বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
.
.
--আপনি তাহলে মতামত পাল্টাবেন না?
--না।
--আচ্ছা, আমি দু’এক দিনের মধ্যে সব কাগজ পত্র
তৈরী করে আপনাকে জানাব।
.
আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে আসলাম বিদ্বান
সাহেবের অফিস থেকে। আনমনে হাটছি ফুটপাত
ধরে। হাতে জলন্ত সিগারেট। শুনেছি
নিকোটিনের ধূয়ার সাথে সব দুঃখ কষ্ট উড়িয়ে
দেওয়া যায়।তাই আজ আমার সিগারেট হাতে নেওয়া।
সিগারেটে একটি লম্বা টান দিয়ে বসে পড়লাম
পাশের পার্কের ব্যাঞ্চে। আর ভাবছি পুরনো দিন
গুলোর কথা।
.
--সবুজ তুই কাঁদছিস কেনো বাজান?
--
--কী হলো? কথা বলছিস না কেন? তুই কী
পরিক্ষায় খারাপ করেছিস বাজান? খারাপ করলে সমস্যা
নাই সামনের বছর আবার পরিক্ষা দিবি।
--বাবা......।
-- বল বাজান।
--বাবা আমি ভর্তি পরিক্ষায় পাস করেছি।
-- আরে এতো খুশির সংবাদ। এখানে কান্নার কী
আছে? কই গো সবুজের মা, এদিকে আসো।
আমাদের সবুজ পরিক্ষা পাস করছে। খাড়া বাজান আমি
মহল্লার সবাইরে খবরটা দিয়া আসি।
--বাবা।
--এই খুশির দিনে তুই কাঁদছিস কেন বাজান? কি
হয়েছে আমায় খুলে বল।
--বাবা মেডিকেলে ভর্তির জন্য দু’লক্ষ টাকা লাগবে।
আর এতো টাকা তুমি কোথায় থেকে যোগার
করবে। আমার আর ডাক্তার হওয়া হবে না বাবা।
--টাকা নিয়া তুই কোন চিন্তা করস না বাজান। আমি আছি না?
--কিন্তু এতো টাকা তুমি যোগার করবে কী ভাবে?
--এসব নিয়া তুই টেনশন করতে হবে না। টাকা’টা কবে
লাগবে?
--১০-১২ দিনের মধ্যেই।
--আচ্ছা। আমি সময় মতো দিয়ে দিব।
.
আমি সবুজ। গরীব ঘরের বড় সন্তান। বাবা একটি
স’মিলে (কারখানা) কাজ করেন। উনার এই সামান্য আয়
দিয়ে আমাদের মা-বাবা ও চার ভাই বোনের সংসার
চলে। ছোট বেলা থেকে আমি আমার পড়ালেখার
খরচ নিজেই চালাই, দু’একটা টিউশনি করে। মাধ্যমিক ও
উচ্চ মাধ্যমিক দুটোতেই জি.পি.এ ৫ পেয়ে পাস
করি। যেখানে আমার বন্ধুরা উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষা
দিয়ে বড় বড় কোচিং সেন্টারে বই পোস্তক
নিয়ে ব্যাস্ত, সেখানে আমাকে আরো দুইটা
টিউশনিতে বেশি সময় দিতে হয়। কারন আমাকে ভর্তি
পরিক্ষার ফর্ম কিনতে হবে। বাবার অনেক দিনের
ইচ্ছে আমাকে ডাক্তার বানাবে। আসলে আমাদের
মতো গরীব ঘরের ছেলেদের এইসব স্বপ্ন
দেখা অনেকটা হাস্যকর ব্যপার। তবুও স্বপ্ন দেখি
কেউ তাতে বাধা দেয় না বলে।
ভর্তি পরিক্ষার দিন অনেক বন্ধু আমাকে দেখে
হাসছিলো, আর মুখ বাঁকিয়ে বলেছিলো ঐ দেখ
দেখ সবুজ এসেছে মেডিকেল ভর্তি পরিক্ষা
দিতে, যেকিনা এই দু’মাসে মেডিকেল ভর্তি
পরিক্ষার একটা বইয়ের প্রথম পৃষ্টাও চোখে
দেখেনি। আসলে তাদের কথাই ঠিক। আমার বাবার
এতো টাকা কোথায় যে, আমাকে বই কিনি দিবে।
যেখানে ফর্ম কিনার জন্য হিমসিম খেতে হচ্ছে
সেখানে আমার জন্য কোচিং করা আকাশ আর ভূমির
মতো ব্যবধান। ঐদিন তাদেরকে কিছুই বলতে
পারিনি। আমাদের মতো মানুষের জন্ম হয়েছে
তাদের মুখ বাঁকানো কথা শুনার জন্য।
ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে ভালো একটি মেডিকেল
কলেজে চান্স পেয়ে যাই। ঐ দিন যতটা খুশি
হয়েছিলাম তারচেয়েও বেশি চিন্তিত ছিলাম। কারন,
মেডিকেলে ভর্তির জন্য দু’লক্ষ টাকা প্রয়োজন।
যেখানে আমাদের পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়
সেখানে দ’লক্ষ টাকা যোগার করা বাবার জন্য আকাশ
থেকে চাঁদ সংগ্রহ করার মতো।
.
--বাজান, এই অবেলায় শুইয়া আছো কেনো?
--না বাবা, এমনিতেই শুয়ে আছি।
--এই নাও বাজান তোমার ভর্তির টাকা।
বাবা আমার দিকে টাকার দুইটা বান্ডেল এগিয়ে দিয়ে
এই কথা বলছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এই
মুহূর্তে আমি স্বপ্ন দেখছি। হঠাৎ কেউ এসে ঘুম
ভাঙিয়ে দিবে আর এই স্বপ্নও অসমাপ্ত থেকে
যাবে।
--বাজান কী চিন্তা করো?
--না বাবা কিছু না। আচ্ছা বাবা তুমি এতো টাকা যোগার
করলে কী ভাবে?
--বাজান তুমি এতো কিছু জানতে হবে না। ভালো
করে পড়ে ডাক্তার হও। যাতে মহল্লার সবার কাছে
বুক উঁচু করে বলতে পারি আমার ছেলে ডাক্তার।
.
বাবা চলে গেলেন আমার ঘর থেকে। এতক্ষন
ঘুরের মধ্য দিয়েই সময় পার হয়েছে। বার বার
মনে প্রশ্ন জাগছে বাবা এতো টাকা যোগার
করলেন কীভাবে? শত চেষ্টা করেও এর
কোন উত্তর আমি পাইনি। এই প্রশ্নের উত্তরের
চিন্তা ও অপেক্ষা দু’টই মাথা থেকে ফেলে বাবার
স্বপন পূরনের দিকে অগ্রসর হলাম।
.
দেখতে দেখতে কেটে যায় তিনটি বছর। আর
তখনই আমার জীবনে অভিষাপ হয়ে চলে আসে
সাজেদা।
আমাদের মেসের পাশের বিল্ডিঙএ ছিলো লেডিস
হোস্টেল। বিকেল বেলা বই হাতে নিয়ে যখন
ছাদে উঠতাম তখন পাশের বিল্ডিঙ্গের
মেয়েগুলো আমাকে দেখ হাসতো আর নানা কথা
বলতো। হাসারই কথা, আমি একটা খ্যাত ছেলে,
চোখে গুল বর্ডারের মোটা ফ্রেম, সারাক্ষন
বইয়ের মধ্যে চোখ ডুবিয়ে রাখতাম , এইসব
আচরন দেখে যে কেউ হাসার কথা। আমি ঐ
মেয়ে গুলোর কাছে ছিলাম মি. বিনের মতো।
তাদের হাসানোর একটা মাধ্যম আমি। আমাকে
দেখলেই তাদের হাসি পায়। তবে সেদিকে আমার
কোন ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। হঠাৎ অনুভব করলাম
আমার মাথায় কে যেন পানির বোতুল ছুড়ে
মেরেছে। পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম
হোস্টেলের মেয়ে গুলো হাসতে হাসতে
লুটিয়ে পড়ছে। আমি আচ করতে পারলাম এই কাজটি
সাজেদা ছাড়া আর কারোর না। সাজেদা মেয়েটি
বড্ড ফাজিল। এখানে আসার পর থেকেই আমার
পিছনে উঠেপড়ে লেগেছে। ছাদে আর
বেশিক্ষন থাকা ঠিক না। এই ফাজিল মেয়ে গুলো
কখন কী করে বসে বলা যায় না। এদের কাছ
থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। বিশেষ করে ফাজিল
মেয়ে গুলোর দল নেতা সাজেদার কাছ থেকে।
.
সকালে বের হয়েছি মেডিকেলে যাব বলে।
আজ একটা প্রেক্টিক্যাল ক্লাস আছে তাই একটু তাড়া
বেশি। বাসার নিচ থেকে একটা রিক্সা ঠিক করে যেই
উঠতে যাবো তখনি সাজেদা কোথায় থেকে
এসে ঝড়ের বেগে রিক্সায় উঠে বসলো। আমি
রিক্সা ঠিক করেছি এদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ
নেই। এমন ভাবে বসে আছে যেন আমাকে রাখা
হয়েছে উনার রিক্সা ঠিক করে দেওয়ার জন্য।
মেয়েটিকে কিছুই বললাম না, আমি কিছু বললে সেটা
তার গায়ে লাগবে না। কোন কিছু না বলেই হাটা শুরু
করলাম মেডিকেলের দিকে।
.
সাজেদা মেয়েটার অনেক জ্বালাতন সহ্য করেছি।
এখন আবার নতুন একটা জামেলা শুরু করেছে। সে
নাকি আমাকে ভালবাসে। আমি জানি এটা তার নতুন
কোন বিনোদনের বিষয়। আমাকে হেয়ো
করে মেয়েটা যে কী মঝা পায় বুঝতে পারি না।
গত কয়েকদিন থেকে একশোর অদিক চিরকুট
পাঠিয়েছে আমার উদ্দেশ্যে। প্রতি কাগজে একটি
কথাই লিখা ‘ভালবাসি’। সাজেদার এই ভালবাসা সত্যি নাকি
মিথ্যা তা আমি জানি না, তবে আমর মতো গরীব
ঘরের ছেলেদের জন্য প্রেম-ভালবাসা বলে
কিছুই নেই। আমার কাছে প্রেম ভালবাসা বিলাসিতা, যার
সাধ্য আমার নেই। তাই এইসব বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে
নিজের মতো করে চলতে শুরু করলাম।
.
দাঁড়িয়ে আছি কিছু বন্ধু ও বড় ভাইদের সাথে
মেডিকেলর গেইটে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মূল
কারন হচ্ছে একজন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু
নোট সংগ্রহ করা। হঠাৎ বাম দিকে চোখ পড়তেই
দেখতে পেলাম সাজেদা এদিকে আসছে। তখন
আমার ভিতর কেমন যেন ভয় কাজ করছে। বড়
ভাইদের সামনে কিনা কি করে বসে এই ফাজিল
মেয়েটা। আমার কাছে এসেই দাঁড়িয়ে বলতে শুরু
করল...
.
--কি ব্যাপার আজ বাসায় আসতে তোমার এতো
দেরি হচ্ছে কেনো?
আমি তখন বড় ভাইদের চোখের দিকে তাকিয়ে
কাচুমাচু করছিলাম। তখনি আমার এক ফ্রেন্ড প্রশ্ন
করে বসল..
--সবুজ মেয়েটা কেরে?
--আরে ভাইয়া সবুজ আপনাদেরকে আমাদের
বিয়ের কথা জানায় নি?
--বিয়ে!!!
--হ্যা বিয়ে। পনেরো দিন হলো আমাদের বিয়ে
হয়েছে। ভালো কথা, বাসায় আপনাদের দাওয়ার
রইলো । আর আমি এখন যাই। তোমার (আমার দিকে
ইঙ্গিত করে) মনে হয় এখন ক্লাস আছে। ক্লাস
শেষ করে তাড়াতাড়ি বাসায় এসো।
.
আমি অভাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সাজেদার দিকে।
এতক্ষনে সে অনেক দুর চলে গেছে। আশে
পাশের সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে
আমার দিকে। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছে
আমি উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। এতক্ষনে
অনেকেই অনেক কিছু বলাবলি করছে আমাকে
নিয়ে। আমার বন্ধু রিফাত সরাসরি বলে বসল’ দুস্ত
দেখতে তো তোমাকে ভেজা বেড়াল লাগে,
কিন্তু তুমি যে এতো বড় একটা মিচমিচা বান্দর তা
জানতাম না। আমার এখন মনে হচ্ছে আমি শূন্যের
মধ্যে ভাসছি। কেমন যেন ঘুরের মধ্য দিয়েই
সময় পার হচ্ছে। মেয়েটা এতো নোংরা মন-
মানসিকতার হতে পারে কখনও ভাবতে পারিনি।
.
সকাল দশটা। মেডিকেলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে
বের হয়েছি। বাসা থেকে বের হতেই দেখতে
পেলাম সাজেদা রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে দেখেই মুখ ব্যাংচি দিয়ে বলতে শুরু
করলো ...
--কি মি. কেমন দিলাম?
মেয়েটার অনেক অপমান সহ্য করেছি। আজ কিছু
বলতে হবে। নয়তো দেখা যাবে এক সময় আমার
মাথায় উঠে নাচতে শুরু করেছে।
--এই যে, কি ভাবেন নিজেকে? আমরা গরীব
বলে আমাদের কোন দাম নেই আপনাদের
কাছে? আমি গরীব বলে আপনি যাতা ব্যাবহার
করবেন আমার সাথে? আপনাকে অনেক সহ্য
করেছি আর না।
এই কথা গুলো বলেই একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম
মেয়েটির গালে। নিজেই অভাক হচ্ছি এই বিষয়
গুলো লক্ষ করে। যাকে আমি বাঘের মতো ভয়
পাই আজ থাকে থাপ্পড় বসিয়ে অনেক কথা শুনিয়ে
আসলাম। এই মুহূর্তে অনেকটা শান্তি বিরাজ করছে
মনে।
.
ইদানিং কিছু বিষয় লক্ষ করেছি। সাজেদাকে আগের
মতো আর ফাজলামি করতে দেখা যায় না। সব সময়
চুপচাপ থাকে। ছাদে গেলেও এখন শান্তিতে পড়া
যায়। আগের মতো কেউ আমার সাথে খারাপ আচরন
করে না। আমার জন্য ভালো হল। একটা থাপ্পড়
এতো ভালো উপকার করবে যদি আগে জানতাম
তাহলে অনেক আগে এই কাজ করতাম।
.
আগামি কাল একটা পরিক্ষা আছে তাই পড়ার জন্য বই
হাতে নিয়ে ছাদে উঠেছি। প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ি
পাশের হোস্টেলের মেয়েগুলোও ছাদে
দেখা যাচ্ছে। তবে এক কোনে সাজেদাকে
দেখে অভাক হলাম। যে মেয়েটা সারাক্ষন ফাজলামি
নিয়ে পড়ে থাকতো সে মলিন মুখে বসে আছে
এক কোনায়। এতো কিছু ভাবলে আমার পড়া হবে না
তাই ছাদে রাখা চেয়ারে বসে বই খুলে পড়তে শুরু
করলাম। হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমাকে
ডাকছে। ফিরে তাকাতেই দেখি পাশের
হোস্টেলের ছাদে সাজেদা বাদে কোন
মেয়ে নেই। সাজেদা কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে,
আর আমাকে বলছে সরি। আমি এই মেয়ের নতুন
কোন ফাঁদে পড়তে চাই না বলে, কোন কিছু না
বলে রুমে চলে আসলাম। সাজেদা আমাকে নতুন
করে হেয়ো করার জন্য কোন ফাঁদ পাতছে তা
স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। তানাহলে এই মেয়ে কখনো
আমার কাছে ক্ষমা চাইতে আসতো না।
.
এখন আর ছাদে যাওয়া হয় না। ছাদে গেলেই
সাজেদার নতুন নতুন নাটক দেখতে হয়। আগের
চিরকুট গুলাতে লিখা থাকত ভালবাসি, কিন্তু এখন চিরকুট
গুলোতে লিখা থাকে সরি। সাজেদার এই চিরকুট
পাঠানো আমার কাছে অসহ্য লাগে। মেয়েটির
ছায়াও এখন সহ্য করতে পারি না।
.
ক্লাস শেষে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি রিক্সার জন্য।
হঠাৎ আমার এক বন্ধু আমাকে বলল সবুজ তোর বউ
আসছে। আমি ফিরে তাকাতেই দেখি সাজেদা আমার
দিকে আসছে। মেয়েটি আজও কোন না কোন
গন্ডগুল পাকাবে আমি নিশ্চিত। তাই সাজেদা কাছে
আসতেই কোন কিছু বলার সুজুগ না দিয়ে থাপ্পড়
বসিয়ে দিলাম তার নরম গালে। আর বলে আসলাম যদি
তোমার লজ্জা থাকে তাহলে দ্বিতীয়বার আমার
চোখের সামনে আসবে না। তখন উপস্থিত সবাই
আমার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলো। বেশিক্ষন
থাকা হলো না ওই জায়গায়, হেটেই চলে আসলাম
বাসায়। আজ মেয়েটাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া
হয়েছে। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে শান্তি মতো
একটা ঘুম দিলাম। সন্ধ্যায় আমার রুমমেটের ফোনে
ঘুম ভাঙল। ..
.
--সবুজ এখন তুই কোথায়?
--বাসায়।
--কিচ্ছু শুনেছিস?
--নাতো।
--আরে হারামি সাজেদা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে
আত্ম হত্যার চেষ্টা করেছে?
--কি বলছিস এসব!
--যা সত্যি তাই বলছি।
--এখন কী করব দুস্ত?
--শুন তুই এখনি ______ হসপিটালে আয়। আমি আছি
এখানে।
--আচ্ছা আমি আসছি।
খানিক্ষন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
সাজেদা কী আসলেই আত্ম হত্যার করার চেষ্টা
করেছে? এই প্রশ্ন গুলো মনের মধ্যে ঘুর পাক
খাচ্ছে। এই মুহূর্তে নিজেকে অনেক বড় অপরাধি
মনে হচ্ছে। এখন আমার মোটেও কোন কিছু
চিন্তা করার সময় নাই। তাই তাড়াতাড়ি হসপিটালের দিকে
ছুটলাম।
হসপিটালেই ঢুকতেই চেনা অচেনা অনেকে আমার
দিকে উৎসুখ চোখে তাকিয়ে আছে। আমি
অপরাধির মতো ধীর পায়ে সামনে এগুচ্ছি। হঠাৎ
মাঝ বয়সি একজন লোক আমার সামনে এসে হাত
দরে কান্না করতে করতে বলছেন, বাবা তুমি এই
কাজটা না করলেও পারতে। আমার মেয়েটা বড্ড
জেদি। কোন কিছু করার আগে একটুও চিন্তা করে
না। আসলেই তো আমি এধরনের আচরন না
করলেই পারতাম। আমার শুনা উচিত ছিলো ও কি
বলতে চায়। এখন নিজের প্রতি অপরাধবোধ কাজ
করছে।
.
একজন ডাক্তার সামনে এসে আমার উদ্দেশ্যে
বলল ….
--আপনি কি সবুজ সাহেব?
--জ্বি, হ্যা।
--আপনি আসুন আমার সাথে।
কোন কথা না বলেই ডাক্তারের পিছন পিছন চললাম।
ডাক্তার সাহেব আমকে একটা কেবিন নিয়ে
ঢুকলেন। আমাকে ভিতরে রেখেই ডাক্তার সাহেব
কোন কিছু না বলে চলে গেলেন। এখন আমার
কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। সাজেদার সিটের
পাশে রাখা আছে একটি চেয়ার। কোন কিছু না
ভেবে সিটের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লাম।
এখন সাজেদার ঘুমন্ত নিস্পাপ চেহারে দেখে
কারো বুঝার ক্ষমতা নেই যে, এই মেয়ে কত্ত
বদ। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি সাজেদার ঘুমন্ত
চেহারার দিকে। আগের চেয়ে মুখটা কেমন
যেন মলিন লাগছে। এই মলিন মুখের প্রতি কেমন
যেন মায়া কাজ করছে। সিলিং ফ্যানের বাতাসে এক
গুচ্ছ চুল সাজেদার মুখে এসে পড়েছে। এই
মায়াবী চেহারায় চুল গুচ্ছ কেমন ব্যামানান লাগছে।
তাই হাত বাড়িয়ে চুল গুচ্ছ মুখের উপর থেকে
সরিয়ে নিলাম। আমার হাত সাজেদার মুখে লাগতেই
চোখ দু’টো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু
করলো। চোখ খুলেই সাজেদা আমাকে দেখে
আকাশ থেকে পড়ার মতো ভাঙ্গি নিয়ে চেয়ে
আছে আমার দিকে। সাজেদা এখানে আমার উপস্থিত
আশা করেনি। আমি লক্ষ করলাম সাজেদার চোখ
থেকে গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দেরী
না করে আমি তখন সাজেদার চোখের জল নিজ
হাতে মুছে দিলাম। সাজেদা তার হাত আমার দিকে
বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তার হাত ধরব কি ধরব না এইসব
কথা ভাবতে ভাবতে কখন সাজেদার হাত আমার হাতে
মুষ্টি বদ্ধ করলাম টেরই পেলাম না। সাজেদা তখন
কাপা কাপা কণ্ঠে উচ্চারন করছে ভালবাসি। আমি তখন
তার হাত আরো শক্ত করে মুষ্টি বদ্ধ করলাম। আমার
নিরবতা দেখে সাজেদা যা বুঝার তা বুঝে নিলো।
সাজেদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে অন্য দিকে
তার চোখের জল পড়ছে। আগের হাসি আর এই
হাসির মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। এই হাসি একটা
ছেলেকে প্রেমে আবদ্ধ করার জন্য যতেষ্ট।
.
.
.
হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা
বাজে। এখন আমাকে উঠতে হবে। বাসায় মা-বাবা,
সাজেদা সবাই মনেহয় আমার জন্য অপেক্ষা
করছে। পার্কের ব্যাঞ্চ থেকে উঠে বাসার
দিকে পা বাড়ালাম। কলিং বেল চাপতেই ছোট বোন
সুমি এসে দরজা খুলে দিলো। ..
--ভাইয়া সারাদিন কোথায় ছিলে? আজ তো তোমার
ছুটি ছিলো?
--একটা বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম।
--ও। তোমার জন্য বাসার সবাই চিন্তিত ছিলো। তাছাড়া
মোবাইল বন্ধ কেনো তোমার?
--চার্জ ছিলো না।
--হাত মুখ ধূয়ে এসো। আমি তোমাকে চা দিচ্ছি।
.
সুমির সাথে আর কথা না বাড়িয়ে আমার রুমে গেলাম।
আমি রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলাম সাজেদা
শুয়ে আছে। আমাকে দেখেই উঠে বসল।
--কোন উপায় পেয়েছো নাকি?
--হ্যা।
--তা, আমরা কবে নতুন বাসায় উঠছি?
--দু’তিন দিনের মধ্যে।
--আমাদের বাসটা কোথায়?
--এটা নাহয় স্প্রাইজ থাক।
--আচ্ছা। আমি স্প্রাইজ পছন্দ করি।
--
--আমি আমার আর তোমার কাপড় ব্যাগে গুছিয়ে
নিচ্ছি।
--আমার কাপড় ব্যাগে গুছাতে হবে না।
--আচ্ছা। তুমি নিজেই গুছিয়ে নিয়ো।
.
.
.
সকাল নয়টা।
.
ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো।
মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি বিদ্বান
সাহেবের ফোন।
.
--হ্যালো। (ঘুম ঘুম চোখে)
--হ্যালো। সবুজ সাহেব নাকি?
--হ্যা।
--আমি এডভোকেট বিদ্বান বলছি। আপনার সমস্ত
কাগজ পত্র তৈরী হয়ে গেছে। আপনি চাইলে
আজই আসতে পারেন।
--আচ্ছা।
.
মোবাইল পাশে রেখে ফিরতেই দেখতে
পেলাম সাজেদা ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত অবস্থায়
তাকে কী নিস্পাপ লাগছে। আমি একটু এগিয়ে
সাজেদার কপালে একটা চুমা অঙ্কন করে দিলাম।
কিছুক্ষন পরে হয়তো আমার আর এই অধিকারটুকু
থাকবে না। সাজেদাকে ঘুম থেকে তুলে বললাম
তৈরী হয়ে নেও, এই বাসা থেকে বের হওয়ার
সময় হয়ে গেছে। সাজেদা আমার কথা শুনে হাসি
মুখে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেছে। আমি
সাজেদার হাসি মুখের দিকে চেয়ে ভাবছি হয়তো
কিছুক্ষন পর এই হাসি বিষন্নতায় পরিনত হবে।
.
বাহিরে দাঁড়িয়ে সাজেদার জন্য অপেক্ষা করছি।
বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। অল্প
কিছুক্ষনের মধ্যেই সাজেদাকে দেখলাম মোটা
একটা স্যুট ক্যাস নিয়ে বাহিরে আসতে। আমি
সাজেদার হাত থেকে স্যুট ক্যাসটি নিয়ে গাড়ির
ব্যানের মধ্যে রাখলাম। পাশাপাশি গাড়িতে বসে আছি
আমি ও সাজেদা। সাজেদা অনেক খুশি হয়ে নানা
প্রশ্ন আমার দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। আমি এসব
প্রশ্নের তুয়াক্ষা না করে বাহিরের দিকে তাকিয়ে
আছি।
গাড়ি এসে থামল কোর্টে। সাজেদা আমার দিকে
কৌতুহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে বলছে এখানে থামালে
কেনো। আমি এর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম এখানে
কিছু কাজ আছে। সাজেদা আমার পিছনে পিছনে
আসছে। এখনো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে তার চেহারায়
অজানা এক চিন্তার চাপ। আমি গিয়ে বিদ্বান সাহেবের
চেম্বারে ঢুকলাম। বিদ্বান সাহেব আমাকে দেখেই
বললেন।
--আরে সবুজ সাহেব যে। আসুন,এখানে বসুন।
আমি হালকা মুখ প্রসারিত করে একটা হাসি দিয়ে বসে
পড়লাম। বিদ্বান সাহেব আবার বলতে শুরু করলেন,
--আবারো ভেবে দেখুন আপনার স্ত্রীকে
কী সত্যি সত্যি ডিভোর্স দিতে চান।
--আমি এই কয়েকদিনে অনেক ভেবেছি। এখন
আমাদের আলাধা হওয়াটাই ভালো হবে।
সাজেদা আমার দিকে আকাশ থেকে পড়ার মতো
ভাব নিয়ে বলতেছে,
--তুমি এসব কি বলতেছো সবুজ?
--তুমি যা চেয়েছিলে তা উনাকে বুঝাচ্ছি।
--আমি নাহয় ঐদিন রাগের মাথায় কথা গুলো বলে
ফেলেছি তাইবলে তুমি এই বিষয়টা সিরিয়াসলি নিবে?
--তুমি রাগের মাথায় বলছে, কিন্তু আমি তখন সিরিয়াস
ছিলাম সাজেদা। আর তুমি খুব ভালো করেই জানো
আমি সব কিছুই সিরিয়াসলি চিন্তা করি।
--ও! তাহলে তুমিও শুনে রাখো আমিও কিন্তু খুব
জেদি মেয়ে। তুমি কী চাইছো? ডিভোর্সই
তো? ওকে তোমাকে মুক্তি দিচ্ছি।
উকিল সাহেব আমাকে কোথায় সাইন করতে হবে?
.
সাজেদা ডিভোর্স পেপারে সাইন দিয়ে কান্না
করতে চলে গেছে। আমিও ডিভোর্স পেপারে
সাইন করে বেরিয়ে পড়লাম। নিজেকে আজ
অনেক সুখি মনে হচ্ছে। বাবার স্বপ্ন পূরন
করেছিলাম অনেক আগে কিন্তু এই স্বপ্ন
গুলোতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মরিচা পড়ে গেছে। আর
সেই মরিচা আজ আমি ছুটাতে পেরেছি।
সাজেদার সাথে দুই বছর প্রেম করার পর পারিবারিক
ভাবেই আমাদের বিয়ে হয়। এই দুই বছর অনেক
ঝগড়া খনসুটির মধ্যে দিয়েই আমাদের প্রেম নামক
অদৃশ্য বন্ধটি সামনের দিকে এগিয়ে চলছিলো।
কিন্তু বিয়ের পর থেকেই সাজেদা কেমন
যেনো হয়ে গেলো। সারাক্ষন শুধু ঝগড়াই
লেগে থাকত। আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ
লাগতো যখন সে আমার বাবার উপর অভিযোগ
দিতো। তার সাথে যদি আমি থাকতে হয় তাহলে আমি
আমার বাবা-মা ভাই বোন ছেড়ে নতুন ফ্লাটে তাকে
নিয়ে থাকতে হবে। তাই আজ থাকে ডীভোর্স
দিয়ে মুক্ত করে দিলাম। আমি কী ভাবে আমার
বাবাকে ছাড়ব, যে আমাকে মেডিকেলে ভর্তির
জন্য নিজের বাড়ি বিক্রি করে দু’লক্ষ টাকা দিয়েছে।
আমার মাকে কী ভাবে ছাড়ব যে, আমাকে দশ মাস
গর্ভে ধারন করেছে। যেখানে আমার ছোট
ভাইয়েরা সকাল বেলা টাই’এর নট বেঁধে অফিসে
যাওয়ার কথা ছিলো সেখানে প্রতিদিন সকাল উঠে
গ্যারেজে যেতে হচ্ছে, তাও আবার আমার জন্য।
আমার ছোট বোনকে কী ভাবে ছেড়ে থাকব,
আমার জন্য যার পড়ালেখা প্রাথমিক পর্যায়েই অসমাপ্ত
রয়েগেছে। তাদের তরে যদি আমার জীবনটা
উৎসর্গ করে দেই তবুও তাদের ঋন শুদ হবে না।
তাই আজ সাজেদাকেই আমার জীবন থেকে মুক্ত
করে দিলাম।
.
--স্যার বাসায় জাবেন না? (ড্রাইবার)
ড্রাইবারের ডাকে ধ্যন ভাঙ্গল।
--হ্যা বাসায় চলো।
.
.
লিখাঃ Robiul Hasan
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now