বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পরদিন প্রত্যুষ হইতে ঘনঘটা করিয়া
আছে। কিছুকাল অসহ্য উত্তাপের পর
স্নিগ্ধশ্যামল মেঘে দগ্ধ আকাশ
জুড়াইয়া গেল। আজ মহেন্দ্র সময়
হইবার পূর্বেই কালেজে গেছে।
তাহার ছাড়া-কাপড়গুলা মেঝের
উপর পড়িয়া। আশা মহেন্দ্রের ময়লা
কাপড় গনিয়া গনিয়া, তাহার
হিসাব রাখিয়া ধোবাকে বুঝাইয়া
দিতেছে।
মহেন্দ্র স্বভাবত ভোলামন
অসাবধান লোক; এইজন্য আশার
প্রতি তাহার অনুরোধ ছিল ধোবার
বাড়ি দিবার পূর্বে তাহার ছাড়া-
কাপড়ের পকেট তদন্ত করিয়া লওয়া
হয় যেন। মহেন্দ্রের একটা ছাড়া-
জামার পকেটে হাত দিতেই
একখানা চিঠি আশার হাতে
ঠেকিল।
সেই চিঠি যদি বিষধর সাপের মূর্তি
ধরিয়া তখনই আশার অঙ্গুলি দংশন
করিত তবে ভালো হইত; কারণ, উগ্র
বিষ শরীরে প্রবেশ করিলে পাঁচ
মিনিটের মধ্যেই তাহার চরম ফল
ফলিয়া শেষ হইতে পারে, কিন্তু
বিষ মনে প্রবেশ করিলে
মৃত্যুযন্ত্রণা আনে–মৃত্যু আনে না।
খোলা চিঠি বাহির করিবামাত্র
দেখিল, বিনোদিনীর হস্তাক্ষর।
চকিতের মধ্যে আশার মুখ পাংশুবর্ণ
হইয়া গেল। চিঠি হাতে লইয়া সে
পাশের ঘরে গিয়া পড়িল-
“কাল রাত্রে তুমি যে-কাণ্ডটা
করিলে, তাহাতেও কি তোমার
তৃপ্তি হইল না। আজ আবার কেন
খেমির হাত দিয়া আমাকে গোপনে
চিঠি পাঠাইলে। ছি ছি, সে কী
মনে করিল। আমাকে তুমি কি জগতে
কাহারো কাছে মুখ দেখাইতে দিবে
না।
“আমার কাছে কী চাও তুমি।
ভালোবাসা? তোমার এ
ভিক্ষাবৃত্তি কেন। জন্মকাল হইতে
তুমি কেবল ভালোবাসাই পাইয়া
আসিতেছ, তবু তোমার লোভের অন্ত
নাই।
“জগতে আমার ভালোবাসিবার এবং
ভালোবাসা পাইবার কোনো স্থান
নাই। তাই আমি খেলা খেলিয়া
ভালোবাসার খেদ মিটাইয়া
থাকি। যখন তোমার অবসর ছিল, তখন
সেই মিথ্যা খেলায় তুমিও যোগ
দিয়াছিলে। কিন্তু খেলার ছুটি কি
ফুরায় না। ঘরের মধ্যে তোমার ডাক
পড়িয়াছে, এখন আবার খেলার ঘরে
উঁকিঝুঁকি কেন। এখন ধূলা ঝাড়িয়া
ঘরে যাও। আমার তো ঘর নাই, আমি
মনে মনে একলা বসিয়া খেলা করিব,
তোমাকে ডাকিব না।
“তুমি লিখিয়াছ, আমাকে
ভালোবাস। খেলার বেলায় সে কথা
শোনা যাইতে পারে–কিন্তু যদি
সত্য বলিতে হয়, ও কথা বিশ্বাস করি
না। এক সময় মনে করিতে তুমি
আশাকে ভালোবাসিতেছ, সেও
মিথ্যা; এখন মনে করিতেছ তুমি
আমাকে ভালোবাসিতেছ, এও
মিথ্যা। তুমি কেবল নিজেকে
ভালোবাসো।
“ভালোবাসার তৃষ্ণায় আমার হৃদয়
হইতে বক্ষ পর্যন্ত শুকাইয়া
উঠিতেছে–সে তৃষ্ণা পূরণ করিবার
সম্বল তোমার হাতে নাই, সে আমি
বেশ ভালো করিয়াই দেখিয়াছি।
আমি তোমাকে বারংবার
বলিতেছি, তুমি আমাকে ত্যাগ
করো, আমার পশ্চাতে ফিরিয়ো না;
নির্লজ্জ হইয়া আমাকে লজ্জা
দিয়ো না। আমার খেলার শখও
মিটিয়াছে; এখন ডাক দিলে
কিছুতেই আমার সাড়া পাইবে না।
চিঠিতে তুমি আমাকে নিষ্ঠুর
বলিয়াছ-সে কথা সত্য হইতে পারে;
কিন্তু আমার কিছু দয়াও আছে–তাই
আজ তোমাকে আমি দয়া করিয়া
ত্যাগ করিলাম। এ চিঠির যদি উত্তর
দাও, তবে বুঝিব, না পালাইলে
তোমার হাত হইতে আমার আর
নিষ্কৃতি নাই।”
চিঠিখানি পড়িবামাত্র মুহূর্তের
মধ্যে চারি দিক হইতে আশার সমস্ত
অবলম্বন যেন খসিয়া পড়িয়া গেল,
শরীরের সমস্ত স্নায়ুপেশী যেন
একেবারেই হাল ছাড়িয়া দিল–
নিশ্বাস লইবার জন্য যেন বাতাসটুকু
পর্যন্ত রহিল না, সূর্য তাহার
চোখের উপর হইতে সমস্ত আলো যেন
তুলিয়া লইল। আশা প্রথমে দেয়াল,
তাহার পর আলমারি, তাহার পর
চৌকি ধরিতে ধরিতে মাটিতে
পড়িয়া গেল, ক্ষণকাল পরে সচেতন
হইয়া চিঠিখানা আর-এক বার
পড়িতে চেষ্টা করিল, কিন্তু
উদ্ান্িতচিত্তে কিছুতেই তাহার
অর্থ গ্রহণ করিতে পারিল না-
কোলো-কালো অক্ষরগুলা তাহার
চোখের উপর নাচিতে লাগিল। এ
কী। এ কী হইল। এ কেমন করিয়া হইল।
এ কী সম্পূর্ণ সর্বনাশ।
সে কী করিবে, কাহাকে ডাকিবে,
কোথায় যাইবে কিছুই ভাবিয়া
পাইল না। ডাঙার উপরে উঠিয়া
মাছ যেমন খাবি খায়, তাহার বুকের
ভিতরটা তেমনি করিতে লাগিল।
মজ্জমান ব্যক্তি যেমন কোনো একটা
আশ্রয় পাইবার জন্য জলের উপরে
হস্ত প্রসারিত করিয়া আকাশ
খুঁজিয়া বেড়ায়, তেমনি আশা মনের
মধ্যে একটা যা-হয় কিছু প্রাণপণে
আঁকড়িয়া ধরিবার জন্য একান্ত
চেষ্টা করিল, অবশেষে বুক চাপিয়া
উর্ধ্বশ্বাসে বলিয়া উঠিল,
“মাসিমা!”
সেই স্নেহের সম্ভাষণ উচ্ছ্বসিত
হইবামাত্র তাহার চোখ দিয়া ঝর
ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল।
মাটিতে বসিয়া কান্নার উপর
কান্না–কান্নার উপর কান্না যখন
ফিরিয়া ফিরিয়া শেষ হইল, তখন
সে ভাবিতে লাগিল, “এ চিঠি লইয়া
আমি কী করিব।” স্বামী যদি
জানিতে পারেন, এ চিঠি আশার
হাতে পড়িয়াছে, তবে সেই উপলক্ষে
তাঁহার নিদারুণ লজ্জা স্মরণ করিয়া
আশা অত্যন্ত কুণ্ঠিত হইতে লাগিল।
স্থির করিল, চিঠিখানি সেই
ছাড়াজোমার পকেটে পুনরায়
রাখিয়া জামাটি আলনায় ঝুলাইয়া
রাখিবে, ধোবার বাড়ি দিবে না।
এই ভাবিয়া চিঠি-হাতে সে
শয়নগৃহে আসিল। ধোবাটা ইতিমধ্যে
ময়লা কাপড়ের গাঁঠরির উপর ঠেস
দিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
মহেন্দ্রের ছাড়া জামাটা তুলিয়া
লইয়া আশা তাহার পকেটে চিঠি
পুরিবার উদ্যোগ করিতেছে, এমন সময়
সাড়া পাইল, “ভাই বালি।”
তাড়াতাড়ি চিঠি ও জামাটা
খাটের উপর ফেলিয়া সে তাহা
চাপিয়া বসিল। বিনোদিনী ঘরে
প্রবেশ করিয়া
কহিল, “ধোবা বড়ো কাপড় বদল
করিতেছে। যে কাপড়গুলায় মার্কা
দেওয়া হয় নাই, সেগুলা আমি লইয়া
যাই।”
আশা বিনোদিনীর মুখের দিকে
চাহিতে পারিল না। পাছে মুখের
ভাবে সকল কথা স্পষ্ট করিয়া
প্রকাশ
পায়, এইজন্য সে জানালার দিকে মুখ
ফিরাইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া
রহিল, ঠোঁটে ঠোঁট চাপিয়া রহিল,
পাছে চোখ দিয়া জল বাহির হইয়া
পড়ে।
বিনোদিনী থমকিয়া দাঁড়াইয়া
একবার আশাকে নিরীক্ষণ করিয়া
দেখিল, মনে মনে কহিল, “ও,
বুঝিয়াছি।
কাল রাত্রের বিবরণ তবে জানিতে
পারিয়াছ। আমার উপরেই সমস্ত
রাগ! যেন অপরাধ আমারই!”
বিনোদিনী আশার সঙ্গে
কথাবার্তা কহিবার কোনো
চেষ্টাই করিল না। খানকয়েক কাপড়
বাছিয়া লইয়া দ্রুতপদে ঘর হইতে
চলিয়া গেল।
বিনোদিনীর সঙ্গে আশা যে এতদিন
সরলচিত্তে বন্ধুত্ব করিয়া
আসিতেছে, সেই লজ্জা নিদারুণ
দুঃখের
মধ্যেও তাহার হৃদয়ে পুজ্ঞীকৃত হইয়া
উঠিল। তাহার মনের মধ্যে সখীর যে
আদর্শ ছিল, সে আদর্শের সঙ্গে
নিষ্ঠুর চিঠিখানা আর একবার
মিলাইয়া দেখিবার ইচ্ছা হইল।
চিঠিখানা খুলিয়া দেখিতেছে,
এমন সময় তাড়াতাড়ি মহেন্দ্র ঘরের
মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। হঠাৎ
কী মনে করিয়া কালেজের একটা
লেকচারের মাঝখানে ভঙ্গ দিয়া
সে ছুটিয়া বাড়ি চলিয়া
আসিয়াছে।
আশা চিঠিখানা অঞ্চলের মধ্যে
লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্রও ঘরে
আশাকে দেখিয়া একটু থমকিয়া
দাঁড়াইল। তাহার পর ব্যগ্রদৃষ্টিতে
ঘরের এদিক-ওদিক চাহিয়া দেখিতে
লাগিল। আশা বুঝিয়াছিল, মহেন্দ্র
কী খুঁজিতেছে; কিন্তু কেমন করিয়া
সে হাতের চিঠিখানা অলক্ষিতে
যথাস্থানে রাখিয়া পালাইয়া
যাইবে, ভাবিয়া পাইল না। মহেন্দ্র
তখন একটা একটা করিয়া ময়লা
কাপড় তুলিয়া তুলিয়া দেখিতে
লাগিল। মহেন্দ্রের সেই নিষ্ফল
প্রয়াস দেখিয়া আশা আর থাকিতে
পারিল না, চিঠিখানা ও জামাটা
মেজের উপর ফেলিয়া দিয়া ডান
হাতে খাটের থামটা ধরিয়া সেই
হাতে মুখ লুকাইল। মহেন্দ্র
বিদ্যুদ্বেগে চিঠিখানা তুলিয়া
লইল। নিমেষের জন্য স্তব্ধ হইয়া
আশার দিকে চাহিল। তাহার পরে
আশা সিঁড়ি দিয়া মহেন্দ্রের
দ্রুতধাবনের শব্দ শুনিতে পাইল। তখন
ধোবা ডাকিতেছে, “মাঠাকরুন,
কাপড় দিতে আর কত দেরি করিবে।
বেলা অনেক হইল, আমার বাড়ি তো
এখানে নয়।”
রাজলক্ষ্মী আজ সকাল হইতে আর
বিনোদিনীকে ডাকেন নাই।
বিনোদিনী নিয়মমত ভাঁড়ারে গেল,
দেখিয়া, রাজলক্ষ্মী মুখ তুলিয়া
চাহিলেন না।
সে তাহা লক্ষ্য করিয়াও বলিল,
“পিসিমা, তোমার অসুখ করিয়াছে
বুঝি? করিবারই কথা। কাল রাত্রে
ঠাকুরপো যে কীর্তি করিলেন।
একেবারে পাগলের মতো আসিয়া
উপস্থিত। আমার তো তার পরে ঘুম
হইল না।”
রাজলক্ষ্মী মুখ ভার করিয়া
রহিলেন, হাঁ-না কোনো উত্তরই
করিলেন না।
বিনোদিনী বলিল, “হয়তো চোখের
বালির সঙ্গে সামান্য কিছু
খিটিমিটি হইয়া থাকিবে, আর
দেখে কে। তখনই নালিশ কিংবা
নিষ্পত্তির জন্যে আমাকে ধরিয়া
লইয়া যাওয়া চাই, রাত পোহাইতে
তর সয় না। যাই বল পিসিমা, তুমি
রাগ করিয়ো না, তোমার ছেলের
সহস্র গুণ থাকিতে পারে, কিন্তু
ধৈর্যের লেশমাত্র নাই। ঐজন্যেই
আমার সঙ্গে কেবলই ঝগড়া হয়।”
রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “বউ, তুমি
মিথ্যা বকিতেছ–আমার আজ আর
কোনো কথা ভালো লাগিতেছে
না।”
বিনোদিনী কহিল, “আমারও কিছু
ভালো লাগিতেছে না, পিসিমা।
তোমার মনে আঘাত লাগিবে, এই
ভয়ে মিথ্যা কথা দিয়া তোমার
ছেলের দোষ ঢাকিবার চেষ্টা
করিয়াছি। কিন্তু এমন হইয়াছে যে
আর ঢাকা পড়ে না।”
রাজলক্ষ্মী। আমার ছেলের দোষ-গুণ
আমি জানি–কিন্তু তুমি যে কেমন
মায়াবিনী, তাহা আমি জানিতাম
না!
বিনোদিনী কী একটা বলিবার জন্য
উদ্যত হইয়া নিজেকে সংবরণ করিল–
কহিল, “সে কথা ঠিক পিসিমা, কেহ
কাহাকেও জানে না। নিজের মনও
কি সবাই জানে। তুমি কি কখনো
তোমার বউয়ের উপর দ্বেষ করিয়া এই
মায়াবিনীকে দিয়া তোমার
ছেলের মন ভুলাইতে চাও নাই?
একবার ঠাওর করিয়া দেখো দেখি।”
রাজলক্ষ্মী অগ্নির মতো উদ্দীপ্ত
হইয়া উঠিলেন–কহিলেন,
“হতভাগিনী, ছেলের সম্বন্ধে মার
নামে তুই এমন অপবাদ দিতে
পারিস? তোর জিব খসিয়া পড়িবে
না!” বিনোদিনী অবিচলিতভাবে
কহিল, “পিসিমা, আমরা
মায়াবিনীর জাত, আমার মধ্যে কী
মায়া ছিল, তাহা আমি ঠিক জানি
নাই, তুমি জানিয়াছ–তোমার
মধ্যেও কী মায়া ছিল, তাহা তুমি
ঠিক জান নাই, আমি জানিয়াছি।
কিন্তু মায়া ছিল, নহিলে এমন ঘটনা
ঘটিত না। ফাঁদ আমিও কতকটা
জানিয়া এবং কতকটা না জানিয়া
পাতিয়াছি। ফাঁদ তুমিও কতকটা
জানিয়া এবং কতকটা না জানিয়া
পাতিয়াছ। আমাদের জাতের ধর্ম
এইরূপ–আমরা মায়াবিনী।”
রোষে রাজলক্ষ্মীর যেন কণ্ঠরোধ
হইয়া গেল–তিনি ঘর ছাড়িয়া
দ্রুতপদে চলিয়া গেলেন।
বিনোদিনী একলা ঘরে ক্ষণকালের
জন্য স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল–
তাহার দুই চক্ষে আগুন জ্বলিয়া
উঠিল।
সকালবেলাকার গৃহকার্য হইয়া
গেলে রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রকে
ডাকিয়া পাঠাইলেন। মহেন্দ্র
বুঝিল, কাল রাত্রিকার ব্যাপার
লইয়া আলোচনা হইবে। তখন
বিনোদিনীর কাছ হইতে পত্রোত্তর
পাইয়া তাহার মন বিকল হইয়া
উঠিয়াছিল। সেই আঘাতের
প্রতিঘাত স্বরূপে তাহার সমস্ত
তরঙ্গিত হৃদয় বিনোদিনীর দিকে
সবেগে ধাবমান হইতেছিল। ইহার
উপরে আবার মার সঙ্গে উত্তর-
প্রত্যুত্তর করা তাহার পক্ষে
অসাধ্য। মহেন্দ্র জানিত, মা
তাহাকে বিনোদিনী সম্বন্ধে
ভর্ৎসনা করিলেই বিদ্রোহিভাবে
সে যথার্থ মনের কথা বলিয়া
ফেলিবে এবং বলিয়া ফেলিলেই
নিদারুণ গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হইবে।
অতএব এ সময়ে বাড়ি হইতে দূরে
গিয়া সকল কথা পরিষ্কার করিয়া
ভাবিয়া দেখা দরকার। মহেন্দ্র
চাকরকে বলিল, “মাকে বলিস, আজ
কালেজে আমার বিশেষ কাজ আছে,
এখনই যাইতে হইবে, ফিরিয়া
আসিয়া দেখা হইবে।” বলিয়া
পলাতক বালকের মতো তখনই
তাড়াতাড়ি কাপড় পরিয়া না
খাইয়া ছুটিয়া বাহির হইতে গেল।
বিনোদিনীর যে দারুণ চিঠিখানা
আজ সকাল হইতে বার বার করিয়া
সে পড়িয়াছে এবং পকেটে লইয়া
ফিরিয়াছে, আজ নিতান্ত
তাড়াতাড়িতে সেই চিঠিসুদ্ধ
জামা ছাড়িয়াই সে চলিয়া গেল।
এক পশলা ঘন বৃষ্টি হইয়া তাহার
পরে বাদলার মতো করিয়া রহিল।
বিনোদিনীর মন আজ অত্যন্ত বিরক্ত
হইয়া আছে। মনের কোনো অসুখ
হইলে বিনোদিনী কাজের মাত্রা
বাড়ায়। তাই সে আজ যত রাজ্যের
কাপড় জড়ো করিয়া চিহ্ন দিতে
আরম্ভ করিয়াছে। আশার নিকট
হইতে কাপড় চাহিতে গিয়া আশার
মুখের ভাব দেখিয়া তাহার মন
আরো বিগড়াইয়া গেছে। সংসারে
যদি অপরাধীই হইতে হয় তবে
অপরাধের যত লাঞ্ছনা তাহাই কেন
ভোগ করিবে, অপরাধের যত সুখ
তাহা হইতে কেন বঞ্চিত হইবে।
ঝুপ ঝুপ শব্দে চাপিয়া বৃষ্টি আসিল।
বিনোদিনী তাহার ঘরে মেঝের
উপর বসিয়া। সম্মুখে কাপড়
স্তূপাকার। খেমি দাসী এক-
একখানি কাপড় অগ্রসর করিয়া
দিতেছে, আর বিনোদিনী মার্কা
দিবার কালি দিয়া তাহাতে অক্ষর
মুদ্রিত করিতেছে। মহেন্দ্র কোনো
সাড়া না দিয়া দরজা খুলিয়া
একেবারে ঘরের মধ্যে প্রবেশ
করিল। খেমি দাসি কাজ ফেলিয়া
মাথায় কাপড় দিয়া ঘর ছাড়িয়া ছুট
দিল।
বিনোদিনী কোলের কাপড় মাটিতে
ফেলিয়া দিয়া বিদ্যুদ্বেগে উঠিয়া
দাঁড়াইয়া কহিল, “যাও, আমার এ ঘর
হইতে চলিয়া যাও।”
মহেন্দ্র কহিল, “কেন, কী
করিয়াছি।”
বিনোদিনী। কী করিয়াছি। ভীরু
কাপুরুষ! কী করিবার সাধ্য আছে
তোমার। না জান ভালোবাসিতে,
না জান কর্তব্য করিতে। মাঝে
হইতে আমাকে কেন লোকের কাছে
নষ্ট করিতেছ!
মহেন্দ্র। তোমাকে আমি
ভালোবাসি নাই, এমন কথা বলিলে?
বিনোদিনী। আমি সেই কথাই
বলিতেছি। লুকাচুরি ঢাকাঢাকি,
একবার এদিক, একবার ওদিক–তোমার
এই চোরের মতো প্রবৃত্তি দেখিয়া
আমার ঘৃণা জন্মিয়া গেছে। আর
ভালো লাগে না। তুমি যাও।
মহেন্দ্র একেবারে মুহ্যমান হইয়া
কহিল, “তুমি আমাকে ঘৃণা কর,
বিনোদ!”
বিনোদিনী। হাঁ, ঘৃণা করি।
মহেন্দ্র। এখনো প্রায়শ্চিত্ত
করিবার সময় আছে, বিনোদ। আমি
যদি আর দ্বিধা না করি, সমস্ত
পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাই, তুমি
আমার সঙ্গে যাইতে প্রস্তুত আছ?
বলিয়া মহেন্দ্র বিনোদিনীর দুই
হাত সবলে ধরিয়া তাহাকে কাছে
টানিয়া লইল। বিনোদিনী কহিল,
“ছাড়ো, আমার লাগিতেছে।”
মহেন্দ্র। তা লাগুক। বলো, তুমি
আমার সঙ্গে যাইবে?
বিনোদিনী। না, যাইব না।
কোনোমতেই না।
মহেন্দ্র। কেন যাইবে না। তুমিই
আমাকে সর্বনাশের মুখে টানিয়া
আনিয়াছ, আজ তুমি আমাকে
পরিত্যাগ করিতে পারিবে না।
তোমাকে যাইতেই হইবে।
বলিয়া মহেন্দ্র সুদৃঢ়বলে
বিনোদিনীকে বুকের উপর টানিয়া
লইল, জোর করিয়া তাহাকে ধরিয়া
রাখিয়া কহিল, “তোমার ঘৃণাও
আমাকে ফিরাইতে পারিবে না,
আমি তোমাকে লইয়া যাইবই, এবং
যেমন করিয়াই হউক, তুমি আমাকে
ভালোবাসিবেই।”
বিনোদিনী সবলে আপনাকে
বিচ্ছিন্ন করিয়া লইল।
মহেন্দ্র কহিল, “চারি দিকে আগুন
জ্বালাইয়া তুলিয়াছ, এখন আর
নিবাইতেও পারিবে না,
পালাইতেও পারিবে না।”
বলিতে বলিতে মহেন্দ্রের গলা
চড়িয়া উঠিল, উচ্চৈঃস্বরে সে
কহিল, “এমন খেলা কেন খেলিলে,
বিনোদ। এখন আর ইহাকে খেলা
বলিয়া মুক্তি পাইবে না। এখন
তোমার আমার একই মৃত্যু।”
রাজলক্ষ্মী ঘরে ঢুকিয়া কহিলেন,
“মহিন, কী করছিস।”
মহেন্দ্রের উন্মত্ত দৃষ্টি এক
নিমেষমাত্র মাতার মুখের দিকে
ঘুরিয়া আসিল; তাহারপরে পুনরায়
বিনোদিনীর দিকে চাহিয়া
মহেন্দ্র কহিল, “আমি সব ছাড়িয়া
চলিয়া যাইতেছি, বলো, তুমি আমার
সঙ্গে যাইবে?”
বিনোদিনী ক্রুদ্ধা রাজলক্ষ্মীর
মুখের দিকে একবার চাহিল। তাহার
পর অগ্রসর হইয়া অবিচলিতভাবে
মহেন্দ্রের হাত ধরিয়া কহিল,
“যাইব।”
মহেন্দ্র কহিল, “তবে আজকের মতো
অপেক্ষা করো, আমি চলিলাম, কাল
হইতে তুমি ছাড়া আর আমার কেহই
রহিবে না।”
বলিয়া মহেন্দ্র চলিয়া গেল।
এমন সময় ধোবা আসিয়া
বিনোদিনীকে কহিল, “মাঠাকরুন,
আর তো বসিতে পারি না। আজ যদি
তোমাদের ফুরসৎ না থাকে তো
আমি কাল আসিয়া কাপড় লইয়া
যাইব।”
খেমি আসিয়া কহিল, “বউঠাকরুন,
সহিস বলিতেছে দানা ফুরাইয়া
গেছে।”
বিনোদিনী সাত দিনের দানা ওজন
করিয়া আস্তাবলে পাঠাইয়া দিত,
এবং নিজে জানালায় দাঁড়াইয়া
ঘোড়ার খাওয়া দেখিত।
গোপাল-চাকর আসিয়া কহিল,
“বউঠাকরুন, ঝড়ু-বেহারা আজ
দাদামশায়ের (সাধুচরণের) সঙ্গে
ঝগড়া করিয়াছে। সে বলিতেছে,
তাহার কেরোসিনের হিসাব
বুঝিয়া লইলেই সে সরকারবাবুর কাছ
হইতে বেতন চুকাইয়া লইয়া কাজ
ছাড়িয়া দিয়া চলিয়া যাইবে।”
সংসারের সমস্ত কর্মই পূর্ববৎ
চলিতেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now