বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রিয় ইরা ,
আজ অনেক ইচ্ছে করছে তোমাকে একটা
সাদামাটা গল্প শোনাই । আমার গল্প । শাহেদের
গল্প । আমাদের গল্প !
গল্পের শুরুটা খুব এলোমেলো ছিল.. প্রচন্ড
ইগোবাজ দুটি মানুষ কবে কখন একটি চাওয়া এক
হয়ে গিয়েছিল সে কথা আজ আর মনে নেই ।
কোন দিন তারিখ ঠিক করে ভালবাসি বলা হয়নি কারুরই ।
তাই বলে আমাদের একসাথে কাটানো দিন গুলো
একেবারেই বৈশিষ্ট্যহীন ছিল তা নয় ।
অন্যদের মত আমরা হয়ত নিয়মকরে উইকএন্ডে
ঘুরতে যেতে পারতাম না , হয়ত শাহেদ কখনো
বর্ষার প্রথম কদম ফুল আমার হাতে তুলে দিয়ে
বলেনি তুমি এর চেয়ে সুন্দর ! তবু মাঝে মাঝে
ওর বোকার মত তাকিয়ে থেকে লজ্জায় চোখ
নামিয়ে ফেলা ক্ষণ টুকুকে ভীষণ ভালবাসতাম ।
কিংবা "কাল তোমার ক্লাস আছে ?" প্রশ্ন
শেষের লুকোনো আবেগটুকু অনেক আপন
লাগত আমার !
আর আপন লাগত ওর সত্য বলার সাহস ! জানো ,
যেদিন প্রথম ওর বাসায় গেলাম ওর বৌ হয়ে , হ্যাঁ
আমাদের বিয়ের কথাই বলছি ! সেদিন ওর
কাকীমারা আমার সামনেই কেমন কপাল কুচকে
ছিলেন । ফুলশয্যার রাতে আমার প্রথম কথা ছিল "
তোমার পরিবার আমাকে পছন্দ করেনি তাই না ? "
শাহেদ মুচকি হেসে বলেছিল - সংসার তো আমি
করব... আপাতত আমার পছন্দ হলেই চলবে ।
আমি একটুও কষ্ট পাইনি জানো । বরং আরো একটু
বেশী ভালবেসে ফেলেছিলাম ওর সাথে
জড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোকে ।
এর পরের গল্পটা একটু অচেনা ছিল । ঠিক অচেনা
নয়... বরং ভয়ঙ্কর রকম চেনা ...
এলোমেলো.. তুমি তো জানো আমি বেশ
ভাল একটা রেজাল্ট নিয়ে গ্রাজুয়েশন কম্পলিট
করেছিলাম । একটা ফরেইন কোম্পানী থেকে
অনেক ভাল একটা চাকরীর অফারও পেয়েছিলাম ।
হ্যাঁ , যা ভাবছো তা ই । শাহেদ আমাকে চাকরীটা
করতে দেয়নি ।
ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে দুমাস চেষ্টাও করেছিলাম
। সেসময় ও জেদ ধরল পরিবারে নতুন একজন
সদস্যের ! সত্যি বলতে ছোট্ট একটা হাতের
মাঝে নিজের আঙ্গুল আকড়ে ধরার সুখ সুখ
মুহূর্তটার আমিও ভীষণ লোভী হয়ে গিয়েছিলাম
।
এরপর অনেক গুলো বিষন্ন আর ক্লান্ত বিকেল
শেষে রোজালিন এল আমার সারাবেলার খুনসুটি
হয়ে ।
ওকে ঘিরে আমাদের ভালবাসার কোন কমতি ছিলনা
। গোলাপী গোলাপী রং এর ছোট্ট পুতুল টা
আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল খেলনা ,শখের
রান্না বাটি ছেড়ে ।
আমার আর চাকরীতে ফেরা হয়নি ওকে সব টুকু
পূর্ণতায় বড় করে তোলার চেষ্টাতে ।
আমি ওর মাঝে নিজের শৈশব কৈশোর টা দেখতাম ।
যা কিছু আমার হয়নি তার সবটুকু ওকে দিতে চেয়েছি
আমি । রোজাও ঠিক ওর বাবার মত হয়েছিল ।
প্রচন্ড জেদী আর স্বাধীনচেতা । একদিন
রাতে খাবার টেবিলে বসে জানালো ও আর
এদেশে পড়াশোনা করতে চায়না । একটা
স্কালারশীপও নাকি পেয়ে গেছে জার্মানীর
একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে । ওখানে থাকা ওর বন্ধু আর
তার পরিবারই নাকি করে দিয়েছে সব । এখন শুধু
আমাদের অনুমতির অপেক্ষা ।
আমি জানি এই অপেক্ষা টুকুর দেরী হয়ত ও
পছন্দ করবেনা তাই বাঁধা দেইনি আর ।
ও যেদিন চলে গিয়েছিল শাহেদ আমাকে
এয়ারপোর্টে নিতে চাচ্ছিল না । ভেবেছিল আমি
খুব কাঁদব । জানো ইরা , সেদিন আমি একটুও কাঁদিনি ।
সত্যি বলছি ! শুধু বাড়িতে ফিরে ওর ছোট্ট
বেলার জামা জুতো আর খেলনা গুলো জড়িয়ে
রেখেছিলাম বুকের কাছটায় ! আমার পুতুল পুতুল
বাবুটা কবে এত বড় হয়ে গেছে আমি কিচ্ছুটি
টের পাইনি !
প্রথম প্রথম প্রতি সপ্তাহে মেইল করত ।
স্কাইপিতে কথাও হত । আমার ঘুরে ফিরে কি
খাচ্ছো , ঠিকমত ঘুমাচ্ছো কিনা এই গদবাধা প্রশ্ন
গুলো হয়ত ওর আর ভাল লাগত না কিংবা ব্যস্ত হয়ে
পড়েছিল পড়াশোনায় তাই মেইল এর সংখ্যা কমতে
লাগল আস্তে আস্তে ।
এর পর অনেক গুলো দিন কেটে গেছে
নিঃসঙ্গতার সাথে ঘর করে। শাহেদও ইদানিং ভীষণ
ব্যস্ত অফিসের কাজে । বয়স হয়েছে ,আগের
মত আর চাপ সামলাতে পারেনা ঠিকঠাক । বেশীর
ভাগ সময়ই মেজাজ খিটখিটে করে বাসায়
ফেরে...আর বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে
বেড়েছে সর্ম্পকের দুরত্ব ।
ছুটির দিনের বিকেল গুলোতে একসাথে বসে চা
খাওয়ার চেয়ে একবেলা ঘুমিয়ে নেয়া ওর কাছে
বেশী আপন মনে হয় ।
আর আমার ? আমার এখন অসীম অবসর... এক
চিলতে আকাশ , প্রিয় ঘরের কোন আর টুকরো
মেঘেরা না থাকলে হয়ত বিষন্ন বাতাসের কাছে
কবেই হেরে যেতাম । জানো ইরা , পঞ্চান্ন
বছর বয়স টা খুব একলা । এলোমেলো ।
অকারনেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে । বুকের
কাছটায় অভিমানের মেঘ খুব ভারী হলে টুপটাপ
বৃষ্টি নামে একটুতেই । সবকিছু থেকেও মনে
হয় নিজের কিছু নেই । একটু একটু করে গড়া
নিজের সংসারটা কেমন অচেনা লাগে ।
পঞ্চান্ন বছর বয়স টা কেমন যেনো...
এলোমেলো । প্রিয় মানুষগুলোর কাছে
নিজেকে বোঝা মনে হয় , জীবনে লাগে
অর্থব । বুকের ভেতরে হলুদ পাতার দীর্ঘশ্বাস
টুকু বাড়তে থাকে একটু একটু করে ।
ছোট্ট একটা চড়ুই বিকেলের জানালায় এসে
বসলে তার সাথেও গল্প জুড়ে দিতে ইচ্ছে
করে । অনেক ক্লান্ত আর একাকী বিকেলের
গল্প !
তোমার কি বিরক্ত লাগছে ইরা ?
আমি জানিনা তুমি বাংলা পড়তে পারো কিনা । তোমার মা
হয়ত তোমাকে কখনো জোনাকীর গল্প
শোনায়নি , বৃষ্টি শেষে মাটির অদ্ভুত সুন্দর
গন্ধের কথা বলেনি..
অনেক সবুজ আর এক চিলতে লালের গল্প
বলেনি । আমার সেই সব গল্প তোমাকে
শোনাতে ইচ্ছে করে । তোমার কি সময় হবে
ইরা ?? আমাকে জানিও
আর ভাল থেকো । সবটুকু ভাল ।
ইতি
তোমার নানু
চিঠিটা শেষ করে ছোট্ট একটা বাক্সে ঢুকিয়ে
রাখে শাহেদ এর স্ত্রী , অনিন্দিতা । সে জানে
এই চিঠি কখনো পাঁচ বছরের ছোট্ট ইরার হাতে
পৌছোবেনা তবু খামের উপর ছোট ছোট
অক্ষরে লিখে রাখে "ইরার পঞ্চান্নতম
জন্মদিনের উপহার " !
- মেঘলা তাসনিম -
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now