বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(১)
নিভৃতের সাথে দীপার প্রথম দেখা হয় একটা
আর্ট এক্সিবিশনে । দীপা ঘুরে ঘুরে দেশের
খ্যতনামা চিত্রশিল্পীদের ততোধিক খ্যাতিসম্পপন্ন
বা খ্যাতি লাভের সম্ভাবনা সম্পন্ন চিত্রকর্মগুলো
দেখছিল । গ্যালারিতে খুব বেশি ভিড় ছিল না , এই
ধরণের প্রদর্শনীতে থাকেও না সাধারণত । তাই
গ্যালারিতে বিস্তার করছিল ভদ্রস্থ নীরবতা । এরই
মাঝে দীপা শুনতে পেল কে যেন বিরক্তি মাখা
কণ্ঠে বলছে – “ধুর ! কি যে আঁকা হয় আজকাল
; কাকের ঠ্যাঙ আর বকের ঠ্যাঙ । ” শুনে
তো দীপা পুরো থ ! এখানে যেসব ছবি
প্রদর্শিত হচ্ছে সেগুলোর প্রতিটাই চড়া দামে
বিক্রি হয় । কোথাকার অল্প বয়স্ক একটা ছেলে
এসে এসব ছবিকে যাচ্ছেতাই বলছে , কি
আজব !
দীপা ভাবলো ছেলেটার সাথে একটু কথা বলবে
। তাকে জিজ্ঞাসা করবে এই ছবিগুলোর কোন
জায়গাটা তার কাছে কাকের ঠ্যাঙ , বকের ঠ্যাঙ
মনে হচ্ছে । এই জন্য সে ছেলেটার কাছাকাছি
গেলো সে । সাধারণত এই ধরণের পরিবেশে ,
সাদা বাংলায় যাকে বলে সারকামস্টেন্স ; সেখানে
ছেলেটাই এগিয়ে এসে কথা বলে । কিন্তু
কালোমতোন , ছোটখাটো ভুঁড়িওয়ালা , ঝাঁকড়া
চুলের ছেলেটা দীপার উপস্থিতিকে
কোনোরকম তোয়াক্কা না করে সেখান
থেকে গটগট করে বের হয়ে গেলো । আর
দীপা অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার থ বনে
গেলো ।
(২)
এর কিছুদিন পরে দীপা তার এক পাগল কবি বন্ধুর
অক্লান্ত অনুরোধে সাড়া দিতে গেলো এক
কবিতা পাঠের আসরে । কবিতা তার ভালো লাগে না
খুব একটা , কিন্তু কবি বন্ধুটি তার খুব কাছের একজন
বন্ধু । তাই আসা ।
যা-ই হোক । গিয়েই দেখে সেখানে গোল
হয়ে বসে আছে আলুথালু বেশের ২০-২৫ জন
মানুষ । জানা গেলো মানুষগুলোর কয়েকজন তরুণ
কবি আর বাকিরা শ্রোতা । কবিতাচক্রের প্রধান অতিথি
হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে দেশের
নামকরা এক কবিকে ।
দীপা এদিক-সেদিক তাকিয়ে তরুণ কবিদের
দেখছিলো । কীভাবে যে মানুষজন এই
ধরণের আজাইরা কাজ করতে পারে , তা তার
বোধগম্য হয় না কখনো । হঠাৎ তার চোখে
পড়ে সেদিনের সেই কালোমতোন ,
ছোটখাটো ভুঁড়িওয়ালা , ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা ।
হাতে একটা খাতা নিয়ে বসে আছে একপাশে আর
মোটা চশমার মাঝখান দিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে ।
কিন্তু কারো সাথে তেমন একটা কথা বলছে না ।
কিছুক্ষণ পর প্রধান অতিথি এলেন । কবিতার
সমসাময়িকতা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ একটা আলোচনা
চলল । এরপর শুরু হল স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর ।
দীপার মাথার উপর দিয়ে গেলো অধিকাংশ কবিতা ,
অধিকাংশ সময়ে তা-ই যায় । সবার শেষে কবিতা পাঠ
করলো ছেলেটি । খুব ছোট একটা কবিতা ,
কিন্তু কবিতাটা দীপার মনে গেঁথে গেলো ।
“ তুই সুখ হতে চাস না আমার , তোকে ভুলতে সময়
নেবো না আমি ।তার চেয়ে দুঃখ হয়ে থাক
আমার ,দুঃখটা হয়ে যাক দামী ।” কবিতা পাঠ শেষে
দীপা পরিচিত হতে গেলো ছেলেটির সাথে
, ততোক্ষণে নাম জানা হয়ে গিয়েছে ; নিভৃত ।
“আপনার কবিতাটা খুব ভালো লেগেছে আমার ।”
– হাসি হাসি মুখ করে বলল দীপা ।
“ভালো জিনিস তো ভালো লাগবেই ।” কি ভাব
রে বাবা ! ভাবলো দীপা ।
সেদিনের মতো আলাপচারিতা সেখানেই শেষ ।
(৩)বাসায় এসে দীপা ফেসবুক ওপেন করেই
পেলো নিভৃতের বন্ধু হওয়ার অনুরোধ । খুশি
হয়েই গ্রহন করলো সে । এরপর থেকে শুরু
হল তাদের চ্যাটিং ।
দীর্ঘ ডিজিটাল আলাপচারিতার মাঝে তাদের একে
অপরকে খুব ভালো করেই জানা হয়ে গেলো
। আপনি থেকে তুমি আসতে সময় লাগলো না ,
তার চেয়েও কম সময়ে তুই-এ চলে এলো তারা
।নিভৃতের বিবিধ বিষয়ে অতি-জ্ঞান , নিজেকে
নিয়ে উচ্চমার্গীয় চিন্তা , এসব আপাতদৃষ্টিতে
হাস্যকর মনে হলেও দীপার কাছে এসবের
কারণেই নিভৃতের অপরিহার্যতা দিন দিন বাড়তে
লাগলো ।
তবে এই ভালোলাগার প্রসারণটা দুই দিক থেকেই
প্রায় সমানভাবে হচ্ছিল , কিন্তু কেউই কাউকে
জানাচ্ছিলো না । কেন যে জানাচ্ছিলো না তা
বোধহয় স্রস্টারও অজানা ।
(৪)
“আচ্ছা , তুই কি আমাকে ভালোবাসিস ?” হুট করে
প্রশ্ন করলো দীপা ।
“তোর কি মনে হয় ?” সাথে সাথে জবাব দিল
নিভৃত ।
“আমি তোর কাছ থেকে শুনতে চাই ।”
“আমি তোর কাছ থেকে তোর ভাবনাটা জানতে
চাই । ”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ । নীরবতাটা ভাঙলো
নিভৃত নিজেই ।
“দ্যাখ , তোকে আমার অনেক ভালো লাগে ।
অনেক , অনেক , অনেক । নিজেকেও
এতোটা লাগে না । কিন্তু আমি কনফিউসড । তুই আর
আমি এত ঘনঘন দেখা করছি , এত কাছাকাছি মিশছি ।
তাই আমাদের মাঝে আবেগ জেগে ওঠাটা
আশ্চর্য নয় ।কিন্তু সেটা কি ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু
সেটা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারি নাই । আমি কি
তোকে ব্যাপারটা বুঝাতে পেরেছি । ”
দীপা সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো ।
নিভৃতের চোখের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে
পারলো যে সে তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে ,
কিন্তু গোঁয়ার্তুমির কারণে বলছে না ।
দীপা আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে উঠে
চলে গেলো ।
(৫)
এরপর ২-৩ সপ্তাহ কেটে গেলো । দীপা আর
নিভৃতের মধ্যে কোন ধরণের যোগাযোগ হয়
না । নিভৃতও করে না , দীপাও করে না । ।
একদিন হঠাৎ নিভৃতের মুঠোফোনে দীপার একটা
ক্ষুদেবার্তা এলো । --“আমি ইউ,এস, এ, চলে
জাচ্ছি । বাকি পড়াশনাটা ওখানেই করবো । আমাদের
কাছাকাছি থাকার কারণে তুই কনফিউসড ছিলি , আশা করি
এবার তোর কনফিউসন দুর হবে । ”
মেসেজ পেয়ে নিভৃতের মাথা খারাপ হওয়ার দশা ।
সে ভেবেছিলো এবার দেখা হলেই সে
সোজাসুজি প্রপোস করে বসবে । সে তখনই
ফোন করে দীপাকে । জানতে পারে দীপা
এয়ারপোর্টে । নিভৃত ছুট লাগায় ।
কিন্তু দীপার সাথে তার দেখা হয় না । হন্তদন্ত
হয়ে নিভৃতের পৌঁছানোর ১০ মিনিট আগেই
বোর্ডিং জোনে ঢুকে যায় দীপা ।
(৬)
নিভৃত নিজের রুমে বসে গান শুনছিল । এমন সময়
তার রুমমেট এসে তাকে জানায় যে দুবাই
এয়ারপোর্টে একটা প্লেন টেক-অফ করার সময়
ক্রাশ করেছে । পাইলটসহ সকল যাত্রী মারা
গিয়েছে । নিভৃত প্রথমে খবরটা শুনে তেমন
একটা পাত্তা দেয় নি , কিন্তু খানিক বাদে অজানা একটা
আশঙ্কায় তার মন দুলে উঠে । সে দীপার বাসায়
ফোন করে এবং তার আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয় ।
ঐ ফ্লাইটের একজন যাত্রী ছিল দীপা । নিভৃতের
মনের নিভ্রিতস্থলটা নিঙরে কান্না বের হয়ে
আসে ।
পুরুষ মানুষের কান্না খুব ভয়ঙ্কর , স্বজন হারানোর
কান্না তো আরো বেশি ।
(৭)
এক সপ্তাহ পরে নিভৃত ক্লাস শেষ করে রুমে
আসে । তার রুমমেট তার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে
দেয় । নিভৃত অবাক হয় ভীষণ । এই ই-মেইলের
যুগে কে আবার চিঠি পাঠালো । চিঠির উপরে
প্রেরকের নাম দেখে আরো অবাক হয়ে যায় ,
সেখানে দীপার নাম লেখা । কাঁপা হাতে খাম
থেকে চিঠিটা বের কুরে পড়তে শুরু করে
সে ।
“প্রিয় নিভৃত ,তোকে আজ জীবনে প্রথম চিঠি
লিখছি । আসলে এটাই আমার জীবনের প্রথম চিঠি
। এই ইন্টারনেটের যুগে তোকে চিঠি লেখার
কারণটা আগে বলি । আসলে এই মুহূর্তে আমার
কাছে ডিজিটাল হরফের চাইতে আমার হাতের
লেখাটা তোর কাছে পৌঁছানোটা জরুরি মনে
হচ্ছে । তাই কাগজ কলম হাতে তুলে নেওয়া ।
দুবাই এয়ারপোর্টে বসে আছি । চার ঘণ্টার যাত্রা-
বিরতি চলছে । গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে দেখলাম
তোর কাছ থেকে প্রায় দশ হাজার সাতশত আঠাশ
মাইল দূরে চলে এসেছি । এই দীর্ঘ
দূরত্বটা তোর মনের কনফিউসন দূর করার জন্য
যথেষ্ট কিনা তা জানি না , কিন্তু আমার জন্য যথেষ্ট
। আমি তোকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি , তুই
বাসিস আর না বাসিস । যদিও এটা কোন প্রশ্ন নয় ,
তবু তোর উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম । আর এই
চিঠিটা যখন তোর হাতে পৌঁছাবে তখন আমি আরো
দূরে চলে যাবো , বলতে গেলে তখন
গ্লোবের একপাশে তুই , আর ঠিক অন্যপাশে
আমি । আশা করি সেই দূরত্বটা তোর মনের সমস্ত
জটিল সমীকরণের সহজ সমাধান দিতে পারবে ।
আর লিখতে পারবো না রে । চোখ ঝাপসা হয়ে
আসছে । ভালো থাকিস তুই ।
ইতি --তোর (যদি তুই ভাবিস) দীপা । ”
নিভৃত চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইল , বুকের কাছে
জাপটে ধরে থাকলো অনেকক্ষণ । তার চিৎকার
করে বলতে ইচ্ছা করছিলো , জানাতে ইচ্ছা
করছিলো তার ভালবাসার কথা । কিন্তু হায় ! যে
মানুষটা শুনবে সেই তো আর নেই ।
হঠাৎ পাশের রুম থেকে গানের সুর ভেসে
এলো --
“আমার ভিনদেশি তারা একা রাতেরই আকাশে...
তুমি বাজালে একতারা আমার চিলেকোঠার পাশে...
ঠিক সন্ধ্যা নামার মুখে...
তোমার নাম ধরে কেউ ডাকে...।
মুখ লুকিয়ে কার বুকে তোমার গল্পো বলো কাকে “
- দুর্জয় বৈদ্য
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now