বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আশার পক্ষে সঙ্গিনীর বড়ো দরকার
হইয়াছিল। ভালোবাসার উৎসবও
কেবলমাত্র দুটি লোকের দ্বারা
সম্পন্ন হয় না–সুখালাপের মিষ্টান্ন
বিতরণের জন্য বাজে লোকের
দরকার হয়।
ক্ষুধিতহৃদয়া বিনোদিনীও নববধূর
নবপ্রেমের ইতিহাস মাতালের
জ্বালাময় মদের মতো কান পাতিয়া
পান করিতে লাগিল। তাহার
মস্তিষ্ক মাতিয়া শরীরের রক্ত
জ্বলিয়া উঠিল।
নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে মা যখন
ঘুমাইতেছেন, দাসদাসীরা একতলার
বিশ্রামশালায় অদৃশ্য, মহেন্দ্র
বিহারীর তাড়নায় ক্ষণকালের জন্য
কলেজে গেছে এবং রৌদ্রতপ্ত
নীলিমার শেষ প্রান্ত হইতে চিলের
তীব্র কণ্ঠ অতিক্ষীণ স্বরে কদাচিৎ
শুনা যাইতেছে, তখন নির্জন
শয়নগৃহে নীচের বিছানায়
বালিশের উপর আশা তাহার খোলা
চুল ছড়াইয়া শুইত এবং বিনোদিনী
বুকের নীচে বালিশ টানিয়া উপুড়
হইয়া শুইয়া গুনগুন-গুঞ্জরিত
কাহিনীর মধ্যে আবিষ্ট হইয়া রহিত,
তাহার কর্ণমূল আরক্ত হইয়া উঠিত,
নিশ্বাস বেগে প্রবাহিত হইতে
থাকিত।
বিনোদিনী প্রশ্নকরিয়া করিয়া
তুচ্ছতম কথাটি পর্যন্ত বাহির করিত,
এক কথা বার বার করিয়া শুনিত,
ঘটনা নিঃশেষ হইয়া গেলে
কল্পনার অবতারণা করিত–কহিত,
“আচ্ছা ভাই, যদি এমন হইত তো কী
হইত, যদি অমন হইত তো কী করিতে।”
সেই-সকল অসম্ভাবিত কল্পনার পথে
সুখালোচনাকে সুদীর্ঘ করিয়া
টানিয়া লইয়া চলিতে আশারও
ভালো লাগিত।
বিনোদিনী কহিত, “আচ্ছা ভাই
চোখের বালি, তোর সঙ্গে যদি
বিহারীবাবুর বিবাহ হইত।”
আশা। না ভাই, ও কথা তুমি বলিয়ো
না–ছি ছি, আমার বড়ো লজ্জা
করে। কিন্তু তোমার সঙ্গে হইলে
বেশ হইত, তোমার সঙ্গেও তো কথা
হইয়াছিল।
বিনোদিনী। আমার সঙ্গে তো ঢের
লোকের ঢের কথা হইয়াছিল। না
হইয়াছে, বেশ হইয়াছে–আমি যা
আছি, বেশ আছি।
আশা তাহার প্রতিবাদ করে।
বিনোদিনীর অবস্থা যে তাহার
অবস্থার চেয়ে ভালো, এ কথা সে
কেমন করিয়া স্বীকার করিবে।
“একবার মনে করিয়া দেখো দেখি
ভাই বালি, যদি আমার স্বামীর
সঙ্গে তোমার বিবাহ হইয়া যাইত।
আর একটু হলেই তো হইত।”
তা তো হইতই। না হইল কেন। আশার
এই বিছানা, এই খাট তো একদিন
তাহারই জন্য অপেক্ষা করিয়া ছিল।
বিনোদিনী এই সুসজ্জিত শয়নঘরের
দিকে চায়, আর সে কথা কিছুতেই
ভুলিতে পারে না। এ ঘরে আজ সে
অতিথিমাত্র–আজ স্থান পাইয়াছে,
কাল আবার উঠিয়া যাইতে হইবে।
অপরাহ্নে বিনোদিনী নিজে
উদ্যোগী হইয়া অপরূপ নৈপুণ্যের
সহিত আশার চুল বাঁধিয়া সাজাইয়া
তাহাকে স্বামীসম্মিলনে
পাঠাইয়া দিত। তাহার কল্পনা যেন
অবগুণ্ঠিতা হইয়া এই সজ্জিতা বধূর
পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুগ্ধ যুবকের
অভিসারে জনহীন কক্ষে গমন করিত।
আবার এক-এক দিন কিছুতেই আশাকে
ছাড়িয়া দিত না। বলিত, “আঃ, আর-
একটু বসোই-না। তোমার স্বামী তো
পালাইতেছেন না। তিনি তো বনের
মায়ামৃগ নন, তিনি অঞ্চলের পোষা
হরিণ।” এই বলিয়া নানা ছলে ধরিয়া
রাখিয়া দেরি করাইবার চেষ্টা
করিত।
মহেন্দ্র অত্যন্ত রাগ করিয়া বলিত,
“তোমার সখী যে নড়িবার নাম
করেন না–তিনি বাড়ি ফিরিবেন
কবে।”
আশা ব্যগ্র হইয়া বলিত, “না, তুমি
আমার চোখের বালির উপর রাগ
করিয়ো না। তুমি জান না, সে
তোমার কথা শুনিতে কত
ভালোবাসে–কত যত্ন করিয়া
সাজাইয়া আমাকে তোমার কাছে
পাঠাইয়া দেয়।”
রাজলক্ষ্মী আশাকে কাজ করিতে
দিতেন না। বিনোদিনী বধূর পক্ষ
লইয়া তাহাকে কাজে প্রবৃত্ত
করাইল। প্রায় সমস্ত দিনই
বিনোদিনীর কাজে আলস্য নাই,
সেই সঙ্গে আশাকেও সে আর ছুটি
দিতে চায় না। বিনোদিনী পরে-
পরে এমনি কাজের শৃঙ্খল
বানাইতেছিল যে, তাহার মধ্যে
ফাঁক পাওয়া আশার পক্ষে ভারি
কঠিন হইয়া উঠিল। আশার স্বামী
ছাদের উপরকার শূন্য ঘরের কোণে
বসিয়া আক্রোশে ছটফট করিতেছে,
ইহা কল্পনা করিয়া বিনোদিনী
মনে মনে তীব্র কঠিন হাসি
হাসিত। আশা উদ্বিগ্ন হইয়া বলিত,
“এবার যাই ভাই চোখের বালি,
তিনি আবার রাগ করিবেন।”
বিনোদিনী তাড়াতাড়ি বলিত,
“রোসো, এইটুকু শেষ করিয়া যাও। আর
বেশি দেরি হইবে না।”
খানিক বাদে আশা আবার ছটফট
করিয়া বলিয়া উঠিত, “না ভাই,
এবার তিনি সত্যসত্যই রাগ করিবেন-
আমাকে ছাড়ো, আমি যাই।”
বিনোদিনী বলিত, “আহা, একটু রাগ
করিলই বা। সোহাগের সঙ্গে রাগ
না মিশিলে ভালোবাসার স্বাদ
থাকে না–তরকারিতে
লঙ্কামরিচের মতো।”
কিন্তু লঙ্কামরিচের স্বাদটা যে
কী, তাহা বিনোদিনীই
বুঝিতেছিল–কেবল সঙ্গে তাহার
তরকারি ছিল না। তাহার শিরায়
শিরায় যেন আগুন ধরিয়া গেল। সে
যে দিকে চায়, তাহার চোখে যেন
স্ফুলিঙ্গবর্ষণ হইতে থাকে। “এমন
সুখের ঘরকন্না–এমন সোহাগের
স্বামী। এ ঘরকে যে আমি রাজার
রাজত্ব, এ স্বামীকে যে আমি
পায়ের দাস করিয়া রাখিতে
পারিতাম। তখন কি এ ঘরের এই দশা,
এ মানুষের এই ছিরি থাকিত। আমার
জায়গায় কিনা এই কচি খুকি, এই
খেলার পুতুল!” (আশার গলা জড়াইয়া)
“ভাই চোখের বালি, বলো-না ভাই,
কাল তোমাদের কী কথা হইল ভাই।
আমি তোমাকে যাহা শিখাইয়া
দিয়াছিলাম তাহা বলিয়াছিলে?
তোমাদের ভালোবাসার কথা
শুনিলে আমার ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না
ভাই।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now