বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

দহন

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X [রিভিওঃ- আমি এখন চিনতে পেরেছি তাকে । চিনতে পারার সাথে সাথে ভয়ঙ্কর একধরনের ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে । সে এত বেশিবার আমার সাথে হেঁটেছে, কথা বলেছে, শুয়েছে আমার ছায়ার সাথে আমি ভুলে গেছি কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব । বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য] . . . ঝড় বৃষ্টির দিন । না, কথাটা যথার্থ হলো না । কারন বাইরের অবস্থা ভিন্ন । বাইরে যা হচ্ছে তার নাম মহাপ্রলয় ; কল্পান্ত, ব্রহ্মার অহোরাত্রের অবসান । বাড়ির সামনে কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার যে দুটি গাছ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে ছিলো এতোকাল ধরে, তারা নুয়ে পড়েছে দুইদিকে । আমগাছটাও ভেঙে পড়েছে পশ্চিমের টিনের চালার ঘরের উপর । কোন দিক থেকে একটা টিন উড়ে এসে নতুন মোচা আসা কলাগাছটাকে দুই ভাগ করে দিয়েছে । এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে আমাকে একা ফেলে সবাই কোথায় চলে গেছে ! হতবিহ্বল আমি দৌঁড়াতে আরম্ভ করলাম । ছুটতে ছুটতে একসময় চলে এলাম একটা খোলা মাঠে । চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম বিভিন্ন নাম ধরে । কিন্তু বাতাসের গায়ে বাধা পেয়ে বারবার ফিরে আসছিলো আমার সমস্ত চিৎকার । আমি আবার দৌঁড়াতে আরম্ভ করলাম । দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হঠাত খেয়াল করলাম আমার চারপাশে ঘন জঙ্গল । একটা গহীন সবুজ অরণ্য । এখানে আকাশ ছোঁয়া সব বৃক্ষ । বৃক্ষ এক, বৃক্ষ দশ, বৃক্ষ শতক । এখানে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর বনপথ । আকাশ জুড়ে বাজছে ঝড়ের জগঝম্প । তবলার মত, তানপুরার মত জলে জলে শব্দ তুলছে বৃষ্টির সঙ্গীত । একঝাঁক সবুজ এসে নিশ্বাসের মত মিশে যাচ্ছে ফুসফুসে, রক্তে, প্রাণে । সবুজের বুক চিরে রক্তাক্ত পায়ে আমি এসে থামলাম একটা প্রকান্ড বাড়ির দরজার সামনে । ভয়ে আড়ষ্ট অভিভূত আমি ক্রমাগত করাঘাত করতে করতে দরজায়। এক সময় ক্লান্ত পায়ে আমি ফিরে যাচ্ছিলাম আশাহত । এমন সময় দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম । শান্ত সৌম্য চেহারার একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে । শাদা পাঞ্জাবীর উপর কালো চাদর গায়ে মধ্যবয়সী একজন যুবক । এমন বিমর্ষ অনবদ্য নীল চোখ, মজবুত চোয়াল, এমন সুগঠিত শরীর । যেন ধুতি-পাঞ্জাবী-চাদরে দাঁড়ানো কোন গ্রীক দেবতা । ভেতরে এসো মীরা । এর আগেও অনেকে আমার নাম ধরে ডেকেছে আমাকে । কিন্তু একি অদ্ভুত অনুরণ তার কন্ঠস্বরে , একি সীমাহীন স্বপ্নজাগানো তার ধ্বনি ! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত ছোট ছোট পা ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে এলাম । ঢুকতেই মুখামুখি একটা বড় আয়না । মৃদু আলোয় আয়নায় আমি আমার অবয়ব দেখতে পেলাম । কর্ডের কাজ করা সবুজ শাড়ি, হাফ স্লিভ ব্লাউজ, গলায় সবুজ পুঁতির কন্ঠহার, সবুজ পাথর বসানো লতানো কানের দুল, কপালে লাল টিপ । যেন একখন্ড সবুজ দেহ । ‘জিজ্ঞেস করলে না যে, আমি কি করে তোমার নাম জানলাম ?’ এক হাজার বছরের বেশি আমি হেঁটেছি তোমার ছায়ার সঙ্গে, আমার নাম জেনেছ এই বা বিশেষ কি ; আরো বেশি কিছু জানো হয়তো । খুব ইচ্ছে হলো তাকে বলি মনের এই কথাটা । কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না । শুধু দেখে গেলাম ছোট ছোট প্রতিটা কাজে তার কি বাড়াবাড়ি রকমের যত্ন । বাতাসে টেবিলের ফুলদানিটা পড়ে গেছে, পড়ে গেছে তার ভেতরের পানিও ; সেটায় আবার পানি ভরে রাখা । পশ্চিমের দেয়ালের ওয়েল পেইন্টিংটা বাঁকা হয়ে আছে, সেটা ঠিক করে রাখা । দক্ষিণের জানালাটা খোলাই ছিল । ঝড়-বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে গেছে জানালার পর্দা । জানালাটা বন্ধ করে পর্দাটা গুছিয়ে রাখার মত তুচ্ছ কাজেও কি সীমাহীন সৌন্দর্য্য । তুমি কি একাই থাক ? চোখ তুলে তাকালো সে । মিষ্টি করে হাসলো । কি জানি কি অর্থ এই রহস্যময় হাসির ? একটু আগে যে ভয় আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিলো, বিমূঢ় করে রেখেছিলো, মনের কোনে কোনে এখন তার কোন অস্থিত্ব নেই । মনে হলো যা কিছু ঘটছে এর সবকিছুই স্বাভাবিক ; পূর্বনির্ধারিত । এসো বারান্দায় গিয়ে বসি । রহস্য উপন্যাসের মত প্যাচানো সিঁড়ি ভেঙ্গে বসার ঘর, লাইব্রেরী রুম পার হয়ে আমি যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, আমার মনে হলো এটা বারান্দা নয়, একটা ছাদ । এতো বড়, এতো প্রসস্থ । মাথার উপরের কাঁচ, ঘরের চারদিকে পানির মত টলটলে স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল, যেন একটা কাঁচের ঘর । এক কোনে সিডি প্লেয়ারে ক্রমাগত বেজে যাচ্ছে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গীত । বাইরের দিকে মুখ করে রাখা দুইটি চেয়ার । সামনেই কফির গরম জগ । আমি জানতাম তুমি আসবে । তাই এতো আয়োজন । আর কি কি জানো আমার সম্পর্কে ? অনেক কিছু । তোমার প্রিয় রঙ, প্রিয় পোশাক, তোমার ইচ্ছে । আরো কত কি । বলতো শুনি, কেমন জানো তুমি । পরীক্ষা নিবে ! তবে তাই নাও । তোমার প্রিয় রঙ সবুজ । গাছের পাতার মত, নিবিড় অরণ্যের মত । শাড়ি-ই তোমার পছন্দ । শাড়ির সাথে মানিয়ে চুড়ি । প্রায় তোমার ইচ্ছে করে কোন গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে । তোমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের চূঁড়ায় উঠে পৃথিবী দেখতে । একদিন সব কিছু ছেড়ে কোন এক উঁচু, অতিকায়, মহান এক পাহাড়ের টানে তুমি চলে যাবে বলে ভেবে রেখেছো । সে দিনটি হবে তোমার জন্মদিন । তোমাকে কি এর আগেও আমি দেখেছি কোথাও ? দেখেছ । পৌষের এক জ্যোৎস্না ভাঙ্গা রাতে, চৈত্রের ভয়ঙ্কর নির্জন দুপুরে শাহবাগের মোড়ে । তোমার প্রতিটা জন্মদিনে যখন তুমি শহরের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের ছাদে বসে একা একা কাঁদতে । খুব সকালে তোমার জানালার গায়ে যে মেঘ জমতো, সে সব মেঘের গায়ে । একাকীত্বের বিষন্নতায় একবার তুমি অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিলে । তারপরই তোমার মনে হয়েছিলো, জীবন সে কি অপার পাওয়া, সুখের কি অফুরন্ত সম্ভারময় এই জীবন । ভুলের অনুশোচনায় বারবার তোমার ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীতে ফিরে আসতে । তখন জীবনে ফিরে আসার সারাটা পথ জুড়ে তুমি আমারই হাত আঁকড়ে ধরে ছিলে । আমি এখন চিনতে পেরেছি তাকে । চিনতে পারার সাথে সাথে ভয়ঙ্কর একধরনের ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে । সে এত বেশিবার আমার সাথে হেঁটেছে, কথা বলেছে, শুয়েছে আমার ছায়ার সাথে আমি ভুলে গেছি কোনটা বাস্তব, কোনটা অবাস্তব । বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য । চলো ছাদে যাবে । আমি উঠে এসে তার হাত ধরলাম । স্প্রিঙের মতো প্যাঁচানো, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আঁটা অশেষ সিঁড়ি চোখের পলকে পাড়ি দিয়ে আমরা যেখানে এসে দাঁড়ালাম তোমরা তার কিছুই দেখনি । না পৃথিবীর কোন নর, কোন নারী এসেছে এখানে আগে । আকাশের কাছাকাছি ছাদ, কিংবা ছাদটাই একখন্ড অখন্ড আকাশ ; এত উঁচু । হাঁটু জলের মত এক হাঁটু ফেনায় ফেনায় মেঘ । যে একখন্ড ছাদের উপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি তার চারপাশে যা দেখতে পেলাম তা যেন বর্ণনার অতীত । বাক্যে রচনার উর্ধ্বে । অরণ্যের যে বৃক্ষগুলো আকাশ ছুঁয়েছিলো তাদের সবগুলো মাথা একে একে মিশে হয়েছে সবুজ প্লাবন । ছেলেটি আস্তে এসে আমার কানে কানে বললো, ‘দেখো তাদের রানীকে পেয়ে তারা কি অহঙ্কারীই না হয়ে উঠেছে’ । এমন সবুজ তারা পেলো কোথায় ? তোমার শড়ির আঁচলে, তোমার কন্ঠহারে, তোমার সবুজ দুলে । তুমি কেমন করে এলে এখানে ? যেমন করে তুমি এসেছো । ইট-কাঠের কদর্য পৃথিবীতে একটু নিশ্বাসের জায়গা হয়নি । এক রত্তি সবুজের অভাবে মরে যায় যে হৃদয়, যে প্রাণ ছেড়ে আসে জীবনের হাত, তারা তোমার- আমার মত অরণ্যের সবুজে আসে পূণর্জনমে । এই যে শুনুন ; শুনতে পাচ্ছেন ? ভিজে গেলেন তো ! এই যে আপনাকে বলছি ... এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না । ট্রেনের জানালায় হাতের উপর চিবুক রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে । বাতাসে উড়ছে ভেজা বিস্রস্ত চুল । চোখে এখনো লেগে আছে সেই বিনোদিনী স্বপ্ন । হাজার রাতের অন্ধকার নেমেছে বাইরে । কোথাও এতটুকু আলো নেই । সবকিছু গভীর কূপের ভয়ঙ্কর কালো জলের মত স্থির । ছুটছে শুধু ট্রেন । ভাসছি কেবল আমি । ট্রেনের সাথে সাথে ছুটে চলছে ২২টি বছরের অতীত । কিংবা অতীত খুলে দিয়েছে বর্তমানের দুয়ার । আমি তখন খুব ছোট । ৩-৪ বছর বয়স । মীরপুরে খুব ছোট একটা বাসায় আমরা থাকতাম । ও বাসায় আমাদের কোন বারান্দা ছিল না । কোন ছাদ ছিল না, ছিল না এক ফোঁটা উঠান । এসবের বদলে আমার মা ছিল । মায়ের আঁচলকে আকাশ ভেবে জড়িয়ে ধরে থাকতাম সারাক্ষণ । বাবার বুক ছিল মস্ত উঠান । অহোরাত্র দৌঁড়ালেও ফুরাতো না । তাদের সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মত অবিরাম ঝরতো আমার কথার মেঘমালা । কয়েক বছর পরে আমরা বনানীর বড় একটা বাসায় চলে এলাম । এখানের সব কিছুই বেশি রকমের বড় । প্রয়োজনের তুলনার প্রচুর । চারদিকে খোলা বারান্দা, দিগন্তের মত মস্ত বড় ছাদ, অফুরন্ত উঠান । এতো কিছুর মাঝে ধীরে ধীরে আমি হারিয়ে ফেললাম যা কিছু পুরানো । এতো বড় উঠানে একা ছুটাছুটি করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম । এতটুকু আমি, এক রত্তি একটা মেয়ে, আকাশের মত বিরাট ছাদে বড্ড একা লাগতো আমার । আমার সমস্ত গল্প একে একে জমতে শুরু করলো আমার ঘরের দেয়ালে, জানালার কাঁচে, দামী আসবাবপত্রের স্তুপে । আপনিও একটা নিন না । পাটিসাপ্টা পিঠা । আমার মা বানিয়ে দিয়েছেন । না, না ; আমি কিছু খাবো না এখন । আরে নিন ; নিন । বিয়ের পর প্রথম বার বাড়ি গিয়েছিলাম । বিয়ে হয়েছে ছয় মাস হয়ে গেছে । ও একটা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার । তাই ছুটি পায়না একদম । একটা পিঠা নিলাম হাতে । আমার সামনের সীটে এই যে মেয়েটি বসে আছে, সাধারণ একটা মেয়ে । দেখলেই বোঝা যায় নতুন বিয়ে হয়েছে । পাশেই বসে তার স্বামী ঘুমাচ্ছে । কি সুখী চেহারা মেয়েটির ! কিসে একটি মানুষ সুখী হয় ? বনানীতে আমাদের প্রকান্ড বাড়ি আমাকে কখনো এতটুকু সুখী করতে পারেনি । শহরের ব্যাস্ততম সড়কের পাশে সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের উপর আকাশের কাছাকাছি একটা ফ্লাট আমাকে একটুকু স্বস্তি এনে দিতে পারেনি । ছোট বেলায় পাশের বাড়ির টুকুর মতো একটা খেলনা গাড়ির খুব লোভ হয়েছিল । বাবা আমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে গাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন । সেদিনের আনন্দের কথা আমার অহোরাত্র জানে । এখন প্রতি বছর নতুন নতুন মডেলের গাড়ি কেনা হয় আমার জন্য । কিন্তু সেই লাল-সবুজ খেলনা গাড়ি, আমার আনন্দ দেখে বাবার চোখের সেই মুগ্ধতা আমায় কেউ ফিরিয়ে দিবে না । প্রায় রাতে বাবার কোলে মাথা রেখে রূপকথার গল্পের ডালিমকুমার আর অচিনপূরের রাজকু্মারীর গল্প শুনে গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে থাকার মত নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসার দিন-রাত আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিবে না । দুঃখগুলো পেকে ঝুনো নারকেল হয়েও খসে পড়ে না কেন ? অথচ সুখের বেলায় ঠিক উল্টোটা । টুসটুসে হওয়ার আগেই অবেলায় আঁকশিতে হ্যাঁচকা টান । জীবন এমন কেন ? প্রাণটাকে একলা ফেলে সুখের হাত ধরে পালিয়ে যায় স্বার্থপরের মত । কোথায় যাবেন আপনি ? সামনের সীটে বসা মেয়েটি কৌতুহলি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । নিবীড়ভাবে তাকিয়ে দেখছে আমার অবয়ব । বাইরে যে ঝড় বইছে তার প্রলয় বিনাশ করে দিচ্ছে আমার চুলের বিন্যাস । হউক; ট্রেনের জানালাটা তারপরও বন্ধ করেতে ইচ্ছে করছে না । জানি না । একেবারে দক্ষিণে গিয়ে থামবো । শুনেছি সাগরে পা ভিজালে মন শান্ত হয় । মেয়েটা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে । থাকুক, অবিশ্বাসের সম্মুখীন হলেই মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয় । আমি আবার জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে বসলাম । এটা আমার দ্বিতীয় জীবন । কাল রাতের ঘটনার গ্লানী মুছে যেত যদি আমার শরীর থেকে প্রাণটা টাওয়ারের সতের তলায় নিঃশেষ হয়ে যেত, আফিমের ধোয়ার মত । কিংবা পাখির পালকের মত উড়ে উড়ে মাটিতে এসে মিশত আমার ৪৫ পাউন্ড ওজনের শরীরটা । জানি না কি হলো আমার । মনে হলো মৃত্যু মানেই তো হারিয়ে যাওয়া । আড়াল হয়ে যাওয়া । অপরিচিত পৃথিবীতে জন্ম নেয়া । মন্দ কি, আমি যদি আর না ফিরি এই গুরুত্বহীন জগতে । অনেক সময় নিয়ে গোসল করলাম । শরীরের যেখানে যেখানে জন্তুর ছোঁয়া লেগেছে সেখানে ধুয়ে মুছে সাফ করার ব্যর্থ চেষ্টা । শাওয়ারের নীচে কিছুক্ষণ মন হালকা করে কাঁদলাম । শেষ যেবার পারিবারিক ভ্রমণে প্যারিস গিয়েছিলাম সেখান থেকে কিছু দামি অর্ন্তবাস আর সুগন্ধী কিনেছিলাম । ওসবের মোড়ক খুললাম । আয়নার সামনে বসে সময় নিয়ে সাজলাম । তারপর ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে যেন সেই সমুদ্রপারের কাহিনী । তারপর জীবনানন্দের একটা কবিতা পড়লাম । অশান্ত হাওয়ার বুকে তবু আমি বনের মতন জীবনেরে ছেড়ে দিছি! — পাতা আর পল্লবের মতো জীবন উঠেছে বেজে শব্দে — স্বরে; যতবার মন ছিঁড়ে গেছে, হয়েছে দেহের মতো হৃদয় আহত যতবার — উড়ে গেছে শাখা, পাতা পড়ে গেছে যত — পৃথিবীর বন হয়ে — ঝড়ের গতির মতো হয়ে, বিদ্যুতের মতো হয়ে আকাশের মেঘে ইতস্তত; একবার মৃত্যু লয়ে — একবার জীবনের লয়ে ঘূর্ণির মতন বয়ে যে বাতাসে ছেঁড়ে — তার মতো গেছি বয়ে ! কাল রাতে যে লোকটি আমার সারা শরীর তরতাজা গোলাপের পাঁপড়ির মত রগড়েছে, সে আমার বাবার ব্যাবসায়ী বন্ধু । সে ফ্লাটে এসেছিলো বাবার খোঁজে, যদিও সে জানত বাবা এখানে থাকে না । সে জানত এখানে আমার শত চিতকারেও কোন প্রতিকার হবে না । এর আগেও ফ্যামেলী পার্টিতে আমি তার কামনার্ত কুৎসিত দৃষ্টি দেখেছি । দেখেছি আমার বুকে তার দৃষ্টির লালা গড়াতে । আমি জেনে গেছি এই শহরের মানুষ আমার শরীর দেখেছে কেবল, শরীরের আড়ালে পর্দানশীন আমার এক রত্তি হৃদয় দেখার সময় হবেনা তাদের । বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে । আমার শরীর অনেকটাই ভিজে গেছে । হাওয়ার বেগে ছুটছে ট্রেন । আর ট্রেনের গতির বিপরীতে আমি ফেলে আসছি আমার অতীত । -ইয়াসির আরাফাত-


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ "দহন"
→ দহন [কষ্ট নামের বাঁগিচা]
→ দহন
→ দহন
→ আত্মদহন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now