বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
২
আকাশ ফুটো হয়ে গেছে।
প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সাথে আলোকসজ্জা। ঘনঘন বিজলী চমকাচ্ছে। মীকাইল ফেরেসতাকে সৃষ্টিকর্তা কি নির্দেশ দিয়েছেন অনুমিত করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন থেকে এরকম বৃষ্টি হয় নি। হুড়মুড় করে আকাশ ভেঙ্গে পড়া বৃষ্টি।
বারান্দায় বসে বসে আমি বৃষ্টি দেখছিলাম। বাসায় কেউ নেই। আমার স্ত্রী বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে তিন দিনের সফরে গেছে। গন্তব্যস্থল তার বাবারবাড়ী। যাওয়ার সময় কিছু কড়া কথাও শুনিয়ে গেছে। একজন মধ্যবয়স্ক অসুস্থ মানুষের সাথে এক ছাদের তলায় ভালোবাসাবাসি করা তার পক্ষে অসহ্য। মৃত্যু পথযাত্রীর সাথে থাকাতো আরও ভয়ানক। আমার স্ত্রী চায় না, আমার অকাল মৃত্যুতে তার বাচ্চারা গভীর শোক পাক। বাচ্চা-কাচ্চাদের কচি মনে শোকের বাতাস লাগলে তারা মানুষ হতে পারবে না। তার ধারনা অসময়ে পিতৃহারা ছেলেরা মানুষ হয় না। গুন্ডা হয়। রাত দুপুরে রাস্তাঘাটে খুন-খারাবী করে বেড়ায়। এরশাদ শিকদারের বাবা নাকি বাল্যকালে মারা গেছে।
আশ্চর্য!
আমার একটুও খারাপ লাগছে না। বউ-বাচ্চাছাড়া জীবনটা মন্দ যাচ্ছে না। একা একা থাকার মাঝে গভীর জীবনবোধ আছে। আমি সেই বোধের সন্ধান পাচ্ছি তিনদিন থেকেই। ক্যান্সারের সাথে বসবাস করছি। কিছুদিনের মধ্যেই কুলহীন সাগরে পাড়ী জমাব। ভজঘন্ট পৃথিবীতে আর থাকতে হবে না ভেবেই ভালো লাগছে। মনের মাঝে একটা স্ফুর্তি স্ফুর্তি ভাব চলে এসেছে। আমি গুনগুন করে গাইলাম,
‘ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে...’
ঘরের চাবি ভাঙ্গার কি আছে বুঝলাম না। তালা ভাঙ্গা যেতে পারে অথবা দেয়াল। কবিদের মন বোঝা বড় দায়।
আমি কবিদের মন বোঝার মতো মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মাই নি। আমাকে একজন মেথর সম্প্রদায়ের মানুষ বুঝতে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।
গল্পকথক ভোলানাথ একজন মেথর। লোকটাকে আমি কিছুদিন থেকে দেখছি। সিটি কর্পোরেশনের পেশাদার লোক। কয়েকদিন আগেই চাকুরী পেয়েছে। আমাদের মহল্লার দায়িত্বে আছে।
চেহারা ভদ্রলোকের মতো দেখে বাসায় ডেকে এনেছি। বাথরুমের সেফটি ট্যাঙ্কটা পরিষ্কার করাব বলে। অনেক কাজের লোক। সেফটি ট্যাঙ্কের কথা বলতেই রাজী হয়ে গেল। দুই একদিন পরেও আসতে পারত। তা করে নি। আগাম না জানিয়েই আজকে বৃষ্টির দিনে এসেছে। এসেই সেফটি ট্যাঙ্কটা খুলে রেখেছে। আমি দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। মেথররা সেফটি ট্যাঙ্ক খুলে তাতে কেরোসিন ঢেলে রাখে। তাতে দুর্গন্ধ অনেকটা কমে যায়। ভোলানাথ কোরোসিন ঢালে নি। কাজটা যে খুব আগ্রহ করছে তাও মনে হচ্ছে না। নাক কুচকানো দেখেই মনে হচ্ছে এই লোক সেফটি ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের জন্য পৃথিবীতে আসে নি। কেন এসেছে সেটা ধাধা।
আমার সামনেই মাটিতে বসে আছে ভোলানাথ। মুখ থেকে ভকভক করে মদের গন্ধ আসছে। চেলা মদের মতো গন্ধ। মেথরদের একমাত্র শক্তি মদ। প্রচলিত আইনে জমি কিনতে পারে না তাই উপার্জনের সমস্ত অর্থ এরা মদ আর নারীর পেছনে ঢালে। মদ না খেলে নেশা হবে না। নেশা না হলে সেফটি ট্যাঙ্ক পরিষ্কার হবে না। নেশা করার পর এরা কবর থেকেও লাশ তোলে। আমাদের গ্রামে একবার একটা খুন হলো। একটা সুন্দরী তরুনীকে কেটে দুই টুকরো করা হয়েছে। দাফন করার তিনদিন পর পুলিশ আসল। লাশ তুলতে হবে। নতুন করে পোস্ট মর্টেম হবে। এক মেথর প্রচুর মদ্যপানের পর কবরে নামল। কবরে নেমেই তার নেশা চরম আকার ধারন করল। কবর থেকে লাশ উঠল কিন্তু মেথর উঠবে না। তার শেষ ইচ্ছা, খালি কবরে যেন তাকে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। কবর নাকি খুব ঠান্ডা। এসির মতো ঠাণ্ডা। তার বাড়ীতে এসি নেই।
যারা নিজেরা গোছানোভাবে সুন্দর কথা বলতে পারে না, তাদের একটা বদভ্যাস থাকে। অন্যদের ডেকে ডেকে গল্পের আসর বসানো। আমি নিজে এই শ্রেনীর। সাজিয়ে কথা বলতে পারে বলে কাজের আগে ভোলাকে ডেকে গল্প করছি। ভোলা সাজিয়ে গল্প বানাতে পারে।
ভোলার গল্প শেষে জিজ্ঞাসা করলাম,
‘ডাক্তার মতিন কিসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? কিছু বুঝতে পারলাম না।’
ভোলা বলল,
‘ডাক্তারী ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।’
‘কেন?’ আমি চোখ সরু করে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘এটা এমন আর কি যে ডাক্তারী ছেড়ে দেওয়া লাগবে? হর-হামেশায় তো ঘটছে ব্যাপারগুলো?’
আমি ভোলার দিকে তাকালাম। তার চোখগুলো টকটকে লাল। চেলা মদের গুন। নেশা জমে যাচ্ছে। ভোলা চোখ বন্ধ করল,
‘অবশ্যই ঘটছে। কিন্তু সব ঘটনার গতিপথ এক হবে কি?’
‘তা হবে না। কিন্তু সামান্য একটা লিউকেমিয়ার রোগী দেখে তো আর দুঃখে এমন একটা পেশা ছেড়ে দেওয়া যায় না।’
ভোলা একটু কাছে এসে বসল,
‘যায় না কে বলেছে। কারো কারো কাছে যায়। এরা পৃথিবীর সত্যিকারের রুপটা বুঝতে পারে। প্রচন্ড সাহসী আর একরোখা হয় এরা। এদের কাছে ডাক্তারীও যা মেথরিগিরিও তা।’
আমি মাথা ঝাকাতে শুরু করলাম।
‘এই কথা মানা যায় না, তবুও খটকা লাগছে।’
ভোলা কিছুক্ষন সেফটি ট্যাঙ্কটার দিকে তাকিয়ে থাকল। আস্তে করে উত্তর দিল,
‘খটকা লাগারই কথা। আমারও লেগেছিল। সুদর্শন তরুন একটা ছেলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। অপেক্ষার মুহুর্ত বড় কষ্টকর। এই কষ্ঠ দেখতেও কষ্ট। অপেক্ষা শুরুর আগেই ডিউটি ডাক্তার সেই কষ্ঠ দূর করে দিয়েছে। ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে বাতাস ভরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই রাতেই তরুনটির অপেক্ষার মুহুর্ত ফুরিয়েছে।’
আমি হাহা করে হেসে উঠলাম। সটান হয়ে শুয়ে পড়লেন রকিং চেয়ারে। দীর্ঘদিন যাবত তিনি নিজেও ক্যান্সারে ভুগছি। কোলন ক্যান্সার। এই টাইপের ক্যান্সার অভিজাত সম্প্রদায়ের। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর কোলন ক্যান্সার বিখ্যাত হয়ে গেছে। অভিজাত শ্রেনীতে নাম লিখিয়েছে। আমি বললেন,
‘বাহ! বেশ ভালো গল্প। ডাক্তার সাহেব সাইকো রোগী ছিলেন। মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর মৃত্যুর অপেক্ষা সহ্য করতে পারতেন না। রোগীর কষ্টের কথা ভেবে পরোপকার করেছেন। রোগীকে মেরে ফেলেছেন। ডাক্তার সাহেব সমাজ সেবী সাইকো রোগী। তুমি কি সাইকো বোঝ? সহজ ভাষায় বলা হয় মাথায় গণ্ডগোল।’
ভোলা কন্ঠটাকে গম্ভীর করল। একটু কাছে এসে বলল,
‘অসম্ভব। ডাক্তার মতিন সাইকো রোগী হতে পারে না। সব কিছু সাজানো গোছানো ছিল। সেদিনের হাসপাতালের হাজিরা খাতায় ডাঃ মতিনের জায়গায় ডাঃ কাদেরের স্বাক্ষর ছিল। পুলিশ ডাঃ কাদেরকে ধরে ফেলে। কিছু টাকা খাইয়ে ওয়ার্ড বয়কে মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য করেছিল মতিন।’
আমি হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। কিছু একটা ঘটছে। খুব অগোচরে। বোঝা যাচ্ছে না। তবে কাজটা যে খুব গোছানো তা বুঝতে আমার দেরী হলো না। আমি উৎকন্ঠা মাখানো কন্ঠে বললাম,
‘তুমি কিভাবে জানো এতো কিছু। আমার মনে হচ্ছে এটা কোন গল্প নয়।’
ভোলার চোখগুলো ধক করে জ্বলে উঠল। হিসহিস করে উঠল তার গলা। দাড়িয়ে পড়ল। এগিয়ে আসল আমার দিকে। ভরাট গলায় বলল,
‘নিজের গল্প সে নিজে জানবে না তা কি করে হয়?’
আমি বিস্ময়ে ফেটে পড়লাম। দ্রুত বুঝতে পারলাম কি ঘটতে যাচ্ছে। সুদর্শন তরুনের ব্যাপারটা ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একজন সাইকো রোগীর মানসিক যন্ত্রনার উপশম। সাইকো রোগীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো একই ঘটনা এরা বারবার ঘটানোর চেষ্ঠা করবে। সুদর্শন তরুনটিরও ক্যান্সার ছিল, আমারও আছে। দুজনই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আজকের ঘটনা কি একই সুত্রে গাথা হচ্ছে? হতেও পারে।
ভোলানাথ আমার দিকে আরো এগিয়ে আসছে। আমি প্রচন্ড ভয়ে চিৎকার করে বললাম,
“তুমি কে?’
হীম শীতল গলায় ভোলা উত্তর করল,
‘তাতে কি আসে যায়? ভোলানাথকে নিশ্চয় ডাঃ মতিন ভাববেন না। একজন মেথর কি ডাঃ মতিন হতে পারে?’
আমি আবার প্রচণ্ড জোরে চিৎকার ছেড়ে বললাম,
‘পারে...... হতে পারে......।’
আমার গলার শব্দ শুনে আমি নিজে ভয় পেয়ে গেলাম। শব্দের পরিবির্তে শুধু ফিসফিস করে বাতাস বের হচ্ছে মনে হল। আশেপাশে কেউ নেই। চিৎকার দিয়েও লাভ নেই। কেউ আসবে না এই সময়। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। অন্ধকারে ডুবে আছে মহল্লা। সেফটি ট্যাঙ্ক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আশেপাশের মানুষজনকে কোটি টাকা দিলেও আসবে না। কেউ জানবে না এখানে কি ঘটছে। নাটকের জন্য সুন্দর একটা সাজানো সেট। কেউ নিপুন হাতে সাজিয়েছে। আমি অপেক্ষা করছি। ভোলা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সে মিথ্যা বলে নি। তার চোখে স্পষ্ট পরিচয়। ডাক্তার মতিন। ডাঃ মতিন আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছি। হাতে একটা শাবল। সেফটি ট্যাঙ্ক খুলতে এই শাবল ব্যবহার করা হয়।
৩
ডায়েরীর পাতা বন্ধ করলেন হাশেম আলী। ডায়েরীটা তার ব্যাঙ্কার বন্ধু জয়নাল সাহেবের।
তিনি আশ্চর্য হয়ে আছেন।
এটা কিভাবে সম্ভব? একজন মানুষ এই রকম কঠিন পরিস্থিতিতে ডায়েরী কিভাবে লিখবে?
তিনি ঘটনার স্বপক্ষে যুক্তি খুজতে শুরু করলেন। অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য তিনি কোন যুক্তি জানেন না।
তিনি ছাত্রাবস্থায় বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না।
হাশেম আলী ডায়রীটা পেয়েছেন জয়নালের রকিং চেয়ারের নিচে। পুলিশের চোখ এড়িয়ে খুব সাবধানে তুলে নিয়েছেন। ডায়েরীটা খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল।
কয়েকদিন আগে তার একমাত্র ব্যাঙ্কার বন্ধু জয়নাল খুন হয়। খুন হয়েছে নিজের বাসায়। রকিং চেয়ারে লাশটা পড়ে ছিল। মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখে বোঝা যায়, আঘাতটা রডের। শাবল-টাবল কিছু একটা হতে পারে।
(শুভম)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now