন করে দেখতে লাগলো। কোন মেয়ে যখন কাউকে হারানোর ভয়ে কাঁদে, সেটার থেকে উপভোগ্য বিষয় বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না কোন পুরুষের কাছে। এক ধরনের বিকৃত সুখকর অনুভূতি!
অহনা চোখ মুছে তাকালো রাজ্যের দিকে। তারপর বলে উঠল, “শয়তান ব্যাটা, মজা করেন আমার সাথে?”
“হুম করি। এই অধিকারটা তো শুধুই আমার”
“মাথার যে কয়টা চুল অবশিষ্ট আছে, সেগুলো কি রক্ষার এতোটুকু ইচ্ছা নাই?”
“না, নেই। এগুলো না থাকলে যদি আমার প্রতি তোমার অবসেশনটা একটু কমতো- তাহলে ভাববার বিষয় ছিল”
অহনা ভালমত চোখ মুছে। রাজ্যর দিকে এগিয়ে যেতেই রাজ্য ফট করে সটকে পড়ে। চিৎকার করে বলে, “অ্যাই অহনা, তুমি কি সত্যিই আমার চুল ছিড়বে নাকি?”
“হুম। ছিঁড়ব যাতে আর কোন পরনারী নজর না দেয়”
সপ্তাহখানেক আগের কথা। এই বিল্ডিংটায় এমন কিছু ঘটে যাবে- কেউ ভাবে নি। রাজ্য ভেবে অবাক হয়, জাস্ট মাথার উপরেই চলছিল নির্যাতন, পরকীয়া এবং অতঃপর খুন।
মাসখানেক আগে অহনাদের বিল্ডিংএর ছ’তলায় নতুন ভাড়াটে উঠেছিল। শুধু দুজনের সংসার। একদিন সন্ধ্যায় অহনা ছাদে যাচ্ছিল। ছাদে উঠার সময় ছ’তলার সামনে দিয়ে যেতেই শুনতে পেল ভাংচুর আর চিৎকার। একটা মেয়ের গোঙ্গানি শুনতে পেল, মেয়েটি বলছিল, “আর না, প্লিজ আরনা”। অহনা শিউরে উঠেছিল। ছ’তলার অন্যপাশের ভাড়াটের কাছে শুনেছিল, সারাদিন গেঞ্জাম লেগেই থাকে। কিন্তু শহুরে আত্মক্রেন্দ্রিক জীবনে পড়শীর ঘরে কি হচ্ছে- তা নিয়ে কারো বিকার থাকে না। দরজার ওপাশে কি হচ্ছে তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।
অহনা কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। ধুপধাপ বাড়ি মারল দরজায়। দরজার ওপাশের ভাঙচুর কিছুক্ষনের জন্য থামল। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। অহনা আবার বাড়ি মারে। মিনিটদশেক বাদে দরজা খুলল ভাড়াটে স্বামী। শুধু মাথা বের করে বলল, “কী চাই?”
সাথে সাথে লোকটার মুখ থেকে ভয়াবহ বোটকা গন্ধ নাকে লাগলো। অহনা জানে না মদের গন্ধ কেমন। তবে ওর মনে হল, লোকটা মাতাল। লোকটার চোখদুটো টকটকে লাল। অহনা উঁকি দিতেই দেখতে পেল, ফ্লোরে ১৫-১৬ বছরের একটি মেয়ে শুয়ে কাৎরাচ্ছে। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।
অহনা বলল, “ভাবীর সাথে কথা ছিল”
“এখন ভাবীর সাথে কথা বলা যাবে না” বলেই দড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিল। অহনা দরজার সামনে বসে পড়ল। মিনিটদশেক বাদেই আবার শুরু হল। লোকটির কথা শুনতে পেল “কথা ছিল দশ লাখের। নইলে তোর মত পেত্নীকে বিয়ে করি আমি! দিছে মাত্র পাঁচ। বাকিটা কবে দিবে? বল, মা*”
মেয়েটা আর্তনাদ করছিল। অহনা নিজের কান চেপে ধরল। এরপর অহনা উঠে দাঁড়াল, কিছু না ভেবেই আবার ধুপধাপ বাড়ি মেরে বাচ্চাদের মত নিচে নেমে পাঁচতলায় দাঁড়িয়ে থাকলো। লোকটা দরজা খুলে কিছুক্ষণ আশেপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে আবার দরজা লাগিয়ে দেয়। অহনার বুকের ভেতরটা দপদপ করতে থাকে। মিনিটদশেক বাদেই ও আবার মেয়েটার কান্না শুনতে পেয়ে আবার দরজায় বাড়ি মেরে পাঁচতলায় এসে দাঁড়ায়। তবে এবার মাতাললোকটা দরজা খুলেই “কে রে” বলে নামতে থাকে। অহনাও তৎক্ষণাৎ পা টিপটিপে তিনতলায় নেমে বেল টিপে, দরজায় বাড়ি মারে। কিন্তু দরজা কেউ খোলে না, অদিকে মাতাললোকটা নামছে। অহনা আবারো নামতে থাকে, গ্যারেজের একটা গাড়ির পিছনে গিয়ে লুকায়। হুঙ্কার ছেড়ে খুঁজছে লোকটা, বারবার বলে উঠছে, “কৈ গেলি?”
অহনা হঠাৎ অনুভব করে, ও একা নয়, ওর বাচ্চাটা লাথি মারছে। ও কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিল ওর মধ্যে বেড়ে ওঠা অন্য সত্ত্বাকে। মাতাললোকটা কিছুক্ষণ পড়ে চলে যায়, অহনা বাসায় ফিরে আসে। রাজ্যকে সব বলতেই রাজ্য বলে ওঠে, “তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এমন কেন করতে গেলে? লোকটা মাতাল, তার উপর তোমার এই-”
“আমি সহ্য করতে পারছিলাম না মেয়েটার কষ্ট। আমাদের উচিত, থানায় রিপোর্ট করা”
“পাগল হয়েছো?”
“একটা মেয়ের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলছে!”
“তো? মেয়েটা তো যায় নি পুলিশের কাছে? তোমার কি?”
“কি বলছেন এসব!”
“থিঙ্ক প্রাক্টিকালি, আমরা রিপোর্ট করলাম পুলিশের কাছে। মেয়েটি যদি অস্বীকার করে... আমি এই ব্যাপারে বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলবো”
“আপনি তো প্রজেক্টের কাজে কালই চলে যাচ্ছেন”
“ফিরে এসে কথা বলবো”
অহনা চুপ করে থাকে। কোন একটা সিরিয়ালের লাইন মনে হতে লাগলো ওর “If just one person out of those numerous bystanders open his eye, then there wouldn’t be a case of one person’s soul getting completely destroyed”
পরদিন রাজ্য চলে গেল। অহনা ভাবে, রাজ্যর জায়গায় অপু হলে কি এমনটাই করতো? অহনা জানে না। মোবাইলের স্ক্রিনে অপুর নাম্বারটি বের করে, তাকিয়ে থাকে...
অসহায় মেয়েটার আর্তনাদ অহনাকে তার অসহায়ত্ব দেখিয়ে দেয়। বিবেকতাড়িত অহনা রোজ সন্ধ্যায় ৬তলায় যায়, দরজায় দুমদাম বাড়ি মেরে দৌড়ে পালায়। মেয়েটাকে নির্যাতন থেকে সাময়িক রেহাই দেবার জন্য মাতালটার সাথে রোজ বাঘ-হরিণের মত লুকোচুরি খেলা অবসেশন হয়ে দাঁড়ায় অহনার।
একদিন দুপুরে ঘুমুচ্ছিল অহনা। দরজায় কলিংবেল বাজল। অহনা খুলে দেখে, সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে। মেয়েটিকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে সোফায় বসে ইশারা করল অহনা। বলল, “তোমার স্বামী বাসায় নেই?”
মেয়েটি মাথা নাড়ে। অহনা বলে ওঠে, “যদি চলে আসে, আর তোমাকে বাড়ি না পায়?” তারপর আবার বলে ওঠে, “কেন থাকছো পশুটার সাথে?”
মেয়েটার গাল ভিজে যায়। বলতে থাকে, “ কী করবো? কোথায় যাবো?”
“মানে?”
“বাপের বাড়ি ফিরে যাবার উপায় নেই। আমাকে ঘাড় থেকে নামানোর জন্য যৌতুক হিসেবে পাঁচলাখ দিয়েছে। আরো পাঁচ লাখ দাবী করেছে আমার মত কুৎসিতকে বিয়ে করে আমার পরিবারকে উদ্ধার করার জন্য। পড়াশুনাও তো বেশিদূর না। এইট পাস। ঐ লোককে ছাড়লে যাবো কোথায়? থাকবো কোথায়? মার সহ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই”
“তোমার বাসায় জানে?”
“জানে, বলে, সহ্য করতে। আমিও সহ্য করি। পাশের বাসার আপা বলছিল থানায় রিপোর্ট করতে। কিন্তু রিপোর্ট করার পর কোথায় থাকবো আমি?”
“তাই থাকবে জানোয়ারটার সাথে?”
“কী করতে পারি আমি?”
দুজনেই নীরব কিছুক্ষণ। অহনা বলে, “আমার সাথে দেখা করতে এলে কেন?”
“জানতে পেরেছি, আপনি মা হতে যাচ্ছেন। আমার জন্য রোজ এমন ঝুঁকি আপনার জন্য ঠিক নয়। আসি” বলে মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়।
অহনা বলে, “একটু দাঁড়াও”
অহনা একটা মলম আর কিছু ব্যাথার ওষুধ এনে মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দেয়। মেয়েটা অহনাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। অহনা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। অহনার কখনো নিজেকে এতোটা অসহায় মনে হয় নি।
সপ্তাহদুয়েক বাদেই রাজ্য প্রজেক্টের কাজ ফেলে চলে আসে। ৬তলায় নাকি খুন হয়েছে। খুনের জন্য পুলিশ বাসার স্বামীটিকে গ্রেফতার করেছে। রাজ্য জানতে পারল, লোকটি তার স্ত্রীর প্রেমিককে খুন করেছে। প্রেমিকটি আবার আর কেউ নয়, লোকটির বস। রাজ্য বেশ অবাক হল। লোকটা শয়তান, স্ত্রীকে মারধর করলেও মানুষ খুন করতে পারে- এমন ভাবে নি। পাশের বাসার ভাবি এসে বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প করছিল, “আরে জানেন না, ভাবি। সেকি ঘটনা! আমরা তো তখন ঘুমুচ্ছিলাম। মেয়েটার স্বামী ঐদিনো মদ খেয়ে টাল ছিল। স্বামী যখন টাল, তখন পাশের ঘরেই চলছিল সব। স্বামীটা যখন টের পেল মাতাল অবস্থাতেই পিঠে কোপ বসিয়ে দিয়েছে। মৃত প্রেমিককে তো একবারে নগ্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে। ছি ছি! স্বামী মারধর করলেই কি আদরের জন্য পরপুরুষের কাছে যেতে হবে নাকি? জেনা করতে হবে? ছি ছি... মেয়েটার জন্য খারাপ লাগতো... এখন আর খারাপ লাগছে না। রাত ১টার দিকে মেয়েটার চিৎকার শুনে আমরা গিয়ে দেখি, খুন করে সোফায় স্বামী ঝিমোচ্ছিল, তার কাছেই ফ্লোরে পড়ে ছিল রক্তাক্ত চাকু। স্বামীটা আবার দাবি করছে সে খুন করে নি। মাতালের আবার কথা!”
সেই ভাবী চলে যেতেই রাজ্য অহনাকে বলে, “দেখলে কি কান্ড? দরজার ওপাশে আসলে কি হয়- বোঝা যায় না”
“দেখলাম। মেয়েটা যখন আর্তনাদ করছিল কেউ এগিয়ে আসে নি। কিন্তু এখন ছি ছি করার লোকের অভাব নেই। দরজার ওপাশে কি হয় কেউ জানে না, জানতে চায়ও না”
রাজ্য হতবাক হয়ে যায় অহনার উত্তরে। রাজ্য মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না, অহনার মনে কি চলছে।
দুদিন আগের ঘটনা। রাত সাড়ে ১২টার দিকে অহনার দরজার বেল বাজল। অহনা ভীষণ ভয় পেল, এতো রাতে কে? রাজ্যও নেই বাসায়। দরজা খুলে দেখে মেয়েটা দাঁড়িয়ে। সারা গায়ে রক্ত লেগে আছে। মেয়েটাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। মেয়েটা বলতে থাকে, “আজ ওর বসকে নিয়ে এসেছিল। ওর বসকে বেডরুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দেয়। আমি কিছুই করতে পারি নি... লোকটা যখন উপুড় হয়ে ঘুমুচ্ছিল, মুখে গামছা চেপে চাকু বসিয়ে দিয়েছি পিঠে। মরে গেছে”
অহনা বলে, “তোমার স্বামী?”
“মাতালটা মদ খেয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। কি করবো এখন?”
অহনা ও মেয়েটা মিনিটদশ চুপ হয়ে বসে থাকে। অহনা বলে ওঠে, “কী চাও তুমি?”
“ভালভাবে বাঁচতে চাই”
“প্রতিটা দিন তো মরছোই”
“আমাকে বাঁচান”
“জানো, ধর্ষিতা হয়ে বাঁচার থেকে চরিত্রহীন হয়ে বাঁচা সোজা। পর্ণস্টাররা খুব সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, কিন্তু ধর্ষিতাদের বাঁচতে হয় মুখ লুকিয়ে। ধর্ষিতাদের সমাজ বারবার ধর্ষণ করেই চলে, থানায়, কোর্টে, সংবাদে। এই সমাজে ধর্ষিতারা ধর্মহীন, কিন্তু চরিত্রহীন পুরুষ বা স্ত্রীর ধর্ম ঠিকই বহাল থাকে। ধর্ষিতা পরিচয়ের থেকে দুশ্চরিত্রা পরিচয়টা বাঁচার জন্য সম্মানজনক”
“হুহ... চরিত্র”
“বিসর্জন দিতে পারবে?”
“পারবো”
“তাহলে, যা যা বলছি , শোনো, যে চাকু দিয়ে কোপ দিয়েছো, তার হাতলে লাগবে তোমার স্বামীর হাতের ছাপ। কোথাও রক্ত মুছতে হবে, কোথাও লাগাতে হবে... আর তোমাকে হতে হবে দুশ্চরিত্রা”
[সমাপ্ত]
★ভাল লাগলে ১ হলও রেটিং দিন এতে কে অন্যরাও পরতে উৎসাহ পাবে★
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now