বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। দীপু এখনও তারিককে পেটায়নি, পেটাবে সেরকম সম্ভাবনা কম। রাগটা প্রথম দিকে যেরকম বেশি ছিল, এখন আর সেরকম নেই। তা ছাড়া কোনোরকম ঝগড়া-বিবাদ ছাড়া আগে মার খেয়েছিল বলে একদিন পাল্টা মার দেয়া বেশ কঠিন। মানুষ খেপে না উঠলে মারামারি করবে কেমন করে? তা ছাড়া তারিক আজকাল অনেক ভাল হয়ে গেছে অন্তত দীপুর সাথে। আগে সবসময় যেরকম একটা ঝগড়া খুঁচিয়ে তুলতে চাইত এখন আর তা করে না, কাজেই দীপু আর মারামারি করার উৎসাহ পায় না।
এমনিতে সময় মোটামুটি খারাপ কাটছিল না। বিকেলে ফুটবল খেলে সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ফিরে আসে। সামনে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষা, তাই আজকাল একটু পড়াশোনার চাপ। পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেলে সবাই বাঁচে।
সেদিন খেলা শেষ করে সবাই দল বেঁধে ফিরে আসছিল। পানির ট্যাংকটার কাছে এসে কে যেন বলল, তার বড় ভাই স্কুলে পড়ার সময় একবার ওটার উপরে উঠেছিল।
তারিক ফ্যাকফ্যাক করে হেসে বলল, কী আমার বীর! আমি এইটার ওপর কতবার উঠেছি।
গুল মারিস না।
তারিক খেপে উঠল, সত্যি সত্যি সে কয়েকবার এটার ওপরে উঠেছে। চেঁচিয়ে বলল, যদি এখন উঠে তোদের দেখাই?
দেখা না!
যদি উঠি, কী দিবি?
দরকার নেই বাবা, আছাড় খেয়ে পড়বি, পরে আমার দোষ হবে।
তারিক খেপে উঠল, কী বললি? আছাড় খাব? তা হলে দেখ আমি উঠছি।
দীপু বাধা দিয়ে বলল, সন্ধ্যার সময়ে ওঠার দরকারটা কী? বিশ্বাস করলাম তুই পারিস।
উঁহু, তোরা বিশ্বাস করিস না, আমি এখন উঠব।
দীপু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, এটা এমন কী ব্যাপার যে বিশ্বাস করব না?
তার মানে এটা খুব সোজা, তুইও পারবি?
একশো’বার পারব।
ওঠ দেখি!
দীপু খেপে উঠে বলল, ভাবছিস উঠতে পারব না?
ওঠ না দেখি।
তারিকের উপর নান্টুর অনেকদিনের রাগ, সে তারিককে খেপানোর জন্যে বলল, এটা আর কঠিন কী আমিও পারব।
নান্টু ছোটখাট হালকা-পাতলা-ভীরু বলে বন্ধুমহলে পরিচিত! যখন সেও বলে বসল যে সে পর্যন্ত উঠতে পারবে, তখন তারিক সত্যি সত্যি খেপে গেল। চোখ ছোট করে বলল, যদি সত্যি বাপের বেটা হোস, আয় আমার সাথে, ওঠ।
তারিক পানির ট্যাংকের দিকে এগিয়ে গেল, আর সত্যি সত্যি লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। দীপু নান্টুকে বলল, যা ওঠ!
নান্টু দুর্বল গলায় বলল, ঠাট্টা করে বলেছিলাম।
দীপু বলল, যা পারিস না তা বলতে যাস কেন? গরু কোথাকার!
তারিক অনেক দূর উঠে গেছে, চেঁচিয়ে বলল, বাপের ব্যাটা হলে আয়, আর ভয় পেলে থাক—বাসায় গিয়ে বার্লি খা গিয়ে।
দীপু ট্যাংকটার দিকে এগিয়ে গেল আর হঠাৎ কী মনে করে নান্টুও পেছনে পেছনে এগিয়ে গেল—সেও উঠবে।
ওঠার আগে দীপু নান্টুকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি উঠবি?
হুঁ।
ভয় পেলে থাক–
না আমি উঠব!
ঠিক আছে, ওঠ। দীপু নান্টুকে আগে যেতে দিল। পেছনে পেছনে সেও উঠতে লাগল। ভয়ানক উঁচু পানির ট্যাংকটা। নিচ থেকে বোঝা যায় না। প্রায় আধাআধি ওঠার পর দীপু নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে ছোট ছোট পুতুলের মতো দেখাচ্ছে। দেখে মাথা ঘুরে উঠতে চায়। তারিক তরতর করে উঠে যাচ্ছে, নান্টু তরতর করে না উঠলেও বেশ চমৎকার উঠে যাচ্ছে। ঠান্ডা লোহার সিঁড়িটা শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছিল। শুধু ভয় হচ্ছিল এই বুঝি ফসকে যায় হাত, আর ছিটকে পড়ে নিচে।
শেষ অংশটুকু সবচেয়ে ভয়ানক। একেবারে খাড়া উঠে গেছে। তারিক পর্যন্ত একটু দ্বিধা করল ওঠার আগে। মাঝামাঝি উঠে আবার একটা হাঁক ঠিকই দিল ওদের দেখানোর জন্যে।
নান্টু শেষ অংশটায় এসে একটু ভয় পেয়ে গেল মনে হয়। সিঁড়ি ধরে ভয়ে ভয়ে উপর দিকে তাকাল, দীপু এসে জিজ্ঞেস করল, ভয় লাগছে?
নান্টু দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল।
নেমে যা তা হলে, তোর আর উঠে কাজ নেই।
নান্টুও নেমে যেতে চাইছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে উপর থেকে তারিকের গলার স্বর শুনতে পেল, মুরগির বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
দীপু ধমকে উত্তর দিল, ফ্যাচফ্যাচ করবি না বলে রাখলাম!
ভয় করছে নাকি? তারিক ভয় পাওয়ার ভঙ্গি করে ঠাট্টা করে চেঁচাতে লাগল, ও মাগো, ভয় করে গো, বার্লি খাব গো, দুধ খাব গো…..
দীপু তারিকের ঠাট্টায় কান না দিয়ে বলল, নান্টু ভয় পেলে নেমে যা।
নান্টু কী মনে করে ঠান্ডা গলায় বলল, না, উঠব।
সত্যি?
হুঁ।
দেখিস—
কিছু হবে না।
দীপুকে অবাক করে দিয়ে নান্টু সত্যি সত্যি উঠতে শুরু করল। এক পা এক পা করে নান্টু উঠতে থাকে। প্রত্যেকবার পা তোলার আগে লোহার সিঁড়িটা শক্ত করে ধরে রাখে। একেবারে খাড়া সিঁড়ি, পেছন দিকে তাকাবে না তাকাবে না করেও শেষ তিনটা ধাপের আগে হঠাৎ নিচের দিকে তাকাল নান্টু, আর তাকানোর সাথে সাথেই তার যেন কী হয়ে গেল! কত উপরে সে ঝুলে আছে, আর কত নিচে মাটি, ছোট ছোট গাছপালা বাড়িঘর ছোট ছোট পুতুলের মতো লোকজন। মাথা ঘুরে গেল, নান্টুর হাত ফসকে যাচ্ছিল, একটা চিৎকার করে প্রাণপণে সিঁড়িটা ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
দীপু ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, নান্টু কী হয়েছে?
নান্টু কোনো উত্তর দিল না।
নান্টু, নান্টু, এই নান্টু। কোনো উত্তর নেই নান্টুর। দীপু ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে আসে অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না, কাছে এসে হাত দিয়ে ওর পা ধরে নাড়া দিল দীপু।
একটা অদ্ভুত শব্দ করল নান্টু। দীপু অবাক হয়ে দেখল নান্টু থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে দীপুর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল মুহূর্তে।
উপর থেকে তারিকের হাসি ভেসে আসে, কী রে মুরগির বাচ্চারা, উঠিস না কেন? বার্লি খাবি?
দীপু আবার নান্টুকে ডাকল, নান্টু দাঁড়িয়ে থাকিস না, ওপরে ওঠ।
নান্টু কোনো উত্তর দিল না, গোঁ-গোঁ করে একটা শব্দ করল।
ওঠ। ওঠ বলছি!
ভাঙা গলায় নান্টু বলল, পারব না।
পারবি না মানে?
নান্টু গোঙাতে গোঙাতে বলল, পারব না, পারব না।
আর অল্প বাকি, উঠে পড়।
পারব না, পারব না, পারব না—
নেমে আয় তা হলে।
পারব না, আমি পারব না।
পারবি না মানে?
উঁহু, আমি কিছু পারব না।
উপর থেকে তারিক একটু অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে, তোরা ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
দীপু বলল, নান্টু বলছে উপরে উঠতে পারবে না।
তা হলে নেমে যায় না কেন?
নামতেও পারছে না।
মানে?
ঠিক তক্ষুণি নান্টু হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।
অন্ধকারে, প্রায় দুশো ফিট উপরে সরু লোহার খাড়া সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি কাঁদতে শুরু করে, তখন অবস্থাটা কল্পনা করা যায় না। তারিক ভয় পেয়ে বলল, এই দীপু, কাঁদছে কেন নান্টু?
জানি না।
উপরে তুলে আন ওটাকে।
আমি কীভাবে তুলব?
দাঁড়া, আমি টেনে তুলছি?
উপর থেকে তারিক নান্টুর শার্টের কলার ধরে টানতে লাগল আর নিচে থেকে দীপু লোহার মতো হয়ে অ্যাঁকড়ে থাকা নান্টুর হাত খুলে উপরে ধরিয়ে দিতে লাগল, তারপর সাবাধানে পা ঠেলে ঠেলে উপরের সিঁড়িতে তুলে দিল। মুখে ক্রমাগত ধমক আর অনুরোধ করে যেতে লাগল। তিনটি ধাপ ওকে তুলে আনতে অন্তত দশ মিনিট সময় লেগে গেল।
উপরে উঠে নান্টু মুখ চেপে শুয়ে পড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে লাগল। দীপুর মনে হল বুঝি মরেই যাবে।
তারিক ভারি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ওরকম করছে কেন?
বোধ হয় ভয় পেয়েছে।
ভয় পেয়েছে তো উঠেছে কেন?
আমি কী জানি।
যত্তসব ফাজলেমি! মুরগির বাচ্চার মতো ভয়, তা হলে উঠতে যায় কেন?
আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন?
ওকেই জিজ্ঞেস কর।
দীপু খুব ঘাবড়ে গেল। নিচে থেকে অন্যরা বুঝতে পেরেছিল একটা কিছু গোলমাল হয়েছে। বাবু চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে দীপু?
দীপু কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। সন্ধ্যার সময় কয়টি ছেলে পানির ট্যাংকের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আবার কয়টি ছেলে এত উঁটু ট্যাংকের উপরে উঠে গেছে, আশেপাশে এমনিতেই লোকজনের ভিড় জমে যাবার কথা। দীপুর সব মিলিয়ে খুব অস্বস্তি লাগতে থাকে। তাকিয়ে দেখল, সত্যি সত্যি নিচে লোকজনের ভিড় জমে গেছে। কেউ যে ব্যাপারটি ভাল চোখে দেখছে না তা আর বলতে হল না। আরও বেশি লোক জমে যাবার আগেই একটা-কিছু করা দরকার। সে চেঁচিয়ে বলল, তোরা বাসায় চলে যা।
কেন?
যা বলছি, এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস না। খবরদার!
যেসব লোক এর মাঝে জমা হয়ে গিয়েছিল তারা জানতে চেষ্টা করল ব্যাপারটি কী। কিন্তু নিচে যারা আছে, তারা ব্যাপারটি আসলেই জানে না, অন্যদের কী বলবে! দীপুর কথামতো তারা সরে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করল। কৌতূহলী লোকজন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে চলে গেল।
শেষ লোকটি চলে যাবার পর তারিক বলল, আমি গেলাম।
মানে?
মানে আবার কী? সারারাত বসে থাকব নাকি?
সত্যি সত্যি তারিক উঠে দাঁড়িয়ে নামার আয়োজন করতে থাকে। দীপু নান্টুকে ডাকল, নান্টু কোনোমতে উঠে বসে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ওকে নামার কথা বলার কোনো অর্থ হয় না, এখানে বসে থেকেই সে একটা অস্বাভাবিক ভয়ে কাঁপছে। কিছু-একটা হয়ে গেছে ওর।
দীপু তবু চেষ্টা করে দেখল, নান্টু, নামবি না?
নান্টু জবাব দিল না। আগের মতো কাঁদতে লাগল।
বসে থাকবি নাকি সারা রাত?
নান্টু তবু জবাব দিল না, কাদাটা একটু বেড়ে গেল শুধু।
আমরা গেলাম তা হলে।
নান্টু একটু জোরে কেঁদে উঠল এবার।
তারিক বিরক্ত হয়ে বলল, আমি জানি না বাপু, তোর যা ইচ্ছে হয় কর। আমি যাচ্ছি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now