বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
চিঠির প্রতিটা শব্দ গল্প
--------- ইয়াসির আরাফাত
কাঁক পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে প্রকৃতি। এমন প্রখর রোদ উপেক্ষা করে মানুষের ঘামে ভেজা শরীরের ভীড় ঠেলে শহরের ব্যস্ততম সড়ক ধরে হাঁটছি আমি । বুকপকেটে সযত্নে সুবাস ছড়াচ্ছে একজনের মন । আসলে একটা চিঠি; যেখানে মেয়েটাই লিখেছে- ‘কাগজে লেখা চিরকুট নয় শুধু, আমার মন পাঠালাম।’
যে মেয়েটির মন নিয়ে আমি হাঁটছি আমি তাকে চিনি না ; তবে সে আমাকে চিনে । অনেক আগে আমাদের বাড়িতে ব্যবহৃত টেলিফোন নাম্বার সে জানে । যেটা আমার নিজেরও ঠিক মনে ছিলোনা । কলেজে পড়ার সময় একবার রোড এক্সিডেন্টে প্রায় মরে গিয়েছিলাম । বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম, এই ঘটনার কথা ও সে চিঠিতে লিখেছে । আরো লিখেছে- যে কোন উজ্জ্বল রঙের প্রতি আমার তীব্র আকর্ষনের কথা, অন্ধকার ভীতির কথা, বিনয় মজুমদারের কবিতা প্রীতির কথা, আমার বুকের ডানপাশে কালো জন্মদাগটির কথা ।
আমি কিছুটা অস্থির বোধ করছি । ছোটবেলা থেকে ছাগলের মতো ঘি'য়ে ভাজা বেলপাতা খেয়েছি অথবা তেঁতুল গাছের ত্রিসীমানায় যাইনি বলেই হয়ত আমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো । কিন্তু আমি কিছুতেই পত্র-লেখিকাকে চিনতে পারছিনা । তবে মেয়েটার জন্য আমার ভেতর চমৎকার একটা বোধ তৈরি হচ্ছে । আশ্চর্য সব কথা লিখে রেখেছে সারাটা চিঠি জুড়ে । এক লাইন ভেবে, তারপর অন্য লাইন পড়তে হয় । এক জায়গায় লিখলো-
শব্দ করে বলো ‘ভালোবাসি’, দেখবে বুকের মধ্য হতে একটা মৌমাছি উড়ে যাবে; পড়ে থাকবে এক ফোঁটা মধু ।
কি জানি কি অর্থ এসব কথার । অন্য এক জায়গায় লিখলো-
ধরো একটা বৃক্ষ। তার শাখায় শাখায় নতুন মুকুল এসেছে; দেখতে আসবে না?
এসব কথার অর্থ আনিস অবশ্যই জানবে । আনিস- দি পত্রলেখক । চিঠির সাংকেতিক ভাষা উদ্ধার এবং চিঠি লিখে দেওয়া, এই ছিলো বন্ধুমহলে আনিসের কাজ । আমার মনে পড়ে আফ্রোজার লেখা চিঠির কথা । একই স্যারের কাছে পড়তে যেতাম আমি আর আফ্রোজা । সে হাসলে গালের বাম পাশে গভীর একটা গর্ত হয়ে যেতো । আমি বলতাম একটা পুকুর হতো । ভয়ানক সুন্দর সেই পুকুরে আমি প্রায়ই গলায় কলসী বেঁধে নেমে পড়তাম । একদিন সে আমার রসায়ন বইটা চেয়ে নিলো বাসায় নিবে বলে । পরদিন যখন বইটা ফিরিয়ে দিলো ঠিক এরকম একটা সুবাস বইয়ের মধ্য হতে বেরিয়ে এসেছিলো । বাসায় ফিরে ‘পর্যায় সারণী’ অধ্যায় খুলতেই পেলাম একটা পত্র । প্রথম পত্র । এক জায়গায় লিখেছিলো-
আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে ,
তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে ,
চিঠি লিখব না ।
আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।
আনিস অনেক্ষণ ধরে চেষ্টার পর বীনয় মজুমদারের কবিতার ভাষা, রসায়নের ভাষায় লেখা এই চিঠির পাঠ উদ্ধার করতে পেরেছিলো । তবে সেই পত্রের জাবাব আমার দেয়া হয়নি । কারন, সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে বুকপকেটে ভিজে যাওয়া পত্রটা পেয়েছিলেন আমার মা । মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাবে এই ভয়ে আম্মু স্যারের বাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন । আফ্রোজার সাথে আর দেখা হয়নি আমার । অনিসের দেখা পেলে ভালো হতো। আনিস এখন কোথায় থাকে জানি না । তার সাথে যোগাযোগ নেই এক যুগেরও বেশী।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমি চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীর সামনের রাস্তায় চলে এলাম। এখানে এসে আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো। দেখলাম একজোড়া ছেলেমেয়ে বসে আছে রাস্তার ধারে। ছেলেটা হাত নেড়ে, মাথা দুলিয়ে কি সব বলে যাচ্ছে আর মেয়েটা হেসে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে ছেলেটার গায়ে। অদ্ভুত সুন্দর এসব দৃশ্য দেখার জন্যই বুঝি পরম করূণাময় এই পৃথিবী বানিয়েছেন। নাকি বুকপকেট থেকে উঠে আসা আশ্চর্য্য সেই গন্ধটা আমার ভেতর সৌন্দর্যের ব্যপারে একধরনের বিভ্রম তৈরি করেছে? নয়ত রাস্তার পাশের খোলা ডাষ্টবিনগুলোকেও কেন মনে হচ্ছে জয়নুলের এক একটা পোর্ট্রেট? বিপরীত দিক হতে ছুটে আসা প্রতিটা রিক্সাকে কেনই বা মনে হবে উড়ে আসা এক একটা প্রজাপতি? প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই ঘরে ফেরা পতঙ্গের মতো যে আমি ফিরে যাই ঘুমঘরে, কিসের উত্তেজনায় আমি এখনো জেগে আছি রাস্তায়?
এই মুহুর্তে তিনজন যুবক আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে ধারালো ক্ষুর। এদেরকে দেখে আমার একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল। হ্যাঁ, কৌতুক। এরকম উদ্ভট মজা প্রায়ই জীবন আমাদের সাথে করে থাকে। শফিকের সাথেও করেছিলো। শফিক আমাদের এক বছরের বড়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য মেধাবী ছাত্র হিসেবে শফিক পেয়েছিল জেলা পরিষদ পদক। কি এমন অনর্থ ঘটলো শফিক কাছে টেনে নিয়েছিলো নেশার আধি-ভৌতিক জগত। হিরোইন নিয়ে বুদ হয়ে থাকতো প্রায়। এই বস্তুর নাম কেন হিরোইন হয়েছে জানা নেই আমার। সেটা এখানে অপ্রাসঙ্গিকও বটে। তবে নেশার টাকা জোগাড় করতে ছিনতায়ের উদ্দেশ্যে শফিক যখন অন্ধকার গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো তখন তার হাতেও শোভা পেতো একটা ঝকঝকে ক্ষুর। এর-তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে পালানোর সময় অনেক মানুষের বোধগম্য হতো না জীবনের এই কৌতুকের অর্থ। জীবনের কৌতুকটা ছিলো নিষ্ঠুর । এতোটাই ব্যঙ্গাত্মক ছিলো যে, শফিক এক মহিলার ব্যাগ নিয়ে পালাতে গিয়ে বজ্রাঘাতের মত দাঁড়িয়ে পড়েছলো। কারণ অন্ধকারের আধো আলোয় যে মহিলার চেহারা সে দেখেছিলো সেই মহিলা ছিলো ওর মা। শফিক আজো বাড়ি ফিরেনি।
যে ছেলেগুলো আমাকে ঘিরে আছে ছিনতায়ের উদ্দেশ্যে তারা আমাকে চিনতে পারছে না। কিন্তু আমি তাদের চিনতে পারছি। তাহলে কি আমার প্রার্থনা সত্যি হতে যাচ্ছে ! একটা কবিতায় লিখেছিলাম ...
মনে রাখার মতো কিছু নেই,
মনে রেখো না ;
অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না মানুষ ।
এমনতো হতেই পারে কারো মনে নেই আমার কথা।
অপরিচিতের মতো দাঁড়ালে, হেঁটে গেলে
চিনতে পারছো না ।
চিনতে না পারার জন্যই বোধয় আমার প্রতি তারা খুব একটা সুহৃদ না। তাদের একজন একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বললো- দামি যা কিছু আছে দিয়ে দিতে। নয়তো ছেলেটা তার হাতের ক্ষুরটা পিকাসোর তুলির শৈল্পিক আঁচড়ের মতো আমার পেটে চালিয়ে দিবে।
কিন্তু ছেলেটার প্রথম কথাটা আমাকে ভাবনায় ফেলে দিলো। এই মুহুর্তে বুকপকেটে রাখা চিঠিটাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। কিংবা বার্সেলোনা রিয়েল মাদ্রিদ্রের পুরানো একটা ম্যাচের টিকেট আছে মানিব্যাগে; স্মৃতির ঐ টুকরোটাও আমার কাছে অমূল্য। এসব দিলে তারা কি চলে যাবে? মনে হয় না; বরং এই মুহুর্তে আমার কাছে মূল্যহীন, কিছু টাকা আর মোবাইল সেটটা দিয়ে দিলাম ।
তারা চলেই যাচ্ছিলো, হঠাৎ তাদের একজন এসে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে বুকপকেট থেকে চিঠিটা নিয়ে গেলো । একটুর জন্য আমার মনে হলো আমি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি । ছেলেটা দৌঁড়ে যতটা দূরত্বে যাচ্ছে আমি পৃথিবী থেকে ততোটাই দূরে সরে যাচ্ছি। আমার মনে হলো, আর কখনোই এই চিঠির জবাব দিতে পারবো না আমি। মেয়েটি হয়ত প্রতিক্ষায় থাকবে। প্রতিদিন ডাকপিয়নের খোঁজ নিবে।
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now