বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রথম রাতে বিনোদিনীকে
পটলডাঙার বাসায় রাখিয়া মহেন্দ্র
যখন তাহার কাপড় ও বই আনিতে
বাড়ি গেল, বিনোদিনী তখন
কলিকাতার বিশ্রামবিহীন
জনতরঙ্গের কোলাহলে একলা বসিয়া
নিজের কথা ভাবিতেছিল।
পৃথিবীতে তাহার আশ্রয়স্থান
কোনোকালেই যথেষ্ট বিস্তীর্ণ
ছিল না, তবু তাহার এক পাশ
তাতিয়া উঠিলে আর একপাশে
ফিরিয়া শুইবার একটুখানি জায়গা
ছিল–আজ তাহার নির্ভরসথল অত্যন্ত
সংকীর্ণ। সে যে নৌকায় চড়িয়া
স্রোতে ভাসিয়াছে, তাহা দক্ষিণে
বামে একটু কাত হইলেই একেবারে
জলের মধ্যে গিয়া পড়িতে হইবে।
অতএব বড়োই স্থির হইয়া হাল ধরা
চাই, একটু ভুল, একটু নাড়াচাড়া
সহিবে না। এ অবস্থায় কোন্ রমণীর
হৃদয় না কম্পিত হয়। পরের মন সম্পূর্ণ
বশে রাখিতে যেটুকু লীলাখেলা
চাই, যেটুকু অন্তরালের প্রয়োজন, এই
সংকীর্ণতার মধ্যে তাহার অবকাশ
কোথায়। একেবারে মহেন্দ্রের
সহিত মুখোমুখি করিয়া তাহাকে
সমস্ত জীবন যাপন করিতে প্রস্তুত
হইতে হইবে। প্রভেদ এই যে
মহেন্দ্রের কূলে উঠিবার উপায়
আছে, কিন্তু বিনোদিনীর তাহা
নাই।
বিনোদিনী নিজের এই অসহায়
অবস্থা যতই সুস্পষ্ট বুঝিল ততই সে
মনের মধ্যে বলসঞ্চয় করিতে
লাগিল। একটা উপায় তাহাকে
করিতেই হইবে, এ ভাবে তাহার
চলিবে না।
যেদিন বিহারীর কাছে বিনোদিনী
নিজের প্রেম নিবেদন করিয়াছে,
সেদিন হইতে তাহার ধৈর্যের বাঁধ
ভাঙিয়া গেছে। যে উদ্যত চুম্বন
বিহারীর মুখের কাছ হইতে সে
ফিরাইয়া লইয়া আসিয়াছে, জগতে
তাহা কোথাও আর নামাইয়া
রাখিতে পারিতেছে না, পূজার
অর্ঘ্যের ন্যায় দেবতার উদ্দেশে
তাহা রাত্রিদিন বহন করিয়াই
রাখিয়াছে। বিনোদিনীর হৃদয়
কোনো অবস্থাতেই সম্পূর্ণ হাল
ছাড়িয়া দিতে জানে না–
নৈরাশ্যকে সে স্বীকার করে না।
তাহার মন অহরহ প্রাণপণ বলে
বলিতেছে, “আমার এ পূজা
বিহারীকে গ্রহণ করিতেই হইবে।”
বিনোদিনীর এই দুর্দান্ত প্রেমের
উপরে তাহার আত্মরক্ষার একান্ত
আকাঙ্ক্ষা যোগ দিল। বিহারী
ছাড়া তাহার আর উপায় নাই।
মহেন্দ্রকে বিনোদিনী খুব ভালো
করিয়াই জানিয়াছে, তাহার উপরে
নির্ভর করিতে গেলে সে ভর সয়
না–তাহাকে ছাড়িয়া দিলে তবেই
তাহাকে পাওয়া যায়, তাহাকে
ধরিয়া থাকিলে সে ছুটিতে চায়।
কিন্তু নারীর পক্ষে যে নিশ্চিন্ত
বিশ্বস্ত নিরাপদ নির্ভর একান্ত
আবশ্যক, বিহারীই তাহা দিতে
পারে। আজ আর বিহারীকে
ছাড়িলে বিনোদিনীর একেবারেই
চলিবে না।
গ্রাম ছাড়িয়া আসিবার দিন
তাহার নামের সমস্ত চিঠিপত্র নূতন
ঠিকানায় পাঠাইবার জন্য
মহেন্দ্রকে দিয়া বিনোদিনী
স্টেশনের সংলগ্ন পোস্ট-আপিসে
বিশেষ করিয়া বলিয়া আসিয়াছিল।
বিহারী যে একেবারেই তাহার
চিঠির কোনো উত্তর দিবে না, এ
কথা বিনোদিনী কোনোমতেই
স্বীকার করিল না–সে বলিল, “আমি
সাতটা দিন ধৈর্য ধরিয়া উত্তরের
জন্য অপেক্ষা করিব, তাহার পরে
দেখা যাইবে।”
এই বলিয়া বিনোদিনী অন্ধকারে
জানালা খুলিয়া গ্যাসালোকদীপ্ত
কলিকাতার দিকে অন্যমনে চাহিয়া
রহিল। এই সন্ধ্যাবেলায় বিহারী এই
শহরের মধ্যেই আছে–ইহারই
গোটাকতক রাস্তা ও গলি পার হইয়া
গেলেই এখনই তাহার দরজার কাছে
পৌঁছানো যাইতে পারে–তাহার
পরে সেই জলের কলওয়ালা ছোটো
আঙিনা, সেই সিঁড়ি, সেই সুসজ্জিত
পরিপাটি আলোকিত নিভৃত ঘরটি–
সেখানে নিস্তব্ধ শান্তির মধ্যে
বিহারী একলা কেদারায় বসিয়া
আছে–হয়তো কাছে সেই
ব্রাহ্মণবালক, সেই সুগোল সুন্দর
গৌরবর্ণ আয়তনেত্র সরলমূর্তি
ছেলেটি নিজের মনে ছবির বই লইয়া
পাতা উল্টাইতেছে–একে একে
সমস্ত চিত্রটা মনে করিয়া
স্নেহেপ্রেমে বিনোদিনীর
সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ পুলকিত হইয়া
উঠিল।
ইচ্ছা করিলে এখনই যাওয়া যায়,
ইহাই মনে করিয়া বিনোদিনী
ইচ্ছাকে বক্ষে তুলিয়া লইয়া খেলা
করিতে লাগিল। আগে হইলে হয়তো
সেই ইচ্ছা পূর্ণ করিতে সে অগ্রসর
হইত; কিন্তু এখন অনেক কথা
ভাবিতে হয়। এখন শুধু বাসনা
চরিতার্থ করা নয়, উদ্দেশ্য সিদ্ধ
করিতে হইবে। বিনোদিনী কহিল,
“আগে দেখি বিহারী কিরূপ উত্তর
দেয় তাহার পরে কোন্ পথে চলা
আবশ্যক, স্থির করা যাইবে।” কিছু
না বুঝিয়া বিহারীকে বিরক্ত
করিতে যাইতে তাহার আর সাহস
হইল না।
এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যখন
রাত্রি নয়টা-দশটা বাজিয়া গেল,
তখন মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আসিয়া
উপস্থিত। কয়দিন অনিদ্রায়
অনিয়মে অত্যন্ত উত্তেজিত
অবস্থায় সে কাটাইয়াছে; আজ
কৃতকার্য হইয়া বিনোদিনীকে
বাসায় আনিয়া একেবারে অবসাদ ও
শ্রান্তিতে তাহাকে যেন অভিভূত
করিয়া দিয়াছে। আজ আর
সংসারের সঙ্গে নিজের অবস্থার
সঙ্গে লড়াই করিবার বল যেন
তাহার নাই। তাহার সমস্ত
ভারাক্রান্ত ভাবী জীবনের
ক্লান্তি যেন তাহাকে আজ আগে
হইতে আক্রমণ করিল।
রুদ্ধ দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া ঘা
দিতে মহেন্দ্রের অত্যন্ত লজ্জাবোধ
হইতে লাগিল। যে উন্মত্ততায় সমস্ত
পৃথিবীকে সে লক্ষ্য করে নাই, সে
মত্ততা কোথায়। পথের অপরিচিত
লোকদের দৃষ্টির সম্মুখেও তাহার
সর্বাঙ্গ
সংকুচিত হইতেছে কেন।
ভিতরে নূতন চাকরটা ঘুমাইয়া
পড়িয়াছে–দরজা খোলাইতে অনেক
হাঙ্গাম করিতে হইল। অপরিচিত
নূতন বাসার অন্ধকারের মধ্যে
প্রবেশ করিয়া মহেন্দ্রের মন
দমিয়া গেল। মাতার আদরের ধন
মহেন্দ্রের চিরদিন যে বিলাস-
উপকরণে, যে-সকল টানাপাখা ও
মূল্যবান চৌকি-সোফায় অভ্যস্ত,
বাসার নূতন আয়োজনে তাহার
অভাব সেই সন্ধ্যাবেলায় অত্যন্ত
পরিস্ফুট হইয়া উঠিল। এই-সমস্ত
আয়োজন মহেন্দ্রকে সম্পূর্ণ করিতে
হইবে, বাসার সমস্ত ব্যবস্থার ভার
তাহারই উপরে। মহেন্দ্র কখনো
নিজের বা পরের আরামের জন্য
চিন্তা করে নাই-আজ হইতে একটি
নূতন গঠিত অসম্পূর্ণ সংসারের সমস্ত
খুঁটিনাটি তাহাকেই বহন করিতে
হইবে। সিঁড়িতে
একটা কেরোসিনের ডিবা
অপর্যাপ্ত ধুমোদগার করিয়া
মিটমিট করিতেছিল–তাহার
পরিবর্তে একটা ভালো ল্যাম্প
কিনিতে হইবে। বারান্দা বাহিয়া
সিঁড়িতে উঠিবার রাস্তাটা কলের
জলের প্রবাহে স্যাঁতস্যাঁত
করিতেছে–মিসিত্র ডাকাইয়া
বিলাতি মাটির দ্বারা সে জায়গা
মেরামত করা আবশ্যক। রাস্তার
দিকের দুটো ঘর যে জুতার
দোকানদারদের হাতে ছিল,
তাহারা সে দুটো ঘর এখনো ছাড়ে
নাই, তাহা লইয়া বাড়িওয়ালার
সহিত লড়াই করিতে হইবে। এই-সমস্ত
কাজ তাহার নিজে না করিলে নয়,
ইহাই চকিতের মধ্যে মনে উদয় হইয়া
তাহার শ্রান্তির বোঝায় আরো
বোঝা চাপিল।
মহেন্দ্র সিঁড়ির কাছে কিছুক্ষণ
দাঁড়াইয়া নিজেকে সামলাইয়া
লইল–বিনোদিনীর প্রতি তাহার যে
প্রেম ছিল, তাহাকে উত্তেজিত
করিল। নিজেকে বুঝাইল যে, এতদিন
সমস্ত পৃথিবীকে ভুলিয়া সে
যাহাকে চাহিয়াছিল, আজ
তাহাকে পাইয়াছে, আজ উভয়ের
মাঝখানে কোনো বাধা নাই–আজ
মহেন্দ্রের আনন্দের দিন। কিন্তু
কোনো বাধা যে নাই, তাহাই
সর্বাপেক্ষা বড়ো বাধা, আজ
মহেন্দ্র নিজেই নিজের বাধা।
বিনোদিনী রাস্তা হইতে
মহেন্দ্রকে দেখিয়া তাহার
ধ্যানাসন হইতে উঠিয়া ঘরে আলো
জ্বালিল, এবং একটা সেলাই কোলে
লইয়া নতশিরে তাহাতে নিবিষ্ট
হইল–এই সেলাই বিনোদিনীর আবরণ,
ইহার অন্তরালে তাহার যেন একটা
আশ্রয় আছে।
মহেন্দ্র ঘরে ঢুকিয়া কহিল, “বিনোদ,
এখানে নিশ্চয় তোমার অনেক
অসুবিধা ঘটিতেছে।”
বিনোদিনী সেলাই করিতে করিতে
বলিল, “কিছুমাত্র না।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমি আর দুই-তিন
দিনের মধ্যেই সমস্ত আসবাব
আনিয়া উপস্থিত করিব, এই কয়দিন
তোমাকে একটু কষ্ট পাইতে হইবে।”
বিনোদিনী কহিল, “না, সে
কিছুতেই হইতে পারিবে না–তুমি
আর-একটিও আসবাব আনিয়ো না,
এখানে যাহা আছে তাহা আমার
আবশ্যকের চেয়ে ঢের বেশি।”
মহেন্দ্র কহিল, “আমি-হতভাগ্যও কি
সেই ঢের বেশির মধ্যে।”
বিনোদিনী। নিজেকে অত “বেশি”
মনে করিতে নাই–একটু বিনয় থাকা
ভালো। সেই নির্জন দীপালোকে
কর্মরত নতশির বিনোদিনীর
আত্মসমাহিত মূর্তি দেখিয়া
মুহূর্তের মধ্যে মহেন্দ্রের মনে
আবার সেই মোহের সঞ্চার হইল।
বাড়িতে হইলে ছুটিয়া সে
বিনোদিনীর পায়ের কাছে আসিয়া
পড়িত–কিন্তু এ তো বাড়ি নহে,
সেইজন্য মহেন্দ্র তাহা পারিল না।
আজ বিনোদিনী অসহায়, একান্তই
সে মহেন্দ্রের আয়ত্তের মধ্যে, আজ
নিজেকে সংযত না রাখিলে বড়োই
কাপুরুষতা হয়।
বিনোদিনী কহিল, “এখানে তুমি
তোমার বই-কাপড়গুলা আনিলে
কেন।”
মহেন্দ্র কহিল, “ওগুলাকে যে আমি
আমার আবশ্যকের মধ্যেই গণ্য করি।
ওগুলা “ঢের বেশির দলে নয়।”
বিনোদিনী। জানি, কিন্তু এখানে
ও-সব কেন।
মহেন্দ্র। সে ঠিক কথা, এখানে
কোনো আবশ্যক জিনিস শোভা পায়
না–বিনোদ, বইটইগুলো তুমি
রাস্তায় টান মারিয়া ফেলিয়া
দিয়ো, আমি আপত্তিমাত্র করিব
না, কেবল সেই-সঙ্গে আমাকেও
ফেলিয়ো না। বলিয়া এই উপলক্ষে
মহেন্দ্র একটুখানি সরিয়া আসিয়া
কাপড়ে-বাঁধা বইয়ের পুঁটুলি
বিনোদিনীর পায়ের কাছে আনিয়া
ফেলিল।
বিনোদিনী গম্ভীরমুখে সেলাই
করিতে করিতে মাথা না তুলিয়া
কহিল, “ঠাকুরপো, এখানে তোমার
থাকা হইবে না।”
মহেন্দ্র তাহার সদ্যোজাগ্রত
আগ্রহের মুখে প্রতিঘাত পাইয়া
ব্যাকুল হইয়া উঠিল–গদ্গদকণ্ঠে
কহিল, “কেন বিনোদ, কেন তুমি
আমাকে দূরে রাখিতে চাও।
তোমার জন্য সমস্ত ত্যাগ করিয়া কি
এই পাইলাম।”
বিনোদিনী। আমার জন্য তোমাকে
সমস্ত ত্যাগ করিতে দিব না।
মহেন্দ্র বলিয়া উঠিল, “এখন সে আর
তোমার হাতে নাই–সমস্ত সংসার
আমার চারি দিক হইতে স্খলিত
হইয়া পড়িয়াছে–কেবল তুমি একলা
আছ, বিনোদ! বিনোদ–বিনোদ–”
বলিতে বলিতে মহেন্দ্র শুইয়া
পড়িয়া বিহ্বলভাবে বিনোদিনীর
পা জোর করিয়া চাপিয়া ধরিল
এবং তাহার পদপল্লব বারংবার
চুম্বন করিতে লাগিল।
বিনোদিনী পা ছাড়াইয়া লইয়া
উঠিয়া দাঁড়াইল। কহিল, “মহেন্দ্র,
তুমি কী প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে
মনে নাই?”
সমস্ত বলপ্রয়োগ করিয়া মহেন্দ্র
আত্মসংবরণ করিয়া লইল–কহিল,
“মনে আছে। শপথ করিয়াছিলাম,
তোমার যাহা ইচ্ছা তাহাই হইবে,
আমি কখনো তাহার কোনো অন্যথা
করিব না। সেই শপথই রক্ষা করিব।
কী করিতে হইবে, বলো।”
বিনোদিনী। তুমি তোমার বাড়িতে
গিয়া থাকিবে।
মহেন্দ্র। আমিই কি তোমার
একমাত্র অনিচ্ছার সামগ্রী,
বিনোদ! তাই যদি হইবে, তবে তুমি
আমাকে টানিয়া আনিলে কেন। যে
তোমার ভোগের সামগ্রী নয়,
তাহাকে শিকার করিবার কী
প্রয়োজন ছিল। সত্য করিয়া বলো,
আমি কি ইচ্ছা করিয়া তোমার
কাছে ধরা দিয়াছি, না তুমি ইচ্ছা
করিয়া আমাকে ধরিয়াছ। আমাকে
লইয়া তুমি এইরূপ খেলা করিবে,
ইহাও কি আমি সহ্য করিব। তবু আমি
আমার শপথ পালন করিব–যে
বাড়িতে আমি নিজের স্থান
পদাঘাতে চূর্ণ করিয়া ফেলিয়াছি
সেই বাড়িতে গিয়াই আমি থাকিব।
বিনোদিনী ভূমিতে বসিয়া পুনরায়
নিরুত্তরে সেলাই করিতে লাগিল।
মহেন্দ্র কিছুক্ষণ স্থিরভাবে তাহার
মুখের দিকে চাহিয়া বলিয়া উঠিল,
“নিষ্ঠুর, বিনোদ, তুমি নিষ্ঠুর!
আমি অত্যন্ত হতভাগ্য যে, আমি
তোমাকে ভালোবাসিয়াছি।”
বিনোদিনী সেলাইয়ে একটা ভুল
করিয়া আলোর কাছে ধরিয়া তাহা
বহুযত্নে পুনর্বার খুলিতে লাগিল।
মহেন্দ্রের ইচ্ছা করিতে লাগিল,
বিনোদিনীর ঐ পাষাণ হৃদয়টাকে
নিজের কঠিন মুষ্টির মধ্যে সবলে
চাপিয়া ভাঙিয়া ফেলে। এই নীরব
নির্দয়তা ও অবিচলিত উপেক্ষাকে
প্রবল আঘাত করিয়া যেন বাহুবলের
দ্বারা পরাস্ত করিতে ইচ্ছা করে।
মহেন্দ্র ঘর হইতে বাহির হইয়া
পুনরায় ফিরিয়া আসিল–কহিল,
“আমি না থাকিলে এখানে
একাকিনী
তোমাকে কে রক্ষা করিবে।”
বিনোদিনী কহিল, “সেজন্য তুমি
কিছুমাত্র ভয় করিয়ো না। পিসিমা
খেমিকে ছাড়াইয়া দিয়াছেন, সে
আজ আমার এখানে আসিয়া কাজ
লইয়াছে। দ্বারে তালা দিয়া
আমরা দুই স্ত্রীলোকে এখানে বেশ
থাকিব।”
মনে মনে যতই রাগ হইতে লাগিল,
বিনোদিনীর প্রতি মহেন্দ্রের
আকর্ষণ ততই একান্ত প্রবল হইয়া
উঠিল। ঐ অটল মূর্তিকে বজ্রবলে
বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া ক্লিষ্ট পিষ্ট
করিয়া ফেলিতে ইচ্ছা করিতে
লাগিল। সেই দারুণ ইচ্ছার হাত
এড়াইবার জন্য মহেন্দ্র ছুটিয়া বাড়ি
হইতে বাহির হইয়া গেল।
রাস্তায় ঘুরিতে ঘুরিতে মহেন্দ্র
প্রতিজ্ঞা করিতে লাগিল,
বিনোদিনীকে সে উপেক্ষার
পরিবর্তে উপেক্ষা দেখাইবে। যে-
অবস্থায় বিশ্বজগতে বিনোদিনীর
একমাত্র নির্ভর মহেন্দ্র সে
অবস্থাতেও মহেন্দ্রকে এমন নীরবে
নির্ভয়ে, এমন সুদৃঢ় সুস্পষ্টভাবে
প্রত্যাখ্যান–এতবড়ো অপমান কি
কোনো পুরুষের ভাগ্যে কখনো
ঘটিয়াছে। মহেন্দ্রের গর্ব চূর্ণ
হইয়াও কিছুতেই মরিতে চাহিল না,
সে কেবলই পীড়িত দলিত হইতে
লাগিল। মহেন্দ্র কহিল, “আমি কি
এতই অপদার্থ। আমার সম্বন্ধে
এতবড়ো স্পর্ধা কী করিয়া তাহার
মনে হইল। আমি ছাড়া এখন তাহার
আর কে আছে।”
ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ মনে
পড়িল–বিহারী। হঠাৎ এক মুহূর্তের
জন্য তাহার বক্ষে সমস্ত রক্তপ্রবাহ
যেন স্তব্ধ হইয়া গেল। বিহারীর
উপরেই বিনোদিনী নির্ভর স্থাপন
করিয়া আছে–আমি তাহার
উপলক্ষমাত্র, আমি তাহার সোপান,
তাহার পা রাখিবার, পদে পদে
পদাঘাত করিবার স্থান। সেই
সাহসেই আমার প্রতি এত অবজ্ঞা!
মহেন্দ্রের সন্দেহ হইল, বিহারীর
সহিত বিনোদিনীর চিঠিপত্র
চলিতেছে এবং বিনোদিনী তাহার
কাছ হইতে কোনো আশ্বাস
পাইয়াছে।
তখন মহেন্দ্র বিহারীর বাড়ির
দিকে চলিল। যখন বিহারীর দ্বারে
গিয়া ঘা দিল, তখন রাত্রি আর বড়ো
অধিক নাই। অনেক ধাক্কার পর
বেহারা ভিতর হইতে দরজা খুলিয়া
দিয়া কহিল, “বাবুজি বাড়ি নাই।”
মহেন্দ্র চমকিয়া উঠিল। ভাবিল,
“আমি যখন নির্বোধের মতো
রাস্তায় রাস্তায় ছুটিয়া
বেড়াইতেছি, বিহারী সেই
অবকাশে বিনোদিনীর কাছে
গেছে। এইজন্যই বিনোদিনী
আমাকে এই রাত্রে এমন
নির্দয়ভাবে অপমান করিয়াছে, এবং
আমিও তাড়িত গর্দভের মতো ছুটিয়া
চলিয়া আসিয়াছি।”
মহেন্দ্র তাহার পুরাতন পরিচিত
বেহারাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ভজু,
বাবু কখন বাহির হইয়া গেছেন।”
ভজু কহিল, “সে আজ চার-পাঁচ দিন
হইয়া গেছে। তিনি পশ্চিমে
কোথায় বেড়াইতে গেছেন।”
শুনিয়া মহেন্দ্র বাঁচিয়া গেল।
তাহার মনে হইল, “এইবার একটু শুইয়া
আরামে ঘুমাই, আর সমস্ত রাত
ঘুরিয়া বেড়াইতে পারি না।”
বলিয়া উপরে উঠিয়া বিহারীর ঘরে
কৌচের উপর শুইয়া তৎক্ষণাৎ
ঘুমাইয়া পড়িল।
মহেন্দ্র যে-রাত্রে বিহারীর ঘরে
আসিয়া উপদ্রব করিয়াছিল, তাহার
পরদিনই বিহারী কোথায় যাইতে
হইবে, কিছুই স্থির না করিয়া
পশ্চিমে চলিয়া গেছে। বিহারী
ভাবিল, এখানে থাকিলে পূর্ববন্ধুর
সহিত সংঘর্ষ কোন্-একদিন এমন
বীভৎস হইয়া উঠিবে যে, তাহার পর
চিরজীবন অনুতাপের কারণ থাকিয়া
যাইবে।
পরদিন মহেন্দ্র যখন উঠিল তখন
বেলা এগারোটা। উঠিয়াই সম্মুখের
টিপাইয়ের উপর তাহার দৃষ্টি পড়িল।
দেখিল, বিনোদিনীর হস্তাক্ষরে
বিহারীর নামে এক পত্র পাথরের
কাগজচাপা দিয়া চাপা রহিয়াছে।
তাড়াতাড়ি তাহা তুলিয়া লইয়া
দেখিল, পত্র এখনো খোলা হয় নাই।
প্রবাসী বিহারীর জন্য তাহা
অপেক্ষা করিয়া আছে।
কম্পিতহস্তে মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি
তাহা খুলিয়া পড়িতে লাগিল। এই
চিঠিই বিনোদিনী তাহাদের গ্রাম
হইতে বিহারীকে লিখিয়াছিল এবং
ইহার কোনো জবাব সে পায় নাই।
চিঠির প্রত্যেক অক্ষর মহেন্দ্রকে
দংশন করিতে লাগিল। বাল্যকাল
হইতে বরাবর বিহারী মহেন্দ্রের
অন্তরালেই পড়িয়া ছিল। জগতের
স্নেহপ্রেম সম্বন্ধে মহেন্দ্র-
দেবতার শুষ্ক নির্মাল্যই তাহার
ভাগ্যে জুটিত। আজ মহেন্দ্র স্বয়ং
প্রার্থী এবং বিহারী বিমুখ, তবু
মহেন্দ্রকে ঠেলিয়া বিনোদিনী এই
অরসিক বিহারীকেই বরণ করিল।
মহেন্দ্রও বিনোদিনীর দুই-চারখানি
চিঠি পাইয়াছে, কিন্তু বিহারীর এ
চিঠির কাছে তাহা নিতান্ত
কৃত্রিম, তাহা নির্বোধকে
ভুলাইবার শূন্য ছলনা।
নূতন ঠিকানা জানাইবার জন্য
গ্রামের ডাকঘরে মহেন্দ্রকে
পাঠাইতে বিনোদিনীর ব্যগ্রতা
মহেন্দ্রের মনে পড়িল এবং তাহার
কারণ সে বুঝিতে পারিল।
বিনোদিনী তাহার সমস্ত মন-প্রাণ
দিয়া বিহারীর চিঠির উত্তর
পাইবার জন্য পথ চাহিয়া বসিয়া
আছে।
পূর্বপ্রথামত মনিব না থাকিলেও ভজু
বেহারা মহেন্দ্রকে চা এবং বাজার
হইতে জলখাবার আনিয়া খাওয়াইল।
মহেন্দ্র স্নান ভুলিয়া গেল। উত্তপ্ত
বালুকার উপর দিয়া পথিক যেমন
দ্রুতপদে চলে, মহেন্দ্র সেইরূপ ক্ষণে
ক্ষণে বিনোদিনীর জ্বালাকর
চিঠির উপর দ্রুত চোখ বুলাইতে
লাগিল। মহেন্দ্র পণ করিতে লাগিল,
বিনোদিনীর সঙ্গে আর কিছুতেই
দেখা করিবে না। কিন্তু তাহার
মনে হইল, আর দুই-একদিন চিঠির
জবাব না পাইলে বিনোদিনী
বিহারীর বাড়িতে আসিয়া
উপস্থিত হইবে এবং তখন সমস্ত
অবস্থা জানিতে পারিয়া
সান্ত্বনা লাভ করিবে। সে
সম্ভাবনা তাহার কাছে অসহ্য বোধ
হইল।
তখন চিঠিখানা পকেটে করিয়া
মহেন্দ্র সন্ধ্যার কিছু পূর্বে
পটলডাঙার বাসায় আসিয়া উপস্থিত
হইল।
মহেন্দ্রের মলান অবস্থায়
বিনোদিনীর মনে দয়া হইল–সে
বুঝিতে পারিল, মহেন্দ্র কাল
রাত্রে হয়তো পথে-পথে অনিদ্রায়
যাপন করিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিল,
“কাল রাত্রে বাড়ি যাও নাই?”
মহেন্দ্র কহিল, “না।”
বিনোদিনী ব্যস্ত হইয়া বলিয়া
উঠিল, “আজ এখনো তোমার খাওয়া
হয় নি নাকি।” বলিয়া সেবাপরায়ণা
বিনোদিনী তৎক্ষণাৎ আহারের
আয়োজন করিতে উদ্যত হইল।
মহেন্দ্র কহিল, “থাক্ থাক্, আমি
খাইয়া আসিয়াছি।”
বিনোদিনী। কোথায় খাইয়াছ।
মহেন্দ্র। বিহারীদের বাড়িতে।
মুহূর্তের জন্য বিনোদিনীর মুখ
পাণ্ডুবর্ণ হইয়া গেল। মুহূর্তকাল
নিরুত্তর থাকিয়া আত্মসংবরণ
করিয়া বিনোদিনী জিজ্ঞাসা
করিল, “বিহারী-ঠাকুরপো ভালো
আছেন তো?”
মহেন্দ্র কহিল, “ভালোই আছে।
বিহারী যে পশ্চিমে চলিয়া গেল।”
–মহেন্দ্র এমনভাবে বলিল, যেন
বিহারী আজই রওনা হইয়াছে।
বিনোদিনীর মুখ আর-একবার
পাংশুবর্ণ হইয়া গেল। পুনর্বার
আত্মসংবরণ করিয়া সে কহিল, “এমন
চঞ্চল লোকও তো দেখি নাই।
আমাদের সমস্ত খবর পাইয়াছেন
বুঝি? ঠাকুরপো খুব কি রাগ
করিয়াছেন।”
মহেন্দ্র। তা না হইলে এই অসহ্য
গরমের সময় কি মানুষ শখ করিয়া
পশ্চিমে বেড়াইতে যায়।
বিনোদিনী। আমার কথা কিছু
বলিলেন না কি।
মহেন্দ্র। বলিবার আর কী আছে। এই
লও বিহারীর চিঠি।
বলিয়া চিঠিখানা বিনোদিনীর
হাতে দিয়া মহেন্দ্র তীব্রদৃষ্টিতে
তাহার মুখের ভাব নিরীক্ষণ করিতে
লাগিল।
বিনোদিনী তাড়াতাড়ি চিঠি
লইয়া দেখিল, খোলা চিঠি–
লেফাফার উপরে তাহারই
হস্তাক্ষরে বিহারীর নাম লেখা।
লেফাফা হইতে বাহির করিয়া
দেখিল, তাহারই লেখা সেই চিঠি।
উল্টাইয়া পাল্টাইয়া কোথাও
বিহারীর লেখা জবাব কিছুই
দেখিতে পাইল না।
একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া
বিনোদিনী মহেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা
করিল, “চিঠিখানা তুমি পড়িয়াছ?”
বিনোদিনীর মুখের ভাব দেখিয়া
মহেন্দ্রের মনে ভয়ের সঞ্চার হইল।
সে ফস্ করিয়া মিথ্যা কথা কহিল,
“না।”
বিনোদিনী চিঠিখানা টুকরা-টুকরা
করিয়া ছিঁড়িয়া, পুনরায় তাহা
কুটিকুটি করিয়া জানালার বাহিরে
ফেলিয়া দিল।
মহেন্দ্র কহিল, “আমি বাড়ি
যাইতেছি।”
বিনোদিনী তাহার কোনো উত্তর
দিল না।
মহেন্দ্র। তুমি যেমন ইচ্ছা প্রকাশ
করিয়াছ, আমি তাহাই করিব। সাত
দিন আমি বাড়িতে থাকিব।
কালেজে আসিবার সময় প্রত্যহ
একবার এখানকার সমস্ত বন্দোবস্ত
করিয়া খেমির হাতে দিয়া যাইব।
দেখা করিয়া তোমাকে বিরক্ত
করিব না।
বিনোদিনী মহেন্দ্রের কোনো কথা
শুনিতে পাইল কি না কে জানে,
কিন্তু কোনো উত্তর করিল না–
খোলা জানালার বাহিরে অন্ধকার
আকাশে চাহিয়া রহিল।
মহেন্দ্র তাহার জিনিসপত্র লইয়া
বাহির হইয়া গেল।
বিনোদিনী শূন্যগৃহে অনেকক্ষণ
আড়ষ্টের মতো বসিয়া থাকিয়া
অবশেষে নিজেকে যেন প্রাণপণ
বলে সচেতন করিবার জন্য বক্ষের
কাপড় ছিঁড়িয়া আপনাকে
নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করিতে
লাগিল।
খেমি শব্দ শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া
কহিল, “বউঠাকরুন, করিতেছ কী।”
“তুই যা এখান থেকে” বলিয়া গর্জন
করিয়া উঠিয়া বিনোদিনী
খেমিকে ঘর হইতে বাহির করিয়া
দিল। তাহর পরে সশব্দে দ্বার রুদ্ধ
করিয়া, দুই হাত মুঠা করিয়া,
মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া, বাণাহত
জন্তুর মতো আর্তস্বরে কাঁদিতে
লাগিল। এইরূপে বিনোদিনী
নিজেকে বিক্ষত পরিশ্রান্ত করিয়া
মূর্ছিতের মতো মুক্ত বাতায়নের
তলে সমস্ত রাত্রি পড়িয়া রহিল।
প্রাতঃকালে সূর্যালোক গৃহে
প্রবেশ করিতেই তাহার হঠাৎ
সন্দেহ হইল, বিহারী যদি না গিয়া
থাকে, মহেন্দ্র যদি বিনোদিনীকে
ভুলাইবার জন্য মিথ্যা বলিয়া
থাকে। তৎক্ষণাৎ খেমিকে ডাকিয়া
কহিল, “খেমি, তুই এখনই যা–
বিহারী-ঠাকুরপোর বাড়ি গিয়া
তাঁহাদের খবর লইয়া আয়।”
খেমি ঘণ্টাখানেক পরে ফিরিয়া
আসিয়া কহিল, “বিহারীবাবুর
বাড়ির সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ।
দরজায় ঘা দিতে ভিতর হইতে
বেহারা বলিল, “বাবু বাড়িতে নাই,
তিনি পশ্চিমে বেড়াইতে
গিয়াছেন।”
বিনোদিনীর মনে আর সন্দেহের
কোনোই কারণ রহিল না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now