বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আশা ফিরিয়া আসিল। বিনোদিনী
তাহার ‘পরে খুব অভিমান
করিল–”বালি, এতদিন বিদেশে
রহিলে, একখানা চিঠি লিখিতে
নাই?”
আশা কহিল, “তুমিই কোন্ লিখিলে
ভাই, বালি।”
বিনোদিনী। আমি কেন প্রথমে
লিখিব। তোমারই তো লিখিবার
কথা।
আশা বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া
ধরিয়া নিজের অপরাধ স্বীকার
করিয়া লইল। কহিল, “জান তো ভাই,
আমি ভালো লিখিতে জানি না।
বিশেষ, তোমার মতো পণ্ডিতের
কাছে লিখিতে আমার লজ্জা করে।”
দেখিতে দেখিতে দুইজনের বিবাদ
মিটিয়া গিয়া প্রণয় উদ্বেলিত
হইয়া উঠিল।
বিনোদিনী কহিল, “দিনরাত্রি সঙ্গ
দিয়া তোমার স্বামীটির অভ্যাস
তুমি একেবারে খারাপ করিয়া
দিয়াছ। একটি কেহ কাছে নহিলে
থাকিতে পারে না।”
আশা। সেইজন্যই তো তোমার উপরে
ভার দিয়া গিয়াছিলাম। কেমন
করিয়া সঙ্গ দিতে হয়, আমার চেয়ে
তুমি ভালো জান।
বিনোদিনী। দিনটা তো একরকম
করিয়া কালেজে পাঠাইয়া
নিশ্চিন্ত হইতাম, কিন্তু
সন্ধ্যাবেলায় কোনোমতেই
ছাড়াছুড়ি নাই–গল্প করিতে হইবে,
বই পড়িয়া শুনাইতে হইবে,
আবদারের শেষ নাই।
আশা। কেমন জব্দ! লোকের মন
ভুলাইতে যখন পার তখন লোকেই বা
ছাড়িবে কেন।
বিনোদিনী। সাবধান থাকিস, ভাই।
ঠাকুরপো যেরকম বাড়াবাড়ি করেন,
এক-একবার সন্দেহ হয়, বুঝি বশ
করিবার বিদ্যা জানি বা।
আশা হাসিয়া কহিল, “তুমি জান না
তো কে জানে। তোমার বিদ্যা
আমি একটুখানি পাইলে বাঁচিয়া
যাইতাম।” বিনোদিনী। কেন, কার
সর্বনাশ করিবার ইচ্ছা হইয়াছে।
ঘরে যেটি আছে, সেইটিকে রক্ষা
কর্, পরকে
ভোলাইবার চেষ্টা করিস নে ভাই
বালি। বড়ো ল্যাঠা। আশা
বিনোদিনীকে হস্তদ্বারা তর্জন
করিয়া বলিল, “আঃ, কী বকিস, তার
ঠিক নেই।” কাশী হইতে ফিরিয়া
আসার পর প্রথম সাক্ষাতেই মহেন্দ্র
কহিল, “তোমার শরীর বেশ ভালো
ছিল
দেখিতেছি, দিব্য মোটা হইয়া
আসিয়াছ।”
আশা অত্যন্ত লজ্জাবোধ করিল।
কোনোমতেই তাহার শরীর ভালো
থাকা উচিত ছিল না–কিন্তু মূঢ়
আশার কিছুই ঠিকমত চলে না;
তাহার মন যখন এত খারাপ ছিল,
তখনো তাহার পোড়া শরীর মোটা
হইয়া উঠিয়াছিল; একে তো মনের
ভাব ব্যক্ত করিতে কথা জোটে না,
তাহাতে আবার শরীরটাও উলটা
বলিতে থাকে।
আশা মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিল,
“তুমি কেমন ছিলে।” আগে হইলে
মহেন্দ্র কতক ঠাট্টা, কতক মনের
সঙ্গে বলিত, “মরিয়া ছিলাম।” এখন
আর ঠাট্টা করিতে পারিল না,
গলার কাছে আসিয়া বাধিয়া গেল।
কহিল, “বেশ ছিলাম, মন্দ ছিলাম
না।”
আশা চাহিয়া দেখিল, মহেন্দ্র
পূর্বের চেয়ে যেন রোগাই হইয়াছে–
তাহার মুখ পাণ্ডুবর্ণ, চোখে
একপ্রকার তীব্র দীপ্তি। একটা যেন
আভ্যন্তরিক ক্ষুধায় তাহাকে
অগ্নিজিহ্বা দিয়া লেহন করিয়া
খাইতেছে। আশা মনে মনে ব্যথা
অনুভব করিয়া ভাবিল, “আহা, আমার
স্বামী ভালো ছিলেন না, কেন
আমি উঁহাকে ফেলিয়া কাশী
চলিয়া গেলাম।” স্বামী রোগা
হইলেন, অথচ নিজে মোটা হইল,
ইহাতেও নিজের স্বাসেথ্যর প্রতি
আশার অত্যন্ত ধিক্কার জন্মিল।
মহেন্দ্র আর কী কথা তুলিবে
ভাবিতে ভাবিতে খানিক বাদে
জিজ্ঞাসা করিল, “কাকীমা ভালো
আছেন তো?”
সে প্রশ্নের উত্তরে কুশল-সংবাদ
পাইয়া তাহার আর দ্বিতীয় কথা
মনে আনা দুঃসাধ্য হইল। কাছে
একটা ছিন্ন পুরাতন খবরের কাগজ
ছিল, সেইটে টানিয়া লইয়া মহেন্দ্র
অন্যমনস্কভাবে পড়িতে লাগিল।
আশা মুখ নিচু করিয়া ভাবিতে
লাগিল, “এতদিন পরে দেখা হইল,
কিন্তু উনি আমার সঙ্গে কেন
ভালো করিয়াকথা কহিলেন না,
এমন-কি, আমার মুখের দিকেও যেন
চাহিতে পারিলেন না। আমি তিন-
চার দিন চিঠি লিখিতে পারি নাই
বলিয়া কি রাগ করিয়াছেন, আমি
মাসির অনুরোধে বেশি দিন
কাশীতে ছিলাম বলিয়া কি বিরক্ত
হইয়াছেন।” অপরাধ কোন্ ছিদ্র দিয়া
কেমন করিয়া প্রবেশ করিল, ইহাই
সে নিতান্ত ক্লিষ্টহৃদয়ে সন্ধান
করিতে লাগিল।
মহেন্দ্র কালেজ হইতে ফিরিয়া
আসিল। অপরাহ্নে জলপানের সময়
রাজলক্ষ্মী ছিলেন, আশাও ঘোমটা
দিয়া
অদূরে দুয়ার ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল,
কিন্তু আর কেহই ছিল না।
রাজলক্ষ্মী উদ্বিগ্ন হইয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন, “আজ কি তোর
অসুখ করিয়াছে মহিন।” মহেন্দ্র
বিরক্তভাবে কহিল, “না মা, অসুখ
কেন করবে।” রাজলক্ষ্মী। তবে তুই
যে কিছু খাইতেছিস না! মহেন্দ্র
পুনর্বার উত্ত্যক্তস্বরে কহিল, “এই
তো, খাচ্ছি না তো কী।” মহেন্দ্র
গ্রীষেমর সন্ধ্যায় একখানা পাতলা
চাদর গায়ে ছাদের এধারে ওধারে
বেড়াইতে লাগিল। মনে বড়ো
আশা ছিল, তাহাদের নিয়মিত
পড়াটা আজ ক্ষান্ত থাকিবে না।
আনন্দমঠ প্রায় শেষ হইয়াছে, আর
গুটি দুই-তিন অধ্যায় বাকি আছে
মাত্র। বিনোদিনী যত নিষ্ঠুর হোক
সে-কয়টা অধ্যায় আজ তাহাকে
নিশ্চয় শুনাইয়া যাইবে। কিন্তু
সন্ধ্যা অতীত হইল, সময় উত্তীর্ণ
হইয়া গেল, গুরুভার নৈরাশ্য বহিয়া
মহেন্দ্রকে শুইতে যাইতে হইল।
সজ্জিত লজ্জান্বিত আশা ধীরে
ধীরে শয়নকক্ষে প্রবেশ করিল।
দেখিল, বিছানায় মহেন্দ্র শুইয়া
পড়িয়াছে। তখন, কেমন করিয়া
অগ্রসর হইবে ভাবিয়া পাইল না।
বিচ্ছেদের পর কিছুক্ষণ একটা নূতন
লজ্জা আসে-যেখানটিতে ছাড়িয়া
যাওয়া যায় ঠিক সেইখানটিতে
মিলিবার পূর্বে পরস্পর পরস্পরের
নিকট হইতে নূতন সম্ভাষণের
প্রত্যাশা করে। আশা তাহার সেই
চিরপরিচিত আনন্দশয্যাটিতে আজ
অনাহূত কেমন করিয়া প্রবেশ
করিবে। দ্বারের কাছে অনেকক্ষণ
দাঁড়াইয়া রহিল–মহেন্দ্রের কোনো
সাড়া পাইল না। অত্যন্ত ধীরে
ধীরে এক পা এক পা করিয়া অগ্রসর
হইতে লাগিল। যদি অসতর্কে দৈবাৎ
কোনো গহনা বাজিয়া উঠে তো সে
লজ্জায় মরিয়া যায়। কম্পিতহৃদয়ে
আশা মশারির কাছে আসিয়া অনুভব
করিল, মহেন্দ্র ঘুমাইতেছে। তখন
তাহার নিজের সাজসজ্জা তাহাকে
সর্বাঙ্গে বেষ্টন করিয়া পরিহাস
করিতে লাগিল। ইচ্ছা হইল,
বিদ্যুদ্বেগে এ ঘর হইতে বাহির হইয়া
অন্য কোথাও গিয়া শোয়।
আশা যথাসাধ্য নিঃশব্দে সংকুচিত
হইয়া খাটের উপর গিয়া উঠিল। তবু
তাহাতে এতটুকু শব্দ ও নড়াচড়া হইল
যে, মহেন্দ্র যদি সত্যই ঘুমাইত,
তাহা হইলে জাগিয়া উঠিত। কিন্তু
আজ তাহার চক্ষু খুলিল না, কেননা,
মহেন্দ্র ঘুমাইতেছিল না। মহেন্দ্র
খাটের অপর প্রান্তে পাশ ফিরিয়া
শুইয়া ছিল, সুতরাং আশা তাহার
পশ্চাতে শুইয়া রহিল। আশা যে
নিঃশব্দে অশ্রুপাত করিতেছিল,
তাহা পিছন ফিরিয়াও মহেন্দ্র
স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছিল। নিজের
নিষ্ঠুরতায় তাহার হৃৎপিণ্ডটাকে
যেন জাঁতার মতো পেষণ করিয়া
ব্যথা দিতেছিল। কিন্তু কী কথা
বলিবে, কেমন করিয়া আদর করিবে,
মহেন্দ্র তাহা কোনোমতেই
ভাবিয়া পাইল না; মনে মনে
নিজেকে সুতীব্র কশাঘাত করিতে
লাগিল, তাহাতে আঘাত পাইল,
কিন্তু উপায় পাইল না। ভাবিল,
“প্রাতঃকালে তো ঘুমের ভান করা
যাইবে না, তখন মুখোমুখি হইলে
আশাকে কী কথা বলিব।”
আশা নিজেই মহেন্দ্রের সে সংকট
দূর করিয়া দিল। সে অতি প্রত্যুষেই
অপমানিত সাজসজ্জা লইয়া
বিছানা ছাড়িয়া চলিয়া গেল, সে-
ও মহেন্দ্রকে মুখ দেখাইতে পারিল
না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now