বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডাক্তারবাবু……আমি কি বেঁচে আছি?’
প্রশ্নটা শুনে ডাক্তারবাবুর ভুরুতে সামান্য ভাঁজ পড়ল।
মাথার উপরে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে। তাতে
সামনের মানুষটাকে স্পষ্ট দেখতে না পেলেও তার
অস্পষ্ট ছায়া ছায়া অবয়ব বোঝা যাচ্ছিল। নাকের উপর
ভারি চশমার কাঁচ ঐ আধা আলো আধা অন্ধকারেই চকচক
করে উঠছে। মুখের চাপদাড়ির জঙ্গল বুঝতেও অসুবিধা
হচ্ছিল না।
মনস্ত্বত্ববিদের ঘর যেমন হয়, এ ঘরটাও তেমনই। আলোর
চেয়ে অন্ধকারই বেশি। ডাক্তারবাবু টেবিলের
ওপ্রান্তে বসে আছেন, আর রোগী এ প্রান্তে। কাউকেই
বিশেষ স্পষ্ট দেখার উপায় নেই। শুধু দেওয়ালে দুটো
ক্ষীণ ছায়া মাঝে মাঝে নড়েচড়ে উঠছে।
ডক্টর সিনহা প্রশ্নটায় বেশ কৌতুকবোধ করলেন। আস্ত
একটা জলজ্যান্ত লোক জিজ্ঞাসা করছে যে সে বেঁচে
আছে কিনা!
–‘এমন মনে হচ্ছে কেন আপনার?’
লোকটা যেন একটু ইতস্ততঃ করল।একটু উশখুশ করে উঠে
বলল—‘একটা সিগ্রেট খেতে পারি?’
এখানে ধূমপান মানা হলেও লোকটার অবস্থা দেখে
ডাক্তারবাবুর দয়া হয়।অসম্ভব ভয়ে সে জড়োসড়ো! গলার
স্বর কাঁপছে! একটু যেন ফ্যাঁসফ্যাঁসেও!
–‘নিশ্চয়ই’।
সে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগ্রেট ধরাল। হাত দুটোও থরথর
করে কাঁপছে। লাইটার জ্বালাতেই ডাক্তারবাবু তার
চোখ দুটো একঝলক দেখতে পেলেন। লাল টকটকে চোখ।
যেন রক্ত জমে আছে চোখে! একবারের জন্য যেন মনে হল
—লোকটার চোখের মণিটা লাল!
মুহূর্তের জন্য হলেও চমকে উঠেছেন তিনি। পরক্ষণেই
সামলে নিলেন। হয়তো বহুদিন লোকটা ঘুমোয়নি। সেই
জন্যই চোখ অমন লাল।
কিন্তু চোখের মণি অমন লাল হয় কি করে?……
নাঃ, তিনি নিজেকে বোঝালেন। হয়তো লাইটারের
সামান্য আলোয় তার চোখের ভুল হয়েছে। একটা
স্বাভাবিক মানুষের চোখের মণি লাল কখনই হয়না।
একেই বলে ইল্যুশন!
লোকটা সিগ্রেটে উত্তেজিত কয়েকটা টান মেরে যেন
একটু শান্ত হয়। বলে—‘ডাক্তারবাবু, আপনি একটু
দেওয়ালের দিকে তাকাবেন প্লিজ?’
এমন উদ্ভট আবদারে তিনি অবাক ও বিরক্ত দুই-ই হলেন।
কিন্তু মনস্ত্বত্ববিদের চটে যাওয়ার উপায় নেই।
—‘কেন?’
সে ফিসফিস করে বলে—‘দেখুন তো দেওয়ালে কটা
ছায়া দেখা যাচ্ছে?’
–‘আপনি নিজেই তো দেখে নিতে পারেন…!’
–‘আমার ভয় করছে!’ অসম্ভব ভীত, সন্ত্রস্ত গলা তার—‘বলুন
না। কটা দেখা যাচ্ছে?’
তিনি আরও অবাক—‘সে কি! কটা আবার দেখা যাবে!
দুজন আছি, তাই দুটোই দেখা যাচ্ছে!’
–‘তিনটে নয় তো?’
–‘তিনটে! তিনটে কেন থাকবে?’
লোকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে—‘থ্যাঙ্কস। তাহলে
তিনটে নেই……’
এবার বোধহয় ডক্টর সিনহা ভদ্রলোকের বিষয়ে কৌতুহল
বোধ করলেন। লোকটার হাবভাব যেন কেমন উদ্ভট! ত্রিশ
বছরের কেরিয়ারে অনেক উদ্ভট রোগীর দেখা তিনি
পেয়েছেন। কিন্তু এমন রোগী দেখেননি। ওকে একটু
গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিলেন তিনি। তারপর আলতো গলা
খাঁকারি দিয়ে বলেন—
–‘কি হয়েছে আপনার? কি সমস্যা?’
–‘বলবো…’ সে আস্তে আস্তে বলে—‘বলবো বলেই তো
এসেছি। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়!’
–‘কোথায়?’
লোকটা এবার অদ্ভুত ভাবে তাকায় তার দিকে।
ডাক্তারবাবুর মনে হল লোকটার চোখ যেন হঠাৎ জ্বলে
উঠল…
–‘আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন তো?’
–‘কেন করবো না?’
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে—‘তবে শুনুন…আমার নাম তপন
মিশ্র। আমি রাইটার! থ্রিলার লিখি…’
–‘তপন মিশ্র!’ ডক্টর সিনহা অবাক হয়ে বলেন—‘আপনি
তপন মিশ্র!রাতের ভয়ঙ্কর’গল্পটার লেখক?’
–‘হ্যাঁ। আমিই…’।
তপন মিশ্রের কথা—
প্রত্যেকবার এইসময়টাই আমার বড্ড চাপ যায়।
পূজাবার্ষিকীতে থ্রিলারের কদর খুব বেশি। বিশেষ
করে কিশোর পত্রিকাগুলোতে। তাই প্রায় জানুয়ারি
থেকেই আসতে থাকে সম্পাদকদের ফরমায়েশ! জানুয়ারি
থেকে জুলাই অবধি দম ফেলার ফুরসতও থাকে না।
এবার এক সম্পাদক এলেন অদ্ভুত এক ফরমায়েশ নিয়ে।
বললেন—‘দাদা, গোয়েন্দা গল্প নয়, এবার একটু অন্যরকম
লেখা চাই আপনার’।
কিরকম লেখা চান জানতে চাইলে বললেন—‘একদম
টানটান থ্রিলার। একটা বিভৎস চরিত্রকে নিয়ে।
ভিলেন চরিত্র। সাইকো আজকাল বাজারে খুব খাচ্ছে!
খুনের সিকোয়েন্স থাকবে অনেকগুলো। রক্তারক্তি
কান্ড! দেখবেন—পুরো হটকেক হয়ে যাবে’।
–‘যখন সব ফর্মুলাই জানেন, তখন নিজেই একটা হটকেক
বানিয়ে ফেলুন না!’
না…না…এ কথাটা বলিনি! ভাবছিলাম বলবো কিনা।
কিন্তু চেপে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ মনে হল। মুখে
শুধু বললাম—‘বেশ’।
বলে তো দিলাম–কিন্তু এমন চরিত্র আমদানি করি
কোথা থেকে! প্রচুর থ্রিলার পড়তে শুরু করলাম।
ইংরাজি, বাংলা, হিন্দি সবরকম থ্রিলার ফিল্ম
দেখলাম। অনেক দেখে শুনে একটা চরিত্রের আইডিয়া
পাওয়া গেল।
চরিত্রের নাম রাখলাম—অগ্নি। ছ’ফুট হাইটের এক
মাঝবয়েসী লোক। হঠাৎ করে তার শখ হল
ব্ল্যাকম্যাজিক নিয়ে গবেষণা করবে। সেই মতো কাজও
করতে শুরু করল। ব্ল্যাক ম্যাজিকের উপর কাজ করতে
করতেই একটা বই পড়ে জানতে পারল যে, মানুষের
হৃৎপিন্ড শয়তানকে উৎসর্গ করে, তারপর সেই প্রসাদ
খেলে নাকি অমরতা লাভ করা যায়।
সেই বই পড়েই তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। অমরত্বের
লোভে সে আর মানুষ থাকলো না। শুরু হলো তার নারকীয়
হত্যাকান্ড। প্রথমে আশেপাশের লোক, কাজের লোক
এমনকি নিজের স্ত্রী-পুত্রকেও সে ছাড়ে নি! সবাইকে
খুন করে, তাদের হৃৎপিন্ড শয়তানকে উৎসর্গ করে খেতে
শুরু করেছিল! শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে ধরে এবং তার
ফাঁসি হয়।
এই হলো গল্পের মূল কাঠামো। ভাবনা আসা মাত্রই দাঁড়
করিয়ে ফেললাম গল্পটাকে। সম্পাদক পান্ডুলিপি পড়ে
খুব খুশি!বলেই ফেললেন—‘দাদা, যত লেখা আপনার
পড়েছি, এটা হচ্ছে বেস্ট! দেখবেন, পাব্লিক একেবারে
গপগপিয়ে খাবে’।
সম্পাদকের প্রশংসা পেয়ে খুব খুশি হলাম। কিন্তু সে সুখ
আমার কপালে সইল না।
সেদিন রাত্রে খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। বাইরে ঝড়ের
দাপাদাপি! মাঝে মাঝেই প্রচন্ড শব্দ করে বাজ পড়ছে!
এমন সময় হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল।
আমি বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলাম!ঘুম আসছিল
না। পাশেই আমার স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে ঘুমিয়ে
কাদা। কিন্তু আমি ঘুমোতে পারছি না। কি যেন
অস্বস্তি কাজ করছিল মনের মধ্যে!
আমার বেডরুমের জানলার কাঁচে মাঝেমধ্যেই বিদ্যুতের
নীল আলো ঝলসে ঝলসে উঠছে। বাইরে যেন একটা নীল
কুয়াশা কখন আস্তে আস্তে এসে জমাট বাঁধছিল!বৃষ্টির
জলটাকেও যেন নীল মনে হয়!
ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। তাও সেটার প্রায়
ফুরিয়ে আসার সময় হয়েছে। একদম স্তিমিত আলোয় হঠাৎ
মনে হল…—কেউ যেন আমার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে!
অসম্ভব!কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না! চোখের সামনে
কেউ নেই! অথচ দেওয়ালে ওটা তবে কার ছায়া!
প্রায় ছ’ফুট লম্বা একটা ছায়া! বেশ বুঝতে পারলাম তার
পরনে ওভারকোট! মাথায় টুপি!
অবিকল তেমন…ঠিক তেমন…যেমন বর্ণনা আমি বইয়ে
দিয়েছি! অগ্নির পরনেও এই পোষাকই থাকতো…! এই
পোষাকই…
–‘তোমরা লেখকরা নিজেদের কি ভাবো…?’
কানের কাছে একটা অদ্ভুত হিসহিসে আওয়াজ। যেন এক
ঝলক ঠান্ডা হাওয়া শিস দিয়ে বলে উঠল—‘যতই অমরত্বের
লোভ থাক—নিজের স্ত্রী-সন্তানকে খুন করা অত সহজ!
নিজের হাতে নিজের আপনজনকে টুকরো টুকরো করে
কাটতে কি প্রচন্ড কষ্ট হয়, তোমার বিন্দুমাত্রও ধারণা
আছে?’
আমি বুঝে উঠতে পারলাম না ঘটনাটা ঠিক কি ঘটছে!
স্বপ্ন দেখছি! না সত্যিই এ সব আমার সাথে ঘটছে!
কিছু বোঝার আগেই সেই কন্ঠস্বর আবার বলল—‘তুমিই
আমাকে এই ঘৃণ্য অভিশপ্ত জীবন দিয়েছ। আমার হাত
দিয়েই আমার সন্তানকে খুন করিয়েছ! আমি কষ্ট পেলেও
কিছু করতে পারিনি!কারণ তুমি লেখক! যা করাবে তাই
করতে হবে। এটাই নিয়ম!’ বলতে বলতেই সে নিষ্ঠুরভাবে
হিসহিসিয়ে উঠল—‘এবার তোমাকেও তার দাম দিতে
হবে। আমার জীবন এবার তুমিও একবার বেঁচে দেখো।
আমি যা যা করেছি, সব এবার করে দেখবে তুমি। আর
আমার মতোই তোমারও কিছু করার থাকবে না!’
এতক্ষণ যেন আমার জ্ঞান ছিল না! এবার কথাগুলো শুনে
প্রায় লাফিয়ে উঠতে গেলাম!
ঠিক তখনই দপ্ করে মোমবাতিটা নিভে গেল! সঙ্গে
সঙ্গেই কাছে প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ল! জানলাগুলো তার
দাপটে কেঁপে ওঠে!
তারপর আর কিছু মনে নেই!
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই টের পেলাম পাশের
বাড়িতে ভীষণ শোরগোল। কারা যেন ভীষণ কাঁদছে!
স্ত্রী বেড টি নিয়ে এসেছিলেন। কিছু বলার আগেই
উত্তেজিত স্বরে বললেন—‘জানো, রথীনবাবুকে কাল কে
যেন খুন করে গেছে!’
রথীনবাবু আমাদের প্রতিবেশী!
–‘পুরো টুকরো টুকরো করে কেটেছে!’ আমার স্ত্রীয়ের
চোখ দুটো আতঙ্কে বিস্ফারিত—‘সবচেয়ে আশ্চর্য কি
জানো! ওনার হৃৎপিন্ডটা নেই! কে যেন খুবলে তুলে
নিয়েছে!’
আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না! গত রাত্রের কথা
মনে পড়ে গেল! টের পেলাম ভীষণ আতঙ্ক আমার বুকের
ভিতরে চেপে বসছে!
বেড টি খেতে গেলাম। কিন্তু মুখে ভালো লাগল না। মুখ
থেকে কেমন যেন বদগন্ধ বেরোচ্ছিল। অল্প অল্প গা
গুলোচ্ছিল। কাঁচা মাংস খেলে মুখের স্বাদ যেমন হয়ে
যায় টের পেলাম, মুখটা তেমনই হয়ে আছে!
ভাবলাম ব্রাশ করলেই ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো হজম টজম
ঠিক মতন হয়নি তাই এই…
বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করতে গিয়েই যা দেখলাম তাতে
আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল!
আমার দাঁতে কালচে কালচে লাল ছোপ! শুকনো রক্তের
দাগ যেমন হয়, ঠিক তেমন! আর জিভ…!
জিভটা পুরো লাল! রক্ত তখনও শুকিয়ে যায়নি!
আমি হতভম্ব! মনে হচ্ছিল এক্ষুনি পড়ে যাবো। আস্তে
আস্তে বাথরুমের মেঝেতেই বসে পড়লাম!
বসে পড়তেই আরেকটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল। আমার
বসে থাকা ছায়াটার পাস থেকেই আরেকটা দীর্ঘদেহী
ছায়া ভেসে উঠেছে! ওভারকোট, টুপি পরা! ও ছায়া
আমার নয়! হতেই পারে না। অথচ ছায়াটা ঠিক আমার
পিছনেই……!
এরপরই ছায়াটা গোটা দেওয়ালে হেঁটে বেড়াতে শুরু
করলো! ঠিক যেমন সরীসৃপ দেওয়াল বেয়ে বেড়ায়…
তেমনিই সারা দেওয়ালে, ছাতে শরীর ঘেঁষটে বেড়াচ্ছে
সে!
বুঝলাম ও আমায় নিষ্কৃতি দেবে না! সৃষ্টি এবার
স্রষ্টাকে ধ্বংস করেই ছাড়বে!
কাউকে কিছু বললাম না। কিন্তু সারাদিন, সারারাত
সেই ছায়া আমার সাথে লেগেই থাকলো। কখনও সে
আমার পিছন পিছন আসে, কখনও দেওয়ালময় হেঁটে
বেড়ায়! কিন্তু পিছু ছাড়ে না! আমার অদ্ভুত আচরণ দেখে
স্ত্রী অবাক হলেন। কিন্তু ভাবলেন যে হয়তো রথীনবাবুর
মৃত্যু সংবাদে আমি ভয় পেয়ে গেছি। তাই এমন অবস্থা!
এর ঠিক দুদিন পরের কথা!---চলবে------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now