বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছায়াশহর"
লেখক : রাকিব হাসান
পাঠিয়েছেন: প্রিয়া ব্যানার্জী
৩ য় পর্ব
বড়ই নির্জন পরিবেশ, ভাবলাম। আর
গাছের ছায়ায় ঢাকা। সবগুলো
বাড়ি বড় বড় গাছে ঘেরা। গাছের
ঘন পাতা অন্ধকার করে রেখেছে।
রোদ যেটুকু দেখো যাচ্ছে,
রাস্তাতেই দেখা যাচ্ছে।
সোনালী সরু একটা আঁকাবাঁকা
ফিতের মতো পড়ে রয়েছে
দু'পাশের ঘন ছায়ার মাঝখানে। এত
অন্ধকার! জায়গাটার নাম গ্রীন
ভ্যালি না রেখে ডার্ক ভ্যালি
বা ব্ল্যাক ভ্যালি রাখলে ভাল
হতো, মনে মনে ভাবলাম।
" গেল কোথায় ছেলেটা?" তীক্ষ্ণ
দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে
বিড়বিড় করলেন বাবা।
" আমি ওকে মেরেই ফেলব আজ,
দেখো", এই কথাটা এর আগেও
অনেকবার বলেছেন মা। প্রচণ্ড
রেগে গেলে উনি এই কথাটাই বার
বার বলেন। পুরো ব্লকে দুবার চক্কর
মারলাম আমরা। সুজার ছায়াও
কোথাও নজরে পড়ল না। পরের
কয়েকটা ব্লকও ঘুরে দেখার কথা
বললেন মিঃ জোনস। নীরবে মাথা
ঝাঁকালেন বাবা।
পথের একটা মোড় ঘুরতেই লাল ইঁটে
তৈরি একটা উঁচু বিল্ডিং দেখা
গেল। মিঃ জোনস সেটা দেখিয়ে
বললেন, " ওই যে স্কুল।"
অনেক পুরনো আমলের বাড়ি।
বিশাল দরজার দুপাশে মোটা
মোটা থাম। মিঃ জোনস বললেন, "
অবশ্য স্কুল এখন বন্ধ।" তাই হবে, কারণ
স্কুলটা একেবারে খাঁ খাঁ, কাউকে
নজরে পড়ল না। স্কুলের পেছনে
বেড়া দেওয়া খেলার মাঠটা
নজরে পড়ল। ওটাও খাঁ খাঁ বিরাণ,
কেউ নেই কোথাও।
এত দূর এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছে
সুজা?", তীক্ষ্ণ হল মায়ের কণ্ঠস্বর। " ও
কি আর হেঁটে চলে?", বাবা ব্যঙ্গ
ভরে বললেন, " ও তো ওড়ে।"
" চিন্তা করবেন না", মিঃ জোনস
বললেন, " ওকে খুঁজে বের করবই
আমরা"। স্টিয়ারিং হুইলে তাঁর
আঙুলগুলো চেপে বসল।
আরেকটা ছায়ায় ঢাকা ব্লকের
মোড় ঘুরলাম আমরা।
রাস্তায় সাইনবোর্ড চোখে পড়ল,
লেখা আছে : ' সিমেট্রি ড্রাইভ '। "
গোরস্থানের রাস্তা"! আপনমনে
বিড়বিড় করলাম আমি। মস্ত এক
গোরস্তান চোখে পড়ল। নীচু এক
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপর দিকে
উঠে গেছে সারি সারি কবরফলক।
গোড়ার দিকে একটা চ্যাপ্টা উঁচু
হয়ে থাকা সমতল জায়গাতেও
অসংখ্য কবরফলক আর স্মৃতিস্তম্ভ নজরে
পড়ছে। প্রচুর ঝোপঝাড় আছে
গোরস্থানে, তবে বড় গাছ তেমন
নেই। ধীরেধীরে গোরস্থানের
পাশ দিয়ে এগোল আমাদের গাড়ি।
বাঁ পাশে দ্রুত সরে যাচ্ছে
কবরফলকগুলো, আবছা ঝিলিকের
মতো লাগছে। সারা শহরের মধ্যে
একমাত্র এই জায়গাটিতেই যা রোদ
আছে।
"ওই যে আপনাদের ছেলে!", গাড়ি
থেকে হাত বের করে দেখালেন
মিঃ জোনস। ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড়
করিয়ে দিলেন।
" উফ, বাঁচা গেল!", চেঁচিয়ে বলে
উঠলেন মা। আমার পাশে কাত হয়ে
সরে এসে জানলার বাইরে
তাকালেন। নীচু, সাদা রঙ করা
একসারি কবর ফলকের পাশ দিয়ে
কেমন খ্যাপার মতো দৌড়ে
চলেছে সুজা।
" এখানে কি করছে ও?", অবাক হয়ে
যেন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন
করলাম। পাশের দরজাটা ঠেলে
খুলে নেমে এলাম। গাড়ি থেকে
নামলাম। ঘাস মারিয়ে এগিয়ে
গেলাম কয়েক কদম। চিৎকার করে
ডাকলাম ওকে। আমার ডাকে সাড়া
দিল না সুজা। কবরফলকগুলোর পাশ
দিয়ে দৌড়নোর সময় মাঝেমাঝে
নীচের দিকে ঝুঁকে কি যেন
দেখছে। এ রকম করছে কেন?
আরও কয়েক পা এগোলাম। তারপরেই
যেন প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেয়ে থেমে
গেলাম। ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
ওভাবে পাগলের মতো দৌড়নোর
কারণটা বুঝে গেছি। কেউ যেন
তাড়া করেছে ওকে!
আবার কয়েক পা এগোলাম। নজর
আমার সুজার দিকে।
আবার ও নীচু হয়ে কি যেন দেখল।
দিক পরিবর্তন করল। তারপর আবার দু
হাত সামনে বাড়িয়ে ছুটতে লাগল।
তারপরেই বুঝলাম, উল্টো ভেবেছি
আমি।
আসলে সুজাকে কেউ তাড়া
করেনি। সুজাই কাউকে তাড়া
করেছে বা ধরতে চাইছে। নিশ্চয়
কিটুকে। "হুঁ!", বুঝলাম। মা'ও বলেন,
মাঝে মাঝে আমার অতিকল্পনা
মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তবে এরকম
একটা সময়ে নিজের ভাইকে
গোরস্থানের মধ্যে দিয়ে ওভাবে
ছুটতে দেখলে ভয় পাওয়াই
স্বাভাবিক।
আবার সুজার নাম ধরে ডাকলাম।
এবার আমার গলা শুনতে পেল ও।
ফিরে তাকাল। উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে
ওকে। চেঁচিয়ে বলল, " ভাইয়া জলদি
এসো। আমি একা পারছি না।"
" সুজা, কি হয়েছে?" ছুটতে ছুটতে
আমি জিজ্ঞেস করলাম ওকে। কিন্তু
আমি যতজোরে দৌড়ই, ও তত জোরে
দৌড়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরে
যায়। " জলদি এসো! ", চেঁচিয়ে বলল
সুজা। " ও ওভাবে দৌড়চ্ছে কেন?"
বাবার চিৎকার শুনে পেছনে
তাকিয়ে দেখি আমার ঠিক
পেছনেই বাবা। মা ও আসছেন
বাবার ঠিক পেছনে।
" কিটুকে ধরতে পারছি না",
চেঁচিয়ে বলল সুজা, " আমি ওকে
ধরতে পারছি না। মাঝখানে একবার
ধরেছিলাম, হাত ছাড়িয়ে ছুটে
পালিয়ে গেল।" " কিটু, কিটু!"
বাবাও চেঁচিয়ে ডাকলেন এবার
কুকুরটাকে। কিন্তু কিটু ঘুরেও
তাকাল না। কবরফলকগুলো শুঁকে শুঁকে
দেখে ছুটে বেড়াতে লাগল। সুজার
কাছে পৌঁছে গেলেন বাবা।
বললেন, " এখানে এলে কিভাবে?"
" কিটুর পিছু নিয়ে", ভীষণ উদ্বিগ্ন
দেখাচ্ছে সুজাকে, " বাগানে
ঘোরাফেরা করতে করতে হঠাৎ
উঠে দৌড় দিল। কত ডাকলাম, ঘুরেও
তাকাল না। সোজা এখানে চলে
এল। আমাকেও ওর পেছু পেছু আসতে
হল। ভয় পাচ্ছিলাম, আমি না এলে
হারিয়ে যাবে।" কিটুকে ধরতে
এগিয়ে গেলেন বাবা। সুজা
হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, " ওই হাঁদা
কুকুরটার কি হয়েছে, জানি না।
অদ্ভুত আচরণ করছে।"
বাবাও অনেক চেষ্টার পর ধরতে
পারলেন কিটুকে। কোলে তুলে
নিলেন। খুদে টেরিয়ারটা কুঁকড়ে,
শরীর মুচড়ে নেমে যেতে চাইল
বাবার কোল থেকে। কিন্তু বাবা
কোনওমতেই ছাড়লেন না, শক্ত করে
ধরে রাখলেন। দল বেঁধে গাড়ির
কাছে ফিরে এলাম আমরা। গাড়ির
গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন
মিঃ জোনস। বললেন, " ওটার গলায়
শেকল পরিয়ে দাও।"
" শেকল তো আমরা ওকে কোনওদিন
পরাই নি", গাড়ির পেছনের সিটে
উঠে বসতে বসতে বলল সুজা।
" তবে এখন মনে হচ্ছে লাগাতে
হবে", বাবা বললেন, " এভাবে বার
বার যদি দৌড়ে পালায়, তাহলে
তো বিপদ! কে ওকে খুঁজবে এত!" রাগ
করে পেছনের সিটে ওকে প্রায়
ছুঁড়ে ফেললেন বাবা। সুজা ওকে
কোলে তুলে নিল। বিনা
প্রতিবাদে ওর কোলে গুটিসুটি
মেরে রইল কিটু।
কিটুর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে
দিলাম আমি।
গাড়িতে উঠলাম সবাই। আমাদের
সঙ্গে নিয়ে মিঃ জোনস তাঁর
অফিসে নিয়ে চললেন।
এরকম দৌড়ে পালাতে চাইল কেন
কুকুরটা? আমার অবাক লাগছে। এর
আগে তো কখনো ও এমন
অস্বাভাবিক আচরণ করে নি!
আমার মনে হলো, নতুন জায়গাটা
ওরও পছন্দ হয়নি। সারাটা জীবন
আমাদেরই মতো একটা বাড়িতে
থেকেছে ও। ওখান থেকে চলে
এসে হয়ত ওর সুজার মতোই খারাপ
লাগছে, এই অপরিচিত পরিবেশ সহ্য
করতে পারছে না। নতুন বাড়িঘর, নতুন
রাস্তা, নতুন নতুন গন্ধ, ওকে ভড়কে
দিচ্ছে। তাই ওসবের কাছ থেকে
ছুটে পালাতে চেয়েছিল। তবে
আমার এই ব্যাখ্যা কতখানি ঠিক,
আমি জানি না। একসারি অফিসের শেষপ্রান্তে
সাদা রঙ করা একটা ছোট ঘরে
মিঃ জোনসের অফিস। ওটার
সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাবার
সঙ্গে হাত মেলালেন। একটা
বিজনেস কার্ড দিলেন বাবার
হাতে। বললেন, " আগামী সপ্তাহে
চলে আসবেন। কাগজপত্র সব রেডি
করে ফেলব ততদিনে। ওগুলো সই হয়ে
যাবার পর যেকোনো সময় এসে
উঠতে পারবেন নতুন বাড়িতে।"
গাড়ির দরজা ঠেলে খুললেন তিনি।
আমাদের সবাইকে মিষ্টি হাসি
উপহার দিলেন। তারপর নামার জন্য
তৈরি হলেন।
" গ্রাম্পারসন জোনস", বাবার
হাতের কার্ডটার দিকে তাকিয়ে
পড়লেন মা। এমন কঠিন নামতো
সচরাচর কেউ রাখে না। এটা
আপনাদের পুরনো পারিবারিক নাম
নাকি?"
মাথা নাড়লেন মিঃ জোনস।
বললেন, " না, সারা পরিবারে
আমিই একমাত্র গ্রাম্পারসন। হয়ত
সবার থেকে আলাদা করতেই আমার
মা বাবা এমন একটা নাম
রেখেছিল।"
এমনভাবে হাসলেন যেন কি এক মহা
রসিকতা করে ফেলেছেন তিনি।
তারপর গাড়ি থেকে নেমে
গেলেন। কপালের ওপর টেনে
নামালেন সাদা কালো স্টেটসন
হ্যাটের চওড়া কানা। ভাবভঙ্গি
দেখে মনে হল, একটু রোদ লাগলে
যেন গায়ের চামড়ায় ফোস্কা পড়ে
যাবে। গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে
ব্লেজারটা বের করে গায়ে
চড়িয়ে ঢুকে পড়লেন সাদা
অফিসটায়। ড্রাইভিং সিটে সরে
এলেন বাবা। সিটটাকে পেছন
দিকে ঠেলে দিলেন উঁচু
ভুঁড়িটাকে জায়গা করে দেবার
জন্যে। সামনের প্যাসেঞ্জার
সিটে চলে এলেন মা।
বাড়ি ফিরে চললাম আমরা। আবার
শুরু হল চার ঘন্টার দীর্ঘ জার্নি। "
তুমি আর কিটু তো ভাল একখানা
এডভেঞ্চার করে এলে", পেছনে
সুজার দিকে তাকিয়ে বললেন মা।
পাশের জানলার কাঁচটা তুলে
দিলেন, কারণ বাবা এয়ারকুলার
চালু করে দিয়েছেন। " ভয়ানক
এডভেঞ্চার ", সুজা উত্তর দিল, ওর
কোলে শুয়ে এখন বেঘোরে
ঘুমোচ্ছে কিটু।
" নতুন বাড়িতে তোমার ঘরটা পছন্দ
হবে দেখো ", সুজাকে লক্ষ্য করে
আমি বললাম, " সত্যিই ভালো। পুরো
বাড়িটাই খোলামেলা। " চিন্তিত
ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকিয়ে
রইল সুজা। জবাব দিল না। কনুই দিয়ে
ওর পাঁজরে আলতো গুঁতো দিলাম, "
কি কথা বলছ না কেন?"
" কি বলব?" যেন আমার কথাতেও
নিশ্চিত হতে পারছে না সুজা।
ঢিমেতালে যেন গড়িয়ে চলল
পরের দুটো সপ্তাহ। প্রায়ই আমাদের
বাড়িটার চারপাশে ঘুরে বেড়াই
আর ভাবি, আর মাত্র কয়েকটা দিন,
তারপর আর কখনো এ বাড়িটা
দেখতে পাব না। এই বাড়ির
রান্নাঘরে বসে আর কখনো নাস্তা
খাবো না। এই লিভিং রুমটায় বসে
আর টিভি দেখব না। মনটা খারাপ
লাগছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল যখন
দেখলাম, একদিন বিকেলে
প্যাকার্স এন্ড মুভার্স কোম্পানীর
লোক এসে কতগুলো বড় বড় প্যাকিং
বক্স রেখে দিয়ে গেল। আমাদের
জিনিসগুলো এবার প্যাক হবে।
তারমানে সত্যি সত্যিই যাবার সময়
ঘনিয়ে এসেছে। নিজের ঘরে এসে
বিছানায় নেতিয়ে পড়লাম, সহজে
ঘুম এল না। ছাদের দিকে তাকিয়ে
ভাবতে লাগলাম। কত কথা, কত স্মৃতি
এসে ভীড় করছে মনে। স্বপ্নের মতো
লাগছে।
অস্থিরতায় আমি একাই ভুগছি না।
বাবা-মা'ও কারণে অকারণে
ধমকাধমকি করছেন , একে অপরের ওপর
রেগে যাচ্ছেন। একদিন সকালে,
মাংস বেশী ভাজা হয়ে
গেছে....এরকম একটা সামান্য
ব্যাপার নিয়ে কি ঝগড়াটাই না
বাধিয়ে বসলেন দুজনে। ওঁদের এই
ছেলেমানুষি কান্ড দেখে অবাকই
লাগে। আর সুজা তো কথাবার্তা
প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। সারাক্ষণ
গম্ভীর থাকে। কিটুর চেহারাও
কেমন ভার ভার। বিষন্ন ভাব
চেহারায়। আমি খাবার নিয়ে
ডাকলেও আর আগের মতো দৌড়ে
আসে না, চুপচাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে
শুয়ে থাকে।
সবচেয়ে খারাপ লাগল পুরনো
বন্ধুদের বিদায় জানানোর সময়।
ছুটিতে ক্যাম্পিং করতে চলে
গেছে ডন আর জোসেফ ; তাই ওদের
চিঠি দিয়ে আমাদের চলে
যাওয়ার কথা জানাতে হল। তবে
নেড বাড়িতেই আছে। ও আমার
সবচেয়ে পুরনো আর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওকে
বিদায় জানানোটাই বেশী
হৃদয়বিদারক ঠেকল আমার কাছে।
আমরা এখান থেকে চলে যাবার
আগের রাতে নেড এল দেখা করতে।
আমার মন তখন ভীষণ খারাপ।
ও বলল, " এত কষ্ট পাচ্ছ কেন?"
" ও তুমি বুঝবে না", আমি বললাম, "
তোমায় তো আর নিজের বাড়ি
ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে না
চিরদিনের জন্য"। " তোমার কথায়
মনে হচ্ছে তুমি যেন দুনিয়ার আরেক
প্রান্তে চলে যাচ্ছ",
বাবলগামটাকে জোরে জোরে
চিবোতে চিবোতে বলল নেড।
বুঝলাম অস্থিরতা চাপা দেওয়ার
জন্য এরকম করছে ও। আমি চলে যাব,
তাই ওরও মন খারাপ কিন্তু সেটা
প্রকাশ করতে চাইছে না। বলল, "
যাচ্ছ তো গ্রীন ভ্যালিতে, এখান
থেকে মাত্র চার ঘন্টার পথ। শোনো,
এতে মন খারাপ কোর না, আমাদের
দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ হবে না।"
" তা ঠিক", আমি বললাম, " কিন্তু
বিশ্বাস করতে পারছি না।
গাড়িতে করে চার ঘন্টার পথ,
বড়দের জন্যে যাই হোক, আমাদের
মতো ছোটদের পক্ষে অনেক দূর। তবে
টেলিফোনেও মাঝে মাঝে কথা
বলতে পারব আমরা।" বাবলগাম
দিয়ে মুখের বাইরে ছোট্ট একটা বল
তৈরি করল নেড, তারপর আবার ওটা
মুখের ভেতর টেনে নিল। প্রবল
উৎসাহ দেখানোর ভান করল ও। বলল, "
ভাগ্যটা ভাল বলতে হবে তোমার।
এরকম জঘন্য জায়গা থেকে মুক্তি
পাচ্ছ। কত বড় বাড়িতে যাচ্ছ।
গাদাগাদি করে থাকতে হবে না
আর।"
" ভুল বললে, মোটেও জঘন্য নয় এই
জায়গাটা", জোর গলায় বলে উঠলাম
আমি। কেন যে হঠাৎ এই জায়গাটা
ভাল বোঝানোর জন্য মরিয়া হয়ে
উঠলাম, নিজেও বুঝলাম না। আগে
তো কখনো এরকম মনে হতো না।
" তোমায় ছাড়া ক্লাসে আমার
একটুও ভাল লাগবে না", সোফার ওপর
পা দুটো ক্রস করে বসে বলল নেড, "
অঙ্কের ক্লাসে কে আমায় কাগজে
উত্তর লিখে দেবে?"
হেসে উঠলাম। " কাগজে তো সবসময়
ভুল উত্তরটাই লিখে দিয়েছি।"
এবার দুজনেই হেসে উঠলাম। ঘন্টার
পর ঘন্টা কথাবার্তা চালালাম
আমরা। অনেক রাতে নেডের আম্মি
নেডকে ফোন করে বাড়ি আসতে
বললেন। বিদায়ের সময় দুজনের
চোখের পানি বাঁধ মানল না। একে
অপরকে জড়িয়ে ধরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
হলাম, দুজনে দুজনের জন্মদিনের
পার্টিতে হাজির থাকব। এমনকি,
প্রয়োজনে বাবা-মা'কেও সঙ্গে
নিয়ে যাব।
নেড বিদায় নিল।
পরের দিনটা শনিবার। আমাদের
যাবার দিন। একটা বৃষ্টিভেজা
সকাল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না, বাজ
পড়ছে না, শুধু ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে
যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ঝোড়ো
বাতাস। গাড়ি চালানোই দুষ্কর হয়ে
উঠল। ফলে আমাদের যাত্রাটা হল
অসহনীয়। নতুন জায়গার দিকে যত
এগোলাম, আকাশ যেন ততই অন্ধকার
করে এল। ঝোড়ো বাতাসে
রাস্তার ওপর নুয়ে নুয়ে পড়ছে
গাছের ডাল। রাস্তা পিচ্ছিল।
" আস্তে চালাও", বাবাকে সাবধান
করলেন মা, " রাস্তার যা অবস্থা,
এক্সিডেন্ট করবে।"
বাবা তাড়াহুড়ো করছেন আমাদের
মালবাহী ভ্যানটার আগে
পৌঁছনোর জন্য। আমরা সামনে না
থাকলে যেকোনো জায়গায়
জিনিসপত্র ছড়িয়ে ফেলে রেখে
চলে যাবে ওরা।
কোনও কথা বলছে না সুজা। প্রচণ্ড
বিরক্তি ওর মুখে, লক্ষ্য করলাম।
কিটুরও মেজাজ ভাল নেই মনে হল।
মাঝেমাঝে দুই পায়ে ভর দিয়ে
কানদুটো খাড়া করে গাড়ির
পেছনের জানলা দিয়ে তাকিয়ে
হৌ হৌ করে ডাকতে লাগল।
অবশেষে শেষ হল আমাদের যাত্রা,
বাড়ির ড্রাইভওয়েতে গাড়ি
ঢোকালেন বাবা। ভিজে সুরকিতে
খড়খড় করে উঠল চাকা। গাড়ির
ছাদের ওপর জোর বৃষ্টিপাতের শব্দ। "
আওয়ার হোম, সুইট হোম", মা বলে
উঠলেন। কথাটা মন থেকে মা
বললেন কিনা, ডাউট হচ্ছে আমার।
বরং এই দীর্ঘ পথযাত্রা শেষ
হওয়াতেই যেন স্বস্তিবোধ করছেন
মা।
" যাক, মুভারদের আগেই পৌঁছতে
পারলাম আমরা, " হাতের ঘড়ির
দিকে তাকিয়ে বললেন বাবা, "
এখন ওরা পথ ভুল না করলেই বাঁচি।"
" দিন না রাত কিছুই বোঝা যাচ্ছে
না, এত অন্ধকার! " বিরক্ত সুজা বলল।
আমার কোলে লাফাতে শুরু করল
কিটু। গাড়ি থেকে বেরোবার জন্য
অস্থির হয়ে উঠেছে। গাড়ি চললে
জ্বালাতন করে না; কিন্তু গাড়ি
থামলেই বেরোবার জন্য অস্থির
হয়ে ওঠে। গাড়ির একপাশের দরজা
খুলে দিলাম। ড্রাইভওয়েতে জমে
থাকা পানির মধ্যে লাফিয়ে পড়ে
কিটু এঁকেবেঁকে দৌড় দিল সামনের
আঙিনা ধরে।
" যাক, এখানে এসে একজন অন্তত খুশী
হয়েছে", সুজা বলল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মাথা
নীচু
করে বাবা এক দৌড়ে বাড়ির
দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন ; তারপর
পকেট থেকে চাবি বের করে
দরজার তালা খুলে আমাদের
ডাকলেন।
গাড়ি থেকে নেমে বাবার মতোই
দৌড় লাগাল মা আর সুজা। আমি
গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে ওদের
পেছন পেছন দৌড়োলাম।
হঠাৎ কি যেন চোখে পড়ল। থেমে
গেলাম। ওপর দিকে তাকালাম।
ভাল করে তাকাবার জন্যে বৃষ্টি
থেকে চোখ বাঁচাতে চোখের ওপর
হাত রেখে ওপর দিকে তাকালাম।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। একটা মুখ।
বাঁয়ের বড় জানলাটায়।
সেই ছেলেটা। যাকে সেদিন
আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে
থাকতে দেখেছিলাম, মূহুর্তের জন্য।
আমার দিকেই তাকিয়ে আছে
ছেলেটা।
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now