বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দীপ্তিময়
-মুন মানসী হাশেম
১
‘পরিণতি ভেবেছি একটাই, যেভাবেই হোক তোমাকেই চাই
আর কেউ নয়, আমি যেন পাই
পেলে আর না হারাই’
গানের এই অংশটুকু বার বার শুনে যাচ্ছে আবিদ,মাঝে মাঝে আনমনে গলাও মেলাচ্ছে। কিন্তু এখন তার গান শোনার সময় না। কলেজের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে। গান শুনতে শুনতেই তাই বেড়িয়ে পরে। বন্ধুদের চায়ের দোকানে ঘণ্টা খানিক অপেক্ষা করিয়ে রাখতে একটুও খারাপ লাগেনা তার কিন্তু কলেজে এক মিনিট দেরি করে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেনা। আজ কেন যে নিজেই যেচে মাকে সকালের কাজে সাহায্য করতে গেল !এখন নিজের উপর রাগ লাগছে। রাগের কথা মনে হতেই খুব সচেতন হয়ে গেল সে,আজ মোটেই রাগ করা যাবেনা।খুব বিশেষ একটা দিন আজ,এর চেয়ে সুন্দর দিন খুব কমই আছে ক্যালেন্ডারের পাতায়। কথাগুলো ভাবতেই সমস্ত খারাপ লাগা কেটে গেল এক নিমিষেই।
কলেজের গেটে নেমে তাড়াতাড়ি করে ভাড়া মিটিয়ে দেয় সে। ঈশ! কত যে দেরি হল, কে জানে! খুব বেশি দেরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ঘড়ি দেখতে পারেনা আবিদ, তাতে তার অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। গেটে ঢুকতে গিয়েও আবার ফিরে এলো গেটের পাশে লাগোয়া ফুলের দোকান দেখে। কিছু ফুল কিনে দাম মিটিয়ে দিয়ে আবার কলেজের ভেতরে চলে গেলো সে। আরও কিছু কিনতে ইচ্ছে হল কিন্তু সময় এবং সুযোগ দুটোরই অভাব দেখা দিল এ মুহূর্তে। পৃথিবীর সব নিয়মকে মাঝে মাঝে অনিয়ম লাগে আবিদের কাছে। একটা দিনের জন্য খানিক বেশি সময় সে দাবী করতেই পারে। এমন কিছু ক্ষতি তো হবেনা তাতে। ফুল নিয়ে ক্যাম্পাসের হাঁটতে অস্বস্তি লাগার কথা, অনেকে হাতের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। কি আশ্চর্য! ধারাবাহিক ভাবে লাজুক উপাধিতে ভূষিত হওয়া ছেলেটির আজ একটুও লজ্জা লাগছেনা। মনে হচ্ছে আজ সে অনেক কিছুই করে ফেলতে পারে। সম্ভবত সরাসরি গিয়ে ফুলগুলো হাতেই তুলে দিবে। আসলেই কি দিতে পারবে? গত এক বছরেও যখন কিছু করতে পারেনি তখন এক দিনে কি করে ফেলবে? আবার মন খারাপ কড়া নাড়ছে দরজায়। ধুর,ভাববেই না আজ আর কিছু।
এত খারাপ ভাবনার মাঝে যে জিনিসটি স্বস্তি দিল তা হল, দেরি হয়নি। এখনো ক্লাস শুরু হয়নি। এখন শুধু প্রতীক্ষা, কখন আসবে সে! প্রতীক্ষা শব্দটি আবিদ পেয়েছিল রফিক আজাদের ‘প্রতীক্ষা’ কবিতায়। কয়েকটি লাইন আরেকবার মনে মনে ঝালিয়ে নিলো-
“কিন্তু তোমার জন্য
আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু
তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দদু’টির তেমন
কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য
অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন,
ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য
সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের
ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের
জন্যে প্রতীক্ষা করবো না?
‘ফুল কার জন্য’? সোজাসুজি প্রশ্ন অপুর। আবিদ শুধু তাকিয়ে একটা হাসি দিল।
‘তুই দিবি ফুল? আমি কি স্বপ্ন দেখছি’?
‘স্বপ্ন না, সত্যি’।
‘রাখ তোর সত্যি। শালা, এক বছর ধরে দেখেই যাচ্ছিস। টিকটিকির কলিজা নিয়া মানুষ প্রেমে পড়ে কেন বুঝিনা!’
‘টিকটিকির কী কলিজা আছে দোস্ত?’
‘হাসবিনা শালা। আর কতদিন তোর এই আজব প্রেম দেখতে হবে আল্লাহ জানে’!
অপুর কথার আর কোন উত্তর দিতে পারে না আবিদ। এখন সে অন্য জগতের বাসিন্দা। এতক্ষণে প্রতীক্ষার অবসান। সকাল বেলার সেই নির্মল প্রশান্তি!
২
আজকাল কেন যেন ইকবালের আচরণ বুঝে উঠতে পারে না দীপ্তি। বছর খানিক হতে চললো একসাথে এখানে কাজ করছে দীপ্তি আর ইকবাল। কিন্তু কখনো একে অপরের সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেনি। কিছুদিন হল দুজনের মাঝে টুকটাক কথা বিনিময় শুরু হয়েছে। সাধারণ পরিচিতি পর্ব, কিছু এই-সেই কথা। কাজের ফাঁকে খুব সময়ও হয় না। ছুটির পরে একসাথে খানিকটা হেঁটে যাওয়া... কিছুই পরিকল্পনা করে নয়। কিন্তু সময়গুলো ভালোই কেটে যাচ্ছিল। ভালো সময়গুলো ঘোরের মাঝেই কেটে যায় হয়তো। একদিন দুইদিন করে সময় গড়ায়। ভালো লাগায় বুদ হয়ে থাকে দুজন মানুষ। কাজের মাঝে আসা যাওয়াতে দু’একবার চোখাচোখি হয়ে যায়,সাথে চলে মিষ্টি হাসির বিনিময়। ক্যান্টিনে এক টেবিল শেয়ার করা,কখনো চা পানের বিরতিতে দু’চারটি কথা। এর মাঝেই জানা হয়ে যায় প্রিয় রং, জন্মতারিখ আর সব পছন্দের জিনিস।
কথা বলার গণ্ডি কাজের জায়গা পেরিয়ে সেদিন ঠাঁই নিয়েছিল গৃহকোণে যেদিন সব ইতস্ততা ঝেরে মুঠোফোন নম্বরটি চেয়ে নিয়েছিল ইকবাল। প্রায়ই লম্বা সময় ধরে চলে আলাপন ।
‘কী করছেন’? মুঠোফোনে আজাদের এই প্রশ্ন শুনে অভ্যস্ত দীপ্তি।
‘তেমন কিছুনা’।
‘এই তেমন কিছুনা কাজটা কী বলা যায়’?
‘গান শুনি’।
‘কী গান’?
‘রবীন্দ্রসঙ্গীত।আপনার তো আবার এটা পছন্দ নয়’।
‘উহু, হলোনা। পছন্দ ছিল না। এখন ভালো লাগে। অন্যের ভালো লাগাকে এভাবে নিজের করে নিতে পারবো ভাবিনি’।
‘পারলেন কেন’?
‘ভালো লাগলো যে, তাই’।
এমন আরও অকারণ কথায় কেটে যায় সময়। খারাপ তো লাগেই না বরং ভালো লাগায় আচ্ছন্ন থাকে দীপ্তি। সকাল হলেই দেখা হবে এমন স্বস্তি নিয়ে কেটে যায় রাত।একটু কথা বলা, একটু দেখা... অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি জাগায়।
‘গুড মর্নিং’।
প্রতিদিন সকালে ইকবালের থেকে শোনা ছোট্ট শব্দ দুটো সারাদিনের জন্য শুভ কামনার মত মনে হয় দীপ্তির কাছে। মিষ্টি হাসি দিয়ে ছোট্ট শুভ কামনা ফিরিয়েও দেয় সে।
‘গুড মর্নিং’।
কাজ শেষে বের হয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যায় দীপ্তি। গভীর মনোযোগে নিজের ছায়া দেখে সে। আশে পাশের মানুষ যাওয়ার সময় দু’একবার ফিরে দেখে তাকে। দীপ্তির সেসবে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আরও মনযোগী হয়, অপেক্ষা করে। এবার আস্তে আস্তে হাসি ফুটে তার ঠোঁটে। নিজের ছায়া ছেড়ে পাশের ছায়াতে চোখ পড়ে। ইকবাল এখন হাঁটবে তার সাথে। পাশের এই ছায়াটার জন্যই অপেক্ষায় ছিল সে। নিজের ছায়ার পাশে আরেকটা ছায়ার জন্য অপেক্ষা। খুব মজার খেলা। ইদানীং এই খেলাটা খুব ভালো লাগছে দীপ্তির।নিজের এমন অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে মাঝে মাঝে দ্বিধান্বিত হয়ে যায় সে। তার উপর ইকবালের আড়াল দৃষ্টি বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩
কিছু প্রাপ্তির আশা না করেও ভালবাসা যায়। ভালবাসার কোন নিয়ম কোথাও লেখা নেই। আমি যেভাবে ভালবাসতে চাই সেটাই হবে আমার ভালবাসার নিয়ম। মোটামুটি যুক্তিটা দাড় করাতে পেরে খুশি হয় আবিদ। অকারণেই খানিক ঘুরে আসে মেয়েটার মুখবইয়ের দেয়াল থেকে। বন্ধু হবার অনুরোধ পাঠায় নি, তেমন ইচ্ছেও নেই। এমনিতেই লুকিয়ে শুধু দেখে। ভালোলাগার মানুষের যেকোন কিছুই আনন্দ দেয়। এই আনন্দটুকুই হারাতে রাজী নয় সে।
তার এই ভালোলাগাটা সবার কাছে এখন একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো। কিন্তু আবিদ এসব নিয়ে মোটেও ভাবেনা। নিজের জন্য তার কিছু উপলব্ধি আছে যা সে অন্যকে জানাতে চায় না। একজন মানুষের সব কিছু কিকরে এত ভালো লাগতে পারে? বাতাসে মিশে যাওয়া মেয়েটার সব কথাগুলো ধরে রাখতে ইচ্ছে হয়; মনে হয় অকারণে অনেক বেশি মূল্যবান জিনিস মিলিয়ে যাচ্ছে নিমিষে। একবার হাসতে দেখলেই আরো সহস্র যুগ কিছু নয় শুধু এই হাসিটুকু দেখার জন্য বেঁচে থাকার ইচ্ছে জাগে। এই অনুভূতিগুলো কাউকেই বোঝানো যাবেনা। স্রোতের বিপরীতের ভাবনা কী সবার জন্য!
আজ ওর জন্মদিন!অন্যরা যেমন সহজেই শুভেচ্ছা আর উপহার দিল তেমনি করে একবার সহজে সেও কী পারতো না শুভ কামনাটুকু পৌঁছে দিতে? পারতো হয়তো! কিন্তু পারেনি... পারেনি এটাই বড় কথা। এই না পারাটা আজ কষ্ট দিচ্ছে। খুব করে আজ তাকে জানাতে ইচ্ছে করছে-‘তুমি এসেছ বলেই সার্থক ধরণী, তুমি এসেছ বলেই এখনও অগণিত তরুণ বিভোর হয় প্রেমের স্বপ্নে, তুমি এসেছ বলেই সকল নিয়ম তোমার নিয়মে বদলে যায়; সমস্ত পথ এসে থেমে যায় এক পথে... তোমার নরম আলোয় স্নান করে শুদ্ধ হয় অপবিত্রতা’। আরো না জানি কত কী বলতে চায়!বলা হয় না,হয়েই উঠেনা। এমন করে কেউ কী দিয়েছে কাউকে শুভ কামনা? কেউ পারেনা। ভালবাসার জন্য অনেকেই অনেক কিছু করতে পারে কিন্তু আরো অনেক কিছুই যে অনেকে পারে না সে হিসেব কেউ রাখেনা।
‘আবিদ, একা দাঁড়িয়ে শুধু ভাবতেই থাকবি? ফুলগুলো দিবি না’?
‘পেছনে পড়লি কেন অপু? কিনেছি, দিতেই হবে এমন কোন কথা তো নেই’।
‘উইশও করবিনা? সবাই করলো’!
‘বাদ দে, ভালোলাগছে না এসব নিয়ে কথা বলতে। স্যার ঢোকেননি ক্লাসে’?
‘ঢুকলে কী আর তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতি? ঘুষি মেরে তোকে ক্লাসে ঢোকাতাম না শালা’?
‘এত যে শালা শালা করিস কেন? আমার তো ছোট বোন নেই। আর বড় বোনের তো বিয়েই হয়ে গিয়েছে’!
‘শালা, তোর বোন থাকলেই বুঝি বিয়ে করতাম আমি? তারও তোর মতোই টিকটিকির কলিজা থাকতো’!
হাসতে হাসতে অপুকে মারতে হাত বাড়ায় আবিদ। ক্লাসের সামনের করিডোরেই হাঁটছিল দুজন। একটি ক্লাসরুমে হঠাৎ চোখ যায় আবিদের। সে এখানে!থমকে যায় চলা। আবার হারায় সেই জগতে। কী শুভ্রতাই না সারাক্ষণ ঘিরে থাকে তাকে! সৃষ্টিকর্তা নাকি কাউকেই সম্পূর্ণ করে পাঠান না কিন্তু আবিদের কাছে তাকে কখনো অসম্পূর্ণ মনে হয় না। বরং অনেকের অসম্পূর্ণতা দূর করার ক্ষমতা রাখে সে। চলনে, বলনে, পোশাকে কি নিখুঁত সৌন্দর্য!অনেক মেয়েই ঠিক মাপের জুতা পরে না। এবং এটা তারা নিজেরাও জানেনা, যে জুতাটি সে পরে আছে সেটি পায়ের সঠিক মাপের নয়। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! অবধারিত ভাবে হয়ে যাওয়া ভুলটিও তার নেই। খুব বেশি ফর্সা নয়, যে রঙটি হলে ঠিক মানিয়ে যেত এটা সেই রঙ। ছিঃ! এভাবে বর্ণ দেখতে আছে? নিজেকে খানিক শাসিয়ে নেয় আবিদ। কী করবে সে? এত যত্ন নিয়ে গড়া কোন সৃষ্টি আজ অব্দি চোখেই পড়েনি তার। চোখের কোল ঘেঁসে হালকা কালচে ছায়া পড়েছে তবে তা ছাপিয়ে মহনীয় চোখ দুটি যে কারো দৃষ্টিই এড়াতে পারবেনা তা স্পষ্ট জানা। ভালো লাগে বলেই কী বেশি বলছে? নাহ, সব পুরুষ এভাবে তার ভালোলাগার মানুষকে দেখতে পারেনা। কেউ কেউ সৌন্দর্যের সন্ধানে থেকেই হারিয়ে ফেলে সমস্ত। এ দৃষ্টি ঐ সমস্ত সাধারণ পুরুষের দৃষ্টি নয়।
নামটাও একেবারে যেন যোগ্য ব্যক্তিত্বের জন্য হয়েছে। সমস্ত ভালোলাগা মিশিয়ে আবিদ একবার উচ্চারণ করলো নামটি- ‘দীপ্তি’!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now