বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
¤¤¤ চক্র ¤¤¤
(১ম পর্ব)
By : এডমিন।
---------------------
ঘাসের উপর দুটো ঘুঘু পাখি বসে আছে।
দৃশ্যটা অদ্ভুত।
ঘুঘু নির্জনতাপ্রিয় পাখি, এই ভিড়ে বসে থাকার কথা না।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড মানেতো
রীতিমতো বাজার। এই হট্টগোলে নিশ্চিন্তমনে
পাখিদুটো ঘোরাফেরা করছে। ঢাকা শহরে
লোকের ভিড়ে থেকে এ দুটো পাখির সাহস
বেড়ে গেছে, তাই মানুষের আসা-যাওয়া কেয়ার
করছে না। কিংবা গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে এই
ব্যস্ত নগরে এসে পাল্টে যাওয়া মানুষগুলোর
মতো এ পাখিগুলোরও স্বভাব পাল্টে গেছে।
কথায় বলে ভিটেয় ঘুঘু চড়ানো। এ কথা বলে হুমকি
দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এমনই দুরবস্থা করা হবে
যেন ভিটেমাটি খালি পড়ে থাকে। সেখানে সকাল
বিকেল ঘুঘু পাখি মচ্ছব করবে। বাংলার এ প্রবাদ
থেকে বোঝা যায়, ঘুঘু পাখি নির্জনতা পছন্দ
করে। তাহলে বেলা এগারোটায় এই হৈচৈয়ের
মধ্যে পাখিদুটো কী করছে?
কপাল কুঁচকে ভাবতে থাকে তন্ময়।
পাখি দুটোকে দেখে প্রিয় কবি রুদ্র মুহাম্মদ
শহীদুলার একটি কবিতা মনে পড়ে গেল,
থাকুক আমার এটুকু স্মৃতি থাকুক
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটা ঘুঘু ডাকুক
এ কবিতাও কী ঘুঘুর নৈশব্দ প্রিয়তাই প্রমাণ করছে
না?
টানা এক ঘন্টা ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের
সামনে দাঁড়িয়ে আছে তন্ময়। এই এক ঘন্টায় চার
কাপ চা আর পাঁচটি সিগারেট শেষ করেছে। এখন
বসে বসে কবিতা আউড়ানো ছাড়া আর করার কিছু
নেই।
আমিনুলের দেখা নাই।
কোনো অ্যাসাইনমেন্টেই সময়মতো পৌছায়না
বলে বদনাম আছে আমিনুলের। গতকাল রাতে চিফ
রিপোর্টার এই অ্যাসাইনমেন্টটা আমিনুলকে
দেওয়ার সময় প্রতিবাদ করেছিলো তন্ময়। জিয়ার
ডে অফ থাকায় সকালে আমিনুল ছাড়া আর কোনো
ফটোগ্রাফার ফ্রি ছিল না। বাধ্য হয়ে তাকেই
মেনে নিতে হয়েছে। রাতে অফিস থেকে
বেরুবার সময় বার বার করে বলেছিলো, ঠিক সকাল
দশটার মধ্যে মেডিকেলে পৌছে যেতে। তখন
দাঁত কেলিয়ে আমিনুল বলেছিলো,
ওক্কে বস, কোনো চিন্ত কইরেন না। দশটায়
ঠিক পৌছায়া যামু।
এখন এগারোটা বাজতে চললো, কোনো খবর
নেই। মোবাইলে ফোন করলে বলছে-
সংযোগ দেওয়া সম্ভব না। বেলা গড়ানোর সঙ্গে
সঙ্গে চক্রবৃদ্ধিহারে মেজাজ খারাপ হচ্ছে।
রঞ্জুর ফ্রাস্ক থেকে আরেক কাপ লেবু চা
খাবে কিনা ভাবতে ভাবতে প্যাকেট খুলে সিগারেট
বের করে তন্ময়। গত এক ঘন্টার বিরক্তিকর
মুহুর্তগুলোতে কিছুটা বিনোদন যুক্ত করেছে
এই রঞ্জু। দেখতে ছোটখাট হলে কি হবে,
একজন পাঁকা ব্যবসায়ী। সুযোগ পেলেই
গ্রাহককে নয়-ছয় বুঝিয়ে বোকা বানাচ্ছে।
একটু আগেই ইমার্জেন্সিতে গুরুতর আহত
মধ্যবয়স্ক এক লোককে নিয়ে ঢুকলো
কয়েকজন। কিছুক্ষণ পর ওই দলের তিন যুবক
বাইরে এসে সিগারেট ধরায়। পাশেই ঘুরঘুর
করছিলো রঞ্জু। যুবকদের দুজন কাছ থেকে চা
নিয়ে খেতে থাকে। অন্যজন সম্ভবত চা রসিক
নন। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে চলছিলো উত্তেজিত
বাক্য বিনিময়। একটু দূরে থাকায় তাদের কথাগুলো
স্পষ্ট শুনতে না পেলেও তন্ময় বুঝতে পারে,
যুবকেরা একইসঙ্গে কোনোকিছু নিয়ে
উত্তেজিত এবং উদ্বিগ্ন। কথার ফাঁকেই একজন
চায়ের দাম পরিশোধের জন্য বিশ টাকার একটি
নোট বাড়িয়ে দেয় রঞ্জুর দিকে। আর ওই
পিচ্চিও দু কাপ রং চায়ের দাম আট টাকার বদলে বার
টাকা রেখে আট টাকা ফেরত দেয়।
একটু দূর থেকে পুরো বিষয়টি লক্ষ্য করে
তন্ময়।
প্রথমে ভেবেছিল ছোট মানুষ, ভুল করে আট
টাকা দাম রাখার বদলে আট টাকা ফেরত দিয়েছে।
কিন্তু একটু পরেই আরেকটি দলের কাছে চা বিক্রি
করতে গিয়ে একই কান্ড ঘটায় রঞ্জু। এবার তার
কপাল খারাপ। টাকা গুনে বাকি টাকাটা ফেরত চাইলো
গ্রাহক। ভুল হয়ে গেছে, এমন একটি ভঙ্গী
করে সঙ্গে সঙ্গেই টাকা ফেরত দিলো রঞ্জু।
অন্য যে কেউ এ ঘটনায় মনে করবে ভুল করে
বুঝি চা বিক্রেতা কম টাকা ফেরত দিয়েছে, কিন্তু
পর পর দুটি ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে
দেখেছে বলেই তন্ময় জানে, এটা পিচ্চি চা
ওয়ালার বিজনেস ট্রিক। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে
আসা গুরুতর আহত বা অসুস্থ্য রোগীর শঙ্কিত ও
শোকাহত স্বজনদের তুচ্ছ টাকা-পয়সার হিসেব
মাথায় না থাকাটাই স্বাভাবিক। এ সুযোগে দিব্যি টু পাইস
কামিয়ে নিচ্ছে রঞ্জু মিয়া।
টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে যতোই ছল-চাতুরি করুক,
রঞ্জুর চা টা খেতে বেশ। আরেক কাপ খাওয়া
যেতে পারে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় তন্ময়।
সময় কাটানোর জন্য রঞ্জুর সঙ্গে আলাপ জুরে
দেয়।
‘কতোদিন ধইরা চা বেচস?’
‘এই ধরেন চাইর-পাঁচ বচ্ছর’
রঞ্জর বয়স হবে বড় জোর দশ। চার-পাঁচ বছর
ধরে চা বিক্রি করছে? হাসি চেপে আলাপ চালিয়ে
যায় তন্ময়, সময়তো কাটাতে হবে! আর তা ছাড়া
রঞ্জুর কথা বলার ভঙ্গিটাও বেশ মজার। প্রতিটি
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে গম্ভীর হয়ে
কিছুক্ষন ভেবে নেয়; যেন একটি ভাবগম্ভীর
প্রেস কনফারেন্সে বসে ঘাঘু সাংবাদিকের জটিল
প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
‘দিনে কয় টাকা লাভ হয়?’
‘পঞ্চাশ-একশ ট্যাকা।’
এরপর আর আলাপ এগোয় না। গ্রাহক ধরতে
ব্যাস্ত হাতে ছুটে যায় রঞ্জু। সেটাও একটা দৃশ্য
বটে। প্রায় নিজের সমান দৈর্ঘের ফাস্কটি কী
অনায়াসে বয়ে বেড়াচ্ছে।
‘ভাই, পাঁচশ টাকার ভাংতি হবে?’
মাধ্য বয়সী লোকটা কিছুক্ষন ধরেই এখানে-
সেখানে ভাংতি খুঁজছেন। এবং যথারীতি কোনো
দোকানদারই তাকে ভাংতি দিচ্ছে না। এদিকে যে
সিএনজিতে করে তিনি এসেছেন সেটা আবার
যাত্রী তুলে নিয়েছে। এখন তাড়া দিচ্ছে ভাড়া
পরিশোধের জন্য। ঘটনার চাপে লোকটি
ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। সঙ্গের
কিশোরী মেয়েটিও ঘেমে-নেয়ে একাকার।
যেন পাঁচশ টাকার ভাংতি না থাকাটা মস্ত অপরাধ।
কিন্তু তন্ময়ের কাছে ভাংচি চেয়ে লাভ কী?
পকেটে সাকুল্যে শ তিনেক টাকা আছে। এর
মধ্যে একটি পঞ্চাশ টাকার নোটে টেপ মারা। গত
কদিন ধরে বহুবার চেষ্টা করেও চালানো যায়নি।
ভাংতি দিতে না পারলেও অসহায় ভদ্রলোকের
সাহায্যে এগিয়ে যায় তন্ময়।
‘তোমার ভাড়া কতো?’ সিএনজির ড্রাইভারকে
জিজ্ঞেস করে তন্ময়।
‘আশি ট্যাকা।’
রঙ্গমঞ্চে তন্ময়ের মতো একজন তরুণের
প্রবেশে কিছুটা হকচকিয়ে যায় সিএনজি চালক।
কিশোরীসমেত একজন মধ্যবয়স্ক লোকের
সঙ্গে ঝাড়ি দিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু জ্বলন্ত
সিগারেট হাতে, লম্বা চুলের জিন্স পরা তরুনের
সঙ্গে যথেষ্ট সাবধানে কথা বলতে হবে- এটুকু
বুদ্ধি তার আছে।
‘তোমার কাছে চারশ টাকা নাই?’
‘না স্যার।’
এবার সিএনজিতে বসে থাকা যাত্রীর দিকে তাকায়
তন্ময়।
‘আপা, আপনার কাছে পাঁচশ টাকার ভাংতি আছে? অথবা
আপনি কী এই ভদ্রলোককে চারশ টাকা দিতে
পারেন? পরে সিএনজি ওয়ালার ভাড়ার সঙ্গে
অ্যাডজাস্ট করে নিবেন।’
তন্ময়ের অনুরোধে কাজ হয়। সহজেই মিটে
যায় ভাংতির ঝামেলা। সংক্ষিপ্ত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ব্যস্ত
পায়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যান প্রৌঢ়।
সম্ভবত কোনো রোগী দেখতে
এসেছেন।
আবার হাত ঘড়ির দিকে তাকায় তন্ময়।
সাড়ে এগারোটা বাজে।
শালার আমিনুল কোথায় মরলো?
কয়েক দিন ধরে রিপোর্টের খড়া যাচ্ছে। হাতে
জামানোও কিছু নাই। এদিকে নিউজ এডিটর তারেক
ভাই সমানে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন স্পেশাল স্টোরির
জন্য। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে হাসপাতাল নিয়ে
একটা সিরিজ স্টোরির প্ল্যান জমা দিয়ে ছিলো
তন্ময়। সেটা যে তারেক ভাই সম্পাদকের কাছে
দেবেন এবং সম্পাদক এই আইডিয়াটা এতোটা পছন্দ
করবেন, সেটা কে জানতো!
পুলিশ-হাসপাতাল এ বিষয়গুলো রিপোর্টারদের
আপদকালীন মজুদের মতো। কখনো
রিপোর্টের আকাল পড়লে এসব জায়গায় একটু
খোঁজ-খবর করলেই স্টোরি দাঁড়িয়ে যায়। হাসপাতাল
আর পুলিশ স্টেশনতো আসলে নিউজে আখড়া।
সে কথা ভেবেই সরকারি হাসপাতালের দুর্নীতি
নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরিকল্পনাটি জমা
দিয়েছিল তন্ময়। সম্পাদকের অনুমোদনের পর
পিছিয়ে আসার আর কোনো পথ থাকলো না।
ফলাফল- সকাল দশটা থেকে দেড় ঘন্টা ধরে
হাসপাতালের সামনে ঠায় দাঁড়ানো।
জিন্সের পকেটে মুঠোফোনরটা গা ঝাড়া দিয়ে
উঠে। হাতে নিয়ে স্ক্রিনটা দেখে সঙ্গে
সঙ্গেই কলটা রিসিভ করে তন্ময়। বহুল প্রতীতি
আমিনুল বাবাজির ফোন।
ফোনটা হাতে নিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে
অবাক হয়ে যায় তন্ময়। হাসপাতালের গেট থেকে
দৌড়ে আসছে সাদেক সরকার। চার ফুট দশ ইঞ্চি
উচ্চতার সাদেক সরকারের শরীরের মধ্য
প্রদেশে একটা বেমামান ভাবে উঁচু, গালে চাপ
দাড়ি। মাথায় সবসময় একটা সাদা গোল টুপি। এই
চেহারার একটি লোকের এভাবে উধশ্বাসে
দৌড়ানোর দৃশ্য সকাল-বিকেল দেখা যায় না।
নিশ্চই গুরুতর কিছু ঘটেছে।
আরে, সাদেক তো তন্ময়ের দিকেই ছুটে
আসছে। ভ্র“ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকে
তন্ময়।
বিষয় কী?
ওদিকে ফোনের অপর প্রান্তে আমিনুল
প্রাণপণে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে।
এতোণে খেয়াল হয়ে তন্ময়ের। জবাব দেয়,
‘কী ব্যপার আমিনুল?’
‘তনুভাই আপনে কই? হাসপাতালের সামনে? বিরাট
গ্যাঞ্জাম লাগছে। আপনের দারুন বিপদ। বস,
আপনে যেইখানে আছেন নড়বেন না। আমি পাঁচ
মিনিটে আসতাছি...।’
আমিনুলের ফোন পেয়ে হতভম্ব হয়ে যায়
তন্ময়। ততক্ষণে সাদেক সরকার তন্ময়ের
সামনে দাঁড়িয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now