বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১ম পর্ব)
# হুমায়ূন_আহমেদ
.
.
.
.
.
মাঝরাতের দিকে রানুর ঘুম ভেঙ্গে গেল।
তার মনে হলোছাদে কে যেন হাঁটছে। সাধারণ
মানুষের হাঁটা নয়, পা টেনে টেনে হাঁটা। সে
ভয়ার্ত গলায় ডাকল, ‘এই, এই।’ আনিসের ঘুম ভাঙল
না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অল্প-অল্প
বাতাস। বাতাসে জামগাছের পাতায় অদ্ভুদ এক
রকমের শব্দ উঠছে। রানু আবার ডাকল, ‘এই, একটু
ওঠ না। এই।’
‘কী হয়েছে?’
‘কে যেন ছাদে হাঁটছে।’
‘কী যে বল! কে আবার ছাদে হাঁটবে? ঘুমাও
তো।’
‘প্লীজ, একটু উঠে বস। আমার বড় ভয় লাগছে।’
আনিস উঠে বসল। প্রবল বর্ষণ শুরু হলো এই
সময়। ঝমঝম করে বৃষ্টি। জানালার পর্দা বাতাসে
পতপত করে উড়তে লাগল। রানু হঠাৎ দেখল,
জানালার শিক ধরে খালিগায়ে একটি রোগামতো
মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির দুটি হাতই অসম্ভব
লম্বা। রানু ফিসফিস করেবলল, ‘ওখানে কে?’
‘কোথায় কে?’
‘ঐ যে জানালায়।’
‘আহ কী যে ঝামেলা কর! নারকেল গাছের ছায়া
পড়েছে।’
‘একটু বাতিটা জ্বালাও না।’
‘রানু তুমি ঘুমোওতো।’
আনিস শোবার উপক্রম করতেই ছাদে বেশ
কয়েক বারথপাথপ শব্দ হলো। যেন কেউ-এক
জন ছাদে লাফাচ্ছে।
রানু চমকে উঠে বলল, ‘কিসের শব্দ?’
‘বানর। এ জায়গায় বানর আছে। কালই তো
দেখলে ছাদে লাফালাফি করছিল।
‘আমার বড় ভয় করছে। একটু উঠে গিয়ে বাতিটা
জ্বালাও না। পায়ে পড়ি তোমার।’
আনিস বাতি জ্বালাল। ঘড়িতে বাজে দেড়টা। ছাদে
আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবু রানুর
ভয় কমল না।
সে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল।
আনিস বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এরকম করছ কেন?’
‘কেন জানি অন্য রকম লাগছে আমার। একটা খুব
খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।’
‘কীস্বপ্ন?’
‘দেখলাম আমি যেন….
কথার মাঝখানে হঠাৎ রানু থেমে গেল। কে
যেন হাসছে। ভারি গলায় হাসছে। রানু কাঁপা স্বরে
বলল, ‘হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছ? কে যেন
হাসছে।’
‘কে আবার হাসবে। বানরের শব্দ। কিংবা কেউ
হয়তো জেগে উঠেছে দোতলায়।’
আনিস লক্ষ্য করল, রানু খুব ঘামছে। চোখ-মুখ
রক্তশূণ্য। বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের
প্যাকেট বের করল। দেশলাই জ্বালাতে-জ্বালা
তেবলল, ‘কী স্বপ্ন দেখেছিলে?’
‘দিনের বেলা বলব।’
‘কী যে সব কুসংস্কার তোমাদের! এখনো ভয়
লাগছে?’
‘হ্যাঁ।
‘ভয়টা কিসের? চোর-ডাকাতের, না ভূতের?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে বাতি জ্বালানোই থাক। বাতি জ্বালিয়েই
ঘুমাব আজকে। এখন বল দেখি কী স্বপ্ন
দেখলে?’
‘দিনের বেলা বলব।’
‘আহ্ বল না! বললেই ভয় কেটে যাবে।’
রানু আনিসের বাঁ হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
থেমে-থেমে বলল, ‘দেখলাম, একটা ঘরে
আমি শুয়ে আছি।একটা বেঁটে লোক এসে
ঢুকল। তারপর দেখলাম, সে আমার শাড়ি টেনে
খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।’
আনিস শব্দ করে হাসল।
রানু বলল, ‘হাসছ কেন?’
‘হাসব না? এটা কিএকটা ভয় পাওয়ার স্বপ্ন?’
‘তুমি তো সবটা শোনো নি।’
‘সবটা শুনতে হবে না। পরে কী হবে তা আমার
জানা। তুমি যা দেখেছ তা হচ্ছে একটা সেক্সুয়াল
ফ্যান্টাসি। যুবক-যুবতীরা এ রকম স্বপ্ন প্রায়ই
দেখে।’
‘আমি দেখি না।’
‘তুমিও দেখ। মনে থাকে না তোমার।’
‘আমি স্বপ্ন খুব কম দেখি। যা দেখি তা সব সময়
সত্যি হয়। তোমাকে তো বলেছি অনেক বার।’
আনিস চুপ করে রইল। রানু এই কথাটি প্রায়ই বলে।
বিয়ের রাতে প্রথম বার বলেছিল। আনিস সেবারও
হেসেছে। রানু অবাক হয়ে বলেছে, ‘আপনি
আমার কথা বিশ্বাস করলেন না, না?’
‘নাহ।’
‘আমি আমি আপনার গা ছুঁয়ে বলছি, বিশ্বাস করুন আমার
কথা।’
রানু এমনভাবে বলল, যেন আনিসের বিশ্বাসের
উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আনিস শেষ
পর্যন্ত হাসি মুখে বলল, ‘ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম,
এখন দয়া করে আপনি-আপনি বলবে না।’রানু ফিসফিস
করে বলল, ‘আপনার সঙ্গে যে আমার বিয়ে
হবে, সেটাও আমি জানতাম।’
‘এটাও স্বপ্নে দেখেছিলে?’
‘হুঁ। দেখলাম, একটি লোক খালিগায়ে দাঁড়িয়ে
আছে। তার পেটের কাছে একটা মস্ত কাটা দাগ।
লোকটিকে দেখেই আমার মনে হলো, এর
সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আমি তাকে বললাম,
কেটেছে কীভাবে? আপনি বললেন,
‘সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা
পেয়েছিলাম।’
আনিস সে রাতে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা
বলতে পারে নি। তার পেটে কেটা কাটা দাগ সত্যি-
সত্যি আছে, এই মেয়েটির সেটি জানার কথা নয়।
তবে সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কাটে নি।
জামগাছ থেকে পিছলে পড়ে কেটেছে।
ব্যাপারটা কাকতালীয়, বলাই বাহুল্য। মাঝে-মাঝে
এমন দুই-একটা জিনিস খুব মিলে যায়। তবুও কোথায়
যেন একটা ক্ষীণঅস্বস্তি থাকে।
বাইরে বৃষ্টি খুব বাড়ছে। ঝড়টর হবে বোধহয়।
শোঁ-শোঁ আওয়াজ হচ্ছে জানালায়। একটি কাঁচ
ভাঙ্গা। প্রচুর পানি আসছে ভাঙ্গা জানালা দিয়ে,
শীত-শীতকরছে।
‘রানু চল ঘুমিয়ে পড়ি।’
‘সিগারেট শেষ হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
বিছানায় ওঠামাত্র প্রবল শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল। বাতি
চলে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু এ অঞ্চল নয়,
সমস্ত ঢাকাই বোধ করি অন্ধকার হয়ে গেল।
আনিস বলল, ‘ভয় লাগছে রানু?’
‘হ্যাঁ।
‘আচছা একটা হাসির গল্পটল্প কর। এতে ভয় কমে
যায়। বল একটা গল্প।’
‘তুমি বল।’
আনিস দীর্ঘ সময় নিয়ে এক জন পাদ্রী ও তিনটি
ইহুদি ও তিনটি মেয়ের গল্প বলল। গল্পের এক
পর্যায়ে শ্রোতাকে জিজ্ঞেস করতে হয়–
পাদ্রী তখন কী বলল?
এরউত্তরটি হচ্ছে পাঞ্চ লাইন, কিন্তু কিচ্ছু
জিজ্ঞেস করল না রানু। সে কি শুনছে না? আনিস
ডাকল, ‘এই রানু, এই!’ রানু কথা বলল না। বাতাসের
ঝাপটায় সশব্দে জানালারএকটি পাল্লা খুলে গেল।
আনিস বন্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়াতেই রানু তাকে
জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল, ‘তুমি যেও না।
খবরদার, যেও না!’
‘কী আশ্চর্য, কেন?’
‘একটা-কিছু জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।’
‘কী যে বল!’
‘প্লীজ, প্লীজ।’
রানু কেদে ফেলল। ফোঁপাতে-ফোঁপাতে
বলল, ‘তুমি গন্ধ পাচ্ছ না?’
‘কীসের গন্ধ?’
‘কর্পূরের গন্ধের মতো গন্ধ।’
এটা কি মনের ভুল? সু্ক্ষ্ম একটা গন্ধ যেন পাওয়া
যাচ্ছে ঘরে। ঝনঝন করে আরেকটা কাঁচ ভাঙল।
রানু বলল, ‘ঐ জিনিসটা হাসছে। শুনতে পাচ্ছ না?’
বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আনিস কিছু শুনতে পেল না।
‘তুমি বস তো। আমি হারিকেন জ্বালাচ্ছি।’
‘না তুমি আমাকে ধরে বসে থাক।’
আনিস অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তুমি ঐ জানালাটার
দিকে আর তাকিও না তো!’ আনিস লক্ষ্য করল, রানু
থরথর করে কাঁপছে, ওর গায়ের উত্তাপও
বাড়ছে।রানুকে সাহস দেবার জন্যে সে বলল,
‘কোনো দোয়া-টোয়া পড়লে লাভ হবে?
আয়াতুল কুর্সি জানি আমি। আয়াতুল কুর্সিপড়ব?’
রানু জবাব দিল না। তার চোখ বড়-বড় হয়ে উঠছে।
মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে নাকি? শ্বাস ফেলছে
টেনে-টেনে।
‘এই রানু, এই।’
কোনোই সাড়া নেই। আনিস হ্যারিকেন জ্বালাল।
রান্নাঘর থেকে খুটখুট শব্দ আসছে। ইঁদুর, এতে
সন্দেহ নেই। তবু কেন জানি ভালো লাগছে না।
আনিস বারান্দায় এসে ডাকল, ‘রহমান সাহেব, ও রহমান
সাহেব।’ রহমান সাহেব বোধহয় জেগেই
ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেরুলেন।
‘কী ব্যাপার?’
‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
‘কী হয়েছে?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘হাসপাতালে নিতে হবেনাকি?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘আপনি যান, আমি আসছি। এক্ষুণি আসছি।’
আনিস ঘরে ফিরে গেল। মনের ভুল,
নিঃসন্দেহে মনের ভুল। আনিসের মনে হলো
সে ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র কেউ-
এক জন যেন দরজার আড়ালে সরে পড়ল।
রোগা, লম্বা একটি মানুষ। আনিস ডাকল, ‘রানু।’
রানুতৎক্ষণাৎ সাড়া দিল, ‘কি?’
ইলেকট্রিসিটি চলে এল তখনই। তার কিছুক্ষণের
মধ্যেই রহমান সাহেব এসে উপস্থিতহলেন।
উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ‘এখন কেমন অবস্থা?’
রানু অবাক হয়ে বলল, ‘কিসের অবস্থা? কী
হয়েছে?’
রহমানসাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। আনিস বলল,
‘তোমার শরীর খারাপ করেছিল, তাই ওঁকে
ডেকেছিলাম। এখন কেমন লাগছে?’
‘ভালো।’
রানু উঠে বসল। রহমান সাহেবের দিকে
তাকিয়েমৃদু স্বরে বলল, ‘এখন আমি ভালো।’
রহমান সাহেব তবু মিনিট দশেক বসলেন। আনিস
বলল, ‘আপনি কি ছাদে দাপাদাপি শুনেছেন?’
‘সে তো রোজই শুনি। বাঁদরের উৎপাত।’
‘আমিও তাই ভাবছিলাম।’
‘খুব জ্বালাতন করে। দিনে-দুপুরে ঘর থেকে
খাবারদাবার নিয়ে যায়।’
‘তাই নাকি?’
‘জ্বি। নতুন এসেছেন তো! কয়েক দিন যাক
টের পাবেন। বাড়িঅলাকে বলেছিলাম গ্রিল দিতে।
তা দেবে না। আপনার সঙ্গে দেখা হলে আপনিও
বলবেন। সবাই মিলে চেপে ধরতে হবে।’
‘জ্বি, আমি বলব। আপনি কি চা খাবেন না কি এক কাপ?’
‘আরে না না! এই রাত আড়াইটার সময় চা খাব নাকি,
কী যে বলেন! উঠি ভাই। কোনো অসুবিধা
হলে ডাকবেন।’
ভদ্রলোকউঠে পড়লেন। রানু চাপা স্বরে বলল,
‘এই রাত-দুপুরে ভদ্রলোককে ডেকে
আনলে কেন? কী মনে করলেন উনি!’
‘তুমি যা শুরু করেছিলে! ভয় পেয়েই ভদ্র
লোককে ডাকলাম।’
‘কী করেছিলাম আমি?’
‘অনেক কান্ড করেছ। এখন তুমি কেমন, সেটা
বল।’
‘ভালো।’
‘কী রকম ভালো?
‘বেশ ভালো।’
‘ভয় লাগছে না আর?’
‘নাহ।’
রানু বিছানা থেকে নেমে পড়ল। সে বেশ সহজ
ও স্বাভাবিক। ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই
চোখে-মুখে। শাড়ি কোমরে জড়িয়ে ঘরের
পানি সরাবার ব্যবসা করছে।
‘সকালে যা করার করবে। এখন এসব রাখ তো।’
‘ইস, কী অবস্থা হয়েছে দেখ না!’
‘হোক, এস তো এদিকে।’
রানু হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে এল।
‘এখন আর তোমার ভয় লাগছে না?’
‘না।’
‘জানালার ওপাশে কে যেন দাঁড়িয়েছিল
বলেছিলে?’
‘এখন কেউ নেই। আরথাকলেও কিছু যায় আসে
না।’
আনিস দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরাল। হালকা গলায় বলল,
‘এক কাপ চা করতে পারবে?’
‘চা, এত রাতে!’
‘এখন আর ঘুম আসবে না, কর দেখি এক কাপ।’
রানু চা বানাতে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি
ফোটার শব্দ হলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম
করে। রানু একা-একা রান্নাঘরে। কে বলবে এই
মেয়েটিই অল্প কিছুক্ষণ আগে ভয়ে অস্থির
হয়ে গিয়েছিল! ছাদে আবার ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছে।
এই বৃষ্টির মধ্যে বানর এসেছে নাকি? আনিস উঠে
গিয়ে রান্না ঘরে উঁকি দিল। হালকা গলায় বলল,
ছাদেবড় ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে?’ রানু জবাব দিল না।
আনিস বলল, ‘এই বাড়িটা ছেড়ে দেব।’
‘সস্তায় এ রকম বাড়ি আরপাবে না।’
‘দেখি পাই কি না।’
‘চায়ে চিনি হয়েছে তোমার?’
‘হয়েছে। তুমি নিলে না?’
‘নাহ, রাত-দুপুরে চা খেলে আমার আর ঘুম হবে
না।’
রানু হাই তুলল।আনিস বলল, ‘এখন বল তো তোমার
স্বপ্ন-বৃত্তান্ত।’
‘কোন স্বপ্নের কথা?’
‘ঐ যে স্বপ্ন দেখলে! একটা বেঁটে লোক।’
‘কখন আবার এই স্বপ্ন দেখলাম? কী যে
তুমিবল!’
আনিস আর কিছু বলল না। চা শেষ করে ঘুমুতে
গেল। শীত-শীত করছিল। রানু পা গুটিয়ে বাচ্চা
মেয়ের মতো শুয়েছে। একটি হাত দিয়ে
জড়িয়ে রেখেছে আনিসকে। তার ভারি নিঃশ্বাস
পড়ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ হয়। জানালায়
নারকেল গাছের ছায়া পড়েছে। মানুষের মতোই
লাগছে ছায়াটাকে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে।
মনে হচ্ছে মানুষটি হাত নাড়ছে। ঘরের ভেতর
মিষ্টি একটা গন্ধ। মিষ্টি, কিন্তু অচেনা।
আনিস রানুকে কাছে টেনে আনল। রানুর মুখে
আলো এসে পড়েছে। কী যে মায়াবতী
লাগছে! আনিস ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।
ওদের বিয়ে হয়েছে মাত্র ছ’ মাস। আনিস
এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। প্রতি রাতেই রানুর
মুখ তার কাছে অচেনা লাগে। অপরুপ রুপবতী
একটি বালিকার মুখ, যাকে কখনো পুরোপুরি চেনা
যায় না। আনিস ডাকল, ‘রানু, রানু।’ কোনো জবাব
পাওয়া গেল না। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন রানু। আনিসের
ঘুম এল না। শুয়ে-শুয়ে ঠিক করে ফেলল,
রানুকে ভাল একজন সাইকিয়াট্রিস্ট্রের কাছে নিয়ে
যেতে হবে। অফিসেরকমলেন্দুবাবু এক
ভদ্রলোকের কথা প্রায়ই বলেন, খুব নাকি গুণী
লোক। মিসির সাহেব। দেখালে হয় একবার মিসির
সাহেবকে।
রানু ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হেসে উঠল।
অপ্রকৃতিস্থ মানুষের হাসি শুনতে ভাললাগে না, গা
ছমছম করে।
ভদ্রলোকের বাড়ি খুঁজে বের করতে অনেক
দেরি হলো। কাঁঠালবাগানের এক গলির ভেতর
পুরোনো ধাঁচের বাড়ি। অনেকক্ষণ কড়া নাড়বার
পর অসম্ভব রোগা এক ভদ্রলোক বেরিয়ে
এলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, ‘কাকে চান?’
‘মিসির সাহেবকেখুঁজছি।’
‘তাকে কী জন্যে দরকার?’
‘জ্বি, আছে একটা দরকার। আপনি কি মিসির সাহেব?’
‘হ্যাঁ। বলেন, দরকারটা বলেন।’
রাস্তায় দাড়িয়ে সমস্যার কথা বলতে হবে নাকি?
আনিস অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কিন্তু
ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি এ রকম যে, বাইরেই দাঁড়
করিয়ে রাখবেন,ভেতরে ঢুকতে দেবেন না।
আনিস বলল, ‘ভেতরে এসে বলি?’
‘ভেতরে আসবেন? ঠিক আছে আসুন।’
মিসির সাহেব যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় দরজা থেকে
সরে দাঁড়ালেন। ঘন অন্ধকার।তিন-চারটা বেতের
চেয়ার ছাড়া আসবাব পত্র কিছু নেই।
‘বসুন আপনি।’
আনিস বসল। ভদ্রলোক বললেন, ‘আজ আমার
শরীরটা ভালো না। আলসার আছে। ব্যাথা হচ্ছে
এখন। তাড়াতাড়ি বলেন কি বলবেন।’
‘আমার স্ত্রীর একটা ব্যাপারেআপনার কাছে
এসেছি। আপনার নাম শুনেই এসেছি।’
‘আমারনাম শুনে এসেছেন?’
‘জ্বি।
‘আমার এত নাম ডাক আছে, তা তো জানতাম না!
স্পেসিফিক্যালি বলুন তো কার কাছে শুনেছেন?’
আনিস আমতা-আমতা করতে লাগল। ভদ্রলোক
অসহিষ্ণু স্বরে বললেন, ‘বলুন, কে বলল?’
‘আমাদের অফিসের এক ভদ্রলোক।
কমলেন্দুবাবু। আপনি নাকি তার বোনেরচিকিৎসা
করেছিলেন।’
‘ও আচ্ছা,চিনেছি, কমলেন্দু। শোনেন, আমি
ডাক্তার না, জানেন তো?’
‘জ্বি স্যার, জানি।’
‘আচ্ছা আগে এক কাপ চা খান, তারপর কথা বলব।
রুগীটি কে বললেন?’ আপনার স্ত্রী?’
‘জ্বি।
‘বয়স কত?’
‘ষোল-সতের।’
‘বলেন কী! আপনার বয়স তো মনে হয়
চল্লিশের মতো, ঠিক না?’
আনিস শুকনো গলায় বলল, ‘আমার সাঁইত্রিশ।’
‘এমন অল্প বয়সি মেয়েকে বিয়ে করেছেন
কেন?’
এটা আবার কেমন প্রশ্ন। আনিসের মনে হলো,
কমলেন্দুবাবুর কথা শুনে এখানে আসাটা ঠিক হয় নি।
ভদ্রলোকের নিজেরই মনে হয় মাথার ঠিক
নেই। একজন অপরিচিত মানুষকে কেউ এ রকম
কথা জিজ্ঞে করে?’
‘বলুন বলুন, এরকম অল্পবয়েসী মেয়ে বিয়ে
করলেন কেন?’
‘হয়ে গেছে আর কি।’
‘বলতে চান না বোঝা যাচ্ছে। ঠিক আছে,
বলতে হবে না। চা‘র কথা বলে আসি। চা খেয়ে
তারপর শুরু করব।
ভদ্রলোক আনিসকে বাইরে বসিয়ে ভেতরে
চলে গেলেন। তারপর আর আসার নামগন্ধ নেই।
আট-ন’ বছরের একটি বাচ্চা মেয়েমেয়ে এক
কাপ দারুণ মিষ্টি সর-ভাসা চা দিয়ে চলে গেল। তারপর
আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। দেখতে-
দেখতে সন্ধ্যা হয়েযায় । আনিস বেশ
কয়েকবার কাশল। দুই বার গলা উঁচিয়ে ডাকল, ‘বাসায়
কেউ আছেন?’ কোনো সাড়া নেই। কী
ঝামেলা!
কমলেন্দুবাবু অবশ্য বারবার বলে দিয়েছেন-এই
লোকের কথাবার্তার ঠিকঠিকানা নেই। তবে
লোকটা অসাধারণ। আনিসের কাছে অসাধারণ কিছু
মনে হয় নি। তবে চোখের দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ।
এইটি অবশ্য প্রথমেই চোখে পড়ে। আর
দ্বিতীয় যেজিনিসটি চোখে পড়ে, সেটি
হচ্ছে তার আঙ্গুল। অস্বাভাবিক লম্বা-লম্বা তার সব
ক‘টা আঙ্গুল।
‘এই যে, অকেক্ষণ বসিয়ে রাখলাম।’
‘না, ঠিক আছে।’
‘ঠিক থাকবে কেন? ঠিক না।’
লোকটি এই প্রথম বার হাসল। থেমে-
থেমেবলল, ‘আলসার আছে তো, ব্যথায় কাহিল
হয়ে শুয়েছিলাম। অমনি ঘুম এসে গেল।’
‘আমি তাহলে অন্য একদিন আসি?’
‘না, এসেছেন যখন বসুন। চা দিয়েছিল?’
‘জ্বি।’
‘বেশ, এখন বলুন কী বলবেন?’
আনিস চুপ করে রইল। এটা এমন একটা ব্যাপার, যা চট
করে অপরিচিত কাউকে বলা যায় না। ভদ্রলোক
শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর মাথারঠিক
নেই, তাই তো?’
‘জ্বি-না স্যার, মাথা ঠিক আছে।’
‘পাগল নন?’
‘জ্বি-না।’
‘তাহলে আমার কাছেএসেছেন কেন?’
‘মাঝে-মাঝে সে অস্বাভাবিক আচরণ করে।’
‘কী রকম অস্বাভাবিক?’
‘ভয় পায়। মাঝে-মাঝেই এ রকম হয়।’
‘ভয় পায়? তার মানে কী? কিসের ভয়?’
‘ভূতের ভয়।’
‘ঠিক জানেন ভয়টা ভূতের?’
‘জ্বি-না, ঠিক জানি না। মনে হয় এ রকম।’
ভদ্রলোক একটি চুরুট ধরিয়ে খকখক করে
কাশতে-কাশতে বললেন, ‘বর্মা থেকে
আমারএক বন্ধু এনছে, অতি বাজে জিনিস।’ আনিস
কিছু বলল না।তবে এই ভদ্র লোকের স্টাইলটি তার
পছন্দ হলো। ভদ্রলোকঅবলীলায় অন্য একটি
প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। এবং এমনভাবে কথা
বলছেন, যেন আগের কথাবার্তা তাঁর কিছুই মনে
নেই।
‘এ রকম চুরুট চার-পাঁচটা খেলে যক্ষ্মা হয়ে
যাবে। আপনাকে দেব একটা?’
‘জ্বি-না।’
‘ফেলে দিলে মায়া লাগে বলে খাই। খাওয়ার জিনিস
না। অখাদ্য। তবে হাভানা চুরুটগুলি ভালো হয়। হাভানা
চুরুট খেয়েছেন কখনো?’
‘জ্বি-না।
‘খুব ভালো। মাঝে-মাঝে আমার এক বন্ধু
আমাকে দিয়ে যায়।’
ভদ্রলোক চুরুটে টান দিয়ে আবার ঘর কাঁপিয়ে
কাশতে লাগলেন। কাশি থামতেই বললেন, ‘এখন
আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। যথাযথ
উত্তর দেবেন।
‘জ্বি আচ্ছা।’
‘প্রথম প্রশ্ন, আপনার স্ত্রী কি সুন্দরী?’
‘জ্বি।’
‘বেশ সুন্দরী?’
‘জ্বি।’
‘আপনার স্ত্রী কখন ভয় পান-রাতে না দিনে?’
‘সাধারণত রাতে। তবে একবার দুপুরে ভয়
পেয়েছিল।’
‘ভয়টা কী রকম সেটা বলেন।’
‘মনে হয় কিছু-একটা দেখে।’
‘সব বার কি একই জিনিস দেখে না একেক বার
একেক রকম?’
‘এটা আমিঠিক বলতে পারছি না।’
‘এই সময় তিনি কি কোনো রকম গন্ধ পান?’
‘আমি ঠিক বলতে পারছি না।’
‘যখন সুস্থহয়ে ওঠেন তখন কি তাঁর ভয়ের কথা
মনে থাকে?’
‘বেশিরভাগ সময়ই থাকে না, তবে মাঝে-মাঝে
থাকে।’
‘আপনার স্ত্রীর স্বাস’্য নিশ্চই খারাপ।’
‘জ্বি।
‘উনি প্রথম কখন ভয় পেয়েছিলেন, বলতে
পারেন?’
‘জ্বি-না। তবে খুব ছোটবেলায়।
‘প্রথম ভয়ের ঘটনাটা আমাকে বলুন।’
‘আমি সেটা ঠিক জানি না।’
‘আপনি অনেক কিছুই জানেন না মনে হচ্ছে।
আপনার স্ত্রীকে একদিন নিয়ে আসুন।’
আনিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি
তাকে আনতে চাই না।’
‘কেন চান না?’
‘সে খুব সেনসিটিভ। সে যদি টের পায় যে, তার
অস্বাভাবিকতা নিয়ে আমি লোকজনের সাথেঘ
আলাপ করছি, তাহলে খুব মন-খারাপ করবে।’
‘দেখুন ভাই, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কথা না-
বলে কিছুই করা যাবে না। আপনার স্ত্রী অসুস্থ
এবং আমার মনে হচ্ছে এই অসুখ দ্রুত বেড়ে
যাবে। আপনি তাঁকে নিয়ে আসবেন।’
আনিস উঠে দাঁড়াল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আপনাকে কত দেব?’
ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কমলেন্দবাবু
কি আপনাকে বলেননি আমি ফিস নিই না? এই কাজটি
আমি শখের খাতিরে করি, বুঝতে পারছেন?’
‘জ্বি পারছি।’
‘তবে আপনি যদি ভালো গোলাপের চারা পান,
তাহলে আমাকে দিতে পারেন।
আমারগোলাপের খুব শখ। সব মিলিয়ে ত্রিশটি
ডিফারেন্ট ভেরাইটির চারা আমার কাছে আছে।
একটা আছে দারুন ইন্টারেস্টিং, ঘাসফুলের মতো
ছোট সাইজের গোলাপ।’
‘তাই নাকি?’
‘জ্বি। ওরা বলে মাইক্রো রোজ। হল্যান্ডের
গোলাপ। কড়া গন্ধ। দেখবেন?’
‘আরেক দিন দেখব। আজ দেরি হয়ে গেছে,
আমার স্ত্রী একা থাকে।’
‘ও, তাই নাকি? শোনেন, একা তাকে রাখবেন না।
কখনো যেন মেয়েটি একা না থাকে। এটা খুবই
জরুরি।’
রাস্তায় নেমে আনিসের মন খারাপ হয়েগেল।
খামোকা সময় নষ্ট। লোকটি তেমন কিছুই জানে
না। কমলেন্দুবাবু যে সব আধ্যাত্মিক শক্তিটক্তির
কথা বলেছেন, সে সব মনে হয় নেহায়েতই
গালগল্প। তবে লোকটির কথাবার্তা বেশ
ফোর্সফুল। রানুকে বুঝিয়েসুঝিয়ে এক বার
এনে দেখালে হয়। ক্ষতি তো কিছু নেই।
তাছাড়া ভদ্রলোক খুব সম্ভব ফ্যালনাও নন।
ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রির টীচার। একেবারে কিছু না-
জেনে তো কেউ মাষ্টারি করে না। কিছু নিশ্চই
জানেন। মানুষের চেহারা দেখে কিছু অনুমান
করাটাও ঠিক না।
আনিস অফিসে চলে গেলে রানুর খুব একলা
লাগে। কিছুই করার থাকে না। গোছানো আলনা
আবার নতুন করে গোছায়। বসার ঘরের বেতের
সোফা ঝাড়ন দিয়ে ঝাড়ে। শোবার মেঝে
ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মুছতে-মুছতে চকচকে
করে ফেলে, তবু সময় কাটে না। এক সময়
তেতলার বারান্দায় গিয়ে বসে। এ-বাড়ির ছোট
বারান্দাটি তাঁর খুব পছন্দ। গ্রিল দেওয়া বারান্দাটি
গোলাকার। এখানে বসে অনেক দূর পর্যন্ত
দেখা যায়। সামনেই একটা মেয়েদের স্কুল।
টিফিন টাইমে মেয়েগুলোর কান্ডকারখানা
দেখতে এমন মজা লাগে! রানু প্রায় সারা দুপুর
বারান্দাতেই বসে থাকে। একা-একা ঘরে বসে
থাকতে ভারোলাগে না। কেমন যেন নিঃশ্বাস বন্ধ
হয়ে আসে। একটু যেনভয়ভয়ও লাগে।
অবশ্য যখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে থাকে,
তখন ভয়ভয় ভাবটা কমে যায়। বিকেলবেলা
বাড়িঅলার মেয়ে ুদটি তাদের ভেতরের দিকের
বাগানে বসে মজা করে চা খায়। চা খেতে-
খেতে দুইজনেই খুব হাসাহাসি করে। একেক দিন
ওদের বাবাও সঙ্গে বসেন, রানুর দেখতে বেশ
লাগে।
ছোট মেয়েটির সঙ্গে রানুর কিছু দিন আগে
আলাপ হয়েছিল। বেশ মেয়েটি! খুব স্মার্ট।
দেখতেও সুন্দর। একদিন দুপুরে রানু বারান্দায়
এসে বসেছে, মেয়েটি এসে উপস্থিত। মুখে
চাপা হাসি। হাতে কী-একটা বই। এসেই বলল,
‘আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি।’
‘কি কথা?’
‘আপনিসারাদিন বারান্দায় বসে থাকেন কেন?’
‘সারাদিন কোথায়? দুপুরবেলায় বসি। কিছু করার নেই
তো, একা একা লাগে।’
‘তা ঠিক। বসব আপনার এখানে? আজ আমি
কলেজে যাই নি। বোটানি প্র্যাকটিক্যাল ছিল
আজকে।’
মেয়েটি খুব সহজভাবে বসল। ঘন্টাখানেকের
মধ্যে একগাদা কথা বলল। তারপর যাবার সময় হঠাৎ
বলল, ‘আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘কর।’
‘আপনি এত সুন্দর কেন? যে আমার চেয়ে
সুন্দরী, তাকে আমার ভালো লাগে না।
রানু কী বলবে ভেবে পেলনা। মেয়েটি
হাসতে-হাসতে বলল, ‘আমাদের ক্লাসের
মেয়েদের কি ধারণা, জানেন? তাদের ধারণা, আমি
হচ্ছি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা।
ওদের এক দিন এনে আপনাকে দেখিয়ে দেব।
‘ঠিক আছে, দিও। আরেকটু বস। চা খাবে?’
‘না আমি চা বেশি খাই না। বেশি চা খেলে গায়ের
রঙ ময়লাহয়ে যায়।’
মেয়েটি যেমন হুট করে এসেছিল, তেমনি হুট
করে নিচে নেমে গেল। বেশ লাগল রানুর।
মালিবাগের বাসাটার মতো নয়। নিঃশ্বাস নেবার জায়গা
ছিল না সেখানে। পাশ দিয়ে রাত-দিন রিকশা যাচ্ছে,
গাড়ি যাচ্ছে। প্রথম দিনেই আনিসকে বলেছেন,
‘আমার বাড়ি ভাড়া দেবার দরকার নেই। টাকার জন্যেই
তো বাড়ি ভাড়া। টাকা যথেষ্ট আছে। তবুদুই ঘর
ভাড়াটে রাখি। কারণ এত বড় বাড়িতে মানুষ না-থাকলে
ভালো লাগে না। কবরখানা-কবরখানা ভাব চলে
আসে। তবেসবাইকে আমি বাড়ি ভাড়া দিই না।
আপনাকে দিচ্ছি, কারণ আপনাকে পছন্দ হয়েছে।
ভাড়াও খুব কম। মাত্র ছয় শ’ টাকা। তিন-রুমের এত
বড় একটা বাড়ি ছয় শ’ টাকায় পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
রানু এখানে এসে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তার
সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে বাথরুম। বড় ঝকঝকে
একটা বাথরুম। বাসাটা রানুর খুব পছন্দ হয়েছিল। আনিস
যখন বলল, ‘কি, নেব? পছন্দ হয়?’
‘হয়।’
‘ভালো করে ভেবে বল নেব কি না। দুই দিন পর
যদি বল পছন্দ না, তাহলে মুশকিলে পড়ব।
মালিবাগের বাসাটা ভালো ছিল। শুধু-শুধু বদলালাম।’
‘এই বাসাটাও ভালো।’
রানু খুব খুশি মনে নতুন বাসা সাজাল। নিজেই পরদা
কিনে আনল, সারা রাত জেগে সেলাই করল। তার
উৎসাহের সীমা নেই।
‘বুঝলে রানু, সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে।
অন্যদের বাসা যা-েটাবে। একা-একা থাকার
অভ্যেসটা ভালো না। যাবে তো?’
‘যাব।’
‘একা থাকলেই মানুষের মধ্যে নানান রকম
প্রবলেম দেখা যায়, বুঝলে? সব ভাড়াটেদের
সঙ্গে খাতির রাখবে।’
‘ভাড়াটে তো মাত্র এক জন।’
‘ঐ ওনার বাসাতেই যাবে। বাড়িঅলার বাসায়ও যাবে।’
‘আচ্ছা, যাব।’
রানু অবশ্যি যায় নি কোথাও। তাঁর ভালো লাগে না।
অন্যদের মতো সে কারো সঙ্গে সহজভাবে
মিশতে পারে না। অন্যদের সামনে কেমনযেন
আড়ষ্ট লাগে। বারান্দার বেতের চেয়ারটাতে
বসে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। দুপুরটাই যা
কষ্টের। দুপুরটা কেটে গেলেই অন্যরকম
একটা শান্তি লাগে। কিন্তু আজকের দুপুরটা দীর্ঘ।
কিছুতেই আর কাটছে না। বারান্দায় বসে থাকতেও
ভালো লাগছে না। মেয়েদের স্কুলটাও কী
কারনে যেন বন্ধ। চারদিকে চুপচাপ। বড্ড ফাঁকা।
কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলে কেমন হয়?
ঘরের ভেতরটা কেমন যেন অন্য রকম। রানু
ভেতরে ঢুকে জানালার পর্দা ফেলে দিল।
অনেকখানি অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকার ও
চুপচাপ। আর তখন স্পষ্ট গলায় কেউ ডাকল, ‘রানু,
রানু।’ কয়েক মূহুর্ত রানু নড়ল না। অপেক্ষা করতে
লাগল। কিন্তু যে ডেকেছে সে দ্বিতীয়বার
আর ডাকল না।
রানুর এ রকম চারদিকের নিস্তব্ধতার মধ্যে এক জন
অশরীরী কেউ তাকে ডেকে ওঠে।
অসংখ্যবার শুনেছে এই ডাক। কে সে!
কোত্থেকে আসে সে! রানু ফিসফিস
করেবলল, ‘কে?’ কোনো জবাব পাওয়া গেল
না।
‘কে তুমি?’
জানালার পরদাটা শুধু কাঁপছে। বিকেল হয়ে আসছে।
রানু ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলে বারান্দায় এসে
দাঁড়াল। নিচের বাগানে বাড়িঅলার বড় মেয়েটি
হাঁটছে। নীলু বোধহয় ওর নাম। এই মেয়েটি তার
বোনের মতো নয়। গম্ভীর। কথাবার্তা প্রায়ই
বলেই না। তবুও ওকে দেখলেই রানুর মনে হয়-
মেয়েটিবড় ভালো। মায়াবতী মেয়ে।
রানু দেখল-বিষণ্ন ভঙ্গিতে মেয়েটি একা-একা
বসে আছে। তার ইচ্ছা হল নিচে নেমে ওর
সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু সে গেল না।
.
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now